রিক্ত বসন্ত

পর্ব - ১৭

🟢

চেয়ারে চুপচাপ পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে মাহবুব।অপেক্ষা করছে কখন মিলি আসবে।আদৌও আসবে কিনা সেসব মাহবুব জানেনা।যদি সিয়ামদের কাছে না থাকে তবে আর কোথায় খুঁজবে?তন্ময় তো বলল এছাড়া মিলির আর কোথাও যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।আর মাহবুবের যতদূর মনে হচ্ছে এত তাড়াতাড়ি পরিচিত কোনো জায়গা ছাড়া মিলি গিয়ে উঠতে পারবে না।যদি শহর ছেড়েও বা গিয়ে থাকে তাহলে কোন ব্যবস্থা না করে কোথায় যাবে?আর যদি কোন ব্যবস্থা করেই থাকতো আগে থেকে তবে তো আর চৌধুরী বাড়িতে উঠত না।

আর ঠিক মিলির খোঁজ করার জন্যই তন্ময়কে ধরা।কেননা মিলির যদি কোন যাওয়ার জায়গা থেকে থাকে তবে সেই সম্বন্ধে তন্ময় অবশ্যই জানবে।আর মিলি এমনিতে কখনই আর মাহবুবের সামনে ধরা দেবে না।কেননা মিলি জানে যদি মাহবুব ওকে খুঁজে পায় তাহলে হয়তো আবার জোর করে নিয়ে যাবে চৌধুরী বাড়িতে। সেজন্যই তন্ময়কে ব্যবহার করছে।জানে তন্ময় কে বাঁচানোর জন্য হলেও মিলি ওর সামনে আসবে।তবে এখন ভীষণ দুশ্চিন্তা হচ্ছে।মিলিকে পাবে কিনা সেই চিন্তা হচ্ছে।

এদিকে তন্ময় কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। খোঁজ দিল তো মিলির তবে এখনও ওকে এখানে ধরে রাখার মানেটা কি?ছেড়ে দিলেই তো হয়।মিনমিনে কন্ঠে পুলিশ অফিসার কে বলল,

“অফিসার,আমি তো খোঁজ দিয়ে দিয়েছি।আর নিশ্চয় এটা বুঝতে পারছেন যে আমি যদি ওর কিছু করে থাকতাম তাহলে খোঁজ দিতাম না। এবার তো আমাকে যেতে দিন।”

অফিসার গম্ভীর গলায় বললেন,

“চুপচাপ বসে থাক।আমাদের কাজ হয়ে গেলে এমনিতেই ছেড়ে দেবো।”

তন্ময়ের এবার রাগ হলো।এই মিলি নামক আপদটা যে কবে ওর পিছু ছাড়বে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।ভেবেছিল চলে এসেছে এখন তন্ময়ের জীবনে শান্তি আর শান্তি।খুব তাড়াতাড়ি জেসির সাথে একটা সুখের সংসার করবে কিন্তু না এ তো পিছু ছাড়ার নামই নিচ্ছে না।জীবনটা একেবারে জ্বা/লিয়ে মারলো।রাগান্বিত গলায় অফিসার কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আপনারা কিন্তু এবার বেআইনি কাজ করছেন। অযথা আমাকে তুলে হ্যারাস করছেন।আমি কিন্তু আপনাদের সবার নামে কেস করবো বলে দিলাম। কি ভেবেছেন ক্ষমতা আছে জন্য যা ইচ্ছে তাই করবেন?আমি বলছি আমি কিছু করিনি,মিলির খোঁজও তো দিলাম তারপরেও আপনারা কথা শুনছেন না।এখন যদি ও নিজের ইচ্ছেতে হারিয়ে যায় তাহলে তার দোষ কি আমার?বারবার বলছি ও বাঁচুক বা মরুক তাতে আমার এখন কিছু যায় আসে না।কথা মাথায় যায় না আপনাদের?”

অফিসার মাথা তুলে অগ্নিদৃষ্টিতে তন্ময়ের দিকে তাকাতেই ও থেমে গেল।ভাবনার জগত থেকে বেরিয়ে এলো মাহবুবও।ওর সম্মুখ চেয়ারে বসা তন্ময়ের দিকে একবার তাকালো।তন্ময় বোধহয় তখনও মাহবুবকে দেখেনি।অফিসারের দৃষ্টি দেখেই থেমে গেছে।মাহবুব চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে তন্ময়ের সামনে দাঁড়ালো।এবারে তন্ময় খেয়াল করলো।তবে এবারে ভয় পেল না।ভয় পেলে চলবে না।যত ভয় পাবে ওরা তত ভয় দেখাবে।

“এভাবে চোখ রাঙাচ্ছেন কেন?আমি কি ভুল কিছু বলেছি নাকি?”

মাহবুব এক হাতে তন্ময়ের শার্টের কলার ধরে ওকে দাঁড় করালো।তন্ময় ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করলো তবে লাভ হলো না।

“কি বললি তুই মিলি বাঁচুক বা মরুক তাতে তোর কিছু যায় আসে না তাই তো?”

তন্ময় মৃদু কম্পিত গলায় বলল,

“হ্যাঁ।ওর সাথে আমার এখন কোনো সম্পর্ক নেই তাহলে ওর যাই হয়ে যাক তাতে আমার কি?”

“তাহলে কিছু বছর আগে আমার পা ধরে কেন বলেছিলি যে ওকে না পেলে,আমি যদি ওর হাত তোর হাতে না দেই তবে তুই ম/রে যাবি?আরে তোর ভালোবাসা দেখে তো আমি আমার বাবাকে রাজি করাতে চেয়েছিলাম।তোর পাগ/লামো দেখে আমি নিজের কথা থেকে সরে গিয়ে তোর আর মিলির বিয়েটা মেনে নিতে চেয়েছিলাম।আমি মিলিকে কথা দিয়েছিলাম যে আমি বাবাকে রাজি করাবো কিন্তু তোরা পালিয়ে বিয়ে করে সবটা শেষ করে দিয়েছিস।আর আজ তুই আমাকে বলছিস আমার বোন বাঁচুক না ম/রুক তাতে তোর কিছু আসে যায় না?এতটা বেঈমান কোন মানুষ হতে পারে?তোর শরীরে মানুষের র/ক্ত বইছে তো?”

“দেখুন আমার শরীরে মানুষের র/ক্ত বইছে না অন্য কিছুর র/ক্ত বইছে তাতে আপনার কি?বলছি তো ছেড়ে দিন আমায়।কোন অপরাধ নেই,অযথা এভাবে থানায় এনে বসিয়ে রেখেছেন।”

মাহবুব অন্য হাত অফিসারের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“আপনার বন্দুকটা দিন তো আঙ্কেল।”

মাহবুব কথাটা বলতেই তন্ময় চোখ বড় বড় করে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,

“বন্দুক দিয়ে কি করবেন?”

মাহবুব তন্ময়ের প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে অফিসার কে বলল,

“বন্দুকটা একটু দিন আঙ্কেল।”

অফিসার আপত্তি জানিয়ে বলল,

“না মাহবুব।তোমার মাথা গরম আছে,এখন তোমার হাতে বন্দুক দেওয়া যাবে না।”

“দিন আমায়।যদি পরিস্থিতি বিগড়েও যায় সামাল দেওয়ার ক্ষমতা আমার আছে।এমনিতেও ওর কিছু হলে কে বাঁচাতে আসবে ওকে?”

“আহা এত মাথা গরম করলে হয় নাকি?আমি এখনো উপস্থিত আছি তো।”

মাহবুব অফিসারের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করলেন যে কিছু করবে না,শুধুমাত্র একটু ভয় দেখাবে।তবে মুখে সেসব বলল না।মুখে বলল তার উল্টো কথা।

“সামনে যে একটা আপদ দাঁড়িয়ে আছে ওর কাহিনী একেবারে শেষ করব।বন্দুকটা দিন।”

অফিসার এবারে দিল।বন্দুকটা হাতে নিয়ে সরাসরি সেটা তাক করলো তন্ময়ের কপালে।তন্ময়ের তখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা।এবারে আর কন্ঠে কোন তেজ অবশিষ্ট রইল না।গলাটা শুঁকিয়ে এসেছে।খেয়াল করলো পুরো শরীর ভয়ে কাঁপছে।তোতলানো গলায় বলল,

“কি করছেন?নামান ওটা।”

“নামানোর জন্য তো ধরিনি।তোর সাহস হয় কি করে আমার বোনকে নিয়ে এসব বলার?আমি তোর এসব কাজে অবাক না হয়ে পারছি না। তোকে আমার এতটাই বিরক্ত লাগছে যে আমি বলতেও পারছি না যে আমি তোকে ঘৃণা করি।কেননা ঘৃণা তো অনেককেই করা যায় কিন্তু তোর প্রতি আমার অনুভূতিটা আমি ঠিক বোঝাতে পারবো না রে।আমি নিজেও বুঝতে পারছি না তোর সাথে ঠিক কি করলে আমি একটু শান্তি পাবো।”

“দেখুন আপনি কিন্তু এবারে বাড়াবাড়ি করছেন।প্লিজ ছেড়ে দিন আমায়।আচ্ছা ঠিক আছে আমি যদি কোন ভুল করে থাকি তার জন্য ক্ষমা চাইছি।মিলি এলে ওর কাছেও ক্ষমা চাইবো। কিন্তু ছেড়ে দিন আমায়।আর বন্দুকটা নামান।ভয় করছে আমার।”

“ক্ষমা চাইলে আমার বোনের জীবনটা ঠিক হয়ে যাবে?তাহলে কি আমি আমার হাসিখুশি বোনটাকে ফেরত পাব?যদি ফেরত দিতে পারিস তাহলে তোকেও ক্ষমা করে দেবো যা।ছেড়ে দেব।আর না পারলে তুই আজ শেষ।”

“আচ্ছা ঠিক আছে আমি সব ঠিক করে দেব।আগে আপনি ছাড়ুন আমায়।”

মাহবুব তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

“নিজের জীবনের কত দাম তাই না?তোকে তো এখনো মা/রিনি তাতেই তোর ভয় করছে।আর আজকে কি অনায়াসে বলে দিলি যে আমার বোন বাঁচুক বা ম/রুক তাতে তোর কিছু যায় আসে।অথচ দেখ আমি জানি আমার বোন তোকে বাঁচানোর জন্য এখানে ছুটে আসবে।একটা অমানুষকে ভালোবেসেছিল মেয়েটা।”

মাহবুব এবার জোরেই ধাক্কা মারলো তন্ময় কে। তন্ময় সোজা মেঝের উপর উপুড় হয়ে পড়ল।খেয়াল করলো কারো একটা পায়ের কাছে গিয়ে পড়েছে।মাথা তুলে তাকাতেই দেখল মিলি।মিলিকে দেখে তন্ময় যেন প্রাণ ফিরে পেল। যাক এবারে অন্তত ওর কিছু হবে না।মিলিকে যখন পেয়েছে মাহবুব এবারে ঠান্ডা হবে।আর মিলির সামনে মাহবুব তন্ময়ের কিছু করতেও পারবে না।মিলি নিশ্চয় আটকাবে।

তন্ময়ের উঠে দাঁড়ানোরও তর সইলো না।কোন মতে সোজা হয়ে বসে অনুনয়ের কন্ঠে মিলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“প্লিজ মিলি আমাকে বাঁচাও।দেখো তোমার ভাই আমাকে মা/রার হুমকি দিচ্ছে।আমি জানতাম তুমি আমাকে বাঁচানোর জন্য নিশ্চয়ই আসবে। মিথ্যে মামলা দিয়ে তোমার ভাই আমাকে এখানে আটকে রেখেছে।প্লিজ তুমি বোঝাও ওনাকে।”

তন্ময়ের কথার মিলি কোন উত্তর দিলোনা।ওকে মেঝে থেকে উঠতেও বলল না।চুপচাপ ওকে পাশ কাটিয়ে মাহবুবের কাছে এলো।মাহবুব মিলিকে জড়িয়ে ধরে চিন্তিত গলায় বলল,

“ঠিক আছিস তুই?বলেছিলাম তো আমি দেশে ফেরা অব্দি একটু অপেক্ষা কর।এভাবে কেউ চলে যায় কাউকে কিছু না বলে।”

মিলি বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,

“যে মুহূর্তে উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম যে ওই বাড়িতে পা রাখাটা আমার জীবনের আরেকটা ভুল সেই মুহূর্তে বেরিয়ে এসেছি ভাইয়া।জীবনটা আমার ভুলে ভরে গেছে।এত অনুশোচনা,এত আফসোস আমি আর নিতে পারছি না।আর এই নিয়ে আমার কোন আফসোস নেই।”

“তোকে আর ওই বাড়িতে ফিরতে হবে না।আমি তোকে আর পিউ কে নিয়ে আলাদা থাকবো।”

“তার দরকার পড়বে না ভাইয়া।আমি নিজের ব্যবস্থা করে নিয়েছি।”

মিলি এবার মাহবুবের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে অফিসারের দিকে তাকালো।ওনাকে মিলি চেনেন।ওর বাবারই বন্ধু।অফিসার নিজেও চিন্তিত গলায় মিলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এভাবে কাউকে কিছু ইনফর্ম না করে তোমার চলে যাওয়াটা ঠিক হয়নি মিলি।মাহবুব কত চিন্তায় ছিল জানো?”

“এসব কথা বাদ দিন আঙ্কেল তার আগে আমায় একটা কথা বলুন,ভাইয়া তন্ময়ের নামে কি কেস করেছে?”

“আপাতত ওর নামে কোন কেস করেনি মাহবুব।”

“আমি করতে চাই।আমার সাথে ঠিক যে যে অন্যায় করেছে তার প্রত্যেকটার আমি সঠিক বিচার চাই।আমি চাই ও এত শাস্তি পাক,এত শাস্তি পাক যেন ওর নিজের প্রতি যে আত্মবিশ্বাস আছে যে ও সাধু সেটা শেষ হয়।আমি চাই ওর মেরুদন্ডটা এমনভাবে ভাঙা হোক যেন কখনো সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারে।আমি চাই ওর এতটা সম্মানহানি হোক যেন কখনো আর কারো দিকে চোখ তুলে তাকাতে না পারে।এই পৃথিবীর সব থেকে নিকৃষ্ট মানুষটাও যেন ওর গায়ে থুথু ফেলে আমি সেটা চাই।ওর এমন অবস্থা করতে হবে যেন ওর সো কলড ভালোবাসা ওকে নিজের আসল রুপটা দেখিয়ে পালায়।”

মিলির কথা শুনে তন্ময় তাজ্জব বনে গেল।যাকে নিজের রক্ষক ভেবেছিল সেই তো এখন তন্ময়কে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করছে।তড়িঘড়ি করে এগিয়ে গিয়ে মিলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এসব কি বলছ তুমি মিলি?আমাদের মাঝে তো সব ঠিকঠাক হয়ে গিয়েছিল।”

মিলি এবারও তন্ময়ের কথার কোন উত্তর দিল না।মাহবুব মিলির কাঁধে হাত রেখে ভরসা দিয়ে বলল,

“তুই যা চাইবি তাই হবে।”

মিলি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে অফিসার কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমি ওর স্ত্রী থাকা অবস্থাতে ও অন্য নারীর সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে আংকেল।আমাকে না জানিয়ে ওষুধ খাইয়ে আমার বাচ্চাটাকে নষ্ট করতে চেয়েছে।মানসিক অত্যাচার করেছে আমার উপরে।গর্ভাবস্থায় বারবার আমাকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলেছে।আমার কোন খরচ বহন করবে না সেই কথা বলেছে।এইসব কিছুর অভিযোগ আছে আমার ওর উপরে।”

তন্ময় এবার মিলিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করিয়ে বলল,

“এই মিলি এসব কি বলছো?আর আমি তো ওসব ভুলে করে ফেলেছিলাম।কিসের কেস করবে তুমি?আর খরচের কথা বলছো আমিতো তোমায় ছয় লাখ টাকা দিয়েছিলাম।”

মিলি এক ঝটকায় নিজের বাহু থেকে তন্ময়ের হাত ছাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“একদম আমাকে ছোঁবে না।কিসের ছয় লাখ টাকা?কি প্রমাণ আছে তোমার কাছে যে তুমি আমায় ছয় লাখ টাকা দিয়েছিল?কোন সাক্ষী আছে?কেউ দেখেছে?আর ভুল?পাপকে ভুল বলছো?আরে ভুল তো করেছি আমি।জীবনে প্রতিটা পদক্ষেপে ভুল করেছি।তোমাকে ভালোবেসে ভুল করেছি,তোমার হাত ধরে পালিয়ে এসে ভুল করেছি,তোমাকে বিয়ে করে ভুল করেছি,তোমার সাথে সংসার পেতে ভুল করেছি। আর সর্বশেষ কি ভুল করেছি জানো?ওই বাড়ি থেকে চলে আসার সময় তোমাকে আবারো নিজের দুর্বলতাটা দেখিয়ে।আমি আরো একবার নিজের চোখে ছোট হয়ে গেছি।আমি আরো একবার নিজের আত্মসম্মানের কাছে হেরে গেছি।তোমার উপরে কি ঘৃণা হবে,আমার নিজের উপর এখন ঘৃণা হচ্ছে যে তোমার মতন একটা মানুষের বুকে মাথা রেখে আমি শেষবার কেঁদেছিলাম।তোমাকে উদ্দেশ্য করে আমার ভালোবাসার হাজারটা লাইন লিখে রেখে এসেছিলাম।আবার এখন নিজের ভাবনার উপরে লজ্জা হচ্ছে এটা ভেবে যে আমি আমার চিঠির শেষে তোমায় বলে এসেছিলাম তুমি আমায় তালাক দিও না।আমি সারা জীবন তোমার স্ত্রীর পরিচয় নিয়ে বাঁচতে চাই।তোমার মতন একটা মানুষের স্ত্রীর পরিচয়ে বাঁচার জন্য আমি তোমাকে অনুরোধ করলাম?ছিঃ।শোনো এখন আমি তোমাকে বলছি তুমি আমাকে কি তালাক দেবে, ঠিক সময় হলে আমি নিজে তোমাকে তালাক দেবো।”

“একটু শান্ত হও মিলি।ঠান্ডা মাথায় ভাবো।দেখো এসব কেস করে কি হবে বলো?শুধু শুধু আমাদের জীবনে অশান্তি হবে।তার থেকে ভালো তুমি তোমার মতো তোমার বাচ্চাকে নিয়ে ভালো থাকো,আমি আমার মত ভালো থাকি।তুমি তোমার বাচ্চাকে ভালো ভাবে মানুষ করো।যদি টাকা-পয়সার দরকার হয় আমি দিয়ে দেব।দেখো তুমি তোমার বাচ্চাকে নিয়ে ভালো থাকো।অযথা নিজের জীবনে আর অশান্তি করোনা।”

বিজ্ঞাপন

“শুধু আমার বাচ্চা তাই না?তোমার কিছু না?আর কোন বাচ্চার দোহাই দিয়ে এখন বাঁচতে চাইছো একটু আগে ফোনে যাকে অভি/শাপ দিলে?আমি বারবার নিজের অপমান গুলো ভুলে গিয়েছি তোমার ভালোবাসার কথা মনে করে।আমি বারবার তোমার কাছে আত্মসম্মান হারিয়েছি কিন্তু যখনই তুমি আবার বাচ্চাকে নিয়ে কিছু বলো না আমি সেটা মেনে নিতে পারি না।আমি এটা বুঝতেই পারি না যে আমার বাচ্চাটাকে নিয়ে সবার এত কিসের সমস্যা?ও তো এই পৃথিবীতেই আসেনি এখনও।ও আমার বেঁচে থাকার অবলম্বন সেটা কেউ বুঝতেই চাইছে না।সবাই শুধু ওর সাথে লাগছে কেন?তুমি আমার বাচ্চা কে নিয়ে ওই কথাগুলো বলে খুব অন্যায় করে ফেলেছো তন্ময়।”

তন্ময় অপরাধী গলায় বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে।আমি স্বীকার করছি আমার অন্যায়টা।আমি অপরাধ করে ফেলেছি আর কখনো এমনটা করবো না।এর থেকে তো অনেক বড় বড় অপরাধ আমার ক্ষমা করে দিয়েছো তুমি মিলি,শেষ একটা অপরাধ ক্ষমা কর।”

“অসম্ভব।তোমার মতন মানুষ কে যত ছাড় দেবো তোমরা তত মাথায় উঠে নাচবে।তোমাদের কে শিক্ষা না দিলে তোমরা সারা জীবনেও শোধরাবে না।আজ বিপদে পড়েছো জন্য তুমি ক্ষমা চাইছো, তাও জানি সবকিছুই নাটক।তুমি তো মানোই না যে তুমি কোন অন্যায় করেছো।তুমি জেসির প্রতি তোমার ভালোবাসাকে আমার প্রতি তোমার ভালোবাসার সাথে তুলনা করো।তুমি বলো জেসি কে ভালোবাসা অন্যায় হলে নাকি আমাকে ভালোবাসাও অন্যায়।অমানুষ কোথাকার?ভালোবাসা আর পাপের মাঝে পার্থক্যই করতে শেখোনি তুমি।আমার এখন আফসোস হচ্ছে নিজের বলা কিছু কথার উপর,কিছু কাজের উপর।তোমার এত অন্যায়ের পরেও তোমার প্রতি আমার যে বিন্দু পরিমাণ ভালোবাসাটুকু বেঁচে গিয়েছিল আজ সেটুকুও আর রইল না।এখন তুমি বাঁচো বা ম/রো তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না।”

কথাটা বলে মিলি বেরিয়ে গেল।ওর পিছন পিছন মাহবুবও গেল।তন্ময় যেতে ধরলে কন্সটেবল ওকে যেতে দিল না।

বাইরে এসে মিলি যেন শ্বাস নিতে পারলো। এতক্ষন তন্ময়ের সামনে দম বন্ধ লাগছিল। শরীরটা এখন ভীষণ খারাপ লাগছে।এত জোরে জোরে কথা বলার জন্য বোধহয় এমনটা হচ্ছে।কান্না পাচ্ছে খুব।একটু কাউকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।একটু খুব করে নিজের ভেতরের সব কষ্ট বোঝাতে ইচ্ছে করছে কাউকে।যতই কষ্ট দেখাক না কেন কিন্তু মিলির ভেতরে যে কি চলছে সেটা কেউ বুঝতে পারবে না পরিপূর্ণভাবে।মাহবুব এসে মিলির মাথায় হাত রেখে বলল,

“ঠিক আছিস তুই?”

“এখন ঠিক আছি ভাইয়া।”

“তুই সত্যি কেস করতে চাস?যদি চাস তাহলে কেস কর,আমি সাহায্য করবো তোকে।আমি আছি তোর পাশে।তন্ময় যে শাস্তি পাবে এটা কিন্তু নিশ্চিত।”

“ওকে তো শুধু আইনের শাস্তি টুকু দিলে হবে না ভাইয়া।ওকে বোঝাতে হবে যে সবাই মিলি না। ওকে যে বোঝাতে হবে ও যাকে ভালোবেসেছে সে শুধুমাত্র ওর চাকরি আর নিজের একটা সিকিওর ফিউচারের লোভে পড়ে ওকে ফাঁসিয়েছে।তন্ময় কে বোঝাতে হবে ভাইয়া যে মিলির মতো সবাই টানাটানির সংসারে হাসিমুখে থাকতে পারেনা।ওকে বোঝাতে হবে যে সবাই নিজের একটা সুখ শান্তিতে ভরা জীবন ফেলে একটা বেকার ছেলের হাত ধরে অনিশ্চিত ভবিষ্যতে পা রাখার সাহস দেখাবে না।মিলির মতো সবাই নিজের ইচ্ছে গুলোকে বিসর্জন দিয়ে সংসারের উন্নতি করতে চায় না।তন্ময় কে বোঝাতে হবে ভাইয়া মিলি ওকে যতটা ভালোবেসেছে এই পৃথিবী শুদ্ধু আর কেউ ওকে তেমনটা ভালোবাসবে না।”

“তাহলে কি করবি?”

“কয়েকটা দিন ওকে জোলে কাটাতে দাও।আমি পরে দরকার হলে কেস তুলে নেব।এখন শুধু একটু ভয় দেখানো দরকার।আমিও যে কিছু করতে পারি ওকে শুধু এতোটুকু বোঝানোর দরকার।ও যে অন্যায় করেছে সেটা ওকে বুঝতে হবে।”

“আচ্ছা ঠিক আছে।এখানে অপেক্ষা কর আমি আসছি।”

মাহবুব ভেতরে গেল আবার।মিলি একটা পিলারের সাথে হেলান দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।শরীরটা এতটাই দুর্বল লাগছে যে মনে হচ্ছে এক্ষুনি বোধহয় মাথা ঘুরে পড়ে যাবে।হঠাৎ কানে একটা ডাক ভেসে এলো।

চোখ খুলে তাকাতেই সামনে এক যুবককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল।মিলির মনে হচ্ছে ছেলেটাকে চেনে কিন্তু কে সেটা এই মুহূর্তে হঠাৎ করে মনে করতে পারছে না।মিলি কে আর কষ্ট করে মনে করতেও হলো না তার আগেই সামনে দাঁড়ানো রাজীব নিজ থেকেই বলে উঠলো,

“আমাকে চিনতে পারছেন না মিলি?আমি রাজিব,তন্ময়ের বন্ধু।”

রাজিব নামটা শুনতে মিলির শরীর ঘৃণায় রি রি করে উঠলো।কথা বলতে ইচ্ছে করলো না তবে রাজীব নাছোরবান্দা।মিলি অবজ্ঞা করলেও শুনবে না।

“কেমন আছেন মিলি?শরীর ঠিক আছে তো?”

“চোখের সামনে থেকে সরে যান।”

“রেগে যাচ্ছেন কেন?আমি তো বলেছি আমি আপনার পক্ষের লোক।”

মিলি রাজীবের দিকে তাকিয়ে বলল,

“তাহলে এখানে কেন এসেছেন?এসেছেন তো নিশ্চয়ই তন্ময়কে ছাড়াতে।আমার বিপক্ষের লোককে ছাড়াতে এসে বলছেন আপনি আমার লোক?”

“না না আমি তন্ময় কে ছাড়াতে কেন আসব? আমিতো শুধু দেখতে এসেছি ওর পরিণতিটা কি হলো।আর তাছাড়া আপনাকে তো আমি বলেছিলাম যে কোন সাহায্য লাগলে আপনি আমায় বলতে পারেন।তন্ময় আপনাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে তো কি হয়েছে।আপনি চাইলে কোনো একটা ব্যবস্থা না হওয়া অব্দি আমার বাড়িতে উঠতে পারেন।আমি সাহায্য করবো তো আপনাকে।আপনার মতন এত সুন্দরী একটা মেয়েকে সাহায্য না করে কি থাকা যায়?বিনিময়ে আপাতত আমার কিচ্ছু চাই না।শুধু আপনাকে দেখতে পেলেই হবে।”

“ভাইয়া!ভাইয়া!”

রাজীবের এমন কথায় প্রেক্ষিতে মিলির মুখ থেকে হঠাৎ এমন ডাকে রাজীব নিজেও একটু ভরকালো।মাহবুব তখন অফিসারের সাথে কথা বলতে বলতে বাইরেই আসছিল।মিলির ডাক শুনে আরো একটু তাড়াতাড়ি ওর দিকে এগিয়ে এসে চিন্তিত গলায় বলল,

“কি হয়েছে?”

মিলি হাতের ইশারায় সামনে দাঁড়ানো রাজীবকে উদ্দেশ্য করে দেখিয়ে বলল,

“তন্ময়ের সাথে সাথে এই লম্পটটারও একটা ব্যবস্থা করতে পারবে ভাইয়া?ও আমায় প্রতিনিয়ত আজেবাজে প্রস্তাব দেয়,আমার সাথে অত্যন্ত খারাপ ভাষায় কথা বলে।”

রাজীব ব্যতিব্যস্ত গলায় বলল,

“রাগ করছেন কেন?আমি তো মজা করছিলাম আপনার সাথে।”

মিলি চেঁচিয়ে উঠে বলল,

“একদম চুপ।পেয়েছিস কি তোরা আমাকে হ্যাঁ?তোদের আমাকে কি মনে হয়?আমাকে এতটা সস্তা মনে হয় তোদের যে একজন ছুঁড়ে মা/রছে তো আর একজন আমাকে লোভ দেখিয়ে কাছে টানতে চাইছে?তোরা পুরুষ জাতি বি/ষের মতন।যে বিষ ধীরে ধীরে আমায় শেষ করে দিচ্ছে।আমাকে কি তোর বাজারের মেয়ে মনে হয়

যে আশ্রয়ের খোঁজে তোর বাড়িতে গিয়ে উঠবো,তোর সাথে আলাদা সংসার করবো? আমাকে কি তোর তন্ময়ের মত মনে হয় যে পরকীয়ায় নামবো?”

রাজীব কে কথাগুলো বলে মিলি অফিসারের দিকে তাকিয়ে বলল,

“তন্ময় কোথায় আঙ্কেল?”

“আমার কেবিনে বসিয়ে রেখে এসেছি।”

মিলি ভেতরে গেল।মিলিকে আবার ফেরত আসতে দেখে তন্ময় চমকালো।একটা আশার আলো দেখতে পেল যেন।তবে মিলির চোখ মুখের অবস্থা দেখে একটু ভয় পেল।তন্ময়কে কিছু বলার সুযোগ দিলোনা মিলি।নিজেই চেঁচিয়ে উঠে বলল,

“আমাকে কোন পরিস্থিতিতে নামিয়ে এনেছো তুমি ভাবতে পারছো একবার?তোমার জন্য আজ আমায় তোমার মতনই কিছু জানো/য়া বাজারের সস্তা মেয়ে ভাবছে।ওরা ভাবছে তুমি আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছো জন্য আমি আশ্রয়ের খোঁজে ওদের বাড়িতে গিয়ে ওদের সাথে নোংরামি করার জন্য উঠবো।এখনো তোমার আর আমার তালাক হয়নি তাতেই তোমার জানোয়ার বন্ধু আমাকে এসব নোংরা প্রস্তাব পাঠাচ্ছে।তুমি আমার জীবন,সম্মান সব কিছু শেষ করে দিয়েছো সেটা কি বুঝতে পারছো?এই সমাজে তুমি আমার কোন মূল্যই রাখনি।শুধুমাত্র তোমার জন্য সবাই আমার দিকে এখন এমন দৃষ্টিতে তাকায় যেন আমি খুবই সস্তা।আমার প্রতি তাদের দৃষ্টি এমন থাকে যে তারা খুব সহজেই আমার অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের নোংরা খিদে মেটাতে পারবে।”

তন্ময় সত্যিই কিছু বুঝলো না।কথা তো হচ্ছিলো এর আগে অন্য বিষয়গুলো নিয়ে এখন আবার মিলি কোন বিষয়ে কথা বলছে?কোন বন্ধুর কথাই বা বলছে?প্রশ্নাত্নক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“কি হয়েছে?কি বলছো বুঝতে পারছিনা।কোন বন্ধুর কথা বলছো?”

“বুঝবে না এটাই তো স্বাভাবিক।আমার কোন কথা তুমি বোঝো নাকি আজকাল?শুধু এতটুকু বুঝে রাখো আমার জীবন তুমি শেষ করে দিয়েছ।তোমার অফিসের কলিগ রাজীব কে চেনো না?এর আগেও তোমার সাথে আমার সম্পর্কের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আমায় ফোন করে নোংরা প্রস্তাব দিয়েছে।এখন তোমাকে ছাড়ানোর জন্য এখানে এসেছে আর বাইরে আমার সাথে দেখা হওয়ার পর আমাকে বলছে ও নাকি আমার পক্ষের লোক।তারপরে কি বলেছে জানো?খুব কষ্ট হচ্ছে আমার বলতে কিন্তু তোমার শোনাটা দরকার।ও বলেছে তুমি আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছো তো কি হয়েছে?আমি যেন অন্য জায়গায় ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত ওর বাড়িতে গিয়ে উঠি।ও আমায় সব রকম সাহায্য করতে রাজি।বিনিময়ে আপাতত আমার থেকে কিছু চায় না।শুধু আমাকে একটু দেখতে পেলেই হবে।”

তন্ময় অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“রাজিব বলেছে এসব তোমায়?”

“বিশ্বাস হচ্ছে না তাই না?হবেই বা কি করে? তোমার চোখে তো রাজীবকে খারাপ লাগবে না কেননা তোমরা দুইজন তো একই শ্রেণীর,একই প্রকৃতির,একই নোংরা মানুষ।তুমি নোংরামি করেছো অন্য একটা মেয়ের সাথে আর তোমার শ্রেণীর আরেকটা লোক নোংরামো করতে চাইছে তোমার স্ত্রীর সাথে।আর সুযোগটা কে দিয়েছে জানো?তুমি।যদি আজ তুমি ঠিক থাকতে তবে কারো সাহস ছিল না আমার দিকে চোখ তুলে তাকানোর।যদি আজ তোমার আর আমার সম্পর্ক ঠিক রাখতে তুমি তাহলে কেউ আমাকে এই নোংরা প্রস্তাবগুলো দিতে পারত না।আমি কোনদিন যেটা করিনি আজ সেটা করছি তন্ময়।আমার জীবন নষ্ট করার জন্য,আমার সম্মান নষ্ট করার জন্য,সবার চোখে আমার মর্যাদা শেষ করার জন্য,আমার বাচ্চাকে অভি/শাপ দেওয়ার জন্য আমি তোমায় অভি/শাপ দিচ্ছি আজ তুমি জীবনেও সুখী হতে পারবে না।তুমি ফিরবে আমার কাছে,তোমায় ফিরতে হবে আমার কাছে।আর সেই দিন তুমি আমার পা ধরে চোখের জল ফেলে যত আকুতিই করো না কেন আমি তোমার হবো না।আর খুব তাড়াতাড়ি আমি তোমায় ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেবো।আমি তোমায় অভি/শাপ দিচ্ছি তন্ময় তুমি আমায় যতটা কাঁদিয়েছো তার থেকে অনেক বেশি কাঁদবে তুমি।এই যে তুমি আজকে আমায় মাঝপথে ছেড়ে দিলে না আমি তোমায় অভি/শাপ দিচ্ছি জীবন একদিন তোমায় এমন পর্যায়ে দাঁড় করাবে যে তুমি তোমার আশেপাশে কাউকে খুঁজে পাবে না।তুমি যেভাবে আমার হৃদয়টাকে মে/রে ফেলেছো,তুমি যেভাবে আমার সন্তানকে মা/রতে চেয়েছো,তুমি যেভাবে আমার অনাগত সন্তানকে অভি/শাপ দিয়েছো আমি তার বিনিময়ে তোমায় অভি/শাপ দিচ্ছি তুমি মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতড়াবে,তুমি ছটফট করবে কিন্তু তোমার মুক্তি মিলবে না সেই যন্ত্রনা থেকে।আমার চোখের জলের প্রতিটা ফোটার দাম তোমায় দিতে হবে আর সেটা এই পৃথিবীতেই দিতে হবে।আমার আল্লাহ তোমার থেকে সব কেড়ে নেবে।তোমার সুখ,শান্তি,স্বস্তি সবকিছু কেড়ে নেবে।তোমাকে পথের কাঙাল বানিয়ে ছাড়বে।আমি কোনদিন তোমাকে এসব বলতে চাইনি কিন্তু আজ তুমি আমায় যেই জায়গায় দাঁড় করেছো আমি তাতে বাধ্য হচ্ছি এই কথাগুলো তোমায় বলতে।শুধু একটা বার ভেবে দেখো তুমি আমাকে কোন পর্যায়ে দাঁড় করালে আমি তোমায় অভি/শাপ দিতে পারি।মিলিয়ে নিও আমার কথাগুলো তন্ময়।শাস্তি তুমি পাবেই।আমার পক্ষে যতটা শাস্তি দেওয়া সম্ভব ততটা তোমায় দেবোই।আর বাকিটুকু আমি আমার আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিলাম।আর মনে রেখো আমি এমন একজনের হাতে বিচারের দায়িত্ব ছেড়ে দিলাম যিনি ছেড়ে দেন না কাউকে।”

কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে মিলি চলে গেল। তন্ময় কিচ্ছু বলতে পারলো না।কোনো প্রতিবাদও করতে পারলো না।একটু রাগও দেখাতে পারল না।এই প্রথম যেন একটু ভয় পেল।একটু যেন উপলব্ধি করতে পারল যে মিলির সাথে ঠিক কতটা অন্যায় করলে এভাবে ওকে অভিশাপ দিতে পারে।এতটাই অন্যায় করেছে যে চাইল যেন তন্ময় মৃত্যুর মাধ্যমেও খুব সহজে মুক্তি না পায়।তন্ময় নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করল,

“আমি কি সত্যি এত অপরাধ করেছি মিলির সাথে?”

_______

বাইরে এসে সিঁড়ির ওপরে বসে পড়লো মিলি। নিজেই দুহাতে নিজের মাথার চুল খামচে ধরলো।আশেপাশের মানুষজন ওকে দেখছে। মাহবুব তাড়াহুড়ো করে এসে বোনের পাশে বসলো।মিলি চিৎকার করে কেঁদে উঠলো।নিজেকে কেমন যেন পা/গল পা/গল লাগছে।মাহবুব দু হাতে মিলিকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করলো,তবে পারলো না।

মিলি চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

“তন্ময় বদলে গেছে ভাইয়া।ও আর আমায় ভালোবাসে না।পুরো দুটো দিন পর আমায় দেখল অথচ একবারের জন্য জিজ্ঞেস করল না আমি কেমন আছি।আমি ওকে পেছনে ফেলে রেখে চলে এলাম একটা বারের জন্যও আমায় আটকালো না।ও এখন কি ভাবছে জানো আমি জানি।ও এখন ভাবছে কবে এসব ঝামেলা থেকে মুক্তি পাবে আর জেসি কে বিয়ে করবে।নিজের উপর,নিজের ভালোবাসার উপর এখন ঘৃণা হচ্ছে আমার।বদলে গেল ভাইয়া তন্ময়।খুব জঘন্যভাবে বদলে গেল।”

মাহবুব কোন কথা বলল না।মিলিকে নিয়ে গিয়ে সোজা গাড়িতে বসালো।মাথায় হাত রেখে বলল,

“তুই দুই মিনিট বস আমি আসছি।”

মাহবুব আবারও ভেতরে তন্ময়ের কাছে গেল।মাহবুবকে দেখে তন্ময়ের ভেতরে কোন আশার আলো জাগলো না যে মাহবুব ওকে বাঁচাতে এসেছে।বেশ নির্জীব লাগলো।মাহবুবের চোখে মুখে এবার সেই রাগী ভাব দেখা গেল না।তন্ময়ের সামনে দাঁড়িয়ে ওর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে অনুরোধ করে বলল,

“ভালো হয়ে যাও।যা করেছো আগে ভুলে যাও সবটা।আমার বোনটাকে বাঁচার একটা কারণ দাও।আগে যেমন ওর অবলম্বন ছিলে এখনো তেমনটা হও।আবার সবটা শুরু করো মিলির সাথে।আমার বোনটা ভালো থাকবে না তোমায় ছাড়া।আমি জানি তুমি যদি এখনো ক্ষমা চাও তোমায় আরো একটা সুযোগ দেবে।জানো বাইরে পাগ/লের মতন কাঁদছিল আমার বোনটা।আমি ওকে জড়িয়ে ধরেছিলাম কিন্তু শান্ত করতে পারিনি।আমি জানি ওখানে যদি শুধু তোমাকে পেত ও তাহলেই শান্ত হয়ে যেত।ফিরে এসো তন্ময়।তোমার যা দরকার আমি তোমায় তাই দেবো।অন্যের কোম্পানিতে তোমায় চাকরি করতে হবে না।তুমি আমাদের কোম্পানিতে থাকবে।তোমায় কর্মচারীর মতন থাকতে হবে না,তুমি মালিকের মতন থাকবে।তুমি বলো আর কি চাও আমি তোমায় সব দেওয়ার চেষ্টা করব।শুধু তুমি ভালো হয়ে যাও।”

মাহবুবের বলা এতগুলো কথার প্রেক্ষিতে তন্ময় শুধু একটা বাক্যে বলল।

“আমি এখন ফেরত যেতে চাইলেও মিলি আর আমায় গ্রহণ করবে না।”

“ভালোবাসে তোমায়।করবে গ্রহণ।ও তোমার সাথে এখনো সংসার করতে চায়।”

তন্ময় তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

“আপনি চেনেন না মিলিকে।আমি চিনি।এখান থেকে যাওয়ার সময় ও আমাকে যে কথাগুলো বলে গেছে সেগুলো শুনলে আপনি আর এই কথাটা বলতে পারতেন না।ও আর সংসার করবে না আমার সাথে।আমি ফিরে গেলেও না।”

“তুমি কি ফিরতে চাও?”

মাহবুবের চোখে মুখে একরাশ উৎকণ্ঠা উত্তরটা জানার জন্য তবে তন্ময় এবার কোন উত্তর দিল না।মাহবুব পুনরায় একই প্রশ্ন করলো কিন্তু তন্ময় এবারও চুপ থাকলো।হয়তো উত্তরটা তন্ময়ের নিজেরও জানা নেই।তন্ময় এখন কি চাইছে,কাকে চাইছে সেটা নিজেও জানে না।হয়তো খানিক সময়ের মোহে পড়ে নিজের পুরা জীবনটা এলোমেলো করে ফেলল।এতদিন যে ভুলটা বুঝতে পারেনি আজ মিলির কথায় কিছুটা হলেও যেন নিজের অপরাধটা অনুভব করতে পারছে।মাহবুব হতাশ হলো।এবারে হতাশ হলো নিজের ওপর।কাকে কি বলতে এসেছে?তন্ময়ের যদি বোধ-বুদ্ধি কাজ করতো তবে তো এরকম একটা জঘন্য কাজে লিপ্তই হতো না।

“তোমার কাছে আসাটাই আমার ভুল হয়েছে।জানিনা কেন এসেছিলাম?বোনের কান্নাটা সহ্য করতে পারিনি তাই হয়ত।তবে এখন মনে হচ্ছে আবার ওকে অপমান করলাম।পস্তাবে তুমি তন্ময়।আমার বোনের জীবনটা শেষ করার দাম তোমায় দিতে হবে।”

কথাটা বলে মাহবুব নিজেও চলে গেল।সবাই তন্ময়কে একটা কথাই বলছে ও পস্তাবে।ও জীবনে ভালো থাকতে পারবে না।আর যাওয়ার সময় অনেকগুলো করে প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে তন্ময়ের জন্য।একটু উত্তরগুলো দিয়ে গেলে কি হয়?তন্ময় এখন বুঝতে পারছে না ও আসলে কি চায়।মাহবুব প্রশ্নের উত্তরটা নিজে দিয়ে গেলে পারতো না কি?তবে তো তন্ময়ের একটু সুবিধা হত বুঝতে যে ও কি চায়।সাহায্য তো কেউ করে না সবাই শুধু ওকে দোষারোপ করেই যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
রিক্ত বসন্ত গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস