সকলেই এসে দাঁড়ায় আকাশের রুমে । রাহা গালে হাত দিয়ে কাদঁছে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে । রাগে ফোস ফোস করছে আকাশ । হাতে ফাইল টা রয়েছে ।
পুনরায় চিৎ*কার করে বলে ,
_ যাও আমার চোখের সামনে থেকে ।
রাহা আবার কেঁপে ওঠে । ভয়ে আরো জোড়ে কেঁদে দেয় । রাহার কান্না দেখে আকাশের রাগ আরো বেড়ে যায় ।
_ কাঁদবে না একদম । অকাজ আর কাদা ছাড়া আর কিছু পারো তুমি ? পারলে গিয়ে সেটা করো, বিদায় হও আমার চোখের সামনে থেকে ।
অনন্যা শেখ এগিয়ে যেতে যেতে বলেন ,
_ কি হয়েছে আবার এরকম করছিস কেনো ? কি করেছে রাহা ?
_ কি করেনি সেটা জিজ্ঞেস করো ।
_ বলবি তো কি হয়েছে ? না বললে জানবো কিভাবে ?
হাতের ফাইল টা সামনে ধরে বলে ,
_ দেখো কি হয়েছে ?
_ এমন হয়েছে কিভাবে ফাইল টা ?
_ সেটা ওকেই জিজ্ঞেস করো । আমার সব পরিশ্রমে পানি ঢেলে দিয়েছে ।
অনন্যা শেখ রাহার কাছে এগিয়ে যায় । রাহার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে ,
_ কি হয়েছে মা ? ফাইল টা অমন হয়েছে কিভাবে ?
কান্নার ধকলে কিছুই বলতে পারে না রাহা । কাদতে কাদতে নাজেহাল অবস্থা । কথা বলার মত অবস্থায় নেই । পুরো শরীর থরথর করে কাপছে রাহার । অনন্যা শেখ রাহার গাল থেকে হাত সরিয়ে দেখতেই আতকে উঠলেন । তাকায় ছেলের মুখের দিকে , চোয়াল শক্ত করে ওনাদের দুজনের দিকেই তাকিয়ে আছে আকাশ।
_ এভাবে মে*রে*ছিস কেনো মেয়েটাকে ? কি অবস্থা করেছিস মেয়েটার গালের ।
সকলেই এগিয়ে গিয়ে দাড়ায় রাহার সামনে ।
ফর্সা গাল টাতে পাঁচ আঙ্গুলের ছাপ বসে গেছে । লাল হয়ে ফুলে উঠেছে অনেক টা । ব্যথায় টনটন করছে ।
এভাবে কেউ মা*রে ? ছোট থেকে এত বড় হয়েছে আজ অব্দি ফুলের টোকা পড়েনি গায়ে । বাড়ির কেউ কখনো চোখ রাঙ্গিয়ে কথা বলেনি । ননীর পুতুলের মত ত্বকে আঘাত পড়ার সাথে সাথেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সেই আঘাত ।
মিলা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে ,
_ এসব কি আকাশ ? এভাবে মে*রেছিস কেনো ওকে ?
গাল টা কেমন হয়ে গেছে দেখেছিস ?
রাহার এমন গাল দেখেও একটু মায়া হয় না আকাশের। বরং রাগে গজগজ করতে করতে বলে ,
_ এর থেকেও জোড়ে মা*রা উচিত ছিল । কিছু না বলতে বলতে আজ এই অব্দি এসেছে । ওকে পই পই করে বলেছিলাম , ফাইল টা তে যেন হাত না দেয় । কিন্তু ও কি করেছে দেখেছিস ? হাত দিয়ে শুধু ধরেনি পুরো পুরি নষ্ট করে দিয়েছে । আমার গত এক সপ্তাহের পরিশ্রম সব পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছে ।
অনন্যা শেখ কিছুটা রাগ দেখিয়ে বলেন ,
_ একটা ফাইল নষ্ট হয়েছে তো কি হয়েছে ? তাই বলে তুই মেয়েটাকে এভাবে মা*রবি ? ফাইল কি দ্বিতীয় বার তৈরী করা যাবে না ?
_ আজকের দিন পার হলে আগামী কাল আমার প্রেজেন্টেশন । গত এক সপ্তাহ না ঘুমিয়ে রাত জেগে ফাইল টা তৈরি করেছি । একদিনের মধ্যে এই ফাইল কিভাবে রিক্রিয়েট করবো ? তোমাদের কোনো ধারণা আছে এই প্রেজেন্টেশনের জন্য কত পরিশ্রম করতে হয়েছে ? বস কে আমি কি উত্তর দেবো ? সে ভরসা করে আমাকে এই কাজ টা দিয়েছিল । কি বলবো যখন আমি আগামী কাল প্রেজেন্টেশন দিতে পারবো না ? আমাদের বাড়িতে ছোট একটা বাচ্চা আছে সে না বুঝে আমার ফাইল নষ্ট করে ফেলছে এটাই বলবো ?
_ এত রেগে যাচ্ছিস কেনো ?
আকাশ পুনরায় চিৎ*কার করে বলে ?
_ কি করবো আমার মাথা কাজ করছে না । ওকে সরাও আমার চোখের সামনে থেকে । আমি যা যা অপছন্দ করি তোমরা সেই সব গুন ওয়ালা একটা মেয়ের সাথে আমাকে বিয়ে দিয়ে দিলে । তাও আবার আমার থেকে বয়সে এত ছোট । তবুও ওকে আমি মেনে নিয়েছে ভালোবেসেছি । নিজের অপছন্দের জিনিস গুলোও সহ্য করে নিচ্ছি । ওর সাথে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি । তোমাদের কাছে কখনো অভিযোগ করেছি কিছু ? এমন একটা ইমম্যাচিউর মেয়ের সাথে আমাকে কেনো বিয়ে দিলে ? বলেছি কখনও ? মাথায় এত টুকু বুদ্ধি নেই । সব সময় উল্টা পাল্টা কাজ কর্ম করে । এর আগেও দুবার আমার অফিসের পেপার্স নষ্ট করেছে । আমি ভালো ভাবে দুবারই বুঝিয়েছি আমার অফিসের কোনো কিছুতে যেন হাত না দেয় । এবারেও এত বার করে বলেছি তবুও কাজ হলো না । শেষ পর্যন্ত ফাইলটার এই অবস্থা করে ছেড়েছে । ওকে সরাও আমার চোখের সামনে থেকে না হলে কি করবো আমি নিজেও জানি না ।
_ বাবা মাথা ঠান্ডা কর । এত রাগ ভালো না ।
_ সবাই বের হও সাথে এই আপদ টাকে নিয়ে যাও।
অনন্যা শেখ ছেলের এমন রাগ দেখে আর কিছু বলার সাহস করে না । রাহার হাত ধরে রুম থেকে বেরিয়ে আসে । পেছন পেছন বাড়ির সবাই বেরিয়ে যায় ।
আকাশ হাতের নষ্ট ফাইলের দিকে তাকিয়ে থাকে ।
কি করবে কিছুই মাথায় আসছে না । মাথা টা হ্যাং হয়ে গেছে । রাগে দুনিয়া অন্ধকার দেখছে ।
,
অনন্যা শেখ রাহা কে ওনার নিজের রুমে নিয়ে আসে ।
গালে মলম লাগিয়ে দেয় ।
ফর্সা গাল টা কালো হয়ে গেছে র*ক্ত জমাট বেঁধে ।
রাহা হিছকি তুলে কাদঁছে । চোখ মুখ ফুলে গেছে কান্নার কারণে । চোখ নাক মুখ লাল হয়ে গেছে ।
অনন্যা শেখ রাহার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে ,
_ আকাশের ফাইলে পানি ফেলেছো কেনো মা ?
রাহা হিঁচকি তুলতে তুলতে বলে ,
_ আমি ইচ্ছে করে ফেলেনি মা । ভুল করে পরে গেছে ।
_ গালে অনেক ব্যাথা করছে ?
রাহা উপর নীচ মাথা নাড়ায় । অনন্যা শেখ রাহা কে বুকে টেনে নেয় । মায়ের ওম পেতেই রাহা আরো জোড়ে কেঁদে ওঠে । অনন্যা শেখ মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে বলে ,
_ কাঁদে না মা । একটু পর সব ঠিক হয়ে যাবে । আকাশ একটু পরেই এসে তোমাকে আবার আদর করবে ।
_ আমি যাবো না আর ওখানে ।
_ আচ্ছা না গেলে এখন কান্না বন্ধ করো । চোখ মুখ কেমন হয়ে গেছে দেখেছো ?
,
রাহা আকাশের রুমে আর যায়নি । কাদতে কাদতে শাশুরি মায়ের রুমেই ঘুমিয়ে গেছে ।
আকাশ পুনরায় ফাইল তৈরি করছে । একবারের জন্যও বসা থেকে ওঠেনি । রাতের মধ্যে ফাইল কমপ্লিট করতে হবে ।
দুপুর দুইটায় মিলা আকাশের রুমে আসে । কোনো কথা না বলে আকাশের সামনে কফির মগ রেখে আলমারি খুলে রাহার ড্রেস নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায় । আকাশ একবারও মাথা তুলে মিলার দিকে তাকায়নি । শুধু কফির মগের দিকে তাকিয়ে ছিল একবার । এটারই প্রয়োজন ছিল ।
মিলা রাহার ড্রেস নিয়ে অনন্যা শেখের রুমে আসে । রাহা বেডে বসে আছে ।
ড্রেস রাহার হাতে দিয়ে বলে ,
_ যাও ওয়াসরুমে ।
রাহা কোনো কিছু না বলে ওয়াসরুমে প্রবেশ করে । হাঁসি খুশি রাহার মলিন মুখ দেখে মিলার একটুও ভালো লাগছে না । গাল টা এখনো ফুলে আছে । পাঁচ আঙ্গুলের ছাপ এখনো স্পষ্ট । কি জোরেই না মে*রে*ছে শ*য়*তা*ন ছেলেটা । কাদতে কাদতে চোখ মুখ ফুলে গেছে মেয়েটার ।
মিলার ভীষণ খারাপ লাগছে রাহার জন্য । আকাশ কে হাজার টা বকা ঝকা করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে নিজের রুমে যায় । সমুদ্র মাত্রই শাওয়ার নিয়ে ফ্রেস হয়ে এসে বেডে বসেছে । সন্ধ্যা ঘুমিয়ে গেছে ।
_ রাহা এখনো কাদঁছে ?
_ হুম ।
_ আকাশ এমন একটা কাজ করবে ধারণার বাইরে ।
_ রাগ সামলাতে পারেনি । আকাশ তো সহজেই রাগে না বা এমন কিছু করেও না । কিন্তু আজকে হয়তো রাগের মাত্রা অনেক বেশিই হয়ে গিয়েছিল ।
_ হুম । তুমি যাও ফ্রেস হয়ে আসো ।
অনন্যা শেখ রাহার জন্য রুমেই খাবার নিয়ে আসে ।
নিজের হাতে খাইয়ে দেয় । রাহা খেতে খেতে আবারো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে । অনন্যা শেখের ভালো লাগছে না রাহা কে এভাবে দেখতে । মেয়েটা একটু পর পর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাদঁছে ।
আকাশ কে খাওয়ার জন্য ডাকতে আসে অসীম । তাকে এক ধমক দিয়ে নিচে পাঠিয়ে দেয় আকাশ ।
মুখ টা ছোট করে নিচে ফিরে আসে অসীম । আকাশের ধমক নিচ থেকে সবাই শুনেছে । আজকে যে আকাশের মস্তিষ্ক উতপ্ত লাভার মত হয়ে আছে সবাই বুঝতে পারছে । তাই ওকে আর ডিস্টার্ব না করাই উত্তম ।
সারাদিন আর রুম থেকে বের হয় না রাহা ।
সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরে আসে দুই ভাই আমজাদ শেখ আর আজলান শেখ । ড্রইং রুম আজ শান্ত দেখে সোফার দিকে তাকায় দুজনেই । অসীম নেই আজ সোফায় । সমুদ্র সন্ধ্যা কে নিয়ে বসে আছে । রাহা বা আকাশ দুজনের এক জনও নেই । মিলা দুই শাশুরির সাথে রান্না ঘরে ।
দুই ভাই নাতনির সাথে কথা বলে হাতে থাকা চকলেটের প্যাকেট দিয়ে নিজেদের রুমের দিকে আগায় ।
আমজাদ শেখ রুমে প্রবেশ করতেই দেখে রাহা বেডে শুয়ে আছে । রাহা কে নিজের রুমে দেখে ভ্রু কুঁচকে আসে আমজাদ শেখের । রাহা তো এই রুমে আসে না খুব একটা । আসলেও একটু সময় থেকে আবার চলে যায় । কিন্তু আজ একা একা শুয়ে আছে কেনো এখানে ? অসুস্থ নাকি ?
গলা খাঁকারি দেয় আমজাদ শেখ । শ্বশুরের গলার স্বর শুনতে পেয়ে নড়ে চড়ে ওঠে রাহা ।
আমজাদ শেখ পাঞ্জাবির পকেট থেকে ফোন মানিব্যাগ বের করে রাখে । তার পর রাহার দিকে এগিয়ে যায় ।
_ কি হয়েছে মা শরীর খারাপ লাগছে ?
রাহা না তাকিয়েই " না " বলে ।
গলার স্বর শুনে স্বাভাবিক লাগে না । আরেকটু কাছে এগিয়ে যায় ।
_ কি হয়েছে তোমার ?
রাহা দুদিকে মাথা নাড়ায় ।
_ আমার দিকে তাকাও ।
রাহা কিছু বলে না ।
আমজাদ শেখের কুচকে যাওয়া কপাল ভ্রু আরো কুচকে যায় ।
_ কেউ কিছু বলেছে ? আকাশ বকেছে ?
এতক্ষণ ধরে রাখা কান্না আবার বেরিয়ে আসে । ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে আবার ।
আমজাদ শেখ হকচকিয়ে যায় । কি হলো কাদঁছে কেনো ? তড়িঘড়ি করে বলে ,
_ কি হয়েছে তোমার ? আমার দিকে ঘোরো ।
রাহা উঠে শ্বশুরের দিকে মুখ করে মাথা নিচু করে বসে।
আমজাদ শেখ রাহার থুতনি ধরে মুখটা উচু করে ধরে ।
রাহার মুখ দেখতেই চমকে ওঠেন তিনি ।
চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে আছে । বাম গালে পাঁচ আঙ্গুলের ছাপ স্পষ্ট । চোখ মুখ ফুলে গেছে । দুই চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে শ্রাবণ ধারা ।
হুরহুর করে রাগ উঠে যায় । মেয়েটা কে কে এভাবে মা*র*লো ? আর একা একা কান্না করছে কেউ নেই ওর কাছে ?
_ কে মে*রে*ছে মা তোমাকে ?
শ্বশুরের আদর মাখা স্বর শুনে রাহার কান্না আরো বেড়ে যায় । রাহার মুখ টা দেখে ভীষণ মায়া হয় আমজাদ শেখের । রাহা কে আদর করে কান্না বন্ধ করতে বলে । তার পর রুম থেকে বেরিয়ে আসে । ড্রইং রুমে দাঁড়িয়ে হুংকার ছেড়ে বলে ,
_ রাহা কে কে মে*রে*ছে ?
ওনার হুংকার শুনে রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে আসে তিন জন । দাদার হুংকার শুনে ছোট সন্ধ্যা ভয় পেয়ে যায় ।
আজলান শেখ নিজের রুম থেকে বেরিয়ে আসে ছোট ভাইয়ের হুংকার শুনে । অসীম নিজেও নিজের রুম থেকে বেরিয়ে আসে ।
আকাশ আর রাহা বাদে সবাই ড্রইং রুমে উপস্থিত হয় ।
আমজাদ শেখ অনন্যা শেখের দিকে তাকিয়ে আগের মতোই গর্জন করে বলে ,
_ রাহা কে কে মে*রে*ছে ?
অনন্যা শেখ মিনমিন করে বলে ,
_ আকাশ ।
_ আকাশ ? আকাশ কেনো মে*রে*ছে ওকে ?
কোথায় ও ?
_ নিজের রুমে কাজ করছে ।
_ কেনো মে*রে*ছে ?
সব কিছু খুলে বলে অনন্যা শেখ । সব কিছু শোনার পর কিছুটা শান্ত হয় আমজাদ শেখ । তার পরেও রাগী স্বরে বলে ,
_ তাই বলে মেয়েটাকে ওভাবে চর দেবে ? এখনো গাল টা লাল হয়ে ফুলে আছে । কেঁদে কেঁদে চোখ মুখের কি হাল করেছে । তিন জন ওকে ছেড়ে রান্না ঘরে কি করছো ? এক জন ওর কাছে থাকতে পারলে না ?
অনন্যা শেখ আগের মতোই মিনমিন করে বলে ,
_ ওর কাছেই ছিলাম আমি । ঘুমিয়ে পড়েছিল তাই রান্না ঘরে এসেছি ।
আমজাদ শেখ আকাশ আর বাড়ির সবাই কে বকতে বকতে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যায় । ওনার পেছন পেছন আজলান শেখও যায় রাহা কে দেখার জন্য ।
দুই জা রান্না ঘরে চলে যায় । মিলা ড্রইং রুমেই দাঁড়িয়ে রইলো ।
অসীম সোফায় বসে । সাথে সাথেই সন্ধ্যা বাবার কোল থেকে অসীমের কোলে চলে যায় ।
অসীমের মুখ আজ মলিন থমথমে । একে তো রাহা কে মে*রে*ছে । রাহার মন খারাপ, কান্না করছে । তার উপর নিজেও ভাইয়ের কাছে রাম ধমক খেয়েছে । সব সময় হাঁসি ঠাট্টা করা অন্য কে হাসানো অসীমের মুখেও আজ হাঁসি নেই । পুরো বাড়ি আজ থমথমে ।
,
আমজাদ শেখ রাহা কে নিজের সাথে করে ড্রইং রুমে নিয়ে আসে । নিজের পাশে বসিয়ে চকলেট খেতে দেয় ।
রাহার কান্না বন্ধ হলেও মুখে আষাঢ়ের ঘনো কালো মেঘ ছেয়ে আছে এখনো ।
আকাশ এক বারের জন্যও নিজের রুম থেকে বের হয়নি । মিলা চার বার চার মগ কফি দিয়ে এসেছে । দুপুরে খায়োনি ।
রাত নয়টা বেজে যায় । খাবার খাওয়ার জন্য সবাই ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসে । কিন্তু রাহা সোফা থেকে ওঠে না । এখন খাবে না সে । খিদে নেই পেটে ।
আমজাদ শেখ খাওয়ার জন্য জোর করলে অনন্যা শেখ বলে সে খাইয়ে দেবে ।
সবাই খাওয়া শুরু করে । অনন্যা শেখ প্লেটে খাবার বেড়ে রাহার কাছে এসে বসে । ভাত মাখিয়ে রাহার মুখের সামনে ধরে ।
_ হা করো খেয়ে নাও ।
_ খাবো না মা খিদে নেই ।
_ এমন বলে না মা , সেই দুপুরে খেয়েছো এখন অল্প খাও ।
রাহা খাবে না সেটাই বলতে থাকে বার বার ।
তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে আকাশ । ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে সোফার দিকে তাকায় । আকাশের রাগী চোখ মুখ দেখেই হা করে রাহা। আকাশ সোজা গিয়ে চেয়ার টেনে বসে ।
নিজেই খাবার বেড়ে নেয় । ওর রাগী থমথমে গম্ভীর মুখ দেখে কেউ কিছু বলে না । অসীম তো মনের ভুলেও দ্বিতীয় বার ভাইয়ের মুখের দিকে তাকায় না ।
রাহা অল্প খেয়ে আর খায় না । ভূ*তে*র ভয় টয় সব ভুলে একা একাই শশুর শাশুরির রুমে চলে যায় ।
আকাশ নিজের খাওয়া শেষ করে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে ,
_ এক ফ্লাক্স গরম পানি কফি চিনি চামচ আর কফির মগ আমার রুমে দিয়ে আসবে ।
বলেই চলে যায় ।
আমজাদ শেখ ছেলের যাওয়ার পথে তাকিয়ে বলেন,
_ সাহেবের অর্ডার কি ? যেন কোনো দেশের প্রাইম মিনিস্টার বা প্রেসিডেন্ট ।
অনন্যা শেখ বলেন ,
_ ছেলেটা এমনিই রেগে আছে তার উপর তোমার এসব বলতে হবে ?
_ রেগে আছে তো আমার কি ? আমার বাচ্চা মেয়েটাকে মে*রে গাল ফুলিয়ে দিয়েছে বদ ছেলে একটা । ওর কাছে আর মেয়েই দেবো না ।
_ আহ আমজাদ চুপ করে খাও তো । খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে ।
_ চুপ কেনো করবো ভাবী ? আমার মেয়ে টাকে মে*রে গালটার কি অবস্থা করেছে বজ্জাত ছেলেটা । একটা দুটো জোড়ে চর টা মে*রে*ছে নাকি ? সেই সকালে মে*রে*ছে এখন অব্দি দাগ রয়ে গেছে । ওর নামে তো বউ নির্যাতনের কেস দেওয়া উচিত ।
সায়মা শেখ আবার বলেন ,
_ পুলিশ সবার আগে তাহলে তোমাকেই ধরবে আমজাদ । তুমিই তোমার সাতাশ বছরের ছেলের সাথে ষোলো বছরের মেয়ের বিয়ে দিয়েছো । দোষ টা তো প্রথমে তোমার নিজেরই ।
আমজাদ শেখ খেতে খেতে বলেন ,
_ সব সময় সত্যি কথা বলতে নেই ভাবী । মাঝে মাঝে মুখ টা বন্ধ রাখতে হয় ।
আমজাদ শেখের কথা শুনে মুচকি হাসে সবাই ।
খাওয়া দাওয়া শেষে যে যার রুমে চলে যায় ।
রুমে এসে দেখে রাহা বেডে পা তুলে বসে আছে । শশুর শাশুড়ি কে দেখেও নড়া চড়া করে না । রাত দশটা বেজে গেছে । ঘুমোতে হবে এখন ।
অনন্যা শেখ রাহার কাছে গিয়ে বলে ,
_ আর কতক্ষন বসে থাকবে ? রাত তো অনেক হলো গিয়ে ঘুমিয়ে পরো ।
_ আমি ওই রুমে যাবো না মা ।
_ কেনো কি হয়েছে ?
_ আমার ভয় করছে ।
_ তাহলে চলো আমি তোমাকে রুমে দিয়ে আসছি ।
_ না না আমি যাবো না ওই রুমে । উনি আবার মা*র*বে আমাকে । আমাকে ওনার চোখের সামনে যেতে নিষেধ করেছে ।
_ আর মা*র*বে না শুধু শুধু ভয় পাচ্ছো । তখন তো রাগের কারণে চোখের সামনে থেকে যেতে বলেছিল ।
_ না মা*র*বে আমি জানি । আমি যাবো না ওই রুমে ।
_ তোমাকে মা*রা তো দূরে থাক ধমক দিলেও আকাশ কে বাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবো ।
_ না না আমি তাও যাবো না ।
_ দেখো মা ঝগড়া হলেই স্বামী স্ত্রীর আলাদা থাকতে নেই । আলাদা থাকলে সম্পর্কের মধ্যে শ*য়*তা*ন প্রবেশ করে । আজকে তোমার ভয় করছে কালকেও ভয় করবে পরশু দিন হয়তো ভয় টা একটু কমবে বা আগের মতোই ভয় করবে । তাই বলে কি ভয় না কমা অব্দি তুমি ওই রুমে যাবে না ? স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে মধ্যে ঝগড়া মা*রা*মা*রি মান অভিমান হয়েই থাকে । তাই বলে আলাদা থাকা যাবে না । তুমি চলো আমার সাথে দেখবে আকাশ কিছুই বলবে না তোমাকে । ভয় পাওয়ার কিছু নেই মা ।
_ সত্যি মা*র*বে না তো ?
_ নাহ্ কিছুই করবে না । আকাশ তোমাকে অনেক ভালোবাসে । তখন তো রাগের মাথায় অমন করে ফেলেছে ।
_ এখনো রাগ করে আছে ।
_ এখন রাগ কমে গেছে ।
_ যদি তাও মা*রে ?
_ ওকে ঘাড় ধরে বাড়ি থেকে বের করে দেবো ।
রাহা বেড থেকে নেমে দাড়ায় ।
অনন্যা শেখ ডোরের দিকে এগিয়ে যায় । রাহা শাশুরি মায়ের আঁচল ধরে পেছন পেছন হাটে ।
ভয়ে ভয়ে রুমের ভেতর প্রবেশ করে রাহা । সোফায় বসে থাকা আকাশ মুখ তুলে একবার তাকায় । তার পর আবার নিজের কাজে ব্যাস্ত হয়ে যায় ।
রাহা দ্রুত বেডে উঠে শুয়ে পড়ে গায়ে চাদর দিয়ে ।
অনন্যা শেখ ডোর ভিড়িয়ে দিয়ে চলে যায় ।
তিনি জানেন রাহা আকাশ কে ছাড়া ঘুমায় না । এখন ভয়ে আকাশের কাছে যেতে না চাইলেও আকাশের থেকে দূরে সরেও সারারাত আর ঘুমাবে না । তার মধ্যে আজকে দুপুরে কাদতে কাদতে দুবার ঘুমিয়ে গিয়েছিল।
দুপুরে আর বিকেলে ঘুমোনোর কারণে এখন আর ঘুম আসছে না রাহার । তবে ভয়ের কারণে নড়া চড়াও করছে না । ভুলেও আকাশের দিকে মুখ করে শোয়নি ।
শুয়ে থাকতে থাকতে আবার কান্না চলে আসে ।
এত গুলো দিনেও আকাশ রাহা কে ধমক দিয়ে কথা বলেনি । মাঝে মধ্যে না পেরে একটু রাগ দেখিয়ে কথা বলেছে তবে ধমক দেয়নি কখনও ।
আজ আকাশের রাগ ধমক আর চর খেয়ে আকাশ কে অনেক বেশীই ভয় পাচ্ছে রাহা । আর আকাশের সেই চরের কথা স্মরণ হতেই আবার ঠেলে কান্না আসছে ।
হা করে জোড়ে জোড়ে শ্বাস নেয় । চোখ বন্ধ করে চাদর দিয়ে অপদমস্তক ঢেকে নেয় ।
,
আকাশের কাজ শেষ হতে হতে শেষ রাত হয়ে যায় ।
এখন রাত চারটা বাজে । ফাইল টা বন্ধ করে সোজা হয়ে সোফায় গা এলিয়ে দেয় । বেলা বারোটায় বসেছিল। এক ভাবে বসে থাকতে থাকতে পিঠ মাজা শেষ । এক বার খাওয়ার জন্য উঠেছিল । তিন বার মুখ ধুয়ে এসেছে । দুবার ফ্রেস হয়ে এসেছে ।
এখন পুরো মাথা হ্যাং হয়ে গেছে । ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।
ফাইলের কয়েক টা পেজ ঠিক ছিল তাই আরো দ্রুত কাজ শেষ হয়েছে ।
ফাইল আলমারিতে তুলে রেখে দেয় । ল্যাপটপ চার্জে লাগিয়ে টাওয়াল ট্রাউজার নিয়ে ওয়াসরুমে প্রবেশ করে । শাওয়ার নিয়ে এসে ডোর লক করে লাইট অফ করে বেডে গিয়ে শুয়ে পড়ে । রাহা বেডের কিনার ঘেঁষে শুয়ে আছে । আকাশ দুজনের মাঝে দূরত্ব রেখে শুয়েছে। তিন ঘণ্টা ঘুমোতে পারলেও ভালো লাগবে একটু ।
,
সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর রাহা দেখে ঘুমের ঘোরেই আকাশের গা ঘেঁষে শুয়ে ছিল । দ্রুত দূরে সরে আসে ।
বেড থেকে নেমে ওয়াসরুমে প্রবেশ করে ।
ওয়াসরুমে এসে ফোস করে শ্বাস ছারে । আকাশের যে আগে ঘুম ভাঙ্গেনি এটাই অনেক । ঘুম থেকে উঠে যদি রাহা কে এত কাছে দেখতো তাহলে হয়তো মাথায় তুলে বেড থেকে নিচে ফেলে দিত । সেই দৃশ্য কল্পনা করতেই শরীর ঝাকিয়ে ওঠে রাহার ।
ফ্রেস হয়ে এসে নিজের ফোন টা নিয়ে রুম থেকে দ্রুত বেরিয়ে যায় ।
এলার্ম এর শব্দে ঘুম ভাঙ্গে আকাশের । স্বভাব মতোই হাত ছড়িয়ে রাহা কে খোঁজে । হাতের নাগালে রাহা কে না পেয়ে চোখ খুলে তাকায় । সাথে সাথেই স্মরণ হয় গত কালের কথা । শোয়া থেকে উঠে বসে । ঘুম না হওয়ার দরুন মাথা ভার ভার হয়ে আছে । ঘুমে দুই চোখ আপনা আপনি বন্ধ হয়ে আসছে ।
বেড থেকে নেমে ওয়াসরুমে প্রবেশ করে ।
ফ্রেস হয়ে এসে অফিসের জন্য তৈরি হয়ে নেয় একেবারে । তার পর সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে রুম থেকে বের হয় ।
নিচে এসে সবাই কে দেখলেও রাহা কে দেখে না । সোফায় বসে গলা ছেড়ে কফি চায় ।
মাথা পাতলা করার জন্য কফিই একমাত্র ভরসা ।
অনন্যা শেখ কফি নিয়ে আসে । কোনো কথা না বলে আবার নিজের কাজে চলে যায় ।
খাবার টেবিলে সবাই উপস্থিত থাকলেও রাহা নেই ।
আমজাদ শেখ বলেন ,
_ সবাই এখানে রাহা কই ?
সবাই খেয়াল করে রাহা নেই । অনন্যা শেখ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে ,
_ রাহা কোথায় আকাশ ?
আকাশ নিজের প্লেটে খাবার নিতে নিতে বলে ,
_ আমি কিভাবে বলবো রাহা কোথায় ? আমি তো আর রাহা কে নিজের পকেটে নিয়ে ঘুরি না যে সব সময় আমি জানবো কোথায় সে ।
_ তুই জানবি না এটা কেমন কথা ?
_ আমি ঘুম থেকে উঠে ওকে দেখিনি । এখন কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর না করে কটা খেতে দাও শান্তিতে ।
ছেলের কাঠ কাঠ কন্ঠস্বর শুনে আর কোনো প্রশ্ন করেন না অনন্যা শেখ । অসীম কে পাঠায় রাহা কে খুঁজে আনার জন্য ।
অসীম ভাইয়ের রুম বড় ভাইয়ের রুম বাবা মায়ের রুম খুঁজেও রাহা কে পায় না । তার পর ছাদে উঠে আসে । এদিক ওদিক তাকাতেই দেখে রাহা দাঁড়িয়ে আছে চুপ চাপ একা একা ।
অসীম দূর থেকেই ডেকে ওঠে ,
_ ওখানে একা একা দাঁড়িয়ে আছো কেনো ? নিচে চলো খেতে ডাকছে ।
রাহা পেছন ফিরে তাকায় । অসীম কে দেখে আবার সামনের দিকে তাকায় ।
_ আমি পড়ে খাবো তোমরা খেয়ে নাও ।
অসীম এগিয়ে যায় রাহার কাছে ।
_ ভাইয়া আরো বকেছে ?
রাহা দুদিকে মাথা নাড়ায় ।
_ সবাই ডাকছে চলো ।
_ পড়ে খাবো ।
_ এখন খেলে কি সমস্যা ?
_ কিছু না এমনি খেতে ইচ্ছে করছে না এখন ।
_ ভাইয়া আছে দেখে যাবে না তাইতো ?
রাহা বলে না কিছু । সত্যি বলতে আকাশের ভয়েই নিচে যাবে না এখন । সকালে রুম থেকে বেরিয়েই ছাদে চলে এসেছে যেন আকাশের সামনে না পড়ে ।
_ এখনো ভাইয়া কে ভয় পাচ্ছো ? ভাইয়া কিছু বলবে না চলো এখন ।
_ না না এখন যাবো না আমি ।
অসীম কিছু না বলে দাঁড়িয়ে রইলো রাহার সাথে । অসীম জানতো রাহা ভূ*তে ভয় পায় ভীষণ । কিন্তু আজ জানতে পারলো আকাশ কেও যমের মত ভয় পায় । যার ভয়ে খেতে পর্যন্ত যাচ্ছে না ।
আকাশ খাওয়া শেষ করে দ্রুত বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। গ্যারেজ থেকে নিজের বাইক বের করে স্টার্ট করে। গেটের কাছাকাছি যেতেই বাইকের আয়নায় দেখে ছাদের উপর থেকে রাহা ওর দিকে তাকিয়ে আছে। দ্রুত গতিতে বাড়ির সীমানা ছাড়িয়ে চলে যায় আকাশের বাইক ।
বিষন্ন রাহা খাওয়ার জন্য নিচের দিকে এগিয়ে যায় ।
রাহার পেছন পেছন যায় অসীম ।