আমার ঝামেলা রানী

পর্ব - ১

🟢

সাতাশ বছরের সিঙ্গেল জীবনের ইতি টেনে বিয়ে করেছে আকাশ । বিয়ের সব নিয়ম কানুন শেষ করে বাসর ঘরের সামনে এসে দাঁড়ায় । সাথে দাঁড়িয়ে আছে বন্ধু নামের শত্রু গুলো আর কাজিন মহল ।

টাকা ছাড়া কেউই তাকে ঘরে প্রবেশ করতে দেবে না । বাহির থেকে ডোর লক করে দাঁড়িয়ে আছে সবাই ।

সকলের দাবি বাসর ঘরে প্রবেশ করতে হলে বিশ হাজার টাকা দিতে হবে ।

অনেক তর্ক বিতর্ক করার পর পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে বিদায় করে সকল কে । আকাশের হাতে চাবি তুলে দিয়ে সবাই চলে গেছে ।

লম্বা করে শ্বাস নিয়ে ডোর খোলে আকাশ । গলা খাঁকারি দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে । ভেতর থেকে ডোর লক করে বেডের দিকে তাকায় । আহা ওর সুন্দরী বউটা কখন থেকে ওর জন্য অপেক্ষা করছে । আর বদ*মাইস গুলো ওকে রুমে আসতে দিচ্ছিল না । এক হাত সমান লম্বা ঘোমটা টেনে বেডে বসে আছে আকাশে বিয়ে করে আনা নতুন বউ।

আকাশ আস্তে করে সালাম দেয় ।

_ আসসালামু আলাইকুম ।

বরের উপস্থিতি টের পেয়েছে আগেই ।

শব্দ করে সালামের জবাব না দিয়ে আস্তে করেই দেয় ।

তার পর বেড থেকে নেমে দাড়ায় আস্তে আস্তে ।

বরের পা ছুঁয়ে সালাম করার জন্য এক পা আগাতেই ধারাম করে উপুড় হয়ে পড়ে যায় আকাশের পায়ের উপর । হকচকিয়ে যায় দুজনেই ।

নিজেকে স্বাভাবিক করে নতুন বউয়ের হাত ধরে টেনে দাঁড় করায় আকাশ । লজ্জায় মাথা নত করে নেয় নতুন বউ । আকাশ বউয়ের দিকে তাকায় । সর্বনাশ করেছে ।

বউয়ের দোপাট্টা, শাড়ির আঁচল আর কোমরে গুজে রাখা শাড়ি বাদে বাকি শাড়ি খুলে পড়ে গেছে । লুটোপুটি খাচ্ছে ফ্লোরে । উন্মুক্ত হয়ে গেছে ফর্সা সরু পেট কোমর । আকাশ চোখ সরিয়ে নেয় ।

_ ব্যাথা পেয়েছো ?

দুদিকে মাথা নাড়ায় নতুন বউ । যার অর্থ সে ব্যথা পায়নি ।

ইতস্তত বোধ করে আকাশ । তার পর ভাবে , বউটা তো ওর নিজেরই । এখানে লজ্জা পাওয়ার কি আছে ? আর ইতস্তত বোধ করার কি আছে ? একটু পরে তো ও নিজেই শাড়ি খুলে নিত ।

সব অসস্তি লজ্জা দূরে ঠেলে নিচু হয়ে নতুন বউয়ের শাড়ি তুলে নেয় হাতে ।

_ শাড়ি ঠিক করতে পারবে ?

দুদিকে মাথা নাড়ায় । ঠিক করতে পারবে না ।

আকাশ ভাবে ওর ভাবি কে ডাকবে তার পর আবার ভাবে, ঠিক করার কি দরকার ? একটু পর তো খুলবেই। নিজেই এলোমেলো ভাবে গুছিয়ে বউয়ের দিকে তাকিয়ে বলে ,

_ শাড়ি কোমরে গুজে নাও ।

আকাশের হাত থেকে শাড়ির এলোমেলো কুচি নিজের হাতে তুলে নিয়ে কোমরে গুজে নেয় ।

আকাশ কি দিয়ে কথা শুরু করবে ভেবে পাচ্ছে না ।

এর মধ্যে আবার নীচু হয়ে সালাম করতে যায় নতুন বউ। আকাশ বউয়ের বাহু ধরে আটকে দিয়ে বলে ,

_ সালাম করতে হবে না । বেডে গিয়ে বসো ।

বউ গুটি গুটি পায়ে হেঁটে বেডে গিয়ে বসে ।

আকাশ নিজের মনে খুশি হয়ে আলমারির দিকে এগিয়ে যায় । আলমারি খুলে একটি বক্স বের করে বেডের দিকে এগিয়ে যায় । বউয়ের সামনে এসে বসে বেডে ।

_ তোমার বা হাত টা দেখি ।

হাত বাড়িয়ে দেয় বউ । বক্স খুলে একটি রিং বের করে আঙ্গুলে পরিয়ে দেয় । দেনমোহর আগেই পরিশোধ করে দিয়েছে ।

_ নাম কি তোমার ?

_ জামিলা রাহা ।

বউয়ের ভয়েজ প্রথম শুনে থ হয়ে যায় আকাশ । একদম চিকন রিনরিনে কন্ঠস্বর । যেন একটা বাচ্চা মেয়ে ।

_ আমার নাম জানো ?

_ হ্যাঁ ।

_ কি ?

_ আকাশ আহমেদ ।

আকাশ হাত বাড়িয়ে রাহার ঘোমটা সরিয়ে মুখের দিকে তাকায় । মুখ দেখে তো ঝটকা খায় আকাশ । দেখে মনে হচ্ছে অল্প বয়সের মেয়ে । মেকআপ কম থাকার দরুন বয়স টা খুব ভালো করেই বোঝা যাচ্ছে ।

_ কোন ক্লাসে পড় তুমি ?

_ এবার নাইন শেষ করলাম , টেনে উঠবো ।

বিজ্ঞাপন

রাহার মুখ থেকে এমন কথা শুনে চোখ দুটো রসগোল্লার মত বড় বড় হয়ে যায় ।

_ বয়স কত তোমার ?

_ ষোলো বছর ।

এবার তো আকাশের মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাওয়ার দশা ।

ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল রাহার মুখের দিকে । এই ছোট্ট মেয়ের সাথে ওর মা ওকে বিয়ে করিয়ে দিল ?

এগারো বছরের গ্যাপ দুজনের বয়সের মাঝে ।

মায়ের কথা শুনে মেয়ে না দেখে বিয়ে করার ফল । মা বলেছিল মেয়েটি ওর থেকে বয়সে একটু ছোট । কিন্তু এত ছোট সেটা তো বলেনি ।

মায়ের মুখে মেয়ের কথা বর্ণনা শুনে আর দ্বিমত করেনি আকাশ । মা বলেছিল মেয়ে পড়া শোনা করছে এখনো । বাবা মায়ের দ্বিতীয় সন্তান । বড় ভাই আছে ।

ভাই বিয়ে করেছে ছয় মাস আগে । রাহার ভাইয়ের সাথে আকাশের দেখা হয়েছিল । আকাশের বয়সী রাহার বড় ভাই রিশাদ । সেই অনুযায়ী আকাশ ভেবেছিল রাহার বয়স কম হলেও আনুমানিক ঊনিশ বিশ হবে । রাহার ফোটো ও দেখেছিল সেখানেও রাহাকে দেখতে ঊনিশ বিশ বছর বয়সী মনে হচ্ছিল । কিন্তু এই রাহার বয়স তো মাত্র ষোল আর ওর বয়স সাতাশ বছর ।

বয়সের এতটা গ্যাপ কিভাবে মানিয়ে নেবে একে অপরের সাথে ? মাথায় হাত দিয়ে অন্য দিকে ঘুরে বসে রইলো আকাশ । মাথাটা কেমন ভো ভো করে ঘুরছে ।

কার উপর রাগ করবে বাবা মায়ের উপর , নিজের উপর , নাকি রাহার ফ্যামিলির উপর ?

ওর বাবা মা নাহয় ছেলের জন্য অল্প বয়সী মেয়ে ঠিক করেছে । কিন্তু রাহার বাবা মা ? ওনারা কিভাবে এত বড় একটা ছেলের সাথে নিজেদের মেয়ের বিয়ে দিল ?

একবারও বিবেকে বাঁধলো না ? মেয়ের থেকে ছেলে এগারো বছরের বড় এটা কি ওনারা জানতো না ? নাকি ওর বাবা মা বলেনি ছেলের বয়স কত ?

এই মেয়ের সাথে কিভাবে সংসার করবে ? আঠারো বছর বয়সী হলেও একটা কথা ছিল । ষোলো বছর বয়স । এই বিষয় টা মানতে খুব কষ্ট হচ্ছে আকাশের ।

এখন কি করবে ? যা হবার হয়ে গেছে এখন কিছু বলেও লাভ নেই । এখন কিছু বলতে গেলেও শুধু শুধু অশান্তি সৃষ্টি হবে । চুপ করে বসে রইলো মাথা নিচু করে। রাহা ও চুপ করে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে । আকাশের হঠাৎ কি হলো বুঝতে পারছে না ।

মাথা ব্যাথা করছে ? নাকি অন্য কিছু রাহার ছোট মাথায় কিছুই ধরছে না । রাহা নিজেও ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল আকাশের দিকে ।

অনেক ভাবনা চিন্তার পর বেড থেকে উঠে দাঁড়ায় আকাশ । রাহার দিকে তাকিয়ে বলে ,

_ এই ভারী শাড়ি পরে আর কতক্ষন থাকবে ? উঠে শাড়ি চেঞ্জ করে ফ্রেস হয়ে নাও ।

মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে বেড থেকে নামার জন্য উদ্যত হয় রাহা । তখন কার কথা স্মরণ হতেই রাহাকে সাবধান করে বলে ,

_ দেখে নামো । আবার পড়ে যেও না , ব্যাথা পাবে ।

আস্তে আস্তে নেমে আসে রাহা । লাগেজ খুলে হালকা একটা শাড়ি নিয়ে ওয়াসরুমে প্রবেশ করে । ফ্রেস হয়ে কোনো রকম শাড়ি পেঁচিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে । রাহার শাড়ি পরা দেখে আকাশের গম্ভীর মুখে মৃদু হাসির রেখা দেখা যায় । রাহা শাড়িটা সোফার ওপরে রেখে জুয়েলারি গুলো খুলতে শুরু করে ।

আকাশ তাকায় রাহার মেকআপ বিহীন মুখের দিকে ।

বাচ্চা বাচ্চা মুখের আদল এখনো কাটেনি । শুধু লম্বায় বড় হয়েছে । চেহারা টা মায়ায় ভরা । দেখেই প্রশান্তিতে

ভোরে যায় মন । কিন্তু বউটা এখনো অনেক ছোট ।

_ রাত অনেক হয়েছে তুমি শুয়ে পরো ।

_ আচ্ছা ।

আকাশ টিশার্ট ট্রাউজার নিয়ে নিজেও ওয়াসরুমে প্রবেশ করে । পরনের শেরওয়ানি পায়জামা খুলে টিশার্ট ট্রাউজার পড়ে নেয় । হাত মুখ ধুয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে থাকে। এত দিনের সাজানো স্বপ্ন টা একমুহূর্তেই শেষ । বাসর রাত নিয়ে কত শত স্বপ্ন ছিল । সেই বাসর রাত টাই মাটি হয়ে গেছে ।

ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে । বেডের দিকে তাকায় । রাহা ঘুমিয়ে গেছে । সারাটা দিন অনেক ধকল গেছে ছোট্ট মেয়েটার উপর দিয়ে । সেই দুপুর থেকে ভারী শাড়ি টা পড়ে ছিল । তার পর এত এত নিয়ম কানুন ।সব মিলিয়ে ক্লান্ত থাকায় দ্রুতই ঘুমিয়ে গেছে ।

আকাশ হাত মুখ মুছে নিয়ে লাইট অফ করে ড্রিম লাইট অন করে বেডে গিয়ে শুয়ে পড়ে দুজনের মাঝে দূরত্ব রেখে । চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলেও ঘুম ধরা দেয় না দু চোখে । মস্তিষ্ক এখনো ভো ভো করছে । কেমন যে রাগ হচ্ছে বাড়ির সকলের উপর । কেউ একটা বার বললো না মেয়ের ষোলো বছর বয়স । মাত্র নাইনে পড়ে। বাবা মায়ের পছন্দে বিয়ে করতে চেয়েছে তাই বলে এই পুঁচকে মেয়ের সাথে বিয়ে করিয়ে দেবে ? একটা বার মেয়ে দেখতে যাওয়া উচিত ছিল । সব কিছু বাবা মায়ের উপর ছেড়ে দেওয়া উচিত হয়নি । সব কিছু বাবা মায়ের উপর ছেড়ে দেওয়ার দারুন এখন বাসর ঘরে বিয়ে করা বউয়ের পাশে শুয়ে আছে দুই হাত সমান দূরত্ব বজায় রেখে । তাও এই শীতের সময় । এই দুঃখ কোথায় রাখবে আকাশ ?

আস্তে আস্তে রাত বাড়তে থাকে কিন্তু আকাশের চোখে ঘুম দেখা দেয় না ।

চিৎ হয়ে শুয়ে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে আছে আকাশ।একটু পর অনুভব হয় ওর শরীরের উপর ভারী কিছু উঠে এসেছে । পাশ ফিরে তাকাতেই দেখে রাহা ঘুমের ঘোরে ওকে জড়িয়ে ধরে হাত পা উঠিয়ে দিয়েছে শরীরের উপর ।

চোখ বন্ধ করে জোড়ে শ্বাস টেনে নেয় আকাশ । আস্তে আস্তে কাত হয়ে শুয়ে রাহাকে সরানোর চেষ্টা করে কিন্তু উল্টো রাহা আরো ভালোভাবে জড়িয়ে ধরে আকাশের বুকে নিজেকে গুটিয়ে নেয় আদুরে বিড়াল ছানার মত ।

একমুহুর্তের জন্য হার্টবিট মিস যায় আকাশের । একটু পরেই অস্বাভাবিক গতিতে বিট করতে শুরু করে আকাশের হার্ট । জীবনের প্রথম কোনো নারী ওর এতো কাছে । তাও ওর বুকেই লেপ্টে ঘুমিয়ে আছে । কেমন একটা অপরিচিত ফিলিংস হচ্ছে । এই ফিলিংসের সাথে পূর্বে সাক্ষাৎ করেনি আকাশ । আস্তে আস্তে রাহার শ্বাস ঘনো হয় । ভারী গরম শ্বাস আছড়ে পড়ে আকাশের বুকে । রাহাকে দূরে সরিয়ে দিতে চেয়েও সরাতে পারে না আকাশ । রাহার অধিকার আছে ওর বুকে ঘুমানোর । সেই অধিকার নষ্ট করতে পারে না আকাশ । বির বির করে বলে ,

_ এই রাহা দূরে যাও আমার থেকে । বাসর রাতে বউ যদি এভাবে জড়িয়ে ধরে এত কাছে শুয়ে থাকে তাহলে নিজেকে কিভাবে কন্ট্রোল করবো ? আমাকে পা*গ*ল করতে চাইছো নিজের শরীরের মাতাল করা সুবাস দিয়ে ? আমি কন্ট্রোল লেস হয়ে গেলে সামলাতে পারবে না কিন্তু । তাই আগেই দূরে সরো ।

কিন্তু আকাশের কথা গুলো রাহার কর্ণকুহরে পৌঁছায় না । রাহা তো ঘুমে বিভোর । দিন দুনিয়া সব ভুলে গেছে।

অটোমেটিক আকাশের দুই হাত জড়িয়ে ধরে রাহাকে । বুকের মাঝে আগলে ধরে চোখ বন্ধ করে নেয় ।

বির বির করে অনেক কিছু বলে ।

রাহা ঘুমের ঘোরেই একটু পর পর নড়া চড়া করে ওঠে ।

আকাশ ভালো ভাবে দুজনের উপর ব্ল্যাঙ্কেট দিয়ে ঢেকে নেয় । বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে অন্য দুনিয়ায় হারিয়ে যায় ।

বিজ্ঞাপন
আমার ঝামেলা রানী গল্পটি সানা শেখ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সাংসারিক উপন্যাস