“তোমার হাজব্যান্ড তোমাকে এই অবস্থায় চাকরি করতে পাঠালো এতদূর এই ব্যাপারটা না আমার একদমই ভালো লাগলো না মিলি।”
লাবিবার কথা শুনে মিলি হাসলো।যে মেয়েটার সাথে ফ্ল্যাটে থাকে সেই মেয়েটার নামই লাবিবা।মেয়েটা বেশ ভালো,চঞ্চল স্বভাবের,হাসি খুশি।সেই সাথে খুব অল্প সময়ের মধ্যে মিলির সাথে বেশ ভাব জমিয়ে ফেলেছে।
মিলি তো স্বভাবে প্রচণ্ড শান্ত হয়ে গিয়েছে আজকাল।কেউ প্রশ্ন করলে শুধু সেটুকুর উত্তর দেওয়ারই প্রয়োজন মনে করে।একটা শব্দও বাড়তি উচ্চারণ করতে পছন্দ করে না।সেখানে মেয়েটা ওকে কথা বলতে বাধ্য করছে।একটা মিনিট মেয়েটার মুখ বন্ধ থাকে না।
মিলিকে হাসতে দেখে লাবিবা ভ্রুঁ কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“আমি এখানে হাসার মতন কি বললাম তোমায় মিলি?”
মিলি আবারো হেসে বলল,
“হাসার মতন কথাই তো বললে।অবশ্য তুমি তো কিছু জানো না তাই তোমার এমনটা মনে হওয়াই স্বাভাবিক।”
“কি জানিনা আমি?”
মেয়েটার কন্ঠে দারুন উৎসাহ জানার জন্য যেটা ও জানেনা।চোখ মুখ তার চিক চিক করছে উৎকণ্ঠায়।শুধু যেন পারছে না মিলির পেটের ভেতর থেকে সব কথা টেনে বের করতে।তবে মিলির আজকাল আর এসব কথা বারবার তুলতে ভালো লাগেনা।বারবার সবাইকে নিজের হেরে যাওয়ার গল্প গুলো শোনাতে ভালো লাগে না।তবে কেন যেন লাবিবার এত আগ্রহ দেখে আর না বলে থাকতে পারলো না।
“আমি আর আমার হাজব্যান্ড দুজনে আলাদা থাকছি। ওর সাথে বর্তমানে আমার কোন সম্পর্ক নেই।”
লাবিবার রান্নার হাতটা থেমে গেল।মিলিকে কাজ করতে দেয়নি মেয়েটা।বলেছে রান্নার দায়িত্বটাও সামলে নেবে।মিলির এখন একটু বিশ্রামের দরকার।এমনিতেই ওকে দেখে মনে হয় যে শরীরটা ভীষণ দুর্বল,চোখের নিচে কেমন কালি জমেছে,সব সময় কেমন যেন একটা ছন্নছাড়া হয়ে থাকে।রোগা পাতলা মেয়েটা কে দেখে মনে হয় একটু ফু দিলেই যেন উড়ে যাবে।যদিও এতটা দুর্বল এখনো মিলি হয়নি তবে লাবিবার দৃষ্টিতে মিলি কে ঠিক এমনই মনে হলো, সেজন্য রান্নাটা করতে দেয়নি।
তবে মিলির বলা এই কথাটা যেন ঠিক বিশ্বাস হলো না।চোখ বড় বড় করে অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“সত্যি বলছো তোমরা সেপারেশনে থাকো?”
“অবাক হচ্ছ কেন এত?আজকাল তো এটা খুবই সাধারণ ঘটনা।”
“না মানে তুমি এত সুন্দর দেখতে,শিক্ষিত,আবার প্রেগনেন্ট মানে কেন,কিভাবে কি হলো?”
মিলি শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“সে যদি সরাসরি বলে দেয় যে তোমাকে আর ভালোবাসতে পারি না,তখন এসব সৌন্দর্য,উচ্চ শিক্ষা,বাচ্চা কোন কিছুই তাকে আটকাতে পারে না।যে একবার যাওয়ার জন্য মনস্থির করে তুমি আর হাজার চেষ্টা করলেও তোমাতে তার মন আটকে রাখতে পারবে না।”
“কত বছরের সংসার তোমার?”
“বলতে পারো মোট ৮ বছরের।চার বছর কল্পনার সংসার আর চার বছর বাস্তবের।”
“মানে?”
“মানেটা হলো আমরা ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম।আমাদের চার বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল।ওই চারটে বছর আমি আমার কল্পনায় একটা খুব সুন্দর সংসার সাজিয়েছিলাম।আর আমার বিয়ের প্রথম দুটো বছর ঠিক সেই কল্পনার মতন সংসার করেছি।খুব ছোটখাটো,সাদামাটা,গোছানো একটা সংসার।আর পরের দু বছরে কথা নাহয় নাই বলি।এই হলো আমার মোট আট বছরের সংসার।চার বছর কল্পনার,চার বছর বাস্তবের।”
লাবিবা যেন এবারে আরো অবাক হয়ে গেল। এতদিনের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেল?এতদিনের সম্পর্কে আবার হঠাৎ করে ভালোবাসা উধাও হয়ে যায়?তার মধ্যে আবার প্রেমের সম্পর্ক।লাবিবার আগ্রহ আরো বাড়ল মিলির সম্পর্কে জানার জন্য।আগ্রহী গলায় প্রশ্ন করল,
“আমাকে বলবে কেন এসব হলো?”
সত্যি বলতে মিলির এখন বলতে ইচ্ছে করছে না।এক কথা ঘুরেফিরে তুলতে আর ভালো লাগছে না।আবার মেয়েটাকে যদি সোজাসুজি না করে দেয় তাহলে হয়তো কষ্ট পাবে।মিলি একটু বুঝিয়ে বলল,
“অন্য কখনো বলি তোমাকে গল্পটা?আসলে আমি না একটু গুছিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি।আমাকে একটু নিজেকে গোছানোর সময় দাও।তারপর না হয় তোমায় একদিন বলবো।আমি এখনো অগোছালো আছি।এর মাঝে আবার যদি সেই পুরনো কথাগুলো তুলি না আমি আবার আরো অগোছালো হয়ে যাব।আমি একটু নিজেকে আবার উঠে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছি।আমাকে এটুকু সময় দাও আচ্ছা?তারপরে তোমায় শোনাবো সব।”
লাবিবা তাড়াহুড়ো কণ্ঠে বলল,
“কোন ব্যাপার না।আমারই ভুল হয়েছে তোমার থেকে এখন এসব শুনতে চাওয়া।আমিও না আস্ত একটা গা/ধা।”
মিলি হাসলো।যাক মেয়েটা তবে বুঝেছে,অবুঝ না।লাবিবা আবারও রান্নায় মনোযোগ দিল। মিলিও অবশ্য চুপ করে আছে তেমনটা না।হাতে হাতে টুকটাক কাজ করে দিয়েছে।রান্নার মাঝে হঠাৎ করে লাবিবার রান্নার হাতটা থেমে গেল।গ্যাসটা বন্ধ করল।মিলির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলো,
“তুমি খুব কষ্টে আছো তাই না মিলি?”
মিলি আলতো হেসে বলল,
“মৃত্যুর পর কেউ কি আর কোন কষ্ট অনুভব করতে পারে?আমিও পারিনা।কষ্ট শব্দটা আমার অনুভূতিকে বোঝানোর জন্য খুবই ছোট।আমাকে খু/ন করা হয়েছে লাবিবা,খুব জঘন্যভাবে আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ আমায় তিলে তিলে খু/ন করেছে।সে আমার ভালোবাসাকে খু/ন করেছে,আমার বিশ্বাসকে খু/ন করেছে।তাহলে তো বলতে হচ্ছে আমি বেঁচে নেই।তবে এখন আর কষ্টে থাকবো কি করে?”
_____
প্রায় ১০ দিন পর অবশেষে তন্ময় জেল থেকে ছাড়া পেল।সুঠাম দেহি,সুদর্শন চেহারার তন্ময়ের দশদিনে হাল বেহাল হয়ে উঠেছে।দেখে মনে হচ্ছে শুকিয়ে গেছে।চেহারার যত্ন না নেওয়ার কারণে গায়ের ফর্সা রংটা শ্যামবর্ণ ধারণ করেছে।চুলগুলো উসকো খুশকো লাগছে।কত দিন সেখানে যেন কারো হাত পড়েনি।গায়ের কাপড়চোপড়ে মনে হচ্ছে চিমটি কাটলে এখন হাতেই ময়লা উঠে আসবে।আর সেই সাথে বিমর্ষ চেহারা।এক ফোঁটা হাসি নেই সেখানে।সিয়াম বাদে আর কেউই দেখা করতে আসেনি এই কয়দিনে।সেই যে একদিন সিয়াম এসেছিল তারপর অবশ্য আর ও আসেনি।আসবেই বা কেন?সিয়াম তো মিলির পক্ষের তবে তন্ময় কে দেখতে আসবে কেন?
তবে তন্ময় সব থেকে বেশি অবাক হয়েছে বাড়ি থেকে কেউ না আসায়।একটাবারের জন্য তাই বলে কেউ দেখা করতে এলো না?কারো ওর জন্য একটু চিন্তা হলো না?একটু পরোয়া করলো না?ভীষণ রাগ এজন্য তন্ময়ের মনে।এটাও ঠিক করেছে যাদের ওর জন্য চিন্তা হয় না আজ থেকে তন্ময় নিজেও তাদের নিয়ে চিন্তা করবেনা।
বাইরে বেরিয়ে রাস্তার ধারে গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল মাহবুবকে।তবে সেদিকে তন্ময়ের এগিয়ে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে হলো না।তন্ময়কে দেখতেই অবশ্য মাহবুব নিজেই এলো।মুখে তার একটা স্বস্তির হাসি লেপ্টে আছে যা তন্ময়ের গায়ে জ্বা/লা ধরালো।
“কেমন লাগলো এই কয়দিন জেলে কাটাতে?”
“আপনার বোনের সাথে থাকতে যতটা কষ্ট হয়েছে তার থেকে বোধহয় ভালোই ছিলাম।”
“তাহলে তো তোকে ছাড়ানোটাই ভুল হলো রে আমার।আবার ঢুকবি নাকি জেলে?”
“আমি না করলে তো আপনি শুনবেন?
ছেলে খেলা পেয়েছেন তো।কেস করছেন যখন ইচ্ছে, আবার যখন ইচ্ছে কেসটা তুলে নিচ্ছেন।ক্ষমতা আছে জন্য যা ইচ্ছে তাই করছেন তাই না?”
“তোর মতন জা/নো/য়ারে/র উপর কেস করতে কোন ক্ষমতার দরকার হয় না রে।যেকোনো সাধারণ মানুষই তোর মতন ইত/র কে শাস্তি দিতে পারে।তবে তোর এই গলার জোরটা আমাকে ভীষণ বিরক্ত করছে।গলা নামিয়ে কথা বল।এবার কিন্তু আর জেলে পাঠাবো না।এবার আর এটা ভাববো না যে আইন তোর ব্যবস্থা করবে।এবার কিন্তু আমি নিজে তোর ব্যবস্থা করব।”
“কি করবেন মে/রে ফেলবেন?আমাকে মা/রলে আপনার বোন আপনাকে ছাড়বে না।”
তন্ময়ের শেষের বাক্যটায় দারুন আত্মবিশ্বাস প্রকাশ পেল।সেই সাথে ঠোঁটে একটা কুটিল হাসি ফুটে উঠলো।মাহবুব যেন অবাক না হয়ে পারলো না।এই ছেলেটা এমন কেন?এখনো কি করে মিলিকে নিয়ে এতটা আত্মবিশ্বাস দেখাচ্ছে?কোন মুখে মিলির সম্বন্ধে এই কথাগুলো বলছে?আচ্ছা ওর কি মানসিক সমস্যা আছে?মানসিকভাবে অসুস্থ না হলে মাহবুবের মন হলো এমন কথা বলা উচিত নয়।প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“তোর কি মানসিক সমস্যা আছে?তুই এখনো কোন মুখে কথাটা বলিস আমি যদি তোকে মে/রে ফেলি আমার বোন আমাকে ছাড়বে না?ওকে নিয়ে এখনও এই আত্মবিশ্বাসটা দেখাস কি করে?তুই কি সত্যি মানুষ?”
“কেন বললাম জানেন?কারণ আপনার বোন বলে এখনো ও আমাকে ভালোবাসে।আর যদি ওর ভালোবাসাটা সত্যি হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই আমার খু/নিকে ছাড়বে না।সেজন্যই বলেছি।এর থেকে বেশি আর কিছু না।”
“তোর চাকরিটা কিন্তু আর নেই।”
তন্ময় বেশ স্বাভাবিক গলাতেই বলল,
“এটা জানা কথা।আপনি যখন এত কিছু করতে পেরেছেন তবে চাকরিটা যে কেড়ে নিতে পারবেন এটা স্বাভাবিক।আর তাছাড়া এমনিতেও আপনি আমার সাথে যা করেছেন তারপর ওই কোম্পানিতে আমি আর ফেরত যেতাম না কাজের জন্য।”
“তোর কি মনে হয় তোর প্রেমিকা এখন তোকে বিয়ে করবে?আচ্ছা এই যে কয়টা দিন তোকে একটা বারের জন্য দেখতে এলো না,কোন খোঁজ খবর নিলো না,তোকে বাঁচানোর কোন চেষ্টা করল না এতেও কি তোর মনে হয় না যে যার ভালোবাসায় তুই এমন উন্মাদ হয়ে উঠছিস সে আসলে তোকে ঠকাচ্ছে?”
তন্ময় জানে না মাহবুবের এই প্রশ্নের উত্তরটা কি দেবে।প্রশ্ন তো ওর নিজের মনেও হাজারটা আছে জেসি কে নিয়ে।আর জেসি কে সেইসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।সেই সাথে উত্তর দিতে হবে রাজীব কে।ওর সাহস কি করে হয় মিলির দিকে খারাপ নজর দেওয়ার?ওর সাহস হয় কি করে মিলিকে এসব নোংরা প্রস্তাব দেওয়ার?হ্যাঁ তন্ময় মানছে যে ও মিলিকে আর ভালোবাসে না,মিলির সাথে আর থাকতে চায় না তাই বলে তন্ময়ের স্ত্রীর দিকে অন্য কেউ নজর দেবে এটা তো তন্ময় মেনে নিতে পারে না।কেননা এখনো তো মিলির সাথে ওর ডিভোর্সটা হয়নি।সময় লাগবে সেটা হতে।তন্ময় যা ইচ্ছে তাই করতে পারে,অন্য মেয়ের সাথে পরকীয়ায় জড়াতে পারে,তাকে ছোঁয়ার জন্য উন্মাদ হয়ে উঠতে পারে,মিলির সাথে খারাপ আচরণ করতে পারে তাই বলে মিলি অন্য সম্পর্কে জড়াবে এটা কি করে সম্ভব?মিলির দিকে কেউ চোখ তুলে তাকাবে এটাও সম্ভব না।মিলি করতে পারে না এমনটা।
ভাগ্যিস তন্ময় নিজের ভাবনা গুলো মনের মাঝে লুকিয়ে রাখল।কেননা যদি বলে ফেলতো তবে মাহবুবের হাতে যে এখানে আবার মা/র খেত এ ব্যাপারে নিশ্চিত।
মাহবুবের আর ইচ্ছে করছে না তন্ময়ের সাথে কথা বলতে।ওকে দেখলেই কেমন যেন রাগ হচ্ছে।
বারবার মনে পড়ছে নিজের বোনের কথা।মেয়েটা শুধুমাত্র ওর জন্য আজ নিজের শহর ছেড়ে,নিজের মানুষগুলোকে ছেড়ে চলে গেছে।অবশ্য শুধু যে একা তন্ময় দায়ী সেটাও তো না।ওর বাড়ির লোকজনও দায়ী।যদি একটু ওরা মিলি কে সহযোগিতা করতো,একটু মিলির মনের অবস্থাটা বুঝতো তবে হয়তো আজকে মিলিকে যেতে হতো না এই শহরটা ছেড়ে।একা একা এই অবস্থায় থাকতে হতো না,একটু যত্ন পেতো মেয়েটা,একটু ভালোবাসা পেতো,মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার মতন কাউকে পেতো,একটু কারো কাঁধে মাথা রেখে কাঁদার মতন একটা মানুষ পেত।কিন্তু কেউ কিছু হতে দিল না।মেয়েটাকে কেউ বুঝলো না।মেয়েটার কষ্ট,অসহায়ত্বগুলো কেউ বুঝলো না।সবাই শুধু নিজেদের স্বার্থ বুঝে গেল।যাওয়ার আগে মাহবুব শুধু তন্ময়কে একটাই কথা বলে গেল এবং বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে গেল।
“তুই দেখিস আমার বোন খুব সুখে থাকবে।ওকে শুধু একটু নিজেকে সামলে উঠতে দে আমি ওর সুখের ব্যবস্থা করব।আমি চেষ্টা করব ওর জীবনে এমন কাউকে আনতে যে ওকে তোর থেকে হাজার গুণ বেশি ভালো রাখবে।যার ভালোবাসা ওকে তোর মতন একটা শয়/তানের কথা ভুলিয়ে দেবে।আর তুই যে সুখের আশায় আমার বোনকে এতটা কষ্ট দিলি মিলিয়ে নিস আমার কথা তুই সেই সুখ এই দুনিয়ার কোথাও খুঁজে পাবি না।”
কথাটা বলে মাহবুব চলে গেল।আবারো কতগুলো প্রশ্ন রেখে গেল তন্ময়ের জন্য।আবারও একটা জঘন্য ভাবনার মাঝে ছেড়ে রেখে গেল তন্ময়কে।আর কি বলে গেল মাহবুব?মিলির জীবনে আবার নতুন করে কাউকে আনবে?সত্যিই মিলি গ্রহণ করবে নতুন কাউকে?মিলি তো বলেছিল যে ও সারাজীবন তন্ময়ের স্ত্রীর পরিচয়ে বাঁচতে চায় তবে নিশ্চয়ই আর অন্য কাউকে গ্রহণ করবে না।নিজেই নিজের ভাবনার উপর বিরক্ত হলো তন্ময়।মিলি কাউকে বিয়ে করুক বা না করুক,ভালোবাসুক বা না বাসুক,জীবনে কেউ আসুক বা না আসুক তাতে তন্ময়ের কি?তন্ময় নিজে সুখে থাকলেই তো হলো।বাদ বাকি মিলি জাহা/ন্নামে যাক সেসব তন্ময়ের দেখার কিছু নেই।
_____
গত কয়েকদিন হলো বেশ ব্যস্ততার মাঝে দিন কাটছে মিলির।দীর্ঘ একটা সময় অফিসে কাজ করতে হয়।একনাগারে এতক্ষণ বসে থাকতে ভীষণ কষ্ট হয়।তবে কিছু করার নেই।কাজ তো একটা করতেই হবে।তবে নিজের সাথেও বলা যায় এক প্রকার যুদ্ধ করছে।নতুন কাজ সবটা বুঝতে,শিখতে ভীষণ বেগ পেতে হচ্ছে মিলিকে।মাঝে মাঝে তো আফসোস হচ্ছে এটা ভেবে যে কেন সেই আগের স্কুলের চাকরিটা ছেড়েছিল। শিক্ষকতা পেশাটা মিলির বরাবরই সবথেকে বেশি পছন্দের।অন্য কোন পেশা মিলি কে কখনও এতটা টানেনি যতটা শিক্ষকতা টেনেছে।আর সত্যি বলতে পছন্দের পেশাটা যদি কষ্টের হয় তবুও তাতে একটা তৃপ্তি পাওয়া যায়।মিলি ঠিক করেছে খুব তাড়াতাড়ি কোন একটা ভালো স্কুল বা কলেজে চাকরি খোঁজার চেষ্টা করবে।
লাঞ্চ টাইমে দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য মিলি ক্যান্টিনে গেল।খুব ভারি কিছু খেতে ইচ্ছে করল না।একটা স্যান্ডউইচ কিনে খেল।৫ মিনিটের মধ্যে খাওয়া-দাওয়া সব শেষ করে আবার নিজের কাজের জায়গায় এসে বসলো।তৎক্ষণাৎ একজন লোক এসে মিলি কে বলল যে ফরহাদ ওকে কেবিনে ডাকছে।মিলি আগেই আর ল্যাপটপটা চালু করল না।অমনি সব কিছু রেখে গেল।
“মে আই কাম ইন স্যার?”
ফরহাদ তখন হাতে থাকা ফাইলপত্রে গভীর মনোযোগ দিয়ে বসে ছিল।কারো কণ্ঠস্বর পেতে দরজার দিকে তাকালো।মিলিকে দেখেই তার মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠল।হাতের ফাইলটা পাশে রেখে হাস্যজ্জ্বল গলায় বলল,
“নিশ্চয় মিলি আসুন।”
মিলি ভিতরে আসতেই ফরহাদ ওকে চেয়ার ইশারায় দেখিয়ে বলল,
“আপনি বসুন,দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না।”
“না সমস্যা নেই।এতক্ষণ বসে ছিলাম।একটু দাঁড়িয়ে থাকলে কিছু হবে না।”
“আপনি বসুন।এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে আমার কথা বলতে অসুবিধা হবে।”
মিলি বসলো।আজেবাজে কোন কথা বলার জন্য না সে এখানে এসেছে না তার কোন ইচ্ছে আছে বাড়তি কোন কথা বলার।তাই সরাসরি কাজের প্রশ্ন করলো,
“আমায় ডেকেছিলেন?”
“হ্যাঁ।আসলে আপনার সাথে কিছু কথা ছিল।”
“হ্যাঁ বলুন।”
“তার আগে বলুন লাঞ্চ করেছেন?”
“হ্যাঁ করেছি।কি কথা সেটা বলুন।”
“আসলে বলতে চাইছিলাম যে এভাবে রোজ রোজ এতটা পথ অফিসে এসে,একটানা এতক্ষণ বসে থেকে আপনার কাজ করতে নিশ্চয় অসুবিধা হবে।আপনি চাইলে কয়েকটা মাস ওয়ার্ক ফ্রম হোম করতে পারেন।আপনি চাইলে সপ্তাহে এক দুদিন অফিস আসতে পারেন আর যদি অসুবিধা হয় তাহলে না আসলেও কোন সমস্যা নেই।আপনি বাসায় বসে যতটুকু সম্ভব কাজ করবেন।কোন প্রেসার নেই।”
ফরহাদ মিলির সুবিধার জন্যই যদিও কথাটা বলল,মিলিও বুঝলো যে এতে ওর সুবিধা হবে তবে ব্যাপারটা মানতে একটু অসুবিধা হলো।সবাইতো রোজ রোজ অফিসে আসে,সবারই তো একটানা এতক্ষণ বসে থাকতে সমস্যা হয় তাহলে এভাবে আলাদা করে মিলির কথাটা ভাবার কি আছে?মনের প্রশ্নটার ভেতরে চেপে রাখলো না।সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
“কিন্তু আমি আলাদা সুযোগ সুবিধা কেন পাবো? আপনি আমাকে কেনই বা এই সুযোগটা দেবেন?”
“আপনি একটু বিশেষ সেজন্য।”
ফরহাদের এবারের কথাটা মিলির আরো অপছন্দ হলো।কন্ঠে এবার হালকা গাম্ভীর্যতা এনে বলল,
“আমি বিশেষ কেন?আমাকে বিশেষ ভাবে ট্রিট করার কোন মানেই হয় না।আর তাছাড়া আমার এভাবে একটানা বসে কাজ করতে অফিসে আসতে অসুবিধা হবে কেন?”
“আপনি জানেন কেন।”
“কিন্তু আপনি জানলেন কি করে?”
“মাহবুব স্যার বলেছেন।”
মিলির কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ সৃষ্টি হলো।প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ভাইয়ার সাথে আপনার কখন কথা হলো?কেন কথা হলো?আর আমাকে নিয়ে কথা উঠলোই বা কেন?”
ফরহাদ স্বভাব সুলভ আলতো হেসে বলল,
“সে সব কথা বাদ।ওটা আমার আর মাহবুব স্যারের মাঝের কথা।দেখুন মিলি আপনি আমার পরিচিত।মাহবুব স্যার আমার ভীষণ কাছের।ওনার উপরে আমার অনেক ঋণ আছে।আপনাকে এই কথাটা বলার কারণ যদি আপনার অসুবিধা হয় তাহলে আপনার ভাইয়াও কষ্ট পাবেন।এর থেকে বেশি কিছু না।”
“কিসের ঋণ?যদি আমার ধারণা খুব ভুল না হয়ে থাকে তবে তো আপনাদের আমাদের ওপর ক্ষোভ থাকা উচিত ছিল তাই না?বিয়েটা ঠিক হওয়ার পর আমি আপনাকে বলেছিলাম বিয়েটা ভেঙে দিতে।এটা তো একটা আপনাদের জন্য অপমানই বলা চলে।ইভেন আমি তন্ময়ের জন্য আপনার সাথে একটু রুড বিহেভ করেছিলাম।তারপরেও ভাইয়ার প্রতি আপনার কিসের এত ঋণ আর আমাকেই সুযোগটা দেওয়ার মানেটা কি?”
“আপনাকে সুযোগটা দেওয়ার পুরো কারণটা মাহবুব স্যার।উনি বয়সে,অভিজ্ঞতায়,সম্মান সব দিক থেকে আমার থেকে বড়।ট্রাস্ট মি আমি ওনাকে ভীষণ সম্মান করি।সেজন্যই আমি ওনাকে মাহবুব স্যার বলে ডাকি।উনি আমায় অনেক সাহায্য করেছেন আমার ব্যবসাটা দাঁড় করাতে।আমার ডুবে যাওয়া ব্যবসাটা উনি বাঁচিয়েছেন।আমাকে মেন্টালি সাপোর্ট বলুন বা ইকনোমিকালি সাপোর্ট বলুন যখন যা সাহায্য প্রয়োজন হয়েছে উনি আমায় করেছেন।কাল যখন ওনার সাথে কথা হয় আমার আমি ওনাকে আপনার কথা বলি তখন উনি আমাকে খুব রিকুয়েস্ট করেন যেন আমি দেখি আপনার কোন অসুবিধা না হয়।একটা সম্পূর্ণ অচেনা শহরে আপনি আপনার শরীরের এই অবস্থায় একা থাকছেন অন্তত অফিসের কাজের ব্যাপারটায় যেন আমি একটু হলেও আপনাকে কম প্রেসার দেই।আমি সেই জন্যই আপনাকে কথাটা বললাম।আর আমাদের বিয়ের ব্যাপারটা বাদ দিন।ওসব অতীত।”
মিলি এবারে হয়তো বুঝলো ফরহাদের কথাটা।তবে তারপরও এত মানুষের মাঝে আলাদা করে সুযোগটা নেওয়া বোধহয় ঠিক হবে না।আজকাল মানুষের কথা মিলির আর সহ্য হয় না।আর মিলি চাইলেও তো কারো মুখ বন্ধ করতে পারবে না।পারবে নিজেকে সামলাতে।এবারে আর ফরহাদকে কোন রাগ দেখালো না।কন্ঠে সেই গাম্ভীর্যতাটাও রাখলো না।বরং একটু কৃতজ্ঞতা ভরা কন্ঠে বলল,
“দেখুন স্যার আপনি যে আমায় এতটা সাহায্য করতে চেয়েছেন এটাই আমার জন্য যথেষ্ট।আর আমি তো জেনে রাখলাম যে যদি কখনো আমার সমস্যার কারণে অফিস না আসতে পারি কোন সমস্যা হবে না।যদি কখনো একান্তই আমার শরীরটা অতিরিক্ত খারাপ করে আমি সেই দিন বরং ছুটিটা নেব।তবে আমি চেষ্টা করবো নিয়মিত অফিসে আসার।”
ফরহাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“আমি আবারো আপনাকে বলছি মিলি,আমি মাহবুব স্যারের কাছে চির কৃতজ্ঞ।আপনি ওনার বোন।উনি আমার কাছে আপনার বিষয়ে কিছু অনুরোধ করেছেন আমি চাই ওনার অনুরোধটা রাখতে।আপনি চাইলে কিন্তু ওয়ার্ক ফ্রম হোম করতেই পারেন।”
“জানেন তো আমার ভাইয়া আমায় নিয়ে খুব চিন্তা করে।কিন্তু আমার ভাইয়াকে না এখন বুঝতে হবে যে আমায় কষ্ট করেই চলতে হবে।ধীরে ধীরে কষ্ট সহ্য করতে করতে আমায় নিজেকে শক্ত করে তুলতে হবে।যেদিন আমার শরীরটা অতিরিক্ত খারাপ করবে আমি সেদিন অফিসে আসবো না।তাছাড়া আমি আসার চেষ্টা করব।আর আরেকটা অনুরোধ,আমার ভাইয়ার কথাতে হলেও আমাকে আলাদা করে কোন সুযোগ দেবেন না।বিশ্বাস করুন আমার মানুষের কথা এখন আর সহ্য হয় না।আমি নিজের প্রতি নোংরা ইঙ্গিত সহ্য করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছি,আর পারবো না।আশা করছি আর কিছু বলতে হবেনা আপনাকে।”
ফরহাদ বুঝলো মিলির কথার মানে।মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে আশ্বস্ত করলো।