অফিস থেকে ফিরে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করতেই বাবা বাবা বলে ডাকতে ডাকতে দৌড়ে এগিয়ে যায় আকাশ রাহার ছেলে ধ্রুব । আকাশ নিচু হয়ে ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে গালে চুমু খায় । ধ্রুব বাবার গলা জড়িয়ে ধরে একনাগাড়ে ডাকতে থাকে বাবা বাবা বলে ।
_ হ্যাঁ বাবা বলো ।
_ এসেছো ।
_ হুম এসেছি ।
ধ্রুব বাবার মুখের দিক থেকে চোখ সরিয়ে বাবার কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে ।
আকাশ ছেলের মাথায় চুমু খেয়ে ভেতরের দিকে আগায় । ধ্রুব কে সোফায় বসায় সন্ধ্যার পাশে । তার পর দুজনের হাতে দুটো চকলেট দেয় । সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রান্না ঘরের দিকে উঁকি দেয় ।
তারপর নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যায় ।
একটু পরেই লেবুর ঠান্ডা শরবত নিয়ে রুমে আসে রাহা।
শরবত নিয়ে দাঁড়ায় আকাশের সামনে । আকাশ এক হাতে শরবত নিয়ে অন্য হাতে রাহা কে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয় । শরবত রাহা কে দু ঢোঁক খাইয়ে তার পর নিজে খায় ।
খালি গ্লাস টেবিলের উপর রেখে দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে । রোজকার মতন সারামুখে চুমু খায় ।
_ যাও ফ্রেস হয়ে আসো ।
_ আমার পাওনা ?
রাহা হাতের ইশারায় নিচু হতে বলে । আকাশ নিচু হতেই রাহা আকাশের গালে কপালে ঠোঁটে চুমু খায় ।
আকাশ রাহার ঠোঁটে শক্ত একটা চুমু খেয়ে সোজা হয়ে দাড়ায় । রাহা আকাশের গলার টাই খুলে শার্টের বোতাম খুলে শার্ট খুলে দেয় ।
আকাশ উন্মুক্ত বুকে আবারো আগলে নেয় রাহা কে ।
রাহা ও চুপ করে রইলো ।
এখন আর রাহা আগের মত ঝামেলা করে না । মাঝে মধ্যে একটু আকটু ভুল করে ফেলে । ইমম্যাচিউর মেয়েটা ম্যাচিউর হয়ে গেছে । বুঝতে শিখে গেছে অনেক কিছু । স্বামী সন্তানের খেয়াল রাখে । বড় জায়ের সাথে মিলে সংসারের কাজ করে । দুই শাশুরি সংসারের কাজ থেকে অবসর নিয়েছে । মূলত রাহা আর মিলা তাদের দুজন কে অবসরে পাঠিয়ে দিয়েছে । তারা এখন নাতি নাতনী নিয়ে সময় পার করে ।
আকাশ এখন আর আগের অবুঝ ঝামেলা রানী কে দেখতে পায় না । ঝামেলা রানী এখন শান্ত হয়ে গেছে ।
আকাশ রাহা কে ছেড়ে টাওয়াল হাতে নিয়ে ওয়াসরুমে প্রবেশ করে । রাহা রুম থেকে খালি গ্লাস টা নিয়ে বেরিয়ে যায় ।
কে*টে গেছে চার টা বছর ।
রাহা আকাশের ছেলে ধ্রুবর বয়স দুই বছর । বাবার মতই শান্ত শিষ্ট হয়েছে ধ্রুব ।
,
রাত আটটার মধ্যে বাড়ি ফিরে আসে সবাই ।
অসীম এখন মাস্টার্সের স্টুডেন্ট কয়েক মাস পর পরীক্ষা । বয়স ছাব্বিশ বছর । এখন আর আগের মত হ্যাংলা পাতলা নেই আকাশের মত সুঠাম দেহের অধিকারী হয়েছে । এখন পরিপূর্ণ বয়স্ক একজন যুবক।দেখতেও প্রায় আকাশের মতোই হয়েছে । গাঁয়ের রঙ আকাশের চেয়ে একটু চাপা তবে ফর্সাই । আগের থেকে দুষ্টামি একটু কমেছে। তবে পুরোপুরি না । এখনো বাবার সাথে ফাজলামো করে । দুই ভাইয়ের পেছনে লাগে । রাহার আর মিলার সাথে খুনসুটিতে মেতে ওঠে। তবে রাহার পরিবর্তন অসীমের জন্য একটু কষ্ট দায়ক হয়ে গেছে । এখন আর রাহার সাথে মিলে অকাজ করতে পারে না । এই বিষয় টা অসীমের জন্য অনেক কষ্টের বেদনার । ও মানতেই পারে না রাহা আর ঝামেলা করে না। ঝামেলা রানী এখন ঝামেলা থেকে দূরে থাকে । ঝামেলা না করলেও অসীম এখনো ঝামেলা রানী বলেই ডাকে । এই নাম কোনো দিন পরিবর্তন হবে না ।
সবাই রোজকার মতন সোফায় বসে গল্প জুড়ে বসেছে ।
অসীম বড় দুই ভাইয়ের মধ্যে বসে আছে । অন্য পাশে আমজাদ শেখ আর আজলান শেখ বসে আছেন ।
আরেক পাশের সোফায় রাহা মিলা অনন্যা শেখ আর সায়মা শেখ বসে আছেন । সন্ধ্যা দুই দাদার মাঝ খানে বসে আছে আর ধ্রুব আকাশের কোলে ।
সন্ধ্যা এখন সাত বছরের হয়েছে । অসীমের ডুপ্লিকেট বলা চলে সন্ধ্যাকে । ভাতিজিকে নিজের মতোই বানিয়ে নিয়েছে এই কয়েক বছরে । অসীম সন্ধ্যার দিকে তাকায় । তার পর মধুর সুরে ডাকে ।
_ আম্মা ।
সন্ধ্যা তাকায় ছোট চাচ্চুর দিকে । অসীম আবার ডাকে ,
_ আম্মাহ্ ।
_ কি ?
মধুর সুরে আবার ডাকে ,
_ ও আম্মা ।
_ হুম বলো ।
_ আম্মা গো ।
_ কি হয়েছে ?
_ আম্মাহ্ ।
সন্ধ্যা রাগ দেখিয়ে বলে ,
_ ডাকছো কেনো এভাবে ? কি হয়েছে বলবে তো নাকি ?
_ আম্মা গোহ্ ।
_ ধ্যাত ।
_ ও আমার আম্মা ।
সবাই তাকিয়ে আছে অসীমের দিকে । এই ছেলে এত বড় হয়ে গেল কিন্তু এখনো ভালো হলো না । মেয়ে টাকে শুধু শুধু রাগাচ্ছে । কে বলবে এই ছেলের বয়স ছাব্বিশে এসে ঠেকেছে ?
অসীম দুই হাত দুদিকে মেলে আবার ডাকে ,
_ আম্মা ।
সন্ধ্যা দাদার কাছ থেকে উঠে দৌড়ে এসে অসীমের গলা জড়িয়ে ধরে । অসীম নিজেও দুই হাতে জাপটে ধরে ।
_ আম্মা গো আজ সারাদিন তুমি আমাকে একটুও আদর করোনি ।
_ তুমি তো সারাদিন বাড়িতেই ছিলে না ।
_ হুম তাও ঠিক । এখন একটু আদর করে দাও ।
সন্ধ্যা অসীমের দুই গালে কপালে হামি দেয় । অসীম ও দেয় ।
আমজাদ শেখ গলা খাঁকারি দিয়ে বলেন ,
_ একটা মেয়ে আছে দেখতে শুনতে নাকি বেশ ভালোই।
সকলেই অসীম আর সন্ধ্যার দিক থেকে চোখ সরিয়ে আমজাদ শেখের দিকে তাকায় । বাবার কথা শুনে কপাল ভ্রু কুচকায় অসীম । বাকি সবাই আগ্রহ নিয়ে তাঁকিয়ে আছে বাকি কথা শোনার জন্য ।
আমজাদ শেখ আবার বলেন ,
_ তোমরা যদি রাজি থাকো তাহলে দুই তিন দিনের মধ্যে মেয়ে দেখতে যেতে চাই ।
অসীম বলে ,
_ কার জন্য মেয়ে দেখতে যাবে ?
সকলেই এবার অসীমের দিকে তাকায় ।
আমজাদ শেখ বলেন ,
_ নিশ্চই যে এখনো বিয়ে করেনি তার জন্যই ।
_ সেটাই তো জানতে চাইছি । কে বিয়ে করেনি আর কার জন্য মেয়ে দেখতে যেতে চাইছো ?
_ আহাম্মক তুই ছাড়া এই বাড়িতে বিয়ে করতে কে বাকি আছে ?
_ ধ্রুব ও বাদ আছে এখনো ?
সকলেই চোখ বড় বড় করে তাকায় । আমজাদ শেখ রেগে সোফার কুশন তুলে ছুঁড়ে মে*রে বলে ,
_ হতচ্ছাড়া ধ্রুবর বিয়ের বয়স হয়েছে ?
_ তুমি তো বয়সের কথা কিছু বলোনি । শুধু বলেছো আমি ছাড়া আর কেউ বিয়ে করতে বাকি আছে কিনা ?
আমি ছাড়া তো ধ্রুবই বিয়ে করতে বাকি আছে এখনো।
আমজাদ শেখ হাসবেন নাকি কাঁদবেন বুঝতে পারলেন না । এই বদ ছেলে বিয়ের কথা বললেই এড়িয়ে যায় । কিছু জিজ্ঞেস করলে বলেও না । তার এক কথা "আমি এখন বিয়ে করবো না । বিয়ে করতে দেরি আছে আরো। কেউ বুঝতে পারে না বিয়ে করতে কিসের আপত্তি ? বয়স তো কম হয়নি । পড়াশোনার পাশাপাশি বাবা চাচার সাথে নিজেদের ব্যবসার হাল ধরেছে । জব করবে না তাই অনার্স শেষ করার আগেই ব্যবসায় জড়িয়েছে নিজেকে । সব দিক থেকে সব কিছু ঠিক আছে তাহলে বিয়ে করতে আপত্তি কিসের এত ?
আমজাদ শেখ কাঠ কাঠ গলায় বলেন ,
_ আমরা আগামী পরশু মেয়ে দেখতে যাচ্ছি পছন্দ হলে আকদ সম্পন্ন করে আসবো ।
_ জীবনেও না । আমি বিয়ে করবো না বলেছি তো ।
_ বিয়ে করতে কি সমস্যা তোর ?
_ অনেক সমস্যা । মাস্টার্স শেষ করি তারপর দেখা যাবে ।
_ কি দেখবি ?
_ মেয়ে , বিয়ে ।
_ আমরা আগামী কালকেই যাবো ।
_ যাও মানা করেছি আমি ? তোমাদের চার বাপ ব্যাটার মধ্যে যার পছন্দ হবে , সেই বিয়ে করে নিয়ে আসবে আমার কোনো আপত্তি নেই ।
বিস্ফোরিত নয়নে তাকিয়ে থাকে সকলে ।
আমজাদ শেখ সোফা ছেড়ে উঠে এসে অসীমের পিঠে ধুমধাম লাগিয়ে দেয় দুটো । বদ ছেলে বলে কি ?
_ মা*র*ছো কেনো ?
_ কি বললি তুই ?
_ শুনতে পাও নি ?
_ সেজন্যই তো মে*রে*ছি ?
_ ভুল কিছু বলেছি আমি ? আমি বিয়ে করতে চাইছি না কিন্তু তোমরা জোর করেই বিয়ে করাবে । আমাকে বিয়ে না করিয়ে তার থেকে ভালো হয় তোমরা নিজেরাই বিয়ে করে নাও ।
এবার দুই ভাই দুই পাশ থেকে চেপে ধরে অসীম কে ।
_ এরকম করছো কেনো তোমরা ?
_ আমাদের বউ দের সতীন নিয়ে আসতে বলছিস কেনো তুই ?
_ যাতে তোমাদের বউ দের কাজ করতে কষ্ট কম হয় ।
_ তোকে বলেছে ওদের কাজ করতে কষ্ট হয় ?
_ আমি বলেছি আমার বউ লাগবে ? যখন লাগবে তখন আমি নিজে থেকেই বলবো । তোমাদের অত টেনশন করতে হবে না । তোমাদের বউ লাগলে নিয়ে আসতে পারো কোনো সমস্যা নেই ।
অনন্যা শেখ সোফা ছেড়ে উঠে এসে অসীমের চুল ধরে পিঠে বসায় একটা ।
_ কি সমস্যা ? যে পারছো মে*রে*ই যাচ্ছো ।
_ এত লাগাম ছাড়া কেনো তুই ?
_ তোমরাই লাগাম ছাড়া হতে বাধ্য করেছো । বলছি বিয়ে করবো না এখন কিন্তু তোমরা জোর করেই বিয়ে করাবে । যখন বিয়ে করতে ইচ্ছে হবে তখন নিজে থেকেই বলবো ।
আমজাদ শেখ সোফার দিকে এগিয়ে বলেন ,
_ যখন তোর বিয়ে করতে ইচ্ছে হবে তখন আমি নিজেই তোর বিয়ে করাবো না ।
_ সমস্যা নেই আমি নিজ দায়িত্বে বউ নিয়ে এসে সারপ্রাইজ দিয়ে দেবো তোমাদের ।
মিলা রাহা ফিক করে হেসে ওঠে অসীমের কথায় ।
অসীম নিজেও মুচকি হাসে ।
সমুদ্র অসীমের কাঁধের উপর হাত রেখে ফিসফিস করে বলে ,
_ তুই বিয়ে কেনো করতে চাইছিস না ? কোনো পছন্দের মেয়ে আছে ? থাকলে বল ।
অসীম ও আস্তে আস্তে বলে ,
_ সেরকম কিছুই না ভাইয়া । পরীক্ষার খুব বেশি দেরি নেই । এখন বিয়ে মেয়ের ঝামেলায় জড়ালে পড়াশোনায় মনযোগী হতে পারবো না । আর এমনিতেই আমি তোমাদের দুজনের মত ভালো স্টুডেন্টও না । তাই আমি আমার পুরো ফোকাস পরীক্ষায় দিতে চাই । বিয়ে তো ছয় মাস এক বছর পরেও করা যাবে তাইনা ?
_ হুম তোর কথাতেও যুক্তি আছে ।
মিলা সোফা ছেড়ে উঠে বলে ,
_ রাত অনেক হয়েছে খেতে আসো সবাই ।
_ খাবার বাড়ো আসছি ।
,
রাতের খাবার খেয়ে যে যার রুমে চলে যায় ।
আকাশ ধ্রুব কে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাহা শোয়ার জন্য বেড ঠিক করছে ।
এমন সময় ওদের ডোরে টোকা পড়ে ।
_ কে ?
_ আমি ভাইয়া ।
আকাশ ডোর খুলে দেয় ।
অসীম ভেতরে এসে দাঁড়ায় ।
_ কিছু লাগবে ?
_ হুম ।
_ কি ?
_ ধ্রুব কে নিতে এসেছি ।
ধ্রুব আকাশের গলা জড়িয়ে ধরে বলে ,
_ এখন যাবো না , সকালে যাবো ।
অসীম ধ্রুব কে নিজের কোলে নেওয়ার জন্য টানাটানি শুরু করে ।
_ আব্বা আসো ।
_ সকালে যাবো ।
_ না এক্ষনি ।
_ না ।
অসীম ধ্রুব কে নিজের কোলে নিয়ে নেয় ।
_ ও যখন যেতে চাইছে না তখন এখানেই থাকুক ।
অসীম ডোরের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ধ্রুব কে উদ্যেশ্য করে বলে ,
_ সব সময় বাবা মায়ের মধ্যে ঢুকে শুয়ে থাকিস।
তুই কি আমার আরেক টা আম্মা আসতে দিবি না আব্বা ?
আকাশ অসীমের কথা শুনে তেড়ে যায় । অসীম ধ্রুব কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দৌড় শুরু করে ।
বেডে বসে থাকা রাহা লজ্জায় লাল হয়ে গেছে অসীমের কথা শুনে ।