রিক্ত বসন্ত

পর্ব - ৩১

🟢

ভর দুপুরে তন্ময়ের আগমন ঘটেছে আজ লিজাদের বাড়িতে। এই বাড়ি আর জায়গা দুটোই তন্ময়ের অপরিচিত। এর আগে কখনো আসা হয়নি এখানে, ভবিষ্যতেও কখনো আশা হবে কিনা সেসব জানে না। তবে আজ কাজের সূত্র ধরে বাধ্য হয়ে আসতে হয়েছে। লিজা আজ অফিসে যেতে পারেনি। আর একটা ফাইলে লিজার সিগনেচার দরকার ছিল। তন্ময় ফোন করেছিলে লিজা কে কিন্তু লিজা বলেছে আজ অফিসে আসতে পারবে না। তন্ময় যেন বাড়িতে এসে সিগনেচার নিয়ে যায়। এখন তন্ময় হলো কর্মচারী। মালিকের মুখের উপরে তো আর বলতে পারেনা যে আমি কেন যেতে যাব, আপনি এসে আপনার সিগনেচার দিয়ে যান।

তাই বাধ্য হয়ে আসতে হয়েছে। তবে মনে মনে ভীষণ চটে আছে লিজার ওপর। শুধু মালিক জন্য কিছু বলতে পারছে না। নাহলে দু চারটে চ'ড় থা'প্পড় মে'রে দিত এই মেয়েকে। মেয়েদের এসব বেয়া'দবি তন্ময়ের একদম অপছন্দ। কিন্তু কথা হচ্ছে প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে অথচ এখনো কেউ দরজা খোলার নামই নিচ্ছে না। লিজা তো জানে যে তন্ময় আসবে তাহলে দরজা না খোলার কি আছে? আর যদি দরজা না খোলারই ছিল তাহলে তন্ময়কে আসতে বলেছিল কেন? একেই তো বাইরে আজ মারাত্মক ঠান্ডা পড়েছে তার উপরে এই ঠান্ডার দিনে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে কাঁপতে হচ্ছে এই মেয়েটার জন্য। তন্ময়ের ভীষণ রাগ হলো লিজার ওপরে। মনে মনে বেশ কয়েকবার লিজা কে বেয়া'দব বলল, অনেক গালাগালিও করলো। বিড়বিড় করে বলল,

“মেয়েটা চূড়ান্ত রকমের অসভ্য। মেয়েরা কেন এমন হবে? মেয়েরা হবে নম্র, ভদ্র, কোমল একদম মিলি…

আর কিছু বলতে পারলো না তন্ময়, নিজেই থেমে গেল। এতগুলো দিন পর আবার কেন মিলিকে টানছে এসবের মাঝে? মিলি তো চলে গেছে। ভালো আছে মিলি নিজের জীবনে। তন্ময়ও বেশ আছে ওর জীবনে। তবে কেন সব কিছুতে এভাবে মিলি কে টেনে আনে তন্ময়? কেন সবার সাথে সবসময় মিলির তুলনা দিতে হবে ওকে? কোন মানেই হয় না এসবের।

এতক্ষণে লিজার ওপরে যে রাগটা হচ্ছিল তন্ময়ের এখন নিজের উপরে সেই রাগটা হচ্ছে। তবে এভাবে ঠান্ডার মধ্যে আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না। পকেট থেকে ফোনটা বের করে লিজার নাম্বারে কল দিতে ধরলো। তার আগেই ভিতর থেকে একজন কাজের লোক এসে দরজাটা খুলে দিল। তন্ময় তার ওপরে রাগ দেখিয়ে বলল,

“এত সময় লাগে দরজা খুলতে?”

মহিলা কিছু বলল না। চুপচাপ দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়িয়ে তন্ময়কে ভিতরে আসার রাস্তা করে দিল। তন্ময় বাড়ির ভেতরটা দেখে চমকে গেল। বিশাল বড় বাড়ি। এর আগে এত সুন্দর বাড়ি তন্ময় সামনাসামনি কখনো দেখেনি। সব সময় সিনেমাতেই দেখেছে। প্রত্যেকটা আসবাবপত্র, মেঝে সব চকচক করছে সেই সাথে তন্ময়ের চোখ দুটোও। তবে খুব বেশিক্ষণ এসবের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় পেল না তন্ময়। কাজ করতে এসেছে, কাজ শেষে আবার অফিসে যেতে হবে। এদিকে আশেপাশে কোথাও লিজা কে দেখা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে কাজের মহিলা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“লিজা ম্যাডাম কোথায়?”

“আপামনি উপরে ঘরে আছেন। আমারে কইছে আপনারে ঘরে পাঠাইয়া দিতে, উনি নিচে আইতে পারবো না। সিঁড়ি দিয়া সোজা উপরে উইঠা বাম দিকে যাইবেন। দুই ঘর পরে যেই ঘরটা দেখবেন ওইটাই আপামনির ঘর।”

একনাগাড়ে কথাগুলো বলে মেয়েটা চলে গেল। তন্ময় আরো একবার মনে মনে লিজা কে গালাগালি করলো। জমিদারের মেয়ে যে নিচে আসতে পারবে না। টাকা পয়সা আছে জন্য তন্ময়কে খাটিয়ে মা'রছে। একটু নিচে নেমে এলে কি হতো? কিন্তু না, ম্যাডামের এখানেও ভাব দেখাতে হবে। ওকে উপরে তুলেই ছাড়বে। শুধু বেতনটা বেশি দেয় আর অন্য জায়গায় চাকরি পাচ্ছে না জন্য এখানে থাকতে হচ্ছে তন্ময় কে। না হলে চাকরি কে ছুঁড়ে মা'রত তন্ময়।

বিড়বিড় করতে করতে কাজের মেয়েটার দেয়া নির্দেশ মত তন্ময় লিজার ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। দরজাটা হালকা একটু খোলা আছে। সরাসরি ঢুকে যাবে এমন স্বভাব তন্ময়ের নেই। দরজায় দুবার টোকা দিয়ে অনুমতি চাইলো,

“ম্যাডাম আমি তন্ময়। ভিতরে আসবো?”

“ইয়েস কাম ইন।”

লিজার কন্ঠটা শুনতে তন্ময়ের একটু অন্যরকম লাগলো। তবে সেসবে খুব বেশি গুরুত্ব দিল না। অনুমতি পেয়ে ঘরের ভিতরে গেল। দেখলে লিজা বালিশের সাথে হেলান দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে বসে আছে।

তন্ময় কাছে গিয়ে একবার ধীর গলায় ডাকলো,

“ম্যাডাম!”

লিজা কে দেখে মনে হলো খুব কষ্টে চোখ মেলে তাকালো। চোখ দুটো কেমন লাল টকটক করছে। অন্যরকম লাগলো লিজার চোখ মুখ এর অবস্থা।

“আপনি ঠিক আছেন ম্যাডাম?”

“আই এম ফাইন তন্ময়। আপনি কাগজটা দিন। আর কোথায় সাইন করতে হবে সেটা দেখিয়ে দিন।”

লিজার কথা অনুযায়ী তন্ময় তাই করলো। সাইন করার সময় খেয়াল করলো তন্ময় দেখাচ্ছে এক জায়গায় লিজা করতে নিচ্ছে অন্য জায়গায়। মনে হয় ঠিকঠাক দেখতে পারছে না। অনেক কষ্ট করে ঠিক জায়গায় সাইনটা করলো লিজা। তবে এত কষ্ট হওয়ার কারণটা তন্ময় ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। মনে মনে একবার ভাবলো,

“লিজা কি ড্রিঙ্ক করেছে?”

করতেই পারে। বড় লোকের মেয়ে যা ইচ্ছে তাই করবে। এত বড় বাড়ির মেয়ে, পরিবার সব বিষয়ে সাপোর্ট করে। আর এমন পরিবারে ড্রিঙ্ক করা কি এমন ব্যাপার? সবাই তো আর তন্ময়ের পরিবারের মতন হয় না যে নিজের ছেলেকে ভুলে যাবে।

সাইন করা শেষে ফাইলপত্রগুলো ব্যাগে গুছিয়ে তুলে তন্ময় লিজা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমি তবে আসছি ম্যাডাম।”

লিজা বাধা দিয়ে বলল,

“আরে আপনি প্রথমবার এলেন আমার বাড়িতে, কিছু না খেয়ে চলে যাবেন? ওয়েট।”

কথাটা বলে লিজা একজনের নাম ধরে কয়েকবার চেঁচালো। তবে নিচে থেকে কারো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না।

“ম্যাডাম আমি অন্য কোনদিন এসে খেয়ে যাব।”

“তা বললে হয় নাকি তন্ময়। আপনি একটু অপেক্ষা করুন আমি ওদেরকে বলে আসছি।”

কথাটা বলে লিজা নিজেই বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ালো। দুই কদম হাঁটতে না হাঁটতেই তাল হারিয়ে পড়ে যেতে নিলে তন্ময় ওকে ধরে ফেলল। তন্ময় একহাতে লিজার হাতটা আঁকড়ে ধরলো আর ওপর অন্য হাত গিয়ে পড়লো লিজার কোমরে। তবে বেশিক্ষণ তন্ময় লিজাকে ধরে থাকতে পারলো না। খুব তাড়াতাড়ি লিজা কে ছেড়ে দিল। অপরাধী গলায় বলল,

“সরি ম্যাডাম আমি আপনাকে এভাবে ধরতে চাইনি। আসলে পড়ে যাচ্ছিলেন তাই..”

লিজা শব্দ করে হেসে উঠে বলল

“ইউ আর সো কিউট তন্ময়। সেই সাথে খুব ইনোসেন্টও। কিন্তু আমার মনে হয় আপনি জানেন না যে আমি মোটেও আপনার মতন ইনোসেন্ট না। আর খারাপ কিছুই হয়নি আমাদের মাঝে বরং যা হয়েছে আমার বেশ ভালোই লেগেছে।”

তন্ময় চমকে লিজার দিকে তাকালো। লিজা মুচকি হেসে নিচে চলে গেল। একটু আগে তন্ময় বাইরে দাঁড়িয়ে শীতে কাঁপছিলো। আর খেয়াল করলো এখন ঘামছে। উপরে পরে থাকা জ্যাকেটটা খুলে ফেলল। পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘমটুকু মুছে নিল।বুঝতে পারছে না কেন এমনটা হচ্ছে। লিজা ওর কথার দ্বারাই বা কি বোঝাতে চাইলো?সত্যি তো কিছু হয়নি তাহলে ভালো লাগলো কি?

_______

“তাকদীর ভাই!”

ডাকটা কানে যেতেই তাকদীর বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে ফেলল। আবার সেই ন্যাকা গলার ডাক। তাকদীরের কেন যেন এখন আর এই ডাকটা কোনমতেই ভালো লাগে না। আগে এমনটা হতো না কিন্তু যবে থেকে ওর বড় মামা তোহার সাথে ওর বিয়ের কথা বলেছে ঠিক তবে থেকেই তোহার মুখ থেকে এই ডাকটা সহ্য করতে পারেনা। তবে কিছু করার নেই। এখন রাগও দেখাতে পারবে না। অবশ্য সে কখনোই রাগ দেখায়নি। তার মায়ের শিক্ষা কোন মেয়ের সাথে উগ্র আচরণ করা যাবে না। তার মধ্যে আবার ওদের বাড়িতে ঘুরতে এসেছে। খুব কষ্টে নিজের বিরক্তি ভাব আড়াল করে পিছন ফিরে তাকিয়ে মুখে জোর পূর্বক একটা হাসি এনে বলল,

“কেমন আছিস তোহা?”

তাকদীর আগে আগে কথাটা জিজ্ঞেস করায় তোহা কে বেশ খুশি দেখালো। আপ্লুত কণ্ঠে বললো,

“ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?”

তাকদীর আবারো জোর করে হেসে বলল,

“এইতো তোকে দেখে বেশ ভালোই লাগছে।”

তোহা বুঝতেও পারল না যে তাকদীর মিথ্যে বলল। তাকদীরের মিথ্যেটা শুনেই ভীষণ খুশি হলো। উচ্ছ্বসিতা গলায় বলল,

“তোমার ভালো লেগেছে এতে আমার অনেক ভালো লাগলো।”

“আচ্ছা ঠিক আছে চল বাড়ি যাই। বাকি কথা বাড়িতে গিয়ে হবে। আর রাস্তায় এখন কথা বলিস না কেমন? তুই তো জার্নি করে এসেছিস দুর্বল নিশ্চয়ই।”

তোহা তৎক্ষণাৎ দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বোধক উত্তর জানিয়ে বলল,

“একদমই না। তুমি চাইলে আমি সারা রাস্তা গল্প করতে পারি।”

“না না, কোন দরকার নেই। আসলে আমার কানে একটু সমস্যা হয়েছে। ডাক্তার বলেছে কারো সাথে বেশি কথা না বলতে, কারো কথাও বেশি না শুনতে। না হলে সমস্যা হবে।”

তোহার ঠিক বিশ্বাস হলো না তাকদীরের কথাটা। সন্দেহী গলায় বলল,

“এমনও বলে নাকি?”

“তোর বিশ্বাস না হলে তোকে ওই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো। এখন একদম চুপ। মুখে আঙুল দে ঠিক যেমন ছোটবেলায় খেলতাম।”

তোহা মুখে আঙ্গুল দিলো না ঠিকই তবে তাকদীরের কথায় চুপ করে গেল। তোহা তো কখনোই তাকদীরের কথার অবাধ্য হয় না। তাকদীর অপছন্দ করে এমন কোন কাজও করেনা। তবে আজ কেন করবে?

তোহাকে দাঁড় করিয়ে তাকদীর একটা অটো দাঁড় করালো। ঠিকানা আর ভাড়া ঠিক করে তোহার ব্যাগটা পিছনে তুলে দিয়ে তোহাকে পিছনে উঠতে বলে নিজে সামনে গিয়ে বসলো। তোহার মনটা একটু খারাপই হলো। পেছনে তো পুরো সিট ফাঁকা আছে। ওর সাথে বসলে কি এমন ক্ষতি হতো?

_________

মিলির ফ্ল্যাটে অনবরত কলিংবেল বাজিয়ে যাচ্ছে তাকদীর। বাজাচ্ছে তো বাজাচ্ছে থামার কোন নাম নেই। মিলি হুড়মুড়িয়ে এসে দরজাটা খুলে দিয়ে আতঙ্কিত গলায় বলল,

“কি হয়েছে?”

তাকদীর অসহায় মুখ করে বলল,

“একটু পানি দরকার সিনিয়র। প্রাণটা শুকিয়ে গেছে।”

মিলি ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“প্রাণ আবার কি করে শুকায়? আর গলা শুকালে পানি খেতে হয়।”

“ও আমি বোধহয় ভুল বলে ফেলেছি।যাইহোক প্রাণ বা গলা যেটাই শুকিয়ে যাক না কেন এখন সতেজ হয়ে গিয়েছে।”

“কেন এসেছো? দিনে কতবার আসতে হয় তোমার? আর পাগ'লের মতন কলিংবেল বাজাতে থাকো কেন? তুমি জানো না আমার আসতে সময় লাগবে? আর এতবার আসবে না। আমার দরজা খুলে দিতে সমস্যা হয়। বারণ করে দিলাম তোমায় আসবে না আমার ফ্ল্যাটে এতবার।”

তাকদীর প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলাল,

“আপনার দরজা খুলে দিতে অসুবিধা হয় এটাই তো সমস্যা?”

“হ্যাঁ। আমার ভীষণ সমস্যা হয় বারবার এসে দরজা খুলে দিতে।”

“আমার কাছে ডুপ্লিকেট চাবি আছে তো। আমি ওটা দিয়ে দরজা খুলে ভিতরে চলে আসবো।”

“একটা থা'প্পর খাবে বেয়া'দব ছেলে। একটা মেয়ের ফ্ল্যাটে এভাবে ঢুকে যাবে তুমি? আন্টিকে কি বলবো তোমার এসব কথা? আর কিসের সিনিয়র সিনিয়র, বারবার বলেছি আপু বলে ডাকবে। বয়সে ছোট তুমি।একদিন কান মলে দিলেই পরের দিন থেকে আর আপু ডাক ভুলবে না।”

বারবার মিলের কথায় ধাক্কা খাচ্ছে তাকদীর।এত রুষ্ঠ গলায় ওর সাথে কথা বলার কি আছে? মিলি কি বোঝেনা তাকদীরের ছোট্ট হৃদয়টা ভেঙে যায়? কষ্ট পায় তো তাকদীর।

কিছু বলতে নেবে তবে তার আগেই পিছন থেকে আবার ভেসে এলো তাকদীরের ভাষায় সেই ন্যাকা ডাকটা। ডাকটা কানে যেতেই তাকবীরের সর্বাঙ্গ জ্ব'লে উঠলো। তাকদীরের কাঁধের পেছন দিয়ে মিলি দেখলো একটা অল্প বয়সী বেশ মিষ্টি একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে যাকে মিলি চেনে না। এর আগে কখনো দেখেনি। তাকদীর কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“উনি কে?”

তাকদীর কটমট করে বলল,

“আরেকটা ল্যাদা বাচ্চা।”

তবে তোহার দিকে তাকাতেই অভিব্যক্তি বদলে গেল তার। মুখে আবার সেই হাসিটা ফুটিয়ে তুলে বলল,

“কি সমস্যা?”

তোহা একটু ইতস্তত গলায় বলল,

“কোন সমস্যা নেই। আসলে তুমি কাকে ডাকতে এসেছো দেখতে এসেছিলাম।”

বিজ্ঞাপন

“ডেকে তো বাড়িতেই নিয়ে যেতাম। বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্যই তো ডাকতে এসেছি। আবার কষ্ট করে তুই এতটা পথ হাঁটতে গেলি কেন?”

“এতটা পথ কোথায়? তুমি কি বিরক্ত হয়েছো আমি আসায়? আচ্ছা আমি চলে যাচ্ছি।”

তাকদীর একটু নড়েচড়ে উঠে বলল,

“বিরক্ত হয়নি তবে তুই যখন চলে যেতে চাচ্ছিস তাহলে যেতে পারিস।”

তোহা আর সেখানে দাঁড়ালো না। হাসিমুখেই ভিতরে চলে গেল। তাকদীর পিছন ফিরে মিলিকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই মিলি হালকা গম্ভীর গলায় বলল,

“ওনার সাথে এমন ব্যবহার করলে কেন? তুমি তো এমন ব্যবহার করো না কারো সাথে, অন্তত কোন মেয়ের সাথে?”

“কি বলেছি? খারাপ তো কিছু বলিনি। ওই তো চলে যেতে চাইলো।”

“তোমার ব্যবহার ওকে এমনটা বলতে বাধ্য করেছে। কে ওই মেয়েটা?”

“মামাতো বোন।”

“তবে ওর প্রতি এত বিরক্ত কেন তুমি?”

তাকদীর কথাটা বলার জন্য মুখ খুলল তবে খুব তাড়াতাড়ি আবার মুখটা বন্ধ করে নিল।মিলিকে এসব কথা বলতে চায় না। এই মেয়ের মতিগতির ঠিক নেই বলা যায় না আবার কখন কি ভেবে নেয়। কথাটা এড়িয়ে গিয়ে বলল,

“এমনিতেই বিরক্ত। আম্মু আপনাকে ডেকে আনতে বলেছে, চলুন।”

“তুমি যাও আমি পরে আসছি।”

“এখনি চলুন।”

“জেদ করছো কেন?”

মিলির কন্ঠে একটু রাগী ভাব প্রকাশ পেল।তবে তাকদীরের সেসবে কিছু যায় আসলো না। গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,

“আমি জেদি তাই।”

“বেয়া'দবি করলে আন্টিকে বলে দেব।”

“সেসব পরে দেখা যাবে।”

“যাব না আমি তোমাদের ফ্ল্যাটে।”

“তাহলে কিন্তু আমি আমার খাবার নিয়ে এখানে চলে আসব।”

“এবারে কিন্তু তুমি বেয়া'দবি করছো তাকদীর। আমার রাগ সম্বন্ধে কিন্তু তোমার কোন ধারনা নেই। কোন কিছুতেই বাড়াবাড়ি আমার পছন্দ না। আর একটা কথা তোমায় বলছি নিজের সীমার মাঝে থাকো। তোমাকে ছাড় দিয়েছি তার মানে এই না যে তোমার যা ইচ্ছে তাই করবে। আমি যদি দূরত্ব কমাতে পারি তবে দূরত্ব বাড়াতেও পারি। আর এতটাই বাড়াবো যে তুমি আমার নাগালও খুঁজে পাবে না। তাই বলছি আমায় রাগ দেখাতে বাধ্য করো না।”

মিলি ভেবেছিল ওর এই কঠিন কথাটায় বোধহয় কাজ হবে। হয়তো তাকদীর মন খারাপ করে চলে যাবে। তবে তেমন কিছুই হলো না। বরং তাকদীরের অভিব্যক্তির বদল ঘটলো। মাঝে মাঝে যেমন গম্ভীর হয়ে ওঠে মুখ ভঙ্গি, ভীষণ সিরিয়াস লাগে দেখতে ছেলেটা কে ঠিক তেমন লাগলো। দু কদম এগিয়ে এলো মিলির দিকে। বেশ গম্ভীর গলায় বলল,

“আর আমার জেদ সম্পর্কে আপনারও কোন ধারণা নেই। আমাকেও জেদ দেখাতে বাধ্য করবেন না।”

“জেদ দেখানোর কোন অধিকার তোমার নেই।”

“অধিকার বানিয়ে নিতে জানি আমি। চুপচাপ চলুম আমার সাথে। আমি প্রচন্ড জেদি। একবার যখন বলেছি আপনাকে নিয়ে যাবো তার মানে নিয়ে যাবই। আর না গেলে আমি এখানে চলে আসব খাবার নিয়ে।”

মিলির এবার সত্যি সত্যি বেশ রাগ হলো।তাকদীরের আচরণ ওর কাছে এখন ঠিক ভালো লাগছে না। এমন তো চলতে পারে না।এই ক'দিনের পরিচয়ে ছেলেটা অতিরিক্ত অধিকার বোধ দেখাতে শুরু করেছে। চোখ মুখে কাঠিন্য ভাব ফুটিয়ে দিলে,

“তোমার আচরণগুলো যেন আমার এই বাড়ি ছাড়ার কারণ না হয়ে দাঁড়ায় তাকদীর।যেকোনো কিছুর উপর থেকে মায়া আমি খুব সহজে উঠিয়ে ফেলতে পারি। সেখানে তোমার প্রতি তো এখনো আমার কোন মায়া তৈরিই হয়নি। এক সেকেন্ডও লাগবে না আমার এইসব কিছু ছেড়ে চলে যেতে।”

তাকদীরের অভিব্যক্তি আবার বদলে গেল।গুরুগম্ভীর মুখে ভয়ের চাপ দেখা দিল।অপরাধী গলায় বলল,

“সরি সিনিয়র! আমি ভুল বলে ফেলেছি তাই না? কিছু মনে করবেন না আমার কথায়। আসলে এমনটা করা আমার অভ্যেস, জেদ দেখিয়ে ফেলি। আর দেখাবো না সত্যি বলছি।”

“মনে থাকে যেন কথাটা।”

“আচ্ছা ঠিক আছে মনে থাকবে। আপনি কি যাবেন নাকি আপনার খাবারটা এখানে দিয়ে যাব? আমি আসবো না, শুধু আপনার খাবারটাই দিয়ে যাব।”

মিলি গম্ভীর গলায় বলল,

“প্রয়োজন নেই। আন্টি বলে গেছে ওখানে যেতে সেইজন্য যাব। তবে এখন না, তুমি যাও।”

তাকদীর আর দ্বিতীয় কোন শব্দ ব্যয় করলো না। মিলি মলিন হেসে বলল,

“তোমার কোন জেদই এখানে টিকবে না তাকদীর।”

_______

দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষে তাহরিমা বেগম মিলি আর তোহা কে নিয়ে বসে গল্প করছেন নিজের ঘরে। তাকদীর বেশ কয়েকবার ঘরের সামনে দিয়ে ঘুর ঘুর করলো। সেই বিষয়টা তোহার নজর এড়ালেও মিলি আর তাহরিমা বেগম দুজনেই বেশ ভালো ভাবে খেয়াল করলো। দুজনেই হয়তো এর কারণটাও খুব ভালো করেই জানে। অবশেষে থাকতে না পেরে তাকদীর আগে একটা অজুহাত বের করলো। তারপর সোজা তাহরিমা বেগমের ঘরের ভেতরে এসে বলল,

“আম্মু আমার রুমের এসি কাজ করছে না।আমি এখানে থাকি? চুপচাপ বসে থাকবো?মোবাইল চালাবো।”

তাহরিমা বেগম গম্ভীর গলায় বললেন,

“এই ঠান্ডার দিনে কে এসি চালায়? মাথা ঠিক আছে তোমার?”

তাকদীর কোন কিছু বলে না চুপচাপ ঘুরে আবার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর আবার আগমন ঘটলো ওর। আড্ডার মাঝে বারবার বাধা দেয়ায় তাহরিমা বেগম বিরক্তিকর গলায় বললেন,

“কি সমস্যা তোমার?”

“আম্মু আসলে তোমাদের সাথে গল্প করতে ইচ্ছে করছে। একা একা ভালো লাগছে না?”

কে জানে তাকদীরের কথার মানে তোহা কি বুঝলো। ভাবলো হয়তো ও আছে জন্যই তাকদীর এখানে আসার অজুহাত খুঁজছে, ঠিক যেমন তোহা খোঁজে। তবে এবারে তাহরিমা বেগম আর রাগ করলেন না। চুপচাপ বসতে ইশারা করলেন।

তাকদীর আসতেই আড্ডাটা জমে উঠলো।কাউকে আর হাসাতে বাদ রাখলো না এমনকি তার গম্ভীর আম্মু তাহরিমা বেগম কেও না। কথার মাঝে একবার তাকদীর মিলিকে সিনিয়র বলে ডেকে উঠলো। মিলি তৎক্ষণাৎ তাহরিমা বেগম কে উদ্দেশ্য করে অভিযোগের গলায় বলল,

“আন্টি আপনার এই ছেলেটা কিন্তু খুব বেয়া'দব। বারবার করে বলি আমি ওর আপু হই সম্পর্কে কিন্তু আপু বলে ডাকেনা। আমায় শুধু সিনিয়র বলে, মাঝে মাঝে নাম ধরেও ডাকে।”

অন্য কোনদিন হলে তাকদীর তাহরিমা বেগম এর কাছে ভীষণ বকা খেত তবে আজ তাহরিমা বেগম কি বলবেন ছেলেকে বুঝতে পারছেন না। তার ছেলে কেন মিলি কে আপু বলে ডাকে না সে কথা মিলি না জানলেও উনি তো ঠিকই জানেন। তবে যেহেতু মিলি এখনও এসবের কিছুই জানে না তাই ওকে জানানোর প্রয়োজন নেই। হালকা রাগ দেখিয়ে তাকদীর কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“নাম ধরে ডাকো কেন তুমি ওকে?”

তাকদীর দাঁত বের করে হেসে বলল,

“বেরিয়ে যায় মুখ থেকে আম্মু। আটকানোর চেষ্টা করে কিন্তু পারিনা।”

তাহরিমা বেগম আর কিছু বলল না। সবাই টুকটাক কথা বললেও তোহা একদমই নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। মাঝে মাঝে শুধু একটু মাথা নাড়িয়ে কথায় সায় জানাচ্ছে। না হলে বেশিরভাগ সময়টাই আড়চোখে তাকদীরের দিকে তাকিয়ে থাকছে যা মিলির নজর এড়ালো না। সেই সাথে তোহার দৃষ্টির মাঝে থাকা তাকদীরের জন্য ভালোবাসাটাও বুঝলো।

বুঝবে নাই বা কেন? একসময় তো মিলিও ঠিক এমন ভাবেই কারো দিকে তাকিয়ে থাকতো। আর আজ তোহার এই দৃষ্টির মানে মিলি বুঝবে না তা কি হতে পারে?

ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও মিলি বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারলো না। শরীরটা হঠাৎ করে খারাপ লাগছে। উঠে দাঁড়িয়ে সবার থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য উদ্ধত হতেই তাকদীর বলে উঠলো,

“চলুন এগিয়ে দিয়ে আসি আপনাকে।”

এবারে মিলি কিছু বলতে যাবে তার আগেই তাহরিমা বেগম মৃদু ধমকে উঠে তাকদীর কে বলল,

“এত চঞ্চলতা আমার পছন্দ না। নিজের জায়গায় চুপচাপ বসো।”

মিলি হাসলো।কে জানে কি বুঝলো।

এদিকে সামনে তোহা আছে সেটা বড় ব্যাপার না, তবে মিলির সামনের তাকদীর একটু অপমানিত বোধই করল। তবে কিছু করার নেই। চুপচাপ আবার চেয়ারে বসে পড়ল।তোহা উঠে দাঁড়ে হাসি হাসি মুখে বলল,

“আপু চলুন আমি আপনাকে রেখে আসছি।”

মিলি আপত্তি জানিয়ে বলল,

“আরেক লাগবে না। এই তো এ পাশ থেকে ও পাশে এখানে আমায় রেখে আসার কি আছে?”

“তারপরও চলুন। আপনার একার সংসারটাও দেখে আসি।”

মিলি এবারে আর আপত্তি করলো না। নিয়ে গেলে তোহাকে সাথে। তাকদীরের এখন তোহার ওপর খুবই হিংসে হলো। কিছুক্ষণের জন্য ইচ্ছে করলো তোহার জায়গা নিয়ে নিতে। তোহার ভাগ্যটা কত ভালো মিলি নিজ থেকে ওকে নিয়ে গেল, একটুও আপত্তি করল না। তাকদীরের এসব ভাবনার মাঝে তাহরিমা বেগমের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো যাতে তাকদীর কেঁপে উঠলো।

“তোমায় বলেছিলাম আমি বাড়াবাড়ি না করতে।”

তাকদীর মাথা নিচু করে নরম গলায় বলল,

“কি করলাম আমি আম্মু?”

“তোমার জন্য মিলি অস্বস্তি অনুভব করছে।এসব আমি একদম অপছন্দ করি। আমার ছেলে কোন মেয়ের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে সেসব কল্পনাতেও ভাবতে পারিনা।”

তাকদীর অপরাধী গলায় বলল,

“সরি আম্মু আর হবে না।”

“তোমাকে আমি খুব ভালো করে চিনি। তুমি তোমার এই চঞ্চলতা কখনো কমাতে পারবে না। তোমাকে একটা কথা বলে রাখি মিলির সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাবে। একটা কথা মাথায় রাখবে দিনশেষে মিলি যা চাইবে তাই হবে।”

তাকদীর মাথা তুলে তাকিয়ে নির্জীব গলায় বলল,

“আমি যা চাই উনি তো তা কখনোই চাইবে না আম্মু। তাহলে কি করবো?”

“তোমার প্রশ্নের উত্তর আমি আমার আগের কথাতেই বলে দিয়েছি। মিলি যা চাইবে তাই হবে। আর তোমাকেও তাই মানতে হবে।”

বিজ্ঞাপন
রিক্ত বসন্ত গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস