পুরো বাড়ি খুঁজেও অসীম কে আর পাওয়া যায় না । ভোজবাতির ন্যায় উবে গেছে ।
ফোনে কল করলেও ফোন বন্ধ বলছে কেউ দেখেওনি কোথায় গেছে ।
ভীষণ পরিমাণে রেগে আছেন আকাশের বাবা আমজাদ শেখ ।
ছোট ছেলেকে এই মুহূর্তে সামনে পেলে জীবন্ত চিবিয়ে খেতেন । এই ছেলের যন্ত্রণায় বাড়ির কেউ শান্তিতে থাকতে পারে না । বড় ভাইয়ের বিয়ের পরের দিন ভাবীকে বক্সের ভেতর দুটো ব্যাঙ রেখে প্যাকিং করে গিফট করেছিল । গিফট্ খুলে বড় বড় দুটো ব্যাঙ দেখে ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল মিলা।
আর এবার মেজো ভাইয়ের বউ কে কেঁচো খুঁড়ে এনে প্যাকিং করে গিফট করেছে। তাও একটা দুটো কেঁচো না পঞ্চাশ টারও বেশি হবে হয়তো । কি পরিমাণ বাঁদর হলে এমন কাজ করে।
রাহা কোনো রকম হাসি চেপে সোফায় বসে আছে । তবুও একটু পর পর মুচকি মুচকি হাসছে ।
কেঁচো গুলো পরিষ্কার করে ফেলে দিয়েছে কাজের বুয়া।
সব মেয়েরা পুনরায় সোফায় বসেছে ।
আকাশ বড় ভাইয়ের সাথে বাড়ির বাহিরে গেছে ।
রাগে গজগজ করতে করতে বাড়ির বাহিরে বেরিয়ে যায় আমজাদ শেখ আর ওনার বড় ভাই আজলান শেখ। রান্নার দিক টা দেখার জন্য দুই ভাই এগিয়ে যায়।প্যান্ডেল ডেকোরেশন এর দিক টা আকাশের ফুপা দেখছেন ।
,
দুপুর পর রাহা কে সাজানোর জন্য পার্লার থেকে বিউটিশিয়ান আসে । রাহার ভারী মেকআপ পছন্দ নয়।তাই বিয়ের দিন লাইট মেকআপ করেছিল । কিন্তু আজ তার ননদরা বলছে তাকে ভারী মেকআপ করতেই হবে। তাই চুপ চাপ বসে আছে আর মেকআপ আর্টিস্ট রাহাকে সাজিয়ে দিচ্ছে ।
মেরুন রঙ্গা লেহেঙ্গার সাথে ভারী মেকআপ রাহাকে দেখতে অসম্ভব রকমের সুন্দর লাগছে । তবে আসল চেহারা ঢাকা পড়েছে ভারী মেকআপ এর আড়ালে ।
সবাই নতুন বউয়ের সাথে সেলফি তুলতে ব্যস্ত ।
নতুন বউদের মাঝে যেমন লাজুকতা মিশে থাকে তার বিন্দু মাত্র লাজুকতা নেই রাহার মাঝে । তাকে দেখে মনে হচ্ছে বিয়েটা তার হয়নি সে নিজেই বিয়ে খেতে এসেছে । যে যা জিজ্ঞেস করছে ফটাফট উত্তর দিচ্ছে ।
সবাই বুঝতে পারছে রাহা চঞ্চল প্রকৃতির মেয়ে ।
,
রাহাকে রুম থেকে বের করে নিচে নিয়ে আসা হয় ।
আকাশ তৈরি হয়ে নিজের রুম থেকে বেরিয়ে আসে । সিঁড়ির কাছে এগিয়ে আসতেই চোখ পড়ে সোফায় বসে থাকা মেরুন রঙ্গা লেহেঙ্গা পরিহিত রমণীর দিকে ।
রমণীর টকটকে লাল ঠোঁট একটু পর পর মুচকি হাসছে। আকাশ ডান হাত টা বুকের বা পাশে রেখে জোড়ে শ্বাস টেনে নেয় । তার পর ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করে । আকাশ নিচে নেমে আসতেই কয়েক জন বলে ওঠে ।
_ ওইতো নতুন জামাই চলে এসেছে ।
সকলের সাথে সাথে রাহাও চোখ তুলে তাকায় । চোখাচোখি হয় দুজনের । রাহা চোখ নামিয়ে নেয় ।
আকাশ কাছ থেকে দেখতে থাকে নিজের পিচ্চি বউ টা কে ।
রাহার বাবার বাড়ি থেকে লোক জন আসে । সকল কে দেখে রাহার হাসি চওড়া হয় ।
,
রাহা আর আকাশ কে স্টেজে বসানো হয় ।
ফটোশুট হয় দুজনের । সাথে বাড়ির সকলের ।
হাসি আনন্দে সময় গড়িয়ে যায় ।
স্টেজ থেকে একে একে নেমে আসে সবাই । আকাশ রাহার হাত ধরে স্টেজ থেকে নামার জন্য উদ্যত হয় ।
সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছে সমুদ্র । কথা বলছে অসীমের সাথে । আপাতত অসীম কে ছাড় দেওয়া হয়েছে । সুযোগ বুঝে উদ্যম মাধ্যম দেবে ।
সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় লেহেঙ্গার সাথে হিল বেঁধে হোঁচট খায় রাহা । পড়ে যেতে যেতে হাত বাড়িয়ে খা*মচে ধরে সমুদ্রের পাঞ্জাবী । রাহার হাতের ধাক্কায় উপুড় হয়ে নিচে পড়ে যায় সমুদ্র ।
টাল সামলাতে না পেরে রাহার সাথে সাথে আকাশ নিজেও হোঁচট খায় ।
কোনো মতে নিজেকে ব্যালেন্স করে সোজা হয়ে দাড়ায় রাহা । নিচের দিকে তাকাতেই দেখে সমুদ্রের পাঞ্জাবী ছিঁড়ে গেছে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ।
উপস্থিত সকলে তাকিয়ে আছে নিচে পড়ে থাকা বাড়ির বড় ছেলে সমুদ্র শেখের দিকে আর আকাশ রাহার দিকে । কয়েক জন দৌড়ে এসে সমুদ্র কে টেনে দাঁড় করায় । সোজা হয়ে দাড়াতেই পাঞ্জাবির ছিঁড়ে যাওয়া অংশ টুকু নিচে ঝুলে পড়ে । যা দেখেই ফিক করে হেসে ওঠে অসীম । ওর সাথে যোগ দেয় আরো অনেকে ।
এমন একটা কান্ড ঘটিয়ে রাহা অনুতপ্ত না হয়ে মুখ লুকিয়ে হাসে । আকাশ দেখতে পায় ওর পিচ্চি বউ অঘটন ঘটিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে ।
অসীম বড় ভাইয়ের পেছনে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবির ছেড়া ঝুলে থাকা অংশ টুকু হাত দিয়ে তুলে পিঠের সাথে ধরে বলে ,
_ ভাবী তো দারুন কাজ করলো । ভাসুরের মানসম্মান খেয়ে দিল এক থাবায় ।
অসীমের এমন কথা শুনে হো হো করে হাসতে শুরু করে অনেকেই । রাহা জোড়ে হাসতে যাবে তার আগেই আকাশ হাত দিয়ে চেপে ধরে রাহার মুখ ।
কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে ,
_ হাসছো কেনো ? চুপ চাপ থাকো সবাই পঁচা বলবে ।
রাহা আকাশের হাত সরানোর জন্য ছটফট করতে লাগলো ।
_ হাসবে না একদম চুপচাপ দাড়াও ।
বলেই মুখ থেকে হাত সরিয়ে নেয় । সমুদ্র এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে সবাই ওর দিকে তাকিয়ে আছে । ওর বউ টাও হি হি করে হাসছে সেই সাথে কাজিন মহল আর বেয়ান গুলো ।
ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে ছিঁড়ে যাওয়া পাঞ্জাবী দেখার চেষ্টা করে । ছেড়া অংশ টুকু অসীম ভাইয়ের হাতে ধরিয়ে দেয় ।
রাহার হাত ধরে বড় ভাইয়ের সামনে এসে দাঁড়ায় আকাশ । রাহা অনুতাপের স্বরে বলে ,
_ সরি ভাইয়া আমি বুঝতে পারিনি ।
_ না না ঠিক আছে সমস্যা নেই ।
আকাশ রাহার হাত ছেড়ে নিঝুমের দিকে তাকিয়ে বলে ,
_ নিঝুম ওকে নিয়ে ভেতরে যা ।
ভাইয়ের কথা মত রাহার হাত ধরে ভেতরের দিকে এগিয়ে যায় । সাথে বাড়ির বাকি মেয়েরা আর রাহার কাজিন রাও যায় । ভেতরে যেতে যেতেও মুচকি মুচকি হাসে রাহা । নিজের বাড়িতে থাকলে এমন পরিস্থিতিতে গড়াগড়ি করে হাসতো ।
আকাশ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে ,
_ কাল রাতে সালাম করতে যেতে নিজেই ধপাস করে পড়ল । সকালে ঘুম থেকে উঠে আবোল তাবোল বকলো । কেঁচো দেখে ভয় পেয়ে অন্যদের শরীরের উপর ছুঁড়ে মারলো । আর এখন ভাসুরের পাঞ্জাবী ঝুলঝুলা করে দিল । হোঁচট খেয়েছে ভালো কথা ভাইয়ার পিঠেই থাবা বসাতে হলো ? আমার বেচারা ভাইয়াটার কি অবস্থা করেছে ।
ভাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে বলে ,
_ ব্যাথা পেয়েছো ভাইয়া ?
_ নাহ্ ঠিক আছি আমি ।
পাশ থেকে আকাশের বন্ধু বলে ,
_ ভাই তোর বউ এটা কি করলো ? ঠিক ভাবে দেখতেই পারলাম না ।
_ কেনো দেখতে পাসনি ?
_ অন্য দিকে তাকিয়ে ছিলাম তো ।
_ আচ্ছা রাহা কে আবার ডাকি তুই ভাইয়ার জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবি । তাহলে ভালো ভাবে ফীল করতে পারবি ।
_ না ভাই দরকার নেই ।
সমুদ্র বাড়ির ভেতর এগিয়ে যায় ।
ছোট ভাই বড় ভাই বন্ধু গুলো হো হো করে হাসতে থাকে সমুদ্রের যাওয়ার পথে তাকিয়ে ।
জীবনের প্রথম এমন কিছু ঘটলো সমুদ্রের সাথে ।
বির বির করে বলে ,
_ ভালো হয়েছে যে পাঞ্জাবী ধরেছিল প্যান্ট ধরলে তো সব শেষ । আল্লাহ বাঁচিয়েছে আজকে ।