রিক্ত বসন্ত

পর্ব - ৭

🟢

“তুমিও চলো আমাদের সাথে মা।আমি তোমায় কথা দিচ্ছি এখানে তোমার কদর না থাকলেও তোমার শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে তুমি তোমার কদর পাবে,সম্মান পাবে তুমি।আমি দায়িত্ব নিচ্ছি।”

আমজাদ সাহেব আশ্বস্ত করলেন ঠিকই,মিলিও হয়তো ওনার কথায় ভরসা পেল তবে যাওয়ার ইচ্ছেটুকু নেই।ওই বাড়িটাও তো তন্ময়েরই।তন্ময়ের সূত্র ধরেই তো এই মানুষগুলোর সাথে পরিচয়,সম্পর্ক গড়ে ওঠা।সেখানে যখন তন্ময়ের সাথেই সবকিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে সেখানে ওই মানুষগুলোর সাথে সম্পর্ক রেখে কি হবে?বরং প্রতিদিন ওই মানুষগুলোকে দেখে পুরনো ঘা তাজা হয়ে উঠবে।

“আমার আর ওই বাড়িতে যাওয়া সাজে না বাবা।আর তুমি সম্মানের কথা বলছো না?আমার এখনো যতটুকু সম্মান বজায় আছে ওই বাড়িতে গেলে সেটুকুও থাকবে না।”

“ছেড়ে দেবে সংসারটা?আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখবে না?”

মিলি আমজাদ সাহেবের হাত দুটো ধরে কৃতজ্ঞতার কন্ঠে বলল,

“তুমি আমার জীবনের ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ,প্রিয় একজন মানুষ বাবা।আমি আমার কল্পনার থেকেও বেশি ভালোবাসা তোমার থেকে পেয়েছি।তুমি এমন একজন মানুষ যাকে আমি এই জীবনে কখনো ভুলতে পারবো না।তোমার ভালোবাসা,তোমার স্নেহ,তোমার প্রশ্রয় কিছুই ভুলতে পারবো না আমি।যোগাযোগ না থাকলে কি আমি এসব ভুলে যাবো নাকি?আমি সারা জীবন তোমায় মনে রাখবো।তুমিও তোমার দোয়ায় আমায় রেখো।”

“আমাদের নাতি-নাতনি যেই আসুক না কেন তাকে দেখার সুযোগ দেবে না?”

“আমি কি করবো আমি সত্যিই জানিনা বাবা।শুধু এতোটুকু জানি আমি এতটা দূরে যেতে চাই যেখানে কখনো আমায় তন্ময়ের নাম শুনতে হবে না,যেখানে তন্ময় আমায় আর খুঁজে পাবেনা কখনো।বিশ্বাস করো ওর থেকে আর অবহেলা পাওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।আমি খুব জঘন্যভাবে হেরে গেছি বাবার নিজের ভালোবাসার কাছে।”

আমজাদ সাহেব চোখ মুছলেন।গ্রামের স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেছেন।সারা জীবন অন্যের ছেলে-মেয়েদেরকে মানুষ করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন,তাদের নৈতিকতা শিখিয়েছেন,বলেছেন জীবনে ভালো মানুষ হতে।আর আজ তার নিজের ছেলেটাই একটা অমানুষে পরিণত হয়েছে।তিনি যেন অনুভব করতে পারলেন অন্যের সন্তানদের মানুষ করার ব্রত গ্রহণ করলেও তিনি নিজের সন্তানটাকে মানুষ করতে পারেননি।

“আমায় ক্ষমা করে দিও তুমি মা।আমার শিক্ষাতেই নিশ্চয় কোন গাফিলতি থেকে গিয়েছিল যার শাস্তি আজ তুমি পাচ্ছো।”

ওদের কথাবার্তার মাঝে তনিমা এলেন।ব্যস্ত গলায় মিলিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“আমি রান্না বান্না সব করে রেখেছি।আজ সারাদিন আর তোমায় রান্না ঘরে যেতে হবে না।আর শোনো তন্ময়ের সাথে বেশি কথা বাড়িয়ো না।আমার বিশ্বাস ও ঠিক ফিরবে।দেখো ও ভালো হয়ে যাবে।”

মিলির ভীষণ হাসি পেল তনিমার ছেলের উপর বিশ্বাস দেখে।মা তো।কি করে ছেলেকে ঘৃণা করবেন?ভালো হোক খারাপ হোক,নিজের সন্তান।মা কি কখনো তার সন্তানদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে?পারে না।সে জন্য মিলিও আর কিছু বলল না,মাথা নাড়ালো।

“সারাদিন তো বাসায় একা থাকো,নিজের খেয়াল রাখবে কি করে?বললাম আমাদের সাথে চলো আমি তো খেয়াল রাখতে পারব।না হলে আমি থেকে যাই এখানে?”

মিলি আপত্তি জানিয়ে বলল,

“না মা,তার কোন দরকার পড়বে না।আপনারা কতদিনই বা তন্ময় কে চোখে চোখে রাখবেন?তন্ময় বড় হয়েছে,নিজের ভালো-মন্দ বুঝতে শিখেছে।এখন কি আর ওকে শাসন করে,মারধর করে কিছু করানো সম্ভব?সেইদিন চলে গেছে।যদি ওর নিজের ফেরার ইচ্ছে হয় তবেই ওকে ফেরানো সম্ভব তাছাড়া আমার ভালোবাসা কিংবা আপনাদের শাসন কোন কিছুই ওকে ফেরাতে পারবে না।”

“এসব কথা না হয় এখন থাক।তুমি নিজের খেয়াল রেখো সাথে আমার নাতি-নাতনি যেই আসবে তারও খেয়াল রেখো।আমার তন্ময়ের বাচ্চা।ও তো না আসতেই আমার সবথেকে আদরের জায়গাটা দখল করে নিয়েছে।”

মিলির ভীষণ খারাপ লাগলো।এই মানুষটাকে তো বলতেও পারবেনা যে হয়তো কখনো তারা বাচ্চাটাকে দেখার সুযোগও পাবে না।কেননা তন্ময় কে যে মিলি সেই সুযোগ দিতে চায় না।ওনারা দেখলে হয়তো বাচ্চাটাকে নিজেদের কাছে রাখতে চাইবেন,তন্ময় কে খবর দেবেন,মিলিকে জোর করতে চাইবেন কিন্তু মিলি সেটা করতে পারবে না।বলা যায় না শেষে যদি তন্ময়েরও নিজের বাচ্চার প্রতি ভালেবাসা তৈরি হয়?তখন যদি বাচ্চাটাকে মিলির থেকে কেড়ে নিতে চায়?না আর ভাবতে পারলো না মিলি।

‘চিন্তা করবেন না মা আমি খেয়াল রাখবো।”

মিলির থেকে বিদায় নিয়ে যাওয়ার জন্য তারা প্রস্তুত হলেন।মিলি তাদেরকে ছাড়তে নিচে অব্দি এলো।আমজাদ সাহেব একটা সিএনজি দাঁড় করালেন।শেষবারের মতন মিলি আবারো বিদায় জানালো।আমজাদ সাহেব কেমন যেন একটা নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে মিলির দিকে তাকিয়ে থাকলো।চোখে তার ভীষণ অপরাধবোধ,যেন ক্ষমা চাইছে দুটো চোখ মিলির কাছে।তিনি বুঝতে পারছেন আর হয়তো কখনো দেখা হবে না মিলির সাথে।তিনি আটকাতেও চাইলেন না।এই মেয়েটাকে আটকানোর তার মুখ নেই।যদি তনিমা ঘুণাক্ষরেও টের পায় যে মিলি ওনাদের সাথে আর যোগাযোগ রাখবে না তাহলে হয়তো যেতে দেবে না মিলি কে।নিজেও আর যাবেন না।তাই তিনি স্ত্রীকে কিছু বললেন না।মিলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

“যেখানেই থাকো ভালো থেকো।খুব গর্ব করতাম আমার ছোট ছেলে আর ছেলের বউকে নিয়ে।আমার ছোট ছেলেকে নিয়ে আজ থেকে আমার গর্ব শেষ আর ছেলের বউকে নিয়ে গর্ব করবো সেই ক্ষমতা আমার নেই।যার মর্যাদা রাখতে পারিনি তাকে নিয়ে গর্ব করার অধিকার আমার নেই।পারলে নিজের জীবনটা গুছিয়ে নিও।আর মনে রেখো তোমার এই বাবা যতদিন বেঁচে আছে তার দোয়ায় তোমায় রাখবে।”

মিলি এবারে ডুকরে কেঁদে উঠলো।ওর কান্নার আওয়াজে তনিমা ছুটে এলেন।

“ও মা কি হলো?কাঁদছো কেন?কি বলেছো তুমি ওকে?”

মিলি দু হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তনিমাকে।কি অদ্ভুত তাই না?যে মানুষটা একসময় মিলিকে দুচোখে সহ্য করতে পারতো না আজ মিলির চোখের জল তাকেও বিচলিত করে তুলেছে,সেই মানুষটাও মিলিকে ভালোবেসে আপন করে নিলো,আগলে নিতে চাইছে।অথচ যার ভালোবাসায় ভরসা করে মিলি এই সংসারে এসেছিল তার ভালোবাসাই ফুরিয়ে গেল।সেই আজ মিলি কে সহ্য করতে পারে না।

“বিশ্বাস করুন মা আমি আপনাদের সবাইকে খুব ভালোবাসি,আমি আমার এই সংসারটাকে খুব ভালোবাসি।আমার এই চার বছরে কোন আফসোস ছিল না,আমার জীবনে কোন অভিযোগ ছিল না।আমি তন্ময় কে নিয়ে গর্ব করতাম কিন্তু আজ আমি এমন ভাবে হেরে গিয়েছি যে লজ্জায় আয়নায় নিজের দিকে তাকাতে পারি না।”

তনিমার চোখ জোড়াও ভিজে উঠলো।মিলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

“চিন্তা করো না সব ঠিক হয়ে যাবে।তুমি শুধু একটু ধৈর্য ধরে থাকো দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।তন্ময় আবার ফিরে আসবে।আমি আমার ছেলেকে চিনি ও তোমায় ছাড়বে না দেখো।”

মিলি আর কিছু বলল না,ছেড়ে দিলো তনিমাকে।চলে গেলেন ওনারা।সিএনজির ভেতর থেকে যতদূর সম্ভব মিলিকে দেখা যায় আমজাদ সাহেব মাথাটা বের করে মিলির দিকে নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।শেষ পর্যন্ত তার দৃষ্টিতে মিলি শুধু অপরাধবোধই দেখতে পেল।মিলি হাসলো।এই অপরাধ বোধটা যদি একটু তন্ময়ের দৃষ্টিতে দেখতে পেত তবে তার সংসারটা টিকে যেত।

_________

একটা ক্যাফেতে মুখোমুখি চেয়ারে বসে আছে মিলি আর জেসি।মিলি তন্ময়ের এক কলিগের থেকে জেসির নাম্বারটা সংগ্রহ করে ওর সাথে দেখা করার কথা বলেছিল,জেসিও আর না করেনি।মেয়েটা দেখতে আসলেই ভীষণ সুন্দর,অল্প বয়স,ফরমাল ড্রেসআপে আরো সুন্দর লাগছে দেখতে।চোখেমুখে তার উপচে পড়া লাবণ্য।এই লাবণ্যতাই হয়ত তন্ময় কে মুগ্ধ করেছে।চোখে মুখে তার উপচে পড়ছে আনন্দ, সেইসাথে জেতার খুশি।দৃষ্টি দিয়ে মিলি কে কটাক্ষ করতেও ছাড়ছে না।বিপরীত পাশে মিলির নিষ্প্রাণ দৃষ্টি।রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটিয়ে কান্না করে চোখের নিচে জমানো কালি,মুখে ব্রণের দাগ।সকাল থেকে বোধহয় কিছু খাওয়া হয়নি।চোখ মুখটা তার ভীষণ শুকনো দেখাচ্ছে।

জেসি তাড়া দিয়ে বলল,

“যা বলার তাড়াতাড়ি বল।আমার হাতে এত সময় নেই।অফিস থেকে মাত্র ২ ঘন্টার ছুটি নিয়ে বেরিয়েছি,যেতে হবে আবার।”

মিলি আলতো হেসে বলল,

“চিন্তা করো না বেশি সময় নেব না।”

“তোমাকে দেওয়ার মতন এত সময়ও আমার হাতে নেই।তোমার হাতে অঢেল সময় থাকলেও আমার কাজ আছে।”

“আমাকে বোঝাতে চাইছো যে আমি বেকার,অকর্মণ্য,অপদার্থ?”

“যদি বোঝাতে চেয়েও থাকি ভুল তো কিছু বলিনি।আমি সেলফ ডিপেন্ডেন্ট,জব করি,মাসে ভালো ইনকাম করি আর সেখানে তুমি অন্যের উপর নির্ভরশীল।তাহলে তোমাকে এগুলো বোঝাতে চাওয়া তো ভুল না তাই না?”

“তন্ময়ের সাথে সম্পর্কে জড়ানোর আগে জানতে না যে ও বিবাহিত?”

“জানতাম।”

“তারপরেও ওর সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়াতে একটুও বিবেকে বাঁধলো না?”

“না।”

“সত্যি?কখনো কি মনে হয়নি যে অন্যায় করছো? কখনো এটা মনে হয়নি যে একজনের সংসার ভেঙে আদৌ নিজের সুখের সংসার করতে পারবে কিনা?”

“আমায় দোষারোপ করছো কেন?আগে এই কথাগুলো নিজের স্বামীকে বলো।তন্ময়ের ভাবা উচিত ছিল না কি যে ওর বউ আছে,সংসার আছে অন্য মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়ানো উচিত হবে না?”

“জানো তন্ময় ভীষণ ভালোবাসতো আমায়।আমাদের দুজনের ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল,পালিয়ে বিয়ে করেছিলাম।”

জেসির মুখ দেখে মনে হলো যেন ভীষণ কৌতুকপূর্ণ কোন কথা বলে ফেলেছে মিলি।ঠাট্টার ছলে বললো,

“সিরিয়াসলি?ও তোমায় ভালোবাসতো?আমার তো সেটা মনে হয়নি কখনো।”

“কেন?”

“তোমাকে যদি ভালোবাসতো তাহলে আমি ওকে এতটা আকর্ষণ কখনো করতে পারতাম না।ও আমাকে ছোঁয়ার জন্য এতটা ব্যাকুল হত না।"

“তোমাদের মধ্যে সম্পর্ক কত দুর এগিয়েছে?”

মিলির চোখে মুখে এক অন্যরকম যন্ত্রণা ফুটে উঠল।এই প্রশ্নের উত্তরটা কি শুনতে হবে সেটা ভাবতেই বুক কেঁপে উঠছে।

“পরশু সারাদিন ও কোথায় ছিল জানো?বাড়ি ফিরতে অত দেরি হয়েছিল কেন জানতে চেয়েছিলে একবারও?”

“আমি জানতে চাইলেও ও বলে না।তোমার সাথে ছিল?তারমানে আমি যেটা ভাবছি..”

জেসি হালকা হেসে বলল,

“চিন্তা করো না।তুমি যতদূর ভাবছো ততদূর এখনো যাইনি।বলতে পারো আমি এগোতে দেইনি।পরশু ওর ইচ্ছে ছিল আমার সাথে রাত কাটানোর।কেন কাটাতে চেয়েছিল সেটাও নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো?”

মিলি বুকে পাথর চাপা দিয়ে নিজেকে সংযত করলো।কাঁদলে চলবে না।এখনো যে ওকে অনেক কিছু শুনতে হবে।

“তারপর?”

“তারপর আর কি আমি থাকতে দেইনি।আমার থেকে যদি একটু পজেটিভ সাইন পেত তাহলে এতদিনে আমাদের সম্পর্কটা আসলেই অনেকটা দূরে এগিয়ে যেত।কিন্তু আমি তো এতটা বোকা না যে বিয়ে না করে ওর সাথে শারীরিক সম্পর্কে জড়াবো।দেখেছো দোষটা কিন্তু তোমার স্বামীর অথচ তাও তুমি আমায় দোষারোপ করছো।”

“আমি তো একবারও বলিনি যে তন্ময়ের দোষ নেই।ও সবথেকে বড় দোষী কিন্তু ওকে আস্কারা দিয়েছো তুমি।তন্ময়ের উপর সব দোষ চাপিয়ে নিজেকে যে নির্দোষ প্রমাণ করতে চাইছো এটা কিন্তু ঠিক না।তুমিও সমান দোষী।”

“দেখো মিলি আমি বলব তন্ময় তোমার কখনোই ছিলই না।ও যদি তোমার থাকতো তাহলে কখনো আমার কাছে আসতো না।জিজ্ঞেস করে দেখোতো ওকে আমি আগে ভালোবাসার কথা বলেছি নাকি ও আগে বলেছে?আগে আমি ওকে বলেছি যে আমার ওকে দরকার নাকি ও আগে এসে আমাকে বলেছে ওর আমায় দরকার?আমাকে ও নিজের অসহায়ত্বের কথা বলেছে,তোমার সাথে ঠিক কতটা অসুখি সেসব কথা বলেছে।”

“কি বলেছে তোমায় জানতে পারি কি?”

“এটাই যে তোমার সাথে আর থাকতে চায় না।তোমার প্রতি ওর আর ভালোবাসা নেই।ভালোবেসে বিয়ে করেছিল কিন্তু এখন নাকি আর ভালোবাসা নেই।তোমার প্রতি ভালোবাসা আসেনা।ওর একটা নির্ভরযোগ্য বিশ্বস্ত কাঁধ চাই,ওর মনের মতন একটা সঙ্গী কে চায় যেটা ও আমার মাঝে খুঁজে পেয়েছে।আমি শুধু সঙ্গ দিয়েছি।”

জেসির বলা কথাগুলো মিলির বুকে বি/ষাক্ত তীরের ন্যয় বিধলো।দিনের পর দিন তবে তন্ময় জেসির কাছে নিজের জীবনের মিথ্যে অসুখী হওয়ার গল্প শুনিয়েছে।এই যে মিলি ওকে সারাদিন সুখে রাখার জন্য এত খাটাখাটনি করতো সে সব তবে বৃথা?মিলি কে চুপ করে থাকতে দেখে জেসি পুনরায় বলে উঠলো,

“তন্ময়ের যেমন আমাকে দরকার ছিল তেমন আমারও তন্ময়ের মতন একটা ভরসা যোগ্য মানুষকে খুব দরকার ছিল।ছোটবেলা থেকে অনেক কষ্ট করে আমি আজ এই জায়গায় এসে পৌঁছেছি।আমার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য আমার তন্ময় কে ঠিক মনে হয়েছে।ও নিজের জীবনের অভাব গুলো আমার দ্বারা পূরণ করতে পেরেছে,আমি আমার অভাবগুলো ওর দ্বারা পূরণ করতে পেরেছি।”

“যাকে আজ শক্ত খুটি ভাবছো ভবিষ্যতে সেই খুঁটিটা যদি নড়বড়ে হয়ে যায়,যদি ভেঙে যায় তখন কি করবে?”

জেসি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,

“ভাঙবে না।তন্ময়ের ওপর বিশ্বাস আছে আমার।”

মিলি শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“তুমি তো বড্ড বোকা মেয়ে।তোমার মতন পড়াশোনা জানা,উচ্চশিক্ষিত,চাকরি বাকরি করা আধুনিক একটা মেয়ের থেকে এমন বোকা কথা আমি সত্যি আশা করিনি।যে আমায় ছেড়ে তার নিজের প্রয়োজনে তোমার কাছে যেতে পেরেছে সে তোমায় ছেড়ে তার নিজের প্রয়োজনে আবার অন্য কারো কাছেও যেতে পারে।তুমি কি ভেবেছো তুমি ওর জীবনে স্থায়ী হবে?কখনোই না।শোনো জেসি তন্ময়ের মতন পুরুষ কে বিশ্বাস করা যায় না।ও নারী নেশায় ডুবে গেছে।ও এখন এক নারী তে কখনোই সন্তুষ্ট থাকবে না।”

“ভয় দেখাতে চাইছো আমায়?যেন আমি ওর জীবন থেকে সরে যাই আর তুমি সেখানে আবার নিজের জায়গা করে নিতে পারো?অবশ্য তন্ময়ের মতো ছেলেকে কেউ হাতছাড়া করতে চাইবে না।তোমার তো আবার নিজের কোন ঠিক ঠিকানাও নেই।”

“তন্ময় বোধহয় তোমায় আমার ব্যাপারে কিছু বলেনি তাই না?”

“কি বলবে?”

“ওকে বিয়ে করার আগে আমার জীবনের ব্যাপারে?”

“বিশেষ কিছু ছিল নাকি বলার মত?”

বিজ্ঞাপন

“ছিল তো।অনেক কিছু ছিল।জানো আমি আমার বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে।আমরা দুই ভাই বোন।আমি আর আমার বড় ভাই আছে।আমার ছোটবেলা থেকে ইচ্ছে ছিল বিদেশে পড়াশোনা করার।কলেজ শেষ করে আমি বিদেশে চলে যেতাম কিন্তু যাইনি তন্ময়ের জন্য।জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি।প্রচুর বিয়ের সম্বন্ধ এসেছিল।ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ার,কোন কোন ছেলে বিদেশ কিংবা দেশেই তার বিরাট বড় ব্যবসা আছে,টাকা পয়সার কোন অভাব নেই,দেখতে শুনতেও মাশাআল্লাহ কিন্তু আমি তাদের সবাইকে ফেলে রেখে বেকার,সাধারণ তন্ময়ের হাত ধরেছিলাম।মাহবুব চৌধুরীর নাম শুনেছো কখনো?”

জেসি একটু মনে করার চেষ্টা করে বলল,

“শুনেছি বোধহয়।এমএম কোম্পানির সিইও।ওই কোম্পানির সাথে কিছুদিন আগে আমাদের কোম্পানির একটা ডিল হয়েছে।”

“উনি আমার ভাই।”

জেসি বিস্ময় ভরা গলায় বলল,

“তোমার নিজের ভাই?”

“হ্যাঁ।”

“তো তোমাদের কোম্পানি থাকতে তন্ময় তাহলে এই কোম্পানিতে কাজ করে কেন?”

“যোগ্যতা নেই তাই।”

“মানে?”

“মানে হলো আমার ভাইয়া ঠিকই বলেছিল তন্ময়ের ব্যাপারে।আমাদের বিয়েটা আজও আমার পরিবার মেনে নেয়নি।তন্ময় কে আমার পরিবারের কেউ পছন্দ করত না।আমার ভাইয়া আমায় বলেছিল যে একদিন ও আমার হাতটা ছেড়ে দেবে,কেন বলেছিল জানিনা।ওই দিন আমি ভাইয়ার সাথে প্রচন্ড খারাপ ব্যবহার করেছিলাম।কখনো আমি আমার ভাইয়ার মুখের উপর একটা উত্তর দেইনি সেখানে সেদিন আমি কতই না অপমান করেছিলাম আমার ভাইয়া কে।আর আজ বুঝতে পারছি আমার ভাইয়া ঠিক ছিল।”

“তার মানে তুমি চৌধুরী বাড়ির মেয়ে?”

“হ্যাঁ।মুসতারিন চৌধুরী,ডাক নাম মিলি।চৌধুরী বাড়ির একমাত্র মেয়ে।”

জেসি অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“আই কান্ট বিলিভ দিস!তুমি আমায় মিথ্যে বলছো তাই না?”

“তোমাকে বিশ্বাস যে আমার করাতেই হবে এমন কোন কথা নেই।পারলে তন্ময়কে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারো ও ঠিক উত্তর দিয়ে দেবে।”

জেসি ভাবনার জগতে নিমগ্ন হল।তার মাথায় একটা কথা কোনমতেই আসছে না যে মিলি এত বড় বাড়ির মেয়ে হয়ে তন্ময়ের মতন একটা সাধারণ চাকরি করা ছেলের সাথে কি করে বিয়ে করতে পারে?ও চাইলে অনেক ভালো বিয়ে হতে পারতো।মিলির জায়গায় জেসি থাকলে কখনোই এই ভুল করত না।জেসি কে ভাবনার মাঝে ডুবে থাকতে দেখে মিলি বলে উঠলো,

“জানো তো জেসি আমি খুব করে চাইবো আজ যেমন তুমি আমার সংসার ভাঙলে তেমনি কোন একদিন যেন কেউ তোমার সংসারও ভাঙে।সাথে আমি এটাও চাইবো আজ যেমন তন্ময় আমাকে ঠকালো কোন একদিন যেন কেউ ওকেও ঠকায়।যে বা যারা আমার সংসার ভেঙেছে,আমার থেকে আমার ভালোবাসা কেড়ে নিয়েছে,আমার সন্তানকে তার বাবার থেকে দূরে করেছে আমি মন থেকে চাইবো তাদেরকে যেন আমার আল্লাহ সব থেকে কঠিন শাস্তি দেয়।এই দুনিয়ায় করা পাপের শাস্তি যেন তারা এই দুনিয়াতেই ভোগ করে।আরেকটা কথা,আমি তোমার আর তন্ময়ের জন্য একটা ব্যাপারে মন থেকে দোয়া করবো।”

জেসি কপাল কুঁচকে বলল,

“কি ব্যাপারে?”

মিলি আলতো হেসে বলল,

“আমি যা ভেবে রেখেছি তোমাদের জন্য সেসব সহ্য করার ক্ষমতা যেন আল্লাহ তোমাদের দেন।”

_________

কফি শপ থেকে বেরিয়ে বাড়িতে ফিরতে ইচ্ছে করলো না মিলির।বাড়িতে এখন দম বন্ধ লাগে।পুরনো স্মৃতিগুলো যখন মস্তিষ্কে উঁকি দেয় তখনই বাঁচার ইচ্ছেটা হারিয়েে ফেলে।তবে মিলি কে তো হারলে চলবে না।

ব্যস্ত শহরে ফুটপাত ধরে হাঁটা দিল।কখনো একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিল কখনো আবার ফুটপাতের ওপরেই বসে পড়লো।মাথায় অনেকক্ষণ থেকে একটা কথা আসছে।বারবার ভাবছে সেখানে যাবে কি যাবে না।তন্ময় কে ছাড়ার পর মিলি কে তো নিজের একটা থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।না হলে কোথায় যাবে?মিলির একটা নিরাপদ জায়গা দরকার।এই সমাজে তো মেয়েরা নিরাপদ নয়।একটা মেয়ে একাকি বাইরে রাত কাটাবে সেটা সম্ভব না।

মিলির শরীরটা এখন ভীষণ খারাপ লাগছে।একেই তো গরম তার ওপরে সারাদিন না খাওয়া।মাথাটা ভীষণ ব্যথা করছে। হাঁটতে হাঁটতে একটা বিশাল ভবনের সামনে এসে দাঁড়ালো।একটা সময় এই জায়গা নিয়মিত যাতায়াত ছিল মিলির।

ভবনের সামনের বিশাল সাইনবোর্ডে সোনালি অক্ষরে লেখা “এমএম গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ”।তার

নিচে ছোট অক্ষরে লেখা,“Since 1993”.

বড় বড় গ্লাসের দেয়ালের মাঝে নামটা ঝলমল করছে।মিলি হাসলো।এখনো তবে তার নাম এখানে উল্লেখ করা আছে।তবে কেন যেন ভেতরে যাওয়ার সাহস হচ্ছে না।যাদেরকে এক সময় নিজে ছেড়ে চলে এসেছিল,অপমান করেছিল তন্ময়ের জন্য আজ আবার তাদের কাছে গিয়ে সাহায্য চাইবে?ব্যাপারটা মিলির কাছে হাস্যকর মনে হলো।মানুষ সত্যি স্বার্থপর। নিজের প্রয়োজনে মানুষ সব করতে পারে,নিজের স্বার্থের জন্য মানুষ সব করতে পারে।মিলি শুধু তন্ময় কে স্বার্থপর বলছে অথচ মিলিও সেই একই স্বার্থপরের মতন কাজ করছে।যে ভাই কে এত অপমানজনক কথা বলে এসেছিল,যেই বাবা-মায়ের চোখের জলের মূল্য দিতে পারেনি আজকে সেখানে আবার এসেছে সাহায্যের জন্য।মিলি পারলো না ভিতরে যেতে।ভীষণ আত্মসম্মানে বাঁধছে।যে পথ দিয়ে এসেছিল সেই পথ দিয়ে আবার ফিরে যেতে নিলে পিছন থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।কণ্ঠটা মিলির পরিচিতি সেটা বেশ ভালোই বুঝতে পারলো।অনেকদিন হলো শোনে না জন্য ঠিক চিনতে পারলো না কার কন্ঠ।পিছন ফিরে তাকাতেই এক বয়স্ক পুরুষালী মুখ দেখতে পেল।মিলি চিনতে পারলো।আজ অনেকগুলো বছর পর আবার এই মুখটা দেখতেই মুখে হাসি ফুটে উঠল।আলতো হেসে বলল,

“কেমন আছো চাচা?”

বৃদ্ধ লোকটা মিলির প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেন না। তার আগে শব্দ করে কেঁদে উঠলেন।

মিলি জানে মানুষটা কেন কাঁদছে।ছোটবেলা থেকে ভীষণ আদর করেছে এই মানুষটা।নিজের মেয়ের মতো ভালোবেসেছে।যেকোনো দরকারে কিংবা প্রয়োজনে,বিপদে-আপদে সব সময় মিলি এই মানুষটাকে কাছে পেয়েছে।সেই পিতৃসম মানুষটার সাথে আজ অনেকগুলো বছর হলো দেখা,সাক্ষাৎ,কথা কিছু হয় না।কাঁদবে এটাই স্বাভাবিক।মিলি এগিয়ে এসে অপরাধী গলায় বলল,

“আমায় ক্ষমা করে দিও চাচা।তোমার ভালো মেয়ে হয়ে উঠতে পারিনি আমি।”

বয়স্ক লোকটা উদ্বিগ্ন গলায় বললেন,

“না মা ক্ষমা চাইয়ো না।তুমি তো আমার আম্মা।তুমি যতই ভুল করো না কেন তাও আমার কাছ থেইকা তুমি এমনি ক্ষমা পাইয়া যাইবা।”

“না চাচা আমায় ক্ষমা করো না এত সহজে।আমি ক্ষমা পাওয়ার যোগ্যই না।”

“এইসব কইওনা।তুমি বাইরে দাঁড়াইয়া আছো কেন?ভেতরে চলো।মাহবুব বাবা অফিসে আছে।”

“আমি যাব না চাচা।”

“যাবা না কেন?”

“আমি কি ভাইয়ার সাথে কথা বলার মুখ রেখেছি? কোন মুখ নিয়ে ভাইয়ার সামনে দাঁড়াবো বলো?”

“এমন কয় না মা।তুমি হয়তো জানো না কিন্তু আজও ওই বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ তোমার কথা মনে করে। তোমার আম্মা আজও তোমার কথা মনে কইরা কান্দে,তোমার ভাই আজও তোমার জন্মদিন পালন করে।কেউ তোমারে ভোলে নাই।”

“আর বাবা?বাবা মনে করেনা?”

এ পর্যায়ে ভদ্রলোক থেমে গেলেন।এই প্রশ্নের উত্তরটা তিনি মিলিকে দিতে পারবেন না।মেয়েটা যে তাহলে আরো কষ্ট পাবে।ওনার নিরবতাই মিলির সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিল।মিলি নিজের উপরে তাচ্ছিল্য হাসলো।মিলির তো এসব আশা করাই ভুল যে ওর বাবা এখনো ওর কথা মনে করে কষ্ট পাবে।তবে হ্যাঁ বাড়ির অন্যদের কথা শুনে ভীষণ ভালো লাগলো।নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো মিলির।মানুষগুলো কে এত কষ্ট দেয়ার পরেও তাকে এখনো নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে।মিলি তাদের সাথে যে অন্যায়টা করেছিল বিনিময়ে কষ্ট পাবে এটাই তো স্বাভাবিক।বাবা মাকে কষ্ট দিয়ে কোন সন্তানই হয়তো ভালো থাকতে পারে না।

“তুমি সত্যি বলছো চাচা মা,ভাইয়া এখনো আমায় মনে করে?”

“তোমার বিশ্বাস হইতেছে না?খাড়াও আমি কল করতেছি মাহবুব বাবারে।”

ভদ্রলোক একটু দূরে গিয়ে কলটা করলেন।তিনি যতই মিলি কে আশ্বস্ত করুক না কেন চিন্তা তো তার নিজেরও হচ্ছে।হ্যাঁ হয়ত ক্ষমা করবে ঠিকই তবে মনের মাঝে তো একটু রাগ নিশ্চয়ই আছে।আর মিলিকে দেখে ওর মন মানসিকতার যে অবস্থা মনে হচ্ছে তাতে এতটুকু রাগও মিলি সহ্য করতে পারবে না,চলেই যাবে দেখা না করে।

ভদ্রলোক মাহবুবের নাম্বারে কল করল।কয়েকবার কল করার পর মাহবুব কলটা রিসিভ করে সালাম দিল।ভদ্রলোক সালামের জবাব দিয়ে ইতস্তত গলায় বললেন,

“বাবা তোমারে একখান কথা কওনের ছিল।রাগ কইরো না কেমন?”

মাহবুব আশ্বস্ত করে বলল,

“কি যে বলো না চাচা।তোমার কথায় রাগ করবো কেন?কি হয়েছে বলো?”

“মিলি মা আইছে।”

ফোনের অপর পাশ থেকে কোন উত্তর এলো না। ভদ্রলোক একটু ভয় পেলেন।মাহবুবের উত্তর না দেওয়ার কারণ হিসেবে নিজেই নিজেকে বোঝালেন যে হয়তো শুনতে পায়নি।তাই তিনি পুনরায় বললেন,

“মিলি মা আইছে বাবা।বাইরে খাড়াইয়া আছে।”

অপর পাশ থেকে মাহবুবের গম্ভীর গলার স্বর ভেসে এলে,

“কে মিলি?আর যদি অফিসের বাইরে এসেও থাকে আমি কি করবো চাচা?”

ভদ্রলোকের মুখটা ছোট হয়ে গেল।মাহবুবের কন্ঠে রাগ প্রকাশ পাচ্ছে।ভয়ে ভয়ে পুনরায় বললেন,

“তোমার লগে দেখা করবার আইছে বাবা।”

“এপয়েন্টমেন্ট নিয়েছে কি?তুমি তো জানো চাচা আমি এপয়েন্টমেন্ট ছাড়া কারো সাথে দেখা করি না।আর তাছাড়া সবার আগে ওনাকে জিজ্ঞেস করো যে ওনার আমার সাথে কি দরকার?”

“এমন কইরো না বাবা।মাইয়াডার চেহারা দেখে মনে হইতাছে শরীর ভালো না,কান্তাছে।নিজের ভুল বুঝতে পারছে ওরে ক্ষমা কইরা দাও।”

“সব ভুলের ক্ষমা হয় না চাচা।ও ওই দুই দিনের ছেলের জন্য ওর বাবা,মা,ভাই পুরো পরিবারকে ত্যাগ করেছে।ও নিজের ইচ্ছেয় গেছে।ওর আমাদেরকে কোন প্রয়োজন ছিল না জন্যই তো চলে গিয়েছিল তাহলে আজ আবার কেন এসেছে ওকে আগে সেটা জিজ্ঞেস করো?আগে ওকে গিয়ে জিজ্ঞেস করো যদি আমাদের কাছে ফেরারই ছিল তাহলে আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিল কেন?আর যখন চলে গিয়েছিল তাহলে আজ আবার ফিরতে চাইছে কেন?”

বেশ জোরেই একটা শব্দ ভদ্রলোকের কানে গেল। পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলেন মিলি মাটিতে পড়ে আছে।বোধহয় জ্ঞান হারিয়েছে।ভদ্রলোক চিৎকার করে উঠে মাহবুবকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“বাবা মিলি মা জ্ঞান হারাইয়া ফেলছে।মাটিত পইরা গেছে।”

মাহবুব বোধ হয় কথাটা পরিস্কার ঠিক বুঝতে পারলো না।প্রশ্ন করলো,

“কি হয়েছে চাচা?”

মিলির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে কি ক্রন্দনরত কন্ঠে বললেন,

“মিলি মা জ্ঞান হারাইয়া পইড়া গেছে।জলদি নিচে আইসো।আমি তোমারে কইতাছিলাম মাইয়াডার শরীর আমার ভালো লাগতেছে না।ওর চোখ-মুখ ডাইবা গেছে,খালি ঘামতেছিলো।”

মাহবুব আর কোন কিছু শোনার প্রয়োজন মনে করলো না।কোনো অভিমানে কিংবা রাগ কিছুই আর তাকে বাঁধা দিতে পারলো না।তার কানে শুধু একটা কথাই ভাসছে আর সেটা হলো মিলি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেছে।যে বোন কে মাটিতে পা ফেলতে দেয়নি সেই বোন আজ জ্ঞান হারিয়ে ধুলো মাখানো রাস্তায় পড়ে আছে।মাহবুব আর কিচ্ছু ভাবতে পারলো না।ফোনটা হাতে নিয়েই ছুটে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো।লিফট এর জন্য অপেক্ষা করতে পারল না,সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো।আশেপাশে ততক্ষণে লোকজন জমে গেছে।অফিসের কিছু লোকজনও বাইরে এত চেঁচামেচির আওয়াজ পেয়ে চলে এসেছে।চৌধুরী বাড়ির একমাত্র মেয়েকে তারা অনেকেই চেনেন।তবে অনেকদিন পরে দেখলেন কিন্তু ঘটনা জানেন না।কেউ কেউ আবার ঘটনা জানেন।যারা জানেনা তারা মিলির এমন বেহাল দশা দেখে বেশ অবাক হলেন।মাহবুব ভিড় ঠেলে তাড়াহুড়ো করে বোনের কাছে এসে বসলো।তার চোখে মুখে সে কি আতঙ্ক,সে কি চিন্তা।

একেই বোধহয় বলে র/ক্ত।যতই অভিমান থাকুক না কেন প্রয়োজনের সময় ঠিক চলে আসে।মাহবুব দেখলো মিলির হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে।আগে মিলির হাতে পালস চেক করলো।তারপরে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়ে তাড়াহুড়ো কন্ঠে ভদ্রলোকের উদ্দেশ্য করে বলল,

“চাচা তাড়াতাড়ি গাড়ি বের করো,ওকে হসপিটাল নিয়ে যেতে হবে।”

ভদ্রলোক আর কোনো দেরি না করে ছুটে গেলেন গাড়ি বের করতে।মাহবুব বোনকে কোলে উঠিয়ে গাড়িতে চড়ে বসলো।

বিজ্ঞাপন
রিক্ত বসন্ত গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস