আজ শুক্রবার হওয়ায় তন্ময়ের অফিসে যাওয়ার কোন তাড়া নেই।মিলিরও তাই সকালের নাস্তা বানানোর তাড়া নেই।কেননা ও জানে আজ তন্ময় দেরিতে ঘুম থেকে উঠবে।আর নিজের খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে তো খেয়াল রাখার কথা মিলি ভুলেই গেছে।ময়লা জামা কাপড় গুলো ধোঁয়ার জন্য এক জায়গায় করতে নিয়ে আজ আবারো তন্ময়ের শার্ট থেকে সেই একই মেয়েলি পারফিউমের গন্ধটা মিলি পেল।নিজের ওপর তাচ্ছিল্য হাসলো।মিলির এখন এটা ভেবেই অবাক লাগে যে ও কাকে ভালোবেসেছিল?কার সাথে এতগুলো বছর সংসার করলো?কার জন্য জীবনের এতোগুলো দিন নষ্ট করলো?কার জন্য নিজের পরিবারকে কষ্ট দিল?ভুল করেছে মিলি,ভীষণ বড় ভুল করে ফেলেছে।
ঘুম থেকে উঠে মিলিকে এভাবে স্বাভাবিক দেখে তন্ময় কিঞ্চিত অবাক হলো।ওষুধটা খাওয়ার পর তো মিলির এতটা স্বাভাবিক থাকার কথা না।প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“গতকাল রাতে ওষুধটা খেয়েছিলে তুমি?”
মিলি ছোট করে উত্তরে বলল,
“হ্যাঁ।”
তন্ময় চিন্তায় পরে গেল।তবে কি ওষুধ টা ভুল ছিল নাকি?সন্দেহী গলায় জিজ্ঞেস করল,
“তুমি ঠিক আছো মিলি?”
“ঠিক না থাকার কি আছে?”
“কিন্তু…..”
“খু/ন করতে না পেরে আফসোস হচ্ছে নাকি তন্ময়?”
তন্ময় চমকে উঠলো।স্বাভাবিক গলায় বলার চেষ্টা করলো,
“কি সব আবোল তাবোল কথা বলছো?কিসের খুন?”
মিলি শব্দ করে হেসে উঠলো।একদম উদভ্রান্তের মতন হাসছে।মিষ্টি মেয়ের হাসিটা তন্ময়ের কাছে আজকে ভয়ানক লাগলো।মৃদ্যু কম্পিত গলায় বলল,
“এভাবে হাসছো কেন?”
“তুমি আজ আরো একবার প্রমাণ করে দিলে তন্ময় যে পুরুষ কখনোই এক নারীতে সন্তুষ্ট থাকতে পারে না।তাদের ঘরে একজন আর বাইরে অন্যজন লাগে।কুকুরের মতন নিজের স্ত্রী কে রেখে অন্য নারীর পিছনে ছোটা কিছু পুরুষের স্বভাব সেটা তুমি আমায় বুঝিয়ে দিলে।তুমি আজ আবারো প্রমাণ করে দিলে ভালোবাসা পুরনো হয়ে যায়।”
তন্ময় মৃদু রাগান্বিত গলায় বলল,
“কি আজেবাজে কথা বলছো?ভদ্রভাবে কথা বলো আমার সাথে।”
“কি বললে?তোমার মতন একটা ই/তর,অস/ভ্য,জা/নো/য়া/রের সাথে আমায় ভদ্রভাবে কথা বলতে হবে? আরে তুমি মানুষ নাকি যে তোমার সাথে আমি ভদ্রভাবে কথা বলব?তুমি হলে একটা খু/নি,তুমিএকটা অমানুষ,পশু যে নিজের সন্তানকে খুন করতে দুবার ভাবে না।”
তন্ময় এবারে ভালোই ভয় পেল।তবে নিজের ভয়টা মিলির সামনে দেখানো যাবে ন।মিলির তোলা অভিযোগটা অস্বীকার করে বলল,
“এবার কিন্তু বাড়াবাড়ি করছো মিলি।অযথা আমার উপর এসব অপবাদ দিচ্ছো কেন?”
“বিশ্বাস করো যদি তুমি আমার স্বামী আর আমার সন্তানের বাবা না হতে তোমায় আমি এই মুহূর্তে এখানে খু/ন করে জেলে যেতাম।কিন্তু কি বলোতো আমি মানুষ,তোমায় ভালোবাসি আমি সেজন্য তোমায় মা/রতে আমার হাত কাঁপবে।আমি পারবো না তোমায় মা/রতে।কিন্তু তুমি অমানুষ সেজন্যই তো নিজের স্ত্রীর জীবনের ঝুঁকির কথা না ভেবে নিজের সন্তানকে খু/ন করার জন্য ওষুধটা দিয়েছিলে।তুমি কবে এতটা অমানুষ হয়ে গেলে তন্ময় আমি তো বুঝতে পারিনি?কবে আমি তোমার কাছে এতটা বিরক্তিকর হয়ে উঠলাম বলতে পারো?”
তন্ময় চোখ নামিয়ে নিল।কি বলবে খুঁজে পাচ্ছে না।মিলি ধীর পায়ে এগিয়ে গেল তন্ময়ের দিকে।তন্ময় তখনও মিলির দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না।মিলি আলতো করে জড়িয়ে ধরলো ওকে।তন্ময়কে জড়িয়ে ধরে ওর বুকে মাথা রাখলো মিলি।কিছুক্ষণ নিঃশব্দে কাঁদলো।তন্ময় বুঝতে পারলো যে মিলি ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।বুকের কাছে শার্টটা ভেজা ভেজা লাগছে তবুও ওকে আটকালো না,সান্ত্বনাও দিলো না।এমন কি না নিজের থেকে দূরে সরালো।মিলি কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“কবে আমার ভালোবাসা এতটা দুর্বল হয়ে গেল তন্ময় যে তুমি ভালোবাসার খোঁজে অন্য কারো কাছে ছুটে গেলে?কবে আমার ভালোবাসা তোমার কাছে এতটা অসহ্যকর হয়ে উঠলো যে তুমি নতুন ভালোবাসার সন্ধানে নেমে পড়লে?আমার অন্যায়টা একটু আমায় বলবে?কেন এভাবে আমায় ঠকালে?”
“দেখো মিলি ব্যাপারটা এমন না যে তোমার কোন দোষ আছে।”
“তাহলে কেন অন্য সম্পর্কে জড়ালে?”
“আমি জানিনা।জেসির সাথে দীর্ঘদিন যাবত চাকরি সূত্রে আমার সম্পর্ক।প্রথম দিকে শুধুমাত্র আমরা কলিগ আর ভালো বন্ধু ছিলাম কিন্তু কখন যে সেই ভালোলাগাটা ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে আমি বুঝতে পারিনি।"
মিলি ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,
“তোমার স্ত্রী তোমার বুকে মাথা রেখে কাঁদছে আর তুমি তোমার প্রেমিকার প্রতি তোমার ভালোবাসার কথা বলছো?আমার প্রতি কি একটু মায়াও হয় না তোমার?তোমার নিজের কি লজ্জা করছেনা একটুও তন্ময় এগুলো বলতে?”
“তুমি যখন অর্ধেক সত্যটা জেনেই গেছো তবে পুরো সত্যিটা জানানো দরকার।কেননা আমাদের এই সম্পর্ক থেকে আমি মুক্তি চাই।”
মিলি এবার তন্ময় কে ছেড়ে দিল।না এখন আর এই মানুষের বুকে মাথা রাখা যায় না।ঘৃনা লাগছে।
“বেশ তবে অর্ধেক সত্যটা যখন জানি পুরো সত্যটা আমায় জানাও।বলো আমার কাছে কি এমন ছিল না যার জন্য তুমি জেসির কাছে গেলে,ওকে ভালোবাসলে?আমার থেকে তুমি কি পাওনি যা তুমি ওর থেকে পেলে?”
“এসব পাওয়া না পাওয়ার ব্যাপার না হয় থাক।একটা মানুষের সাথে একসাথে থাকতে থাকতে টান তৈরি হবে এটাই স্বাভাবিক।জেসির সাথে থাকতে থাকতে ওর প্রতি আমার ভালোবাসা চলে এসেছে।”
“তবে আমি কে ছিলাম?আমার সাথেও তো থাকো তুমি তাই না?আমি তো তোমার স্ত্রী,ভালোবেসে বিয়ে করেছিলে আমায় তবে আমার প্রতি টান শেষ হয়ে গেল কেন?”
“তোমার এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই।হ্যাঁ তোমায় ভালোবেসেছিলাম একসময় পা/গলের মতন তবে এখন কেন জানি তোমার প্রতি ভালোবাসা আসে না।দেখো মিলি আমি চাই না তোমায় ঠকাতে সেজন্যই তোমায় বলছি আমি আর এই সম্পর্কে থাকতে পারছি না।আমার দম বন্ধ লাগে তোমার সাথে এক বাড়িতে থাকতে,এক ঘরে থাকতে।”
“কিন্তু আমার শরীরকে ভীষণ ভালো লাগে তাই না?আমার কাছে আসতে,নিজের চাহিদা মেটাতে ভীষণ ভালো লাগে?যেসব বাইরের কারো সাথে পারবে না করতে সেসব করার জন্য ঘরে বউকে খুব ভালো লাগে তাইতো?তাহলে তো তোমার চরিত্রের উপর আঙ্গুল উঠবেই।”
তন্ময় সাবধানী গলায় বলল,
“খবরদার মিলি আমার চরিত্র নিয়ে কথা বলবেনা।আমার চরিত্র নিয়ে কথা বলার তোমার কোন অধিকার নেই।”
“একদম চেঁচাবে না আমার ওপরে তন্ময়।কোন মুখে নিজের চরিত্রের কথা এত জোর গলায় বলছো?তোমার মাঝে যদি বিন্দু পরিমাণ লজ্জাবোধ থাকতো তবে তুমি আমার চোখে চোখ রেখে তোমার নোংরামির কথাগুলো বলতে না।তোমার এই দৃষ্টিতে এখন অপরাধ থাকতো।”
“আমি তো বলছি আমি খারাপ।বেশ এই খারাপের সাথে তোমায় থাকতে হবে না।মুক্তি দাও আমায়।আমি জেসির সাথে ভালো থাকতে চাই।প্লিজ মিলি আমায় ভালো থাকতে দাও।আমাদের মাঝে এখন ভালোবাসা অবশিষ্ট নেই।আমাদের একে অপরকে দেওয়ার মতন এখন আর কিচ্ছু নেই।”
মিলির মাথাটা ঘুরে উঠলো।তবে হাত বাড়িয়ে আর তন্ময় কে সাহায্যের জন্য ডাকলো না।নিজেই চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে পড়ল।মিলির যে শরীরটা খারাপ লাগছে সে সব তন্ময় বোঝার প্রয়োজন মনে করলো না।আবারো রাগান্বিত গলায় বলল,
“আমার যা বলার আমি বলে দিয়েছি।দেখো এই নিয়ে আবার কোন কেস করতে যেও না।এমনিতেও কেস চালানোর ক্ষমতা তোমার নেই,আর না তোমার আশেপাশেই কেউ আছে।আমাদের মাঝে একটা মিউচুয়াল ডিভোর্স হওয়াই ভালো।তোমার মাসে মাসে যে খাওয়া পড়ার খরচ আছে সেটা আমি দিয়ে দেব।তাও প্লিজ আমায় মুক্তি দাও।”
কথাটা বলে তন্ময় বেরিয়ে গেল।মিলি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।ওর কাঁধে যে কেউ একটু ভরসার হাত রাখবে তেমন মানুষ পাশে নেই।কেউ যে একটু এক গ্লাস পানি ঢেলে দেবে ওকে তেমন কেউও নেই।এতটা অসহায় বোধহয় মিলি কখনো নিজেকে অনুভব করেনি।যার হাত ধরে বাকি সবাইকে ফেলে রেখে চলে এসেছিল সেই মানুষটা আজ মিলি কে ছুঁড়ে ফেলে দিল।একটা বারের জন্য ভাবলো না যে মিলির যাওয়ার কোন জায়গা নেই।তন্ময়ের জন্য মিলি নিজের সব যাওয়ার জায়গা বন্ধ করে দিয়ে এসেছিল,সব পথ ছেড়ে এসেছিল।স্বার্থপর এর মত নিজের সুখের কথা ভাবলো অথচ ওকে ছাড়া যে মিলির জীবনটা শেষ হয়ে যাবে সেটা একবারও ভাবলো না।
_______
সময় যেতে যেতে ঘড়ির কাঁটা এসে থামলো রাত বারোটায়।তন্ময় সেই যে সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে আর ফেরার কোন নাম নেই।ফোনটা রিসিভ করারও প্রয়োজন মনে করছে না।
তনিমা রান্না করছেন,আর আমজাদ সাহেব ব্যস্ত পায়ে সারা বাড়ি জুড়ে পায়চারি করছেন।দুপুরে তারা এসেছিল।আসার পর তারাও তন্ময় কে অনেকবার কল করেছে কিন্তু কলটা রিসিভ করার সময় তন্ময়ের হয়নি।আসার পরে মিলির থেকে সবটা শুনে কারোরই মন মেজাজ ভালো ছিল না।আজ প্রথম তনিমা মিলির একটু যত্ন নিয়েছেন।দুপুরে খাইয়ে দিয়েছেন,মাথায় তেল দিয়ে দিয়েছেন,নিজেই ঘর-বাড়ি পরিষ্কার করেছেন।এখন রাতের রান্নাটাও নিজেই করতে গেছেন।মন তো তারও ভালো নেই তাই রান্না ঘরে ঢুকতে দেরি হয়ে গিয়েছিল।রান্না শেষে ঘড়িতে সময় দেখে তার চক্ষু চড়কগাছ।বারোটা পার হয়ে গিয়েছে অথচ এখনো তন্ময়ের ফেরার কোনো নাম নেই।ড্রইংরুমে উঁকি দিতেই আমজাদ সাহেবের রাগান্বিত মুখটা দেখতে পেলেন।হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেলেন মিলির ঘরে।একটু আগে তিনিই মিলি কে জোর করে বিশ্রাম নিতে পাঠিয়েছিলেন।
“মিলি,তন্ময় কি প্রতিদিনই এতোটা দেরি করে বাড়ি ফেরে?”
তনিমার কন্ঠ পেয়ে মিলি চোখ মেলে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল,
“না মা।দেরিতে আসে ঠিকই তবে এতোটা দেরি করেনা।”
“তাহলে আবার কোনো বিপদ হলো না তো?”
মিলি আলতো হেসে বলল,
“ওর বিপদ এখন এই বাড়িতে মা আর সেটা হলাম আমি।আমি ওর জীবনের এখন সবথেকে বড় আর একমাত্র বিপদ যার থেকে ও রেহাই চায়।”
আজ আবারো তনিমার নিজের ছেলের প্রতি ভীষণ রাগ হলো।এখন তো মনে হচ্ছে এর থেকে বউ পাগল তন্ময়ই ভালো ছিল।সারাজীবন তিনি নিজের শিক্ষা নিয়ে গর্ব করেছেন,নিজের সন্তান কে নিয়ে গর্ব করেছেন আর আজ তার সেই গর্ব তন্ময় শেষ করে দিল।নিজের ছেলের প্রতি আজ তনিমার ভীষণ ঘৃণা হচ্ছে।হ্যাঁ তিনি মিলি কে পছন্দ করতেন না কেননা তার মনে হতো তার ছেলে তার পর হয়ে যাচ্ছে।কিন্তু তারমানে এই না যে ছেলের পরকীয়া মেনে নেবেন।ওনার এসব ভাবনার মাঝেই কলিংবেল বাজলো।সবাই বুঝলো যে তন্ময়ই ফিরেছে।মিলি উৎকন্ঠিত গলায় বলল,
“মা আপনি গিয়ে বাবা কে আটকান।তন্ময় কিন্তু আর আগের মতন নেই।আজেবাজে কিছু বলে ফেললে বাবা কষ্ট পাবে।”
তনিমা মাথা নাড়িয়ে চলে গেলেন।মিলিও আস্তে-ধীরে উঠে দাঁড়ালো।ওখানে মিলিরও থাকা প্রয়োজন।
তন্ময় ধৈর্যহীন ভাবে সমানে কলিংবেল বাজিয়েই যাচ্ছেন।আমজাদ সাহেব গিয়ে দরজা খুলে দিলেন।দরজা খুলতেই তন্ময় বিরক্তিকর গলায় বলল,
“কত সময় লাগে দরজা খুলতে?”
কথাটা বলে সামনে তাকিয়ে নিজের বাবা কে দেখতে পেয়ে তন্ময় ভীষণ চমকালো।বুঝতে পারছে না ঠিক দেখছে না ভুল।তবে তন্ময়ের যাবতীয় সন্দেহ দূর হলো আমজাদ সাহেবের গলার স্বর শুনতেই।
“এত রাত অব্দি শুক্রবারে তোমার বাহিরে কি কাজ থাকে?আর ফোন করলে ফোনপ পাওয়া যায় না কেন?”
“বাবা আসলে একটা দরকারি কাজে আটকে…..”
তন্ময় কে আমজাদ সাহেব কথাটা সম্পূর্ণ করতে দিলো না।তার আগেই সজোরে ওর গালে একটা চড় বসালেন।তন্ময় ছিটকে পাশের দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেল।গালে হাত রেখে বিস্ময় ভরা গলায় বলল,
“মা/রলে কেন তুমি আমায়?”
“কুলাঙ্গার জন্ম দিয়েছি একটা।তুই আমার সন্তান এটা ভাবতেও এখন আমার লজ্জা লাগে।বাড়িতে গর্ভবতী স্ত্রী কে রেখে মাঝরাত অব্দি অন্য মেয়ের সাথে নোংরামি করতে তোর লজ্জা করেনা।”
তন্ময় বুঝলো ওর মা-বাবাও সব জেনে গেছে।তবে কথা হলো এই রাতের বেলা বাইরে এত চেঁচামেচি করলে অন্য ফ্ল্যাটের মানুষরাও সব জেনে যেতে পারে যা তন্ময়ের ভীষণ সম্মানে লাগলো।গম্ভীর গলায় বলল,
“যা বলার ঘরে গিয়ে বলো।”
কথাটা বলে ঘরের ভেতরে এসে দরজাটা বন্ধ করে দিল।অনেকদিন পর ছেলে কে দেখলেন তনিমা।পরিস্থিতি ঠিক থাকলে এখন জড়িয়ে ধরে আদর করতেন।কিন্তু ছেলে এমন কান্ড ঘটিয়ে রেখেছে যে ভালোবাসার সাথে ঘৃণাও আসছে।তবে তিনি আগেই রাগারাগি করতে চাইলেন না তন্ময়ের সাথে।এভাবে কোনো সমস্যার সমাধান হয় না।এগিয়ে গিয়ে ছেলের গালে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কাতর গলায় বললেন,
“কেন এসব করলি বাবা?তুই না মিলি কে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলি।ওর জন্য তুই আমার সাথে অব্দি এক মাস কথা বলিস নি আর আজ ওকেই ছেড়ে দিতে চাইছিস?এখনও সময় আছে বাবা ফিরে আয় তুই।খুব বেশি দেরি হয়নি।”
তন্ময়ের সব কথাই ভীষণ বিরক্ত লাগছে এখন।এসব কথা বলে যে আর কোনো লাভ নেই সেসব তো ওনারা বুঝতে পারছেন না।গাল থেকে তনিমার হাতটা সরিয়ে এক কোণায় দাঁড়ানো মিলির সামনে গিয়ে বলল,
“কি ভেবেছো এসব করলে তুমি আমায় পেয়ে যাবে?আমার বাবা-মা কে আমার বিরুদ্ধে উস্কে দিয়ে ভেবেছো জিতে যাবে?এমনটা কল্পনাতেও এনো না।”
মিলি ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“সত্যি তোমার মনে হয় যে আমি এখনও তোমায় পাওয়ার আশায় আছি?এটা ঠিক কাল পর্যন্ত আমি তোমায় ফিরে পাওয়ার আশায় ছিলাম জন্যই বাবা কে সবকিছু বলেছিলাম।কিন্তু বিশ্বাস করো আজ সকালে তোমার মুখ থেকে ওই কথাগুলো শোনার পর তোমার সাথে থাকার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার নেই।আমার ভালোবাসা তো দূর তুমি আমার মুখের থুথু পাওয়ারও যোগ্য না।”
“মুখ সামলে কথা বলো মিলি।ভুলে যেওনা আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে আছো তুমি।বুঝে শুনে কথা বলবে আমার সাথে।”
মিলি পাল্টা হুমকি দিয়ে বলল,
“তুমি আমার সাথে বুঝে শুনে কথা বলো তন্ময়।ভুলে যেওনা তুমি যার সাথে কথা বলছো সে এখনও,এখনও তোমার মতন হাজারটা তন্ময় কে কেনার ক্ষমতা রাখে।”
তন্ময় তাচ্ছিল্য ভরা গলায় বলল,
“তাই নাকি?তোমার কোনো ক্ষমতাই নেই।”
“ভুল বললে।জানো তো এখনও এমএম গ্রুপে আমার নামে ২৫% শেয়ার আছে।আর আমি জানি আমার অংশ এখনও আমারই আছে।আরো কোথায় কোথায় যে আমার নামে কি কি আছে সেটা আমি নিজেও ঠিক করে জানি না আর এই যে এত নিজের পুরুষত্বের ক্ষমতা দেখাতে চাইছো না,আমার ভাই যদি এখনো জানতে পারে যে তুমি আমায় এভাবে ঠকাচ্ছো তোমার অবস্থা খারাপ করে ছাড়বে।আরে সেসব বাদ দাও,তুমি আমাকে এতটা দূর্বল কেন ভাবছো বলোতো?যদি তোমার নামে একবার কেস করিনা তেমার এই দেমাগ আর জেসি দুটোই বেড়িয়ে যাবে।তাই বলছি আমাকে রাগিও না।তোমার এমন অবস্থা করবো যে বাঁচার জন্য আমার পায়ে এসে পড়বে তুমি।”
তন্ময় সত্যি ভয় পেল।সত্যি মিলি যদি ওর নামে কেস করে তাহলে বিপদে পড়ে যাবে।ভাবলো এখন আর মিলির সাথে কথা না বাড়ানোই ভালে।সোজা নিজের ঘরে চলে যেতে নিলে আমজাদ সাহেব আটকালেন।গম্ভীর গলায় বললেন,
“আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তারপর ইচ্ছে হলে জাহান্নামে যাস তবুও আটকাবো না।বল কেন করলি এসব?ওই মেয়েটার জন্য খারাপ লাগলো না?”
“তোমার সব প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই বাবা।আমার বাড়িতে এসেছো যতদিন ইচ্ছে থাকো কিন্তু আমার ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করোনা।আর যদি মিলির জন্য এতই কষ্ট হয় তাহলে ওকে নিজেদের সাথে নিয়ে যাও।তবে মনে রেখো গ্রামে ও আমার স্ত্রীর পরিচয়ে থাকবে না।হয় তোমরা নিজেদের মেয়ের পরিচয়ে রেখো নাহলে আশ্রিতা।”
আমজাদ সাহেব ধপ করে বসে পড়লেন।তনিমা আর মিলি দুজনে ওনার দিকে ছুটে এলেন।তনিমা গেল পানি আনতে।মিলি চিন্তিত গলায় বলল,
“তুমি ঠিক আছো বাবা?”
আমজাদ সাহেব ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন,
“তোমায় আমি বলেছিলাম মা তুমি নিজের পরিবার কে ছেড়ে এসে ঠিক করোনি।আমি বলেছিলাম তোমায় যে আমার ছেলে স্বার্থপর।কেন এই ভুলটা করলে তুমি?”
মিলির নিজেরও চোখ দুটো ভিজে উঠলো।তনিমা আর গ্লাসটা নিয়ে এতটুকু পথ হেঁটে আসার শক্তি পেলেন না।মিলি মাথা তুলে একবার তন্ময়ের দিকে তাকালো যার চোখে বিন্দু পরিমাণ অনুশোচনা নেই।
“ভুল যখন করেই ফেলেছি তখন তো ফল আমায় ভোগ করতেই হবে বাবা।আসলে সম্পর্কের চার বছরেও কখনো ওকে স্বার্থপর মনে হয়নি।বৃষ্টির দিনে আমায় ছাতার নিচে রেখে নিজে ভিজতো,আমায় ছায়া দিয়ে নিজে রোদে পুড়তো,আমায় একটা ছোট্ট উপহার দিয়ে নিজে বাকি দুদিন হেঁটে কলেজে আসতো সেই মানুষটা কে স্বার্থপর কি করে ভাবতাম?”
তনিমা আর চুপ করে থাকতে পারলেন না।ছেলেটা যে তার সত্যি অমানুষ হয়ে গেছে সেসব তো নিজের চোখেই দেখলেন।মিলির কাঁধে হাত রেখে ভরসা দিয়ে বললেন,
“তুমি চিন্তা করোনা মিলি তুমি আমাদের সাথে যাবে।ওই শয়তান থাকুক একা।”
“না মা সেটা হয় না।জানেন তো মা পুরো শ্বশুরবাড়ি খারাপ হোক কিন্তু যদি স্বামী ভালো থাকে একটা মেয়ে সেখানে সংসার করতে পারে।কিন্তু পুরো শ্বশুরবাড়ির মানুষজন ভালো হয়েও কোনো লাভ হয় না যদি না স্বামী ভালো হয়।আপনি আমায় অপছন্দ করেছেন তখন আমি মেনে নিয়েছি সব কারণ তন্ময় আমার ছিল।কিন্তু এখন তো আমার ভরসার সুতোটাই ছিঁড়ে গেছে।আমার দীর্ঘ আট বছরের ভালোবাসায় ধুলো জমেছে মা।এই সংসারে আমার আর আমার বলতে কিছুই নেই।”
“নিজের অধিকার এভাবে ছেড়ে দেবে?”
মিলি শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“ভালোবাসাই তো নেই অধিকার দিয়ে কি করবো?আর কিসের অধিকার,কার ওপর দেখাবো অধিকার?আমি মানুষটা না মা ম/রে গিয়েছি।আমি সেদিন ম/রে গিয়েছি যেদিন আমার স্বামীর শার্টে অন্য নারীর গন্ধ পেয়েছি।আমি সেদিন ম/রে গিয়েছি যেদিন আমার স্বামী আমার মাঝে অন্য কাউকে খুঁজেছে।আমার স্বামীর বুকে আমি মাথা রাখা অবস্থায় যখন সে অন্যজনের প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা বলেছে আমি তখন মরে গিয়েছি।আর এই মৃত মানুষ কিভাবে নিজের অধিকারের জন্য লড়াই করবে বলো?”