রিক্ত বসন্ত

পর্ব - ৩৩

🟢

একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে তন্ময়ের কাছে কল এলো। প্রথমে কিছুক্ষণ নাম্বারটার দিকে তাকিয়ে থাকল তন্ময়। অপ্রত্যাশিতভাবে হঠাৎ করে তন্ময়ের মনে হলো মিলি কল করেনি তো? আচ্ছা মিলি আবার ফিরে আসতে চাইছে না তো? তন্ময়ের মনে হলো হতেই পারে এমনটা। তন্ময়কে ছাড়া তো মিলি থাকতে পারে না।

তন্ময় যেন একেবারে নিশ্চিত হয়ে গেল যে মিলিই ওকে কল করেছে। হয়তো এখন ফিরে আসতে চাইছে আবার। বেশ খুশি খুশি মনে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরতেই অপর পাশ থেকে পরিচিত একটা কন্ঠস্বরই ভেসে এলো। তবে কণ্ঠটা মিলির না, কন্ঠটা জেসির।

জেসি ক্রন্দনরত গলায় বলল,

“আমাকে ফিরিয়ে নাও তন্ময়। আমি ভুল করেছি আমি মানছি। আমি তোমার পায়ে ধরে ক্ষমা চাইতেও রাজি আছি কিন্তু তাও আমায় তুমি ফিরিয়ে নাও। এই নর'ক থেকে আমাকে বাঁচাও।”

জেসির কণ্ঠ শুনে তন্ময় যেমন অবাক হয়েছে ঠিক তেমনি বিরক্তও হয়েছে। একটা মেয়েই তন্ময়ের কাছে ফিরে আসতে চাইছে তবে মেয়েটা মিলি না, তন্ময়ের তথাকথিত ভালোবাসা জেসি ওর কাছে ফিরে আসতে চাইছে। জেসির জায়গায় যদি মিলির কন্ঠটা শুনতো তবে তন্ময় খুশি হত। তবে জেসির কন্ঠটা একদমই পছন্দ হলো না। রাগান্বিত গলায় বলল,

“তুমি কোন সাহসে আমায় ফোন করেছো?আর ভাবলে কি করে যে আমি তোমাকে আবার ফেরত নেব? তোমার স্বামী কই যার হাতে সেদিন আমায় মা'র খাইয়া নিলে?”

“আমি জানি তো আমি ভুল করেছি। মিলি চলে যাওয়ার পর যেমন তোমার মনে হয়েছিল যে তুমি ভুল করেছো ঠিক তেমনি তুমি চলে যাওয়ার পর আমার মনে হয়েছে যে আমি ভুল করেছি। তোমায় ওভাবে ঠকানোটা আমার উচিত হয়নি আমি জানি। তবে এখন আমি তোমার কাছে ফিরে যেতে চাই।”

তন্ময় তাচ্ছিল্য গলায় বলল,

“তুমি ভাবলে কি করে তুমি ফিরে আসতে চাইলেই আমি তোমাকে ফেরত নেব? যে আমাকে একবার ছেড়ে চলে যায় তাকে আমি আবার ফেরত নেই না। মিলি হলে অন্য কথা ছিল।”

“মিলি তোমার কাছে জীবনেও ফিরে আসবে না তাই সে আশা ছেড়ে দাও। তন্ময় আমার কথা বোঝার চেষ্টা করো, দেখো তুমিও জীবনে একা আমিও জীবন একা। আমরা দুজনেই ঠকে গিয়েছি। চলো না আমরা এক হয়ে যাই আবার। আমি এখনো তোমায় ভালোবাসি।”

“চুপ করো তো। তোমার এসব মিথ্যে ভালোবাসার গল্প অন্য কাউকে গিয়ে শুনিও। এসব শুনিয়ে আমাকে গলাতে পারবে না। আর খবরদার যদি কখনো আমায় কল করেছো তো। আমি কিন্তু রাজীবকে বলে দেব।”

জেসি আরো কিছু বলতে চাইলো তবে তন্ময় সে সুযোগ দিলো না। ফোনটা কেটে দিয়ে নাম্বারটা ব্লক করে দিল। রাগ আর বিরক্তির সংমিশনে তন্ময়ের মেজাজটা বেজায় চটে গেল। এদিকে ঘাড়ের উপর এখনো অনেক কাজ, তার মধ্যে আবার লিজা ওর কেবিনে ডেকেছে।

তন্ময় জানে এখন কোন কাজ করাবে না ওকে দিয়ে, চুপচাপ বসিয়ে রাখবে, মাঝে মাঝে ল্যাপটপে আলতু ফালতু জিনিস দেখাবে। কেন? এর থেকে কি তন্ময়কে কাজটা করতে দিলে ভালো হতো না? তাহলে তো অন্তত সময়মতো বাড়ি ফিরতে পারতো। এই মেয়ে তো আর জানে না বাড়ি ফিরে তন্ময় কে আবার নিজের জন্য রান্না করতে হবে, ঘরদোর গোছাতে হবে। উনি তো বাড়ি ফিরে একদম মুখের সামনে গরম গরম খাবার পাবেন। তন্ময়ের কষ্ট উনি কি করে বুঝবেন। বাজে মহিলা।

মনে মনে আরো বেশ কিছু গালি দিলো লিজা কে। নিজের ডেস্কে যাওয়ার জন্য পিছন ফিরে পা বাড়াতে নিয়েই দেখল লিজা দাঁড়িয়ে আছে। লিজা কে হঠাৎ করে দেখে তন্ময় চমকে উঠল। ভয় পেল। ভাবলো লিজা আবার কিছু শুনে ফেলল নাকি? পরক্ষণেই মনে হলো যা বকাঝকা করার কিংবা গালাগালি করার সব তো মনে মনে করেছে তাহলে লিজা শুনবে কি করে? ভাগ্যিস মুখে কিছু বলেনি। তন্ময়ের নিজের ওপরে নিজেরই গর্ব হলো। বেশ বুদ্ধিমান মনে হলো নিজেকে।

লিজা তন্ময়ের দিকে এগিয়ে এসে প্রশ্ন করল,

“গার্লফ্রেন্ডের সাথে ঝগড়া করছিলেন বুঝি?”

তন্ময় বিরক্তির সহিত বলল,

“এক্স।”

“আপনার ওয়াইফের সাথে কোন যোগাযোগ হয় না?”

“না। ও রাখতে চায় না যোগাযোগ।”

“ডিভোর্স হয়েছে আপনাদের?”

“সেসব আপনার না জানলেও চলবে ম্যাডাম।”

“রাগ করলেন? আসলে আপনাকে দেখে অনেক ডিপ্রেসড মনে হচ্ছে। আপনার কথা শুনে যা বুঝলাম আপনার এক্স আপনাকে ঠকিয়েছে। ভাবলাম হয়তো আপনার একটু সঙ্গ দরকার সেজন্য এলাম। আপনি যদি চান তবে আমার সাথে আপনার কষ্টের কথাগুলো শেয়ার করে হালকা হতে পারেন।”

তন্ময় একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“নিজেই তো কষ্ট ডেকে এনেছি তবে হালকা হবো কি করে? আমি যে ভুল করেছি সেসব আমিও জানি তবে আমি তো ভুলটা শোধরানোর চেষ্টা করেছিলাম। মিলিকে বলেছিলাম যেন ফিরে আসে আমার কাছে কিন্তু এলোনা, অপমান করলো আমায়। কি এমন করেছিলাম আমি যে এভাবে অপমান করলো? হ্যাঁ ভুল করেছিলাম। তাই বলে এত বড় ভুল ছিল না যে আর ফিরে আসা যাবেনা আমার কাছে। আমি চলে যেতে বলেছিলাম আবার আমিই তো ফেরত নিতে চেয়েছিলাম। তবে এলে সমস্যা কি হতো? ভালো থাকতো আমার কাছে।”

আসল ঘটনাটা লিজা কোনমতেই বুঝতে পারছে না, আন্দাজও করতে পারছে না কিছু। তন্ময় নিজেই নিজের ভুল স্বীকার করছে আবার নিজেই নিজেকে নিরপরাধ দেখানোর চেষ্টা করছে। তবে ঘটনাটা জানার খুব আগ্রহ তৈরি হলো লিজার মাঝে। তন্ময়কে পেতে হলে তো আগে ওর বিষয়ে সবকিছু জানতে হবে। তন্ময়ের দুর্বলতা জানতে হবে, কি করলে তন্ময় খুশি হবে সে সবকিছু জানতে হবে।

“আমায় কি বলা যাবে তন্ময়? আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি নিজেও জানেন না আপনি কি চান। আমায় বললে হেল্প করতে পারবো। কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যান যে আপনি আমার এমপ্লয়ি, আমি আপনার বস। ফ্রেন্ড হিসেবে আমায় সব বলতে পারেন।”

কথাটা বলে লিজা শক্ত করে তন্ময়ের হাতটা ধরে ওকে ভরসা দিল। তন্ময় বোধহয় বলতে চাইলো। ভেতরে তার অনেক কষ্ট জমা আছে, অনেক আক্ষেপ জমা আছে কিন্তু বলার মতন কেউ নেই। তন্ময়ের কষ্টগুলো শোনার মতন তো এক মিলিই ছিল এখন সেই মিলিও নেই।

রাতে অফিস শেষ করার পর লিজা তন্ময়কে নিয়ে একটা ক্যাফেতে গেল। কফি খেতে খেতে তন্ময় সবকিছু বলল। নিজের ভুলগুলোও অকপটে স্বীকার করে নিল কিন্তু পরক্ষণেই আবার নিজেকে নিরপরাধ প্রমাণ করতেও চাইলো। একটাই অভিযোগ মিলিকে যখন ফিরে আসতে বলল তবে এলো না কেন? তন্ময় ভুল করেছিল ক্ষমাও তো চেয়েছিল, যথেষ্ট নিচু হয়েছিল মিলির সামনে। তবে কি ওকে ক্ষমা করা যেত না?

সব কিছু বলার পর তন্ময় থামলো। একটু হলেও হালকা লাগছে। আবার বিরক্তও লাগছে। এখন মনে হচ্ছে কেন লিজা কে কথাগুলো বলতে গেল? না বললেও পারতো। কে জানে লিজা ওর সম্বন্ধে কি ভাবছে? যদি তন্ময়কে খারাপ ভেবে নেয়?খারাপ ভেবে যদি আবার চাকরি থেকে বের করে দেয় তবে তো না খেতে পেয়ে ম'রবে?

তবে তেমন কিছুই হলো না। বরং লিজা তন্ময়ের পক্ষ নিয়ে বলল,

“একদম ঠিক বলেছেন আপনি। আপনার কোন দোষ নেই। ওনার উচিত ছিল আপনার কাছে আবার ফিরে আসা। উনি কখনো আপনার মনের মতন হয়ে উঠতে পারেনি এতে আপনার কোন দোষ নেই। ওনার উচিত ছিল আপনার মনের মতন হয়ে ওঠা। এত বছরের রিলেশন আপনাদের অথচ উনি কখনো আপনাকে বুঝেই উঠতে পারেননি। আই থিঙ্ক উনি আপনাকে ভালোইবাসতে পারেনি কখনো। আপনার এক্স ওয়াইফ আপনাকে ডিজার্ভই করে না।”

লিজা ভেবেছিল এই কথাগুলো বললে বোধহয় তন্ময় ভীষণ খুশি হবে ওর উপরে। তবে না তেমন কিছুই হলো না। বরং একটু রাগ দেখিয়ে বলল,

“অদ্ভুত তো! আপনি ওকে নিয়ে এসব কেন বলছেন? মিলি আমাকে ভালোবাসে না এই কথাটা যদি মিলি নিজে এসেও আমাকে বলে তাও আমি বিশ্বাস করব না। শুনুন ম্যাডাম আপনাকে আমি সব বলেছি, কেন বলেছি জানিনা। তবে তার মানে এটা না যে আপনি আমার ওয়াইফ কে নিয়ে যা ইচ্ছে তাই বলবেন। আমি বলতেই পারি ওকে নিয়ে কিন্তু আপনাকে বলার অধিকার কে দিয়েছে? আমি দেইনি।”

লিজা ভরকালো। লিজার এখন তন্ময় কে পা'গল মনে হচ্ছে। ছেলেটা নিজেই নিজের বউ সম্বন্ধে খারাপ খারাপ কথা বলছে আবার লিজা বললেই দোষ? বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

“আপনিই তো এখনই আপনার ওয়াইফ কে নিয়ে আজে বাজে কথা বললেন।”

“তো? ও আমার ওয়াইফ, আমি ওকে ভালোবাসি, ও আমাকে ভালোবাসে। আমি বলতেই পারি। আপনি কি ওর কেউ হন? আপনি কি ওকে চেনেন যে আপনি ওর সম্বন্ধে এসব বলছেন? দোষ আমি করেছি সেসব আমি জানি। আর সেটা আমি বুঝতে পেরেছি যখন জেসি আমাকে ঠকিয়েছে। কিন্তু তার মানে এই না আমি ওর সম্বন্ধে অন্য কারো মুখ থেকে কোন বাজে কথা সহ্য করবো।”

লিজা এবারে পরিষ্কারভাবে তন্ময় কে বুঝতে পারল। বুঝলো যে ছেলেটা এখনো মিলিকেই ভালোবাসে। আর শুধু এখন না সবসময় হয়তো মিলিকেই ভালোবেসেছে শুধু সাময়িক মোহে পড়ে গিয়েছিল। কিংবা নিজের ভালোবাসাটা কখনো ঠিকভাবে উপলব্ধিই করতে পারেনি কখনো। বা মিলির প্রতিও সবসময় মোহই ছিল। লিজা বুঝতে পারল ও যেমন মিলির সম্বন্ধে ভালো বললে তন্ময়ের সমস্যা হবে ঠিক তেমনি খারাপ বললেও সমস্যা হবে। সবথেকে ভালো হবে মিলির প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যাওয়া। বরং আলাদাভাবে তন্ময়ের উপর সিম্প্যাথি দেখানো ঠিক হবে।অপরাধী গলায় বলল,

“আই এম রিয়েলি সরি তন্ময়। আমি বুঝতে পারছি আমি আপনাকে হার্ট করেছি। বাট আই প্রমিস আর কখনো করবো না। আসলে আপনার এত কষ্ট আমার সহ্য হচ্ছে না।আপনার অপমান আমার সহ্য হয় না সেখানে আপনার ওয়াইফ আপনাকে এভাবে ইন্সাল্ট করছে ব্যাপারটা আমি মানতে পারছিলাম না সেজন্য ওভাবে বলে ফেলেছি। কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছি আমার বলাটা উচিত হয়নি।”

এবারে তন্ময়ের রাগটাও একটু কমলো। জোরে জোরে কয়েকটা নিঃশ্বাস ছেড়ে একটু শান্ত গলায় বলল,

“দেখুন ম্যাডাম আমি জানি আমাকে আপনার কাছে এখন অদ্ভুত লাগছে,পা'গ'লও লাগতে পারে। আমার আর আমার ওয়াইফের সম্পর্কটা ভীষণ অদ্ভুত পর্যায়ে গিয়েই ঠেকেছে। কিন্তু প্লিজ ওকে নিয়ে কোনো খারাপ কথা বলবেন না। আমি জানি ও মেয়েটা ভালো। সব থেকে ভালো হবে আপনি ওকে নিয়ে কখনো কিছু বলবেনই না।”

“আচ্ছা ঠিক আছে আপনি যেমন চাইবেন তেমনই হবে। আমি কথা দিচ্ছি আপনার অপছন্দ হয় এমন কোন কিছু আমি কখনোই করবো না। আর একটা কথা, প্লিজ আপনি মুড অফ করে থাকবেন না। আপনার মন খারাপ দেখলে আমারও ভালো লাগে না। আর যদি কখনো নিজেকে একা মনে হয় তবে আমাকে একটা কল করে নেবেন। নাহলে আমার বাড়িতে চলে আসবেন আমরা আড্ডা দেবো। আমি প্রমিস করছি, আপনাকে আমি কখনো একা ফিল হতে দেবো না।”

তন্ময়ের হাতের ওপরে হাত রেখে তন্ময় কে ভরসা দিয়ে কথাগুলো বলল লিজা। তন্ময় ভরসা পেল কিনা সেসব জানে না তবে কিছু একটা আন্দাজ করতে পারছে। ওর অনুভূতিটা কেমন সে সব জানে না। তবে বুঝতে পারছে লিজার দিক থেকে অনুভূতিটা ধীরে ধীরে অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে।

_________

সন্ধ্যার দিকে তাহরিমা বেগমের বাপের বাড়ি থেকে খবর এলো ওনার বাবা নাকি ভীষণ অসুস্থ। ওনাকে দেখতে চেয়েছে। খবরটা পাওয়ার সাথে সাথে তাহরিমা বেগম যাওয়ার জন্য উতলা হয়ে উঠলেন। তাকদীরকেও তিনি সাথে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তবে তাকদীর যেতে রাজি হলো না। বলল যে ফোনেই কথা বলে নেবে। তাহরিমা বেগম বুঝলেন তাকদীর কেন যেতে রাজি হতে চাইছে না। তিনিও তাই স্বার্থপরের মতন জোর করলেন না। ওখানে তো তার বাবার খেয়াল রাখার মতন অনেক মানুষ আছে। কিন্তু এখানে যদি মিলির হঠাৎ কোন অসুবিধা হয় তবে কেউ নেই ওর জন্য।শেষে সন্ধ্যায় তিনি তাড়াহুড়ো করে তোহাকে নিয়ে চলে গেলেন।

যাওয়ার আগে মিলিকে সাবধানে থাকতে বললেন। বেশ অনেক কিছু বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন। তাহরিমা বেগম চলে যাওয়ায় মিলির কেন যেন একটু ভয় হচ্ছে এখন। এতদিন অন্তত উনি ছিলেন, মিলির একটু হলেও ভরসা ছিল। এখন নিজেকে একটু হলেও একা লাগছে। তাকদীর আছে ঠিকই তবে ওকে তো আর সবকিছু বলা যাবে না।

ঘড়িতে সময় তখন রাত বারোটার কাছাকাছি। তাকদীর তখন গভীর ঘুমের দেশে তলিয়ে। হঠাৎ করে ফোনটা শব্দ করে কেঁপে উঠলো। তাকদীরের ঘুম ভাঙলো ঠিকই তবে রিসিভ করতে ইচ্ছে করছে না। তবে যখন দেখলো ফোনটা রিং হতেই আছে তো হতেই আছে তখন ফোনটা ধরলো। কোন মতে চোখটা খুললো তবে স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নাম কিংবা নাম্বার কিছুই দেখতে পেল না।ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে ঘুমুঘুমু কন্ঠে বলল,

“কে?”

“হেল্প মি তাকদীর!”

কন্ঠটা যে মিলির সেটা ঘুমের ঘোরেও তাকদীরের বুঝতে একটুও অসুবিধা হলো না। মিলির কন্ঠটা কানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম উড়ে গেল। লাফ দিয়ে উঠে বসে উৎকণ্ঠিত গলায় বলল,

“কি হয়েছে? কিসের সাহায্য করবো?”

“পেটে ব্যথা করছে আমার। প্লিজ সাহায্য করো। হসপিটালে যেতে হবে।”

বিজ্ঞাপন

ঘুমের ঘোরে তাকদীর কারণটা বুঝতে পারল না। অজ্ঞের ন্যয় প্রশ্ন করলো,

“কিন্তু কেন?”

মিলি এবার রাগান্বিত গলায় বলল,

“লেবার পেইন হচ্ছে গাধা।”

এবারও কথাটা বুঝতে তাকদীরের একটু সময় লাগলো। বোঝার সাথে সাথে উৎকন্ঠিত গলায় মিলি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমি আসছি, এক্ষুনি আসছি।”

ফোনটা কানে ধরে উঠে দৌড় দিল। ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়াতেই মনে হলো মিলি তো এখন দরজা খুলতে পারবেনা। দৌড়ে আবার নিজের ফ্ল্যাটে গিয়ে চাবিটা নিয়ে এলো।দরজা খুলে ভেতরে যেতেই দেখল মিলি ছটফট করছে। তাকদীর কি করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। ওর নিজেরই কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগছে। মিলির পাশে গিয়ে বসে অস্থির গলায় বলল,

“কি করব আমি এখন?”

মিলি খিঁচে চোখ-মুখ বন্ধ করে রেখেছে ব্যথায়। এরমধ্যে আবার তাকদীরের এমন প্রশ্ন। নিজেই নিজেকে শক্ত করে বলল,

“অ্যাম্বুলেন্স ডাকো প্লিজ! হসপিটালে যেতে হবে তাকদীর বুঝতে পারছ না?”

এবারে তাকদীরের মস্তিষ্ক একটু ভালোভাবে কাজ করা শুরু করলো। এই সময় অ্যাম্বুলেন্স ডাকলে অনেক সময় লাগবে আসতে। মিলি কে নিয়ে এই মুহূর্তে বাইকে করেও যেতে পারবেনা, একটা গাড়ি লাগবে। মিলিকে একটু অপেক্ষা করতে বলে তাড়াহুড়ো করে নিচে নেমে গেল। সাবাদের ফ্ল্যাটে গিয়ে অনবরত কলিং বেল বাজাতে লাগলো।বাজাচ্ছে তো বাজাচ্ছেই, থামাথামির কোন নামই নিচ্ছে না। একটু পরে ভিতরের মানুষজন হতদন্ত হয়ে ছুটে এলো। সাবার মা, বাবা, সাবা তিনজনেই এসেছে। দরজা খুলতেই তাকদীর সাবার মা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আন্টি প্লিজ আপনি সাবা কে নিয়ে একটু উপরে মিলির ফ্ল্যাটে যান। ওর লেবার পেইন হচ্ছে। আমি গাড়ি আনতে যাচ্ছি ততক্ষণ একটু ওকে তৈরি দিয়ে সাথে কি কি দিতে হবে না দিতে হবে একটু গুছিয়ে দিন আন্টি প্লিজ।আর গোছানো হয়ে গেলে দুজনে মিলে ওনাকে ধরে একটু নিচে নামিয়ে আনুন আন্টি।”

কথাটা বলে তাকদীর গাড়ি আনতে গেল।ভদ্রমহিলা দেরি করলেন না। মেয়েকে নিয়ে তাড়াতাড়ি উপরে গেলেন।

প্রায় মিনিট দশেকের বেশি সময় পর তাকদীর একটা অটো নিয়ে এলো। দেখলো মিলি নিচে একটা চেয়ারে বসে থেকে ব্যথায় আর্তনাদ করছে। কোন রকমের কোন সময় ব্যয় না করে সাবা আর ওর মা মিলিকে গাড়িতে তুলে দিতে বলে নিজে আবার ছুটে ওপরে গেল। খুব দ্রুত আবার নেমেও এলো। তাকদীর ওনাদেরকেও সাথে যেতে বললেন তবে এই রাতে উনি যেতে চাইলেন না। শেষে বলল যেন অন্তত সাবাকে পাঠায় কিন্ত ভদ্রমহিলা তাতেও আপত্তি জানালেন। জায়গাটা ভালো না, এই রাতের রাস্তায় উনি মেয়েকে কোনমতেই পাঠাতে রাজি না।

মিলি তাকদীর কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কাউকে প্রয়োজন নেই তাকদীর। যদি তোমার যেতে অসুবিধা হয় তাহলে প্লিজ তুমিও থেকে যাও, গাড়ি এনে দিয়েছো এতটুকুর জন্যই ধন্যবাদ।”

“আমার কোনো অসুবিধা নেই। ঠিক আছে কাউকে লাগবে না, চলুন।”

_______

সময় রাত দুটোর কাছাকাছি। নার্স পেশেন্টের বাড়ির লোকের খোঁজ করতে এলে তাকদীর এগিয়ে গেল। নার্স ব্যস্ত গলায় বলল,

“আপনি কি ওনার হাজবেন্ড? ডেলিভারি বিষয়ে কথা ছিল?”

তাকদীর কিয়ৎক্ষন থমকায়। নিজেকে স্বাভাবিক করে বলে,

“না।”

“তবে ওনার হাজবেন্ড কে ডাকুন নাহলে পরিবারের অন্য কাউকে ডাকুন। আপনি কি ফ্যামিলির কেউ?”

তাকদীর খুব দ্রুত উত্তরে বলল,

“ওনার হাজবেন্ড নেই। আমিই ওনার ফ্যামিলির লোক। কি হয়েছে আমায় বলুন?”

“বাচ্চার পজিশন ঠিক নেই। এছাড়া বাচ্চার হার্টবিটও কমে আসছে, পেশেন্টও খুবই দূর্বল। ওনার শরীরের যা কন্ডিশন নরমাল ডেলিভারি সম্ভব না। সিজার করতে হবে।”

তাকদীর আতঙ্কিত গলায় বলল,

“তো গিয়ে বের করুন না ওকে পেট থেকে।হার্টবিট কমে গেছে আর আপনারা আমার কাছে এসেছেন কেন? অদ্ভুত!”

“কাম ডাউন। এখানে কিছু মেডিসিনের নাম লেখা আছে নিচ থেকে নিয়ে আসুন ইমিডিয়েটলি।”

তাকদীর একটা সেকেন্ডও ব্যয় করলো না।দৌড়ে নিচে চলে গেল। মেডিসিন গুলো নিয়ে এসে নার্সের হাতে ধরিয়ে দিয়ে তাড়া দিয়ে বলল,

“এবার যান। তারাতাড়ি বাচ্চা কে বের করুন।আর প্লিজ দেখবেন পেশেন্টের যেন বেশি কষ্ট না হয়।”

নার্স চলে গেল। তাকদীর দীর্ঘক্ষণ অপারেশন থিয়েটারের বাইরে পায়চারি করলো। ভীষণ চিন্তা হচ্ছে। আগে তো শুধু মিলি কে নিয়ে চিন্তা হচ্ছিলো কিন্তু এখন এই নার্স এসে বাচ্চাটা কে নিয়ে যা ভয় দেখিয়ে গেল তাতে তাকদীরের চিন্তা আরো দ্বিগুন হয়ে গেছে।

বেশ অনেকটা সময় পর একটা বাচ্চার কান্নার আওয়াজ তাকদীরের কানে এলো।চমকে উঠলো তাকদীর। বুঝতে পারছে না আওয়াজটা কোথায় থেকে আসছে।কিছুক্ষনের প্রচেষ্টার পর দেখলো আশেপাশে আর কোনো বাচ্চাকেই দেখা যাচ্ছে না।তারমানে….

বাকি হিসেবটা তাকদীর খুব সহজেই মিলিয়ে নিল। তাকদীর জানে না কেন তবে ভীষণ আনন্দ হচ্ছে ওর। একটা অদ্ভুত রকমের চাপা উত্তেজনা কাজ করছে তাকদীরের মাঝে।নিজেও জানে না ওর এতটা খুশির কারণ কি। তবে হ্যাঁ ভীষণ আনন্দ হচ্ছে। মনটা এখন মিলির বাচ্চা কে দেখার জন্য উতলা হয়ে উঠেছে।

আরো বেশ কিছুক্ষন পর একজন নার্স এলো।এর আগেরবার যিনি এসেছিলেন তিনি না অন্য জন। ওনার হাতে তোয়ালে তে প্যাঁচানো কিছু একটা আছে। তাকদীর বুঝলো এটাই মিলির সন্তান। নার্স সেখানে একমাত্র তাকদীরকেই দেখতে পেয়ে ওর দিকে এগিয়ে এসে আলতো হেসে বলল,

“অভিনন্দন। আপনি ছেলে সন্তানের বাবা হয়েছেন।”

তাকদীর অবুঝের ন্যয় প্রশ্ন করলো,

“হ্যাঁ?”

“বললাম আপনার ছেলে হয়েছে। এই যে আপনার ছেলে, কোলে নিন।”

তাকদীর কিছু বলল না, চুপচাপ হাত বাড়ালো। নার্স খুব সাবধানে বাচ্চাটাকে তাকদীরের কোলে দিল।এতো ছোট বাচ্চা তাকদীর বোধহয় এর আগে কখনো কোলে নেয়নি, আজই প্রথম। অভ্যাস না থাকায় ঠিক ভাবে নিতেও পারছে না। নার্স একটু চিন্তিত গলায় বলল,

“আপনি তো নিতেই পারছেন না। আর কেউ আসেনি আপনার সাথে?”

তাকদীর দু দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“না। আমি পারব কোলে নিতে, চিন্তা করবেন না।”

“দেখবেন পড়ে যেন না যায় আবার।”

তাকদীর আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,

“পড়বেনা। মিলি মানে ওর মা কেমন আছে?”

নার্স হালকা চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,

“অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছে, অক্সিজেনেরও সমস্যা হচ্ছে। চিন্তা করবেন না, ডাক্তার দেখছেন।”

তাকদীর আতঙ্কিত গলায় বলল,

“ঠিক হয়ে যাবে তো উনি? বলেছিলাম আপনাদের ওনাকে বেশি কষ্ট দেবেন না।”

নার্স আবারো আলতো হেসে বলল,

“চিন্তা করবেন না, ঠিক হয়ে যাবে।”

কথাটা বলে নার্স চলে গেল। তাকদীর গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে বসলো।তোয়ালের মাঝে থাকা ছোট্ট মুখটার দিকে একবার তাকালো। চোখ বন্ধ করে আছে।গায়ের রং লাল লাগছে দেখতে। তাকদীর ভয়ে ভয়ে একবার আঙুল দিয়ে আলতো করে ওর গাল ছুঁয়ে দিল। এত নরম গাল এর আগে তাকদীর কখনো স্পর্শ করেনি। ছোট্ট হাতটা একবার ছুঁয়ে দেখলো।সেই সাথে মনে পড়লো নার্সের বলা কথাটা যে ও তাকদীরের ছেলে। উনি না জেনেই কথাটা বলেছে তবে তাকদীরের মনে সেই ইচ্ছেটাই জেঁকে বসলো।

বিজ্ঞাপন
রিক্ত বসন্ত গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস