আকাশের পালা এবার শশুর বাড়ী যাওয়া । সব গোছগাছ হয়ে গেছে একটু পরেই বের হবে শশুর বাড়ী যাওয়ার জন্য । আকাশ বড় ভাই আর ফ্রেন্ড দের সাথে কথা বলছে বাড়ির বাহিরে দাঁড়িয়ে ।
রাহা সোফায় বসে আছে । ওর ওকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে অনেকেই ।
অসীম রাহার কাজিন দের পাশে গিয়ে দাড়ায় ভদ্র ছেলের মত । সালাম দিয়ে ঢং করে বলে ,
_ বিয়াইন সাহেবারা কেমন আছেন সবাই ?
মেয়ে গুলোও ঢং করেই বলে ,
_ আমরা সবাই ভালো আছি, আপনি কেমন আছেন বিয়াই মশাই ?
_ এতক্ষণ ভালোই ছিলাম ।
_ কেনো এখন ভালো নেই ?
_ আপনাদের সাক্ষাৎ পেয়ে এখন অনেক ভালো আছি ।
সকলেই একসাথে বলে ,
_ ওওও ।
_ তো বিয়াইন সাহেবারা এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবেন নাকি আমার সাথে যাবেন ?
_ আপনার সাথে কেনো যাবো বিয়াই মশাই ?
_ আমাদের বাড়িতে এসেছেন আপনাদের তো সেভাবে আপ্যায়ন করা হলো না । আমার সাথে চলুন আপনাদের জন্য সারপ্রাইজ রেডি করে রেখেছি সেই কখন । সময়ের অভাবে বলতে পারছিলাম না ।
_ কি সারপ্রাইজ বিয়াই মশাই ?
_ গেলেই দেখতে পাবেন । বলে দিলে আর সারপ্রাইজ রইলো কোথায় ?
_ হুম তাও ঠিক ।
_ তাহলে চলুন আমার সাথে ।
_ আচ্ছা চলুন ।
রাহার মামাতো ফুপাতো আর বড় ভাইয়ের শা*লী মিলিয়ে পাঁচ জন মেয়ে । সকলের বয়স পনেরো থেকে বিশ বছরের মধ্যে । আর অসীমের বয়স একুশ বছর ।
পাঁচ জন কে সাথে নিয়ে বাড়ির বাহিরে বেরিয়ে আসে ।
পাঁচ জনের জন্য কি প্ল্যান তৈরি করে রেখেছে এই হার ব*জ্জা*ত ছেলে অসীম , কারো ধারণাতেই নেই । এর মাথায় সব সময় শ*য়*তা*নি বুদ্ধি কিলবিল করে ।
সব সময় এর ওর পেছনে লাগবেই ।
কিন্তু এ যাত্রায় বেঁচে যায় পাঁচ জন মেয়ে । অসীম যে নিজের সাথে করে রাহার কাজিনদের নিয়ে যাচ্ছে এই দৃশ্য নজরে আসে আকাশের । আকাশ অসীমের সাথে মেয়ে গুলোকে দেখেই বুঝতে পেরেছে ওর হার ব*জ্জা*ত ভাই কিছু একটা প্ল্যান করেছে মেয়ে গুলোকে শায়েস্তা করার জন্য । বিয়ের দিন বিয়ের গেটে এই মেয়ে গুলোই অসীম কে মরিচ দেওয়া মিষ্টি খাইয়ে ছিল মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে । তারই প্র*তি*শো*ধ নেয়ার জন্য যে, অসীম কোনো প্ল্যান করেছে বোঝা শেষ আকাশের । দ্রুত অসীমের দিকে জেতে জেতে ডেকে বলে ,
_ অসীম কোথায় যাচ্ছিস এদিকে আয় ।
ভাইয়ের ডাক শুনে ভাইয়ের দিকে তাকায় ।
_ এদিকে আয় ।
_ আসছি ভাইয়া পাঁচ মিনিট ।
_ এক মিনিটও না তাড়াতাড়ি আয় ।
আপনারা সবাই ভেতরে যান হ্যাঁ ।
পাঁচ জন সম্মতি দিয়ে ভেতরের দিকে আগায় ।
অসীম বুঝতে পারে ওর ভাইয়া ইচ্ছে করেই মেয়ে গুলোকে ওর হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল । ওর প্ল্যান যে বুঝতে পেরে গেছে আকাশ এটা বুঝতে দিলে চলবে না। তাই বলে ,
_ ভাইয়া তুমি বিয়াইন সাহেবা দের ভেতরে পাঠিয়ে দিলে কেনো তাদের কে আমি সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম তো ।
_ তুই কি সারপ্রাইজ দিতে চাইছিলি সেটা খুব ভালো করেই জানি আমি । আবার কেঁচো নাকি ব্যাঙ প্যাকিং করে গিফট দিতে চাইছিলি ? ওই বাড়ির লোক দের সাথে উল্টা পাল্টা কিছু করলে খবর আছে তোর ।
মুখ ছোট করে বলে ,
_ এরকম কিছু করতে চাইনি ।
বলেই অন্য দিকে চলে যায় । বির বির করে বড় ভাইয়ের গুষ্টি উদ্ধার করে দেয় ।
,
সব কিছু চুকিয়ে এবার পালা আকাশের শশুর বাড়ী যাওয়া ।
বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে সবাই । রাহার মুখ খুশিতে চকচক করছে । বাবার বাড়ি যাবে বলে কথা ।
সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কারের দিকে এগিয়ে যায় আকাশ রাহার হাত ধরে । ওদের সাথে সাথে আরো অনেকেই এগিয়ে যাচ্ছে ।
হঠাৎ রাহা একজনের লেহেঙ্গা তে পারা দিয়ে ধরে না দেখেই । মেয়েটি সামনের দিকে পা বাড়াতেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে সামনের দিকে । আর সামনে যারা দাঁড়িয়ে ছিল তারাও মেয়েটির ধাক্কায় উপুড় হয়ে পড়ে যায় । মুহূর্তেই কি থেকে কি ঘটে গেল বুঝতেই পারলো না কেউ ।
অঘটন ঘটিয়ে চোরের মত চোখ মুখ বানিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো রাহা । ওর কি দোষ ? মেয়েটাই তো ওর সামনে চলে এসেছিল । ও কি ইচ্ছে করে পারা দিয়েছিল নাকি ?
কয়েক জন এসে টেনে দাঁড় করায় সবাই কে । একেক জনের ড্রেস এলোমেলো হয়ে খুলে যাওয়ার যোগাড় ।
আকাশ রাহার মুখের দিকে তাকায় । আকাশের বোঝা শেষ এই অঘটন এই ওঘটনকারীই ঘটিয়েছে । এর চোখ মুখ তাই বলছে ।
আজলান শেখ বলে ,
_ তোমরা পরলে কিভাবে ?
_ নিরা ধাক্কা দিয়েছে ।
নিরা বলে ,
_ আমার লেহেঙ্গায় কে যেন পারা দিয়ে ধরেছিল । তাই পড়ে গেছি ।
আজলান শেখ কিছুটা রাগী স্বরে বলে ,
_ কে পারা দিয়েছে ?
আজলান শেখ ভাবছে এই কাজ অসীম করেছে । কারণ এই সব উদ্ভট কাজ অসীম ছাড়া আর কেউই করে না । শুধু যে উনিই ভাবছে তেমন নয় আরো অনেকে এটাই ভাবছে অসীম করেছে এমন । সকলেই রেগে অসীমের দিকে তাকায় । ভাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অসীম সকলের দিকে তাকিয়ে বলে ,
_ তোমরা এভাবে তাকিয়ে আছো কেনো ? আমি পারা দেইনি নিরার ড্রেসে ।
নিরা তেড়ে এসে বলে ,
_ তুইই করেছিস আমি জানি ।
_ একদম আমার কাছে আসবি না বলছি । আমার ঠেকা পড়েছে তোর ওই দুটাকার লেহেঙ্গায় পারা দেওয়ার । আমি ফেললে তোকে এভাবে ফেলতাম না । গোবর দেওয়া পানিতে চুবাতাম ঘাড়ে ধরে ।
বলেই দৌড়ে চলে যায় । নিরা অসীমের পেছন পেছন যেতে যেতে বকাবকি করতে থাকে ।
আমজাদ শেখ নিজের সুপুত্র কে পেছন থেকে বকতে থাকেন । এই ছেলে ছোট বড় কাউকেই শান্তি দেয় না ।
আকাশ রাহার দিকে তাকিয়ে রইলো । যে দোষ করলো সে বেঁচে গেল আর যে কিছুই করলো না সেই সকলের রোষানলের শিকার হলো ।
কারে উঠে বসে আকাশ পাশে বসে রাহা ।
আস্তে ধীরে রাহার বাবার বাড়ির সকলেই আকাশ দের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় ।
,
কার প্রবেশ করে রাহাদের বাড়িতে ।
কার থেকে নেমে আকাশ কে রেখেই বাড়ির ভেতর চলে যায় রাহা । হা করে তাকিয়ে রইলো আকাশ ।
রাহার বড় ভাই রিশাদ আকাশ কে বাড়ির ভেতর নিয়ে আসে । সাথে সকল গেস্ট প্রবেশ করে ।
রাহা কে একা ভেতরে আসতে দেখে রাহার মা দাদি মামী ফুপি সকলেই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ।একটু পরেই রিশাদ আকাশ কে নিয়ে প্রবেশ করে ।
রাহা আগে আগে চলে আসায় রাহার দাদি রাহাকে বলে ,
_ কিরে তুই জামাই রেখে ঢ্যাং ঢ্যাং করতে করতে আগে আগে আসলি কেনো ?
রাহা সোফায় আয়েশ করে বসে বলে ,
_ কেনো ওনার কি পা নেই ? কোলে তুলে নিয়ে আসতে হবে ?
_ বিয়ের পর জামাই নিয়ে প্রথম বাপের বাড়ি আসলি দুজনে একসাথে ভেতরে আসবি না গাঁধী মেয়ে । আগে আগে নাচতে নাচতে চলে আসলি ।
_ কেনো একসাথে আসতে হবে এটা নিয়ম ?
_ তুই বেশি কথা বলিস এখন চুপ করে থাক ।
রাহা চুপ তো করেই না উল্টো বলে ,
_ চুপ করে থাকবো কেনো ? মুখ আছে কথা বলার জন্য কথা বলবোই ।
_ হ্যাঁ হ্যাঁ তুইই কথা বল আমরাই মুখ কান বন্ধ করে থাকি ।
আকাশের দুই ফ্রেন্ড আকাশ আর রিশাদের পাশে দাঁড়িয়ে আছে । দাদি নাতিনের কথা শুনে মুচকি মুচকি হাসছে । আকাশ তো লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে । ওর বউ যে শুধু একটা পিচ্চি মেয়ে তা নয় । এক নাম্বারের বাচাল মেয়ে একটা । চঞ্চল দুষ্ট প্রকৃতির মেয়ে । সেই সাথে অঘটন ঘটাতে ওস্তাদ ।
চব্বিশ ঘণ্টায় সব বুঝে গেছে আকাশ । চব্বিশ ঘন্টায় চার বার অঘটন ঘটিয়ে ফেলেছে ।
রাহার ভাবি রাহার উদ্দেশ্যে বলে ,
_ রাহা আকাশ ভাইয়াকে তোমার রুমে নিয়ে যাও ।
আর রিশাদ তুমি ওনাদের দুজন কে গেস্ট রুমে নিয়ে যাও ফ্রেস হয়ে নিক।
রিশাদ আকাশের ফ্রেন্ড দুজন কে সাথে করে গেস্ট রুমের দিকে এগিয়ে যায় । সাথে রাহার আর আকাশের লাগেজ টাও নিয়ে গেছে রাহার রুমের সামনে রেখে যাবে ।
রাহাকে বসে থাকতে দেখে রিশাদের বউ আবার বলে ,
_ রাহা যাও আকাশ ভাইয়াকে তোমার রুমে নিয়ে যাও।ফ্রেস হয়ে নাও দুজনেই ।
রাহার ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায় । তার পর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে ,
_ আসুন ।
আকাশ রাহার সাথে যেতে শুরু করে ।
প্রথম সিঁড়িতে পা দিয়ে দ্বিতীয় সিঁড়িতে পা রাখতেই মুখ থুবড়ে পড়ে রাহা । আকাশ ধরবে যে সেই সুযোগ টুকুও পায় না ।
সোফার কাছ থেকে সকলেই দৌড়ে আসে সিঁড়ির কাছে। রাহা তো বাড়ি কা*পিয়ে চি*ৎকার করে ওঠে ।
আকাশ দ্রুত ধরে রাহা কে । রাহার ভাবি আর মাও ধরে। রাহার মা বলে ,
_ কিভাবে পরলি ?
কাদতে কাদতে বলে ,
_ লেহেঙ্গা তে পা বেঁধে ।
রাহার দাদি বলে ,
_ লেহেঙ্গা দুই হাতে ধরে হাটবি না ? গেলি তো পড়ে পেলি তো ব্যাথা ।
_ বুড়ি তুমি চুপ করো । আমি পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেয়েছি তুমি না কেঁদে আমাকে কথা শোনাচ্ছো ।
রাহার ভাবি বলে ,
_ কোথায় ব্যাথা পেয়েছ?
_ হাঁটুতে আর কুনুই তে ।
রিশাদ দৌড়ে এসেছে বোনের চি*ৎকার শুনে ।
উতলা হয়ে বলে ,
_ কি হয়েছে রাহার ?
_ লেহেঙ্গায় পা বেঁধে পড়ে গেছে ।
রিশাদ কপাল চাপড়ে বলে ,
_ দুবার তো অন্যকে ফেল্লি এবার নিজেও পরলি ? কোথায় কোথায় ব্যাথা পেয়েছিস ?
_ হাঁটুতে আর কুনুইতে ।
_ অনেক ব্যাথা পেয়েছিস ?
_ হুম ।
রিশাদ ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে ,
_ আম্মু জানো তোমার এই গুণধর মেয়ে কি করেছে শশুর বাড়িতে ?
_ না বললে জানবো কিভাবে, কি করেছে ?
_ স্টেজ থেকে নামার সময় পড়ে যেতে নিয়েছিল । তখন আকাশের বড় ভাই সমুদ্র ভাইয়ার পিঠ খা*ম*চে ধরে পড়ার হাত থেকে বাঁচার জন্য । ও তো বেঁচে যায় কিন্তু সমুদ্র ভাইয়াকে উপুড় করে ফেলে দেয় । ফেলে দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি ওনার পাঞ্জাবী ছিঁড়ে ঝুলিয়ে দিয়েছে শত শত মানুষের সামনে ।
রাহার দাদি রাহার দিকে তাকিয়ে বলে ,
_ কি করেছিস রে গাঁধী ? শেষ পর্যন্ত ভাসুরের মানসম্মান নিয়ে টানাটানি ।
দাদীর কথা শুনে উপস্থিত কয়েক জন ফিক করে হেসে ওঠে । মুহূর্তেই মুখে হাত চেপে হাসি দমন করে নেয় ।
রিশাদ পুনরায় বলে ,
_ আবার আসার সময় আরেক অঘটন ঘটিয়ে এসেছে ।
_ আবার কি করেছে ?
_ আকাশের এক বোনের লেহেঙ্গায় পারা দিয়ে উপুর করে ফেলে দিয়েছে । মেয়েটা একা পড়লেও একটা কথা ছিল । পড়তে পড়তে সাথে আরো কয়েক জন কে সাথে নিয়ে পড়েছে । আমার এই গুণধর বোন অঘটন ঘটিয়ে এমন ফেস করে দাঁড়িয়ে ছিল যেন সে ইহজগতে নেই । লজ্জায় তো আমার মাথা কাটা যাচ্ছিল । আর কি কি করেছে কে জানে ?
পাশ থেকে রাহার মামী বলে ,
_ এসব কথা বাদ রাখো এখন । মেয়েটাকে ধরে দাঁড় করাও অনেক ব্যাথা পেয়েছে হয়তো ।
আকাশ আর রিশাদ রাহাকে ধরে দাঁড় করানোর চেষ্টা করে । কিন্তু রাহার পা মচকে গেছে । দাঁড়িয়ে আবার বসে পরে । ভাইয়ের হাত ধরে বলে ,
_ আমি হাঁটতে পারবো না অনেক ব্যাথা করছে ভাইয়া ।
_ ওকে কোলে তুলে রুমে রেখে আয় রিশাদ ।
দাদীর কথা মত বোনকে কোলে তুলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে আকাশ কেও আসতে বলে ।
রাহার রুমে এসে রাহা কে বেডে বসিয়ে দেয় ।
লাগেজ ভেতরে এনে দিয়ে বলে ,
_ তুই চেঞ্জ করে নে । আকাশ ডোর টা লক করে দাও ।
বলেই রুম থেকে বেরিয়ে যায় রিশাদ ।
আকাশ ডোর লক করে রাহার দিকে ফিরে তাকায় । রাহাও ওর দিকে তাকিয়ে আছে । আকাশ এগিয়ে এসে দাঁড়ায় রাহার সামনে ।
রাহার চোখ দুটো লাল হয়ে আছে । পানিতেও টুইটুম্বর । বেশ ব্যাথা পেয়েছে বোঝা যাচ্ছে ।
রাহার পায়ের সামনে বসে দুই পায়ে ভর করে ।
_ দেখি কোথায় কোথায় ব্যাথা পেয়েছো ।
বলেই রাহার লেহেঙ্গা উচু করতে নেয় ।
রাহা আটকে দিয়ে বলে ,
_ বেশি ব্যাথা পাইনি সেরে যাবে ।
_ আমি দেখবো তুমি হাত সরাও ।
রাহা হাত সরিয়ে সোজা হয়ে বসে ।
লেহেঙ্গা হাটু পর্যন্ত তুলে দেখে দুই হাঁটুতে ছিলে গেছে সিঁড়ির সাথে লেগে । ডান পায়ের গোড়ালির উপরে লাল হয়ে ফুলে উঠেছে ।
পায়ের দিকে দৃষ্টি রেখেই বলে ,
_ দেখে হাটবে না ? এত টা বেখেয়ালি কেনো তুমি ? সাবধানে চলাফেরা করবে সব সময় । কতটা ব্যাথা পেয়েছো দেখেছো ?
_ আমি এর আগে কখনো শাড়ি বা লেহেঙ্গা পরিণী । তাই বার বার পায়ের সাথে পেঁচিয়ে যায় ।
_ এই সব শাড়ি লেহেঙ্গা আর পড়তে হবে না । কাল বাড়ি ফেরার পথে ড্রেস কিনে দেবো । আজকের মত তোমার আগের ড্রেস পড়ে নাও ।
_ আচ্ছা ।
_ একা চেঞ্জ করতে পারবে নাকি কাউকে আসতে বলবো ?
_ একাই পারবো । শুধু লেহেঙ্গার সেফটিপিন একটু খুলে দিন পেছনের গুলো ।
আকাশ বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় । রাহার হাত ধরে কনুই দেখে । কনুই তেও ছিলে র*ক্ত জমাট বেঁধে গেছে ।
রাহা একটু উল্টো ঘুরে বসে । পিঠের দিকে ওড়নায় লাগানো সেফটিপিন গুলো খুলে দেয় আকাশ ।
চুল গুলো দেখিয়ে রাহা বলে ,
_ এগুলোও খুলে দিন ।
আকাশ একে একে চুলে লাগানো ক্লিপ গুলো খুলে দেয়।
রাহা গা থেকে লেহেঙ্গার ওড়নাটা খুলে বেডের উপর রেখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে । কিন্তু ডান পায়ে ভর করতে পারে না । ব্যথায় মুখ দিয়ে মৃদু শব্দ বেরিয়ে আসে ।
বেডের উপর ভর করে দাড়ায় ।
_ কাউকে ডাকবো ।
_ নাহ্ ।
_ ব্যথায় তো দাড়াতেই পারছো না ।
_ পারবো আমি ।
বলেই আস্তে আস্তে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে আলমারির সামনে গিয়ে দাড়ায় । থ্রী পিস বের করে নিয়ে ওয়াসরুমে প্রবেশ করে ।
আকাশ হতাশ দৃষ্টিতে ওয়াশরুমের বন্ধ ডোরের দিকে তাকিয়ে থাকে ।
তার পর লাগেজ খুলে নিজের ড্রেস বের করে চেঞ্জ করে নেয় ।
রাহা ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে । হাতে মেরুন রঙ্গা লেহেঙ্গা টা ।
লেহেঙ্গা টা চেয়ারের উপর রেখে বেডে গিয়ে শুয়ে পড়ে।আকাশ একনজর রাহার দিকে তাকিয়ে ওয়াসরুমে প্রবেশ করে ।
,
খাবার নিয়ে এসে ডোর নক করে রিশাদের বউ নিলা ।
আকাশ গিয়ে ডোর খুলে দেয় ।
খাবার নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে নিলা । বেডে শুয়ে থাকা রাহার দিকে তাকিয়ে বলে ,
_ শরীর খারাপ লাগছে ?
_ ক্লান্ত লাগছে ।
_ খেয়ে রেস্ট নাও ভালো লাগবে ।
পাশ থেকে আকাশ বলে ,
_ পেইন কিলার আছে ভাবি ?
_ হ্যাঁ আছে ।
_ রাহার জন্য একটা পেইন কিলার দিয়ে যাবেন । আর ক্ষ*ত স্থানে দেওয়ার জন্য একটা মলম ।
_ আচ্ছা আপনাদের খাবার বেড়ে দিয়ে নিয়ে আসছি ।
_ বেড়ে দিতে হবে না । আপনি মলম আর পেইন কিলার নিয়ে আসুন ।
নিলা চলে যায় ।
একটু পরেই মলম আর পেইন কিলার নিয়ে আসে ।
দিয়ে আবার চলে যায় ।
ডোর লক করে আকাশ নিজেই খাবার বেড়ে নেয় অল্প অল্প করে দুজনের জন্য । যদিও এখন খেতে ইচ্ছে করছে না তবুও ভদ্রতার খাতিরে খেতে হবে । কষ্ট করে রান্না করে আবার রুম অব্দি বয়ে এনেছে ।
_ রাহা ওঠো খাবার খেয়ে পেইন কিলার খেয়ে নাও ।
_ খেতে ইচ্ছে করছে না আপনি খান ।
_ ইচ্ছে করছে না বললে হবে না ওঠো তারাতারি ।
বলেই হাত ধরে টেনে শোয়া থেকে বসায় ।
আস্তে ধীরে দুজনেই খেয়ে নেয় । বাকি খাবার আকাশ ঢেকে রেখে দেয় । পেইন কিলার খেতে দিয়ে ফোন হাতে নিয়ে ওর ফ্রেন্ডের ফোনে কল করে ।
কল রিসিভ করে কানে নিয়ে ওপাশ থেকে আকাশের ফ্রেন্ড নীলয় খোঁচা দিয়ে বলে ,
_ নতুন জামাই যে ,রুমে ঢুকে আর বের হলেন না তো ।
_ নতুন বিয়ে করেছি রুম থেকে বের কেনো হবো ?
_ আমরা তো আর বিয়ে করিনি তাইনা ?
_ হ্যাঁ তোরা তো বিয়ে করেছিস অবশ্যই । কিন্তু আমার মতো করে তো আর করিসনি তাইনা ?
_ খোঁচা দিবি না আকাশ ।
_ খোঁচাটা প্রথমে দিয়েছিল কে ?
_ আচ্ছা বাদ কি বলবি বল ।
_ কি করছিস তোরা ?
_ বিশ্রাম নিচ্ছি ।
_ খেয়েছিস ?
_ হ্যাঁ । ঠেসে ঠেসে খাইয়ে ছেড়েছে সবাই । পেট এখন টইটুম্বুর হয়ে গেছে । নড়া চড়া করতেও কষ্ট হচ্ছে ভাই ।
_ মুখ আছে কি করতে ? কমিয়ে দিতে বলতে পারলি না ?
_ শোনে না তো কেউ ।
_ ভালোই হয়েছে । কম খাওয়ালে আবার বলতি "তোর তোর শশুর বাড়ী গিয়েছিলাম পেট ভরে খেতেও দেয়নি।
_ এতটা অকৃতজ্ঞ না আমরা বুঝেছিস ?
_ হুম জানি তো । সে জন্যই মাসে দুদিন ট্রিট দিলেও বলিস " বছরে একটা দিন ট্রিট দিস না ।
_ ব্যাটা নতুন বিয়ে করেছিস বউ নিয়ে শুয়ে থাক শীতের মধ্যে । শুধু শুধু কল করে কেনো ডিস্টার্ব করছিস ?
_ খোজ না নিলেও তো বলতি " শশুর বাড়িতে এসে ফ্রেন্ড দের ভুলে গেছে ।
_ যাহ বলবো না । ফোন রাখ বউয়ের সাথে কথা বলবো। নিজে তো বউয়ের কাছেই রয়েছেন বউয়ের থেকে দূরে থাকার যন্ত্রণা বুঝবেন কিভাবে ?
_ যা তোর বউ আজ তোর কল রিসিভ করবে না আমি দোয়া করে দিলাম ।
ফোন স্পিকারে থাকায় আকাশের আরেক ফ্রেন্ড রাফি আকাশের কথা গুলো শুনেছে । শেষের কথা গুলো শুনে নিজেও জোড়ে বলে ,
_ আমীন, তোর দোয়া যেন আল্লাহ তায়ালা কবুল করেন।
নীলয় ফোন লাইন না কে*টেই রাফির দিকে ঝুঁকে রাফির বাহুতে কি'ল বসিয়ে বলে ,
_ শকুনের দোয়ায় গরু ম*রে না ।
রাফি নীলয়কেও একটা কি'ল বসিয়ে দেয় । তার পর নীলয় কে ঠেলে বেডে ফেলে দিয়ে নীলয়ের দুই পায়ের উপর শক্ত হয়ে উঠে বসে বলে ,
_ মা*রলি কেনো বল ?
নীলয় আরেক কি'ল বসিয়ে বলে ,
_ আবার মে*রেছি কি করবি তুই ?
_ তোর পেটের সব খাবার এখন বের করবো যেখান দিয়ে গিলেছিস সেখান দিয়েই ।
বলেই নীলয়ের পেটের উপর উঠতে নেয় । নীলয় আর রাফি ছোট খাটো একটা যুদ্ধ শুরু করে বেডে শুয়ে শুয়ে ।
ওদের দুজনের হইহল্লা শুনে কল লাইন কে*টে দেয় আকাশ । আকাশ মাঝে মধ্যে ভেবে পায় না ওর মত শান্ত শিষ্ট ছেলে ওদের দুজনের মত বদের হাড্ডির সাথে কিভাবে ফ্রেন্ডশিপ করলো । আর ওদের দুজনের সাথে এত গুলো বছর কা*টিয়ে দিল ।
রাহার হাতে আর পায়ের হাঁটুতে মলম লাগিয়ে দেয় আকাশ । তার পর বেডে শুয়ে পড়তে বলে ওয়াসরুমে প্রবেশ করে ।
ফ্রেস হয়ে এসে বেডের দিকে তাকিয়ে দেখে রাহা ব্ল্যাঙ্কেট মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে । আকাশ নিজেই লাইট অফ করে ড্রিম লাইট অন করে বেডে গিয়ে রাহার পাশে শুয়ে পড়ে ।
অনেক সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও রাহা ঘুমায় না ।একটু পর পর একাত থেকে ওকাত হয় । যার দরুন ব্ল্যাঙ্কেটের ভেতর ঠান্ডা ঠান্ডা বাতাস প্রবেশ করে । আর আকাশের ঘুমের সমস্যা হচ্ছে । বিয়ের তোর জোড়ে ঘুম হয় না কয়েক দিন ধরে । আজকে ঘুম পাচ্ছে কিন্তু রাহা নড়া চড়া করে ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে ।
আকাশ রাহার দিকে ফিরে বলে ,
_ চড়ুই পাখির বাচ্চার মত এত ছটফট করছো কেনো ?
আকাশের কথা শুনে আকাশের দিকে ফিরে তাকায় রাহা । কোনো রকম ভনিতা ছাড়াই বলে ,
_ ঘুম আসছে না।
_ কেন?
_ আমার একা একা ঘুম আসে না ।
_ একা কোথায়? আমি তো আছি ।
_ আমাকে জড়িয়ে না ধরলে ঘুম আসে না ।
আকাশের চোয়াল ঝুলে যায় । তার পর চোখ দুটো ছোট ছোট করে বলে ,
_ কাল তো একাই ঘুমিয়েছিলে আবার জড়িয়েও ধরতে হয়নি ।
_ বিয়ের জন্য কয়েক দিন ধরেই ঘুম হচ্ছিল না ঠিক মতো। তাই গত কাল ক্লান্ত থাকায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ।কিন্তু আজ ঘুম আসছে না ।
_ কার সাথে ঘুমাতে তুমি ?
_ দাদীর সাথে । আমি ছোট বেলা থেকেই দাদীর সাথে ঘুমাতাম । ছোট থেকেই দাদি জড়িয়ে ধরে আদর করে ঘুম পাড়াত। আর আমার সেই অভ্যাস হয়ে গেছে । এখন কেউ জড়িয়ে না ধরলে ঘুম আসে না ।
রাহার কথা শুনে আকাশ নিজেই এগিয়ে যায় রাহার দিকে । রাহাকে টেনে বুকের মাঝে আগলে নেয় দুহাতে।
বুকে চেপে ধরে বলে ,
_ এখন চুপ চাপ ঘুমাও একটা কথাও বলবে না । নড়া চড়াও করবে না ।
_ আচ্ছা ।
বলেই চোখ বন্ধ করে নেয় রাহা । কিন্তু ওর শরীর জুড়ে বয়ে চলেছে অদ্ভুত এক শিহরণ । বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটা হচ্ছে তুমুল ভাবে । কিন্তু আকাশের আলিঙ্গনে এসে অনেক ভালো লাগছে । এর আগে কখনো অন্য কারো আলিঙ্গনে এসে এতো ভালো লাগেনি ।
চোখ দুটো বন্ধ করে আকাশের বুকে কান পেতে হার্টবিট শুনতে থাকে ।