“মিলি কি করছো?মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি তোমার?পা/গল হয়ে গেছো তুমি?”
তন্ময়ের কথায় মিলি কোন পাত্তাই দিলোনা।
সে নিজের মতন নিজের কাজ করেই যাচ্ছে।যদিও ওর কাজ শেষের দিকেই বলা চলে।
এদিকে মিলির এমন কান্ডে তন্ময়ের নিজেকে কেমন যেন পা/গল পা/গল লাগছে।চোখের সামনে নিজের এত কষ্ট করে জোগাড় করা টাকাগুলো এভাবে ড্রেনের পানিতে চলে যেতে দেখে বুকটা ব্যথা করছে।পুনরায় মিলি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“মিলি থামো বলছি।”
মিলি ততক্ষণে টাকা গুলো বের করে ড্রেনে ফেলে দিয়েছে।শপিং ব্যাগটা তন্ময়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“নাও।তোমার সব কষ্ট,সব অপমান পানিতে ধুঁয়ে গেছে।”
তন্ময় শপিং ব্যাগটা হাতে নিয়ে বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলল,
“তুমি সব টাকা নষ্ট করে দিলে?”
“হ্যাঁ।”
তন্ময় দুহাত মাথায় ঠেকিয়ে রাস্তার উপরে বসে পড়ল।ইচ্ছে করছে এখন ড্রেনের ময়লা পানি গুলোই তুলে নিয়ে যেতে।
“মিলি ছয় লাখ টাকা ছিল ওখানে মানে বুঝতে পারছো?হায় আল্লাহ!এতগুলো টাকা আমি কখনো একসাথে চোখেও দেখিনি আর তুমি সেগুলো এভাবে ড্রেনে ফেলে দিলে?তুমি কি পাগল?মাথা খারাপ তোমার?যদি তুমি না নিতে তবে আমাকে ফেরত দিয়ে দিতে তাও ঐভাবে নষ্ট করলে কেন টাকাগুলো?”
“তোমার সত্যি মনে হয় তন্ময় যে তোমার টাকা আমি গ্রহণ করতাম?তোমাকে শুধু একটা ছোট্ট শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করলাম।আমি নিজে কোটি টাকার মালিক আর তোমার এই ছয় লাখ টাকার জন্য হ্যাংলামো করব তোমার সাথে?আমাকে কি তোমার মতন ছোটলোক পেয়েছো না তোমার প্রেমিকার মতন লোভী পেয়েছো?আমি শুধু তোমাকে একটা কথা বোঝাতে চেয়েছিলাম জানোতো।আমার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তুমি মাত্র এই ছয় লাখ টাকা হারিয়ে পাগল প্রায় হয়ে রাস্তায় বসে পড়েছো।আর আমি তোমাকে পাওয়ার জন্য কোটি টাকা ফেলে রেখে এসেছিলাম,শুধুমাত্র তোমাকে ভালোবেসে।আমার এই ভালোবাসাও যখন তোমায় আটকাতে পারেনি তারমানে ভালোবাসার মানেই তুমি বোঝো না।"
রাগে তন্ময়ের চোখ দুটো রক্তিম বর্ণ ধারণ করছে।মিলির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
“কাজটা তুমি ঠিক করলে না।ছয় লাখ টাকা এমনি এমনি আসেনি।”
“সেটা আমি জানি।এখন ছয় লাখ টাকা জোগাড় করতে তোমার অনেক সময় লেগে যাবে,কিছুদিন পরে চাকরিটাও থাকবে না,আর কোথাও চাকরি পাবে কিনা সেটাও সন্দেহ।যখনই পাওনাদাররা তোমায় টাকার জন্য চাপ দেবে ঠিক তখনই তোমার মনে পড়বে যে তুমি একটা মেয়ের সাথে কতটা অন্যায় করেছো।তোমার পাপের বোঝা ঠিক কতটা বড় ছিল একসময় সেটা মনে পড়বে।দেখবে তোমার পাশে কেউ নেই।এত অশান্তির পর ভাববে যে বাড়িতে এসে জেসি তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সান্ত্বনা দেবে।ত্যাগ করো সেই চিন্তা।নিজের চাওয়া পাওয়া পূরণ না হলে ও তোমার মানসিক শান্তি কেড়ে নেবে।”
“তোমার একটুও কষ্ট হলো না এই টাকাগুলো এভাবে নষ্ট করতে?আরে তুমি অন্তত নিজের কাছে তো রেখে দিতে পারতে রে ভাই।টাকা এভাবে কেউ নষ্ট করে?”
“তোমাকে ছেড়ে দিলাম আর সামান্য কয়টা টাকা ছাড়তে পারবো না?একবার ভেবেছিলাম টাকাগুলো অন্য কাউকে দিয়ে দেবো কিন্তু পরে মনে হলো না তোমার নোংরা ছোঁয়ার টাকাগুলো যার জীবনে যাবে তার জীবনটাও তোমার মতন নর্দমা হয়ে যাবে।তোমার ছোঁয়া প্রত্যেকটা জিনিসের স্থানই নর্দমাতে হওয়া উচিত।ঠিক যেমন এই টাকাগুলো নর্দমায় ফেলেছি। তুমি ভীষণ বোকা তন্ময়।এতদিনও আমাকে চিনতে পারলে না।আমার যে কোন কালেই এসব টাকা-পয়সা, সম্পত্তির প্রতি কোনো লোভ ছিল না সেসব তুমি বুঝলেই না।তোমাকে ছেড়ে দিয়ে তোমার থেকে এই টাকাগুলো আমি নিয়ে কি করব?”
কথাটা বলে মিলি সেখান থেকে চলে গেল।তন্ময়ের মাথা ঘুরছে,চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে।বারবার দৃষ্টি যাচ্ছে ড্রেনের দিকে।কি করে মিলি এতগুলো টাকা নষ্ট করলো?ছয় লাখ টাকা এই কয়দিনের মাঝে জোগাড় করতে যে তন্ময় কে কত কষ্ট করতে হয়েছে সেটা শুধু তন্ময়ই জানে।তন্ময় জানে ওই টাকাগুলো ওর হতো না কিন্তু তবুও এতটুকু তো জানতো যে টাকা গুলো কারো কাছে থাকবে।
কিন্তু এখন এভাবে টাকাগুলো নষ্ট হয়ে যেতে দেখে নিজেকে যেন আর সামলাতে পারছে না।
______
পুরো দিন আর কোন কথা বলল না তন্ময় মিলির সাথে।মিলিকে দেখলে বারবার ওর কষ্টের জোগাড় করা টাকাগুলোর কথা মনে পড়ছে।কি করে মিলি পারলো এতগুলো টাকা এভাবে নষ্ট করতে?টাকার কি কোন দাম নেই নাকি?রাতে মিলির রান্না করা খাবার খেলো না,বাইরে গিয়ে হোটেলে খেয়ে এলো।আজ সারারাত মিলি ঘুমোলো না।খেয়াল করলো দুচোখে কোন ঘুম নেই।কষ্ট হচ্ছে কিনা সেসবও বুঝতে পারছে না।কান্না তো আসছে না তাহলে মনে হয় কষ্ট হচ্ছে না।কিন্তু যদি কষ্ট নাই হয় তবে মনের ভেতরে এই অস্থিরতাটা কিসের?এই যে মনের ভেতরে একটা ঝড় বয়ে চলেছে সেটা কি কষ্টের থেকে কম?এই যে মিলি বুঝতে পারছে আর এই বাড়িটাতে থাকা হবে না,এই সংসারটা আর মিলির থাকবে না এগুলো ভাবতেই তো বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে তবে এটাকে কি কষ্ট বলে না?মিলি আর কষ্টের সংজ্ঞা খুঁজতে গেল না।তন্ময় অনেকক্ষণ আগেই অন্য ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েছে না হলে একবার ওর ঘরে গিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে আসতো।মাঝরাত অবধি মিলি বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলো।প্রকৃতিটা আজ ভীষণ শান্ত,ভ্যাপসা গরম পড়েছে তবে গরমের মধ্যেও মিলি বারান্দাতেই দাঁড়িয়ে রইল।ঘরের ভেতরে গিয়ে ফ্যানের নিচে শোয়ার বা একটু বিশ্রামের প্রয়োজন মনে করল না।ইচ্ছে হলো না ঠিক।রাতের কালো আকাশটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।এই বারান্দাতেই তো কত স্মৃতি জমে আছে,এই বাড়ির প্রতিটা কোণায় ওর আর তন্ময়ের স্মৃতি জড়িয়ে আছে।এই বাড়িতেই তো তন্ময়ের সাথে সংসারের শুরু আর এই বাড়িতে ওর তন্ময়ের সাথে সংসারের শেষ।অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর মিলির পা দুটো আর সায় জানালো না। ফুলে গেছে বোধ হয়।ঘরে এসে বিছানয় গা টা এলিয়ে দিয়ে একটু ঘুমোনোর চেষ্টা করলো তবে ঘুম এলো না।একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার উঠে পড়লো।ওয়াশরুমে গিয়ে অজু করে এসে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়লো।মোনাজাতে আজ কাঁদলো মিলি,খুব কাঁদলো।একটা সময় তন্ময়কে পাওয়ার জন্য মোনাজাতে এর থেকেও হয়তো বেশি কেঁদেছিল।আজকেও তন্ময়ের জন্যই কাঁদছে,তন্ময় কে হারানোর জন্য,তন্ময়ের বদলের জন্য,সংসারটা ভাঙার জন্য কাঁদছে।মিলি কাঁদলো ঠিকই তবে ওর কান্নার একটুও শব্দ হলো না,মুখ ফুটে কিছু বলল না।হয়তো মনে মনে নিজের সৃষ্টিকর্তার কাছে বিচার দিল।অভিযোগ করলো হয়তো যে কেন এরকমটা মিলির সাথেই হলো।কেন ওর সংসারটাই ভাঙতে হলো।কেন তন্ময়ের মনে ওর জন্য ভালোবাসা শেষ হতে হলো।কিন্তু তাৎক্ষণিক কোন উত্তর মিলি পেল না।যার কাছে অভিযোগ করেছে সে তো শুনেছে সবটা নিশ্চয়ই কোন বিহিত তিনি করবেন।জায়নামাজ ভাঁজ করে রেখে মিলি ঘরটা পরিষ্কার করলো।খুব সুন্দর করে পুরো ঘরটা পরিষ্কার করল।ঘরের কোন কোণায় এক বিন্দুও ময়লা থাকতে দিল না।বরাবরই সংসারের যাবতীয় কাজ করতে মিলি খুব ভালোবাসে।একা হাতে পুরো বাড়ি একদম চকচকে করে রাখো।টুকটাক কাজ করে রান্নাঘরে গেল।মিলি চাইলো ওর দুচোখে একটু ঘুম আসুক তবে ঘুম এলো না।এসব করতে করতে ভোর হয়ে গেল।তন্ময় আজ বেশ সকাল সকালে ঘুম থেকে উঠলো।তবে বুঝলো না যে মিলি সারারাত ঘুমোয়নি।আজ বোধহয় বেরোনোর একটু তাড়া আছে।ঘরে টুকটাক সব হতেই মিলি বুঝলো তন্ময় উঠে পড়েছে।ততক্ষণে রান্নাবান্না সব শেষ।ঘরের দিকে পা বাড়লো।গিয়ে দেখলে তন্ময় তৈরি হয়ে গেছে।মিলি সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তন্ময় বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।দরজার কাছে নিয়ে জুতা পরে বেরোতে নিলে মিলি পিছন থেকে একবার ডাকলো তন্ময় বলে।যদিও তন্ময়ের মিলির সাথে কথা বলার বিন্দুমাত্র কোন ইচ্ছে ছিল না কিন্তু তারপরও কি ভেবে যেন থামল।পিছন ফিরে তাকিয়ে মৃদু গম্ভীর গলায় বলল,
“এতকিছুর পরও তোমার এখনও আমায় বলার আছে কিছু?”
মিলি আলতো হেসে বলল,
“তোমাকে বলার জন্য আমার কথা তো কখনো শেষ হয় না তন্ময়।”
“তবে আমি চাই এখন শেষ হোক।”
“বেশ তো,মেনে নিয়েছি তোমার কথা।শেষ হবে।আজ শেষবারের মতন একটু কিছু বলে নেই।অনেকদিন হলো তো আমায় সময়ই দাওনা।আজ একটুকু সময় দেবে?সময় চাইলাম ঠিকই তবে খুব বেশি সময় নেব না।”
“বলো।”
কথাটা বলে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল তন্ময়।মিলির দিকে তাকাতেও বোধহয় এখন আর ইচ্ছে করে না।মিলি ধীরপায়ে এগিয়ে গেল তন্ময়ের দিকে।মিলিকে নিজের দিকে আসতে দেখে তন্ময়ের কপালে একটু ভাঁজ পড়লো।বুঝতে পারছে না মিলি কি করবে।তন্ময়কে অবাক করে দিয়ে মিলি আলতো করে দু হাত জড়িয়ে ধরল ওকে।তন্ময় যে সত্যি অবাক হয়েছে সেটা ওর চোখ মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।হয়তো আন্দাজ করতে পারেনি যে এত কিছুর পরেও মিলি ওকে জড়িয়ে ধরবে।তবে কেন যেন তন্ময়ের রাগ হলো না,বিরক্তও লাগলো না।শুধু অবাকই হয়েছে বোধ হয়।মিলিকে নিজের থেকে ছাড়ানোর কোন রকম কোন তাড়াও দেখালো না।তবে পাল্টা দুহাতে মিলিকে জড়িয়েও ধরল না।বলা যায় তন্ময় এখন একটা ঘোরের মাঝে আছে যে ঘোরটা কাটল মিলির কন্ঠে,
“অবাক হচ্ছ তাই না?হওয়াটাই স্বাভাবিক।জানো আমি নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছি,অনেকটা সামলে নিয়েছিও।এখন আর আমার মনের মাঝে এই ইচ্ছেটা নেই যে আমার সংসারটা যেন বেঁচে যায়।তোমার সাথে থাকারও এখন আর আমার কোন ইচ্ছে নেই।আমি নিজেও চাই যে আমাদের এই সম্পর্কের এখন ইতি হোক।কেননা তুমি যা করেছো তার পরে তোমার সাথে থাকা যায় না তন্ময়।”
“তাহলে জড়িয়ে ধরেছো কেন?”
“ভালোবাসি তো তোমায়।সংসারটা ভাঙতে চাই কারণ তুমি আমায় এখন আর ভালোবাসো না।এই সম্পর্কটা শেষ করতে চাই কারণ তুমি আর এখন আমায় চাও না। কিন্তু তার মানে তো এটা নয় যে আমি তোমায় ভালোবাসি না।জীবনে একজনকেই ভালোবেসেছি,প্রেমিক হিসেবেও নিজের স্বামী হিসেবেও,আর সেটা তুমি।এই জীবনে আর কাউকে ভালোবাসতে পারব না।”
“অফিসে যেতে হবে দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
“আজই তো শেষবার আর তো কখনো তোমায় আটকাবো না।আচ্ছা তন্ময় আমায় একটা কথা বলবে?তুমি কি আমায় কখনো ভালোবাসোনি?যদি সত্যি ভালোবেসে থাকতে তাহলে তো আজ ভালোবাসা শেষ হয়ে যেত না তাই না?তবে আমিই কি তোমায় শুধু চেয়েছিলাম?আমি তো এটা ভেবেও নিজেকে কখনো সান্ত্বনা দিতে পারবো না যে তুমি আমার বাবার সম্পত্তি দেখে আমায় বিয়ে করেছিলে।তুমি না কখনো আমায় এ বিষয়ে চাপ দিয়েছো যে আমি যেন আমার বাপের বাড়ি গিয়ে টাকা পয়সা নিয়ে আসি,তুমি না কখনো আমার চাকরি করা টাকা আমার থেকে নিয়েছো।তবে হ্যাঁ শেষ কয়েক মাসে খোঁটা দিয়েছো আমি বসে থেকে খাই জন্য।এমনটাও না যে আমি তোমাকে আমার কাছে আসতে দেয়নি।তুমি এটাও কখনো বলতে পারবে না যে আমার ভালোবাসায় কোন কমতি ছিল তাহলে আমি জেসির কাছে হেরে গেলাম কোন দিক দিয়ে একটু বলবে?”
তন্ময় এক হাতে চেয়ারের হাতলটা খামচে ধরলো।অন্য হাত মুষ্টিবদ্ধ করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।এই প্রশ্নের উত্তর ওর কাছে নেই।তন্ময় নিজেও জানে না কেন মিলির প্রতি থেকে হঠাৎ করে ভালোবাসা হারিয়ে গেল।তন্ময় জানে না জেসির মাঝে কি এমন বিশেষ গুন আছে যেটা ওকে এতটা আকর্ষণ করে।তবে একটা বিষয় খেয়াল করেছে জেসি কে ছোঁয়ার একটা তীব্র ইচ্ছে কাজ করে তন্ময়ের মাঝে।আর তন্ময় এটা খুব ভালো করে বুঝতে পেরেছে যে বিয়ে না করলে জেসি ওকে কখনো ছুঁতে দেবে না।তবে কি শুধু একটা শারীরিক টান আর কিছু না?তন্ময়কে চুপ করে থাকতে দেখে মিলি পুনরায় বলে উঠলো,
“আমি পুরনো হয়ে গিয়েছি?আমাকে ছেড়ে তোমার এখন নতুন দরকার তাই না?তবে কি দুদিন পর জেসি কেও ছেড়ে তোমার আবার নতুন কাউকে প্রয়োজন পড়বে?এতটা নোংরা হয়ে গেছো তুমি?আগে তো কখনো বুঝতে পারিনি যে তোমার চরিত্রে দোষ আছে।যে ছেলেটা কলেজে কোন মেয়ে আগ বাড়িয়ে কথা বলতে এলে তাকে এড়িয়ে চলতো,যে ছেলেটা আমি পাশে থাকলে তার পাশ দিয়ে যতই সুন্দরী মেয়ে যাক না কেন মাথা নিচু করে হাঁটতো আজ সেই ছেলেটার এত অধঃপতন?আমার সাথে সম্পর্ক চলাকালীনও কি তুমি অন্য আরো মেয়েদের সাথে সম্পর্কে ছিলে?”
মিলির এই প্রশ্নের উত্তরটা দিতে তন্ময়ের একটুও সময় লাগলো না।তাৎক্ষণিক জোর গলায় বলল,
“কখনোই না।সেই সময় আমার জীবনে শুধু তুমি ছিলে।তোমাকেই শুধু ভালোবেসেছি আর কাউকে বাসিনি।তুমি যত চেষ্টাই করো না কেন মিলি সেই সময়কার আমার ওপরে কোন অপবাদ দিতে পারবে না।তোমাকে ভালোবাসার মাঝে আমি কোন কমতি রাখিনি।”
মিলি এবারে ডুকরে কেঁদে উঠলো।দু হাতে তন্ময়ের পিঠের শার্টটা খামচে ধরে ক্রন্দনরত গলায় বলল,
“সে সময়ের কথা কেন বলছো এখনকার সময়ের কথা কেন বলতে পারছ না যে তুমি এখনো শুধু আমাকেই ভালোবাসো?এভাবে কেউ বদলে যায় তন্ময়?এতটা পরিবর্তন কি করে হয়ে গেল তোমার?”
তন্ময়ের এখন অস্থির লাগছে।মিলির কথাগুলো শুনতে একদমই ভালো লাগছে না,বিরক্ত লাগছে।মিলির কান্নাটাও বিরক্ত লাগছে।কাঁদতে হবে কেন এভাবে?আবার কাঁদবেই যখন ওকে জড়িয়ে ধরেই কেন কাঁদতে হবে।ভিজে যাচ্ছে তো তন্ময়ের শার্টটা।তন্ময় তো অনুভব করতে পারছে যে মিলি কাঁদছে।
“ছাড়ো আমায় মিলি।আমায় যেতে হবে বলছি তো।”
মিলি এবারে সত্যি ছেড়ে দিল।মাথা তুলে তাকিয়ে তন্ময়ের হাতটা ধরে নিজের পেটের উপরে রেখে বলল,
“আমাদের সন্তান কে তুমি একবার ছুঁয়েও দেখলে না তন্ময়।তোমারই তো সন্তান।ওর উপরেও তোমার একটুও মায়া হয় না,তাই না?”
তন্ময়ের কি হলো সে জানে না তবে বিদ্যুৎ বেগে হাতটা সরিয়ে নিয়ে আশেপাশে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বলল,
“জানি না।”
মিলি হাসলো।তন্ময়ের কপালে কাঁটা জায়গাটায় এবারে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল।এই ক্ষতটার জন্য দায়ী মিলি নিজেই।অপরাধী গলায় বলল,
“আমি ইচ্ছে করে তোমায় আঘাত করিনি তন্ময়।জানিনা তখন কি হয়ে গিয়েছিল আমার।তোমার খুব লেগেছিল তাই না?আমি ওষুধও লাগিয়ে দিতে পারিনি।তোমায় নিশ্চয়ই অনেক মাথা ব্যথ্যা করছিল,মাথাটাও টিপে দিতে পারি নি।এক কাপ কফিও করে দেইনি তোমায়।তোমার প্রতি খুব বেশি নিষ্ঠুরতা দেখিয়েছি তাই না?তুমি না হয় আমায় ভালো না বাসলে,আমি তো তোমায় ভালোবাসি।আমার এতটা নিষ্ঠুর হওয়া বোধহয় উচিত হয়নি।”
“ঠিক কাজই করেছিলে।আমায় ওভাবে আঘাত না করলে হয়তো আমি তোমায় কোন আঘাত করে বসতাম যেটা ভালো হতো না।ওই আঘাতের কারণে আমার হিতাহিত জ্ঞান ফিরেছিল।”
মিলি দু হাতের আজলায় তন্ময়ের মুখটা নিয়ে বলল,
“নিজের খেয়াল রেখো কেমন?আমি কয়েক দিনের খাবার রান্না করে ফ্রিজে রেখে দিয়েছি গরম করে খেয়ে নিও।গতকাল রাতে ঘরটাও সুন্দর করে গুছিয়ে রেখেছি।তোমার জামা কাপড় ইস্ত্রি করে আলমারিতে রাখা আছে।বেশি রাত করে বাড়ি ফিরবে না।আর বেরোনোর সময় মনে করে চাবিটা সঙ্গে করে নিয়ে যেও।গ্যাস ভালো করে অফ করো।ভেজা হাতে সুইচ ধরবে না।জুতো পড়ে ঘরের ভেতরে চলে আসবে না।ভেজা গামছাটা বিছানার উপরে রাখবে না।বৃষ্টি হলে ঘরের জানালাটা বন্ধ করে দিও না হলে বিছানা ভিজে যাবে।শীতের দিনে মাঝ রাত অব্দি বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকবে না,ঠান্ডা লেগে যাবে।আর শোনো আজ থেকে আর পাশের ঘরে ঘুমোতে হবে না।তোমার তো আমাদের ঘর ছাড়া ঘুমোতে সমস্যা হয় আজ থেকে ওখানেই ঘুমিয়ো।আর বেশি বাইরের খাবার খাবে না তোমার সমস্যা হয়।আর আমি তো চলে যাচ্ছি খুব তাড়াতাড়ি নিজের জীবনটা নিজের মতন করে সাজিয়ে নিও।আমার কোন চিহ্নই থাকবে না আর এখানে।জেসির সাথে ভালো থেকো আর খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে ভাঙার জন্য প্রস্তুত রেখো।তুমি নিজেও জানো তুমি ভাঙবে।আমার হৃদয়টা যতটা নিষ্ঠুরভাবে তুমি ভেঙেছো তার থেকেও ভয়ানক ভাবে তোমার হৃদয়টা কেউ ভাঙবে।তুমি এতটা ভেঙ্গে চুরে যাবে যে আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না।আর সেই দিন তোমাকে গড়ে তোলার জন্য তোমার পাশে মিলি থাকবে না।মনে রেখো আমি যেমন তোমার যত্ন নেই,আমি যেমন করে তোমায় ভালোবাসি,আমি তোমার যত অপরাধ ক্ষমা করেছি এমন তার কেউ করবে না।আসতে পারো।”
কথাটা বলে মিলি চলে যেতে নিলে পিছন থেকে তন্ময় ওর হাত টেনে ধরল।মিলির কাছে এটা এক প্রকার পিছুটানই মনে হল।এই যে মিলির মনে হল এখনই আরও একবার তন্ময়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে।এই যে মনে হচ্ছে তন্ময়ের সব অপরাধ ক্ষমা করে দিয়ে আবার একটা সুখের সংসার করতে।মনে পড়ছে সব সুন্দর স্মৃতি গুলো,ভুলে যেতে ইচ্ছে করছে খারাপ দিনগুলো। কিন্তু সেসব সম্ভব না।নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো মিলি।তন্ময় কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“দেরি হয়ে যাচ্ছে তোমার।”
তন্ময় সে কথার কোন উত্তর দিল না।প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কোথায় যাবে তুমি?কেউ তো নেই তোমার।”
মিলি তাচ্ছিল্য গলায় বলল,
“কেউ নেই জেনেও যখন হাতটা ছেড়ে দিয়েছো তারপর তোমার মুখে এই প্রশ্নটা আর মানায় না।সত্যি করে বলোতো আমি যেখানেই যাই তোমার কি যায় আসে?আমার থেকে মুক্তি পেলে তো তুমি বাঁচো।”
“একটা সহজ প্রশ্নের সহজ ভাবে উত্তর দিতে পারো না?”
“জটিল প্রশ্ন করে সেটাকে সহজ প্রশ্ন বলছো?চিন্তা করো না যেখানেই যাই না কেন তোমার জীবনে আর কোনো রকম কোনো সমস্যা তৈরি করব না।”
“সেদিন তো তোমার ভাইয়ের ভয় দেখালে তা সম্পর্ক কি ঠিক হয়ে গেছে?ওখানে থাকবে?”
“জানিনা।তুমি চিন্তা করো না এইখানে আর বেশি দিন থাকবো না।”
“আজকেই চলে যাবে?”
“চেষ্টা করব।”
“দেখো মিলি আগেও তোমায় বলেছি আমাদের মাঝে আর আগের মতন কিছু নেই।আমি তোমার খারাপ চাই না।আমি আমার জীবনটা নতুন করে শুরু করতে চাই।তোমাকেও বলছি পারলে তুমিও শুরু করো।যদি মনে হয় আমি তোমার যোগ্য ছিলাম না তবে এবার এমন কাউকে জীবনে জায়গা দিও যাকে তুমি নিজের যোগ্য বলে মনে করবে।”
“কি হবে জায়গা দিয়ে?যদি সেও দুদিন পর তোমার মতনই বদলে যায়?এক জীবনে কয়জনকে ভালোবাসা যায়?কয়জন কে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করা যায়?প্রথম সংসারটাই হয় ভালোবাসার সংসার,পরের গুলো সবই বাধ্যবাধকতা,সবই পরিস্থিতির চাপে পড়ে নিজের জীবন বাঁচানোর তাগিদে করতে হয় যেটা আমি কখনোই করব না।আমি আমার স্মৃতিতে,আমার জীবনে শুধু আমার ভালোবাসার সংসার কেই জায়গা দিয়েছি।কোন বাধ্যবাধকতার সংসার আমার দ্বারা হবে না।”
“যা ভালো মনে করো।আসছি।”
কথাটা বলে তন্ময় চলে গেল।মিলি দৌড়ে ওদের ঘরের জানালার কাছে গেল।এখান থেকে নিচে দেখা যায়, তন্ময় কেও দেখা যাবে।আগে তো এমনটাই করতো।মিলির থেকে বিদায় নিয়ে যাওয়ার পর মিলি এই জানালার কাছে আসতো।তন্ময় নিচে গিয়ে আরো একবার ঘুরে তাকিয়ে বিদায় জানাতো।কি ভেবে যেন মিলি আশা করল যে আজকেও তন্ময় ঘুরে তাকাবে।অপেক্ষা করতে করতে তন্ময়কে দেখা গেল।বাইক নিয়ে বেরোচ্ছে।বাইকটা স্টার্ট দিয়ে কয়েক ইঞ্চি এগোতেই আবার থেমে গেল।তন্ময় সত্যি পিছন ফিরে তাকালো।তবে তাৎক্ষণিকভাবে মিলি নিজেকে আড়াল করে দাঁড়ালো।তন্ময় বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো।কে জানে কোন আশায়?মিলি লুকিয়ে লুকিয়ে আরো একবার তন্ময়ের মুখটা দেখে নিল।কয়েক মিনিট পর তন্ময় সেখান থেকে চলে গেল।হয়ত শেষ দেখা ছিল,ছিল শেষবারের মতন ভালোবাসার স্বীকারোক্তি।