রিক্ত বসন্ত

পর্ব - ২৮

🟢

সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজের জন্য হালকা কিছু রান্না করে সেটা খেলো মিলে। খেয়াল করলো প্রতিদিনের তুলনায় আজ শরীরটা একটু ভালো লাগছে। হাত পায়ের ব্যথাটা বোধহয় একটু কম অনুভূত হচ্ছে।বাড়িতে তার কোন কাজকর্ম নেই বললেই চলে। খুব বেশি জিনিসপত্র তো মিলির সাথে নেই যে সেগুলো গোছগাছ করতে হবে। খুবই অল্প কিছু টুকটাক জিনিস আছে যেগুলো না হলেই না। তবে এতে ভালোই হয়েছে।বাড়িটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। মিলি ঠিক করেছে খুব বেশি জিনিসপত্র কিনবে না। তার থেকে ভালো ঘরটা ফাঁকাই থাক।

একটা বই হাতে নিয়ে মিলি বারান্দায় গেল। লাবিবা ওকে কয়েকটা বই দিয়েছে যেন একাকী বাসায় সময় কাটাতে অসুবিধা না হয়। মিলির অবশ্য বই পড়ার অভ্যাস কোনকালেই ছিল না তবে আজ যেহেতু আর করার মতন কিছু নেই তাই ভাবল একটু চেষ্টা করা যাক।

একটা টুল নিয়ে গিয়ে বারান্দায় বসলো। বাইরে আজকে সূর্যের দেখাও মিলেছে। শীতটা একটু কম। গা থেকে চাদরটা খুলে পাশে রেখে দিল। খুব একটা ঠান্ডা লাগছে না এখন আর।

বইটা খুলে মিলি খুব চেষ্টা করলো ধৈর্য ধরে পড়ার তবে দু পৃষ্ঠার বেশি পড়তে পারলো না। মিলির বোধহয় আজকাল ধৈর্য কমে গেছে। এই দুটো পৃষ্ঠা পড়তেই খুব কষ্ট করতে হয়েছে। নিজের উপর আর চাপ দিল না। বইটা বন্ধ করে পাশে রেখে দিল।

বইটা হাত থেকে রাখতেই ফোনে কারোর কল এলো।স্ক্রিনে নাম্বারটা দেখে মিলি ভ্রুঁ কোঁচকালো। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এটা বাংলাদেশী নাম্বার না, অন্য কোন দেশের নাম্বার হতে পারে। কিন্তু অন্য দেশ থেকে কে কল করলো? মিলির নাম্বার তো ওর কোন আত্মীয় স্বজনের কাছে নেই। আর থাকলেও কেউই মিলির খোঁজ খবর যে নিতে আসবে না মিলি সেটা খুব ভালো করেই জানে।

মনের মাঝে একরাশ প্রশ্ন সমেত ফোনটা কানে ধরতেই অপর পাশের মানুষের কণ্ঠস্বর শুনে মিলির সব প্রশ্নের সমাপ্তি ঘটলো। ফরহাদ কল করেছে। মিলি তো ভুলেই গিয়েছিল যে ফরহাদরা বিদেশে আছে। যাওয়ার পর থেকে একদিনও মিলির সাথে কথা হয়নি।

মিলি কিছু বলতে যাবে তার আগে ফরহাদ লজ্জিত ভঙ্গিতে অপরাধী গলায় বলল,

“আমি জানিনা মিলি আমি আপনার কাছে কিভাবে ক্ষমা চাইবো। আমি যে ক্ষমা চাইবো সেই মুখও আমার নেই। কিন্তু তবুও বলছি আপনি পারলে আমায় ক্ষমা করে দেবেন। আমি আসলে কল্পনাতেও ভাবতে পারিনি যে আমার অফিসে আপনার এত বড় অপমান হবে।বিশ্বাস করুন আমি বাবাকে খুব ভালোভাবে বলে এসেছিলাম যেন আপনার সাথে কোন রকম অসম্মানজনক আচরণ না করে কিন্তু বাবা যে কি করে এমনটা করলো আমি সত্যি ভাবতে পারছি না।

প্লিজ মিলি ক্ষমা করে দেবেন আমায়। আমি জানি আপনি বাবার কথায় অনেক কষ্ট পেয়েছেন।

আমি ক্ষমা চাইছি বাবার হয়ে আপনার কাছে।”

একনাগারে অনেকগুলো কথা বলল ফারহাদ। মিলি শুধু হাসলো। মিলির কাছে ফরহাদের বাবার আচরণটা বেশ স্বাভাবিক লেগেছে। তার এমন উচ্চ শিক্ষিত,যোগ্য ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক হওয়ার পর মিলি সে বিয়েটা ভেঙে দিয়েছে,একটু সম্মানে আঘাত লাগবে এটাই স্বাভাবিক। তবে হ্যাঁ নিজের সম্মানে আঘাত লেগেছে বলে যে অন্যের সম্মানেও আঘাত করতে হবে এমন কোন ব্যাপার নেই। তবে এই নীতিটা হয়তো ওনাকে কেউ শেখায়নি।

সেসবে মিলির মাথা ব্যথা নেই। অপমান তো মিলির এখন সয়ে গেছে। নিজের আপন মানুষরাই যেখানে অপমান করে সেখানে ওনার সাথে তো কখনো মিলির না দেখা হয়েছে,না কথা হয়েছে।

“আপনি অযথা এত ব্যস্ত হচ্ছেন ফরহাদ। আপনার বাবার থেকে আচরণটা এক্সপেক্টেড। হয়তো ওনার আমার উপর অনেক দিনের রাগ জমে ছিল,জাস্ট সেটা বের করে দিয়েছেন। ওটা ওনার অফিস,উনি যাকে ইচ্ছে তাকে রাখবেন। এতে আপনার এত ব্যস্ত হওয়ার কিংবা ক্ষমা চাওয়ার কিছু নেই।”

“মিলি এসব বলে আমার অপরাধবোধটা আর বাড়াবেন না। আমি জানিনা আমি মাহবুব স্যারের সামনে কি করে দাঁড়াবো। আমি ওনাকে কি জবাব দেব। কত ভরসা করে উনি আমায় বলেছিলেন যেন আপনাকে একটু দেখে রাখি, একটু খেয়াল রাখি। আর সেখানে কিনা আমার বাবা আপনাকে এভাবে অপমান করল।”

“আমার কথা বাদ দিন। মিহাদ কেমন আছে? আর আপনার ওয়াইফ মিতু ও কেমন আছে?”

“মিহাদের চিকিৎসা চলছে। ডাক্তাররা যেমন আশা দেয়নি তেমনি আবার আশা ছাড়তেও বলেনি। সবটাই আল্লাহর উপর। জানি না কি হবে। আর মিতুর কথা বলছেন,ওকে নিয়েই চিন্তায় আছি। ছেলের চিন্তায় রাতে ঘুমটা অবধি ঠিকঠাক হয় না ওর। খাওয়া-দাওয়া কিচ্ছু করেনা। ও না কোনদিন অসুস্থ হয়ে যায়।”

“আর আপনি? আপনিও তো অসুস্থ হয়ে যাবেন। আমি তো খুব ভালো করেই জানি আপনার ওয়াইফ না ঘুমোলে আপনিও এক সেকেন্ডের জন্য ঘুমোবেন না,উনি না খেলে আপনিও খাবেন না,উনি রেস্ট না করলে আপনিও করবেন না। এমন করলে কি চলবে বলুন? আপনাকে নিজের খেয়াল রাখতে হবে সেই সাথে মিতু আর মিহাদ দুজনেরই। দায়িত্বটা কিন্তু আপনার কাঁধেই বেশি ফরহাদ।”

ফরহাদ বিষণ্ন গলায় বলল,

“কি করি বলুন তো? ছেলেটার মুখের দিকে তাকালে আর কোন কিছুই ভালো লাগেনা। খুব কান্না করে ছেলেটা আমার। আর মিতু! ও তো নিজের যত্ন নিতে একদমই ভুলে গেছে। আমি জানিনা মিহাদ কে নিয়ে কি অবস্থায় দেশে ফিরবো তবে জানেন আমার কেন জানি মনে হয় যদি আমার ছেলেটার কিছু হয়ে যায় আমি মিতুকেও হয়তো বাঁচাতে পারবো না। ছেলের শোক নাহয় কা'টিয়ে উঠলাম মিতুকে আঁকড়ে ধরে। কিন্তু মিতুর যদি কিছু হয়ে যায় তবে আমি কাকে আঁকড়ে ধরে নিজেকে সামলাবো বলুন তো?”

মিলির বুক চিরে যেমন একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ঠিক তেমনি আবার একটা ভালো লাগাও কাজ করলো। কত ভালোবাসে লোকটা নিজের স্ত্রী সন্তানকে। তাদের অস্তিত্ব হারিয়ে যাওয়ার কথা মনে পড়তেই সে কেমন ভয় পেয়ে যায়। একজন পুরুষ নিজের স্ত্রী সন্তানকে ঠিক কতটা ভালোবাসলে তাদের সাথে সাথে নিজের জীবনটাও শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারে। তার স্ত্রী ঠিক মত খায় না, ঘুমোয় না,নিজের যত্ন নেয় না জন্য তিনিও সেই একই কাজগুলো করেন।পুরুষ মানুষের ভালোবাসা সত্যিই ভয়ংকর। সত্যি কারের ভালোবাসা ভয়ঙ্কর। তবে কিছু মানুষের লোক দেখানো ক্ষণিকের ভালোবাসাও ভয়ংকর তবে সেটা সেই মেয়েদের জন্য যে মেয়েরা তাদের ভালোবাসার জালে নিজেদের জড়িয়ে ফেলে। ক্ষণিকের ভালোবাসার মোহে পড়ে সেই মেয়েগুলো স্বপ্ন দেখে,ভাবে সারা জীবন বুঝি সেই পুরুষটা তাকে একইভাবে ভালোবেসে যাবে। কিন্তু মোহ যে কেটে যায়! স্বপ্নগুলো যে ভেঙে যায়! সেই সাথে বদলে যায় সেই মানুষটার ভালোবাসা।

“চিন্তা করবেন না। দেখবেন মিহাদ ঠিক সুস্থ হয়ে যাবে।দেখবেন একদিন ও সুস্থ হয়ে এত দুষ্টুমি করবে যে আপনারা দুজন মিলে ওকে সামলাতে হিমশিম খাবেন।”

“তাই যেন হয় মিলি। আমি চাই আমার বাড়িতে আমার ছেলেটা নিজের ছোট্ট ছোট্ট পায়ে দৌড়ে বেড়াক। আমি একটু আমার ছেলেটাকে বুকে জড়িয়ে একটা শান্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চাই মিলি। ওকে হারানোর কোন ভয় যেন না থাকে আমার মাঝে। আমি একটু আমার বউয়ের মুখটাতে হাসি দেখতে চাই। ওদের দুজনের এই বিমর্ষ চেহারাগুলো আমি আর সহ্য করতে পারছি না। নিজের এই কষ্টগুলোকে আমার কষ্ট মনে হয় না কিন্তু ওদের যখন কষ্টে দেখি তখনই মনে হয় আমার কলিজাটা ছিঁ'ড়ে যাচ্ছে।”

মিলির চোখ দুটো ভিজে উঠল। কেন যে প্রকৃতি এত নিষ্ঠুর হয় কে জানে? যারা সত্যিকারের ভালোবাসার মানুষ পায় তাদের থেকেই প্রকৃতি যেন সেই ভালোবাসা কেড়ে নেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগে পড়ে। ফরহাদের সংসারে একটু শান্তি থাকলে কি হত? ওই ছোট বাচ্চাটার শরীরে কি এত বড় রোগ বাসা না বাঁধতে চলতো না?

সবই ঠিকঠাক হতো কিন্তু না এই প্রকৃতির যেন কিছু মানুষের শান্তি সহ্য হয় না। কিছু শান্তির সংসার তার সহ্য হয় না। যারা ভালোবাসতে জানে না তারা তো সংসারটা ভেঙে বেশ থাকে আর যারা ভালোবাসার মানুষ পায় তাদের থেকে সেই মানুষটাই চিরকালের মত কেড়ে নেয়।

ফোনের দুপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা চলল। নীরবতা ভেঙে ফরহাদই বলে উঠলো,

“আমাকে দেশে ফিরতে দিন একবার। আমি কথা দিচ্ছি আপনাকে আমি আবার সসম্মানে আমার অফিসে ফিরিয়ে আনব। আপনার সম্মান আমি জানিনা কতটুকু ফেরত দিতে পারব তবে আমি চেষ্টা করব মিলি।”

“না ফরহাদ আমি আর ওখানে ফেরত যাব না। আপনি এমনটা ভাববেন না যে আপনার উপরে কোন রাগ থেকে আমি এই কথাটা বলছি। আসলে আমার আর ওখানে ফেরত যাওয়াটা উচিত হবে না। নিজের বাবার সম্মান অনেক ডুবিয়েছি,দূরে থেকে না হয় আর নাই বা ডোবালাম। আর তাছাড়া আপনি চিন্তা করবেন না আমি চাকরি পেয়ে গিয়েছি।”

“আমি অপরাধী হয়ে থেকে গেলাম সারা জীবন নিজের কাছে মিলি। আমি আর কোনদিন আপনার কিংবা মাহবুব স্যারের সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবো না।আপনাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারব না।”

“যে দোষ আপনি করেননি তার অংশীদার নিজেকে সাব্যস্ত করার কোন মানেই হয় না। আমি সারা জীবন আপনার আর মিতুর সাথে সম্পর্ক রাখতে চাই। মিহাদ কে দেখার জন্য হলেও রাখতে চাই। আমি আপনাদের দুজনের ভালোবাসার সংসারটা দেখতে চাই। জানেন আমার মনের মাঝে পুরুষ মানুষের ভালোবাসার প্রতি একটা ঘৃণা জন্মেছে। সব পুরুষের ভালোবাসা আমার কাছে এখন ছলনা মনে হয় কিন্তু যখন আমি আপনার ভালোবাসাটা দেখি তখন আমার নিজের সেই ভাবনার উপরে একটু হলেও দ্বিধা তৈরি হয়। আমি নিজের এই ভুল ধারণাটা কাটাতে চাই। আর নিজেকে দোষারোপ করা বন্ধ করুন। আপনি এমন একজন মানুষ হাজার চেষ্টা করেও যার কোন খুঁত কেউ ধরতে পারবেনা।”

আরো টুকটাক কিছু কথাবার্তা বলা শেষে মিলি ফোনটা রেখে দিল।

ফোনটা রেখে মিলি নতুন করে কিছু ভাবনার সুযোগও পেল না তার আগেই কলিং বেলটা বেজে উঠলো।এখানে তো ওর পরিচিত কেউ নেই তবে এত সকাল সকাল কে এলো? পরমুহুর্তে তাকদীরের কথা মনে পড়লো। ভাবলো নিশ্চয়ই ছেলেটা এসেছে।

আস্তে ধীরে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিল

তবে সম্মুখে দাঁড়ানো তাহরিমা বেগমকে দেখে চমকালো। ওনাকে মিলি আশা করেনি। আজ শুক্রবার হওয়ায় কলেজে যাননি তিনি। যার ফলে মিলির সাথে একটু কথাবার্তা বলতে এসেছেন। মিলিকে দেখে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে বললেন,

“বিরক্ত করলাম না তো তোমায়?”

মিলিও পাল্টা হেসে বলল,

“আরে না আন্টি বিরক্ত করবেন কেন? ভিতরে আসুন না। আপনারই তো বাড়ি।”

“এখন যেহেতু তুমি থাকছো তাহলে এটা তোমারই বাড়ি।”

“আচ্ছা ঠিক আছে। আমার বাড়িতেই আসুন।”

তাহরিমা বেগম ভেতরে এলেন। মিলি ওনাকে নিয়ে সোজা ঘরে গেল। বাড়িতে বসার মতন আলাদা করে কোন ব্যবস্থা নেই। রাতে মিলি যে তোষকের উপরে ঘুমিয়েছিল তার ওপরেই ওনাকে বসতে বলল। তাহরিমা বেগম খুশি মনে সেখানে বসলেন।

“আন্টি চা খাবেন? একটু চা করে আনি?”

তাহরিমা বেগম আপত্তি জানিয়ে বললেন,

“চা আনতে হবে না। আমি আসলে চা খাই না। তুমি এখানে বসো তোমার সাথে একটু কথা বলি।”

নিচে বসতে মিলিকে বেশ বেগ পেতে হয়। কেউ একজন হাতটা ধরলে একটু সুবিধা হয়। তাহরিমা বেগম ঠিক সেই কাজটাই করলেন। মিলিকে ঠিক যতটা সাহায্য করা যায় বসতে তিনি ততটাই সাহায্য করলেন। হাতে করে তিনি ছোট্ট একটা খাবারের বাটি সাথে এনেছিলেন। সেটা মিলির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,

“এই নাও একটু তেল পিঠা বানিয়েছিলাম। তোমার জন্য নিয়ে এসেছি। খেয়ে বলোতো কেমন হয়েছে?”

মিলি পিঠেটা পেয়ে যেন খুশি হলো। কিছু একটা মিষ্টি খাওয়ার যেন তারও ইচ্ছে করছিল। অপেক্ষা না করে একটা কামড় বসালো। পিঠেটা খাওয়া শেষ করে তাহরিমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“খুব সুন্দর হয়েছে আন্টি। আপনার রান্নার হাত কিন্তু খুব সুন্দর। গতকাল খাবার দিয়েছিলেন সেগুলোও অনেক সুন্দর হয়েছিল।”

“তোমার ভালো লেগেছে এটাই অনেক। তা তুমি কি খেতে পছন্দ করো? কাল তো আমার পছন্দের সব খাবার বানিয়ে দিয়েছিলাম। তুমি কি খেতে পছন্দ করো আমায় বলো,এবার তোমার পছন্দের খাবারগুলো রান্না করে দেবো।”

“আমার এখন পছন্দের ঠিক নেই আন্টি। কখন যে কি খেতে ইচ্ছে করে নিজেই বুঝে উঠতে পারি না। এই দেখুন না কয়েকদিন আগেও মিষ্টি কিছু খেতে পারছিলাম না আর আজ হঠাৎ করে কিছু মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করছিল।”

তাহরিমা বেগম মুচকি হাসলেন। কিছুক্ষন চুপ থেকে হালকা ইতস্তত গলায় বললেন,

বিজ্ঞাপন

“আচ্ছা তোমায় একটা কথা জিজ্ঞেস করি মিলি?”

“হ্যাঁ আন্টি বলুন না।”

“তোমার কি এখন তোমার পরিবারের কারো সাথে যোগাযোগ নেই?”

পরিবারের কথাটা শুনতেই মিলির মুখ থেকে হাসিটা সরে গেল। বিষণ্ন গলায় বলল,

“নিজের ভুলে যে পরিবারকে হারিয়েছি তাদের সাথে আর যোগাযোগ রাখি কি করে? যদিও ভাইয়ার সাথে কথা হয়। এছাড়া বাবা-মা কারো সাথে কথা হয় না।বাবার কাছে তো আমি মৃত। মা চাইলেও যোগাযোগ করতে পারে না বাবার ভয়ে।”

“তুমি চলে আসার পর তোমার হাজব্যান্ড কোনো খোঁজ খবরই করেনি। অন্তত বাচ্চার জন্য?”

“একদিন করেছিল। সবকিছু হারিয়ে আবার আমার কাছে ফিরে আসার জন্য খোঁজ খবর করেছিলো। ও ভেবেছিল আমি বোধহয় আজও সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি যে ও একবার ডাকবে আর আমি ছুটে ওর কাছে চলে যাব। আর বাচ্চার খোঁজ খবর নেবে? ও তো বাচ্চাটাকে চাইনি।”

তাহরিমা বেগম ছোট্ট করে বললেন,

“ওহ্।”

তিনি এই বিষয়ে আর কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইলেন না বোধহয়। যে অল্প কিছু তার জানার ছিল মিলির থেকে সে সবই জানলেন। আর বাড়তি কিছু তিনি জানার প্রয়োজন মনে করলেন না। যাওয়ার জন্য উদ্যত হলেন।উঠে দাঁড়িয়ে মিলিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“আমি এখন আসি কেমন? আর শোনো কোন সাহায্য লাগলে অবশ্যই আমাকে বলবে।”

মিলি আলতো হেসে বলল,

“আচ্ছা আন্টি জানাবো। তবে আন্টি একটা কথা এখানে বাজার কোথায়? আসলে আমি এই জায়গাটায় নতুন,তেমন কিছুই চিনি না। বাজারে যেতে হত।”

তাহরিমা বেগম একটু ভেবে বললেন,

“বাজার তো এখান থেকে বেশ অনেকটাই দূরে। তুমি এই অবস্থায় এতদূর যাবে কি করে? আবার বাজারের ভারি ব্যাগ?”

“ও কোন ব্যাপার না আন্টি। বাজার করার অভ্যাস আমার আছে। আমি পারবো।”

“অভ্যাস আছে তখন তো তোমার শারীরিক অবস্থা এমন ছিল না। আচ্ছা শোনো আমি আমার বাড়ির জন্য বাজার করার সাথে সাথে তোমার জন্যও বাজার করে নেব।”

“আরে না আন্টি আমার জন্য আপনি কেন অযথা কষ্ট করতে যাবেন।”

তাহরিমা বেগমের কন্ঠ এবার একটু গম্ভীর হল। চোখ মুখে কাঠিন্য ভাব ফুটিয়ে তুলে বললেন,

“আমি বলেছি তো সমস্যা হবে না। আর তাছাড়া তোমার থেকে টাকা নেব চিন্তা করো না। তোমার জায়গায় একদিন আমিও দাঁড়িয়ে ছিলাম মিলি।

আমি জানি এই অবস্থায় কারো দয়া গ্রহণ করতে কতটা কষ্ট হয়। আর সেই দয়া জিনিসটা আমি কখনোই তোমায় দেখাবো না।”

মিলি আলতো হাসলো। তাকদীর কেন এত আন্তরিক আর ভালো সেটা বোধহয় মিলি এখন বুঝতে পারছে।তাকদীরকে যে মানুষটা শিক্ষা দিয়েছে তিনি যে ভীষণ আলাদা।

ওদের কথাবার্তার মাঝে আরো একবার কলিং বেলটা বেজে উঠলো।

মিলি তাড়াহুড়ো করে উঠতে ধরলে তাহরিমা বেগম ওকে আস্তে ধীরে উঠতে বলে বললেন যে উনি গিয়ে দরজাটা খুলে দিচ্ছেন। মিলি মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো। তাহারিমা বেগম আগে আগে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন,মিলি ওনার পিছনে পিছনে এলো। দরজা খুলে সামনে তাকদীর কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাহরিমা বেগম কপাল কোঁচকালেন। এদিকে তাকদীর ও তাহরিমা বেগমকে দেখে থতমত খেয়ে গেল।চোখগুলো তার মার্বেলের আকার ধারণ করেছে। কিছু বলতে নেবে তার আগেই তাহরিমা বেগম গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন,

“তুমি এখানে কি করছো?”

তাকদীরের ভাগ্য ভালো থাকায় খুব তাড়াতাড়ি একটা অজুহাত খুঁজে পেল। তবে সেই অজুহাতটাও তোতলানো গলাতেই দিলো।

“আমি তো তোমাকে খুঁজতে এসেছিলাম আম্মু।”

তাহরিমা বেগমের ভ্রুঁ দ্বয়ের মাঝে তৈরি হওয়া ভাঁজটা আরো গাঢ় হলো। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“আমাকে খুঁজতে এখানে কেন এসেছো?”

“আরে আমি তো জানি তোমাকে যখন আমাদের ফ্ল্যাটে পাইনি তার মানে তুমি এই ফ্ল্যাটেই আছো। নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে তুমি তার সাথে পরিচয় করতে আসবে না? এটা তো খুবই স্বাভাবিক। আমার তো ক্ষুধা লেগেছিল। তোমাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না তাই তোমায় ডাকতে এসেছিলাম যে তুমি যেন আমাকে খাবারটা বেড়ে দাও।”

তাহরিমা বেগম তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার সেই দৃষ্টি দেখে তাকদীর ভয় পেল। অযথা কোন কারণ ছাড়াই হাসলো পাগলের মতন। হাসতে হাসতে বলল,

“আজ আবহাওয়াটা কিন্তু দারুণ আম্মু। তুমি দেখেছো বাইরে আজকে কুয়াশা নেই,রোদ উঠেছে। আজকে গোসল করার জন্য আর গরম পানিও লাগবে না।”

তাহরিমা বেগম গম্ভীর গলাতে বললেন,

“অযথা হাসি পা'গলদের লক্ষণ। আর এসব আমার একদম অপছন্দ। তুমি সুস্থ স্বাভাবিক ছেলে সুস্থ স্বাভাবিক ছেলের মত আচরণ করবে। ঘরে এসো খাবার দিচ্ছি।”

কথাটা বলে তাহরিমা বেগম চলে গেলেন। তাকদীর যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। সম্মুখে তাকিয়ে দেখল মিলি ঠোঁট টিপে হাসছে। তাহরিমা বেগম চলে যেতেই মিলি ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,

“এখনো আম্মুকে দেখে এত ভয় করেন আপনি? বিশ্বাস করুন আপনার আম্মুর সাথে আপনাকে কথা বলতে দেখলে আমার আপনাকে একটা ছোট বাচ্চা মনে হয়।”

তাকদীর নাক মুখ কুঁচকে বলল,

“এখানে বাচ্চা মনে হওয়ার কি আছে? অদ্ভুত তো! এত বড় একটা ছেলে কখনো বাচ্চা হয়?”

“আপনার আচরণ দেখে তো তাই মনে হয়।”

তাকদীর মৃদু বিরক্তিকর গলায় বলল,

“আপনি আপনি ছাড়ুন তো সিনিয়র। তুমি বলতে পারেন না? তুমি বললে তো একটু নিজের নিজের মনে হয়, একটা টান ফিল হয়।”

মিলি আলতো হেসে বলল,

“এত নিজের মনে করার কোন দরকার নেই। এত টান অনুভূত হওয়ারও কোন দরকার নেই।”

“অবশ্যই আছে। আমরা প্রতিবেশী। যদি নিজেদের মধ্যে টান অনুভব না করি তাহলে একে অপরের বিপদে সাহায্য করবো কি করে? আচ্ছা আমি বরং আগে তুমি করে ডাকাটা শুরু করি কেমন? তাহলে আপনার বলতে সুবিধা হবে।”

“আপনি করে ডাকলে খুশি হব।”

“রাখুন আপনার খুশি। সব সময় যে আপনাকেই খুশি হতে হবে তার কোন মানে নেই।”

মিলি তাকদীরের কথায় পাত্তা না দিয়ে দরজাটা বন্ধ করতে নিলে তাকদীর হাত দিয়ে দরজাটা আটকালো।মিলি এবারে কিঞ্চিৎ বিরক্তি মাখা গলায় বলল,

“কি সমস্যা?”

তাকদিরের মুখ ভঙ্গি এবার একটু গুরুতর আর গম্ভীর হয়ে উঠলো। মিলির দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে বলল,

“শুনুন সিনিয়র,চোখের জলের মূল্য অনেক। সবার জন্য তা বিসর্জন দিতে নেই। খুশিতে কাঁদার জন্য কিছু চোখের জল বাঁচিয়ে রাখুন। আরেকটা কথা,যে যেমন তার সাথে ঠিক তেমন ব্যবহারই করতে হয়। ঠিক তেমনভাবে যে আপনাকে ভালোবাসে তাকেই ভালোবাসতে হয়। সবাই আপনার ভালোবাসার যোগ্য হয় না। একটা কথা সবসময় মনে রাখবেন যে একবার আপনা দূরে ঠেলে দিয়েছে সে যদি কখনো আবার আপনাকে আপন করতেও চায় তবে তার কাছে আর ফেরত যাওয়া উচিত না। অন্য কিছুর জন্য না হলেও নিজের আত্মসম্মানের জন্য। আর নিজেকে কখনোই অবহেলার বস্তু মনে করবেন না। কেউ যদি আপনাকে অবহেলা করে ছুঁড়ে ফেলে তবে কেউ আপনাকে যত্নে কুঁড়িয়ে নেবে। আপনি হয়তো কারো জীবনের ভুল,আবার হয়তো কারো বুক পকেটে যত্নে পড়ে থাকা ফুল।”

কথাগুলো বলে তাকদীর মুচকি হেসে সেখান থেকে চলে গেল। মিলি তাকদীরের কথার আগাগোড়া কিছুই যেন বুঝতে পারলো না। আবার মনে হলো না হালকা হালকা হয়তো বুঝতে পেরেছে। ছেলেটা যেন হঠাৎ করে আবারো জটিল হয়ে উঠলো মিলির কাছে। এই মনে হয় তাকদীর কোন কিছু নিয়েই সিরিয়াস না আবার মনে হয় না ওর ভেতরের মানুষটা আলাদা। বাইরে নিজেকে যেমন ভাবে দেখায় তেমনটা না। মিলির মাঝে একটা কৌতূহল তৈরি হলো। তাকদীরের আসল সত্তাটা জানার কৌতূহল।

বিজ্ঞাপন
রিক্ত বসন্ত গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস