“ঠিক আছেন আপনি মিলি?”
হঠাৎ ফরহাদের কন্ঠেস্বর পেয়ে মিলি খানিকটা চমকালো।পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো ফরহাদ দাঁড়িয়ে আছে।চোখেমুখে তার যেমন চিন্তার ছাপ আছে ঠিক তেমনি ক্লান্তির ছাপও আছে।
“হ্যাঁ আমি ঠিক আছি।কিন্তু আপনি আবার আসতে গেলেন কেন?আমি তো লাবিবার সাথেই বাড়ি চলে যেতাম।”
ফরহাদ আলতো হেসে বলল,
“আসলে দায়িত্ব নিয়েছিলাম তো আপনার সেটা ঠিক ভাবে পালন করতে পারলাম কিনা দেখতে হবে না?”
“ফোনেও জানতে পারতেন।”
“আমি নিজের ওপর সন্তুষ্ট হতে পারতাম না।দায়িত্ব নেওয়ার পর শুধুমাত্র ফোনে খোঁজ খবর নিয়ে বড় মুখ করে বলা যে আমি দায়িত্ব পালন করেছি সেসব আমার পছন্দ না।যাইহোক,ওষুধ তো নিশ্চয়ই দিয়েছে।আমায় প্রেসক্রিপশন দিন আমি ওষুধ আনানোর ব্যবস্থা করছি।”
“এত রাতে কি আর কোনো দোকান খোলা পাওয়া যাবে?আজকের রাতটা এমনই কাটাই,কাল ওষুধ কিনে নেব।”
ফরহাদ একটু জোর দিয়েই বলল,
“বললাম তো আমায় দিন।কোথায় থেকে,কি করে আনতে হবে সেসব আমি দেখে নেব।”
মিলি প্রেসক্রিপশনটা দিল।সেই সাথে ব্যাগ থেকে টাকাও বের করে ফরহাদের দিকে বাড়িয়ে দিল।ফরহাদ কিছুক্ষণ টাকাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলো।তারপর ভাবনা-চিন্তা শেষে আলতো হেসে টাকাটা নিল।ওদের ওখানেই দাঁড়াতে বলে নিজে গেল ড্রাইভারের কাছে।ড্রাইভার কে প্রেসক্রিপশন দেওয়া শেষে পুনরায় মিলিদের কাছে এসে বলল,
“আমি ড্রাইভার কে বলে দিয়েছি।উনি আপনার ফ্ল্যাটে দিয়ে আসবে।”
মিলি মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো।পাশে দাঁড়ানো লাবিবা চিন্তিত গলায় বলল,
“তাহলে আমরা এখন বাড়ি ফিরবো কিভাবে?”
ফরহাদ আশ্বস্ত করে বলল,
“আমি আছি তো মিস লাবিবা চিন্তা করছেন কেন?আপনাদের এভাবে এখানে রেখে কি আমি চলে যাবো ভেবেছেন?”
লাবিবা বোধহয় একটু লজ্জা পেল।ইতস্তত গলায় বলল,
“আসলে স্যার ড্রাইভার তো চলে গেল।”
“আমি গাড়ি এনেছি।আপনাদের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে তারপর আমি আমার বাড়ি ফিরবো।চলুন,মিলি আপনিও চলুন।”
এবারে লাবিবা নিশ্চিন্ত হলো।সারা রাস্তা আর কেউই কোনো কথা বলল না,কেবল লাবিবা বাড়ির রাস্তাটা দেখিয়ে দিল ফরহাদ কে।বাড়ির সামনে আসতেই গাড়ি থামালো ফরহাদ।মিলি আর লাবিবা নামলো।ফরহাদও অবশ্য নামলো।মিলি কৃতজ্ঞতার কন্ঠে বলল,
“আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।এই অপরিচিত শহরে আপনি অল্প পরিচিত একটা মানুষ হয়ে আমার জন্য আজ যা করলেন আমি আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকলাম।যদি কখনো সুযোগ হয় আপনার এই ঋণ আমি শোধ করবো।”
ফরহাদ আনমনে কিছু একটা ভেবে মিলি কে বলল,
“আপনার থেকে একটা জিনিস চাইবো মিলি দেবেন?খুব কঠিন আবার সহজও।”
মিলি একটু ভরকালো।সহজ আর কঠিনের সমীকরণটা ঠিক মেলাতে পারলো না।তবুও ফরহাদ কে আশ্বস্ত করে বলল,
“বলুন কি চান।আমার সাধ্যের মাঝে থাকলে কথা দিচ্ছি দেওয়ার চেষ্টা করবো।”
“একটু মন থেকে দোয়া করবেন আমার জন্য যেন আমি আমার জীবনের আনন্দ গুলোকে ধরে রাখতে পারি।আমার জন্য একটু দোয়া করবেন যেন আমি নিজেকে শক্ত রাখতে পারি।এতটুকুই চাওয়ার ছিল আপনার কাছে।”
মিলি বেশ অবাক হলো ফরহাদের কথায়।সামান্য দোয়া চাওয়ার জন্য মানুষটা এভাবে আকুতি জানাচ্ছে?
“এটা তো খুব সহজ একটা জিনিস চাইলেন আপনি তবে কঠিন বললেন কেন?”
ফরহাদ স্বভাব সুলভ আলতো হেসে বলল,
“এই পৃথিবীতে অন্যের জন্য মন থেকে দোয়া করাটা সবথেকে কঠিন কাজ মিলি।দোয়া তো অনেকেই করে কিন্তু মন থেকে কয়জন করে?কতজন সারাজীবন আপনাকে নিজের দোয়ায় রাখে বলুন তো?আপনি যেন সুখে থাকতে পারেন এর জন্য যারা দোয়া করে দেখবেন দিনশেষে আপনার সুখের ওপর তাদেরই নজর পড়বে।আপনার মন পরিষ্কার জন্য আমার চাওয়া জিনিসটা আপনার কাছে সহজ লাগলো।কিন্তু একজন জটিল হৃদয়ের মানুষ কে প্রশ্ন করুন তার জন্য অন্যের হয়ে মন থেকে দোয়া করাটা কতটা কঠিন।”
ফরহাদের কথাটা মিলির কাছে একদমই বাস্তব বলে মনে হলো।মিলি যদি তন্ময়ের কথাই ধরে তাহলেই ফরহাদের কথাটা সত্যি প্রমাণ হয়ে যাবে।মিলি জানে তন্ময় নিজে সুখে থাকবে সেটা ঠিক আছে কিন্তু যদি মিলি কে সুখি দেখে তাহলে ও মোটেও ভালো থাকতে পারবে না।
মিলি কে চুপ করে থাকতে দেখে ফরহাদ হাসলো।সেই প্রসঙ্গে আর গেল না।অন্য প্রসঙ্গ তুলে বলল,
“কাল আপনার অফিসে আসার কোনো দরকার নেই বুঝতে পেরেছেন মিলি?”
মিলি গভীর ভাবনার মাঝে ছিল যার ফলে ফরহাদের কথাটা কানে যায়নি।আদৌও মিলি কে কিছু বলেছে কিনা সে বিষয়েও নিশ্চিত হতে পারছেনা।প্রশ্ন করলো ফরহাদ কে,
“আমায় কি কিছু বললেন?”
“বললাম আগামীকাল আপনার অফিস যাওয়ার কোনো দরকার নেই।”
“কেন?আমি তো এখন ঠিক আছি।”
“আমি নিষেধ করেছি তাই কাল যাবেন না।আমি আপনার বস,আমি আপনাকে বলছি কাল বাসায় থেকেই যা কাজ করার করবেন।আর কোনো তর্ক হোক এ বিষয়ে আমি সেসব চাই না।আসছি।”
মিলি কে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ফরহাদ চলে গেল।মিলি হা করে ফরহাদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো।মানুষটা একটু বেশিই কি মিলির ব্যাপারে খেয়াল রাখছে না?মিলির সুবিধা অসুবিধাগুলো যেন মিলির থেকেও একটু বেশি বুঝছে।
ফরহাদ চলে যেতেই লাবিবা মিলির দিকে একটু এগিয়ে এলো।ফরহাদ আর মিলি কথা বলছিল জন্য সে একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল।কেন ছিল জানে না।তবে মনে হয়েছিল ওদের কথার মাঝে না থাকাই ভালো।যদিও সব কথাই শুনেছে।
“এবারেও তুমি বলবে মিলি যে ফরহাদ স্যারের এই যত্ন গুলো নিতান্তই সাধারণ?হয়ত তোমাদের আগে থেকে পরিচয় ছিল জন্যই ওনার এই দূর্বলতা।”
“তুমি শুনলে না লাবিবা উনি কতটা অসহায় ভাবে আমার থেকে দোয়া চাইলেন?ওনার কথার মাঝে খুব তীব্র একটা অসহায়ত্ব ছিল লাবিবা।আমার মনে হয় আমরা ওনার সম্পর্কে এখনো পুরোপুরি কিছু জানি না।দেখো না অফিস টাইমে উনি হুটহাট কেমন তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যান।আমি কয়েকবার খেয়াল করেছি ওনার কাছে একটা কল এলেই কেমন যেন অস্থির হয়ে ওঠেন।আর তার পরপরই বেরিয়ে যান।”
“সেসব হয়ত ওনার ব্যক্তিগত বিষয়।কিন্তু তোমার প্রতি ওনার যথেষ্ট দূর্বলতা আছে।”
“উঁহু।যদি আমি ওনার দূর্বলতা হতাম তাহলে আজ ওনার যত গুরুত্বপূর্ণ কাজই থাকুক না কেন উনি প্রথমেই আমাকে নিতে আসতেন।ওনার দূর্বলতা অন্য কিছু লাবিবা আর আমি ওনার কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া একটা দায়িত্ব।”
লাবিবা এবারে মৃদু বিরক্তি নিয়ে বলল,
“আচ্ছা ধরে নাও তুমিই ওনার দূর্বলতা তাহলে কি করবে?”
“ভুল জিনিস কে আমি আর প্রশ্রয় দেই না লাবিবা।আর না আমি নিজে কখনো আর ভুল কিছুতে জড়াতে চাই।”
_________
এত সকাল সকাল তন্ময়কে ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বেশ অবাক হলো রাজীব।সচরাচর তন্ময় ওর বাড়িতে আসে না।আজ তো একেবারে কোন আগামবার্তা না দিয়েই চলে এসেছে।এদিকে জেসি আছে এখানে।যদি তন্ময় জেসি কে দেখে নেয় তবে কি অজুহাত দেবে?এদিকে তন্ময়ের ভাব-ভঙ্গিও ঠিক ভালো লাগছে না।দেখে মনে হচ্ছে কোন কারণে হয়তো রেগে আছে।তবে তন্ময়ের সামনে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করতে হবে।রাজীব আন্তরিকতা মেশানো গলায় বলল,
“আরে তন্ময় তুই এখন?ভেতরে আয়।”
তন্ময় রাজীবের কথার কোন উত্তর না দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“তুমি মিলি কে আজেবাজে কিছু বলেছিস?”
তন্ময়ের মুখ থেকে হঠাৎ এই প্রশ্নটা রাজীব বোধহয় আশা করেনি।কিঞ্চিৎ বিস্মিত গলায় বলল,
“হঠাৎ মিলির কথা কোত্থেকে এলো?”
“মিলি বলে ডাকছিস কেন?আগে কি বলে ডাকতি ওকে?”
রাজীব ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“সেটা আগে তোর বউ ছিল বলে ভাবি বলে ডাকতাম এখন তো আর তোর বউ নেই।”
তন্ময় জোর গলায় বলল,
“ও এখনো আমার বউ আছে।আমার বউ বুঝতে পেরেছিস?ওর দিকে চোখ তুলে তাকাবি না।ও যেখানেই যাক,যেমন ভাবেই থাকুক কিন্তু তারপরও এখনো ও আমার বউ।ওর দিকে নোংরা দৃষ্টি দিলে তোকে মে/রে ফেলবো আমি।”
তন্ময়ের কথাগুলো শুনে বোধহয় রাজীবের বেশ হাসি পেল।খুব একটা গায়েও লাগালো না তন্ময়ের কথাগুলো।ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,
“তোর লজ্জা নেই না?কোন মুখে তুই এখনো মিলিকে নিজের বউ বলছিস?আর শোন,হ্যাঁ আমি মিলি কে কল করেছিলাম।ওর উপরে আমার নোংরা দৃষ্টিও পরেছে,ওকে আমি খারাপ প্রস্তাবও দিয়েছি।আর এই সুযোগগুলো আমাকে কে তৈরি করে দিয়েছে জানিস? তুই।তুই যখন দিনের পর দিন তোর বউকে নিয়ে নোংরা নোংরা কথা বলতি আমার সঙ্গে তখন হুশ ছিল না যে ও তোর বউ?জেসির সাথে সম্পর্কে জড়ানোর সময় হুশ ছিল না যে ও তোর বউ?এখন তো তুই ওকে ছেড়ে দিয়েছিস এখন আমি ওর সাথে যা ইচ্ছে তাই করবো তাতে তোর কি?আমি আবার ওকে এসব প্রস্তাব দেব, আমি আবার ওকে কল করব।দেখি তুই আমার কি করিস।”
রাজীব নিজের কথা শেষ করতেই ওর নাক বরাবর সজোরে একটা ঘু/ষি বসালো তন্ময়।রাজীব মুখ থুবড়ে মেঝের উপরে পড়লো।মৃদু আর্তনাদও করে উঠলো।তন্ময় ওর কলার ধরে মেঝে থেকে টেনে তুলে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“বলেছিলাম না তোকে মে/রে ফেলবো ওর দিকে তাকালে।আমি মিলির সাথে যা করেছি সেটা আমার আর মিলির ব্যাপার।তুই কেন এর মাঝে ঢুকছিস?তুই কেন এসবের সুযোগ নিবি?”
কথাটা বলে আরো দু-চারটে চ/ড় লাগালো রাজীবের গালে।এদিকে এমন চেঁচামেচির আওয়াজ পেয়ে ভেতরের ঘর থেকে জেসি ছুটে এলো দেখার জন্য যে হচ্ছেটা কি।ড্রয়িং রুমে এসে একেই তো তন্ময়কে দেখে অবাক হলো,তার উপর আবার রাজীব তন্ময়ের হাতে মা/র খাচ্ছে।এক মুহূর্তের জন্য জেসির মনে হলো যে তন্ময় বোধ হয় সব বুঝে ফেলেছে।ওর আর রাজীবের মাঝে কি সম্পর্ক চলছে সেটা বোধহয় জেনে গেছে।মুহূর্তের মাঝে জেসির নিজেকে পা/গল পা/গল মনে হলো।কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না।জেসি তো জানে রাজীব কখনোই ওর স্থায়ী ঠিকানা হতে পারে না।সংসার করতে হলে তন্ময়ের মতন ছেলেকেই দরকার,রাজীবদের দিয়ে কখনো সংসার হয় না।এদিকে রাজীব তন্ময়ের হাতে মা/র খেয়েই যাচ্ছে তো খেয়েই যাচ্ছে।জেসির মনে হলো এবার গিয়ে আটকানো উচিত।ঘটনা আরও বাড়ার আগে ক্ষমা চেয়ে নিলে হয়তো তন্ময় ভুলে যাবে।ভালোবাসে তো ওকে।
ছুটে গিয়ে তন্ময়কে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে অপরাধী গলায় বলল,
“তন্ময় প্লিজ ছাড়ো রাজীবকে।আমি জানি আমি ভুল করেছি প্লিজ ক্ষমা করে দাও।ছাড়ো রাজীবকে।”
হঠাৎ করে জেসির কন্ঠ পাওয়ায় তন্ময় চমকালো।রাজীবের কলারটা ছেড়ে দিয়ে জেসির দিকে তাকিয়ে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“তুমি এখানে কি করছো?”
তন্ময়ের প্রশ্নটা জেসির মাথার উপর দিয়ে গেল।যদি ওর আর রাজীবের সম্পর্কের কথা জেনেই তন্ময় রাজীবকে মে/রে থাকে তাহলে জেসি যে এখন এখানে থাকবে কথাটা তো স্বাভাবিক তন্ময়ের জন্য।তবে প্রশ্ন করল কেন?
জেসি তন্ময়ের কাঁধের পিছন দিয়ে রাজীবের দিকে তাকাতেই দেখল রাজীব ওকে চুপ করতে বলছে।সেই সাথে আশ্বস্তও করলো যে রাজীব আর জেসির সম্পর্কের কথা কিছু আন্দাজ করতে পারেনি তন্ময়।এদিকে জেসি কে চুপ করে থাকতে দেখে তন্ময় মৃদু ধমক দিয়ে বলে উঠলো,
“একটা প্রশ্ন করেছি তো আমি জেসি।তুমি রাজীবের বাড়িতে কি করছো?”
জেসি তৎক্ষণাৎ একটা অজুহাত বানিয়ে বলল,
“আসলে তন্ময় তুমি তো জানো আমার চাকরি নেই।রাজীব বলেছিল একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেবে সেটা নিয়ে আলোচনা করতে এসেছিলাম।”
“অজুহাত দিচ্ছ না তো?ওর তো নিজেরই চাকরি নেই তোমাকে চাকরির ব্যবস্থা করে দেবে কিভাবে?ওর কাছে যদি এতই চাকরি থাকতো তাহলে তো নিজেই করতো তাই না?”
“আরে রাজীব তো চাকরি পেয়েছে।ওর কাজিনের হাজবেন্ডের কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছে।ও বলেছিল আমারও ওখানে চাকরির ব্যবস্থা করে দেবে।তুমি চাইলে তোমার চাকরির ব্যবস্থাও করে দেবে।”
“তুমি ভাবলে কি করে ওর সাহায্য নিয়ে আমি চাকরি করব?আজ থেকে ওর সাথে আমার সব সম্পর্ক শেষ।”
রাজীবের অভিব্যক্তি ভীষণ স্বাভাবিক।তন্ময়ের হাতে এত মা/র খাওয়ার পরেও পাল্টা কোন আঘাতই করেনি তন্ময়কে।এখনো যে ঠিক কি করবে সেসব জেসি বুঝতে পারছে না।অবশ্য সমস্যার সূত্রপাতই তো সে জানে না।
“আচ্ছা তুমি রাজিব কে মা/রছিলে কেন?”
“সেসব জেনে তোমার কোন কাজ নেই।তবে তোমাকে একটা কথা বলে রাখি,আমার সাথে সম্পর্ক রাখতে গেলে রাজীবের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে।ওর বাড়িতে তোমার আসা আমার ভালো লাগেনি।ভেবোনা আমি ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে গেছি।চোখ আমারও আছে,বুদ্ধি আমারও আছে।”
তন্ময়ের কথাটা শুনে রাজীব হাসল।মনে মনে ব্যঙ্গ করে বলল,
“তাই নাকি?জানতাম না তো।ঠিক আছে এবার তোকে প্রমাণ দেবো যে তোর বুদ্ধি আছে কি নেই।”
তন্ময় চলে যেতে নিলে রাজীব ওকে আটকালো।তন্ময় রাগান্বিত গলায় বলল,
“একদম আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করবি না রাজীব।সামনে থেকে সর।”
রাজীব অপরাধী গলায় বলল,
“আচ্ছা ভাই ঠিক আছে ভুল হয়ে গেছে আমার।আমি বুঝতে পেরেছি আমি ভুল করেছি।আসলে তুই তো জানিস মেয়েদের ব্যাপারে আমার একটু কম কন্ট্রোল থাকে।আর মিলি এত সুন্দর..”
মিলির নামটা নেওয়ার সাথে সাথে তন্ময় পুনরায় চোখ রাঙিয়ে শাসিয়ে বলল,
“ওর নামও তুই মুখে নিবি না।তোর কন্ট্রোল থাকে কি থাকে না সেসব অন্য মেয়েদের ক্ষেত্রে দেখাবি,মিলির ক্ষেত্রে একদমই না।আমার হাত থেকে বাঁচলেও ওর ভাইয়ের হাত থেকে কিন্তু বাঁচবি না।আর তার থেকেও বড় কথা তুই তন্ময় না যে মিলি তোকে ছেড়ে দেবে।মনে রাখিস ও এখনো আমায় ভালোবাসে জন্য আমাকে ছেড়ে দিয়েছে কিন্তু তুই যদি নোংরামি করিস তোকে ছেড়ে দেবে না কিন্তু।”
“আচ্ছা ঠিক আছে ভুল হয়ে গেছে আমার।বুঝতে পেরেছি তো।এখন বন্ধুত্বটা নষ্ট করিস না,কত বছরের বন্ধুত্ব আমাদের।”
“কোন দরকার নেই বন্ধুত্বটা রাখার।”
“আহ্ আবার রাগ করছিস কেন?ভুলে গেলি আমি তোর জন্য কি কি করেছি?আরে ভাই তোর জন্য জেল অব্দি খাটলাম।”
“আমার জন্য জেলে যাসনি,নিজের জন্য গিয়েছিলি।”
রাজীব এবারে খুব কষ্টে নিজের রাগটা নিয়ন্ত্রণ করে মুখে জোর পূর্বক একটা হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“আচ্ছা আমার জন্যই জেল খেটেছি।তাও এবার ক্ষমা করে দে।জেসি তুমি অন্তত কিছু বোঝাও।”
জেসি এগিয়ে এসে তন্ময়ের হাতটা ধরে অনুরোধের গলায় বলল,
“ভুল করতেই পারে তন্ময় তাই বলে এভাবে সম্পর্ক শেষ করে দেবে?আর তাছাড়া মিলির কথা নিয়ে তুমি এখনও এত রাগ করছ কেন?আমি আছি তো।মিলির কথা এত মনে করার কি আছে?আমার ভালো লাগেনা।”
তন্ময় গম্ভীর গলায় বলল,
“আমারও আজ তোমায় রাজীবের বাড়িতে দেখে ভালো লাগেনি জেসি।রাজীবের সাথে তোমার অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা আমি এতদিন কিন্তু খুব স্বাভাবিকভাবে নিয়েছি কিন্তু আজ তুমি সোজা ওর বাড়িতে চলে এসেছো,যে জিনিসটা আমার মোটেও ভালো লাগেনি।চলো এখান থেকে।”
কথাটা বলে জেসির হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে গেল তন্ময়।রাজীব শুধু ওদের যাওয়ার পথে তাকিয়ে হাসলো।বিড়বিড় করে বলল,
“আজ শান্ত ছিলাম মানে কি ভেবেছিস তন্ময় তোকে কিছু করার ক্ষমতা আমার নেই?আজকে আমার গায়ে হাত তুলে তুই ঠিক করিসনি।তুই ভাবছিস আমি বদলা নেব না?দেখ তোর সাথে কি করি।”
______
“তুমি কিন্তু এবার অযথাই আমার উপরে সন্দেহ করছো তন্ময়।”
“আমাকে কিছু না জানিয়ে তুমি রাজীবের ফ্ল্যাটে কেন গিয়েছিলে?ওর সাথে তোমার সম্পর্কের সূত্রপাত আমার সূত্র ধরে।আর তাছাড়া ওর স্বভাব চরিত্র কেমন তুমি জানো না?”
জেসি মৃদু ব্যাঙ্গাতক গলায় বলল,
“আজ মনে হচ্ছে ওর স্বভাব চরিত্রের কথা?যখন আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল তখন মনে হয়নি?”
“তখন তো বুঝিনি যে একসময় ওর সাথে সম্পর্কটা এই পর্যায়ে নেমে আসবে।”
তন্ময় থামলো।ভীষণ রাগ হচ্ছে ওর।শুধু যে রাজীবের উপরে রাগ হচ্ছে তা না জেসির উপরেও হচ্ছে।তবে জেসির ওপরে রাগটা সম্পূর্ণ দেখাতে পারছে না।অন্যান্য সময় হলে হয়তো এতোটুকু রাগও দেখাতো না। তবে তন্ময় এখন একটা বিষয় খুব ভালো করে বুঝে গেছে যে যাই হয়ে যাক না কেন জেসি ওকে ছাড়বে না। আর ঠিক সেই সুযোগটাই কাজে লাগাতে চাইছে।তন্ময়ের এখন মনে হচ্ছে জেসি কেও একটু ভয়ের মাঝে রাখাটা দরকার।একটু বোধহয় বেশি ছাড় দিয়ে রেখেছিল এতদিন।
এদিকে তন্ময় কে এত রেগে যেতে দেখে জেসি সত্যিই চিন্তায় পড়ে গেছিল।তার উপরে আবার সন্দেহ করছে।যে করেই হোক পরিস্থিতিটা সামাল দিতে হবে।
“তন্ময় শোনো না এখন আর রাগ করো না।তুমি সকালে কিছু খেয়েছো?”
তন্ময় গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“না।”
“খাওনি কেন?”
তন্ময় একবার চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“খাব কি করে?কেউ কি আমায় রান্না করে দিয়েছে?মিলি কি বাড়িতে আছে যে আমার সামনে গরম ভাত তরকারি রেঁধে রেখে দেবে?বাইরের খাবার আর কত খাব?আমি খেতে পারি না এত বাইরের খাবার।”
“মিলি নেই তো কি হয়েছে আমি আছি না।চলো তোমার ফ্ল্যাটে চলো,আমি রান্না করে দেব।”
তন্ময় তৎক্ষণাত আপত্তি জানিয়ে বলল,
“কোন প্রয়োজন নেই।এমনিতেই আমাকে ফ্ল্যাটটা ছেড়ে দিতে বলেছে তোমার জন্য।বিয়ের আগে আর তুমি আমার ফ্ল্যাটে আসবেনা।আচ্ছা জেসি চলো বিয়ে করে নেই।”
জেসি একটু আমতা আমতা করে বলল,
“এখনই বিয়ের কথা তুলছো কেন তন্ময়?তোমার তো এখন আর চাকরি নেই।এর মাঝে যদি বিয়ে করি তাহলে তোমার খরচ তো আরো বেড়ে যাবে,
তুমি চালাবে কি করে সংসার তখন?”
“মিলিকে যখন বিয়ে করেছিলাম তখনও আমার কোন চাকরি ছিল না।সংসার তো তখনো চলেছে,এখনো চলে যাবে।”
“তখন কিভাবে চলেছে আমি জানিনা কিন্তু এখন চলবে না।তুমি আগে একটা ভালো চাকরি জোগাড় করে নাও তারপরে বিয়ের কথা।”
তন্ময়ের কপালে সুক্ষ্ম ভাঁজের সৃষ্টি হলো।জেসির দিকে দু কদম এগিয়ে এসে সন্দেহী গলায় বলল,
“তুমি আমায় ঠকাচ্ছো না তো?সত্যি বিয়ে করবে তো আমায়?ভালোবাসো তো আমায়?”
জেসি থতমত খেল।মেকি হেসে বলল,
“হ্যাঁ তন্ময় ভালোবাসি তো তোমায়।”
“তাহলে বিয়ে করতে চাইছো না কেন?”
“তোমার ভালোর জন্য।দেখো একটা সংসারের কম খরচ না।এখন বিয়ে করলে সেসব নিয়ে তুমি চিন্তায় থাকবে।আমি তোমার কথা ভেবেই এই সিদ্ধান্তটা নিয়েছি।আই লাভ ইউ বেইবি।”
তন্ময়ের গালে রাখা জেসির হাতটা তন্ময় সরিয়ে দিল।একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“আমার নেওয়া সিদ্ধান্ত গুলো কে ভুল প্রমাণ করো না জেসি।তুমি ভাবতেও পারবেনা আমি তোমাকে পাওয়ার জন্য কি ছেড়েছি।তাই বলছি আমাকে ভুল প্রমাণ করো না।”