চোখ খুলে জায়গাটা ভীষণ অপরিচিত লাগলো মিলির কাছে।এর আগে কখনো দেখেছে বলে মনে পরলো না।শরীরটা ভীষণ দুর্বল লাগছে,মাথাটাও ব্যথা করছে।যতটুকু মনে পড়ছে মিলি তো মাহবুবের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল।তারপরে কি হলো?মিলি একটু মস্তিষ্কে জোর দেওয়ার চেষ্টা করলো তবে কিছু মনে পড়ছে না।আশেপাশে দৃষ্টি ঘোরাতেই রুমের একপাশে সোফায় বসা মাহবুব এর উপরে চোখ পড়ল।মিলি বুঝলো যে হাসপাতালের কেবিনে ওকে রাখা হয়েছে।মিলির যে জ্ঞান ফিরেছে মাহবুব তখনও খেয়াল করেনি।সোফায় গা এলিয়ে চোখটা বন্ধ করে রেখেছে। কে জানে হয়ত ঘুমিয়ে পড়েছে।সময়ের কোন আন্দাজ মিলির নেই।মিলি এবারে বুঝতে পারল ও বোধহয় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গিয়েছিল।নিজেই কষ্ট করে উঠে বসলো।মাহবুবকে সামনে বসে থাকতে দেখে ভীষণ আনন্দ হলো।এই মানুষটা তবে এখনো মিলিকে নিয়ে চিন্তা করে।সারাদিন নিশ্চয় মিলির জন্য এখানে বসে ছিল, নিশ্চয়ই মানুষটা ওকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে।নিজের অজান্তেই চোখ দুটো ভিজে উঠল মিলির।নিজের সিদ্ধান্তের উপর ভীষণ ঘৃণা হলো।কার জন্য কাদেরকে ছেড়ে গিয়েছিল সে?গায়ের উপর থেকে চাদরটা সরিয়ে মেঝেতে পা রাখল।মাথাটা এখনো ঘুরছে।ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে মাহবুবের পায়ের কাছে বসলো।মাহবুব বোধহয় তখনও তার এত নিকটে মিলির উপস্থিতি খেয়াল করেনি।মিলি ডাকতে চাইছে মাহবুবকে ভাইয়া বলে কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বেড়োতে চাইছে না।ডুকরে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।হঠাৎই মাহবুব এর কাছে নিজের পা দুটো একটু ভেজা ভেজা অনুভূত হলো।মনে হলো পানি পড়ছে কোথাও থেকে।
চোখ খুলে পায়ের দিকে তাকাতেই সেখানে মিলিকে বসে থাকতে দেখে চমকে উঠল।
“তুই এখানে বসে আছিস কেন?”
মাহবুব পা দুটো সরাতে চাইলো তবে মিলি সরাতে দিলোনা।মাহবুবের পা জড়িয়ে ধরে ক্রন্দনরত অবস্থায় অপরাধী গলায় বলল,
“আমায় ক্ষমা করে দিও ভাইয়া।জীবনে তো আমার অনেক ভুল ক্ষমা করে দিয়েছো।প্লিজ আর একটাবার আমার এই ভুলটা ক্ষমা করে দাও।আর কখনো এমন কিছু করবো না কথা দিচ্ছি তোমায়।প্লিজ ভাইয়া এইবারে ক্ষমা করে দাও।”
কথাটা বলে মিলি ডুকরে কেঁদে উঠলো।কষ্ট কি মাহবুবের হচ্ছেনা হচ্ছে তো।বোনের চোখের জল তো মাহবুব নিজেও সহ্য করতে পারে না।আর আজ সেই বোন ওর পা জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।তবে মনের মাঝে যে অভিমান আর কষ্ট গুলো অনেক।এত ভালোবাসার পরও মিলি ওদের সবাইকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল তন্ময়ের জন্য।নিজের কয়েকদিনের ভালোবাসার জন্য এত বছরের ভালোবাসার মানুষগুলোকে ছেড়ে দিয়েছিল।গম্ভীর গলায় বলল,
“আমার থেকে ক্ষমা না পেলেও তোর জীবনে কিছু আটকে থাকবে না।যার জন্য আমাদেরকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলি তার ভালোবাসা পেলেই তো তোর সবকিছু হয়ে যায়।আমাদেরকে আর কি দরকার?যা তার কাছেই যা তুই।”
মিলি আবারো শব্দ করে কেঁদে উঠে বলল,
“আমার অপরাধবোধ আর বাড়িও না ভাইয়া।আমি আজ সব হারিয়ে তোমার কাছে এসেছি।জীবনে কত বড় ভুল করেছি আজ তা উপলব্ধি করতে পারছি।বিশ্বাস করো ভাইয়া তোমার মিলির কাছে আজ আর কিচ্ছু নেই।”
মিলির কথাটা মাহবুব ঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারল না হয়তো।অন্তত এটা কোন মতেই আন্দাজ করতে পারল না যে তন্ময় ওর সাথে কিছু করেছে।তবে মিলিকে আর নিজের পায়ের কাছে এভাবে বসে থাকতে দিতে পারছে না।মিলিকে উঠিয়ে নিজের পাশে বসালো।বোনটাকে দেখতে ভীষণ বিধ্বস্ত মনে হচ্ছে।চোখের চাহনি তার দুর্বল।মনে হচ্ছে কত রাত ঘুম হয় না ঠিকঠাক।শুষ্ক ঠোঁট দুটো ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করেছে।টকটকে ফর্সা গায়ের রং কালচে হয়ে উঠেছে।
“কি হয়েছে তোর?ওই কুলাঙ্গার কি এখনো চাকরি পায়নি যে না খাইয়ে এভাবে শুকিয়ে মা/রছে তোকে?”
“পেয়েছি চাকরি।অনেক ভালো চাকরি করে ও।”
“কত টাকা বেতন পায়?”
“অনেক।”
মাহবুব রাগান্বিত গলায় বলল,
“এত টাকা বেতন পেয়েও বউকে খাওয়াতে পারে না?”
“ওর কোন দোষ নেই ভাইয়া।আমিই ঠিক মত খাই না।”
“ওহ্ আচ্ছা।আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম ওর কোন দোষ থাকতেই পারে না,ও তো ধোয়া তুলসী পাতা।দোষ মনে হচ্ছে আবার আমি করলাম তোকে এই কথাটা বলে তাই না?এখন তো নিশ্চয়ই আবার অপমান করবি তোর স্বামীর নামে এমন কথা বললাম বলে?অপবাদ দিলাম বউকে না খাওয়ানোর।শুরু করে দে।অপমান কর আমি কিছু মনে করব না।”
“তোমায় অনেক কষ্ট দিয়েছি আমি তাই না ভাইয়া?”
“একদমই না।তুই কেন আমাকে কষ্ট দিতে যাবি?তুই তো নিজে যেন কষ্ট না পাস সেজন্য চলে গিয়েছিলি তাতে কোনো অন্যায় নেই।বিশ্বাস কর আমি একটুও কষ্ট পাইনি।আর নিজের কথা ভেবে না হলেও নিজের বাচ্চার কথা ভেবে কি একটু খাওয়ানো যায় না?আর ওই কুলাঙ্গারটা কি জোর করে খাওয়াতে পারে না?আবার মনে হয় ওর নামে অপবাদ দিয়ে ফেললাম তাই না?ওর কোন দোষ নেই।ও কেন জোর করে খাওয়াতে যাবে?তোর নিজেরই খেয়ে নেওয়া উচিত ছিল।”
মাহবুবের এসব কথার মাঝেই মিলি হঠাৎ ওকে দু হাতে আঁকড়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।হঠাৎ ধরায় মাহবুব থমকালো,কিছু আর বলতে পারল না।তবে কেন যেন মিলির সেই কান্না শুধু অপরাধবোধের কান্না মনে হলো না।মনে হলো এই কান্নার মাঝে লুকিয়ে আছে আরো একরাশ যন্ত্রণা।মাহবুব কেন যেন আর রাগ করতে পারল না।নিজেও জড়িয়ে ধরল বোনকে।মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“কি হয়েছে তোর?তন্ময় কিছু করেছে?”
“তোমাদের বাড়িতে আমায় একটু কয়েকটা দিনের জন্য থাকতে দেবে ভাইয়া?একেবারের জন্য থাকবো না শুধু কয়েকটা দিনের জন্য থাকবো।নিজের যাওয়ার আর কোন জায়গায় পাচ্ছিনা।আমি এখন নিঃস্ব।বিশ্বাস করো আমার কাছে কিছু নেই।জানো আমি যে কাউকে একটু জড়িয়ে ধরে কাঁদবো তেমন মানুষও নেই আমার কাছে।আজ কতগুলো দিন পর তোমায় পেয়ে একটু মন খুলে কাঁদতে পারলাম।”
“ওই বাড়িটা এখনো তোরই আছে।ওই বাড়িতে,আমাদের কোম্পানিতে,চৌধুরী বংশের সব সম্পত্তিতে এখনো তোর সমান অংশ আলাদা করে রাখা আছে।তুই হয়তো আমাদেরকে ছেড়ে চলে এসেছিলি কিন্তু আমরা তোর সব অংশ এখনো আগের মতনই রেখে দিয়েছি।তোর ঘরটা এখনো আগের মতনই গোছানো আছে।প্রতিদিন নিয়ম করে পরিষ্কার করা হয়।তুই আমার কাছে আশ্রয় কেন চাইছিস?তোর বাড়িতে তুই আসবি।”
“এই অধিকার দেখানোটা এখন আর আমার মানায় না ভাইয়া।আমি তো সব ছেড়ে চলে এসেছিলাম তবে কোন মুখে গিয়ে আবার অধিকার দেখাবো?আমি চাইও না কোনো রকম কোনো অধিকার দেখাতে।আমি শুধু কয়েকটা দিনের জন্য আশ্রয় চাই।”
“তার আগে বল আশ্রয় কেন চাইছিস?তোর নিজের সংসার?”
“শেষ হয়ে গেছে।আমার সংসার,স্বপ্ন,ভালোবাসা সব শেষ হয়ে গেছে।তুমি বুঝতে পারছ না আমার কাছে আর কিছু নেই জন্য আমি তোমার কাছে এসেছি? আমি স্বার্থপরের মতন নিঃস্ব হওয়ার পর তোমার কাছে এসেছি।”
“ওই জানো/য়ারটা কি করেছে?ভরসা আছে তো আমার ওপরে এখনো?একবার বল কি করেছে?তোর চোখের জলের প্রতিটা ফোটার দাম আমি নেব।বল আমায় কি করেছে ও?”
“সব বলবো তোমাকে কিন্তু এখন না।আমায় কয়েকটা দিন সময় দাও।আর পারলে আমায় ক্ষমা করে দিও।”
“ভালো তো তোকে এখনো আগের মতনই বাসি।এখনো তোর জন্য চিন্তা হয়।জানিস মাঝে মাঝে মনে হয় আমার বোনটা কি করছে,কেমন আছে?আমি যেমন ওর যত্ন নিতাম ওই জানো/য়ারটা নিতে পারছে তো?কেন ছেড়ে গিয়েছিলে আমাদের?আমি তো বলেছিলাম যে আমি বাবাকে রাজি করিয়ে নেব।কেন আমার উপর বিশ্বাস রাখতে পারলি না?পালিয়ে বিয়ে করলি কেন?”
“ভুল করেছি ভাইয়া।জীবনে খুব বড় একটা ভুল করে ফেলেছি।আমি কি করে বুঝতাম যে তন্ময় বদলে যাবে?তুমি জানো বাবা নিজের সম্মান,প্রতিপত্তি নিয়ে কতটা সিরিয়াস।তুমি এটাও খুব ভালো করে জানো বাবা কখনো রাজি হতো না।তাহলে আমি কিভাবে থাকতাম?তখন তো বুঝিনি যে তন্ময় এতটা বদলে যাবে।”
“আমি কিন্তু তোকে বলেছিলাম যে ওর ভালোবাসা বেশিদিন থাকবে না।”
মিলি মাথা তুলে বসলো।চোখের জলটুকু মুছে নিয়ে নির্জীব কন্ঠে বলল,
“আমি ভুল করেছি সেটা আমি জানি।জীবনে এমন ভাবে ঠকে গেছি যে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছি না।দেয়ালে আমার পিঠ ঠেকে গেছে ভাইয়া।আচ্ছা ভাইয়া আমাকে ওই বাড়িতে ঢুকতে দেবে তো?আমি যেমন স্বেচ্ছায় ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম তোমরা এবারে আমায় বের করে দেবে না তো?”
মাহবুব মিলির হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ভরসা দিয়ে বলল,
“আমি আছি না।একবার তুই শুধু আয়।চৌধুরী বাড়ির মেয়েকে কি করে স্বাগত জানাতে হয় তোকে দেখিয়ে দেবো।তুই সারা জীবন আমাদের বাড়ির রাজকন্যা ছিলি,এখনো আছিস আর ভবিষ্যতেও থাকবি।তোর ভাইয়া তোকে কথা দিচ্ছে।”
________
“তোমার সাথে কিছু দরকারি কথা আছে তন্ময়।”
মিলির কথা শুনে তন্ময় এক রাশ বিরক্ত নিয়ে বলল,
“তাড়াতাড়ি বলো কি বলবে,ঘুমোবো আমি।”
“এখন তো আর এই অজুহাত গুলো দেয়ার দরকার নেই যে তুমি ঘুমোবে।আমি তো জানি তুমি এখন আমার থেকে মুক্তি পেয়ে অন্য ঘরে গিয়ে নোংরামি করবে।এমনিতেই তো পাপ কম না আর নাহয় মিথ্যে বলে পাপ নাই বা বাড়ালে।”
“একদম বেশি জ্ঞান দেবে না।কি বলবে তাড়াতাড়ি বলো,না হলে আমি গেলাম।আমি যাই করি না কেন তাতে তোমার তো কিছু যায় আসার কথা না।”
“তা অবশ্য ঠিক বলেছো।আগে যায় আসতো কিন্তু এখন থেকে আর যায় আসবে না।সে যাই হোক এটা ধরো।”
মিলি একটা কাগজ তন্ময়ের দিকে বাড়িয়ে দিল।
তন্ময় কাগজটা হাতে নিয়ে দেখে বলল,
“এটা দিয়ে কি করবো এখন আমি?”
“আমাদের বিয়ের কাবিন এর কাগজ।দেখোতো ওখানে কত টাক লেখা আছে?তুমি যা বলেছিলে তাই লেখা হয়েছিলো কিন্তু।”
তন্ময় একবার কাগজটাতে নজর বোলালো।যদিও নজর বোলানোর প্রয়োজন ছিল না।কেননা ওর মনে আছে কত টাকা কাবিন হয়েছিল ওদের বিয়েতে।তন্ময় নিজেই ৫ লক্ষ টাকা কাবিন ধরেছিল।যদিও এক টাকাও পরিশোধ করেনি।মিলি বলেছিল এত ধরার দরকার নেই তবে তখন তন্ময় জোর করে ধরেছিলো।তার ভালোবাসার মানুষের মূল্য বোধহয় সেই কাবিনের টাকার মাধ্যমেই ঠিক করতে চেয়েছিল।আজ নিজের সেই বোকামির উপর বড্ড বেশি রাগ হচ্ছে।তখন তো আর জানতো না যে মিলির ওপর একদিন বিরক্তি চলে আসবে কিংবা মিলি কে ছেড়ে দিতে হবে।ভেবেছিল মিলিকে পাঁচ লাখ টাকা দিলেও ওরই থাকবে সেসব টাকা।
তন্ময় কে চুপ করে থাকতে দেখে মিলি বলে উঠল,
“এখানে ৫ লাখ টাকা উল্লেখ করা আছে যা তুমি নিজে বলেছিলে।”
“হ্যাঁ তো ঠিক আছে।দিয়ে দেবো তোমার পাঁচ লাখ টাকা ধীরে ধীরে।”
“উঁহুম।ধীরে ধীরে তো চলবে না তন্ময়।তুমি তো আমার থেকে এখনই মুক্তি চাও তাই না?”
“হ্যাঁ।”
“বেশ আমিও তোমাকে খুব তাড়াতাড়ি মুক্তি দেবো। কিন্তু তত তাড়াতাড়ি মুক্তি দেবো যত তাড়াতাড়ি তুমি আমাকে এই টাকাটা পরিশোধ করে দিতে পারবে।”
“অদ্ভুত তো!এতগুলো টাকা আমি এই কয়দিনের মাঝে কোথা থেকে জোগাড় করবো?”
“সেটা তোমার ব্যাপার।এমনিতেও তোমার কোন ব্যাপারে তো আমার নাক গলানো মানা।আরেকটা কথা,তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে যে আমার এক জোড়া সোনার কানের দুল আর সোনার চেইন তুমি বিক্রি করে ছিলে।আমি যদিও তখন স্বেচ্ছায় তোময় দিয়েছিলাম তবে এখন আমি সেগুলো আর তোমায় সারা জীবনের জন্য দিয়ে রাখার প্রয়োজন মনে করছি না।এই ৫ লক্ষ টাকার সাথে সেসবও ফেরত দেবে আমায়।”
“বললেই হলো নাকি?তুমি চাইলে আর আমি দিয়ে দেব?কি প্রমাণ আছে যে আমি তোমার থেকে ওগুলো নিয়েছিলাম?”
মিলি বক্র হেসে বলল,
“দিতে তুমি বাধ্য।আমি কিন্তু যা বলছি তোমার ভালোর জন্যই বলছি।তুমিই তো বলেছিলে আমাদের মাঝে যেন একটা মিউচুয়াল ডিভোর্স হয়,তাই হচ্ছে।তুমি আমার থেকে মুক্তি চাইছো,আমি তোমায় মুক্তি দিচ্ছি। আর আমি তোমার থেকে আমার পাওনা,আমার অধিকার চাইছি তুমি আমাকে সেটা দেবে এবং তুমি দিতে বাধ্য।”
“বাধ্য না আমি।”
“অবশ্যই তুমি বাধ্য।দেখো এখন এই কয় লাখ টাকাতেই আমি সীমাবদ্ধ আছি কিন্তু যদি তুমি বেশি বাড়াবাড়ি করেছো তাহলে কিন্তু সারাজীবনের আমার আর আমার বাচ্চার খরচের টাকা দাবি করবো এবং আমার থেকে ডিভোর্সের আশাও ছেড়ে দাও।”
“আর যদি না দেই তাহলে কি করব?”
মিলি কন্ঠে গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে বলে,
“একদম আমাকে চোখ রাঙাবে না।তোমার এই চোখ উপড়ে ফেলবো আমি।চোখ নামিয়ে,গলা নামিয়ে কথা বলবে আমার সাথে।”
মিলির হঠাৎ করে এত কঠোরতা তন্ময়ের যেন ঠিক হজম হচ্ছে না।হ্যাঁ এর আগেও তন্ময়ের সাথে রেগে কথা বলেছে তবে তখন ওর চোখে মুখে এতটা জেদ ছিলনা।হুট করে যে মিলির কি হয়ে গেল সেটাই বুঝতে পারছে না।তন্ময়কে নিজের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মিলি বলল,
“কি হলো?হঠাৎ করে আমার মাঝে এই তীব্র রাগ,জেদ কি করে চাপলো এটাই ভাবছো তো?তুমি বাধ্য করেছ।সত্যি বলতে আমি ভেবেছিলাম যে তোমায় তোমার অবস্থাতে ছেড়ে দেবো।আমি ভেবেছিলাম তোমার কর্মের শাস্তি আমার খোদা তোমায় দেবে।তবে জানো হঠাৎ করে আমার আল্লাহই মনে হয় আমায় মনে করালো যে তার বান্দা এতটা দূর্বল না।তোমার মতন একটা শয়তান কে আমার শাস্তি দেওয়া দরকার।”
“শোনো আমি তোমায় বলেছিলাম যে তোমার পরবর্তী জীবনের খাওয়া পড়ার খরচ মাসে মাসে দেব।ইচ্ছে ছিল তোমার কাবিনের টাকাটাও দিয়ে দেব কিন্তু এখন আর কিচ্ছু পাবে না।তুমি আমার থেকে একটা টাকাও আর পাবে না।খালি হাতে আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে।তোমার এই রাগ জেদ তখন এমনিতেই বেরিয়ে যাবে।আর আমি দেখি তুমি কি করতে পারো।”
মিলি এবারে শব্দ করে হেসে উঠলো।একদম প্রাণ খোলা হাসি যাকে বলে।সেই হাসি খুবই জঘন্যভাবে তন্ময় কে কটাক্ষ করছিল।যেন বলছিলো তন্ময় কতটা কৌতুক পুর্ণ কথা বললো।মিলিকে এভাবে চ্যালেঞ্জ করে খুব ভুল করলো।
“সামান্য ৫ লক্ষ টাকা দিতে পারছে না সে আবার আমার সারা জীবনের খাওয়া পড়ার খরচ চালাবে?তুমি জানো মিলি এতটা দুর্বল মনের মেয়ে নয়।যে মেয়ে নিজের পরিবারকে তোমার মতন একটা কুলাঙ্গারের জন্য ছেড়ে আসার ক্ষমতা রাখে সে তোমাকে সোজা করতে ২ সেকেন্ড ভাববে না।কি করবো জানো?”
“কি করবে?”
“তোমার আর তোমার প্রেমিকার নামে মানহানির মামলা করব।তোমার নামে মানসিক অত্যাচারের কেস করব।আমার বাচ্চাকে খু/ন করার চেষ্টা করার কেস করব।ওই ওষুধটা খেলে আমারও সমস্যা হতে পারতো।আমাকে মারার চেষ্টা করার কেস করবো।আমার বাচ্চা সারা জীবনের ভরণপোষণের কেস করবো,আমার সারা জীবনের ভরণপোষণের কেস করব।অন্তঃসত্তা অবস্থায় স্ত্রীর দায়িত্ব নিতে চাইছো না তার জন্য নারী নির্যাতনের মামলা করব।তোমার এমন অবস্থা করবো যে তুমি সব কুল হারাবে।তোমার চাকরি,তোমার জেসি, তোমার সম্মান কিছু থাকবে না।রাস্তায় ভিক্ষা করে খেতে হবে তোমায়।”
তন্ময় তাজ্জব বনে গেল।তন্ময় যেন কখনো খেয়ালই করতে পারিনি যে ও এতগুলো অন্যায় করে ফেলেছে।মিলি এক এক করে যতগুলো কেসের নাম বলল যদি সত্যি এগুলো করে দেয় তাহলে তো মনে হয় না তন্ময় কখনো জেল থেকে বের হতে পারবে।গলাটা শুকিয়ে এলো তন্ময়ের।একটা শুকনো ঢোক গিলে বলল,
“কি আজেবাজে কথা বলছো এসব?তুমি আমার সাথে এমন করতে পারো না।”
“সব পারি।আমি যে আরো ঠিক কি কি করতে পারি সে সম্বন্ধে তোমার বিন্দুমাত্র কোন ধারনা নেই।জানো তো আজ ভাইয়ার সাথে কথা হয়েছে।প্রথম দেখাতেই আমায় বুকে টেনে নিয়েছে।যদিও এখনো আমি ভাইয়াকে তোমার কথাটা পুরো বলিনি কিন্তু শুধু একবার ভেবে দেখো আমার ভাইয়ার কানে এই কথাটা যদি যায় তাহলে তোমার কি হবে।বিলিভ মি তন্ময় তুমি নিঃশ্বাস ফেলার সময় পাবে না।সারা জীবনেও জেল থেকে বের হতে পারবে না।দরকার পড়লে ভাইয়াকে বলব তোমায় মিথ্যে মামলায় ফাঁসায় যেন।তারপর তোমার পরকীয়া,তোমার প্রেমিকার তোমার প্রতি ভালোবাসা কতদিন থাকে সেটাও আমি দেখতে চাই।”
তন্ময় বুঝলো মিলি ফাঁকা হুমকি দিচ্ছে না।আর তাছাড়া এখন যদি তন্ময় মিলিকে এই টাকাগুলো না দিয়ে দেয় তবে পরবর্তীতে আরো টাকা দিতে হতে পারে।এছাড়াও মান সম্মান নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে।তন্ময় খুব ভালো করে চেনে মাহবুব কে।মিলি মাহবুব এর কাছে ঠিক কতটা প্রিয় সেটাও জানে।এমনিতেই মাহবুব তন্ময় কে পছন্দ করে না,দুচোখে সহ্য করতে পারেন সেখানে যদি সত্যি মিলি সবটা বলে দেয় তাহলে মাহবুব সত্যি ওর বাঁচা মুশকিল করে দেবে।একটু নরম হলো তন্ময়।এখন মিলির সাথে জোর গলায় কথা বলা যাবে না।শান্ত গলায় বলল,
“কি চাইছো তুমি?”
“তোমাকে দশ দিন সময় দিলাম।এই দশদিনের মাঝে আমাকে আমার কাবিনের ৫ লক্ষ টাকা সহ আমার গয়না নিয়ে মোট ৬ লক্ষ টাকা তুমি আমার হাতে তুলে দেব।আই রিপিট দশ দিন।১০ দিনের বেশি এক সেকেন্ডও তুমি পাবে না।আর তারপরে তুমি আমার থেকে মুক্তি পাবে সারা জীবনের মতন।না হলে যেগুলো কেসের কথা বললাম সেসব করব।”
“আরে ১০ দিনে কি করে এতগুলো টাকা জোগাড় করবো?মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোমার?তুমি জানো না আমার অবস্থা?”
“তোমার আগে ভাবা উচিত ছিল এই কথাগুলো। তোমার পকেটের অবস্থা দেখে তারপর ঘরে স্ত্রী রেখে বাইরে প্রেম করা উচিত ছিল।আর ছয় লাখ টাকা কি এমন ব্যাপার?ও তুমি তো মনে হয় কখনো এতগুলো টাকা একসাথে চোখেও দেখোনি তাই না?কিন্তু কি করবো বলো আমার কিছু করার নেই।তোমায় শিক্ষা দেওয়ার জন্য যে আমার এই টাকাগুলো লাগবে।”
“দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছো তাই তো?কাজটা কিন্তু তুমি ভালো করছো না মিলি।”
“সুযোগ নেওয়া কাকে বলে জানো তন্ময়?জানবে কি করে।আমি তো কখনো তোমার কোন দূর্বলতার সুযোগ নেইনি।তোমায় আমি বলি কেমন সুযোগ নেওয়া কাকে বলে।এই যে তুমি দিনের পর দিন তোমার প্রেমিকার সাথে বাইরে রাতের খাবার খেয়ে এসে আমায় বলেছো যে অফিসে ক্লায়েন্ট মিটিং ছিল সেখানে ডিনার করেছ আর আমি চুপচাপ বিশ্বাস করে নিয়েছি,এটাকে বলে সুযোগ নেওয়া।তুমি জানো আমার যাওয়ার কোন জায়গা নেই সেই জন্য ভেবেছো যা ইচ্ছে তাই করে যাবে আর আমি চুপচাপ সব মেনে নেব,এটাকে বলে সুযোগ নেওয়া।তুমি জানো আমি তোমায় খুব ভালোবাসি সেজন্য ভেবেছো তুমি বললে আমি আমার বাচ্চাটাকেও মে/রে ফেলবো,এটাকে বলে সুযোগ নেওয়া।সারা জীবন তুমি আমার দুর্বলতার,আমার বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে গেলে আর আজ আমায় দোষারোপ করছো আমি তোমার সুযোগ নিচ্ছি?ইতর কোথাকার।”
“দেখো মিলি বোঝার চেষ্টা করো এতগুলো টাকা আমার পক্ষে এত তাড়াতাড়ি ম্যানেজ করা সম্ভব না।আমার ভীষণ কষ্ট হবে?তুমি কি চাও আমি অন্যের কাছে টাকার জন্য হাত পাতি?”
মিলি নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার চাওয়ার মূল্য তুমি কবে দিয়েছো তন্ময়?তুমি বলছো তোমার এই ছয় লক্ষ টাকা জোগাড় করতে ভীষণ কষ্ট হবে আর তুমি যখন নিজেকে অন্যের করে দিলে তখন আমার কতটা কষ্ট হয়েছিল একবার ভেবেছিলে?তুমি তো ভাবোনি।তুমি স্বার্থপরের মত শুধু নিজের কথা ভেবেছো।তুমি আমায় ছেড়ে দিতে দুবার ভাবোনি তাহলে আমি কেন তোমার কথা ভাবতে যাবো?শুনে রাখো তোমার মিলি আজ থেকে স্বার্থপর হয়ে গেল,ভীষণ স্বার্থপর।এতটা স্বার্থপর যে সে নিজের তন্ময়ের কথাও আর ভাববে না।”