রিক্ত বসন্ত

পর্ব - ১৫

🟢

অফিস থেকে ফেরার পর এখনো জামা-কাপড় বদলানো হয়নি তন্ময়ের।কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগছে।মিলির একটা খোঁজ পেলে ভালো হতো।নিজের ভাবনায় তন্ময় নিজেই অবাক হলো।মিলির খোঁজ দিয়ে ও কি করবে?ওই তো চেয়েছিল যে মিলি যেন চলে যায়, তাই গেছে।পরক্ষণেই আবার নিজেই নিজেকে বোঝালো যে মিলি কোথায় আছে সেটা জানতে চাওয়া অপরাধ না।খোঁজ নিতেই পারে।কিন্তু কথা হলো কার থেকে খোঁজ নেবে?অনেক ভাবনা-চিন্তার পর তন্ময়ের মাথায় সিয়ামের নামটাই এলো।মিলির বন্ধু বলতে এক সিয়াম আর নীলিমাই আছে।তবে সিয়াম কে সরাসরি জিজ্ঞেস করা যাবে না যে মিলির খোঁজ জানে কিনা।নাহলে সুযোগ পেয়ে যাবে আবার।অপমানও করতে পারে।কি বলবে সেসব ভেবে তন্ময় সিয়ামের নাম্বারে কল করলো।

সিয়াম তখন অফিসে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে।আজকাল ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করছে।কয়েকদিন ছুটি নেওয়ায় এখন কাজের চাপ বেড়ে গিয়েছে।প্রথম বার কলটা ধরতে ধরতেই কেটে গেল।সিয়াম স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে নাম্বারটা দেখার আগে দ্বিতীয় বার কল এলো।

তন্ময়ের নামটা দেখতেই এত ব্যস্ততার মাঝেও ফোনটা রিসিভ করলো।

"হ্যাঁ তন্ময় বল।"

ফোনের অপর পাশ থেকে সিয়ামের গলার আওয়াজ পেয়ে তন্ময় উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলার চেষ্টা করলো,

"ভাই আজ থেকে আমি স্বাধীন।আমি আবার জীবনটা নতুন করে শুরু করতে পারব।"

তন্ময়ের হঠাৎ এমন কথা শুনে সিয়াম ভ্রুঁ কোঁচকালো।প্রশ্নাত্মক গলায় তন্ময়কে বলল,

"তোর কথা ঠিক বুঝলাম না।একটু পরিষ্কার করে বলবি কি হয়েছে?"

তন্ময় ফের উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল,

"ভাই মিলি চলে গেছে।আমি এখন জেসি কে বিয়ে করতে পারবো।"

কথাটা শুনে সিয়াম চমকে গেল।সাথে তন্ময়ের এমন আচরণে অবাকও হলো।যে তন্ময় মিলিকে হারানোর ভয়ে এক সময় তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে আজ সেই তন্ময় মিলি চলে গেছে বলে এতোটা খুশি কি করে হচ্ছে সেটাই সিয়াম বুঝতে পারছে না।কয়েকদিন আগে মিলি জানিয়েছিল যে তন্ময়ের সাথে ওর সম্পর্কটা ভালো যাচ্ছে না।তন্ময় আর মিলির সাথে থাকতে চায় না।তখন সিয়াম তো পুরোপুরি কথাটা বোধহয় বিশ্বাসও করেনি।পরে অবশ্য তাও তন্ময়ের সাথে কথা হয়েছিল।কিন্তু তন্ময় তেমন কিছুই বলেনি।সিয়াম যা বুঝিয়েছে শুধু হা হু করে উত্তর দিয়েছে।তারপরে ব্যস্ততার কারণে আর তন্ময়ের সাথে কথা বলা হয়নি।কিন্তু পরিস্থিতি যে এর মাঝে এতদুর চলে যাবে সেটা সিয়াম কখনোই আশা করেনি।সিয়াম কে চুপ থাকতে দেখে তন্ময় আবারো বলে উঠল,

"কি রে চুপ করে আছিস কেন?শোন মিলির সাথে যেমন তুই আমার বিয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলি তেমনই কিন্তু জেসির সাথেও বিয়ের ব্যাবস্থা করে দিতে হবে।আর শোন মিলি কে আবার এসব বলিস না।ওর খারাপ লাগতে পারে।"

তন্ময় জানে যদি সিয়াম মিলির খোঁজ জেনে থাকে তবে এবারে রেগেমেগে হলেও বলে দেবে।তবে তেমন কিছু হলো না।

সিয়াম প্রশ্নাত্মক গলায় বলল,

“মিলি কোথায়?”

সিয়ামের থেকে এই প্রশ্নটা বোধহয় তন্ময় আশা করেনি।ও তো নিজের সুখের গল্প শোনাচ্ছিলো যেন সিয়ামও রেগেমেগে বলে যে মিলি যেখানে আছে ভালোই আছে।কিন্তু এখানে তো ঘটনা ভিন্ন।পাল্টা প্রশ্ন করলো,

“তুই জানিস না?”

সিয়াম এবারে রাগান্বিত গলায় বলল,

“আমি কি করে জানবো?তোর জানার কথা মিলি এখন কোথায়।”

“আমি তো ভেবেছিলাম হয়ত তোর কাছে আছে।আমি অফিস থেকে বাড়িতে ফিরে ওকে পাইনি।জানি না ও কোথায়।”

"তোর এই কথাগুলো বলতে লজ্জা করছে না তন্ময়?তুই কি ভুলে গেলি যে তুই মিলিকে পাওয়ার জন্য কি কি করেছিলি?আরে তুই ওকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলি তন্ময়!মেয়েটা তোর জন্য সব কিছু ছেড়ে দিয়েছিল আর তুই ওকে এভাবে ঠকালি!মেয়েটা কোথায় আছে,কেমন আছে একটা খোঁজ অব্দি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করলি না?”

সিয়ামের এতগুলো কথা শুনেও তন্ময়ের মাঝে কোনো হেলদোল দেখা গেল না।সে সিয়ামকে শান্ত হতে বলে বলল,

"তুই মাথাটা ঠান্ডা কর সিয়াম।দেখ আমি জানি যে মিলি আমার জন্য সব ছেড়ে দিয়েছিল।কিন্তু আমি তো ওকে কখনো এসব করার জন্য ফোর্স করিনি।আর তাছাড়া আমিও চারটে বছর মানিয়ে গুছিয়ে ওর সাথে সংসার করেছি।কিন্তু আমি আর পারছি না।ওর সাথে থাকলে আমার এখন দম বন্ধ হয়ে আসে।আমাদের মাঝে আর এক বলতে কিছুই নেই।আমার মনে হয়েছে যে আমি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।না মিলি আমার জন্য ঠিক না আমি মিলির জন্য ঠিক।তাই আমাদের পথটা আলাদা হয়ে যাওয়াই ভালো।আর আমাদের মাঝে যখন সম্পর্কই নেই তাহলে ওর খোঁজ রাখবো কেন?”

তন্ময়ের কথা শুনে সিয়াম তাচ্ছিল্য ভরা কন্ঠে বলল,

"বাহ্ তন্ময়,বাহ্!বিয়ের এতোগুলো দিন পর তোর মনে হলো যে তোরা একে অপরের জন্য ঠিক না।তোদের সম্পর্কের এতোগুলো দিন পর তুই আজ বলছিস যে তুই মিলিকে সবকিছু ছেড়ে আসতে ফোর্স করিস নি।মানে সব ভুল মিলির তাই তো?তোকে ভালোবেসে তোর কাছে আসাটাই ওর ভুল ছিল।তুই কিভাবে এরকম নির্লজ্জের মতো কথা বলছিস বলতো?তুই আজ অন্য একটা মেয়েকে পেয়ে মিলিকে ভুলে যেতে পারলি তন্ময়?তোর চরিত্র যে এতোটা খারাপ সেটা তো আমি জানতাম না?মিলি তো একা না তোর বাচ্চা আছে ওর সাথে।"

তন্ময়ও এবার হালকা রাগী কন্ঠে বলল,

"দেখ সিয়াম,আমি ওকে বাচ্চা নিতে নিষেধ করেছিলাম।তাই বাচ্চার সব দায়িত্ব ওর।আর তুই আমার সবথেকে ভালো বন্ধু।তোকে আমি সব কথা বলি বলে জেসির কথাটাও জানালাম।তোর ইচ্ছে হলে তুই আমাদের বিয়েতে থাকবি না হলে থাকবি না।তোর থেকে এতো জ্ঞান কিংবা আমার চরিত্রের সার্টিফিকেট আমি নিতে চাইছি না।"

সিয়াম বুঝলো রেগে কথা বললে তন্ময় আরো বিগড়ে যাবে।সে চাইছে তন্ময়কে কোনোরকমে বুঝিয়ে ওদের সম্পর্কটা আবার জোড়া লাগাতে।সিয়াম এবার শান্ত কন্ঠে তন্ময় কে বলল,

"দেখ তন্ময়,তুই কিন্তু ভুল করছিস।আজ না হোক কাল এই ভুলের জন্য তুই অবশ্যই পস্তাবি।তুই একবার মিলির প্রতি তোর ভালোবাসার কথা মনে কর।তুই ভুলে গেছিস ও একদিন ভার্সিটিতে না আসলে ওকে দেখার জন্য তুই ওর বাড়ির সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতি?রাতবিরেতে হুট করে ওকে দেখার ইচ্ছে হলে ওর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতি।ওর সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা ফোনে কথা বলতি।তোর মনে নেই মিলির বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ার কথা শুনে তুই কেমন পাগ*লের মতো কেঁদেছিলি?তুই ওকে হারানোর ভয়ে কেঁদেছিলি তন্ময়!তোর ভালোবাসা হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে কেঁদেছিলি।তোদের সংসারের কথা ভুলে গেলি তন্ময়?তোর আর মিলির সংসার।মেয়েটা কত কষ্ট করেছে তোর জন্য।তুই বল তো একটা বেকার ছেলের হাত ধরে পালানোর সাহস কয়টা মেয়ের থাকে?ও তোকে ভালোবেসে সেই সাহস দেখিয়েছিল তন্ময়।আজ তুই সব ভুলে গেলি?”

তন্ময় এবার সিয়াম কে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,

"দেখ ভাই আমি জানি যে আমি মিলির জন্য কতটা পাগ*লামো করেছিলাম বা মিলি আমার জন্য কি কি করেছিলো।আমি মিলিকে ভালোবাসতাম।আমাদের সব কথাই এখন অতীত হয়ে গেছে।আমাদের মাঝে আর আগের মতন কিছুই নেই।আমি এখন জেসি কে ভালোবাসি আর ওকে বিয়ে করে ওর সাথে সুখে শান্তিতে সংসার গড়ে তুলতে চাই।"

"কিছুদিন পর যদি তোর মনে হয় তোর এই ভালোবাসাও সত্যি না,তখন কি আবার জেসি কেও ছেড়ে দিবি?"

"এটা সম্ভব না।আমিতো জেসি কে ভালোবেসেই নিজ ইচ্ছেতে বিয়ে করতে চাইছি।"

"তাহলে মিলিকে কি জোর করে বিয়ে করেছিলি?নাকি তখন ওর প্রতি তোর ভালোবাসা ছিল না?একটা কথা মাথায় রাখিস তন্ময় যদি একবার তোর ভালোবাসা বদলে যেতে পারে তাহলে দ্বিতীয়বার বদলাতেও সেটা সময় লাগবে না।যদি একবার তোর ভালোবাসা মিলির ওপর থেকে জেসির উপর চলে যেতে পারে তাহলে দ্বিতীয়বারে জেসির উপর থেকে অন্য কারো উপর যেতেও সময় লাগবে না।আর সবাই কিন্তু মিলির মতন না যে এতো সহজে তোকে ছেড়ে দেবে।তোর কাছে ভালোবাসাটা ছেলে খেলা।তোদের এই কয় বছরের সংসার তোর কাছে একটা পুতুল খেলার মতন।আমার আফসোস হচ্ছে আমি কেন তোর মত একটা ছেলের কান্না দেখে মিলির জীবনটা নষ্ট করলাম!সেদিন যদি আমি তোর কান্না দেখে কষ্ট না পেতাম তাহলে হয়তো আজকে মিলির জীবনটা বেঁচে যেত।ও অন্য কাউকে বিয়ে করে সুখে শান্তিতে ঘর সংসার করতে পারতো।তুই হয়তো মানুষ হয়ে জন্মেছিস কিন্তু তোর মধ্যে মনুষত্ববোধ জন্মায়নি।তুই দেখতে মানুষের মতো হলেও তোর এই নিকৃ*ষ্ট মানসিকতা তোকে মানুষদের কাতারে ফেলে না।"

কথাটা বলেই সিয়াম ফোনটা রেখে দিল।সিয়ামের শেষের কথাগুলো শুনে তন্ময়ের হঠাৎ করে কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে।নিজের কাছে নিজেই প্রশ্ন করল,ও কি সত্যিই মানুষ হতে পারেনি?দুদিন পর জেসির প্রতি থেকেও কি ওর ভালোবাসা উঠে যাবে?আচ্ছা মিলি এখন কোথায়?ও ঠিক আছে তো,ওর কোন বিপদ হলো না তো?সিয়ামও জানে না কিছু তাহলে কোথায় গেল মিলি?

হঠাৎ করে প্রশ্নগুলো তন্ময়ের মাঝে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো।তন্ময় অস্থির চিত্তে রুমের মাঝে পাইচারী করতে থাকলো।সিয়ামের সাথে যে যোগাযোগ করবে তার কোন উপায় নেই।আর অপমান সহ্য করা যাবে না।

তন্ময় যখন নিজের মনকে করা প্রশ্নের উত্তরগুলো খুজতে ব্যস্ত তখনই ওর ফোনটা বেজে উঠলো।স্ক্রীনে "জেসি" নামটা দেখতেই মুহূর্তের মাঝে তার মন থেকে সব প্রশ্নগুলো উবে গেল।হুট করে তার মনে হলো এটাই তার জীবনের শান্তি।আর তার জীবনের যে অশান্তি ছিল সেটা যখন নিজের ইচ্ছেতে চলে গেছে তাহলে আর এত প্রশ্নের উত্তর খুঁজে কি লাভ।সিয়ামের কাছে যখন যায়নি নিশ্চয়ই নিজের বাড়িতে গেছে।

তন্ময় বিছানায় শুয়ে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরল।এরপর ঘন্টার পর ঘন্টা তাদের প্রেমালাপ চলল।

কি অদ্ভুত!এই মানুষটা নাকি দু মিনিট আগে তার স্ত্রীর জন্য চিন্তা করছিলো,সে কোথায় আছে আদৌও ঠিক আছে কি না সেটা ভাবছিলো।একটু আগে তার এতো বছরের সম্পর্ক যে ভেঙে গেছে তাতে তন্ময়ের কোনো ভ্রুঁক্ষেপ নেই।সে এখন নতুন একটা সম্পর্ক তৈরি করতে ব্যস্ত।অথচ তার থেকে বিচ্ছেদের যন্ত্রণা যে একটা মানুষকে একেবারে ভিতর থেকে ভেঙে দিয়েছে সেটা সে বুঝতেও পারলো না।

বিজ্ঞাপন

_____________

রাত দশটার সময় সিয়াম বাড়ি ফিরে মিলিকে দেখে চমকে গেল।অবাক কন্ঠে মিলিকে জিজ্ঞেস করল,

"তুই এখানে কিভাবে এলি?"

মিলি শান্ত দৃষ্টিতে সিয়ামের দিকে তাকিয়ে বলল,

“তন্ময় তোকে কিছু বলেনি?আমি ওর জীবন থেকে চলে এসেছি এটা তো খুব খুশির খবর।এতক্ষণে সবাইকে জানিয়ে দেওয়ার কথা।”

“হ্যাঁ কল করেছিল আমাকে।আমি গালি দিয়ে ফোনটা কেটে দিয়েছি।কিন্তু তোকে এখানে দেখে অবাক হচ্ছি। ভালো করেছিস এখানে এসে।”

সিয়ামের কণ্ঠস্বর পেয়ে রান্নাঘর থেকে তার স্ত্রী নীলিমা এসে বলল,

“আমিও সেটাই বলছিলাম ওকে যে এখানে এসে ভালো করেছে।”

সিয়াম ব্যাগটা সোফার উপরে রেখে মিলির পাশে গিয়ে বসে বলল,

"এত সহজে ছেড়ে দিলি কেন ওকে?"

মিলি অসহায় কন্ঠে বলল,

"তো কি করতাম?আর ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে?আমি ওকে ছাড়িনি বরং অনেকদিন আগেই ও আমাকে ছেড়ে দিয়েছিলো।"

"এত সহজে নিজের অধিকার ছেড়ে দিলি কেন?আমরা তো ছিলাম তোর পাশে!"

মিলি এবার তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

"ওর প্রতি আমার অধিকার ছিল ওর বউ হিসেবে।ও চেয়েছিল বলে আমি ওর বউ হয়েছিলাম।এখন যখন অন্য কাউকে ও বউ বানাতে চাইছে তখন আমি ওকে জোর করতে পারবো না রে।ভালোবাসা কি আর জোর করে পাওয়া যায় বল?আর যদি বলিস অধিকারের কথা তাহলে আমি চাইনা।আমি তো ওকে ছাড়া জীবনে কিছু চাইনি,সেখানে যখন সেই মানুষটাই আমার থাকবে না তখন অধিকার দিয়ে আমি কি করবো।"

“আমার বিশ্বাস হচ্ছে না যে তন্ময় সত্যিই এতটা বদলে গেছে।তুই বলার পরে আমি ওর সাথে কথা বলেছিলাম জানিস।ও সেদিন খুব স্বাভাবিক ভাবে আমার সাথে কথা বলেছিল।আমার কথা বুঝেছিল।জেসির ব্যাপারেও কিছুই বলেনি।আমি ভেবেছিলাম ও হয়তো নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছে।”

“ঐদিন আমার সাথেও খুব ভালো ব্যবহার করেছিল কারণ আমার বাচ্চাটাকে খু/ন করতে চাইছিল।আমার সাথে একটু ভালো ব্যবহার করে একটা ওষুধ খাওয়াতে চেয়েছিল।কিন্তু ভাগ্যিস আমি টের পেয়ে গিয়েছিলাম।”

সিয়াম আর নীলিমার যেন বিশ্বাস হচ্ছে না মিলির কথা।তন্ময়ের এই বর্ণনা তারা মানতে পারছে না।তন্ময়কে তো এক দুই দিন হলো চেনেনা,অনেক বছর হলো চেনে।পরিচয়টা নয় বছরে গিয়ে ঠেকলো অথচ আজ সেই মানুষটাকে সম্পূর্ণ অপরিচিত মনে হচ্ছে। ওদেরই মেনে নিতে কত কষ্ট হচ্ছে তাহলে না জানি মিলি কতটা কষ্ট পাচ্ছে।

"তাহলে এখন কি করতে চাইছিস?"

সিয়ামের প্রশ্নে মিলি আলতো হেসে বলল,

"একটু বাঁচতে চাইছি।নিজের জীবনটাকে নিজের মতন করে গুছিয়ে নিতে চাইছি।সবটা আবার একদম শুরু থেকে শুরু করতে চাইছি আমার বাচ্চার সাথে।এবারে জীবনে কোন পিছুটান রাখবো না।"

"বেশ তোর যা ভালো মনে হয় তাই কর।আমরা তোর পাশে আছি।"

কথাটা বলে সিয়াম সেখান থেকে উঠে চলে গেল।সিয়ামের পিছু পিছু নীলিমাও রুমে চলে এলো।এসে দেখলো সিয়াম বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।নীলিমা ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সিয়ামের কাঁধে হাত রাখলো।নীলিমার হাতের স্পর্শ পাওয়া মাত্রই সিয়াম পিছন ফিরে নীলিমা কে জড়িয়ে ধরলো।নীলিমা বুঝতে পারলো যে ওর কাঁধটা ভিজে উঠছে।সিয়াম হালকা ধরা গলায় বলল,

"আমি তোমাকে এখনো খুব ভালোবাসি নীলিমা আর সারা জীবন ভালোবেসে যাব।ভালোবাসা কি করে এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়?একটা সময় যাকে নিজের থেকেও বেশি চাইলাম,যার সাথে সংসার করার স্বপ্ন দেখলাম,যাকে আমৃত্যু নিজের সঙ্গী বানানোর স্বপ্ন দেখলাম,তার প্রতি হুট করে ভালোবাসা ফুরিয়ে গেল?ভালোবাসার সংজ্ঞা তো এরকম নয়।ভালোবাসা তো কখনো ফুরাবার নয়,ভালোবাসা তো দিন দিন শুধু বেড়ে যায়।বেড়ে যায় ভালোবাসার মানুষটার প্রতি মায়া।ধীরে ধীরে সে মায়া গভীর থেকে গভীরতর হয়ে ওঠে আর আমরা কিছু না বুঝে,না শুনে শুধু সে মায়ার গভীরতায় হারিয়ে যেতে থাকি।যে মায়ার এত গভীরতা সে মায়া হঠাৎ করে ফুরিয়ে যায় কিভাবে?"

সিয়ামের কথা শুনে নীলিমা মুচকি হাসলো।নীলিমা বুঝতে পারছে সিয়াম ভয় করছে যদি ওদের ভালোবাসাটাও কখনো এভাবে ফুরিয়ে যায়!নীলিমা সিয়ামকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিল।তারপর শান্ত কন্ঠে সিয়ামের উদ্দেশ্যে বলল,

"তুমি একদম ঠিক বলেছ,ভালোবাসা কখনো ফুরাবার না।যেটা ফুরিয়ে যায় সেটা কখনো ভালোবাসা ছিলই না।অনেক সময় আমরা ভালো লাগাকে ভালোবাসা ভেবে নেই।জানো মিলি আর তন্ময়ের সম্পর্কের মাঝে মিলির দিক থেকে ভালোবাসা ছিল কিন্তু তন্ময়ের দিক থেকে কখনো ভালোবাসা ছিলই না।তন্ময় তো ভালোবাসার অর্থই বুঝতে পারেনি কখনো।"

"তোমার কি মনে হয় আমি বুঝতে পারি?তোমার কখনো এমন কি মনে হয়েছে যে আমার ভালোবাসা ফুরিয়ে আসছে?"

নীলিমা হালকা হেসে বলল,

"আমার কখনোই এমন মনে হয়নি।আমি কি নিয়ে তোমার কাছে অভিযোগ করবো বলো তো? তুমি আমায় কখনো সে সুযোগ দিয়েছো নাকি?সবার ভালোবাসা এক রকম হয় না সিয়াম।কারো কারো ভালোবাসা যেমন কয়েক বছর যেতে না যেতেই বদলে যায় ঠিক তেমনি কারো কারো ভালোবাসা সারা জীবনেও শেষ হয় না।অনেকে যেমন পেয়েও নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে যত্ন করে নিজের কাছে আগলে রাখতে পারেনা ঠিক তেমনি অনেকে আবার ভালোবাসার মানুষটাকে হারিয়েও আজীবন তার প্রতি নিজের ভালোবাসা মনের কোঠরে যত্ন করে রেখে দেয়।প্রত্যেকটা জিনিসের দুটো দিক থাকে সিয়াম।তুমি ভাবছো হয়তো তন্ময় আর মিলির সম্পর্কের মত একদিন আমাদের সম্পর্কটাও এমন হয়ে যেতে পারে।কিন্তু আমি জানি এমনটা কখনোই হবে না ইনশাআল্লাহ।তন্ময়ের ভালোবাসা তো বিয়ের দুই বছরের মাঝে ফুরিয়ে গিয়েছিল।আর আমাদের বিয়ের ছয় বছর পরও আমি তোমার নামে একটা অভিযোগ করার সুযোগ পাইনি কখনো।তোমার চোখে আমি আজও সেই প্রথম দিনের মতই ভালোবাসা দেখেছি, প্রথম দিনের মতো আমার প্রতি মুগ্ধতা দেখি।ছয় বছর আগে তুমি আমার জন্য যেমন পা*গল ছিলে আমি আজও তোমার চোখে আমার জন্য সেই পাগ*লামিটা দেখতে পাই সিয়াম।একজনের ভালোবাসা দেখে অন্যজনের ভালোবাসাকে বিচার করাটা কখনোই সঠিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না।সবার যেমন ভালোবাসা আলাদা,ভালোবাসার মানুষটা আলাদা ঠিক তেমনি সবার ভালোবাসার ধরনটাও আলাদা।তুমি আজ ভালোবাসার খারাপ দিকটা দেখে ভয় পাচ্ছো কিন্তু আমি তোমার ভালোবাসার ভালো দিকটা দেখেছি সিয়াম।আমার অক্ষমতা বুঝতে দাওনি কখনো আমায় তুমি।তন্ময় ভালো প্রেমিক ছিল কিন্তু স্বামী হিসেবে জঘন্য।আর তুমি প্রেমিক হিসেবে একটু অগোছালো ছিলে ঠিকই কিন্তু একজন স্বামী হিসেবে তুমি সেরা।"

এতক্ষণ বিমুগ্ধ নয়নে সিয়াম নীলিমার কথাগুলো শুনছিল।নীলিমা বরাবরই চাপা স্বভাবের মেয়ে। সিয়ামের সম্পর্কে তেমন কোনো কথা বলে না মুখে।সিয়াম অবশ্য বুঝতে পারে নীলিমার ভালোবাসা।কিন্তু ওর ব্যবহারে,ওর আচরণে নীলিমা কতটা সন্তুষ্ট সেটা সিয়াম জানতো না।

মাঝে মাঝে সিয়াম নিজেকে দোষী ভাবতো,হয়তো ওর কারণেই নীলিমা মন খুলে কথা বলতে পারে না।হয়তো ওর মাঝে এমন বিশেষ কিছু নেই যেগুলো নীলিমা বলতে পারবে।কিন্তু আজ নীলিমার মুখে এসব কথা শুনে সিয়ামের খুব ভালো লাগছে।আজ নিজেকে সফল মনে হচ্ছে একজন স্বামী হিসেবে,একজন মানুষ হিসেবে।

সত্যি তো সবার ভালোবাসা এক হয় না।ওদের দুজনের ভালোবাসার ধরণটাই তো আলাদা।সিয়াম যেমন দিনে হাজার বার করে নীলিমা কে বলে আমি তোমাকে ভালোবাসি ঠিক তেমন ভাবে নীলিমা বলেনা।অথচ সিয়াম জানে যে নীলিমা ওকে ঠিক কতটা ভালোবাসে।

অনেকক্ষণ বিমুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকার পর সিয়াম নীলিমার উদ্দেশ্যে বলল,

"মিলির খেয়াল রেখো।ওর যেন কখনো আমাদের বাড়িতে অস্বস্তি বোধ না হয়।তন্ময় বদলে গেলেও আমরা যেন না বদলাই।"

"এটা আবার বলতে হয় নাকি!"

"তাহলে শাড়ি পরার কথা আজকাল কেন আমাকে বলতে হয়?আমার বউটাকে যে আমি শাড়িতে দেখতে পছন্দ করি সেটা কি আমার বউ জানে না?"

"হুম জানি তো।কিন্তু আমার যে আমার স্বামীর থেকে এই আবদারটা শুনতে ভালো লাগে সেটা কি আমার স্বামী বোঝে না?"

সিয়াম হেসে ফেলল।

"আচ্ছা বেশ আমি আবদার করলাম আজকে আবারো তোমার কাছে।রাতে সবাই ঘুমোনোর পরে তুমি শাড়ি পড়বে আর আমি কফি বানাবো।তারপর বারান্দায় এসে গল্প করবো।আজকে আবার তোমাকে সেই প্রথম দিনের মতো দুচোখ ভরে দেখবো।আজ আবারও তোমার মাঝে আমি হারাবো।আজ আবার আমি তোমার জন্য নতুন করে একটু পাগ*লামো করব।"

বিজ্ঞাপন
রিক্ত বসন্ত গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস