রিক্ত বসন্ত

পর্ব - ২৬

🟢

“এই জবটা কেন প্রয়োজন আপনার?”

তন্ময় স্বাভাবিক গলায় বলল,

"অন্যদের যে কারণে দরকার আমারও সেই কারণেই দরকার,টাকার প্রয়োজন আমার।"

“এ ছাড়া আর দ্বিতীয় কোন কারণ নেই?”

“ওইটাই আসল কারণ।টাকা হলে বাকি সবই হবে।পাওনাদার পিছনে ঘুরছে,মাথা খেয়ে ফেলছে,মারার হুমকি দিচ্ছে।এইসব ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য চাকরি দরকার।”

ভদ্রলোক সন্তুষ্ট হলেন না বিরক্ত বোধ করলেন সেটা তার অভিব্যক্তি দেখে বোঝা গেল না।তিনি পরবর্তী প্রশ্নে বললেন,

“আগের কোম্পানিতে তো আপনি বেশ ভালো একটা পোস্টে ছিলেন তাহলে এই কোম্পানিতে এসে তার থেকে এত নিচু পোস্টে চাকরির জন্য এপ্লাই করছেন কেন?”

প্রশ্নটা শুনে তন্ময় একটু থতমত খেলো।এই প্রশ্নটা যে করবে সেটা ভাবেনি তাই এর উত্তরটাও ঠিক করে আসেনি।ভেবেছিল শুধু এই চাকরিতে জয়েন হওয়ার জন্য টুকটাক কিছু প্রশ্ন করবে আর সেসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া তো তন্ময় এর বা হাতের খেল।পড়াশোনায় সে বরাবরই ভালো।তন্ময় কে চুপ করে থাকতে দেখে ভদ্রলোক পুনরায় গম্ভীর গলায় বললেন,

"কি হলো উত্তর দিন?এই প্রশ্নের উত্তরটা দেওয়া তো সহজ।"

"আমার কিছু পার্সোনাল সমস্যা ছিল,সেজন্য ছেড়ে দিয়েছি।"

"ছেড়ে দিয়েছেন না চাকরি থেকে বের করে দিয়েছে কোনটা ঠিক?"

তন্ময় ভাবছে সত্যি বলবে না মিথ্যে বলবে। মিথ্যে বললে যদি কোনদিন কোন ভাবে জেনে যায় তখন যদি চাকরি থেকে বের করে দেয়? আবার সত্যি বললে তো সম্মান থাকবে না। কেমন একটা অপমানজনক শোনায় না যে চাকরি থেকে বের করে দিয়েছে?তবে তন্ময়ের ভিতর থেকে কেউ একজন যেন বলে উঠল আগেভাগেই সত্যিটা বলে দেওয়াই ভালো।ইতিমধ্যেই যদিও মিথ্যে বলেছে যে ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছে।তবে শুরুতেই ক্ষমা চেয়ে নিলে হয়তো ক্ষমা করে দিতেও পারে।

"আসলে কিছু সমস্যা ছিল সেজন্য চাকরি থেকে আমাকে বের করে দিয়েছে।আমার কোন দোষ ছিল না,আমার সাথে শত্রুতা করা হয়েছে।আর আমার শত্রুরা খুবই পাওয়ারফুল লোক।"

“আপনার মতন সাধারণ মানুষের সাথে এত পাওয়ারফুল লোকদের কি এমন শত্রুতা?”

তন্ময় এবারে কিঞ্চিৎ বিরক্তিকর গলায় বলল,

“ইন্টারভিউতে এসব প্রশ্ন কেন করছেন আমায়?এগুলো কি করার মতন কোন প্রশ্ন হলো?”

“ভীষণ আগ্রহ খুঁজে পাচ্ছি।আপনার ব্যাকগ্রাউন্ডটা তো জানতে হবে।কি কারণে চাকরি থেকে আপনাকে বের করে দিল,কোন আবার ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে কিনা জানতে হবে না?একটা ভালো কোম্পানিতে জব করতেন।ওই কোম্পানি তো আর এমনি এমনি আপনাকে চাকরি থেকে বের করে দেবে না।যথেষ্ট রেপুটেটেড ঐ কোম্পানি।”

“আরে বাবা ওদের সাথে আমার বউকে নিয়ে ঝামেলা।আমার বউয়ের সাথে আমার ডিভোর্স হয়ে গেছে,আমার বউয়ের বাপের বাড়ির লোকজনের অনেক ক্ষমতা।আমার বউয়ের বড় ভাই এসব ঝামেলা করেছে।আরে বাবা আমি অসহায়,নির্যাতিত হয়েছি ওদের হাতে।”

ভদ্রলোক বোধহয় আরও কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইলেন তবে তার আগে তার মেয়ে তাকে থামিয়ে দিলো।এমনিতেই তার এতো প্রশ্ন করাতে বোধহয় মেয়েটা একটু বিরক্তই হয়েছে।

“পাপা থাক না এসব প্রশ্ন এখন।আগে আমাদের কোম্পানিতে উনি চাকরি করুক তারপরে ধীরে ধীরে সম্পর্ক ভালো হয়ে গেলে নাহয় আরো প্রশ্ন করা যাবে।সো মিস্টার তন্ময়,আপনার কোয়ালিফিকেশন আর ওয়ার্ক এক্সপেরিয়েন্স দুটোই ইম্প্রেসিভ।আমরা আপনাকে সিলেক্ট করছি।”

তন্ময় উচ্ছ্বোসিত কন্ঠে বলল,

"সত্যি?"

"হ্যাঁ।আর আমার আপনার ব্যবহার খুব ভালো লেগেছে সেজন্য আমি খুশি হয়ে আপনি আগের কোম্পানিতে যে পোস্টে জব করতেন আমাদের কোম্পানিতেও সেই পোস্টে জব দিচ্ছি।"

তন্ময়ের মুখ থেকে এবার হাসিটা সরে গেল। সন্দেহি গলায় বলল,

"আপনারা আমাকে এত সুবিধা কেন দিচ্ছেন?কি উদ্দেশ্য আপনাদের?কে আপনারা?ঐ মাহবুব চৌধুরীর লোক নাতো? আমাকে চাকরির সুযোগ দিয়ে আবার কোনভাবে ফাঁসিয়ে দেবেন না তো?"

ভদ্রলোক বোধহয় এবার একটু রেগে গেলেন। কিঞ্চিত রাগান্বিত গলায় বললেন,

"হোয়াট রাবিস?কি আজেবাজে কথা বলছেন?"

"আজেবাজে কথা বলছি না আমি।তাই বলে নিশ্চয়ই আমার কোয়ালিফিকেশন এতটাও ভালো না যে এক দেখাতেই আপনারা আমাকে আমার আগের কোম্পানির পোস্টে চাকরি দিয়ে দেবেন।আমি তো ওখানে ধীরে ধীরে প্রমোশন পেয়ে এই জায়গায় এসেছিলাম।"

ভদ্রলোক কিছু বলতে চাইলো তবে তার মেয়ে থামিয়ে দিল।মেয়েটা চেয়ার থেকে উঠে এসে তন্ময়ের পাশে দাঁড়ালো।দেখতে বেশ সুন্দরী মডার্ন একটা মেয়ে।পরনে তার ব্ল্যাক লেডিস শার্ট এর উপরে ব্রাউন লেডিস ব্লেজার আর প্যান্ট।লাইট ব্রাউন সিল্কি চুলগুলো পনিটেল করা।মেয়েটা বোধহয় চাইলো একটু তন্ময় কে আকর্ষিত করতে তবে তন্ময় এখন সেই রকম মন মেজাজে নেই।একরাশ প্রশ্ন সমেত মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে তন্ময়।লিজা আলতো হেসে বলল,

“ধরে নিন আপনি একটু স্পেশাল।আসলে আপনি খুব তাড়াতাড়ি খুবই উন্নতি করেছিলেন।আপনাকে দেখে আমার মনে হচ্ছে যে আপনি অনেক হার্ডওয়ার্কিং। আপনার মতন এমপ্লয়ি আমাদের কোম্পানিতে দরকার।সো এতোটুকু সুযোগ তো দেওয়াই যায়।”

তন্ময় এবার একটু সন্তুষ্ট হলো।কন্ঠটা নরম করে বলল,

"তাহলে ঠিক আছে।"

"ওকে আপনি আসতে পারেন।"

তন্ময় উঠে চলে গেল।ভদ্রলোক গম্ভীর গলায় মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“এখনো তো অনেকের ইন্টারভিউ নেওয়া বাকি আছে তার আগেই ওর চাকরিটা কনফার্ম করলে কেন?”

লিজা ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বলল,

"তুমি চাইলে বাকিদের ইন্টারভিউ নিতেই পারো।চাইলে ওদেরকে চাকরিও দিতে পারো। তবে তন্ময়ের চাকরিটা কনফার্ম।"

____

খাবারের প্লেটটা জেসি যেন এক প্রকার ছুঁড়ে মারলো টেবিলের উপরে।তা দেখে রাজীব রাগী গলায় বলল,

"এসব কোন ধরনের আচরণ?"

জেসিও পালটা রাগ দেখিয়ে বলল,

"তুমি যেমন আচরণ করবে আমার সাথে ঠিক তেমনি আচরণ ফেরত পাবে আমার থেকে। আন্ডারস্ট্যান্ড?"

রাজীব এবার কিঞ্চিৎ বিরক্তিকর গলায় বলল,

"কি সমস্যা তোমার?"

"আমি বলেছিলাম তোমায় আমার টাকার দরকার।"

"কেন দরকার?"

"আমার কিছু কেনাকাটা করার আছে।সামনে আমার ফ্রেন্ডের বার্থডে পার্টি।আমার একটা নতুন ড্রেস নেই।আমি কি পড়বো ওখানে? পুরনো ড্রেস পড়ে গেলে আমার মান সম্মান কিছু থাকবে না।"

রাজীব ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,

"ফকিন্নির বাচ্চা হয়ে বড়লোকি চালচলন দেখাতে যাও কেন?তোমাকে বুঝতে হবে তোমার ক্ষমতা কতটুকু।এটাকে কি বলে জানো?মাটিতে থেকে আকাশ ছোঁয়ার ইচ্ছে।"

জেসির এবারে ভীষণ রাগ হলো।রাজীবের সাহস হয় কি করে ওকে এভাবে কথা বলার!

"আমাকে যে ফকিন্নির বাচ্চা বলছিস তুই কি?ভিখিরি কোথাকার!নিজের বউকে কয়েকটা টাকা দিতে পারে না জামা কেনার জন্য সে আবার বড় বড় লেকচার ঝাড়ছে।"

জেসি কথাটা বলার সাথে সাথে রাজীব চেয়ার থেকে উঠে তেড়ে এসে কষিয়ে জেসির গালে একটা চড় বসালো।বিস্ময়ে জেসির মুখ হা হয়ে গেল।গালে হাত দিয়ে রাজীবের দিকে তাকিয়ে বলল,

"তুমি আমার গায়ে হাত তুললে?ইউ স্কাউন্ড্রেল!"

কথাটা বলে জেসিও পাল্টা রাজীবকে চড় মারার জন্য উদ্যত হলে রাজীব জেসির হাত ধরে পিঠের পিছন মুচড়ে ধরল।ব্যথায় জেসি মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো।তবে রাজীবের কিছু যায় আসলো না।সে আরো একটু মোচড় দিয়ে ধরল হাতটা।দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

"আমাকে তন্ময় পাসনি তুই যে অপমান করবি আর আমি চুপচাপ শুনে যাব।একদম মেরে মুখ ভেঙ্গে রেখে দেবো যদি আর দ্বিতীয় দিন আমাকে এসব গালি দিয়েছিস।আমার টাকায় খাচ্ছিস,আমার বাড়িতে থাকছিস।একদম আমাকে গরম দেখাতে আসবি না।আর এই চোখ দুটো কে নিয়ন্ত্রণে রাখ।আজ থেকে আমার চোখে চোখ রেখে কথা বলার দুঃসাহস দেখাবি না।"

"রাজীব লাগছে আমার,ছাড়ো হাত।"

রাজীব বেশ জোরে ধাক্কা মারলো জেসি কে।জেসি হুমড়ি খেয়ে মেঝের উপরে পড়ল।হাতে বেশ ভালোই আঘাত পেল।রাজীব সেসবে পাত্তা দিলো না।পুনরায় সাবধানী গলায় বলল,

"নিজের সীমার মধ্যে থাক।তোকে বিয়ে করেছি কোন ভালো টালো বেসে না।ওই তন্ময়কে শিক্ষা দেওয়ার জন্য বিয়েটা করেছি।আমার গায়ে হাত দিয়েছিলো না তাই প্রতিশোধ নিয়েছি।আমায় মেরে ছিল কারণ আমি ওর বউয়ের দিকে হাত বাড়িয়েছিলাম।আমারও ঠিক ওই একই কারণে ওকে মারার ছিল,সেজন্য তোকে বিয়ে করেছি,বুঝতে পেরেছিস?"

কথাগুলো বলে রাজীব বেরিয়ে গেল।জেসি রাজীবের যাওয়ার পানে হা করে তাকিয়ে থাকলো।রাজীব হঠাৎ করে এতটা বদলে গেল কি করে?এইতো আগেও কি সুন্দর করে কথা বলতো,দিনে কতবার করে বলতো ওকে নাকি ভালোবেসে ফেলেছে,এখন আর ছাড়তে পারছে না।তবে এখন এতটা বদলে গেলে কেন?কিসের প্রতিশোধ তন্ময়ের উপর? প্রতিশোধ নেয়ার জন্য ওকে কেন ব্যবহার করলো?তবে কি জেসিও ঠকে গেল যেভাবে ও তন্ময়কে ঠকিয়েছিল?

_______

নতুন বাড়িতে খুব বেশি জিনিসপত্র আনার ছিল না মিলির।ওই তো একটা তোষক,রান্নার কিছু জিনিসপত্র আর কাপড়-চোপড়।অন্যান্য জিনিস আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিল।নিজে আসার সময় শুধু কাপড়ের ব্যাগটা নিয়ে এসেছে।তবে দোতলায় এখন এই ব্যাগটা তোলা বেশ কষ্টকর মনে হচ্ছে।নিজের শরীর টেনে তুলতেই তো গা হাপিয়ে ওঠে সেখানে ব্যাগটা তোলা মনে হয় অসম্ভব হয়ে পড়বে।আশেপাশে নজর ঘুরিয়ে কাউকে একটু সাহায্যের জন্য খুঁজলো তবে পেল না।অগত্যা নিজেই ব্যাগটা উপরে তুলতে উ্যদত হলো।

বিজ্ঞাপন

মিলি চেষ্টা করলো তবে দুই ধাপ সিঁড়িতে উঠতেই পেছন থেকে কারও একটা চেঁচানোর শব্দ পাওয়া গেলো,যাতে মিলি কেঁপে উঠলো।মিলি পিছনে তাকাতেই দেখলো কোথা থেকে যেন তাকদীর ছুটে আসছে ওর দিকে।ছেলেটা মিলির কাছাকাছি এসে থামতেই হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

"আরে সিনিয়র,আপনি এতো ভারী ব্যাগ তুলছেন কেন?আমি আছি তো,ছোট্ট করে একবার একটা ডাক তো দিতে পারতেন আমায়।"

"আপনি তো ছিলেন না আশেপাশে,ডাক দিলে শুনতেন কিভাবে?"

"আরে আপনি একবার ডাক দিয়েই দেখতেন, আমি চলে আসতাম।যাই হোক এটা দিন আমি তুলে দিচ্ছি।"

মিলি ভদ্রতার খাতিরে একবার বাঁধা দিয়ে বলল,

"না লাগবে না,আমি পারবো।"

"আহা আবার দুষ্টুমি করে কেন?আমি তো বলছি আমি সাহায্য করবো।আরে বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়ার সাহায্য করবে না তো কে করবে বলুন?দিন দিন আমায় দিন,আমি তুলে দিচ্ছি।আপনি উঠতে না পারলে বলুন আপনাকেও তুলে দেব।"

তাকদীরের বলা শেষের কথাটা শুনে মিলি চোখ গরম করে তাকদীরের দিকে তাকালো।তবে তাকদীরের সেসবে কিছু যায় এলো না।সে তার নিজের চঞ্চল স্বভাব বজায় রেখে বলল,

"আরে সিনিয়র,এতো রাগ করলে চলে নাকি? আমিতো মজা করলাম।আপনি তো এখন বেশ মোটাসোটা হয়ে গেছেন,আপনাকে আমি এমনিতেও তুলতে পারবো না।"

"অতিরিক্ত কথা না বলে সাহায্য করার হলে সাহায্য করুন,নয়তো আমাকে যেতে দিন। আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না।আর আপনার এসব আজেবাজে কথা তো কোনমতেই শুনতে চাচ্ছি না।"

দপ করে তাকদীরের হাসিটা নিভে গেল।একটু বোধহয় কষ্টও পেল।তবে সে কোন ব্যাপার না।তাকদীরের মন খারাপ ঠিক হতে এক সেকেন্ডও সময় লাগে না।তবে এবারে আর কোন কথা না বলে চুপচাপ ব্যাগটা নিয়ে উপরে চলে গেল।আজকেও দোতলায় উঠতে মিলির বেশ সময় লাগলো।এর আগের দিনের মতন আজকেও গিয়ে দেখলো তাকদীর সিঁড়ির ওপর বসে আছে।মিলিকে দেখতেই মুখে হাসি ফুটে উঠলো।বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

"এর আগের দিনের চেয়ে আজ তাড়াতাড়ি উপরে উঠেছেন।যাইহোক দরজাটা খুলে দিন আমি ব্যাগটা ভিতরে দিয়ে আসছি।"

মিলি কোন কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ তালাটা খুলে দিলো।চাবিটা মিলির কাছেই ছিল।তাকদীর ব্যাগটা নিয়ে ভিতরে রেখে আসলো।মিলির থেকে শুনলো যে ব্যাগটা কোথায় রাখলে সুবিধা হবে একদম গিয়ে ঠিক সেখানটায়ই ব্যাগটা রাখলো।ঘরের ভেতর ব্যাগটা রেখে ড্রয়িং রুমে মিলির কাছে এলো।মিলি কৃতজ্ঞতার কন্ঠে বলল,

"ধন্যবাদ আপনাকে।"

"আচ্ছা সিনিয়র আপনার বাড়িতে এলাম চা খাওয়াবেন না?

মিলি কিঞ্চিৎ ইতস্তত গলায় বলল,

"আসলে এখনো তো আমার কিছু গোছানো হয়নি আর আমি চা খাই না জন্য চা নেই আমার কাছে।একটু গুছিয়ে নেই,অন্য কোন দিন খাওয়াবো কেমন?"

"ওহ্ সরি!আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম যে আপনি আজ নতুন এখানে এসেছেন।তাহলে চলুন আমার ফ্ল্যাটে,আমি আপনাকে বরং চা খাওয়াই।"

মিলির তৎক্ষণাৎ আপত্তি জানিয়ে বলল,

"না,তার কোন প্রয়োজন নেই।আমি চা খাই না,আপনি যান।"

তাকদীর বিষণ্ন গলায় বলল,

"চলে যাব?"

"আমি এত দূরে থেকে কথাটা স্পষ্ট শুনতে পেলাম আর তুমি কাছ থেকে শুনতে পেলে না?"

পরিচিত একটা কণ্ঠস্বর কানে যেতেই তাকদীর কেঁপে উঠলো।মনে মনে খুব করে চাইলো যে ওর কান যেন ভুল শোনে।ভয়ে ভয়ে দরজার দিকে তাকাতেই ওর সন্দেহটা সঠিক প্রমাণিত হলো।রাগান্বিত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে তাহরিমা বেগম।মুহূর্তের মাঝে তাকবীরের অভিব্যক্তি কেমন যেন বদলে গেল।মিলি দরজায় দাঁড়ানো মহিলাটা কে সেটা বোঝার চেষ্টা করলো।তাকদীরের মায়ের সাথে মিলির পরিচয় হয় নি,শুধুমাত্র নামটাই জানে।সেজন্যই ইনি আদোও তাকদীরের মা কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারছে না।

তাকদীর তাড়াহুড়ো করে দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে নিজের মায়ের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়ালো।খুবই নম্র গলায় বলল,

"না মানে আসলে আম্মু আমি মজা করছিলাম ওনার সাথে।"

তাহরিমা বেগম গম্ভীর গলায় বললেন,

"এই কথা নিয়ে মজা করার কি আছে?তোমার কি ওনার সাথে মজা করার মতন সম্পর্ক?বলেছিলাম না তোমায় অকারণে কাউকে বিরক্ত করবে না।"

"সরি আম্মু ভুল হয়ে গেছে,আর করব না।"

ছেলের সাথে তাহরিমা বেগম আর কোন কথা বাড়ালেন না।ভিতরে এসে হাস্যোজ্জ্বল মুখে মিলিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“ফ্ল্যাটটা আপনার পছন্দ হয়েছে তো?”

“আরে আন্টি আপনি আমাকে আপনি করে বলছেন কেন?তুমি করে ডাকুন।আপনি তো আমার মায়ের বয়সী,আপনি করে ডাকলে আমার অস্বস্তি হবে।”

ভদ্রমহিলা আলতো হেসে সম্মতি জানিয়ে বলল,

"আসলে ভেবেছিলাম প্রথম দেখাতে তোমায় তুমি করে বললে যদি আবার রাগ করো সেজন্য আপনি করে বললাম।তবে এখন যখন তুমি অনুমতি দিয়ে দিয়েছো তাহলে তুমি করেই ডাকবো।ফ্ল্যাটটা পছন্দ হয়েছে তো?”

“হ্যাঁ,পছন্দ হয়েছে।বেশ খোলামেলা জায়গাটা।”

“আচ্ছা শোনো,আমি পাশের ফ্ল্যাটেই থাকি। কোন অসুবিধা হলে আমায় নির্দ্বিধায় বলবে।দেখো মা এটা তোমার প্রথম বাচ্চা,তুমি সবকিছু হয়তো ঠিকঠাক বুঝবে না।কেউ সাথেও থাকে না তোমার,তাই বলছি যেকোনো ধরনের অসুবিধা হলে আমাকে জানাবে।”

মিলি কৃতজ্ঞতার কন্ঠে বলল,

"আপনি যে আমার জন্য এতটা ভেবেছেন এটা আমার জন্য অনেক আন্টি।কোন অসুবিধা হলে নিশ্চয়ই জানাবো।"

"আচ্ছা ঠিক আছে।তুমি এখন আরাম করো, আমরা যাই।"

মিলি মাথা নাড়াতেই তাহরিমা বেগম চলে এলেন সেখান থেকে।আসার আগে গম্ভীর গলায় তাকদীরকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

"তুমি এখনও এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন?তুমি জানো না ও অসুস্থ?এই অবস্থায় ওর সাথে অযথা মজা করে ওর সময় নষ্ট করো না।"

কথাটা বলে তাহরিমা বেগম আগে আগে চলে গেলেন।তাকদীর জানে এখন ওকেও যেতে হবে।তবে যাওয়ার আগে হঠাৎ মাথায় একটা প্রশ্ন এলো,যেটা না করে যেতে পারলো না।

তাড়াহুড়ো কন্ঠে মিলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"সিনিয়র তাড়াতাড়ি বলুন আপনার বাবু কেমন আছে?"

তাকদীরের তাড়াহুড়োর মাঝে করা প্রশ্নটা মিলির বোধহয় ঠিকঠাক বোধগম্য হলো না।অবুঝের ন্যায় বলল,

"হ্যাঁ?"

"আরে বললাম আপনার বাবু কেমন আছে?"

"ভালো আছে।"

"ওকে কিছু খাইয়েছেন তো সকাল থেকে? ক্ষুধা লাগে নি?কান্নাকাটি করে না ও?"

মিলি শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

"এখনও ওর কান্নাকাটি করার বয়স হয়নি।আর ক্ষুধা লেগেছে বোধহয়,একটু বেশি নড়াচড়া করছে।"

তাকদীর নিজেই নিজের হাতে কপাল চাপড়ে বলল,

"আমিও না একটা আস্ত গাধা।ভুলেই গেছি ও এখনো আন্ডারগ্রাউন্ডে আছে।ওর ফেস রিফিল হওয়া এখনো বাকি।যাইহোক আপনি বেশি বেশি খাবার খান আর গুলুমুলু থাকুন তাহলে আপনার বাবুটাও গুলুমুলু হবে।আচ্ছা শুনুন আপনার বাবু হলে ওর নাম রাখবেন রসগোল্লা,ডাকতে সুবিধা হবে আমার।"

মিলি আবারও হেসে উঠে বলল,

"ঠিক আছে আপনি ওকে এই নামেই ডাকতে পারেন।"

তাকদীর আরো কিছু বলতে নিল তবে তার আগেই তাহরিমা বেগমের গলার স্বর ভেসে এলো।

"তাকদীর এখনো কি করছো ওখানে তুমি?"

তাকদীর আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পেল না।ভয়ার্ত গলায় বলল,

"সিনিয়র,আমি এখন আসি নাহলে আম্মু মারবে আমায়।"

কথাটা বলে তাকদীর নিজের ফ্ল্যাটে চলে গেল।মিলি যেন ছেলেটার কাজে অবাক না হয়ে পারল না।এত বড় একটা ছেলে তারপরও নিজের মাকে দেখে ভীষণ ভয় করে।তার ওপরে আবার এসব বোকা বোকা কথা বার্তা।কে জানে তাকদীর কথাগুলো না জেনে বুঝে বলে নাকি মিলিকে হাসানোর জন্য বলে?

বিজ্ঞাপন
রিক্ত বসন্ত গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস