রিক্ত বসন্ত

পর্ব - ১৬

🟢

মিলির খবরটা পাওয়ার পর কাজ শেষ করে পরেরদিনই দেশে ফিরল মাহবুব।বাড়ি ফিরে প্রচন্ড চেঁচামেচি করল।পিউয়ের থেকে যখন শুনলো যে ওর খালা আর মামি এসে আজেবাজে কথা বলে গেছে তখন আরো রেগে গেল।সেই সাথে মিথিলাকে পরিষ্কার করে বলে দিলো যেন ওরা কোনদিন আর এই বাড়িতে পা রাখতে না পারে।যেখানে ওর বোন থাকতে পারেনি সেখানে বাইরের কোন মানুষও আর আসবেনা।

কথাটা বলে মাহবুব বেরিয়ে গেল।মিলি তন্ময়ের সাথে কোথায় থাকতো সেই ঠিকানা মাহবুব জানে।মিলি কে আনতে গিয়েছিলো ওখান থেকে।আর সময় ব্যয় না করে গাড়ি বের করে আগে সেখানেই গেল।দারোয়ানের থেকে মিলি কোন ফ্ল্যাটে থাকতো সে খোঁজ নিয়ে উপরে গেল কিন্তু উপরে গিয়ে দেখল ফ্ল্যাটে তালা দেওয়া।বাধ্য হয়ে পাশের ফ্ল্যাটে নক করলো।দরজা খুলে সামনে অপরিচিত কাউকে দেখে জ্যোতি ভ্রুঁ কোঁচকালো। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কাকে চাই?”

মাহবুব ইশারায় পাশের ফ্ল্যাট দেখিয়ে বলল,

“এই ফ্ল্যাটে যে থাকতো মিলি,ওকে তো চেনেন নিশ্চয়ই?”

মিলির নামটা শুনতেই জ্যোতির কপালের মাঝে সুক্ষ্ম ভাঁজ সৃষ্টি হলো।ভাবলো তন্ময় কাউকে মিলির খোঁজ নিতে পাঠিয়েছে।তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে মাহবুবের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

“মিলির খোঁজ নিয়ে আপনি কি করবেন?”

“আমি ওর ভাই মাহবুব।আপনি কি বলতে পারবেন যে ও এখন কোথায় আছে?মানে গতকাল কি এসেছিল এখানে?”

মাহবুব নামটা শুনতেই জ্যোতির সন্দেহ আরো বাড়লো।কেননা জ্যোতি তো জানে যে মিলি ওর বাপের বাড়িতে গিয়েছে।তাহলে যদি সত্যি মিলির ভাই হয়ে থাকে তাহলে মিলির খোঁজ করবে কেন?এবারে যেন নিশ্চিত হয়ে গেল যে তন্ময়ই মিলির খোঁজ নেয়ার জন্য এনাকে পাঠিয়েছে।রাগান্বিত গলায় বলল,

“আপনাকে তন্ময় মিলির খোঁজ নেওয়ার জন্য পাঠিয়েছে তাই না?নিজে আমার সাথে পেরে ওঠেনি জন্য এখন মিলির ভাই সাজিয়ে আপনাকে পাঠিয়েছে।”

মাহবুব দুদিকে মাথা দাড়িয়ে বলল,

“না না আমাকে তন্ময় পাঠায়নি।আমি সত্যি মিলির ভাই মাহবুব।”

“মিলি তো আপনার সাথেই গিয়েছিল আপনাদের বাড়িতে তাহলে আপনি যদি সত্যি মিলির ভাই হয়ে থাকেন তবে খোঁজ করছেন কেন ওর?”

“মিলি গিয়েছিলো আমার সাথে,আমি ওকে নিয়ে গিয়েছিলাম আমাদের বাড়িতে কিন্তু তারপরে আমি আমার ব্যবসার কিছু কাজে দেশের বাইরে গিয়েছিলাম।আর বাড়িতে কিছু ঝামেলা হওয়ার কারণে মিলি কাউকে কিছু না বলেই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে।ট্রাস্ট মি আমি মিলির ভাই মাহবুব চৌধুরী।বিশ্বাস না হলে আপনাকে আমি ছবি দেখাচ্ছি আমাদের দুজনের একসাথে।”

মাহবুবকে সত্যিই মিলির সাথে ওর আগের তোলা কয়েকটা ছবি জ্যোতি কে দেখাতে হলো বিশ্বাস করানোর জন্য।তবে এবারে জ্যোতি চিন্তায় পড়ে গেল।ও তো জানে না মিলি কোথায় গেছে।কাল থেকে ফোন করছে ফোনটাও বন্ধ দেখাচ্ছে।ভেবেছিলো হয়তো বাড়িতে গেছে সবার মাঝে ব্যস্ত আছে কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে অন্য কারবার।চিন্তিত গলায় বলল,

“আমি তো জানি না।আমি তো ভেবেছি আপনার সাথে আছে সেজন্য নিশ্চিন্তে আছি।”

শেষ আশার আলোটাও নিভে গেল।মাহবুব এখন কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না।তন্ময়ের খোঁজ করলো এবার।তন্ময়ের নামটা শুনতেই মুহূর্তের মাঝে জ্যোতির অভিব্যক্তি বদলে গেল।রাগান্বিত গলায় বলল,

“ওর খোঁজ করছেন কেন?আপনার মনে হয় ওর মতন অমানুষ মিলির খোঁজ রাখবে?”

“আচ্ছা কি হয়েছে ওদের দুজনের মাঝে আমায় একটু এক্সাক্টলি বলতে পারবেন?আমি মিলির সাথে এই নিয়ে কথা বলার সুযোগই পায়নি।আমি বুঝতে পারছি ওদের দুজনের মাঝে ঝামেলা হয়েছে কিন্তু কি নিয়ে ঝামেলা হয়েছে সেসব কি জানেন কিছু?”

জ্যোতি একে একে সবটা বলল।মাহবুব দুহাত মুষ্টি বদ্ধ করে নিজের রাগটা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলো।সাথে মনে মনে খুব অল্প সময়ের মাঝে অনেক কিছু ভেবে ফেলল যা যা তন্ময়ের সাথে করা যায় কিংবা করা উচিত।তবে এখন তন্ময়ের কথা ভাবার থেকেও দরকার মিলির খোঁজ করা।

জ্যোতি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আচ্ছা আপনার কি এমন কোন জায়গা সন্দেহ হয় যেখানে মিলি যেতে পারে?বা ওর কার সাথে সম্পর্ক আছে,কোন বন্ধু-বান্ধব বা অন্য কোন কেউ?”

“ওর কোন যাওয়ার জায়গা ছিল না জন্যই তো আপনাদেরকে এত অনুরোধ করে ওখানে গেল।আর কোথায় যাবে?”

“ওর কোন বন্ধুর বিষয়ে কিছু জানেন?”

জ্যোতি মস্তিষ্কে একটু জোর খাটালো।মনে করার চেষ্টা করে বলল,

“ওর একটা বন্ধুর কথা আমি শুনেছি,সিয়াম আর নীলিমা।ওরা দুজন হাসবেন্ড ওয়াইফ।”

নামটা মাহবুবের পরিচিত লাগলো।হ্যাঁ এদের নাম তো মাহবুব নিজেও শুনেছে।কলেজ ফ্রেন্ড মিলির।তন্ময়ের সাথে বিয়ের পেছনেও যে ওদের অবদান আছে সেটাও জানে।তবে ওদের সম্বন্ধে তো এখন কিছুই জানে না।

আবারো জিজ্ঞেস করল,

“ওদের ঠিকানা দিতে পারবেন বা কোন নাম্বার?”

যদি হতাশ গলায় বলল,

“ক্ষমা করবেন।আমি এসব কিছু জানি না।”

“আপনি কেন ক্ষমা চাইছেন?আপনি আমার অনেক সাহায্য করেছেন।এতোটুকু জানানোর জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।আমি এখন আসছি।”

“আচ্ছা।আর মিলি কে খুঁজে পেলে ওকে একটু বলবেন যেন আমাকে জানায়।খুব চিন্তা হচ্ছে ওর জন্য।মেয়েটা অনেক কষ্ট নিয়ে এই বাড়ি ছেড়েছে।ওর একটু খেয়াল রাখবেন যেন আর কষ্ট না পায়।”

মাহবুব মাথা নাড়িয়ে চলে যেতে নিলে জ্যোতি ওকে থামালো।ওর মুখ দেখে মনে হচ্ছে যেন কিছু বলতে চায়।মাহবুব আশ্বস্ত করে বলল,

“নিশ্চিন্তে বলতে পারেন কি বলতে চান?আপনি কি আর কিছু তথ্য দিয়ে আমায় সাহায্য করতে পারবেন?”

“দেখুন আমি বলি কি আপনি একবার তন্ময়ের সাথে যোগাযোগ করুন।যেহেতু মিলির বন্ধু তার মানে তন্ময়ও নিশ্চয়ই চেনে।আর আরেকটা কথা তন্ময় কে বিশ্বাস করবেন না।ও একটা অমানুষ।যে নিজের সন্তানকে মে/রে ফেলার কথা ভাবতে পারে তার কাছে মিলি কোন ব্যাপারই না।আপনি ওর কাছে যান।ও জানলেও জানতে পারে।আবার যদি কোন ক্ষতি করে মিলির।”

কিছু সময়ের জন্য মাহবুবের মাথাটা কাজ করা বন্ধ করে দিল।কি করবে বুঝতে পারছে না।না মিলির কোন ক্ষতি হতে পারে না।তাহলে যে মাহবুব ভাই হিসেবে ব্যর্থ হয়ে যাবে।বোনকে দেওয়া কথা রাখতে পারবে না।আর সময় ব্যয় করল না।গাড়িতে উঠে গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে তৌফিক এর নাম্বারে কল দিল।একবারেই তৌফিক কলটা রিসিভ করল।

“হ্যাঁ মাহবুব বলো।এতদিন পর যে?কি খবর?”

মাহবুবের কানে একটা কথাও গেল না।ব্যস্ত গলায় বলল,

“তৌফিক ভাই,তন্ময় কি এখনও আপনার অফিসেই চাকরি করে?”

“হ্যাঁ এখানেই চাকরি করে।কিছুদিন আগে তো তোমাদের কোম্পানির সাথে ডিল হলো সে প্রজেক্টটা তন্ময় লিড করছিলো।তুমি জানো না?”

“না আমি জানি না।ওটা অন্য জনকে আমি দেখার দায়িত্ব দিয়েছি।ও এখন কোথায় বলতে পারবেন কি?”

“অফিসে,কাজ করছে।”

“ওকে বের হতে দেবেন না।আমি আসছি।”

মাহবুবের কণ্ঠ শুনে তৌফিক ভালো কিছুর আভাস পেল না।প্রশ্নাত্মক জিজ্ঞেস করল,

“কি করতে চাইছো তুমি?আর মিলি কি তোমায়…”

“ও বলেনি কিন্তু জানতে পেয়েছি সব।আপনি জানতেন?”

“হ্যাঁ জানতাম কিন্তু মিলি তোমায় কিছু জানাতে নিষেধ করেছিল।ভেবেছিল তুমি রাগারাগি করতে পারো বেশি তাই।”

“সেটা তো করতেই হবে।ওই জানো/য়ারের বাচ্চার সাহস হয় কি করে আমার বোনের সাথে এসব করার।আজ তো ওকে ওই অফিসেই আমি পুঁ/তে রেখে আসব।”

“মাহবুব মাথা গরম করে কিছু করবে না।তুমি অফিসে এসো আমরা বসে কথা বলি।আর মিলি কোথায়?”

“আমার বোনকেই তো খুঁজে পাচ্ছি না।কে জানে কোথায় আছে।আমার তো ভয় হচ্ছে ওই জা/নো/য়া/রের বাচ্চা না কিছু করে বসেছে আমার বোনটার সাথে।আর এখন মাথা ঠান্ডা রাখার কোন প্রশ্নই আসছে না তৌফিক ভাই।আমাকে আজকে আটকানোটা অসম্ভব।আপনি শুধু দেখবেন ও যেন অফিস থেকে না বের হতে পারে।আসছি আমি।”

_______

অফিসে আজ হঠাৎ করে এবং প্রথমবারের জন্য পুলিশকে দেখে সবাই একটু বিচলিত হয়ে পড়ল। আশেপাশে গুঞ্জন তৈরি হলো যে ব্যাপারটা কি?তবে তাদের সাথে ভেতরে মাহবুবকে প্রবেশ করতে দেখে তন্ময়ের অন্তর আত্মা যেন শুকিয়ে গেল।বাকিরা কেউ কিছু আন্দাজ করতে না পারলেও তন্ময় যেন অনেক কিছুই বুঝতে পারল।সাথে এটাও বুঝল যে মিলির সাথে ওর বাপের বাড়ির সম্পর্ক ঠিক হয়ে গেছে।

কিন্তু তন্ময়ের সাথে এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না?মিলি তো বলে গিয়েছিলে যে ওর সাথে আর কোন লেনাদেনা নেই তাহলে মাহবুবকে এখানে পাঠানোর মানেটা কি?

মাহবুবকে এখানে উপস্থিত অনেকে চেনে,অনেকেই চেনে না।নাম জানলেও এখনো সামনাসামনি ঠিক দেখা হয়নি।তন্ময়ের ডেস্কটা একটু কোণার দিকে।মাহবুব আগে এতগুলো মানুষের মুখের ভিড়ে তন্ময় কে খুঁজলো।

তন্ময় তখন মাথা নিচু করে নিজের পুরো মনোযোগ ল্যাপটপের ওপর রেখেছে।খুব করে চাইছে যেন মাহবুব ওকে দেখতে না পায়।যেনও অদৃশ্য হয়ে যায় হঠাৎ করে।তন্ময় খেয়াল করল কিবোর্ড এর উপরে থাকা আঙুলগুলো কাঁপছে।ধীরে ধীরে হাত দুটো থেকে যেন শক্তি হারিয়ে ফেলছে।মাহবুবের সাথে আসা পুলিশদেরকে মাহবুব তন্ময় কে ইশারায় দেখিয়ে বলল,

“ওই যে কালপ্রিট।”

দুজন কনস্টেবল সেদিকে এগিয়ে গেল।তন্ময় তখন চোখ দুটো বন্ধ করে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকছে যেন এবারের মতোন বেঁচে যায়।তবে কাঁধের উপর একটা থাবা পড়তেই চমকে চোখ দুটো খুলল।সামনে দুজন কনস্টেবল কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই গলাটা শুকিয়ে গেল।

“কে আপনারা?”

“পোশাক দেখেও বুঝছেন না?তবে চলুন আসল জায়গায় নিয়ে গিয়ে বোঝাবো।উঠুন।”

“আমি কেন যাব?কোথায় যাব?আমি যাব না আপনাদের সাথে।”

“সম্মান দিয়ে নিয়ে যেতে চাইছি চলুন নাহলে কিন্তু টানতে টানতে নিয়ে যেতে বাধ্য হব।”

তন্ময় জোর গলায় বলল,

“অদ্ভুত তো!আপনারা কেন আমাকে টানতে টানতে নিয়ে যাবেন?”

“আপনার নামে অভিযোগ আছে।থানায় যেতে হবে।”

“যেতে হবে বললেই আমি যাব নাকি?অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট কোথায়?”

“সে সব থানায় নিয়ে গিয়ে দেখাবো।চলুন এখন।”

কথাটা বলে তন্ময়ের শার্টের কলার ধরে ওকে এক প্রকার জোর করে টেনে নিয়ে গেল।তন্ময় যথাসম্ভব নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো,নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করলো কিন্তু কারো কানে যেন কোন কথাই যাচ্ছে না।

এদিকে আশেপাশে সবাই সবকিছু দেখছে আর অবাক হচ্ছে।তারা কিছুই বুঝতে পারছে না।মাহবুব এর সামনাসামনি তন্ময় কে নিয়ে যেতেই মাহবুব কনস্টেবলের থেকে তন্ময়কে ছাড়িয়ে নিয়ে নিজে দু হাতে তন্ময়ের শার্টের কলার ধরে দাঁতে ধাঁত পি/ষে বলল,

“আমার বোন কোথায়?”

“আপনার বোন কোথায় সেটা আমি কি করে জানব?বিশ্বাস করুন আমি জানিনা মিলি কোথায়।”

কথাটা বলার সাথে সাথে মাহবুবের শক্ত-পোক্ত হাতের একটা চ/ড় তন্ময়ের গালের উপরে গিয়ে পড়ল।তন্ময় সেই আঘাতের তাল সামলে সোজা হয়ে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই আরেকটা চ/ড় পড়ল ওর একই গালে।এবারে যেন অপমানে,লজ্জায় তন্ময় আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারল না।মাহবুবই ওকে আবার সোজা করলো।এক হাতে শক্ত করে তন্ময়ের চোয়াল চেপে ধরে বলল,

বিজ্ঞাপন

“কুকুরের পেটে যে ঘি সহ্য হয় না তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলি তুই।কি ভেবেছিস আমার বোনের কেউ নেই জন্য যা ইচ্ছে তাই করে যাবি?এতদিন তোকে কিছু বলিনি তার কারণ আমার বোন তোকে ভালোবাসতো।তুই আমার বোনের দুর্বলতা ছিলি।তোর কিছু হলে আমার বোন কষ্ট পেত।কিন্তু আজ তোকে কি করবো বলতো?ইচ্ছে তো করছে তোকে এখানেই পুঁতে ফেলতে।”

তৌফিক এগিয়ে এসে মাহবুবকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে বলল,

“মাহবুব কি করছো?ছাড়ো।আরে এভাবে সবার সামনে ঝামেলা করে নাকি কেউ?তুমি কিন্তু সমস্যায় পড়বে।”

“কে কি করে আমি সেটাই দেখতে চাই।আমার বোন এমনি তে আমার সামনে আসবে না।এই কুলাঙ্গার কে ব্যবহার করেই ওকে খুঁজে বের করতে হবে।সত্যি করে বল আমার বোন কোথায়?তুই জানিস ও কোথায় আছে।কিছু করিস নি তো আমার বোনের সাথে?তোর জন্য যদি আমার বোনের কোন ক্ষতি হয়েছে আমি কিন্তু তোকে জ্যান্ত কব/র দেবো।”

“কি জ্বালা রে!প্লিজ বিশ্বাস করুন আমি জানিনা মিলি কোথায়।আমি নিজে গতকাল সিয়াম কে কল করেছিলাম মিলি কোথায় সেটা জানার জন্য।সিয়াম বলল ও জানেনা।আমি বলছি তো মিলির সাথে এখন আর আমার কোন সম্পর্ক নেই।আর আমি কি ক্ষতি করবো ওর?আমাকে কি মনে হয় আপনার?”

“একটা জানো/য়ার মনে হয়।সিয়ামের সাথে তোর যোগাযোগ আছে?”

“থাকবে না কেন?আছে।”

“বাকি কথা থানায় গিয়ে হবে।”

“আরে থানায় কেন যাব আমি?আমার অপরাধটা কি সেটা তো বলুন?”

“তোর অপরাধটা হলো তুই আমার বোনকে কাঁদিয়েছিস।এটাই তোর অনেক বড় অপরাধ।বিশ্বাস কর তোকে সারা জীবন জেলে পঁচিয়ে মা/রার জন্য এই অপরাধটাই যথেষ্ট।”

কথাটা বলে তন্ময়কে একটা ধাক্কা মা/র/লো। কনস্টেবল দুটো তন্ময় কে ধরে জোর করে নিয়ে গেল।

মাহবুব এবারে তৌফিক কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“চিন্তা করবেন না।আপনার চাকরির কোন সমস্যা হবে না আমি দেখে নেব সবটা।আপনি শুধু একটা কাজ করবেন।এখানকার কোন ভিডিও বাইরে যেন না বের হয় সেই ব্যবস্থা করুন।আর যদি হয়েছে তাহলে যে করবে তার কিন্তু অনেক সমস্যা হবে আর এই কোম্পানিরও অনেক সমস্যা হবে।”

“তন্ময়ের সাথে কি করবে?”

“আপাতত ওকে দিয়ে মিলি কে খুঁজতে হবে।কেউ নিজ ইচ্ছেতে হারিয়ে গেলে তাকে খুঁজে বের করা খুব কঠিন কাজ।কিন্তু আমি জানি যদি মিলি শোনে যে ওর কারণে আমি তন্ময়ের নামে কেস করেছি ও ধরা দেবে।আসছি।”

কথাটা বলে মাহবুব বেরিয়ে গেল।তৌফিক একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো।সেই সাথে তন্ময়ের জন্য আফসোস হলো।কেন যে ছেলেটা এসব বড় মানুষদের সাথে লাগতে গেল কে জানে।অযথা নিজের সাজানো-গোছানো সংসার,ভবিষ্যতে নষ্ট করলো।

________

“এই অবস্থায় কি তোর একা একা থাকাটা ঠিক হবে?আমাদের এখানে থাকতে সমস্যা কি?”

নীলিমার প্রশ্নের মিলি কোনো উত্তর দিতে পারল না।ও জানেনা ওর একা থাকাটা ঠিক হবে কিনা তবে এতোটুকু জানে এই শহর,শহরের মানুষগুলোকে ছেড়ে মিলি অনেক দূরে চলে যেতে চায়।আর তাছাড়া এইভাবে একেবারে নীলিমাদের কাছে থেকে যাওয়া যায় না।নিজের বাবা,মায়ের কাছেই তো এখন বোঝা আর সেখানে ওরা তো ভালো বন্ধু।

মিলিকে চুপ করে থাকতে দেখে নীলিমা পুনরায় বলে উঠলো,

“তোর কি মনে হয় তন্ময় বদলে গেছে বলে আমরাও বদলে যাবো?আমাদের তিনজনের বন্ধুত্বটা এখনও একই রকম আছে।আচ্ছা তুই কি আমাদের কোন আচরণে কষ্ট পেয়েছিস জন্য চলে যেতে চাইছিস?আমরা কি কোনো ভুল করেছি?”

মিলি ব্যতিব্যস্ত গলায় বলল,

“কি বলছিস এসব?তোরা কেন কিছু করতে যাবি? আমার বিপদের দিনে তোরা আমায় সাহায্য করেছিস,আশ্রয় দিয়েছিস।আমি কৃতজ্ঞ তোদের কাছে।”

“তাহলে কেন চলে যেতে চাইছিস?এখন তোর একটু যত্নের প্রয়োজন।দেখ এখানে তো আমি আর সিয়াম একাই থাকি।সিয়াম সারাদিন কাজে থাকে আমি বাসায় একাই,তুই থাকলে আমারও ভালো লাগবে।”

ওদের কথাবার্তার মাঝে কলিং বেল বেজে উঠল। কথাবার্তার মাঝখানে নীলিমা গিয়ে দরজা খুলে দিলো। সিয়াম এসেছে।আজ বেশ অসময়ে এসেছে বাড়িতে।এই সময় তো কাজের মাঝে একদম ডুবে থাকে।

নীলিমা গেল এক গ্লাস পানি আনতে।মিলি তখন ড্রয়িং রুমের সোফার উপরে বসা।তার যেন কোন কিছুতেই কোন খেয়াল নেই।সিয়াম এসেছে সেই বিষয়টাও খেয়াল করেছে কিনা কে জানে।কেমন যেন আনমনা হয়ে গেছে।কোন কিছুতে এখন আর কিছু যায় আসে না।সিয়াম সোফায় এসে বসতেই নীলিমা এক গ্লাস পানি এনে ওর হাতে দিয়ে মিলির পাশে বসে বলল,

“আজ এত তাড়াতাড়ি এলে যে?”

“ভালো লাগছিল না।অর্ধেক দিনের ছুটি নিয়ে এসেছি।”

“যাক ভালো করেছো।আমি খাবার দিচ্ছি দাঁড়াও।”

“আমি একা আসিনি সাথে করে একটা ভালো সংবাদও এনেছি মিলির জন্য।”

মিলি বেশ অবাক হলো সিয়ামের কথাটা শুনে।

আজকাল ওর জন্য কোন সুখবর আসে নাকি?বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

“আমার জন্য সুখবর?সত্যি বলছিস?”

“কেন বিশ্বাস হয় না?”

“সত্যি বিশ্বাস হচ্ছে না।এখনো যে আমার জন্য কোন সুখবর এই পৃথিবীতে অবশিষ্ট থাকতে পারে সেটাই আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।”

“চুপ কর তো।বেশি বুঝিস সবসময় তাই না?কি হয়েছে তোর জীবনের যে আর কোন সুখবর আশা করতে পারিস না?তন্ময়ের জন্য সারাদিন এত বিরহে ডুবে থাকার কোন মানেই হয় না।ও এইসব ডিজার্ভ করে না।”

“তুই বল কি খবর এনেছিস আমার জন্য?”

“আমাদের অফিসের সিলেটে যে ব্রাঞ্চটা আছে রিসেন্টলি ওইখানে নতুন এমপ্লয়ি এপয়েন্ট করছে।তোর চাকরির ব্যবস্থা হয়ে গেছে।শুধু একটা ইন্টারভিউ দিতে হবে।”

মিলি সন্দেহী গলায় বলল,

“সিরিয়াসলি?”

“হ্যাঁ।”

মিলির মুখ দেখে সিয়াম বুঝলো ওর বোধহয় একটু ভয় হচ্ছে।

“সব কিছু তে এত ভয় পেলে চলবে না।তুই সাহসি মিলি।আল্লাহ সব সময় সবকিছু আমাদের থেকে কেড়ে নেয় না,অনেক সময় আমাদেরকে অনেক কিছু দিয়ে দেয়।আমাদের চাহিদার থেকেও অধিক কিছু দেয়।এই চাকরিটাও হয়তো তেমন কিছুই।তোর খুব দরকার ছিল আর উনি দিয়ে দিয়েছেন।”

“কিন্তু সিয়াম এত দূরে গিয়ে থাকবো কোথায়?সব ম্যানেজ করবো কিভাবে?”

“চিন্তা করিস না।আমাকে দুদিন বাদে সিলেট যেতে হবে।আমি সে সব ব্যবস্থা করে আসবো।একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে আসবো যেন অফিস থেকে কাছাকাছি হয়।আমি আবার গিয়ে তোকে রেখে আসবো।”

ওদের এত পরিকল্পনায় নীলিমা প্রচন্ড বিরক্ত হলো।একরাশ বিরক্তি সমেত বলল,

“তোমাদের দুজনের কি এ ছাড়া আর কোন কাজ নেই?আর সিয়াম তোমাকেও বলছি কি দরকার ছিল এখন ওর চাকরির ব্যবস্থাটা করার?যে একটা অজুহাত পেতাম ওকে এখানে রাখার সেটাও পাচ্ছি না এখন।”

“বাদ দাও নীলিমা।ওর ইচ্ছের বিরুদ্ধে অনেক কিছু হয়ে গেছে,আর কিছু না হোক।ওকে তো চিনি,আমি জানি এখানে থাকলে ও কখনো শান্তি মত থাকতে পারবে না।তার থেকে বড় কথা ও যেখানে ভালো থাকবে সেখানেই যাক।না ও এই বাড়িতে শান্তি পাবে,না এই শহরে।”

ওদের কথাবার্তার মাঝে সিয়ামের ফোনটা বেজে উঠলো।পকেট থেকে বের করে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে নামটা দেখতেই সিয়ামের কপালে গাঢ় ভাজ সৃষ্টি হলো।ওকে এভাবে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে নীলিমা বললো,

“কে কল করেছে?”

“তন্ময়।”

উপস্থিত তিনজনেই বিস্ময়ের শেষ সীমায় পৌঁছালো।মিলি সিয়াম কে বলল,

“ফোনটা রিসিভ করে স্পিকারে দিয়ে কথা বল।আর ওকে কোনোমতেই বলবি না যে আমি এখানে আছি।কোনমতেই যেন আন্দাজ করতে না পারে।”

মিলির কথা অনুযায়ী ফোনটা কানে ধরে সিয়াম গম্ভীর গলায় বলল,

“কি দরকার?”

অপর পাশ থেকে তন্ময় রাগান্বিত গলায় বলল,

“আমার কি দরকার সেটা জিজ্ঞেস না করে মিলিকে জিজ্ঞেস কর ওর কি দরকার?যাওয়ার সময় তো খুব বড় বড় কথা বলে গেল যে আমার জীবনে আর নাকি ফিরবে না,আর কোন অশান্তি তৈরি করবে না তাহলে এসব এখন কি হচ্ছে?”

“পরিষ্কার করে বল কি হচ্ছে?মিলি কি করেছে?আর ওর খোঁজ পেয়েছিস?”

“একদম নাটক করবি না সিয়াম।আমি খুব ভালো করে জানি যে মিলি তোদের কাছে আছে।আর এটাও খুব ভালো করেই জানি যে এখন ও তোদের সামনে আছে।ওকে ফোনটা দে।”

সিয়াম তন্ময়ের কথাটা পুরোপুরি অস্বীকার করে বলল,

“কি আজেবাজে কথা বলছিস?আমি কাল থেকে নিজে মিলির খোঁজ করার চেষ্টা করছি কিন্তু পাচ্ছিনা।আমার কাছে থাকলে কি এত চিন্তা করতাম নাকি?”

“আমি বাদে ওর যাওয়ার কোন জায়গা ছিল না। তারপর ওর ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক ভালো হয়ে গিয়েছিল ভেবেছিলাম ওখানে গিয়েছে।কিন্তু এখন শুনছি ওখানেও নেই তাহলে বাকি থাকলো শুধুমাত্র তুই আর নীলিমা।এছাড়া ওর আর কোন যাওয়ার জায়গা নেই।আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি যে ও তোদের কাছেই আছে।এখন ও আমার সব কথা শুনছে।”

“মিলি কোথায় আছে সেই কথা নাহয় এখন বাদ দে।আগে বল তোর সমস্যা কি?ফোন করে চেঁচামেচি করছিস কেন?এত কিছু করার পরেও কি তোর শান্তি হয়নি?”

“শান্তি হবে কি করে?ওকে বল ওর জন্য আমার মান সম্মান সব কিছু শেষ।ওর ভাই অফিসে সবার সামনে আমার গায়ে হাত তুলেছে,আমার চাকরিটা বোধহয় চলে গেছে,আমাকে পুলিশ স্টেশনে তুলে নিয়ে এসে এখন গুম করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে।মানে হচ্ছেটা কি এসব?আমি কি কোন অপরাধী নাকি যে আমার সাথে এমন ব্যবহার করছে?”

সিয়াম ব্যাঙ্গাত্নক গলায় বলল,

“তুই অপরাধী না?তোর কথা শুনে মনে হচ্ছে আমরাই অপরাধী।এতকিছুর পরেও তোর গলায় এত জোর আসে কোত্থেকে রে?আর জেলে গিয়েছিস তা তোর জেসি কে কল না করে আমাকে কেন কল করেছিস?ওকে কল করে বল তুই জেলে জামিনের ব্যবস্থা করুক।”

“ফাঁসবো আমি মিলির জন্য আর আমাকে ছাড়ানোর জন্য কষ্ট করবে জেসি?আমায় জেলে আনার পরও আমার গায়ে হাত তুলেছে।মিলিকে যদি ওর ভাই না পায় আমার বাঁচা মুশকিল করে তুলবে।ও আমার দোষ দিচ্ছে বলছে আমি নাকি মিলি কে কিডন্যাপ করেছি।মানে আজব!তোর মিলিকে বলে দে যদি আমার কিচ্ছু হয় তাহলে ও আর ওর বাচ্চাও ভালো থাকতে পারবে না।ও কি ভেবেছে এসব করে আমি ওর আর ওর বাচ্চার দায়িত্ব নেব?কক্ষনোই না।বরং ওকে বলে দিস আমি ওকে অভিশাপ দিলাম আমার এই সব কষ্ট,সব অপমানের বদলা ওর বাচ্চার উপর দিয়ে যাবে।ওকে সদর থানায় আসতে বল।”

আর কিছু শোনা গেল না ফোনের ওপর পাশ থেকে।কেটে দিয়েছে ফোনটা।সিয়াম মিলির দিকে তাকালো।ভীষণ শান্ত দেখাচ্ছে মিলি কে।মিলির চোখ মুখে কোনো রাগ নেই,কোন হতাশা কিংবা বিস্ময় ভাব কিচ্ছু নেই।মিলির এই অভিব্যক্তি সিয়াম আর নীলিমাকে একটু চিন্তায় ফেললো।নীলিমা হালকা করে ধাক্কা দিয়ে বলল,

“মিলি কিছু বল?”

“আমি আর কি বলব?যা বলার সেটা তো তন্ময় বলে দিল।”

“যাবি থানায় ওকে বাঁচাতে?তুই না গেলে তো তোর ভাই ছাড়বে না।”

“যাব ঠিকই তবে ওকে বাঁচাতে না।নিজের জীবনে করা আরো একটা ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে যাব।”

সিয়াম প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“আবার কিসের ভুল?”

“আমার গোটা জীবনটাই তো ভুল।একটা ভুলের উপরে আবার ভুল করি।সেই ভুলটা ঠিক করার জন্য আরও একটা ভুল করি।আজ অব্দি কখনো জীবনে ঠিক কোন সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছি?পারিনি।তবে ভুলের পাঠটা এখানেই সমাপ্ত করতে চাই।আর কোন ভুল করবোনা।যে ভুল করেছিলাম এবারে সেটার প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে তন্ময় কে ঠিক সিদ্ধান্তটা জানিয়ে আসবো।”

বিজ্ঞাপন
রিক্ত বসন্ত গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস