রিক্ত বসন্ত

পর্ব - ১০

🟢

“জেসির বাড়িতে কেন গিয়েছিলে তুমি?”

মিলি তখন রান্নাঘরে এটো থালাবাসনগুলো মাজছে।তন্ময়ের প্রশ্নটা ওর কানে গেল ঠিকই তবে উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করল না।চুপচাপ নিজের কাজে মনোযোগ দিলো যা তন্ময়ের রাগ আরো কয়েক গুণ বাড়িয়ে তুলল।হিংস্র কন্ঠে বলল,

“কেন গিয়েছিলে জেসির বাড়িতে তুমি বলো?তোমাকে তো বলেছি তোমার টাকা দিয়ে দেব তারপরও অযথা আমার জীবনে কেন অশান্তি তৈরি করছো?কি ভেবেছো এসব করলে আমি তোমাকে আমার জীবনে রেখে দেবো?তুমি ভেবেছো জেসি আমার জীবন থেকে চলে যাবে তারপর আমি আবার তোমাকে মেনে নিয়ে সংসার করবো?অসম্ভব!তোমার সাথে এক সেকেন্ডও থাকা যায়না মিলি।”

কাজের হাতটা এবারে থেমে গেল মিলির।হাতটা ধুঁয়ে শাড়ির আঁচলে মুছতে মুছতে পিছন ফিরে তাকিয়ে তন্ময় কে উদ্দেশ্য করে ঠান্ডা গলায় বলল,

“তোমার কি মনে হয় তন্ময় তুমি কি কোন অন্যায় করেছো জেসির সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে?”

তন্ময় জোর গলায় বলল,

“অন্যায় কেন করতে যাব?যদি তোমাকে ভালোবাসাটা অন্যায় না হয়ে থাকে তবে জেসিকেও ভালোবাসাটা অন্যায় না।অন্যায় তো তুমি করছো আমার আর জেসির ভালোবাসার মাঝে নাক গলিয়ে।”

“যদি কোন অন্যায় করে নাই থাকো তাহলে আমি যার কাছে গিয়ে যাই বলে থাকি না কেন তাতে এতটা রিয়্যাক্ট করছো কেন?যে যা ইচ্ছে বলুক না কেন তুমি তো জানো তুমি কোন অন্যায় করোনি তাহলে এত রেগে যাচ্ছ কেন?আর যে বা যারা আমার কথা শুনে তোমার ওপর অপবাদ দিচ্ছে তাদেরকে জোর গলায় এই কথাটা বলো যে তুমি কোনো অন্যায় করোনি।ঘরে নিজের স্ত্রীকে রেখে অন্য একটা মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে কোন অন্যায় করোনি তুমি তাহলেই তো হয়ে যায়।”

রাগে তন্ময়ের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।তবে কেন যেন কোনো উত্তর দিতে পারল না মিলির কথার।তন্ময় তো কোন অন্যায় করেনি তবে কেন জবাবটা দিতে পারলা না?হয়তো ভেতর ভেতর তন্ময় নিজেও বুঝছে যে ও খুব বড় একটা পাপ করে ফেলেছে।তন্ময় কে চুপ করে থাকতে দেখে মিলি পুনরায় বলে উঠলো,

“তুমি নিজেও খুব ভালো করেই জানো যে তুমি কত বড় আর নিকৃষ্ট একটা পাপি।কি ভেবেছো ঘরে বউ রেখে বাইরে সম্পর্ক চালিয়ে তুমি পুরুষত্বের পরিচয় দিয়েছো?নিজের বউকে ডিভোর্স দিয়ে প্রেমিকাকে বিয়ে করবে বলে আশ্বস্ত করায় পুরুষত্বের পরিচয় দিয়েছো তুমি?এসব তোমার ভুল ধারণা।তুমি হলে একটা কাপুরুষ।তোমার না আছে কোন ব্যক্তিত্ব,না আছে লজ্জাবোধ,না আছে তোমার মেরুদণ্ড।তোমার শিরদাঁড়া ভেঙে গেছে অনেক আগেই।তোমাকে পুরুষ বলতেও তো আমার লজ্জা হয় এখন।ই/তর কোথাকার।”

তন্ময় সাবধানী গলায় বলল,

“এবার কিন্তু তুমি সত্যিই বেশি বলে ফেলছো মিলি।আমি কিন্তু নিজের রাগের উপরে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না।”

“ভয় দেখাচ্ছো নাকি আমায়?কি করবে?গায়ে হাত তুলবে?”

“একটা কথা মনে রেখো,রাগের মাথায় কিন্তু কারো খু/ন করতেও কারো হাত কাঁপে না।তাই তোমাকে বলছি আমি রেগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলি তার আগে চুপ করে যাও।”

মিলি হাসলো।কি অদ্ভুত ব্যাপার!একদিন যে বলতো মিলিকে ছাড়া বাঁচবেনা আজকে সেই মিলি কে খু/ন করার হুমকি দিচ্ছে।মিলির প্রতি এতটাই বিরক্তি আর ঘৃণা জমেছে যে সে নাকি রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে খু/নও করে ফেলতে পারে।আবার তার নাকি হাতও কাঁপবে না।মিলি আলতো হেসে বলল,

“আমায় যদি তোমার এই রূপটা না দেখিয়ে মে/রে ফেলতে তাহলেই বোধহয় বেশি ভালো হতো।তোমার চোখে আমার জন্য ঘৃণা,বিরক্তি দেখার থেকে তোমার হাতে ম/রণ ভালো ছিল।তবুও এই কথাটা ভেবে ম/রতে পারতাম যে আমার তন্ময় এখনো আমায় ভালোবাসে।তবুও আমি জানতাম যে তুমি শুধু আমার।”

“এসব কথা আর বলো না প্লিজ।আমার ভালো লাগে নাই এই একই কথা বারবার শুনতে।তুমি কেন বুঝতে পারছ না বলোতো আমাদের মাঝে আর কিছু অবশিষ্ট নেই।আমি আর ভালোবাসতে পারিনা তোমায়।তোমায় দেখে এখন আমার রাগ হয়,আমার বিরক্ত লাগে।”

মিলি চেঁচিয়ে উঠে বলল,

“জা/নো/য়ার কোথাকার বিয়ের আগে এসব মনে ছিল না?বিয়ের আগে তাহলে আমার নাম সারাদিন জপ করতি কেন?আমার ভাবতেই গা গুলিয়ে ওঠে যে তোর মতন একটা শয়/তান আমায় স্পর্শ করেছে।তুই তো মানুষই না রে।ঘরে বউ রেখে অন্য মেয়ের শরীরের গন্ধের পিছনে কুকুরের মতন ছুটে গিয়েছিস।অমানুষ, চরিত্রহীন,ল/ম্পট একটা।”

তন্ময় বোধহয় এবার সত্যি রাগে নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।মিলির দিকে তেড়ে আসতে নিলে মিলি হাতের কাছে থাকা একটা কাচের গ্লাস উঠিয়ে তন্ময়ের দিকে ছুঁড়ে মারলো।গ্লাসটা সোজা গিয়ে তন্ময়ের কপালে লাগলো।মুহূর্তের মাঝে কপাল ফেটে র/ক্ত বের হলো।তন্ময় ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলো।মিলি নিজেও বুঝে উঠতে পারলো না ও কি করলো।জ্ঞানে থাকলে কখনোই তন্ময় কে এভাবে আঘাত করত না।তবে হয়তো নিজেকে বাঁচানোর জন্যই এই পন্থা অবলম্বন করেছে।মিলি নিজের মধ্যে ছিল না।কিন্তু যখন তন্ময়ের কপালে র/ক্ত দেখলো ভিতরটা আঁৎকে উঠলো।এগিয়ে যেতে নিলে তন্ময় হাত দিয়ে ওকে বাঁধা দিল।অগ্নিদৃষ্টিতে মিলির দিকে তাকিয়ে বলল,

“কাজটা তুমি ঠিক করলে না মিলি।অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি শুরু করে দিয়েছো তুমি।দশ দিন সময় দিয়েছিলে না?তোমাকে আমার পক্ষে দশ দিনও সহ্য করা সম্ভব না।খুব তাড়াতাড়ি তোমার টাকা ফিরিয়ে দিয়ে আমার জীবন থেকে তোমায় দূর করে দেব।”

কথাটা বলে তন্ময় সেখান থেকে চলে গেল।মিলি ধপ করে মেঝের ওপর বসে পড়ল।ডুকরে কেঁদে উঠলো।নিজের ওপরেই নিজের ভীষণ রাগ উঠলো।তাই বলে কি করে রাগের মাথায় এভাবে তন্ময় কে আঘাত করলো যে র/ক্ত বের হলো?

_______

সময়টা তখন মাঝরাত।তন্ময় মিলির সাথে ঘুমোয় না এখন আর,অন্য ঘরে ঘুমোয়।দরজাটা খোলাই রেখেছিল।মিলি চুপি চুপি পাশের ঘরে এলো।তন্ময় তখন বোঘোরে ঘুমোচ্ছে।মিলি জানে তন্ময় খুব সহজে ঘুম থেকে জাগেনা।টুকটাক শব্দতে তো মোটেই না।তার মাঝে মিলি দেখেছে আজকে আবার ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছে।একটু জোরে শব্দ হলেও জাগা পাবে না বোধহয়।

মিলি চুপচাপ গিয়ে মেঝের উপরে বসলো।মাথায় ব্যান্ডেজ করা তন্ময়ের।আলতো করে সেখানে হাত বুলিয়ে দিল।খুবই আলতো করে যেন বিন্দুমাত্র আঁচ তন্ময় না পায়।বেশ কিছুক্ষণ তন্ময়ের ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকলো।সেই একই চেহারা,সেই একই মানুষ যে এক সময় মিলিকে পাগলের মতন ভালোবাসতো।মানুষটা বদলায়নি কিন্তু ভালোবাসাটা বদলে গেছে।দেখলে বোঝাই যায় না যে এই মানুষটা আর আগের মতন নেই।এইতো সেই একই মানুষ।এই ঘুমন্ত চেহারা দিকে আগেও মিলি ঘন্টার পর ঘন্টা তাকিয়ে থেকেছে।মাঝে মাঝে ধরাও পড়ে গেছে তন্ময়ের কাছে।মিলিকে চমকে হঠাৎ করে তন্ময় চোখ মেলে তাকিয়ে মিলিকে কাছে টেনে নিয়েছে।আজও তন্ময় ঘুমোচ্ছে।মিলি ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কিন্তু আজ আর তন্ময় ওকে কাছে টেনে নেবে না।চোখ খুলে মিলি কে দেখলে বরং বিরক্ত হবে।হঠাৎ করে মিলির ভীষণ কান্না পেলে।মুখে শাড়ির আঁচল গুঁজে নিজের কান্নাটা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলো। একটুও শব্দ হওয়া যাবে না।না হলে তন্ময় জেগে যাবে।

“আমার ক্ষমা করে দিও তন্ময়।বিশ্বাস করো আমি ইচ্ছে করে তোমায় মা/রিনি।তুমি তো জানো বলো তোমার মিলি তোমায় একটুও আঘাত দিতে পারে না।তুমি আঘাত পেলে আমারও যে কষ্ট হয়।আজ কিভাবে কি মনে করে যে তোমায় আঘাতটা করে ফেললাম আমি নিজেও জানিনা।তবে যখন থেকে দেখেছি তোমার কপাল বেয়ে র/ক্ত পড়ছে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে নিজেকে।আমায় ক্ষমা করে দিও।”

কথাগুলো মনে মনে বলল মিলি।তন্ময়ের কান অব্দি যেন না যায়।মিলি এবার কপাল থেকে হাত নামিয়ে তন্ময়ের গালে হাত রাখলো।এই গালটায় কয়েকদিন আগে মিলি চ/ড় বসিয়েছিল।এর জন্যও ভীষণ অপরাধবোধ হলো।

“তুমি আমার ভালোবাসো বুঝলে না তন্ময়।কতটা আঘাত পেলে আমি তোমায় আঘাত করতে পারি একবার ভাবো তো।তুমি যদি শুধু আমার সাথে অন্যায়টা করতে তাহলে তো আমি তোমায় আঘাত করতাম না কিন্তু তুমি যে আমাদের বাচ্চাটাকে মে/রে ফেলার কথা বললে।তুমি জানো তোমার মিলির মতন তোমায় কেউ ভালোবাসতে পারবে না।কিন্তু তবুও তোমার অন্যের ভালোবাসার দরকার হলো।তুমি জানো তোমার এই হঠাৎ বদলটা আমার কাছে কতটা ভয়ংকর লাগে?তুমি জানো পুরনো দিনগুলোর কথা মনে হলে আমি শিউরে উঠি?সেই আগের তন্ময়ের সাথে এই তন্ময় কে মেলাতে পারিনা।কতদিন হলো তুমি আমায় একটু ভালোবেসে মিলি বলে ডাকো না,একটু কাছে টেনে নাও না,আমার একটু যত্ন করো না।দেখো আমার মাথার চুল গুলো কেমন উষ্ক হয়ে আছে তুমি একটু তেল দিয়ে আর সেগুলো আঁচড়ে দাও না।তুমি এখন আর আমায় তোমার পছন্দের রংয়ের শাড়ি পরতে বলো না।অফিস থেকে ফেরার পথে শখ করে আমার জন্য ফুল আনো না।তোমার এত পরিবর্তন আমি কি করে মেনে নিই?চুপ করে আছো কেন উত্তর দাও?”

নিজের বোকামির উপর মিলির নিজেরই হাসি পেল।তন্ময় উত্তর দেবে কি করে ও তো ঘুমোচ্ছে।

“আমিও বোকা।তুমি তো জেগে থাকা অবস্থাতেই আমার প্রশ্নের উত্তর দাও না,আর এখন তো ঘুমিয়ে আছো।আমি জানি আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিচ্ছি কিন্তু এগুলো দিতে আমি বাধ্য হচ্ছি।তোমাকে যে তোমার কর্মফল ভোগ করাতে হবে।তোমায় তোমার ভুলটা দেখাতে হবে।তোমায় বোঝাতে হবে এই পৃথিবীতে মিলির মতন করে আর তোমায় কেউ ভালোবাসতে পারবে না,কেউ আগলে রাখতে পারবে না তোমাকে।তবে খুব বেশি কষ্ট দেব না।আর খুব বেশিদিন তোমাকে বিরক্তও করব না।তুমি দেখো হঠাৎ করে একদিন চলে যাব আমি।তুমি হাজার খুঁজেও আমায় আর পাবে না।আমি মুক্তি দেবো তোমায়।তোমার খুশির জন্য আমি তোমায় মুক্তি দেবো।”

কথাগুলো বলে মিলি উঠে দাঁড়ালো।তন্ময়ের কপালে আলতা করে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।তন্ময় হালকা নড়েচেড়ে উঠলো।ঘুমটা বোধহয় একটু ভেঙেছে।চোখ খুলে তাকাতেই মনে হলো দরজা দিয়ে কেউ বেরিয়ে গেল।বুঝতে পারল হয়তো মিলি এসেছিল তবে নিশ্চিত হওয়ার আর দরকার নেই।আসলে আসুক তাতে তন্ময়ের কি?এমনিতেও মিলির সাথে এখন আর কথা বলতে ইচ্ছে করে না।পাশ ফিরে আবারো নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে পড়ল।মিলি ঘরে গিয়ে একটা কাগজ আর কলম নিয়ে বসলো।তন্ময়কে তো দেওয়ার মতন আর কিছুই নেই মিলির কাছে,তন্ময় হয়তো আর কিছু গ্রহণও করবে না ওর থেকে।তবে শেষ স্মৃতি হিসেবে এই কাগজের টুকরোটা তন্ময় কে দিয়ে যেতে চায়।শেষবারের মতন মিলি এই কাগজের টুকরোতে তন্ময়ের প্রতি নিজের ভালোবাসার কথাগুলো লিখবে।এই শেষ,আর কখনো বলবে না তন্ময় কে নিজের ভালোবাসার কথা।

_______

“এটা কি স্যার?”

“তুমি নিজে খুলে দেখো।”

জেসি তৌফিকের হাত থেকে খামটা নিয়ে ভেতর থেকে একটা কাগজ বের করে দেখতেই আঁৎকে উঠে বলল,

“এটা কি স্যার?”

“তুমি তো একটা এডুকেটেড মেয়ে।টারমিনেশন লেটার এর মানে বোঝো না?”

“কিন্তু কেন?আমার অপরাধটা কি?”

“লেটারে খুব ভালোভাবে তোমার অপরাধটা মেনশন করা আছে।দায়িত্বে অবহেলা এবং কোম্পানির রুল ব্রেক করার জন্য তোমাকে চাকরি থেকে বের করা হচ্ছে।”

“কিন্তু স্যার আমি দায়িত্বে কি অবহেলা করেছি?আর কোম্পানির কি রুল ব্রেক করেছি?”

“এই যে তোমাকে যে কাজ দেওয়া হয় তুমি সেসব না করে তন্ময়ের সাথে ঘুরে বেড়াও।ঠিকমতো তুমি প্রজেক্ট জমা দিতে পারো না।ক্লায়েন্ট এর সাথে খারাপ ব্যবহার করেছো।আসলে ক্লায়েন্টই তোমার নামে কমপ্লেইন করেছে।”

“আর কোম্পানির রুল?”

“এত কৈফিয়ার দিতে তোমায় আমি বাধ্য না।তোমাকে চাকরি থেকে বের করার সিদ্ধান্ত উপর মহলের।আর ক্লায়েন্টের সাথে খারাপ ব্যবহার করাও কোম্পানির রুলসের বাইরে।”

“এটা কিন্তু ঠিক করলেন না স্যার।আমি জানি আপনি মিলির কথা শুনে আমাকে চাকরি থেকে বের করে দিচ্ছেন।”

“তাহলে একবার ভেবে দেখো,মিলির ক্ষমতা কতটুকু?ওর এক কথাতে আমি তোমাকে চাকরি থেকে বের করে দিচ্ছি।ওর সাথে না লাগলেও পারতে।ওর সামনে তুমি খুবই নগণ্য।”

“আমি আপনার নামে কমপ্লেইন করবো অফিসে।”

“ভুলেও এই কাজটা করতে যেও না।এখন তো শুধু অফিস থেকে বের করেছি কিন্তু যদি তুমি এমন কিছু করো না এমন ব্যবস্থা করবো যেন কোথাও আর চাকরি না পাও।আর আমার কথাটাকে একদমই হালকা ভাবে নেবে না।গেট আউট ফ্রম মাই কেবিন।তোমায় যেন অফিসের ত্রিসীমানাতেও আমি না দেখি।”

“আমায় একা কেন বের করলেন?অপরাধটা তো তন্ময়েরও ছিল।তাহলে ওকেও চাকরি থেকে বের করুন।”

“চিন্তা করো না সব হবে।কিন্তু ওর শাস্তিটা আরেকটু জোড়ালো হবে।এখন বের হও,তোমার মুখ দেখতে আমার বিরক্ত লাগছে।তুমি বের হওয়ার পর পুরো অফিসটাকে আমি পরিষ্কার করতে বলবো।”

রাগে দুঃখে জেসি কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো।কেবিন থেকে বেরোনোর সাথে সাথে বেশ কয়েকজন ওকে ঘিরে ধরল।সবার চোখে মুখে তীব্র উৎকণ্ঠা এতক্ষণ কি কথা হল ভেতরে সেসব জানার জন্য।

তাদেরকে পাশ কাটিয়ে জেসি চলে যেতে চাইলে ফারজানা বলে উঠলো,

বিজ্ঞাপন

“কি হলো জেসি আবার চলে যাচ্ছ কেন?কাজ করবে না?”

“খোঁচা দিচ্ছো আমায় ফারজানা?”

“যেটা তোমার প্রাপ্য সেটাই করছি।চাকরিটা গেল মনে হয় তাই না?”

“তাতে তোমার কি?”

“আমার কিছু না।দেখো চাকরিটা গেলে এবার তন্ময়ও হাত থেকে বেরিয়ে না গেলে হয়।চাকরিটা অনেক কষ্টে জোগাড় করেছিলে,তন্ময় কেও কষ্টেই পটিয়েছিলে।একটা যখন গেল আরেকটা যেতেও বেশিদিন সময় লাগবে না।তোমার জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে।”

লজ্জায় অপমানে কোনো উত্তর দিতে পারল না জেসি।অফিস থেকে বেরিয়ে একটা সিএনজি দাঁড় করিয়ে তন্ময়ের ফ্ল্যাটের ঠিকানা বলল।

________

মাথায় হাত দিয়ে তন্ময় সোফায় বসে আছে।মাথাটা কেমন যেন ভার হয়ে আছে।কেউ একটু মাথাটা টিপে দিলে আরাম পেত।তবে মিলিকে তো এখন বলতেও পারবেনা,আত্মসম্মানে লাগবে।এই মাথাব্যথার থেকেও বেশি যেটা তন্ময়কে কষ্ট দিচ্ছে সেটা হচ্ছে মিলির অমন গা ছাড়া ভাব।সকাল থেকে মিলি নিজেই নিজের মতন যা ইচ্ছে তাই করছে।খাচ্ছে,ঘুরে বেড়াচ্ছে,কখনো আবার জ্যোতির ফ্ল্যাটে যাচ্ছে।তন্ময় কে একবার খাওয়ার কথাটাও বলেনি।টেবিলে খাবারগুলো বেড়েও রাখেনি।তন্ময়ের তো এখন সন্দেহ হচ্ছে আদৌ ওর জন্য রান্না করেছে কিনা।একটু যে মুখ ফুটে চা কিংবা কফি করে দেওয়ার কথা বলবে সেটুকুও বলতে পারছে না।মিলি তো জানে সকালবেলা একটু তন্ময়ের চা খাওয়ার অভ্যাস আছে,করে দিলে কি হত?তন্ময় না হয় একটু রাগ করতো,আবার অপমান করতো তাতে কি?মিলির তো সেসব সহ্য করা উচিত ছিল?

একটু আগে মিলি আবার জ্যোতিদের ফ্ল্যাটে গেছে।এখন রাগ হচ্ছে জ্যোতির উপর।যদি পাশের ফ্ল্যাটে ও না থাকতো তবে মিলি কে সারাদিন এখানেই থাকতে হতো।তন্ময়ের এসব ভাবনার মাঝেই কলিং বেল বেজে উঠল।কেউ পাগলের মত বিরতিহীন ভাবে কলিংবেল বাজাচ্ছে তো বাজাচ্ছেই,থামার নামই নিচ্ছে না।মনে হচ্ছে বাইরে যুদ্ধ লেগেছে,এখনই ভিতরে আসতে না পারলে তার প্রাণ যাবে।তন্ময় যেন নিশ্চিত এটা মিলিই, ওকে বিরক্ত করার জন্য এমন করছে।তন্ময় দমবার পাত্র না।ঝগড়া করার প্রস্তুতি নিয়েই গিয়ে দরজা খুলল তবে সামনে জেসি কে দেখতে পেয়ে বেশ বড়সড় একটা ধাক্কা খেল।চোখ কঁচলে আবার সামনে তাকালো বুঝতে পারছে না যা দেখছে সত্যি নাকি স্বপ্ন।তন্ময়ের সেই স্বপ্ন ভেঙে গেল জেসির কর্কশ কণ্ঠে।

“আমাকে অফিস থেকে বের করে দিয়েছে তন্ময় তোমার বউয়ের জন্য।”

“এ্য?”

“আমাকে চাকরি থেকে বের করে দিয়েছে তোমার বউ কমপ্লেন করেছে জন্য।”

“সত্যি বের করে দিয়েছে?”

“তোমার কি মনে হয় আমি এখন মজা করার মতন পরিস্থিতিতে আছি?”

তন্ময়ের মনে হলো সত্যি তো জেসি সত্যিই এখন মজা করার মতন পরিস্থিতিতে থাকতেই পারে না।এমনিতেও জেসি খুব একটা মজা করে না ওর সাথে।তবে তন্ময়ের হঠাৎ করে মনে হলো যেহেতু জেসির নামে কমপ্লেন করেছিলো তবে নিশ্চয় তন্ময়ের নামেও কমপ্লেন করেছে।আর যেহেতু জেসির চাকরিটা নেই তাহলে মনে হয় তন্ময়ের চাকরিটাও নেই।হায় হায়!এমনটা হলে কি করে হবে?উৎকন্ঠিত গলায় প্রশ্ন করলো,

“আমার চাকরিটাও কি গেছে?”

“না তোমারটা আছে।ওরা শুধু আমাকে চাকরি থেকে বের করে দিয়েছে।আমি এখন কি করবো তন্ময় বলো?”

“আস্তে কথা বলো জেসি।এত চেঁচাচ্ছো কেন?শুনে ফেলবে তো আশেপাশের মানুষ।”

জেসির কন্ঠ একটুও নিচু হলো না বরং পূর্বের তুলনায় আরো দ্বিগুণ চেঁচিয়ে বলল,

“শুনলে শুনবে তো সমস্যা কি?আমার সাথে সম্পর্কে জড়ানোর সময় তোমার মনে ছিল না?তখন ভয় পাওনি মানুষ কি ভাববে,মানুষ কি বলবে এসব ভেবে?এখন এত লজ্জা কিসের?”

“আহা আবার চেঁচায়?লজ্জা করবে কেন?আমি তো বলেছি তোমায় বিয়ে করবো।”

“তো কবে করবে?আমি আর অপেক্ষা করতে পারব না। এক্ষুনি,আজ এক্ষুনি আমায় বিয়ে করবে তুমি।কি করে কি করবে আমি জানিনা।”

এত চেঁচামেচির আওয়াজ শুনে পাশের ফ্ল্যাট থেকে জ্যোতি আর মিলি বেরিয়ে এলো।কন্ঠটা মিলির পরিচিত লেগেছিল জন্য আরো তাড়াহুড়ো করে বেরোলো।জেসিকে দেখতে পেয়ে সন্দেহটা সত্যি প্রমাণিত হলো।মুখে তার গাম্ভীর্য ফুটে উঠলো

“তুমি আমার বাড়িতে কি করছো?”

“ও হ্যালো!এটা তোমার বাড়ি না।এটা তন্ময়ের বাড়ি।আর তন্ময়ের বাড়িতে আমার যখন ইচ্ছে আমি তখন আসতে পারি।তুমি আমাকে আটকানোর কে?নিজে তো এখানে দুদিনের অতিথি।”

“ভদ্রভাবে কথা বলো।তোমাকে এখানে ঢুকতে দিল কে বলোতো?সিকিউরিটি গার্ড কি বলেনি যে বাড়ির ভেতরে জন্তু-জানোয়ারের প্রবেশ নিষেধ?”

জেসি চোখ বড় বড় করে মিলির দিকে তাকালো।

“হোয়াট?আমাকে তোমার জন্তু-জানোয়ার মনে হয়?”

“মোটেই না।তুমি তার থেকেও নিকৃষ্ট প্রাণী সেজন্যই বললাম তোমায় কেন ঢুকতে দিয়েছে।বের হও আমার বাড়ি থেকে।”

জেসি তন্ময় কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোমার সামনে আমায় এভাবে অপমান করছে তন্ময় আর তুমি কিছু বলবে না?তোমার কি কিছুই বলার নেই?”

মিলি ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,

“ও পুরুষ নাকি যে কিছু বলবে?ওর মাঝে তো সৎ সাহসই নেই তোমাকে ভালোবেসেছে সেটা স্বীকার করার।তোমার জন্য আমার ভীষণ মায়া হচ্ছে।কাকে ভালোবাসলে বলোতো?একটা কুলাঙ্গার কে?”

এদিকে চেঁচামেচিতে অনেকেই নিচে নেমে এলো।সবার চোখে মুখে তীব্র উৎকন্ঠা।এই পুরো ফ্ল্যাটের সবথেকে শান্ত ইউনিট মনে হয় তন্ময় আর মিলির। সেখান থেকে আজ এত চেঁচামেচির শব্দ সবাইকে বেশ অবাক করেছে।এদিকে তন্ময় পড়লো মহাবিপাকে।ও জানে জেসি কে এখন সামলানো ভীষণ কঠিন।এদিকে মিলিরও এসব একদম ভালো লাগছে না।তন্ময় কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ওকে থামতে বলো তন্ময়।আর গলার স্বর নামিয়ে কথা বলতে বলো আমার সাথে।”

“তুমিও তো একটু চুপ করতে পারো।যখন দেখছো জেসিও রেগে গেছে তুমি একটু থামো।তা না করে দুজনেই চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে।আশেপাশে মানুষজন দেখছে।তুমি অন্তত আমার সম্মানের কথা একবার ভাবো।”

মিলি চটে গিয়ে বলল,

“আমি কেন ভাবতে যাব?প্রেম করার আগে তোমার এসব মানসম্মানের কথা ভাবা উচিত ছিল না?আর তুমি এখনো কোন লজ্জায় আমাকে বলো যেন আমি তোমার সম্মানের কথা ভাবি?বিন্দুমাত্র লজ্জা তোমার মাঝে নেই তাই না?শেষবারের মতন বলছি ওকে এখান থেকে যেতে বলো না হলে কিন্তু আমি এবার ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেব ওকে।”

মিলির কথা শুনে জেসি রাগী গলায় বলে উঠলো,

“হাউ ডেয়ার ইউ?তোমার সাহস হলো কি করে আমার সম্বন্ধে এভাবে কথা বলার?”

“একদম ঠিক ধরেছ।তোমার মত মেয়ের সম্বন্ধে কিছু বলতে গেলে সাহসই দরকার যেটা আমার আছে।তুমি অপমান করা বোঝো না?মানে মান সম্মান বলতে তোমার কিছু নেই তাই না?সেই থেকে যে আমি তোমায় অপমান করছি,বারবার বলছি বের হয়ে যেতে তাও তোমার কানে কথা যায় না?”

“যাব না।আমি তন্ময়ের সাথে ওর ফ্ল্যাটে থাকবো।কি করবে তুমি?”

মিলি ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বলল,

“সত্যি যাবে না?”

“না,যাব না।”

মিলি এবার জ্যোতি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমার একটা সাহায্য করতে পারবে জ্যোতি?”

“হ্যাঁ।বলো না কি করতে হবে?”

“আসলে এই অবস্থা আমার এত তাড়াহুড়ো করে সিড়ি দিয়ে নামা উচিত হবে না।যদি আবার পড়ে টরে যাই তাহলে সমস্যা হবে।আশা করছি বুঝতে পারছ আমি কি করতে বললাম?”

জ্যোতি মাথা নাড়িয়ে বলল,

“চিন্তা করো না,বুঝে গেছি আমি।”

কথাটা বলে জ্যোতি এগিয়ে এসে জেসির হাত ধরে ওকে টেনে নিচে নিয়ে গেল।অনেক চেষ্টা করলো জেসি জ্যোতির থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য তবে পারলো না।জ্যোতির শক্তির সাথে জেসি পেরে উঠলো না।জ্যোতি টানতে টানতে ওকে নিচে নিয়ে গিয়ে বের করে দিল।জেসি একটুর জন্য বোধ হয় সিড়ির উপরে মুখ থুবড়ে পড়ল না।ওর পিছন পিছন তন্ময়ও গেল।ওরা চলে যেতেই একে একে যে যার ফ্ল্যাটে চলে গেল।মিলি আরো একবার অবাক হলো তন্ময়ের কাজে।নিজের স্ত্রীকে ফেলে রেখে আবারো প্রেমিকার পেছনে ছুটলো।

বিজ্ঞাপন
রিক্ত বসন্ত গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস