আমার ঝামেলা রানী

পর্ব - ১৬

🟢

আকাশ এগিয়ে যায় রাহার কাছে । রাহা দেখেও না দেখার ভান করে থাকে ।

ব্যস্ত সে জামা কাপড় ভাঁজ করতে ।

আকাশ গিয়ে হাটু গেড়ে বসে রাহার পাশে । রাহার হাত থেকে কাপড় নিয়ে রেখে দেয় । রাহা আবার হাতে নেয়।

_ তোমার কি হয়েছে রাহা ?

_ কি হবে ?

জামা ভাঁজ করতে করতে ।

_ কাল রাত থেকে কেমন অদ্ভুত আচরণ করছো । কথা বলছো না হাসছো না । মন খারাপ ?

_ নাহ্ ।

_ বাবার বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে ?

_ নাহ্ ।

_ তাহলে কি হয়েছে ?

_ কিছু হয়নি ।

আকাশের একটুও ভালো লাগে না রাহার এমন শান্ত স্বরে বলা কথা । যেই রাহা সব সময় কথা বলার জন্য ছটফট করে । একটা কথার বিপরীতে দশ টা কথা বলে সেই রাহাই মেপে মেপে কথা বলছে ।

আকাশের মনটা কেমন দিশেহারা হয়ে ওঠে ।

রাহার হাত থেকে জামা কাপড় কেড়ে নিয়ে দূরে সরিয়ে রাখে । রাহা কে টেনে নিজের দিকে ফেরায় । দুই হাতে আগলে ধরে রাহার মুখ । রাহার চোখ মুখে কেমন বেদনার ছাপ ফুটে উঠেছে । অভিমানেরা ভিড় জমিয়েছে দুই চোখে । আকাশ ব্যাকুল কন্ঠে বলে ,

_ তোমার কি হয়েছে ঝামেলা রানী ? আমি কোনো ভুল করেছি ? কেউ কিছু বলেছে ? রাগ করেছো ? বলো না কি হয়েছে তোমার ?

রাহা আকাশের হাত সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে বলে ,

_ কি হবে ? কিছুই হয়নি, ছাড়ো এগুলো আগে ভাঁজ করে নেই ।

আকাশ ছারে না রাহা কে । আরেকটু শক্ত করে ধরে ।

_ রাগ করেছো আমার সাথে তাইনা ? গত কয়েক দিন ধরে তোমাকে ঠিক মত আদর করিনি বলে অভিমান হয়েছে না ? সরি ঝামেলা রানী এমন ভুল আর জীবনেও হবে না । দুনিয়ার সব কিছু বাদ সবার আগে আমার ঝামেলা রানী ।

_ ছাড়ো ।

আকাশ রাহা কে টেনে নিজের বাহু বন্ধনে আবদ্ধ করে নেয় । রাহার মাথায় চুমু খেয়ে বলে ,

_ অফিসের এতো কাজের চাপ, বাড়তি এক প্যারা সব মিলিয়ে ফ্রাস্ট্রেশনে ভুগছিলাম । সব কিছু কেমন অসহ্য লাগতো । কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করতো না । তাই আমি তোমাকে দূরে দূরে রেখেছি যেন নিজের অজান্তে তোমাকে কষ্ট না দেই । আমি চাইনি তুমি আবার আমার রোষানলের শিকার হও । তাইতো তোমার থেকে একটু দুরত্ব বজায় রেখেছিলাম । শুধু তোমার থেকে না বাড়ির সকলের থেকেই রেখেছিলাম ।

তুমি দেখেছো তো তাইনা ?

_ আমি রাগ করিনি । ছাড়ো এখন ।

_ তুমি রাগ না করলেও অভিমান করেছো । সরি বলছি তো আর জীবনেও তোমার কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখবো না । আমি বুঝতে পারছি আমি ভুল করেছি চরম ভুল করেছি আমি । আমার একদম উচিত হয়নি আমার ঝামেলা রানী কে দূরে রাখা । এবারের মত মাফ করে দাও আর জীবনেও এমন কিছু করবো না ।

তোমার এমন মুখ দেখে আমার ভালো লাগছে না ঝামেলা রানী ।

রাহার কান্না চলে আসে । আকাশের বুকে শরীরের ভর ছেড়ে দেয় । আকাশ শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ।

আকাশ রাহার মাথায় আবার চুমু খায় । সরি বলে বার বার ।

তখনই আকাশের ফোন বেজে ওঠে কর্কশ শব্দে ।

রাহা কে এক হাতে বুকের সাথে চেপে ধরে রেখে অন্য হাত দিয়ে প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করে ।

মুখের সামনে ফোন ধরতেই অপরিচিত একটা নাম্বার স্ক্রিনে ভেসে ওঠে । আকাশের চোয়াল শক্ত হয় ।

রাগে ফর্সা মুখটা লাল বর্ণ ধারণ করে ।

কল রিসিভ করে কানে ধরে কোনো কিছু বলে না ।

অপর পাশ থেকে মেয়েলি কন্ঠস্বর ভেসে আসে ।

_ হ্যালো আকাশ ?

আকাশ দাঁতে দাঁত চেপে বলে ,

_ এক কথা কত বার বললে আপনি বুঝতে পারবেন মিস নোভা ? আপনাকে নিষেধ করেছি না আমাকে বার বার কল করে বিরক্ত করবেন না । তার পরেও কেনো বার বার কল করে বিরক্ত করেন ? সোজা বাংলা কথা আপনি বুঝতে পারেন না নাকি ?

_ তুমি কেনো আমাকে বুঝতে চাইছো না আকাশ ? আমি তোমাকে ভালোবাসি আকাশ অনেক বেশি ভালোবাসি । তুমি কেনো আমাকে বোঝার চেষ্টা করো না ?

_ মুখ সামলে কথা বলুন মিস নোভা ।

_ এত দিন ধরে নিজেকে সামলেই রেখেছি আকাশ ।

প্লিজ একসেপ্ট মি ।

আকাশ আগের মতই রেগে বলে ,

_ আপনাকে আগেই বলেছি আমি বিবাহিত । বার বার কল করে উত্যক্ত করবেন না আমাকে ।

_ তুমি মিথ্যে বলছো ? আমি জানি তুমি ম্যারিড না ।

আকাশ রাগে ফেটে পড়ে দুই চোখ বন্ধ করে নেয় ।

বিজ্ঞাপন

আকাশ কে এত রেগে যেতে দেখে রাহা আকাশের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে ,

_ কে কল করেছে ?

আকাশ ফোন স্পিকারে দেয় ।

তার পর বলে ,

_ একটা তার ছেড়া , মাথা খারাপ , পা*গল , অ*ভদ্র , অ*সভ্য , নি*র্ল*জ্জ , বেহায়া , বেশ*রম , ছ্যাচড়া মহিলা। যে কিনা বার বার কল করে একজন ছেলেকে উত্যক্ত করে । দশটার ও বেশি নাম্বার ব্লক করেছি তার পরেও অন্য নাম্বার দিয়ে কল করে । পুরো সিম কোম্পানি বোধহয় বাড়িতে তুলে নিয়ে গেছে অ*সভ্য মহিলা একটা ।

আকাশের মুখ থেকে এমন কথা শুনে ফোনের ওপর পাশে থাকা নোভা চুপ হয়ে যায় । আকাশ ওর সর্ম্পকে এভাবে বলছে ? একটু সময় চুপ থাকলেও আবার বলে ,

_ আমি জানি আকাশ তুমি এসব মন থেকে বলছো না ।

খেঁকিয়ে ওঠে আকাশ ।

_ মন থেকেই বলছি আমি ।

_ প্লীজ আকাশ এমন বলো না ।

_ আর একবারও কল করবেন না আমার নাম্বারে ।

_ গত কাল রাতে কল রিসিভ করে কথা বললে না কেনো ? আর সারাদিন একটা বার কল রিসিভ করলে না উল্টো ব্লক করে দিলে । আর এখন রিসিভ করে এভাবে কথা বলছো ? তোমার সাথে কথা বলার জন্য যে আমার হৃদয় ব্যাকুল হয়ে উঠেছে আকাশ ।

_ গত কাল রাতে আমি কখন আপনার কল রিসিভ করলাম ?

_ কেনো মনে নেই তোমার ? রিসিভ করে তো কথা বললে না । আমি একাই কত কথা বললাম তুমি উত্তর ও দিলে না । তুমি আমার সাথে এমন করছো কেনো আকাশ ? আমি সত্যিই তোমাকে ভালোবাসি ।

_ রাখ তোর ভালোবাসা । কয়টার সময় কল করেছিলি সেটা বল ।

_ নয়টার পর ।

আকাশ রাহার মুখের দিকে তাকায় । বুঝতে বাকি নেই রাহা রাত থেকে এমন অদ্ভুত আচরণ কেনো করছে ।

পানির মত সব পরিষ্কার হয়ে যায় আকাশের সামনে ।

রাহা কে আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরে বুকের মাঝে ।

তার পর রাগে ক্ষোভে ফুঁসে উঠে বলে,

_ ইউ ব্লাডি বীচ তোকে সামনে পেলে এখনই খু*ন করতাম আমি । তুই কি কি বলেছিস আমার বউ কে ? কাল রাত থেকে আমার সাথে কথা বলছে না । তোকে সামনে পেলে এখনই জীবন্ত পুতে দিতাম । তোর জন্য আমার বউটা কষ্ট পাচ্ছে কাল রাত থেকে একা একা ।

_ তুমি নাটক করছো আমার সাথে আমি জানি ।

_ শ*য়*তা*ন মহিলা তোর মনে হচ্ছে আমি এখনো নাটক করছি তোর সাথে ? জোকের মত লেগেছিস পেছন ছাড়ছিস না । জীবন টা তেজপাতা বানিয়ে দিয়েছিস কয়েক দিনেই । তোর মত নি*র্লজ্জ ছ্যাচড়া মহিলা আমি দুনিয়ায় আর দুটো দেখিনি । তোর মাথায় মস্তিষ্ক বলতে আদো কি কিছু আছে ? নাকি পুরোটাই গোবরে ঠাসা ? মাথায় ঘিলু বলতে কিছুই নেই তাইনা ? থাকলে তো আর এমন করে একটা ছেলের পেছনে লাগতি না । কতটা বেহায়া নির্লজ্জ ছ্যাচড়া হলে একটা মেয়ে একটা ছেলের পেছনে এমন আদা জল খেয়ে লাগতে পারে ? তোকে না দেখলে বুঝতেই পারতাম না ।তোকে সামনে পেলে এখনই শুলে চরাতাম ।

_ তুমি যা ইচ্ছা বলো আমি তোমার কোনো কথাই বিশ্বাস করি না । তুমি মন থেকে বলো না এই কথা গুলো আমি জানি ।

_ তোর নামে কাল সকালেই আমি মামলা করবো । আমার বউ কে কষ্ট দেওয়ার জন্য তোর নামে কেইস করবো । একটা ছেলে কে বার বার কল করে হ্যারেজ করিস । তোর সব অপরাধ মিলিয়ে কম পক্ষে দশ বছরের জেল হবে ।

_ এমন করছো কেনো আকাশ ?

_ তোর সাথে আমার কোন জন্মের শ*ত্রুতা ? কোন জন্মে আমি তোর পাকা ধানে মই দিয়েছিলাম ? যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য আমার পেছনে আঠার মতো লেগেছিস ।

_ আমি তোমাকে ভালোবাসি আকাশ ।

_ এখনো ভালোবাসি ভালোবাসি করছিস ? আমার দের বছরের অফিস জীবনে ফুলস্টপ পর্যন্ত ভুল হয়নি আর সেদিন তোর জন্য আমার পুরো পেপার্স ভুল হয়েছে ।

বসের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে । তোকে তো আমি কিছুতেই ছাড়বো না । তোর জন্য শুধু মাত্র তোর জন্য আমার আর আমার বউয়ের মাঝে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল । শুধু বউয়ের সাথে না বাড়ির সকলের সাথে । তোকে তো আমি সত্যি সত্যিই পুলিশে দেবো । অফিসে বাড়িতে তোর জন্য কোথাও শান্তি পাই না আমি । তোর নামে তো সত্যি সত্যিই কেইস করবো আমি ।

রাহা বুঝতে পারে না কিছু । দুজনের কথা শোনে আর ফ্যাল ফ্যাল করে আকাশের রাগে লাল হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে ।

_ আকাশ আ

আকাশ থামিয়ে দেয় নোভা কে ।

_ আর একবার আমার ফোনে কল করলে ফোনের ভেতর ঢুকে তোকে মা*রবো আমি ।

ফোন লাইন বিচ্ছিন্ন করে নাম্বার টা ব্লক করে দেয় ।

অনেক বকাবকি করে নোভা কে । এই মেয়ের মত মেয়ে দ্বিতীয় টা দেখেনি আল্লাহর দুনিয়ায় ।

ইচ্ছে করছে ফোনের ভেতর ঢুকে ওটাকে পানিতে চুবাতে । কাঁচা চিবিয়ে খেতে । জীবন্ত পুঁতে দিতে ।

একটা মেয়ে কতটা নির্লজ্জ ছ্যাচড়া হলে এমন করে জানা নেই আকাশের ।

ফোন টা ছুঁড়ে দেয় বেডের উপর । দুই হাতে আগলে ধরে রাহার মুখ ।

_ ওই শ*য়*তা*ন ফালতু মহিলা কাল রাতে কল করে কি কি বলেছে তোমাকে ?

রাহা বলতে পারে না কিছু ফ্যাচ ফ্যাচ করে কেঁদে দেয় ।

আকাশ জড়িয়ে ধরে মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে বলে ,

_ কাদঁছো কেনো ? কি হয়েছে ?

বিজ্ঞাপন
আমার ঝামেলা রানী গল্পটি সানা শেখ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সাংসারিক উপন্যাস