“কি ব্যাপার?এত তোড়জোড় কিসের বাড়িতে?আর ওর ঘর এত গোছানোরই বা কি আছে?কতদিন তোমাদেরকে বলেছি যে এসব জিনিসপত্র সব ফেলে পুড়িয়ে দাও।ওর কোন চিহ্ন আমি আমার বাড়িতে রাখতে চাই না।কথা কানে যায় না তোমাদের?”
জাহিদী চৌধুরীর গম্ভীর গলায় কেঁপে উঠলেন তার স্ত্রী মিথিলা আর পুত্রবধূ পিউ।ড্রয়িং রুমে বসা মাহবুবের কানেও ওর বাবার গম্ভীর গলার আওয়াজ ঠিকই পৌঁছালো।বুঝলো যে তার স্ত্রী আর মা এখন এই পরিস্থিতিটা সামাল দিতে পারবে না।ওকেই কিছু একটা করতে হবে।সোফা থেকে উঠে এসে পকেটে দুহাত গুঁজে গম্ভীর গলায় জাহিদ চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“মিলি তো এই বাড়িরই মেয়ে তবে ওর চিহ্ন বাড়ি থেকে মুছে ফেলার কি আছে আমি তো সেটা বুঝতে পারছি না?”
“এই বাড়ির মেয়ে হয়ে বাড়ির মর্যাদা রেখেছে?খুব যে বাড়ির মেয়ে বলছো তা বাড়ির মেয়ে কোথায়?”
“ও আসবে জন্যই ব্যবস্থা করা হচ্ছে।”
জাহিদ চৌধুরীর কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ সৃষ্টি হলো।ধারালো দৃষ্টিতে মাহবুবের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,
“ও আসছে মানে?”
“ও আসছে মানে আসছে,সহজ কথা।”
“তুমি কি করে জানলে ও আসছে?”
“দেখা হয়েছিল আমার সাথে।কথা হয়েছে,
বলেছে এখানে কয়েক দিন এসে থাকবে।সেজন্য ঘরটা গোছানো হচ্ছে।”
জাহিদ চৌধুরী বজ্র কন্ঠে হুংকার দিয়ে বললেন,
“কার কথায় তুমি ওকে বাড়িতে ফেরার অনুমতি দিয়েছো?আমাকে জিজ্ঞেস করেছো একবার?জাহিদ চৌধুরী এখনো ম/রে যায়নি যে তুমি এই বাড়ির সব সিদ্ধান্ত নেবে।আমার বাড়িতে ওর ছায়াও যেন না দেখি আমি।”
“তুমি বোধহয় ভুলে গেছো বাবা তুমি নিজে এই বাড়িটা আমার আর মিলির নামে করে দিয়েছো।সেই হিসেবে বলতে গেলে এই বাড়িটা মিলিরও।ওর বাড়ি তে ওকে আসতে তুমি আটকাতে পারো না।আইনত তোমার সেই অধিকার নেই।”
“ভুলে যেওনা মাহবুব আমি এখনো বেঁচে আছি।আমার সিদ্ধান্তের বাইরে কিছু করতে যেও না।”
মাহবুব একটু নরম হলো।জাহিদ চৌধুরীকে এখন বুঝিয়ে বলতে হবে,রাগারাগি করলে কোন সমস্যার সমাধান হবে না।শান্ত গলায় বলল,
“মিলি প্রেগন্যান্ট বাবা।তুমি নানা হবে।মিলি নিজের ভুলের জন্য পস্তাচ্ছে,ও খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে নিজের ভুলটা।অন্তত বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে ওকে ক্ষমা করে দাও।দেখো আমিও তো ওর উপর রেগে ছিলাম কিন্তু আর রাগ করে থাকতে পারিনি,ক্ষমা করে দিয়েছি।আমাদের বাড়িরই তো মেয়ে আর কতদিন দূরে রাখবো?দোষ তো আমাদেরই ছিল।আমরা যদি ওর ভালোবাসাকে মেনে নিতাম তাহলে এমন হতো না।”
“তুমি এটা কল্পনাও করছো কি করে আমি আমার মেয়ের সাথে একটা ভিখিরি দু টাকার ছেলের বিয়ে মেনে নিতাম?এমনিতেই তোমার বোনের জন্য আমার যথেষ্ট ফেস লশ হয়েছে সোসাইটিতে।জানো এখনো আমাকে কত খোঁচা শুনতে হয় আমার বিজনেস পার্টনারদের থেকে?ওরা যখন নিজেদের ছেলেমেয়েদের গল্প করে তখন তার মাঝে আমাকে ওরা খোঁচা দেয় যে আমার মেয়ে পালিয়ে গেছে।আমি আমার অপমান কোনদিনও ভুলবো না।আর কিসের নানা?নিজের মেয়েকে ভুলে গেছি নাতিকে দিয়ে কি করব?ওর শরীরেও তো ওই ভিখিরিরই র/ক্ত বইবে।”
“তন্ময়ের সাথে ওর সম্পর্কটা ঠিক নেই।আমি জানিনা কি হয়েছে।ও বলেছে বাড়িতে এসে আমায় জানাবে।এই কয়দিন ওর সাথে কোন যোগাযোগ করতে নিষেধ করেছে জন্য আমি করছি না।ওর যাওয়ার কোন জায়গা নেই বাবা।আমাদের কাছে আসবে না তো আর কার কাছে যাবে?আর কে আছে ওর আমরা ছাড়া?”
“সেটা তোমার বোনের আগে ভাবা উচিত ছিল।আর শোনো তোমার যদি এতই ওর প্রতি ভালোবাসা উতলে পরে তবে অন্য কোথাও নিজের বোনের থাকার ব্যবস্থা করে দাও।তবে এই বাড়ি তে যেন ওর পা না পড়ে।”
পাশ থেকে ওনার স্ত্রীর মিথিলা বলে উঠলেন,
“এভাবে বলছ কেন?মেয়েটা তো আমাদেরই,এখন যদি ও রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় তাহলে কি তোমার সম্মানহানি হবে না?ও যখন নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছে তবে ক্ষমা করে দাও ওকে।আর মাহবুব তো বলল তন্ময়ের সাথে নাকি সম্পর্কটা ঠিক নেই।দরকার হলে আমরা নতুন করে ওর জীবনটা গুছিয়ে দেব।ওর আবার একটা ভালো বিয়ে দেব।এবার আর আমাদের কথায় আপত্তি করবে না।”
জাহিদ চৌধুরী তাচ্ছিল্য গলায় বলল,
“কে বিয়ে করবে তোমার মেয়েকে?একটা বাচ্চা নিয়ে ভালো বিয়ে হবে ভেবেছো?এমন ঘরে বিয়ে হবে যার ঘরেও আগে থেকে বাচ্চা আছে।শোনো মিথিলা,তোমার মেয়েকে নিয়ে আমি আর এত চিন্তা করতে পারবো না।ভালো করতে চেয়েছিলাম ওর সেসব সহ্য হয়নি, পালিয়ে গিয়েছিল।এখন ওকে নিজের ব্যবস্থা নিজে করে নিতে বলো।”
কথাটা বলে জাহিদ চৌধুরী সেখান থেকে চলে গেলেন।মিথিলা ছেলেকে বললেন,
“তোর বাবাকে তো রাজি করাতেই পারছিনা কোনমতে।মেয়েটা এলে যদি খারাপ ব্যবহার করে?
মাহবুব আশ্বস্ত করে বলল,
“চিন্তা করোনা,আমি দেখব।এই অবস্থায় ওকে অন্য কোথাও রাখা যাবে না।ওর যত্নের প্রয়োজন।ওর শরীরের অবস্থা খুব খারাপ।ডাক্তার বলেছে ভীষণ দুর্বল,খাওয়া-দাওয়া,ঘুম কিছু ঠিক মতো করে না ও।ওকে আমাদের কাছে রাখতে হবে।”
ছেলের কথায় ভরসা পেশে মিথিলা সেখান থেকে চলে গেলেন।পিউ এগিয়ে এসে মাহবুব এর কাঁধে হাত রেখে সংশয় নিয়ে বলল,
“মা কে তো আশ্বস্ত করলে কিন্তু আদৌ কি বাবাকে রাজি করাতে পারবে?মিলি পালিয়ে গেছে হলো বাবা মিলির নামটা অব্দি শুনতে পারেনা।আর তুমি জানো বাবা কতটা একরোখা স্বভাবের।কখনো মানবে না। মিলি এখানে এলে বেশি কষ্ট পাবে।”
“এখন যতটা কষ্টে আছে তার থেকে বোধহয় কমই কষ্ট পাবে পিউ।চিন্তা করো না আমি আছি।সব সামলে নেব।”
_______
“হ্যালো কে বলছেন?”
“আমি কথা বলছি মিলি।”
কন্ঠটা মিলির কাছে একদমই পরিচিত মনে হলো না।যদিও বা পরিচিত হয়ে থাকে তবে এই মুহূর্তে চিনতে পারছে না।তার মধ্যে নিজের নামটাও ঠিক করে বলছেনা।আমি এটা কোন পরিচয় হতে পারে নাকি?এমনিতেই মন মেজাজ ভালো নেই তার মাঝে আবার এই উটকো ফোন।হালকা রাগী কন্ঠে বলল,
“কে আপনি?আমি আবার কারো পরিচয় হয় নাকি?নাম বলুন নাহলে ফোন রেখে দেব?”
“আমি রাজীব কথা বলছ,তন্ময়ের কলিগ।”
মিলি মস্তিষ্কে একটু জোর দিতেই রাজিবের নামটা মনে পড়লো।তবে কেন ওকে ফোন করেছে সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না।
“হ্যাঁ বলুন কি দরকার?”
“না কোন দরকার নেই।এমনিতেই তোমার খোঁজ-খবর নিতে ফোন করলাম।আসলে অফিসে শুনলাম তন্ময় তোমার সাথে কি করেছে।ভীষণ খারাপ লাগলো।শোনো মিলি তুমি একদম কষ্ট পাবে না।নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করবে।”
“আপনি বলে সম্বোধন করলে খুশি হব।আর আমি কি আপনার থেকে সমবেদনা চেয়েছিলাম যে ফোন করে আমাকে সমবেদনা জানাচ্ছেন?আপনি কি ভেবেছেন আমি জানিনা যে তন্ময় আর জেসির সম্পর্কের ব্যাপারে আপনি জানেন কিনা?দুজনের তো গলায় গলায় ভাব।আপনার স্বভাব চরিত্রও হচ্ছে ওর মতনই সেটাও আমি জানি।হয়তো আপনার সাথে থেকে থেকে ছোঁয়াচে রোগ লেগেছে।”
“আরে না না মিলি তুমি সরি মানে আপনি আমায় ভুল বুঝছেন।আমি যদি আগে থেকে জানতাম যে তন্ময় এইসব করছে আমি ওকে সত্যি আটকাতাম।বিশ্বাস করুন আমি জানতাম না।”
“দেখুন প্রথমত আপনি জানলেও আমার কিছু না,না জানলেও আমার কিছু না।দ্বিতীয়তঃ এভাবে গায়ে পড়ে আমায় সমবেদনা জানানোর কোন প্রয়োজন ছিল না।তবুও ধন্যবাদ।ফোনটা রাখছি।”
“দাঁড়ান ফোনটা রাখবেন না।”
“কি সমস্যা?”
“বলছিলাম যে আপনার তো বাপের বাড়ির সাথে সম্পর্কটা ঠিক নেই।তন্ময় ছাড়া মনে হয় আর কেউ আপনও নেই।যদি কখনো কোনো প্রয়োজন হয় আমায় অবশ্যই বলবেন।একজন ভালো বন্ধু হিসেবে আমি আপনার পাশে থাকার চেষ্টা করব।জানি তন্ময়ের অভাব হয়ত পূরণ করতে পারব না তবে আমি চেষ্টা করব আপনার কষ্ট কমানোর”
মিলি খিঁচে দুচোখ বন্ধ করে নিল।এখনো ডিভোর্স হয়নি,এখনো ওর পরিচয় তন্ময়ের স্ত্রী আর এর মাঝেই এই রাস্তার কুকুরগুলো নিজেদের নোংরামো শুরু করে দিয়েছে।মিলি দাঁত চিবিয়ে বলল,
“সামনে পেলে পায়ের জুতা খুলে তোকে পেটা/তাম।আমায় কি তোর মতন ছোটলোক পেয়েছিস না রাস্তার কুকুর পেয়েছিস?শোন তন্ময়ের থেকে শুনিস কি কি কেসের ভয় দেখিয়েছি ওকে।আর দ্বিতীয় দিন যদি আমার নাম্বারে তোর কল এসেছে হ্যারাসমেন্টের কেস করে জেলে তুলে দেব।জঙ্গলি কু/ত্তা কোথাকার!”
ফোনটা কেটে দিয়ে নাম্বারটা ব্লক করে সেটা ছুঁড়ে মারলো মেঝে তে মিলি।নিজেই নিজের চুল খামচে ধরলো দুহাতে।রাগে দুঃখে এখন কাঁদতে ইচ্ছে করছে।এই শয়তানগুলোর ভয়ই তো মিলি পায়,এদের হাত থেকে বাঁচার জন্যই তো একটা নিরাপদ আশ্রয় দরকার মিলির।
_____
“ভাই রাজীব কিছু টাকা লাগবে।ছয় লাখ টাকা দরকার,আমি দুই লাখ টাকা জোগাড় করতে পেরেছি।কাল রাতে আবার বড় মুখ করে বলেছি যে দশ দিন দরকার নেই,দুই-তিন দিনেই দিয়ে দেব।ভাই সাহায্য কর আমি কথা দিচ্ছি খুব তাড়াতাড়ি তোকে আমি শোধ করে দেবো।”
কোলড্রিংসের বোতলে একটা চুমুক দিয়ে রাজীব গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“আরে এত চাপ নিচ্ছিস কেন?দেখ এত টাকা তো আমার পক্ষে ম্যানেজ করা সম্ভব না।তবে আমি একজনের খোঁজ দিতে পারি যে তোকে সুদের উপরে টাকা ধার দিতে পারবে।”
“এই না না সুদের উপরে টাকা নিতে পারব না।যারা সুদের ওপর টাকা দেয় বেশিরভাগ মাস্তান হয়।আমি রিস্ক নিতে পারবো না।”
“আরে তো মাস্তান হলে হবে।তোর কি বউ বাচ্চা আছে নাকি যে ওদেরকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ভয় দেখাবে?”
“তো আমাকে তুলে নিয়ে যাবে।না ভাই যাই বলিস আমি সুদের উপর থেকে টাকা নেব না।অন্য কোন ব্যবস্থা কর।”
ওদের কথাবার্তার মাঝেই পাশের চেয়ারে জেসি এসে বসলো।মেনু কার্ডটা হাতে নিয়ে তন্ময় কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“খাবার অর্ডার দাও।”
তন্ময় কিছু বলল না।বাধ্য ছেলের মতন জেসির পছন্দের খাবার অর্ডার দিল।তন্ময় মিনমিনে কন্ঠে বলল,
“এখনো রেগে আছো আমার উপরে?”
“না।কতদিন আমি হোটেলে থাকবো?”
"এই টাকাটা ম্যানেজ করতে যতদিন সময় লাগে।আচ্ছা জেসি তুমি কি আমায় একটু হেল্প করতে পারবে?দেখো মিলি যত তাড়াতাড়ি চলে যাবে ততো তাড়াতাড়ি তুমি আমার বাড়িতে আসতে পারবে।একটু হেল্প করো আমি পরে তোমার টাকা শোধ করে দেব।”
“পঞ্চাশ হাজারের বেশি পারবো না।এটাও আমার ফ্রেন্ডের থেকে ধার করে নিয়ে দিতে হবে।”
“আচ্ছা ঠিক আছে তাই হবে।”
তন্ময়ের একটা কল এলো।ও কথা বলার জন্য উঠে ওদের থেকে দূরে গেল।তন্ময় উঠে যেতেই জেসি রাজীবের দিকে তাকিয়ে বলল,
“পাশে তন্ময় আছে দেখছো না?বারবার হাত ধরছো কেন?”
“টেবিলের নিচ দিয়ে ধরছি তো টের পাবে না।ও গা/ধা।”
“তা ঠিক বলেছ।কিন্তু তারপরও বাই এনি চান্স যদি দেখে ফেলে তাহলে মুশকিল হয়ে যাবে।এমনিতেও তোমাকে আমি কখনো কোন রকমের কমিটমেন্ট করিনি তাই তন্ময়ের সাথে আমার সম্পর্কটা নষ্ট করার চেষ্টা করো না।আমি কিন্তু তোমায় ছেড়ে কথা বলব না।
“আরে ডার্লিং রাগ করছ কেন?আমি তো জানি আমাদের সম্পর্কটা সিরিয়াস না।আমি তোমায় তোমার পছন্দের দামী দামী গিফট দিচ্ছি তার বদলে তুমি আমায় কিছু সুন্দর সুন্দর মোমেন্ট গিফট করছ।দ্যাটস ইট।এর থেকে বেশি কিছু আর এমনিতেও আমি চাইনা।”
“ভালো।এটা সারাজীবন মাথায় রেখো।তবে তন্ময়ের সাথে বিয়ের পর কিন্তু আর সম্পর্কটা আমি কন্টিনিউ করতে পারবো না মনে রেখো।”
“কেন?এখন যেমন চলছে তখনও তেমন চলবে সমস্যা কি?তন্ময় না জানলেই হলো।"
“না।আমি সংসার করতে চাই ভালোমতো।তন্ময় আমার লাস্ট অপশন বলতে পারো।এমনিতেও আমাদের সম্পর্কের কথাটা জানাজানি হওয়ার পর আমার অনেক ফেস লস হয়েছে।তন্ময়কে কোন মত আমি হাতছাড়া করতে পারবো না।”
“আচ্ছা সেসব পরে দেখা যাবে।তা কোন হোটেলে আছো?নাম আর রুম নাম্বারটা বলো বিকেলে একবার গিয়ে দেখা করে আসবো।তোমার জন্য একটা গিফট কিনেছি।”
জেসি বক্র হেসে বলল,
“রিয়েলি?তোমার মনে হয় আমি তোমাকে আমার হোটেলের রুম নাম্বার বলবো?আর বললেও তোমাকে আমি ঢুকতে দেবো?এতটা কাঁচা আমায় ভেবোনা।এখনো তন্ময়কে আমায় সেভাবে ছুঁতে দেইনি,সেখানে তুমি কে?”
“তন্ময়ের থেকেও গভীরভাবে আমি কিন্তু তোমায় অলরেডি ছুঁয়েছি।আচ্ছা ঠিক আছে হোটেলে যাব না।আজ বিকেলে দেখা করি?তেমন কিছু না এমনি একটু ঘোরাফেরা করব।”
“কথা দিতে পারছি না।আগে তন্ময়ের সাথে কথা বলে দেখতে হবে ওর কোন প্ল্যান আছে নাকি বিকেলে।”
ওদের কথাবার্তার মাঝেই তন্ময় এলো।ততক্ষণে খাবার চলে এসেছে।খাওয়ার মাঝে তন্ময় খেয়াল করল জেসি চামচটা বাম হাত দিয়ে ধরেছে।তন্ময় প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“তুমি আবার বাম হাতে কবে থেকে খাওয়া শুরু করলে জেসি?ডান হাতে খাও।”
জেসি মেকি হেসে বলল,
“ডান হাত দিয়ে খেতে ইচ্ছে করছে না।বাম হাতে খাই না সমস্যা কি?”
রাজিব বলে উঠলো,
“আরে তন্ময় তুই খাইয়ে দেনা তাহলেই তো হয়।”
তন্ময় রাজিবের প্রস্তাব নাকচ করে বলল,
“আরে না,তার কোন দরকার নেই।তুমি বাম হাত দিয়েই খাও।”
তন্ময় আসলেই বোকা।জেসির ডান পাশের চেয়ারটাতেই রাজিব বসে।আর জেসির ডান হাতটা যে রাজীবের হাতের দখলে জন্য বাম হাতে চামচ ধরেছো সেটুকুও বুঝলো না।
_________
“মিলি চলো ফুচকা খাই।অনেকদিন হলো খাওয়া হয় না।”
জ্যোতির প্রস্তাবে মিলি আপত্তি জানিয়ে বলল,
“না এখন এসব খাওয়া আমার ঠিক হবে না।এমনিতেই গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় ভুগছি।”
জ্যোতি মুখ ভার করে বলল,
“একটু খেলে কি হবে?তোমার প্লেটের সবগুলো না হয় আমি খেয়ে নেব তুমি একটা খেয়ো?”
জ্যোতির মুখটা দেখে মিলি আর না করতে পারলো না।মেয়েটা মিলির এত খেয়াল রাখে,না বলতেই নিজ উদ্যোগ মিলি কে ডাক্তারের কাছে নিয়ে এসেছিল, সারাদিনই এটা ওটা বানিয়ে মিলিকে খেতে দেয়,টুকটাক এসে কাজও করে দিয়ে যায়।মেয়েটার মনটা খারাপ হয়ে যেতে দেখে খারাপ লাগলো।
“আচ্ছা ঠিক আছে চলো আমি একটা খাব,বাকিগুলো তুমি খেয়ে নিয়ো।”
জ্যোতির চোখ দুটো খুশিতে চিকচিক করে উঠলো।রাস্তার ওপারে ফুচকার স্টল বসেছে।জ্যোতি মিলির হাতটা শক্ত করে ধরল।এই সময় রাস্তায় ভীষণ ভিড়।আর শহরে বেড়ে উঠলেও এত বছরেও মিলি রাস্তাটা ঠিকভাবে পার হতে পারে না।গাড়ি আসতে দেখলে ভয় পায়।কাছাকাছি চলে এলে তো রাস্তার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে পড়ে।সেজন্য কখনোই তন্ময় ওকে একা ছাড়েনা।কোথাও যাওয়ার হলে গাড়িতে তুলে দেয় না হলে রাস্তা পার করে দেয়।কি সুন্দর শক্ত করে হাতটা ধরে রাস্তা পার করে দিতো,মিলির কোন দিকে তাকানোর প্রয়োজন পড়তো না।জানে তো পাশে তন্ময় আছে,নিজের ক্ষতি করবে তবুও মিলির কিছু হতে দেবে না।মিলি যেন মাঝ রাস্তায় আটকে না যায় সেজন্য নিজে হাত ধরে রাস্তা পার করে দিত অথচ আজকে জীবনের মাঝ পথে মিলির হাতটা ছেড়ে দিল তন্ময়।কি অদ্ভুত!
মিলির এসব ভাবনার মাঝে হঠাৎই রাস্তার ওপারের একটা ফুচকা স্টলের দিকে নজর গেল।গাড়ি ঘোরার ভিড় না কমায় তখন ওরা রাস্তা পার হতে পারেনি।ওপারের দৃশ্যটা দেখে মিলির চক্ষু চরক গাছ।নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস হচ্ছে না।মিলিকে এভাকে এক দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে জ্যোতি বলে উঠলো,
“কি দেখছো?”
মিলি ইশারায় দেখাতেই জ্যোতির চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল।
“এই মিলি এসব কি দেখছি?”
“আমিও তো সেটাই ভাবছি।আমি তো প্রথমে ভেবেছিলাম বোধহয় ভুল দেখছি কিন্তু তুমিও যখন একই জিনিস দেখছো তার মানে ঠিকই দেখছি।”
জ্যোতি তাড়াহুড়ো করে ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে বলল,
“দাঁড়াও ছবি তুলি।কাজে লাগবে।”
কথাটা বলে জ্যোতি বেশ কয়েকটা ছবি তুলল।ফুচকার খাওয়া আর হলো না ওদের।দুজনে বাড়ি ফিরে গেল।
________
পরবর্তী দুদিন খুব স্বাভাবিকভাবেই কাটল।না তন্ময় মিলির সাথে কথা বলে,না মিলি তন্ময়ের সাথে কথা বলে।মিলি এখন দিন গুনছে কবে এই বাড়িতে ওর সময় ফুরোবে আর তন্ময় দিন গুনছে কবে মিলি কে এই বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারবে।আজ বিকেলেই তন্ময় অফিস থেকে ফিরল।দরজা খোলার সাথে সাথে মিলি ওর চনমনে হাসিখুশি মুখটা দেখতে একটু অবাক হলো।ভাবলো হয়তো জেসির সাথে আজকে একটু ভালোভাবে সময় কাটাতে পেরেছে সেজন্য এমন হাসিখুশি দেখাচ্ছে তন্ময়কে।দরজাটা খুলে দিয়ে আবার মিলি নিজের ঘরে যেতে নিলে পিছন থেকে তন্ময় ডেকে উঠলো।মিলি থামলো। পিছন ফিরে তন্ময়ের দিকে তাকালো তবে আগবাড়িয়ে কোন কথা বলল না।তন্মায় নিজ থেকেই মিলির দিকে এগিয়ে এসে বলল,
“খুব তো চেষ্টা করলে আমার বাড়িতে থেকে যাওয়ার।খুব চেষ্টা করলে আমার আর জেসির সম্পর্ক ভাঙার,আমাকে শাস্তি দেওয়ার কিন্তু কিছুই তো পারলে না করতে মিলি।এবার কি হবে বলোতো তোমার?”
“যা বলতে চাও সরাসরি বলো।আমার কাছে তোমার এসব আজেবাজে কথা শোনার মতন এত সময় নেই।”
তন্ময় তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“সময় নেই?কি এমন কাজ করো তুমি শুনি যে সময় নেই হাতে?”
“এটা তোমার দেখার ব্যাপার না।তুমি না জানলেও চলবে।তুমি বলো কি বলতে চাও?”
“ওয়েট তোমাকে দেখাই।”
তন্ময় ব্যাগ থেকে একটা শপিং ব্যাগ বের করে সেটা মিলির দিকে এগিয়ে দিল।
“কি আছে এতে?”
মিলির প্রশ্নে তন্ময় বলল,
“তুমি খুলে দেখো।”
মিলি শপিং ব্যাগটা হাতে নিয়ে দেখল ওর ভেতরে অনেকগুলো টাকা।মিলি বুঝলো তন্ময়ের কাছে ও যে টাকা দাবি করেছে এগুলো সেই টাকাই।তার মানে মিলির দিন এবার এই সংসারে,এই বাড়িতে,তন্ময়ের জীবনে একেবারের জন্যই ফুরোলো।মিলির এসব ভাবনার মাঝে তন্ময় বলে উঠলো,
“গুনে দেখতে পারো।এখানে একদম ঠিক ঠিক ছয় লাখ টাকাই আছে।তুমি যা চেয়েছিলে আমি তা তোমায় দিয়েছি এবার আসতে পারো,মুক্তি দাও।"
মিলি নির্জীব দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“আমার থেকে ছাড়া পাওয়ার খুব তাড়া তোমার তাই না?”
“একদম ঠিক ধরেছ খুব তাড়া তোমার থেকে ছাড়া পাওয়ার।এই টাকাগুলো জোগাড় করতে আমার যে কষ্ট হয়েছে না মিলি তার জন্য আমি তোমায় কোনদিনও ক্ষমা করব না।তোমার জন্য আমাকে অনেক টাকা ধার করতে হয়েছে,অনেকের কাছে হাত পাততে হয়েছে,ছোট হতে হয়েছে,অফিসে আমি নিজের মান সম্মান হারিয়েছি,জেসির সাথে আমার সম্পর্কের মাঝে একটা ঝামেলা তৈরি হয়েছিল,এইসব কিছুর জন্য আমি তোমায় কক্ষনো ক্ষমা করব না।এখন প্লিজ আমার জীবন থেকে চলে যাও।আর চাই না আমি তোমায়।”
মিলি কোনো কথা বলল না,চুপচাপ শপিং ব্যাগটা হাতে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।তন্ময় বুঝলো না যে একেবারের জন্য এক কথাতেই চলে গেল নাকি কিছু সময়ের জন্য গেল।যাই হোক না কেন তাতে তন্ময়ের কি?বেশি আর পাত্তা দিল না।এখন গেলে যাক,না গেলেও খুব বেশি দিন আর সময় দেবে না।মিলিকে বলে দেবে যেন খুব তাড়াতাড়ি এখান থেকে চলে যায়।পারলে আগামীকালই কিংবা আজকে।
তন্ময় ঘরে গিয়ে শার্টটা খুলে বিছানার উপরে ছুঁড়ে মা/রলো।ভীষণ গরম পড়েছে।শরীরটা কেমন ম্যাজ ম্যাজ করছে।আগে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে শুয়ে থাকলো কিছু সময়।তারপর ভাবলো আগে গোসল করবে তারপর একটু ঘুমোবে।আলমারি থেকে টি-শার্ট বের করতে গিয়ে হঠাৎই জানলা দিয়ে বাইরে দৃষ্টি গেল।ঠিক দেখল না ভুল দেখল সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য আলমারিটা বন্ধ করে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।যা দেখলো তাতে তন্ময়ের চোখ কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রমণ হলো।সেখান থেকেই মিলির নাম ধরে বেশ কয়েকবার চেঁচালো কিন্তু মিলির কানে সেসব ডাক গেল না।এতদূর থেকে সম্ভবও না হয়তো।তন্ময় আর আগে পিছে কোন কিছু ভাবল না।দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল