রিক্ত বসন্ত

পর্ব - ১৮

🟢

একটা রেস্টুরেন্টে বসে আছে মিলি আর মাহবুব।সামনে টেবিল ভরতি খাবার তবে মিলির কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না।যেখানে কান্নারা গলায় দলা পাকিয়ে আটকে আছে সেখানে খাবার কি করে নামবে?

বেশ অনেকক্ষণ চুপ থাকার মাহবুব বলে উঠলো,

“একটু কিছু খেয়ে নে।অনেকক্ষন থেকে না খেয়ে আছিস,শরীর খারাপ করবে তো।”

“তুমি বাড়ি ফিরে যাও ভাইয়া।আমি সিয়াম দের বাড়িতে যাব।”

মাহবুব আপত্তি জানিয়ে বলল,

“তুই ভাবলি কি করে আমি তোকে ফেলে রেখে ফিরে যাব?আমি আছি তো এখন।তোকে কে কি বলে সেটা আমি দেখে নেব।তুই আমার সাথে যাবি এটাই আমার শেষ কথা।”

“ওটা আমার যাওয়ার জায়গা না ভাইয়া বোঝার চেষ্টা করো।তুমি তো নিজে দেখছো আমার জীবনে কত অশান্তি।আমি চাই তন্ময় কে ভুলে যেতে,আমি চাই সবকিছু ভুলে যেতে কিন্তু ওই বাড়িতে গেলে কখনই সেটা পারবো না।হ্যাঁ তোমার চাপে পড়ে হয়তো বাবা আমায় থাকতে দিতে বাধ্য হবে,হয়তো আমি থেকেও যাব কিন্তু শান্তিটা কখনোই পাবো না।কারণ আমি বাবা আর মায়ের কথা কখনোই মানতে পারবো না।ওই বাড়িতে থাকলে বারবার সবাই আমাকে আমার ভুল নিয়ে খোঁচা দেবে,আমার অতীত নিয়ে আমাকে খোঁচাবে।আমি চাইনা আর এগুলো শুনতে।আমি একটু শান্তি চাই এবার।”

মাহবুব এবারও বোনকে আশ্বস্ত করে বলল,

“আমি বলছি তেমন কিছু হবে না।আচ্ছা ঠিক আছে তুই যখন ওই বাড়িতে ফিরতে চাস না আমি তোকে ওই বাড়িতে ফিরতে বলবো না।আমি তোকে আর পিউ কে নিয়ে আলাদা থাকব।”

মিলি আপত্তি জানিয়ে বলল,

“এটা হয় না ভাইয়া।মনে নেই সেদিন বাবা কি কি বলেছিলো?আমি নিজে তো বাবা মাকে ছেড়ে চলে এসেছি এবার তোমাকেও তাদের থেকে আলাদা করতে চাইছি।বাবা-মার থেকে তাদের সন্তান কে আলাদা করার দায় নিয়ে আমি বাঁচবো না।আর তাছাড়া আমার জন্য ভাবি,বাচ্চারা ওরা কেন নিজেদের বাড়ি ছাড়া হবে?আমি জানি তোমার কথায় হয়তো ভাবি বাড়ি ছেড়ে আসতে রাজি হবে কিন্তু ভাবির মনের মধ্যে একটা কষ্ট ঠিকই থাকবে।বাচ্চারা কেন ওদের বাড়ি ছেড়ে আসবে?নিজের সংসার ছেড়ে আসার কষ্টটা আমি বুঝি ভাইয়া।ওরা সেই কষ্টটা না পাক।আমার নিজের সংসারটা তো শেষ অন্তত ভাবির সংসারটা থাক।আমার জন্য অন্তত নষ্ট না হোক।”

“মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর মিলি?কি আজেবাজে কথা বলছিস?তুই যেমন ভাবছিস তেমন কিছুই হবে না।আমরা ভালো থাকবো আলাদা।আর আমি তো বলিনি যে বাবা-মার সাথে সম্পর্ক শেষ করবো।আমি নিয়মিত ওনাদের সাথে যোগাযোগ রাখব,খোঁজখবর নেব,আমার যা দায়িত্ব আমি সব পালন করব।কিন্তু আমি এটা ভুলে যেতে পারবো না যে তুই আমার বোন,তোর উপরও আমার একটা দায়িত্ব আছে বড় ভাই হিসেবে।আমি তোকে এভাবে একা ছাড়তে পারিনা।”

মিলি শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“কতদিন আমায় আগলে রাখবে?আমার বাকিটা জীবন যে একাই চলতে হবে ভাইয়া।জানো এই শহরটা আমার কাছে এখন বিষাক্ত লাগে।এই শহরের অলি-গলিতে আমার আর তন্ময়ের স্মৃতি আমি খুঁজে পাই।এই যে এখন যে রেস্টুরেন্টে বসে আছি এখানেও আমি আমার আর তন্ময়ের স্মৃতি খুঁজে পাচ্ছি।কারণ একটা সময় আমরা এখানেও এসেছি।এই স্মৃতি গুলোর মাঝে আমি আর থাকতে চাই না।আমি জীবনে কারো সাহারা চাই না।আমি আবার নিজের একটা বাজে অভ্যাস তৈরি করতে চাই না যে আমার বাঁচার জন্য যেন কোন শক্ত খুঁটির দরকার হয়।আমি একা বাঁচতে শিখতে চাই ভাইয়া।কারণ আমি বুঝে গেছি আমাকে বাকি জীবন আমার বাচ্চাটাকে নিয়ে একাই কাটাতে হবে।”

“এমন করিস না মিলি।”

“আমাকে এমনটাই করতে হবে।সিয়াম আমার একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছে।দুদিন পর আমাকে সিলেটে রেখে আসবে।”

মাহবুব হতবিহ্বল গলায় বলল,

“তুই সিলেট যাবি মানেটা কি?চাকরি করতে হলে অন্যের হয়ে কেন করতে হবে?আমাদের নিজের অফিস তো আছে মিলি।”

“বারবার তুমি কেন সেই জিনিসগুলোকে আমার বলছো ভাইয়া যেগুলো আমার না।আমি হাত জোড় করে তোমায় অনুরোধ করছি ভাইয়া আমায় ছেড়ে দাও।তুমি আমার জন্য যা করতে চাইছো সেগুলো করলে হয়তো আমার জীবনটা একটু হলেও গুছিয়ে দিতে পারবে কিন্তু দেখো ধীরে ধীরে তোমার জীবনটা অগোছালো হয়ে যাবে।তুমি বুঝতে পারছো না কেন ভাবির সাথে তোমার একটা সময় গিয়ে ঝামেলা হবে,বাচ্চারা একদিন তোমায় প্রশ্ন করবে যে ওরা কেন নিজের বাড়ি ছাড়া অন্য জায়গায় আছে।আর মা কি করে থাকবে তোমাদের ছাড়া?আমাকে তো হারিয়েছে।বাবা সারাজীবন আমায় দোষারোপ করবে,আরো অভি/শাপ দেবে।”

“মিলি তুই…”

মাহবুবকে মাঝ পথো থামিয়ে দিয়ে মিলি শান্ত কন্ঠে বলল,

“এবারে আমায় খুঁজে পেয়েছিলে ভাইয়া।কিন্তু যদি তুমি আমার কথা না রাখো এর পরে কিন্তু আর খুঁজে পাবে না।আমি কিন্তু আর সাড়া দেব না।তাই বলছি আমাকে জোর করো না।আমি এখানে থাকলে অনেক সমস্যা হবে।রাস্তাঘাটে চলতে কখনো হয়তো হুট করে জেসি কিংবা তন্ময়ের সাথে দেখা হয়ে গেলে আমার কষ্টগুলো বাড়বে।চিন্তা করো না আমি আর জীবনে কোন ভুল সিদ্ধান্ত নেব না।আমি বাঁচতে চাই।আমার বাচ্চাটার জন্য হলেও আমায় বাঁচতে হবে।আর আমি তোমার সাথে যোগাযোগ রাখব।তবে তুমি যেটা চাইছো সেটা সম্ভব না।”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মাহবুব।বেশ কিছুক্ষণ মিলির কথাগুলো ভাবলো।ভাবলো কি করবে?সায় জানাবে নাকি জানাবে না।তবে এতোটুকু মাহবুব বুঝলো যে মিলিকে জোর করে কোন লাভ হবে না।অবশেষে নিজেই নিজেকে রাজি করাতে হলো।

“ঠিক আছে মেনে নিলাম তোর কথা।তবে আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করবি না।আর তন্ময়ের কি করবো?”

“ওর চাকরিটা যেন না থাকে সেই ব্যবস্থা করতে পারবে?আর দেখো যেন কোথাও চাকরি না পায় খুব সহজে।”

“আর ও যে জেলে আছে এখন?”

“থাকতে দাও কয়েকদিন।একটু বন্দি জীবন কাটাক।অনেক তো উড়লো।মুখ থুবড়ে পরা কাকে বলে একটু বুঝতে দাও ওকে।”

“আর ওর বন্ধু রাজিবের কি করবো?ও তো জেলে।”

মিলির চোখেমুখে কাঠিন্যতা ফুটিয়ে তুলে বললো,

“ওই জা/নো/য়ার/টারও একই অবস্থা করবে যা যা তন্ময়ের সাথে করবে।”

_______

তন্ময়কে গিয়ে যখন একজন কনস্টেবল বলল যে ওর সাথে কেউ দেখা করতে এসেছে তন্ময়ের মনে হয়েছিল এর থেকে ভালো কোন সংবাদ আজ অব্দি শোনেনি। যাক ওর কথা তবে কারো মনে পড়েছে।তবে সিয়াম কে দেখে বোধহয় একটু মনঃক্ষুন্ন হলো।কেননা তন্ময়ের মনে হয় যে সিয়াম ওকে বাঁচাতে কখনোই আসবে না। তবে কি আবার খোঁচা দিতে এলো?মিলির হয়ে কি আবার ওকালতি করতে এলো?তন্ময় মনে মনে ঠিক করলো এবার সিয়াম কে ও নিজেও ছাড় দেবে না।উল্টো অপমান করে পাঠিয়ে দেবে।গম্ভীর গলায় সিয়াম কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“দেখতে এসেছিস যে মিলি আমাকে কতটা কষ্টে রেখেছে?”

সিয়াম আলতো হাসলো।তন্ময়ের যে আসলেই জ্ঞান বুদ্ধি সব লোপ পেয়েছে এতে আর কোন সন্দেহ নেই।

“মিলি তোকে কষ্টে রাখেনি তুই নিজেই তোর কষ্টের কারণ।একবারও কি তোর মনে হয় না তন্ময় যে তুই অপরাধ করেছিস?”

“দেখ সিয়াম যদি আমার কোন উপকার করতে পারিস তবেই কিছু বল।অযথা এই জেলের মধ্যে বসে তোর এসব জ্ঞান শোনার মতন ধৈর্য কিংবা ইচ্ছে কোনটাই আমার নেই।চার দিন হলো জেলের মাঝে আছি।আমাকে আদালতে তোলা হয়েছিল।বাড়িতে ফোন দিয়ে বাবা-মাকে আসতে বলেছিলাম কিন্তু ওরা আমার জেলে থাকার কথাটা শুনে ফোনটা কেটে দিয়েছে।একটা উকিল অব্দি জোগাড় করতে পারিনি আমি।এর মাঝে তুই আশা করছিস কি করে তোর এসব জ্ঞান শুনবো আমি?”

সিয়াম এবারে শব্দ করে হেসে উঠলো।

কটাক্ষ করল তন্ময়কে।সিয়ামের সেই হাসিতে তন্ময়ের গা জ্বলে গেল।রাগান্বিত গলায় বলল,

“চলে যা এখান থেকে।আর মিলিকে বলে দেস ওকে আমি কখনো ক্ষমা করব না।”

সিয়াম হাসতে হাসতেই বলল,

“তোর কি মনে হয় তোর থেকে ক্ষমা পাওয়ার জন্য বসে আছে মিলি?ও নিজের জীবনটা গোছাতে চলে গেছে।তোর এসব আজেবাজে কথা,অভিযোগ কোন কিছুই ওর উপর প্রভাব ফেলতে পারবে না।”

তন্ময় ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“চলে গেছে মানে?কোথায় গেছে?”

“সে সব জেনে তোর কোন কাজ নেই।শুধু এতোটুকু জেনে রাখ তোর থেকে অনেক দূরে চলে গেছে।”

“আমাকে এভাবে রেখে ও কি করে চলে গেল?ও কেস তুলে না নিয়ে চলে গেল?মানে আমি সারা জীবন জেলে থাকবো নাকি?”

“তুই যে অপরাধ করেছিস হয়তো এই পৃথিবীতে তার পরিপূর্ণ শাস্তি পাওয়া সম্ভবই না।এখন যতটুকু সম্ভব সেক্ষেত্রে যদি বলি তোর সারা জীবন জেলে কাটানো উচিত।তুই আশা রাখছিসই বা কেন যে তুই জেল থেকে ছাড়া পাবি?আর মিলি তোকে রেখে গেল এটা প্রশ্ন করছিস?ছেড়ে তো আগে তুই দিয়েছিস মিলিকে।”

মূহুর্তের মাঝে তন্ময়ের অভিব্যক্তি বদলে গেল।চোখে সেই তেজ,রাগ,গম্ভীর ভাব কোনোটাই আর নেই।কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগছে দেখতে।তার ভাবনার কোন কুল কিনারা খুঁজে পাচ্ছে না।

সত্যি বলতে সিয়াম কে আসতে দেখে তন্ময় ভেবেছিল মিলিও ওকে বাঁচাতে এসেছে।আর সেজন্য ইচ্ছে করে একটু রাগ দেখাচ্ছিলো যেন মিলি ওর অন্যায়টা অনুভব করতে পারে।তবে তন্ময়ের ভাবনা অনুযায়ী তো কিছুই হলো না।

তন্ময়কে চুপ করে থাকতে দেখে সিয়াম এবারে খোঁচা দিয়ে বলল,

“আচ্ছা তার আগে তুই আমায় একটা কথা বল মিলিকে খুঁজছিস কেন এখানে?তোর জেসি কোথায়?জেসি কে তো দেখতে পারছি না।ও তো তোকে খুব ভালোবাসে তাই না?তাহলে তোর শাস্তির ভাগ নেওয়া ওর উচিত ছিল।আচ্ছা আদৌও দেখা করতে এসেছিল তো তোর সাথে?খোঁজ খবর নিয়েছে কিছু যে তুই বেঁচে আছিস নাকি?”

সিয়ামের প্রশ্নের তন্ময় কোন উত্তর দিতে পারলো না।কি উত্তর দেবে?ওর কাছে তো কোন উত্তর নেই।সত্যি তো জেসি আসেনি ওর সাথে দেখা করতে।একটা বারের জন্য আসেনি আর না যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলো।একবার তন্ময়ই যোগাযোগ করার সুযোগ পেয়েছিল তবে জেসির নাম্বারটা বন্ধ পেয়েছে।

তন্ময় কে চুপ করে থাকতে দেখে সিয়াম ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বলল,

“কি হলো আসেনি তাই না?আসবেও না।তোর স্বভাব না আসলে খুব খারাপ হয়ে গেছে তন্ময়।মিলি তোকে এত ছাড় দিয়েছে যে তুই ভেবেছিস সারাজীবন ওর কাছ থেকে শুধু ছাড়ই পেয়ে যাবি।মিলি তোর এত অপরাধ ক্ষমা করেছে যে তুই ভেবেছিস ও কখনো তোকে শাস্তি দিতেই পারবে না।তুই শুধু দেখেছিস ও তোকে কতটা ভালোবাসে তাই ভেবেছিস ও কখনো তোর সাথে কিছু করতে পারবে না কিন্তু এটা তোর সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।তুই ওর ধৈর্যের বাঁধটা এমন ভাবে ভেঙ্গে দিয়েছিস যে এবার ও তোকে ভাঙতে চাইছে।”

“জেসির নাম্বারটা বন্ধ।হয়তো ও নিজেও কোন সমস্যার মাঝে আছে।দেখ মিলি আবার ওর সাথেও কিছু করল নাকি?”

সিয়ার এবারে ধমক দিয়ে বলে উঠলো,

“চুপ কর।অসভ্য,বেয়াদব ছেলে কোথাকার।তোর যদি এখনো শিক্ষা না হয় তাহলে আমি বলব তোর কখনো শিক্ষা হওয়ার দরকারই নেই ভাই।তোর চোখের সামনে সত্যিটা আছে তাও যদি তুই দেখতে না পাস তাহলে তোর এই দৃষ্টি শক্তি থাকারই কোন দরকার নেই।আর বারবার অযথা মিলির নামে দোষ দিবি না।তবে জানিস আমি এখন চাই যে তোর আর জেসির বিয়েটা যেন হয়ে যায়।কেননা মিলির থেকে অতিরিক্ত ভালোবাসা পেয়ে তুই বিগড়ে গেছিস।এবার একটু জেসির হাতে তোকে সোজা করতে হবে।দু-তিন দিন জেসির কাছে ঝারি খেলেই না তোর এসব পরকীয়ার ভূত একদম মাথা থেকে নেমে দেশ ছেড়ে পালাবে।আর তোর সাথে যা হচ্ছে একদম ঠিক হচ্ছে।তুই ডিজার্ভই করিস না মিলির মতন মেয়েকে।তুই জেসির মতন চরিত্রহীন মেয়েকেই ডিজার্ভ করিস ঠিক যেমন তোর চরিত্র।”

কথাটা বলে সিয়াম চলে গেল।তন্ময়ের নিজেকে নিজের কাছে কেমন যেন অনুভূতি শূন্য মনে হলো। কেমন যেন একটা দ্বিধা দ্বন্দ্বে কাটে আজকাল তন্ময়ের।কোনটা ঠিক কোনটা ভুল সেটা নিজেই বুঝতে পারে না।নিজের মন কি চায় সেটা নিজে ধরতে পারে না।এই হুট করে মনে হয় যে না জেসি ওর জন্য ঠিক,তন্ময় জেসি কে ভালোবাসে আবার এই পরক্ষণে যখন মনে হয় যে একটা বারের জন্য জেসি খোঁজ খবর নিল না তখন ভাবে আদৌ কি জেসি ঠিক?এই মনে হয় যে মিলি ওর জীবন থেকে চলে গিয়ে তন্ময় বেঁচে গেছে আবার এই মনে হয় কেমন যেন একটা শূন্যতা তৈরি হয়ে গেল না জীবনে?আর মাহবুবের সেই প্রশ্নটা তো এখনো তন্ময় কে ভাবায়।তন্ময় কি আদৌ ফিরতে চায়?আবার তবে পরক্ষণেই একটা কথা মনে হয় ফিরতে চাইলেই ফেরা যায় না।যেখানে ফেরার সব দরজা নিজের হাতে বন্ধ করে দিয়েছে সেখানে ফিরবে কি করে?কোন মুখ নিয়ে ফিরবে?

__________

দুই রুমের একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে মিলি।পাশের রুমে অবশ্য অন্যজন থাকে।দুই রুম,দুটো বাথরুম আর একটা কমন রান্নাঘর।মিলি সিয়ামকে বলেছিল যেন একটা কম ভাড়ার মাঝে ফ্ল্যাট খোঁজে সেজন্য সিয়াম এই ব্যবস্থা করেছে।আর এই মুহূর্তে মিলিকে একা রাখাটাও ঠিক হবে না।অন্তত পাশের রুমে যদি কেউ একটা থাকে কোন সমস্যা হলে তাকে বলতে তো পারবে।

মেয়েটার সাথে পরিচয় হয়ে মিলির বেশ ভালোই লাগলো।সিয়াম যে অফিসে চাকরি ঠিক করে দিয়েছে মেয়েটাও সেই অফিসেই কাজ করে।সন্ধ্যায় তখন একাই বাসায় মিলি।মেয়েটা এখনো ফেরেনি।জীবনটা তো তার অনেক আগেই একা হয়ে গেছে তবে আজ এই নতুন শহরে,নতুন বাড়িতে আরেকটু বেশি একা লাগছে।

সিলেটের আবহাওয়াটাও আজ ভীষণ মেঘলা।বৃষ্টি হয়েছে সকালে।এখন অবশ্য হচ্ছে না তবে যে কোন সময় আবার নামতে পারে।আকাশটাকে ঠিক মিলির মতনই উদাস লাগছে।হয়তো যখন দুঃখের ভার গুলো খুব বেশি হয়ে যাচ্ছে তখন সেও কাঁদছে।তবে মিলি ঠিক করলো মিলি আর এবারে কাঁদবে না।যেখানে সামান্য মানুষগুলোকে নিজের দুর্বলতা দেখাতে চায় না সেখানে এই বিশাল আকাশকে নিজের দুর্বলতা দেখানোর কোন মানেই হয় না।

জানালার ধারে দেওয়ালের সাথে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মিলি।বাইরের ঠান্ডা বাতাস যখন গায়ে এসে লাগছে একটা অন্যরকম তৃপ্তি অনুভব করছে যেন।মিলি ভাবছে হ্যাঁ মিলি এখন শান্তি পাচ্ছে।ওই বি/ষা/ক্ত শহর,ওই শহরের বিষাক্ত কিছু মানুষদের থেকে এতটা দূরে এসে মিলি ভীষণ শান্তি পাচ্ছে।তবে সত্যি কি মিলি শান্তি পাচ্ছে না জোর করে নিজের মনকে এটা বোঝানোর চেষ্টা করছে যে ও শান্তি পাচ্ছে?ওই শহরটা বি/ষা/ক্ত ছিল,শহরের কিছু মানুষ মিলির জন্য বি/ষা/ক্ত ছিল কিন্তু মিলির এক টুকরো ভালোলাগাও যে ওই শহরে রেখে এসেছে।মিলির এক টুকরো ভালোবাসাও যে ওই শহরেই রয়ে গিয়েছে।নিজের জীবনের কিছু সুখের স্মৃতি,কিছু কাটানো ভালো দিন,শৈশবের স্মৃতি,যৌবনের প্রেম,তারপরে সেই ভালোবাসার মানুষটার সাথে সংসারের কিছু স্মৃতি সবকিছুই তো ওই বি/ষাক্ত শহরটার মাঝে রয়ে গেছে।

জমে আছে শহরটাকে ছেড়ে আসার একরাশ কষ্ট, একটা নির্দিষ্ট মানুষকে নিজের ভালোবাসা না বোঝাতে পারার আফসোস।এক বুক সমান হাহাকার,যন্ত্রণা ছেড়ে এসেছে ওই শহরে।সেই সাথে ছেড়ে এসেছে নিজের ভালো থাকারও এক টুকরো কারণ।এতকিছু হারানোর মাঝে কি সত্যি ভালো থাকা যায়?সত্যিই কি শান্তি পাওয়া যায়?

ফেরার সময় যখন বাসটা ছেড়ে দিল মিলি তখন জানলা দিয়ে শেষ বারের মতন শহরটাকে দেখে নিল। শেষবার তার কারণ মিলি আর এই শহরে ফিরতে চায় না।বাইরে তখন মাহবুব দাঁড়িয়েছিল,সিয়াম-নীলিমাও দাঁড়িয়েছিল।সিয়াম আসতে পারেনি মিলির সাথে অফিসের একটা জরুরী কাজ থাকার জন্য।মাহবুব অবশ্য আসতে চেয়েছিল তবে মিলি কোনমতেই রাজি হয়নি।এত দূরে খুব কাছের মানুষের সাথে পাড়ি জমানোর পর যখন আবার সে মিলির হাতটা ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে চাইবে তখন হয়তো মিলির বুকটা কাঁপবে।হয়তো ফিরে যেতে ইচ্ছে করবে ওই মানুষটার সাথে।সেই পিছুটানের ভয়েই মিলি আনতে চাইনি মাহবুবকে।

বিজ্ঞাপন

মাহবুব নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল মিলির দিকে। একবারের জন্যও আর আটকায়নি।শুধু সেই দৃষ্টিতে ছিল একরাশ আকুতি।বারবার যেন মিলিকে অনুরোধ করছিল যেন না যায় মিলি।মিলি বুঝেও সেই অনুরোধ কে পাত্তা দেয়নি।বাসটা ছাড়ার সাথে সাথে হাত নাড়িয়ে তিনজনকে বিদায় জানিয়েছিল।বিদায় জানানো শেষে সঙ্গে সঙ্গে জানালাটা বন্ধ করে দিয়েছিল যেন ওরা আর মিলিকে দেখতে না পায়,মিলিও যেন ওদেরকে দেখতে না পায়।

মিলি তো নিজের সব ভালোবাসার মানুষ ফেলে রেখে এসেছে ওই শহরে তাহলে কেন এখন এই ভালো থাকার নাটকটা করছে?কাকে দেখানোর জন্য নাটকটা করছে?কেউ তো নেই ওর আশেপাশে।এসব ভাবতে ভাবতেই মিলির অজান্তে,অনিচ্ছাকৃতভাবে চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।সঙ্গে সঙ্গে ধরণীতে বৃষ্টি নামলো।মিলি এতে বেশ অবাক হলো।হঠাৎ করে আকাশটাকে নিজের খুব আপন কেউ মনে হলো।মনে হলো আকাশটা মিলি কে সমবেদনা জানাচ্ছে।মিলিকে বোঝাতে চেষ্টা করছে কাঁদলে খুব বেশি ক্ষতি হয় না।মাঝে মাঝে কিছু পুরোনো আবেগ,কিছু পুরনো খারাপ স্মৃতিকে ভুলে যাওয়ার জন্য একটু কাঁদা দরকার।

জীবন থেকে এই কালো মেঘ গুলো দূর করার জন্য একটু কাঁদা দরকার।নাহলে পরবর্তী জীবনে বাঁচবে কি করে?

খুব অল্প সময়ের মধ্যে আকাশ,কালো মেঘ আর বৃষ্টি মিলিকে একটা দারুন শিক্ষা দিয়ে গেল।মিলিকে শিখিয়ে দিয়ে গেল শক্ত হওয়ার জন্য কাঁদলেও কোন দোষ নেই।কিছু বি/ষাক্ত স্মৃতি ভুলে যাওয়ার জন্য একবার কেঁদে নেওয়া যায়।কিন্তু তারপর আর দুর্বল হলে চলে না।নিজেকে শক্ত করে দাঁড় করাতে হয়।সকল কালো মেঘগুলোকে জীবন থেকে ছেঁটে ফেলতে হয়।বুক চিরে সব দীর্ঘশ্বাস বের করে দিয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে হয়।তারপর নিজেই নিজেকে অনুপ্রেরণা দেওয়ার জন্য বলতে হয়,

“আমার জন্য আমিই যথেষ্ট।”

________

“এই জবটা আপনার কেন প্রয়োজন?”

মিলি বেশ স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,

“যে কারণে বাকি সবার জবের প্রয়োজন হয়। স্বনির্ভরশীল হতে চাই।”

“আপনি তো এর আগে একটা স্কুলে জব করতেন তাহলে হঠাৎ কর্পোরেট সেক্টরে জবের সিদ্ধান্ত নিলেন কেন?”

“আসলে নির্দিষ্ট কোন জায়গায় চাকরি করার ইচ্ছে ছিল না।এই সেক্টরে একটা চাকরির সুযোগ হয়েছে সেজন্য চেষ্টা করছি।”

“আপনার নাম আমাদের একজন এমপ্লয়ি রেকমেন্ড করেছেন।আমরা ভেবেছিলাম আপনাকে অ্যাপয়েন্ট করব কিন্তু কথা হচ্ছে এখন আমরা আপনার থেকেও একজন ভালো ক্যান্ডিডেটের দেখা পেয়েছি।তার ওয়ার্ক এক্সপেরিয়েন্সও আছে।তাহলে আমরা তাকে রেখে আপনাকে কেন অ্যাপয়েন্ট করব?”

মিলি আলতো হেসে বলল,

“দেখুন আমি তো আপনাদেরকে জোর করতে পারি না আমাকে চাকরিটা দেওয়ার জন্য।যেহেতু তার ওয়ার্ক এক্সপিরিয়েন্স আছে তাহলে আমি এটাও জোর দিয়ে বলতে পারবোনা যে আমি তার থেকে ভালো কাজ করব।তবে এতটুকু বলতে পারি সুযোগ পেলে আমি নিজেকে অবশ্যই প্রমাণ করবো।আমার যতটুকু কোয়ালিফিকেশন আছে ততটুকু দিয়ে যদি আপনাদের মনে হয় আমি এই জব ডিজার্ভ করি তাহলে আমাকে দেবেন।কোনরকম কোন দয়া দেখানোর প্রয়োজন নেই কিংবা আমার নাম আপনাদের একজন এমপ্লয়ি রেকমেন্ড করেছে জন্যও দেওয়ার প্রয়োজন নেই।”

ভদ্রলোক হাসলো।মিলির উত্তরটা বোধহয় ওনার পছন্দ হয়েছে।হাত থেকে মিলির ফাইলটা পাশে টেবিলের উপর রেখে মিলির মুখোমুখি তাকিয়ে ঠোঁটে তীর্যক হাসি ফুটিয়ে বলল,

“আপনার অ্যানসারটা কিন্তু ইম্প্রেসিভ ছিল।এত বছর তো ঢাকায় থেকেছেন হঠাৎ করে সিলেটে আসার সিদ্ধান্তটা কেন নিলেন?ঢাকাতেও তো আমাদের অফিসের ব্রাঞ্চ আছে।ওখানে আপনি ট্রাই করতে পারতেন?”

“সেসব আমার পার্সোনাল ম্যাটার।প্রফেশনাল জায়গায় পার্সোনাল বিষয়গুলোকে না তুললে আমি খুশি হবো।”

ভদ্রলোক ইতস্তত গলায় বললেন,

“আই এম রিয়েলি সরি।আমি আপনাকে নিশ্চয়তা দিতে পারছি না এই জবটার।কারণ অন্য ক্যান্ডিডেট আপনার থেকে এক্সপিরিয়েন্সের দিক থেকে এগিয়ে আছে।”

“যদি এই কারণে আমায় রিজেক্ট করেন তাহলে আমি বলব আমি তো কখনো এক্সপেরিয়েন্স তৈরি করার সুযোগই পাবো না।আপনারা চাইছেন একজন এক্সপেরিয়েন্স ক্যান্ডিডেট অথচ একজন নতুন ক্যান্ডিডেট কে এক্সপেরিয়েন্সড হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না।এই ফিল্ডে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ক্যান্ডিডেট আসছে।তাদের থেকে আপনি কিভাবে এক্সপেরিয়েন্স আশা করবেন বলুন আমায়?একজন মানুষ যে প্রথম কোন একটা জব ইন্টারভিউতে গিয়েছে তার থেকেও যদি আপনি এটা আশা করেন যে সে এক্সপেরিয়েন্সড হবে তবে তো তার জব পাওয়া কখনোই সম্ভব না।

“ইমপ্রেসিভ।আপনাকে জানানো হবে।এখন আসতে পারেন।”

“ধন্যবাদ।”

মিলি দরজার কাছে গেলে ভদ্রলোক পিছন থেকে একবার মিলির নাম ধরে ডাকলো।মিলি পিছনে ফিরে তাকিয়ে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“কিছু বলবেন?”

“আমাকে কি আপনার চেনা চেনা লাগছে?”

প্রশ্নটা মিলির কাছে ভীষণ অদ্ভুত লাগলো।একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষকে চেনা চেনা লাগার প্রশ্নটা আসছে কোথা থেকে?কিছু মুহূর্তের জন্য হয়তো পাগ/লও ভাবলো।এমনিতেই লোকটাকে পছন্দ হয়নি তার উপর আবার এসব অদ্ভুত প্রশ্ন।

"চেনা চেনা লাগার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে?”

“নাথিং,যেতে পারেন।বিব্রত করার জন্য দুঃখিত।”

“আপনি কি আমায় কোনোভাবে চেনেন?”

“পরে কখনো বলবো।”

“যদি আর দেখা না হয়?”

“হবে না কেন?”

“চাকরিটা যদি আমার না হয় তাহলে কি করে দেখা হবে?”

“আপনার বাড়ির ঠিকানা জানি।দরকার পড়লে সেখানে গিয়ে বলে আসবো।”

মিলি কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করলো,

“আমার বাড়ি চেনেন মানে?কে আপনি ঠিক করে বলুন তো?”

ভদ্রলোক সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে নিজে পাল্টা প্রশ্ন করলো,

“নিজেদের কোম্পানি রেখে আপনি অন্য জায়গায় কেন জব ট্রাই করছেন জানতে পারি কি?”

মিলি এবারে গম্ভীর গলায় বলল,

“কে আপনি?”

“যেহেতু চেহারা চেনেননি,নাম তো শুনেছেন তার পরেও চেনেননি তাহলে আর কি বলে পরিচয় দেব?এখন যেটা বলে পরিচয় দিলে আপনি চিনবেন সেই পরিচয়টা শুনলে আপনার পছন্দ হবে না।আপনার সাথে আমার দেখা গুলো ভীষণ অন্যরকম একটা স্মৃতি তৈরি করে।কথাবার্তা গুলো কেমন যেন অদ্ভুত ধরনের হয়।আবারো যে কখনো আপনার সাথে দেখা হবে সেটা সত্যি ভাবিনি।”

মিলি এবার দরজা ছেড়ে ডেস্কের দিকে এগিয়ে এলো।একটু গম্ভীর গলাতে বলল,

“পরিষ্কার করে বলুন কে আপনি?আপনি যদি আমাকে এত ভালোভাবে চিনে থাকেন,আমাদের দেখাশোনা কথাবার্তা যদি এমনই অদ্ভুত হয় তবে আমি আপনাকে কেন চিনতে পারছি না?”

ভদ্রলোক আবারও আলতো হেসে বলল,

“আমাকে চিনতে না পারার সবথেকে বড় কারণটা বোধ হয় আপনার হাসবেন্ড।যদি আমি ভুল না হয়ে থাকি তন্ময় ছাড়া অন্য কোন পুরুষের দিকে ঠিক করে তাকান না আপনি।কিংবা তাকালেও তার চেহারাটা মনে রাখার প্রয়োজন বোধ করেন না।তা আপনার সেই পাগল প্রেমিক কোথায়?এভাবে একা ছেড়ে দিলো আপনাকে আমি তো এটা ভাবতেই পারছি না।বাইরে অপেক্ষা করছে নিশ্চয়ই?”

মিলি এবার আরো অবাক হলো।এই ছেলে তন্ময়ের ব্যাপারেও জানে?তাহলে মিলি কেন চিনছে না এনাকে?ওনার কথাবার্তা শুনে তো মনে হচ্ছে মিলির ব্যাপারে বেশ অনেক কিছুই খুব ভালো করে জানে তারপরও তাহলে মিলি কেন বুঝতে পারছেনা ইনি কে?মস্তিষ্কের উপর ভীষণ জোর খাটালো মিলি।খুব করে মনে করার চেষ্টা করলো যে এই মানুষটাকে কোথাও দেখেছি কিনা কিন্তু কোনমতেই মনে হলো না।প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“আপনার নামটা যেন কি?”

“ফরহাদ রিয়াজ।”

“ট্রাস্ট মি আমি এই নামে কাউকে চিনি বলে কোনমতেই কিছু মনে পড়ছে না।”

“মনে আছে কয়েক বছর আগে একটা রেস্টুরেন্টে বসে আমাদের দুজনের মাঝে প্রথম কথাবার্তা হয়েছিল।আপনি এসেছিলেন আমার কাছে একটা অনুরোধে আর আমি এসেছিলাম আপনার সাথে পরিচিত হবার আশায়।দুজনের দু'রকম ইচ্ছে ছিল কিন্তু পূরণ হয়েছিল আপনার ইচ্ছেটা।তারপরে আমাদের আলোচনার মাঝে হঠাৎ করে কোত্থেকে যেন একটা প্রেমিকা হারানোর ভয়ে একদম কাতর হয়ে ওঠা প্রেমিকের আগমন ঘটে। এসেই সরাসরি প্রেমিকার পায়ের কাছে বসে পড়ে।তার হাত দুটো ধরে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়।বিভিন্ন ভাবে অনুরোধ করে সে তাকে।আমাকেও বলে আমি যেন তার প্রেমিকাকে ছেড়ে দেই।এবং অবশ্যই আমি কোন সম্পর্কে তৃতীয় ব্যক্তি হতে চাইনি সেজন্য চলে এসেছিলাম।যেহেতু আমাদের দুজনের সম্পর্কটার তৈরিও পারিবারিক সূত্র ধরেই তাই তেমন বিশেষ কোন টান ছিল না আপনার প্রতি।সেজন্য খুব সহজেই সম্পর্কটা ভেঙে ফেলতে পেরেছিলাম।তবে জানেন আমার আজও আপনার সেই পাগল প্রেমিকের কথা মনে হয়।আর যখন মনে হয় তখন আমিও একটু পাগ/লামি করার চেষ্টা করি।”

এতক্ষণে মিলির কাছে ফরহাদের পরিচয়টা স্পষ্ট হলো।তবে কোন মতেই একটা কথা বুঝতে পারল না যে তাই বলে নামটা ভুলে গেল কি করে?ফরহাদের চেহারার মাঝেও যেন একটু বদল এসেছে।তখন গাল ভরতি দাড়ি গুলো ছিল না,চোখে চিকন প্রেমের চশমাটাও ছিল না,চুলগুলো একটু অন্যরকম করে কাটা এখন।সেজন্যই চিনতে পারেনি।এতক্ষণে সেই পুরনো ছবিটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে।

তবে ফরহাদ যে এত বছর পরেও মিলিকে চিনেছে এটা মিলির কাছে বেশ আশ্চর্যের ব্যাপার লাগলো।বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

“আপনি আমাকে এখনো মনে রেখেছেন?ব্যাপারটা সত্যিই ভীষণ আশ্চর্যের!”

“কেন মনে রেখেছি জানেন?আপনার সেই পা/গল প্রেমিকের জন্য।আর অবশ্যই অবশ্যই আপনার সাহসের জন্য।সত্যি বলছি সেই দিন আপনার ঐ পাগল প্রেমিকের চোখে আমি আপনাকে হারানোর যে ভয়টা দেখেছিলাম না ওটা আমাকে প্রচন্ড পরিমাণে অবাক করেছিল।আসলে আমার কখনো কারো সাথে কোন সম্পর্ক ছিল না বলতে পারেন সেজন্যই প্রেম ভালোবাসার ব্যাপার নিয়ে আমার তেমন কোনো অভিজ্ঞতাও নেই।কিন্তু আপনার সেই পাগল প্রেমিক তন্ময়ের পাগলামো দেখে আমারো প্রেম করার ইচ্ছে জেগে ছিল।আমি মনে মনে ঠিক করেছিলাম যে যদি কাউকে ভালোবাসি কখনো তন্ময়ের মতন করেই ভালোবাসবো।”

মিলির ভীষণ হাসি পেল ফরহাদের কথা শুনে।এই ছেলেটা তো মিলির মতনই ভুল করছে।কিছু সময় তন্ময় কে দেখে ভেবেছে সারা জীবন বোধহয় তন্ময় এমনই থাকবে।নিজের মতন করে নিজের মাঝে তন্ময়ের একটা আলাদা প্রতিচ্ছবি বানিয়ে নিয়েছে।অথচ আজ যদি ফরহাদ জানতো যে মিলির সেই পাগল প্রেমিক খ্যাত তন্ময়ের কি আমুল পরিবর্তন ঘটেছে তবে কতই না ঘৃণা করতো তন্ময় কে।এই যে ফরহাদ এখন বলছে যে ও ঠিক করেছিল কাউকে ভালোবাসলে তন্ময়ের মতন করেই ভালোবাসবে নিজের এই ভাবনার প্রতিও এক আকাশ সম ঘৃণা জমতো।যদিও বা কাউকে ভালোবেসে থাকে তবে নিজের ভালোবাসার উপরে এখন ভয় জমবে।

কেননা ফরহাদ চেয়েছে তন্ময়ের মতন ভালোবাসতে যে ভালোবাসাটার ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তন হয়,যে ভালোবাসাটা মনের থেকে বেশি শরীর কে ছুঁতে চায়।

কথাগুলো ভাবতেই মিলি হঠাৎ করে আপন মনে হেসে উঠলো।মিলির হাসি দেখে ফরহাদ একটু বিব্রত বোধ করলো।ফরহাদকে ভাবতে বাধ্য করলো হঠাৎ এই হাসির কারণ।কেননা মিলির সে হাসিটা যে স্বাভাবিক ছিল না সেটা ফরহাদের বিচক্ষণ চোখ ঠিকই ধরে ফেলল।

“হাসছেন কেন?”

ফরহাদের প্রশ্নে মিলির হাসির বেগ আরো বাড়লো।হাসতে হাসতে বলল,

“প্রেমিকের পাগলামি হয় ক্ষণস্থায়ী।জং ধরে সেই পাগলামিতে।প্রেমিকের ভালোবাসা হয় মরিচিকার মত।ধুলো জমে যায়।ধুলো জমতে জমতে একসময় সেই প্রেমিকের ভালোবাসা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।জানেন তো আমার সেই পাগল প্রেমিকের ভালোবাসা ফুরিয়েছে।সে এখন অন্য কারো জন্য পাগল। ভালোবাসায় তার সেই পাগলামো করার স্বভাবটা কিন্তু যায়নি শুধু যার জন্য পাগলামো করতো সেই মানুষটা বদলেছে।বদলেছে ওর চাহিদা,বদলেছে ওর ভালোলাগা,ওর দৃষ্টিভঙ্গি। বদলেছে ওর আকাঙ্ক্ষা,ওর কামনা,বাসনা।”

মিলির বলা কথাগুলো যেন ফরহাদের মাথার উপর দিয়ে গেল।নিজেকে একটু ধাতস্থ করে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কি বললেন ঠিক বুঝলাম না?একটু ভালো করে বুঝিয়ে বলবেন?”

“আজ আসি।আমার সেই পা/গল প্রেমিকের পাগ/লামির গল্প গুলো আর কখনো না উঠুক আমাদের মাঝে।যেমন করে সে হারিয়ে গেছে তেমন করে হারিয়ে যাক তার গল্পগুলো।ভালো থাকবেন।”

কথাটা বলে মিলি চলে গেল।ফরহাদ বেশ অনেকক্ষণ ভাবল মিলির কথাগুলোর আসল মানে কি হতে পারে।একটু আন্দাজ করতে পারছে কিন্তু আসলে আন্দাজের বশে তো পুরো ব্যাপারটা ভাবা ঠিক না।

ফরহাদের এসব ভাবনার মাঝেই ওর ফোনটা বেজে উঠলো।স্ক্রিনে নামটা না দেখেই রিসিভ করলো।কানে ধরতে অপর পাশ থেকে কেউ একজন কিছু একটা বলতেই ফরহাদের মুখে দুশ্চিন্তা আর ভয়ের ছাপ দেখা গেল।ব্যতিব্যস্ত গলায় বলল,

“আমি এক্ষুনি আসছি।”

বিজ্ঞাপন
রিক্ত বসন্ত গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস