“কি হয়েছে? কোথায় আ/গুন লেগেছে?”
তাকদীর আতঙ্কিত গলায় ভাড়াটিয়াদের উদ্দেশ্যে করে প্রশ্নটা করলো। তাকদীরের প্রশ্ন শুনে সবাই একসাথে হাউ মাউ করে উঠলো। একসাথে বলার কারণে তাকদীর একটা শব্দও বুঝতে পারলো না। বিরক্তিকর গলায় বলল,
“আরে বাবা যে কোন একজন কথা বলুন না। এতজন বলছেন কিছুই তো বুঝতে পারছিনা।”
তাকদীরের বিরক্তি মাখা কথায় সবাই এবার থেমে গেল। এবারে আর কারো মুখ দিয়েই কোন কথা বের হচ্ছে না। তাকদীরের মাথাটা এবারে আরো গরম হয়ে গেল। একটু আগে সবাই একসাথে চেঁচাচ্ছিলো আর এখন একজনও মুখ খুলছে না।
“সবাইকে তো দেখে মনে হচ্ছে বেঁচে আছেন এখনো, তাহলে মুখ খুলছেন না কেন কারো?”
তাকদীর কথাটা বলার পরও কেউ মুখ খুলল না। তাকদীর এবার বিরক্ত হয়ে নিজ থেকেই একজনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আঙ্কেল আপনি বলুন তো কি হয়েছে?”
ভদ্রলোক খুশি হলেন। এত জনের মাঝে তাকদীর আলাদাভাবে ওনাকে জিজ্ঞেস করায় ব্যাপারটা তার কাছে বেশ সম্মানের মনে হলো।
“আসলে সমস্যা হয়েছে মেইন সুইচে। পুরো ফ্ল্যাটের ইলেকট্রিসিটি চলে গেছে। আমার মেয়ে বলেছে মেইন সুইচের ওখান থেকে নাকি আগুনের ফুলকি বের হতে দেখেছে। আমরা ভয়ে বেরিয়ে এসেছি।”
“ইলেকট্রিশিয়ান কে কল করেছেন?”
লোকটা একটু থতমতো খেল। আমতা আমতা করে বলল,
“কাউকে তো কল করা হয়নি।”
তাকদীর আবারও তেঁতে উঠে বলল,
“খুব ভালো করেছেন। আমাকে তো আপনাদের ইলেকট্রিশিয়ান মনে হয় যে এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতিতে আমাকে কল করেছেন। আপনাদের সবগুলোর কি বুদ্ধি মাইরি। এত বুদ্ধি রাখেন কোথায়?”
তাকদীরের কথার মাঝেই সাবা নামক একটা অল্প বয়সী মেয়ে চিৎকার করে উঠে বলল,
“আব্বু ওই দেখো আবার আগুনের ফুলকি বের হচ্ছে মেইন সুইচের ওখান থেকে।”
যে ভদ্রলোকের থেকে তাকদীর সব কিছু শুনতে চেয়েছিল সাবা তারই মেয়ে। ব্যাপারটা এবার তাকদীরও খেয়াল করলো। হুট করে মাথায় এলো মিলির কথা। আশেপাশে তো কোথাও মিলিকে দেখা যাচ্ছে না। মিলি তো কলেজে নেই, ওর ছুটি চলছে। আর এই অবস্থায় মিলি বাইরে কোথাও যাবে এটা অসম্ভব। তার মানে কি মিলি এখনো ফ্লাটে আছে?
প্রশ্নাত্মক গলায় সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমাদের পাশের ইউনিটে যিনি থাকেন মিলি উনি কোথায়?”
সাবা উত্তরে বলল,
“উনি তো ওনার ফ্ল্যাটেই আছেন।”
“মানে আপনারা কেউ ওনাকে বলেননি যে আ’গুন লাগতে পারে বা কারেন্ট নিয়ে কোন সমস্যা হতে পারে? মানে উনি জানেনই না এ বিষয়ে? আর আপনারা সবগুলো স্বার্থপরের মতন একা একা বেরিয়ে এসেছেন। না কোন ইলেক্ট্রিসিয়ান কে কল করেছেন, না ওনাকে জানিয়েছেন ব্যাপারটা?”
সবাই মাথার নিচু করে ফেলল। রাগে তাকদীরের সর্বাঙ্গ জ্ব’লে উঠলো। সবাইকে উদ্দেশ্য করে শাসিয়ে বলল,
“ফায়ার সার্ভিস কে ডেকে রাখতে পারেন। এখন ওনাকে নিয়ে এসে আপনাদের সবার ঘরে ঘরে আমি আ’গুন লাগাবো। সবগুলা ব্যাক্কল আমার বাড়িতে উঠেছে। যদি ওনার কিছু হয়েছে সবগুলোকে বাড়ি ছাড়া করবো আমি।”
কথাটা বলেই তাকদীর ছুটে উপরে চলে গেল। দোতলায় গিয়ে পাগ’লের মতন মিলির ফ্ল্যাটের কলিংবেল বাজাতে লাগলো। যখন দেখলো শুধু এটাতে কাজ হচ্ছে না তখন দরজায় করাঘাত করতে লাগলো জোরে জোরে। সেই সাথে মিলির নাম ধরে চেঁচাতেও লাগলো কিন্তু মিলি আসার কোন নামই নিচ্ছে না। না ভেতর থেকে কোন সাড়া দিচ্ছে। তাকদীরের এবার ভয় হচ্ছে। ভাবছে আবার মিলির ফ্ল্যাটে কোনো সমস্যা হয়নি তো? আবার কারেন্ট শক খায়নি তো কোনোভাবে? বিভিন্ন আজেবাজে ভাবনা চলে আসছে তাকদীরের মাথায়।
তাকদীরের কন্ঠ আরো জোরালো হলো, সেই সাথে দরজায় করাঘাতের গতিও বাড়লো। এবারেও ভেতর থেকে মিলির কোন সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না। তাকদীরের কপালে ঘামের দেখা পাওয়া গেল এবারে। ধাক্কা দিয়ে দরজাটা ভাঙার চেষ্টা করলো। তবে তাকদীর নিজেও খুব ভালো করেই জানে যে ধাক্কা দিয়ে দরজা ভাঙ্গা অসম্ভব তাও একার পক্ষে। তৎক্ষণাত তাকদীরের মনে পড়ল যে এই ফ্ল্যাটের একটা ডুপ্লিকেট চাবি ওর কাছেও আছে। পকেট থেকে নিজের ফ্ল্যাটের চাবিটা বের করে ভিতরে গিয়ে খুঁজে খুঁজে বাইরে আসতেই দেখল মিলি দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে। মাথার চুলগুলো বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। চোখে মুখে তার একরাশ বিস্ময় আর উৎকণ্ঠা। তাকদীর কে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মিলি প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“আপনি দরজা ধাক্কাচ্ছিলেন?”
তাকদীর মুখে কিছু বলতেই পারলো না। মনে হচ্ছে যেন এতক্ষণ নিঃশ্বাসটাই তার আটকে ছিল। শরীরের ভারটা ঠিকভাবে ধরে রাখতে পারছে না। দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। তাকদীরের এই অবস্থা দেখে মিলির একটু চিন্তা হলো। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে প্রশ্ন করলো,
“ঠিক আছেন আপনি? এত ঘামছেন কেন? কি হয়েছে?”
তাকদীর হাঁপানো গলায় বলল,
“ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন আপনি সিনিয়র।”
“কিসের ভয়?”
“আপনাকে হারিয়ে ফেলার ভয়। এভাবে ভয় দেখাবেন না। ছোট্ট একটা হৃদয় আমার। একজন কে দেব বলে যত্নে রেখে দিয়েছি। ঠুস করে যদি হার্ট অ্যাটাক করতাম তাহলে তাকে এই হৃদয়টা দিতাম কি করে?”
মিলি আরো কিছু প্রশ্ন করত তবে তাকদীর ওকে সেই সুযোগ দিল না। তার আগেই শক্ত করে হাতটা ধরে বলল,
“ধীরে ধীরে নিচে চলুন। আমি হাত ধরেছি পড়বেন না।”
“কিন্তু কেন যাব?”
“প্যানিক করবেন না। মেইন সুইচে সমস্যা হয়েছে। যেকোনো সময় আগুন লাগতে পারে।”
মিলি আঁৎকে উঠে বলল,
“কি বলছেন এসব? আমি তো কিছু জানি না। আর আপনি এই সময় উপরে এসেছেন কেন? আমাকে কল করলেই তো হতো।”
“কথা বলে অযথা সময় নষ্ট করবেন না,চলুন।”
“আরে আমার নামতে অনেক সময় লাগবে। আপনি আগে আগে চলে যান, আমি ধীরে ধীরে আসছি।”
মিলি কথাটা বলতেই তাকদীর অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালো মিলির দিকে। কেন যেন তাকদীরের সেই দৃষ্টিটা দেখে মিলি থতমত খেল। কিছু আর বলার সাহসই পেল না। তাকদীর গম্ভীর গলায় বলল,
“ভয় পাওয়ার কিছু নেই, প্যানিক করারও কিছু নেই। যতক্ষণ সময় লাগে লাগুক। আমি আপনাকে ছেড়ে যাবো না। আপনাকে নেওয়ার জন্য উপরে এসেছি। একবার যখন হাতটা ধরেছি আর ছাড়বো না।”
তাকদীরের কন্ঠ আর কথা বলার ধরনটা মিলির কেন যেন অন্যরকম লাগলো। একটু না ভীষণ অদ্ভুত লাগলো। তবে এখন আর কিছু বলল না। ধীরে ধীরে তাকদীরের হাত ধরে নিচে নেমে এলো। তাকদীর মিলিকে নিয়ে নিচে নামতেই কয়েকজন ওকে ঘিরে ধরে চিন্তিত মুখ ভঙ্গিতে প্রশ্ন করলো,
“ঠিক আছে তুমি?”
মিলি কিছু বলতে নেবে তার আগেই তাকদীর ওকে থামিয়ে দিয়ে বাকি সবাইকে উদ্দেশ্য করে রাগান্বিত ভঙ্গিতে বলল,
“এখন আলগা পিরীত দেখাতে এসেছেন? আগে হুশ ছিল না উনি ঠিক আছেন কি নেই? একজন গর্ভবতী অসুস্থ মহিলা কে ভেতরে রেখে সবাই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে লজ্জা করলো না? এখন আবার এসেছেন সহানুভূতির নাটক করতে? যত্তসব বা’লের কথাবার্তা কয় আমার সামনে।”
সবাই চুপ করে গেলেও সাবা নামক মেয়েটা এগিয়ে এসে তাকদীরকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমি আসলে ওনার কথাই ভাবছিলাম। আমি ওনাকে আনতেও যেতাম।”
“কখন? আ’গুন লেগে গ্রিল হয়ে যাওয়ার পর? হুদাই একটা ঢপ দিতে আসবেন না। যেখানে সামান্য একটু বাতাস উঠলে আপনি কালবৈশাখী ঝড় বলে চেঁচিয়ে উঠে মায়ের আঁচলের তলায় লুকিয়ে পড়েন সেখানে আপনি যে কত এমন পরিস্থিতিতে ওনাকে উপর থেকে আনতে যাবেন সেটা আমার জানা আছে। ল্যাদা বাচ্চা ল্যাদা বাচ্চার মতন থাকুন। যত্তসব বা’ল পাকনা কথাবার্তা।”
_______
মাঝে বেশ কিছু দিন কেটে গেছে। মিলির জীবনে নতুন অতিথি আগমনের দিন ঘনিয়ে এসেছে। এইতো আর কিছুদিন, হয়তোবা সপ্তাহখানেক। তারপরে মিলির আর কখনো নিজেকে একা মনে হবে না। সব সময় নিজের সত্তার সাথে মিশে থাকা একজন কে পাবে।
মিলি আর তাকদীরের সম্পর্কেরও এই কয় দিনে বেশ ভালোই উন্নতি হয়েছে বলা যায়। এই যেমন মিলি এখন তাকদীর কে তুমি করে ডাকে। মিলি ডাকতে চায়নি তবে তাকদীর জেদ ধরেই ডাকিয়েছে। তবে তাকদীর এখনো আপনি বলেই ডাকে, তুমি করে ডাকার অনুমতি পায়নি।
মিলি এখন প্রায়ই তাকদীরের কথায় হাসে, তাকদীরের সাথে আড্ডা দিতেও বেশ ভালোই লাগে। বেশিরভাগ দিন বিকেলবেলা তাহরিমা বেগম ওর ফ্ল্যাটে আসে চা করে নিয়ে। দুজনে চা খেতে খেতে টুকটাক কিছু কথাবার্তা বলে। এমনভাবেই বেশ চলছে মিলির জীবনটা।
ছুটির দিন হওয়ায় আজ সবাই বাড়িতেই আছে। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে তাকদীর দেখলো তাহরিমা বেগম রান্নাঘরে ব্যস্ত সময় পার করছে, সেই সাথে পুরো বাড়ি একদম চকচক করছে। এত তোড়জোরের কারণ তাকদীর ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। রান্না ঘরে গিয়ে তাকের উপর উঠে বসলো। প্রশ্নাত্মক গলায় তাহরিমা বেগম কে জিজ্ঞেস করল,
“রান্না কেন করছো আম্মু?”
ছেলের এমন অদ্ভুত প্রশ্নে তাহরিমা বেগম কিঞ্চিৎ বিরক্তি মাখা দৃষ্টিতে তাকদীরের দিকে তাকাতেই তাকদীর নিজের ভুলটা বুঝতে পারল। ভুলটা শুধরে নিয়ে বলল,
“মানে বলছিলাম যে এত রান্না কেন করছ?”
“তোহা আসছে।”
তাকদীরের মুখটা কেমন শুকিয়ে গেল। অসহায় গলায় বলল,
“ওর আবার আসতে হবে কেন? ওর কি নিজের বাড়ি নেই যে আমাদের বাড়িতে আসতে হবে?”
তাহরিমা বেগম কিঞ্চিত রাগান্বিত গলায় বলল,
“এইসব কোন ধরনের কথাবার্তা? আমাদের বিপদের সময় ওরা আমাদেরকে ওদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিল। এখন ও আমাদের বাড়িতে ঘুরতে আসতে চাইছে তাতে তোমার সমস্যা কি?”
তাকদীর ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“তুমি জানো আম্মু আমার কি সমস্যা। ও কেমন করে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। তারপর সকাল হলে ঘরে চা নিয়ে আসবে, বিকালের নাস্তা দেবে, খাবার টেবিলে খেতে বসলে নিজে না খেয়ে আমার প্লেটে খাবার তুলে দেবে, আমার এসব ভালো লাগেনা। আমার অস্বস্তি হয়। আমার সাথে ওর কথা বলার টোন শুনলে আমার অস্বস্তি হয়। ওর দৃষ্টি তে আমার অস্বস্তি হয়।”
“অস্বস্তি হয় তার কারণ তুমি সেই একটা বিষয় ধরেই বসে আছো। নিজের মামাতো বোন হিসেবেও তো ভাবতে পারো ওকে।”
“আমি তো এর বাইরে অন্য কিছু ভাবি না কিন্তু ও আমায় অনেক কিছু ভাবে। আমার সেসব ভালো লাগে না। তুমি মানা করে দাও ওকে আসতে।”
“ও রওনা দিয়ে দিয়েছে। যেকোনো সময় পৌঁছে যাবে।”
“তাহলে আর কি? আমি বাড়ি থেকে চলে যাই।”
“স্টেশন থেকে আনতে যেতে হবে ওকে।”
তাকদীর লাফ দিয়ে নিচে নেমে বলল,
“অসম্ভব।”
“বাইক নিয়ে যেতে বলিনি। তোমার বাইক ছাড়াও পৃথিবীতে অটো, রিকশা সব আছে।”
তাকদীর অসহায় মুখ করে বলল,
“আম্মু প্লিজ!”
“জেদ করেনা বাবা। তুমি যা বলবে তোমার আম্মু তাই শুনবে। তোহাকে নিয়ে এত ভেবোনা। আমি জানি বড় ভাইজানের উপর আমার অনেক ঋণ জমা আছে তাই বলে সেই ঋণ আমি আমার ছেলের জীবন দিয়ে শোধ করবো না।”
তাকদীর একটু আশ্বস্ত হলো। ওর আম্মু যখন একবার বলেছে তাহলে তাকদীরের উপরে জোর করবে না এ বিষয়ে তাকদীর নিশ্চিত। তবে কথা সেটা না, কথা হলো এতটা রাস্তা তোহার বকবক শুনে ওর মাথাটা খারাপ হয়ে যাবে। মেয়েটা তো শুধু কথা বলে থামবে না, আবার ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েও থাকবো ওর দিকে। মাঝে মাঝে আবার নিজ মনে হাসবে। আবার হঠাৎ করে প্রশ্ন করবে,
“কেমন লাগছে আমায় তাকদীর ভাই?”
ন্যাকামি যত্তসব! তবে তাকদীরের কিছু করার নেই। যেহেতু ওর আম্মু আদেশ করেছে তাহলে পালন করতেই হবে।
ঘরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়ে আবারো থেমে গেল তাকদীর। পূর্বের জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে তাহরিমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“একটা কথা বলি আম্মু?”
“বলো।”
“যেহেতু তোহা আসছে তুমি এত রান্নাবান্নাও করছো তার মানে তো আমাদের বাড়িতে আজ একটা অনুষ্ঠানের মতন তাই না? তাহলে সিনিয়রকে..না মানে সিনিয়র আপুকে আমরা দাওয়াত দেই? সব সময় তো ওনার বাড়িতে গিয়ে তুমি খাবার দিয়ে আসো আজ ওনাকে আমি ডেকে নিয়ে আসি? তোহাও দেখবে ওনাকে। আমি পরিচয় করিয়ে দেব তোহার সাথে।”
কিছু সময়ের জন্য তাহরিমা বেগমের রান্নার হাতটা থেমে গেল। তবে খুব তাড়াতাড়ি থেমে যাওয়া হাতটাকে সচল করে স্বাভাবিক গলায় তাকদীরকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করলেন,
“কি বলে পরিচয় করিয়ে দেবে?”
তাকদীরের মনে অনেক কিছুই চলল তবে সেসব মুখে বলার সাহস নেই। বলা যায় না হয়তো গরম তেলে ওর হাতটাই চুবিয়ে দিল ওর আম্মু।
“বলব সিনিয়র।”
তাহরিমা বেগম মুচকি হাসলেন। পাশের তাকটা ইশারা করে সেখানে তাকদীরকে বসতে বললেন। তাকদীর বাধ্য ছেলের মত বসলো।
রাতে রান্না করা খিচুড়ি কিছুটা বেঁচে গিয়েছিল সেটাই সকালে গরম করে রেখে দিয়েছিলেন তাকদীর কে খেতে দেওয়ার জন্য। সেই প্লেটটা তাকদীরের দিকে বাড়িয়ে দিল। তাকদীর হাত মাখাতে পছন্দ করলো না। একটা চামচ দিয়ে খেলো। একবার খেতে মনে পড়ল যে ওর আম্মু খেয়েছে কিনা। তবে জিজ্ঞেস করল না কিছু। সরাসরি চামচে খিচুড়ি উঠিয়ে তাহরিমা বেগমের মুখের সামনে ধরল। উনিও চুপচাপ সেটা খেয়ে নিলেন। খাওয়া শেষ করে তাকদীর যাওয়ার জন্য অনুমতি চাইলো তবে তাহরিমা বেগম অনুমতি দিলেন না। তার রান্নার হাতটাও থামেনি।
রান্না করতে করতে তাকদীর কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“মিলিকে নিয়ে তোমার এত চিন্তা কেন? তুমি কি খেয়াল করেছো দিনের বেশিরভাগ সময়টা তুমি আজকাল মিলি মিলি করো?”
তাকদীর কিছু বলতে চেয়েও থেমে গেল। কি যেন একটা বলতে চাইলো আবার নিজেই ভুলে গেল কিংবা হয়তো বলতে পারল না। তাকদীরকে চুপ করে থাকতে দেখে তাহরিমা বেগম পুনরায় বললেন,
“মিলি তোমার থেকে বয়সে এক থেকে দেড় বছরের বড়। ওর স্বামী আছে যার সাথে ওর এখনো ডিভোর্স হয়নি, কয়েকদিন পর মা ও হবে। মনে আছে তো এসব কথা।”
মায়ের করা ইঙ্গিত তাকদীর এবার বুঝে ফেলল। বুঝতে পারলো যে তাহরিমা বেগম কিছু সন্দেহ করেছে। তাকদীরও কিছু লুকোতে চাইলো না আর। সবকিছুই বলে সে নিজের আম্মুকে।
তবে তাকদীরের ভেতরে যে অনুভূতিটা আছে সেটা নিয়ে মাঝে মাঝে মনে হয় সে নিজেও খুবই চিন্তায় পড়ে যায়। বেশ কিছুদিন ধরে নিজেই এই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে। নিজেকে প্রশ্ন করে ঠিকই তবে কোন উত্তর পায় না। বরাবরই তাকদীর যখনই কোন বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগেছে কিংবা কোন সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছে তখন সর্বপ্রথম যে মানুষটার দ্বারস্থ হয়েছে সে হলো তাহরিমা বেগম। মানুষটা এতটা বিচক্ষণ যে প্রত্যেক বারই তাকদীরের সমস্যা গুলোর সমাধান করতে পেরেছে। খুবই সাধারণ ভাবে ছোট্ট একটা ইঙ্গিত করে আর তাকদীর বুঝে যায়। তাকদীর ভাবল আজ এই মানুষটাকে ওর দরকার।
“জানো আম্মু সিনিয়র যখন হাসে আমার খুব ভালো লাগে। কিন্তু ওনাকে হাসাতে আমায় খুব কষ্ট করতে হয়। তুমি জানো আমি কখনো এমন মানুষ ছিলাম না যে কারো মন যুগিয়ে চলবো, কাউকে হাসানোর চেষ্টা করব। কিন্তু আমি এখন এমনটা করি। আমি নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করি। আমার যে অভ্যাসটা মনে হয় সিনিয়রের পছন্দ না আমি সেই অভ্যাসটা ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। আগে ফোনে লাবিবা যখন ওনার কথা বলত তখন আমার খুব খারাপ লাগত ওনার জন্য, ওনার হাজবেন্ডের উপর প্রচন্ড রাগ হতো যে পুরুষ মানুষ এমন কেন হবে। ওনাকে না দেখে, ওনার কন্ঠ না শুনে আমার ওনার প্রতি কেমন যেন একটা মায়া তৈরি হয়ে গিয়েছিল। লাবিবা তো আমাকে বলেওনি যে আমাদের ভাড়াটিয়া হিসেবে ওনাকে পাঠাচ্ছে যার গল্প আমাকে শুনিয়েছে। সেজন্য প্রথম দিন আমি ওনাকে চিনতেও পারিনি।”
কথাগুলো বলে তাকদীর থামল।
তাহরিমা বেগম বললেন,
“তারপর?”
“তারপর জানো আমার খুব ইচ্ছে করে ওনার জীবনের সব কষ্টগুলো দূর করে দিতে। ওনার মন খারাপ দেখলে না আমারও ভালো লাগেনা। আমি তোমায় বলতাম মনে আছে যে আমি আমার মায়ের পায়ের কাছে পৃথিবীর সব সুখ এনে রেখে দিতে চাই?”
তাহরিমা বেগম মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোধক উত্তর জানালো। তাকদীর পুনরায় বলে উঠলো,
“ওনার ক্ষেত্রেও তাই মনে হয়। মনে হয় পৃথিবীর সব সুখ ওনার পায়ের কাছে এনে রেখে দেই। মানে কেমন যেন একটা অনুভূতি ওনার প্রতি। আমি তোমায় ঠিক ভাবে বোঝাতে পারছি না আম্মু। মানে উনি শুধু আমার বন্ধু না। লাবিবার প্রতি আমার যে অনুভূতিটা আছে ওনার প্রতি আমার অনুভূতি তেমন না। অন্যরকম কিছু আছে যে অনুভূতি এর আগে কারো প্রতি তৈরি হয়নি। এর মানে কি আম্মু?”
তাহরিমা বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি জানেন তার ছেলে নিজেও নিজের অনুভূতির সম্পর্কে হয়ত ঠিকই আন্দাজ করতে পেরেছে তবে তারপরেও ওনার কাছ থেকে নিশ্চিত হতে চাইছে। তবে কোথাও কিঞ্চিত পরিমাণে একটা সন্দেহ থেকে যাচ্ছে তার মনে যে আদৌ তাকদীর বুঝতে পেরেছে কিনা। সেই সন্দেহটার কারণে তিনি নিজ থেকে আর কিছুই বললেন না। বলা যায় না যদি তার ওই কিঞ্চিত পরিমাণ সন্দেহটাই সত্যি হয়ে থাকে তবে হয়তো তাকদীর ওনার কথায় প্রভাবিত হতে পারে। তার থেকে বরং তাকদীর নিজেই নিজের মনের কথাটা বুঝে নেক। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা তো নির্ভর করবে মিলির উপরে। তিনি শুধু পারেন তার ছেলেকে বোঝাতে।
তাহরিমা বেগমকে চুপ করে থাকতে দেখে তাকদীর বলে উঠল,
“কিছু বলো আম্মু?”
“ভাঙা হৃদয় জোড়া লাগানো কিন্তু খুব কষ্টকর। তোমার আম্মুর হৃদয় এতগুলো বছরেও কেউ জোড়া লাগাতে পারেনি। তাড়াহুড়ো করো না। সবে মাত্র মেয়েটা তোমাকে ভরসা করতে শুরু করেছে। ওকে কখনো অনুভব করিও না যে তুমি ওর দুর্বলতার সুযোগ নিতে চাইছো কিংবা ওকে দয়া দেখাচ্ছো। জানো তো বাবা ভরসার অপর নাম ভালোবাসা বলে আমি মনে করি। আগে ভরসাটা তৈরি হতে দাও।”
“তারমানে আম্মু আমি ওনাকে……”
“থেমে যাও। আগেই এই অনুভূতিকে কোন নাম দিও না। কোন বিষয়ে এত তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিতে নেই। অনেক সময় আছে তোমাদের হাতে। সেই সময়টা কাজে লাগাও।”
তাকদীর বুঝলো তার মায়ের কথা। নিজের ঘরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়ে আবারো থেমে গেল। গুটি গুটি পায়ে পিছনে এসে সন্দেহী গলায় তাহরিমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তোমার কোন আপত্তি নেই?”
তাহরিমা বেগম আলতো হেসে বলল,
“আমি চাই আমার ছেলের সুখ। আর আমার ছেলে নিজের সুখ যেখানে, যার মাঝে খুঁজে পাবে তাতেই আমি সন্তুষ্ট। তোমার জীবন, সিদ্ধান্ত তোমার হবে। আমার বিশ্বাস আমি আমার ছেলেকে যথেষ্ট ভালো শিক্ষা দিতে পেরেছি যে সে ঠিক ভুলের মধ্যে পার্থক্য করতে জানবে। আমার বিশ্বাস আমি আমার ছেলেকে এমনভাবে তৈরি করতে পেরেছি যাতে কোন নারী তাকে নিয়ে গর্ব করতে পারে। তোমায় ভরসা করি আমি বাবা। ঘরে যাও।”
তাকদীর রান্নাঘর থেকে বের হলো ঠিকই তবে নিজের ঘরে আর গেল না। গুটি গুটি পায়ে সদর দরজা খুলে মিলির ফ্ল্যাটের সামনে গেল। কলিং বেল বাজালো কয়েকবার। কিছুক্ষণ পর মিলি এসে দরজা খুলে দিল। সামনে তাকদীরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মিলি একটুও অবাক হলো না। মিলি জানে এমন অসময়ে কেউ আসলে একমাত্র এই ছেলেটাই আসবে। আজেবাজে কোন কথায় না গিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলো,
“কি কাজ?”
মিলির এমন সরাসরি প্রশ্নে তাকদীরের একটুও খারাপ লাগলো না। হেসে হেসেই বলল,
“আপনার সাথে কথা বলতে এলাম সিনিয়র।”
“কি কথা?”
“আজ আমি একটা বিষয় হিসাব করলাম। জানেন তো ফলাফলটাও আমার খুবই পছন্দ হয়েছে।”
মিনি ভ্রুঁ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
“কিসের হিসাব? কিসের ফলাফল? আর সেগুলো আমাকে বলতে এসেছ কেন?”
“কম প্রশ্ন করুন। আমি কি বলছি সেটা শুনুন। আমি হিসাব করে দেখলাম আমি আপনার থেকে গুনে গুনে এক বছর সাত মাস পঁচিশ দিনের ছোট।”
মিলি হেসে উঠে বলল,
“আরে তুমি তো বাচ্চা।”
মুহূর্তের মাঝে তাকদীরের হাসি হাসি মুখটা চুপসে গেল। গাল ফুলিয়ে বলল,
“মাত্র এক বছর সাত মাস পঁচিশ দিনের ছোট হয়ে বাচ্চা হলাম কি করে? আপনি যখন পৃথিবীতে এসে হাঁটতে শিখেছেন তখন আমি সবেমাত্র কান্না শুরু করেছি এইতো পার্থক্য। তবে চিন্তা করবেন না খুব তাড়াতাড়ি আমি বড় হয়ে যাব।”
মিলি আবারো শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“ততদিনে কি আমি ছোট হয়ে যাব নাকি একই বয়সের থাকবো? আমারও বয়স বাড়বে। আমি বুড়ি হয়ে যাব ছেলে।”
“তবে আমিও বুড়ো হয়ে যাব।”
“সেসব কথা বাদ দাও। তার আগে বলো তুমি আমাকে হঠাৎ করে বয়সের পার্থক্যটা কেন বলছো? এসব শুনে আমি কি করবো?”
তাকদীর একটু নড়েচড়ে উঠলো। বুঝতে পারলো ওর ইশারা মিলি কিছুই বোঝেনি।
“এমনি বললাম। আপনাকে মনে করিয়ে দিলাম যে আমি খুব একটা ছোট না। অন্তত আপনি যে কথায় কথায় আপনার ভাইয়ের ছেলের সাথে তুলনা করেন ততটাও ছোট না। আমি যথেষ্ট বড় ম্যাচিউর একটা ছেলে। সবকিছুই করতে পারি।
আমি কারো দায়িত্বও নিতে পারি।”
মিলি আলতো হেসে বলল,
“বাড়ি যাও।”
“যাচ্ছি। এভাবে তাড়িয়ে দেওয়ার কি আছে? অদ্ভুত!”
কথাটা বলে তাকদীর সত্যিই চলে যেতে ধরলে মিলি পেছন থেকে একবার ওর নাম ধরে ডেকে উঠলো।
তাকদীর তৎক্ষণাত পিছন ফিরে তাকিয়ে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,
“হ্যাঁ সিনিয়র বলুন।”
মিলি মলিন হেসে বলল,
“মনে রেখো আমি তোমার থেকে বয়সে বড়, সিঙ্গেল মাদার। পার্থক্যটা বিশাল। এতটাই বিশাল যে পরিমাপ করেও শেষ করতে পারবে না।”
কথাটা বলে মিলি দরজাটা বন্ধ করে দিল। তাকদীর ঠায় সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলো। মিলি যা বোঝাতে চাইলো তাকদীর কি সেসব ঠিক বুঝলো?