মাঝে বেশ কয়েকটা ক্যালেন্ডারের পাতা বদলেছে।বদলেছে সবার জীবন প্রবাহ।এখন ভোরের দিকে হালকা হালকা কুয়াশা দেখা যায়।কিছুদিনের মধ্যেই একদম হাড় কাঁপানো শীত বোধ হয় নেমে পড়বে।মিলির এখন একা একা হাঁটাচলা করতে বেশ কষ্ট হয়।তবে হ্যাঁ নিজেকে সামলে নেওয়ার ক্ষমতা এখন মিলির হয়েছে।কারো হাত ধরে হাঁটতে হয় না।হোঁচট খেয়ে পড়ে যাবে এই ভয়ে হাঁটার সময় পাশে কাউকে রাখতে হয় না।অন্ধকার ঘরে রাতে ঘুমোতেও শিখে গেছে।আজকাল কোন নির্দিষ্ট একটা মানুষের কথা খুব কমই মনে পড়ে।তবে হ্যাঁ একেবারে ভুলে যায়নি।যখন রাতের বেলা অন্ধকার ঘরে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ওই খোলা আকাশের বিশাল চাঁদটার দিকে তাকায় তখন মনে পড়ে মানুষটার কথা।মনে পড়ে একটা সময় দুজনে একসাথে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওই চাঁদটা দেখতো।
অফিসে এসে সরাসরি নিজের ডেস্কে চলে গেল মিলি।চাকরিটা সে এখনো ছাড়েনি।এখনো তো একেবারে শরীর নাজেহাল হয়ে যায়নি যে চাকরিটা ছাড়তে হবে। দেখা যাক না কতদিন করা যায় এভাবে।চেয়ারে বসে ব্যাগের ভেতর থেকে পানির বোতলটা বের করে আগে কয়েক ঢোক পানি খেল।এখন অল্পতেই কেমন যেন হাঁপিয়ে ওঠে।ভাবলো কিছুক্ষণ একটু বসে বিশ্রাম নেবে তারপর ল্যাপটপটা খুলবে।মিলির বিশ্রাম নেওয়ার মাঝেই কোথা থেকে যেন ফরহাদ এলো।মৃদু রাগান্বিত গলায় মিলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপনি এত অবাধ্য কেন মিলি বলুন তো?মাহবুব স্যার বারবার করে আপনাকে বলছে যে অফিসে আসার দরকার নেই,আমি বারবার করে বলছি তারপরও শোনেন না কেন কথা?আপনার এই অবাধ্যতার জন্য যদি কোন একটা ক্ষতি হয়ে যায় তখন কি হবে ভেবে দেখেছেন?তখন তো শুধু কাঁদবেন।কিন্তু তখন কেঁদে আর লাভটা কি হবে?”
হঠাৎ করে ফরহাদের আগমন,তার ওপর আবার সবার সামনে এভাবে চেঁচামেচিতে মিলি একটু থতমত খেল।আড়চোখে আশেপাশে তাকাতেই দেখলো অনেকগুলো বিষ্ময় ভরা দৃষ্টি ওদের দিকে তাকিয়ে আছে।মিলির ভীষণ অস্বস্তি হলো।ইতস্তত গলায় ফরহাদকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমার তো এখনো আসতে অতটা সমস্যা হয় না।”
“কিন্তু আপনার এখন রেস্ট এর দরকার।এতটা রাস্তা জার্নি করে আসা একদমই ঠিক না মিলি।আপনার কিছু হয়ে গেলে আমি মাহবুব স্যার কে কি জবাব দেব বলুন তো?”
“চেঁচাচ্ছেন কেন?আমার কিছু হবে না।আর তাছাড়া আমাকে আপনার কেবিনে ডাকলেও তো পারতেন?”
“আপনাকে ডাকিনি কারণ এতোটুকু পথ আবার হেঁটে যেতে আপনার অসুবিধা হবে তাই।”
“আস্তে কথা বলুন।আশেপাশে আরো অনেক মানুষ আছে,ওদের কাজের অসুবিধা হচ্ছে।”
ফরহাদ যেন এবার হুঁশে ফিরলো।এমনিতেই মনে হয় মাথাটা কোন কারণে গরম ছিল কিংবা কোন অশান্তিতে ছিল তার ওপর মিলির প্রতিদিনের অবাধ্যতা আর ভালো লাগেনা।নিজের একটু যত্ন নিলে কি হয়?একটু খেয়াল রাখলে কি হয়?ফরহাদ এত দিকে নজর রাখতে পারে না তো।এবারে শান্ত গলায় বলল,
“কাল থেকে আর অফিসে আসবেন না।আর এটাই আমার শেষ কথা।এরপরও না শুনলে আপনাকে আর চাকরিতেই রাখবো না।তখন দেখবো আপনি কি করে অফিসে আসেন।”
মিলি তাড়াহুড়ো কন্ঠে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে আসবো না,আপনি যান।”
ফরহাদ চলে গেলো।মিলি আবারো আড়চোখে একবার আশেপাশে তাকিয়ে দেখল কিছু মানুষ নিজেদের কাজে মনোযোগ দিয়েছে তো কিছু মানুষ বাঁকা দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।মিলি জানে ওকে আর ফরহাদকে নিয়ে অফিসে অনেকের মাঝে বিভিন্ন ধরনের আজেবাজে কথাবার্তা চলে।অনেকে বিষয়টাকে ভালোভাবে দেখে তো অনেকে খারাপ ভাবে।অনেকে জানে যে মিলি ফরহাদের পূর্ব পরিচিত জন্য ওদের সম্পর্কটা একটু ভালো কিন্তু অনেকেই সেই সম্পর্কটাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না।তবে এখন কেন যেন মিলির নিজেরও এই ব্যাপারটা আর ভালো লাগছে না।ফরহাদ আজকাল একটু বেশি অধিকার দেখায়,একটু বেশি যত্ন নেয়।লাবিবা বারবার বলছে যে ফরহাদের এসব কিছু স্বাভাবিক হতেই পারে না।নিশ্চয়ই ওর মনের মাঝে কিছু আছে।কিন্তু এমনটা তো ঠিক না।মিলিকে বোঝাতে হবে ফরহাদকে যে ওর পক্ষে নতুন করে আর কোন কিছু ভাবা সম্ভব না।মিলি ঠিক করলো আজকেই কথা বলবে এই নিয়ে ফরহাদের সাথে।ওকে বোঝাতে হবে।মানুষটা খুব ভালো সেটা মিলি জানে তাই অযথা তাকে কষ্ট দেওয়া ঠিক হবে না।এর থেকে ভালো সময় থাকতে সাবধান করে দেবে।
_______
“আমায় আর একটু সময় দিন আমি ছেড়ে দেবো এই বাড়িটা।”
“আগে ছেড়ে দিবেন বললেই তো হবে না।আগে চার মাসের ভাড়া পরিশোধ করুন তারপর বাড়ির বাইরে পা রাখবেন।”
তন্ময় একটু চোট দেখিয়ে বলল,
“ভাড়া না দিয়ে যাব না।চো/র পেয়েছেন কি আমায়?ভাড়া দিতে পারিনি জন্যই এখনও আপনার বাড়িতে আছি।না হলে কি ভেবেছেন আপনার এতো কথা শোনার আমার কোন ইচ্ছে ছিল?”
বাড়িওয়ালাও পাল্টা চোট দেখিয়ে বলল,
“একদম গলা তুলে কথা বলবেন না।ইচ্ছে নেই তো বেরিয়ে যান ভাড়া দিয়ে।চো/র না হলেও বাট/পার আপনি।আর দশ দিন সময় দিলাম এর মধ্যে যদি ভাড়া শোধ করতে না পেরেছেন তাহলে কিন্তু খবর আছে।কোন জিনিসপত্র নিয়ে বেরোতে দেব না।সোজা ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেব বাড়ি থেকে।”
তন্ময় খুব কষ্টে নিজের রাগটুকু নিয়ন্ত্রণ করলো।কেন যে ভুলভাল জায়গায় নিজের রাগ দেখিয়ে ফেলে কে জানে।কন্ঠটা এবার তার একটু নরম হলো।
“আচ্ছা ঠিক আছে আমি দিয়ে দেবো টাকা।এখন যান, আমায় একটু ভাবতে দিন শান্তি মত যে কি করে টাকা দেবো।এমনিতেই পুরো জীবনটাই অশান্তি।আর অশান্তি বাড়াবেন না।”
বকবক করতে করতে বাড়িওয়ালা চলে গেল সেখান থেকে।তন্ময় পাশে তাকাতেই দেখলো জ্যোতি দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ঠোঁট টিপে হাসছে।জ্যোতির হাসি দেখে তন্ময়ের গা জ্ব/লে গেল।রাগান্বিত গলায় বলল,
“নিজের বাড়িতে কি কোন কাজ নেই আপনার?”
জ্যোতি ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“কাজ শেষে তো একটু মনোরঞ্জনের দরকার হয় সেটাই করছিলাম আর কি।তা তন্ময়,আপনার জেসিকে বললেই তো ভাড়াটা দিয়ে দেয়।আর অশান্তি কিসের আপনার জেসি থাকতে?ওই তো আপনার জীবনের একমাত্র শান্তি।আর অশান্তি তো অনেক মাস আগেই ছেড়ে চলে গেছে।”
“জেসির থেকে কেন সাহায্য নিতে যাব?যা করার সব আমিই করব বুঝতে পেরেছেন?আপনি একদম কম কথা বলবেন।”
“আচ্ছা তন্ময় তার আগে আরেকটা কথা বলুন তো, আপনি তো খুব তাড়াহুড়ো শুরু করে দিয়েছিলেন জেসি কে বিয়ে করার জন্য।মিলি তো চলে গেছে অনেকগুলো দিনই পার হয়ে গেল এখনো বিয়ে করলেন না কেন?ঘরটা কি ফাঁকা ফাঁকা লাগে না?একটা নতুন বউ এলে তো একটু আদর যত্ন করতো আপনাকে।ইশ মুখটা শুকিয়ে গেছে আপনার।মিলি তো এখন নেই কে আর যত্ন নেবে আপনার বলুন?”
জ্যোতির কথাটা তন্ময়কেও ভীষণ ভাবালো।সত্যিই তো মিলি নেই আর ওর যত্ন করার মতন,কেউ নেই।তিন বেলা এখন নিজেকে কষ্ট করে হাত পু/ড়িয়ে রেঁধে খেতে হয়।কি যে রান্না করে নিজেই আর মুখে তুলতে পারে না।ঘরদোরের অবস্থা খারাপ।মাস শেষে একদিন গোছানো হয় কিনা সন্দেহ।আর বাকি রইল জেসিকে বিয়ে করার কথা।জেসি তো তন্ময়কে এখনো বিয়ে করতে রাজি হয়নি।সেই একই কথা চাকরি না পাওয়া অব্দি বিয়ে করবে না।আর না তন্ময় এখনো কোনো চাকরি পেয়েছে।ব্যাংকে জমানো অল্প কিছু টাকা আর ধারের টাকা দিয়ে এই কয়মাস চলেছে যা প্রায় শেষের পথে।এদিকে পাওনাদাররাও এখন বাড়িতে আসা শুরু করে দিয়েছে।তন্ময়কে চুপ করে থাকতে দেখে জ্যোতি পুনরায় বলে উঠলো,
“কি হলো বলুন জেসিকে বিয়ে করেননি কেন এখনো?”
“ও বলেছে চাকরি না পাওয়া অব্দি বিয়ে করবে না।”
তন্ময়ের কথা শুনে জ্যোতি শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“চাকরি পাওয়ার পরেও আপনাকে বিয়ে করবে না।ও তো বিয়ের আগেই অন্য জায়গায় সংসার করা শুরু করেছে।আপনি আসলে একটা ব/ল/দ।”
জ্যোতির কথা শুনে তন্ময়ের কপালে ভাঁজের সৃষ্টি হলো।প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“সংসার শুরু করেছে মানে?”
জ্যোতি কোন মতে নিজের হাসিটা থামিয়ে বলল,
“দাঁড়ান আজ একটা বো/ম ফা/টা/ই।মিলি আমাকে যদিও এটা দেখাতে নিষেধ করেছিল।বলেছিল যে আপনি নিজ থেকে সত্যিটা জানলে নাকি আরো বেশি কষ্ট পাবেন কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আজ আপনাকে এটা দেখানো দরকার।কারণ আপনার যা অবস্থা দেখছি কোনদিনও নিজ থেকে কিছু ধরতে পারবেন না।”
“কি দেখাবেন?”
জ্যোতি ফোনের লক খুলে গ্যালারি থেকে কয়েকটা ছবি বের করে ফোনটা তন্ময়ের হাতে দিয়ে বলল,
“এই দেখুন আপনার জেসি বিয়ে না করেও স্বামী পেয়ে গেছে তাহলে আপনাকে আর কি দরকার?কে জানে দুজনে কি করে?”
তন্ময় তাড়াহুড়ো করে ফোনটা হাতে নিল।ফোনের স্ক্রিনে স্পষ্ট দুটো পরিচিত মুখ দেখতে পেল তন্ময়।ফুচকার দোকানের সামনে বেঞ্চের ওপর বসে আছে রাজীব আর জেসি।ফুচকা খাওয়ার উদ্দেশ্যই গেছে বোধহয় দুজনে।প্রথম কয়েকটা ছবি তে শুধুমাত্র দুজনের হাসি মুখটাই দেখা যাচ্ছে যা তন্ময়ের কাছে বেশ স্বাভাবিক মনে হলো।তবে একদম,শেষের ছবিটায় দেখা যাচ্ছে রাজীবের হাতটা জেসির কোমরে রাখা।তন্ময় যেন নিজের বাকশক্তি হারিয়ে ফেলল।নিজের চোখ কে বিশ্বাস হচ্ছে না।জ্যোতি তন্ময়ের অবস্থাটা বুঝতে পারলো।কেন যেন খুব হাসি পেল।এটা তো হওয়ারই ছিল।কাকে ছেড়ে কাকে ভালোবেসেছে তন্ময় সেটা তো ওকে বুঝতেই হতো।
তন্ময় মৃদু কম্পিত গলায় বলল,
“এগুলো সত্যি?”
“মুর্খের মতন কথা বলবেন না একদম তন্ময়।এমনই ভালো বাসলেন জেসি কে যে নিজের চোখকেও বিশ্বাস হচ্ছে না এখন আর?পা/গল আপনি?”
তন্ময় কেমন যেন হাঁসফাঁস করছে।বিশ্বাসঘাতকতা কাকে বলে সেটা যেন এখন বুঝতে পারছে।ভালোবাসার মানুষটা ঠকালে কেমন অনুভূতি হয় সেটাও যেন এখন বুঝতে পারছে।
জ্যোতি তন্ময়ের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে বলল,
“ওয়েট আরেকটা ভিডিও দেখাই আপনাকে।”
তন্ময় চোখ তুলে তাকালো জ্যোতির দিকে।কে জানে আরো কি দেখাবে?ভিডিওটা বের করে জ্যোতি ফোনটা তন্ময়ের হাতে দিতে চাইলে তন্ময় বাঁধা দিয়ে বলল,
“আপনি ধরুন।আমার হাত কাঁপছে।”
জ্যোতি তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“এই ভিডিও দেখলে হাঁটু কাঁপবে।”
জ্যোতি ভিডিওটা চালু করে তন্ময়ের সামনে ধরলো।রাজীব খুব সুন্দর করে আঙুলের সাহায্যে জেসির ঠোঁটের কিনারাটা মুছে দিচ্ছে।আশেপাশে একবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে চটজলদি আবার জেসির গালেও ঠোঁট ছোঁয়ালো।ব্যস এতটুকুই দেখা গেল ভিডিও তে।
তন্ময় এবারে ধপ করে মেঝের ওপর বসে পড়লো।জ্যোতি চমকে উঠলো।যদিও তন্ময়ের কিছু হলে খুব একটা যায় আসে না তবুও মানবতার খাতিরে জিজ্ঞেস করলো,
“ঠিক আছেন আপনি?”
“মিলিও জানতো এসব?”
“হ্যাঁ জানতো।”
“তাহলে আমায় আগে বলেনি কেন?আমায় আগে বললে তো আমি জেসির সাথে সম্পর্কটা ভেঙে দিতাম।তাহলেই তো আমার আর মিলির সম্পর্কটা ভাঙতো না।”
তন্ময়ের কন্ঠে একরাশ অসহায়ত্ব প্রকাশ পেল।সেই সাথে মিলি পুরো ব্যাপারটা জানার পরেও কেন তন্ময় কে জানায়নি সেই নিয়ে বেশ অবাক হলো।তন্ময়ের এখন মনে হচ্ছে মিলি চাইলেই ওদের সংসারটা বাঁচাতে পারতো কিন্তু মিলি চায়নি।অথচ তন্ময় যে তার অনেক আগেই মিলির পর হয়ে গিয়েছিল সেসব যেন তন্ময় বুঝতেই পারছেনা।
জ্যোতির তন্ময়ের প্রতি যতটুকু সহমর্মিতা সৃষ্টি হয়েছিল শেষের প্রশ্নে সেটুকু আর রইলো না।রাগান্বিত গলায় বলল,
“আপনার লজ্জা করছেনা এসব বলতে?নিজের কোন ভুলই কি আর আপনার চোখে পড়ে না?আপনার কি মনে হয় আপনি যখন যেভাবে মিলির কাছে ফেরত যাবেন মিলি আপনাকে সেভাবেই গ্রহণ করবে?এতটা ফেলনা মনে হয় মিলিকে?”
তন্ময় অস্থির কন্ঠে বলল,
“সেসব বলিনি তো আমি।কিন্তু মিলি চাইলে অনেক কিছুই ঠিক করতে পারত।”
“কেন ঠিক করত?আর কি করেই বা ঠিক করত?আপনার মত একটা চরিত্রহীনের সাথে ও সংসার করতো কেন?আর আপনি কি ঠিক করার মতন কোন পরিস্থিতি রেখেছিলেন?একবার ভেবে দেখুন কি কি করেছেন মিলির সাথে তার পরে এই কথাগুলো বলতে আসবেন।ফালতু লোক কোথাকার।”
কথাটা বলে জ্যোতি ঠাস করে তন্ময়ের মুখের ওপরে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে চলে গেল।তন্ময় নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে উঠে দাঁড়ালো।এখন জেসির কাছে যেতে হবে।জেসির মুখ থেকে সব সত্যিটা জানতে হবে।সেই সাথে জেসি কে উত্তর দিতে হবে যে কেন ওকে এভাবে ঠকালো।
_____
“স্যার আসবো?”
কারো কণ্ঠ পেতেই ফরহাদের ধ্যান ভাঙ্গলো।বিষণ্ন মুখটাতে একটু হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে মিলিকে বলল,
“ভিতরে আসুন মিলি।”
বরাবরের ন্যয় ফরহাদের সামনে থাকা চেয়ারটা তে ইশারা করতেই মিলি বসলো সেখানে।ফরহাদের মুখের হাসিটা মিলির কাছে কেমন যেন কৃত্রিম মনে হচ্ছে।মনে হচ্ছে জোরপূর্বক হাসছে।মানুষটাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে কোন একটা বিষয় নিয়ে খুব চিন্তায় আছে কিন্তু তারপরেও মুখের হাসিটা সরাতে প্রস্তুত না।হয়তো নিজের দুর্বলতা কাউকে দেখাতে চায় না সেই জন্য।
“আপনি কি কোন বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন?”
হঠাৎ করে মিলি এই প্রশ্নটা করায় ফরহাদ একটু চমকালো।খুব তাড়াতাড়ি কিছু একটা লুকানোর চেষ্টা করে বলল,
“না তো।”
মিলির বিশ্বাস হলো না ফরহাদের কথাটা।সন্দেহী গলায় পুনরায় বলল,
“তবে আপনাকে দেখে আমার কেন মনে হচ্ছে যে আপনি কোন বিষয় নিয়ে খুব দুশ্চিন্তার মাঝে আছেন?কোন সমস্যা হলে বলতে পারেন আমায়।জানি হয়তো সমাধান করতে পারবোনা তবে হ্যাঁ কিছু পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতে পারি।”
ফরহাদ আলতো হেসে বলল,
“কিছু সমস্যার সমাধান থাকে না মিলি।কিছু সমস্যা থেকে আমরা কখনোই বের হতে পারি না।কিছু সমস্যা তৈরি হয় সারা জীবন আমাদেরকে কষ্টে রাখার জন্য।তবে জানেন তো অনেকগুলো দিন পর কেউ আমার চিন্তা বা কষ্টের ভাগ নিতে চাইলো।ধন্যবাদ আপনাকে এজন্য।”
“তার মানে কোন সমস্যার মাঝে আছেন আপনি?”
“বাদ দিন আমার কথা।আপনি বলুন কোন দরকারে এসেছিলেন?”
মিলির এখন ফরহাদকে এই কথাগুলো বলতেও সংকোচ হচ্ছে।যা বলতে চাইছে সেই সবটাই তো ফরহাদের আচরণ দেখে একটা অনুমান তৈরি করেছে।কিন্তু যদি এই কথাগুলো শুধুমাত্র মিলির অনুমানই হয় তাহলে তো ফরহাদ কে ছোট করা হয়ে যাবে?হয়তো মিলিও আর ওর চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারবে না কখনো।তবে সরাসরি না বললেও আকার ইঙ্গিতে অন্য কিছু বোঝানোই যায়।
মিলিকে চুপ করে থাকতে দেখে ফরহাদ তাড়া দিয়ে বলল,
“কি হলো মিলি বলুন।”
মিলি একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করলো।অল্প কিছু হলেও ফরহাদকে বোঝাতেই হবে।
“দেখুন আমার আর তন্ময়ের সম্পর্কটা যে এখন ঠিক কোন পর্যায়ে আছে সেটা নিশ্চয়ই এতদিনে ভাইয়ার থেকে আপনি জেনে গেছেন?”
“এসব কথা তোলার কোন দরকার নেই মিলি।আপনার অস্বস্তি হোক এমন কোন কথা আমাদের মাঝে উঠুক সেটা আমি চাইনা।”
“আমি আপনাকে কিছু বলতে চাই।অস্বস্তি হবেনা আমার।”
“ঠিক আছে বলুন।”
“তন্ময় বদলে গেছে,ও আর আমায় এখন ভালোবাসে না এসব কথাই সত্যি।কিন্তু তার সাথে এটাও সত্যি যে আমার মনে হয়তো এখনো ওর জন্য কোথাও না কোথাও একটা ভালোবাসা কিংবা দুর্বল জায়গা রয়ে গেছে।তার সাথে এটাও সত্যি যে আমার মনে ওর জন্য ঘৃণাও আছে।এখন আমি জানি না যে একটা মানুষকে একসাথে ভালোবাসা আর ঘৃণা করা যায় কিনা।তবে যদি যায় তবে হ্যাঁ আমি তন্ময়কে এখনো ভালোবাসি, আবার ঘৃণাও করি।”
“ভালো লাগলো আপনার কথাটা শুনে।ভালোবাসার মূল্যটা যে আপনার কাছে অনেক সেটা জেনে ভালো লাগলো।জানেন তো মিলি যদি আপনি আজ বলতেন যে তন্ময়ের প্রতি এখন আপনার কোন ভালোবাসা নেই তবে আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগতো যে তন্ময়কে ভালোবাসার ক্ষেত্রে হয়তো আপনার দিক থেকেও কোন কমতি রয়ে গিয়েছিল।আপনি ভালোবাসেন সত্ত্বেও নিজের আত্মমর্যাদার দিকে লক্ষ্য রেখে সবকিছু ছেড়ে চলে এসেছেন কিন্তু নিজের ভালোবাসাকে হারিয়ে যেতে দেননি।আমার দেখা আপনি খুব অদ্ভুত একজন মানুষ।”
“আমি নিতান্তই সাধারণ একজন মানুষ।জানেন আমি সব সময় খুব একটা শান্তিপূর্ণ জীবন চেয়েছি কিন্তু এখন আমার জীবনে সেই শান্তি নেই।এই সমাজে যে মেয়ে বিবাহিত হওয়া সত্বেও তার পাশে তার স্বামী থাকেনা তার কোন মর্যাদাই থাকে না।কিছু মানুষ সব সময় তাদের ভুল ধরার জন্য ব্যস্ত হয়ে থাকে তো কিছু নোংরা চোখ দেখে ভাবে যে সেসব মেয়ে এখন এতটাই সস্তা হয়ে গিয়েছে যে কিছু পুরুষ নিজেদের চাহিদা খুব অনায়াসে মেটাতে পারবে।ওইসব মেয়েদের সাথে কোন পুরুষের সাধারন কথাবার্তাও এই সমাজের মানুষ ঠিক ভাবে নিতে পারে না।কোন পুরুষ যদি তাদের প্রতি একটু যত্ন দেখায়,একটু সহানুভূতিশীল আচরণ করে তবে এই সমাজের মানুষ সেটার খুব খারাপ অর্থ বের করে।”
ফরহাদ আলতো হাসলো।কে জানে কিছু বুঝলো কি না?
“তারপর বলুন?”
মিলি আবার বলা শুরু করলো,
“কিন্তু জানেন এই সমাজের মানুষ এটা ভেবেই দেখেনা যে কিছুদিন আগে যে মেয়েটার সংসার ভেঙে গেছে সে এত তাড়াতাড়ি আবার নতুন করে একটা মানুষের সাথে জড়ানোর কথা ভাবতেও পারে না।এত তাড়াতাড়ি কেন কিছু মেয়ে তো সারাজীবনেও ভাবতে পারেনা।এদের মধ্যে হয়তো কারো জীবনে আবার নতুন করে কোনো ভালো মানুষের আগমন ঘটে।তারা হয়তো চায় ওই মেয়েদের জীবন থেকে সব দুঃখ কষ্ট দূর করে দিয়ে একটা সুখের সংসার করে দিতে।কিন্তু সব থেকে বড় কথা কি জানেন?ওই মেয়েটা কি চায়।”
মিলি হয়তো আরো কিছু বলতো কিন্তু তার আগে ফরহাদ ওকে থামিয়ে দিয়ে নিজেই বলে উঠল,
“আজ অফিস শেষে একবার আমার বাড়িতে যাবেন মিলি?”
ফরহাদের হঠাৎ এমন প্রস্তাবে মিলি একটু থমকালো।প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কেন যাব?”
“এমনিতেই।চলুন না আজ আমার বাড়ি।কিছু দেখানোর আছে আপনাকে।অনেকদিন থেকে ভাবছিলাম আপনাকে বলব কিন্তু বলা হয়ে ওঠেনি।অনেকদিন থেকেই ভাবছি আমার বাড়িতে আপনাকে নিয়ে যাবো।একজন প্রতিদিন আমার কাছে আবদার করে আপনাকে দেখার।তার খুব ইচ্ছে আপনার সাথে একটু পরিচিত হওয়ার,একটু কথা বলার।”
“কে?”
ফরহাদ আলতো হেসে বলল,
“আমার জীবনের সুখ।”
“মানে?”
“মানেটা না হয় রাতেই বলবো।তবে আজ কিন্তু আপনাকে আমার সাথে যেতেই হবে মিলি।আমি কোন কথা শুনব না।”
মিলি বেশ চিন্তায় পড়ে গেল।ফরহাদ ওর কথার কি মানে বুঝল?আর কেই বা মিলির সাথে দেখা করার জন্য এতটা ব্যস্ত হয়ে আছে?আজ তো যেতেই হবে ফরহাদের বাড়িতে।মনে হচ্ছে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে ওখানে গেলে।
“ঠিক আছে যাবো।”