চার মাস পর………
“ঢাকা আসতে পারবি?”
মাহবুবের হঠাৎ এমন প্রশ্ন মিলি খানিকটা চমকে উঠে বলল,
“কেন? কাগজপত্র সব তৈরি করে তুমি পাঠিয়ে দিয়ো আমি সাইন করে দিয়ে দেব।”
“সেজন্য না। মা খুব অসুস্থ। হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি। তোকে আর অয়ন কে একবার দেখতে চাইছে।”
“আম্মু অসুস্থ কই তুমি আমায় বলোনি তো?”
“গতকাল রাতে ভর্তি করিয়েছি। সময় পাইনি তেমন সারাদিন ব্যস্ত ছিলাম। আর তাছাড়া তোকে বললে তুই চিন্তা করতি। কিন্তু এখন মা দেখা করতে চাইছে তোদের সাথে।”
“কিন্তু বাবা? আমাকে আর আমার ছেলেকে দেখলে যদি আবার বাবা অসুস্থ হয়ে যায়?”
“বাবা কিছু বলবেনা। আমি যখন বললাম তোদেরকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করব তখন বাবা চুপই ছিল।”
মিলি একটু অবাক হয়ে বলল,
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
মিলি ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“মা কে একবার ফোন দেওয়া যাবে?”
“আমি অফিসে আছি এখন। রাতে গিয়ে কথা বলাবো।”
মিলি একবার ঘড়িতে সময় দেখে নিল। বিকেল চারটা বাজে। মাহবুব কে বলল,
“না আজ আর কথা বলানোর দরকার নেই। কাল বরং সামনাসামনি কথা বলব।”
“আচ্ছা আমি গাড়ি পাঠাচ্ছি।”
“দরকার নেই ভাইয়া, আমি বাসে চলে যাব।”
“বাসে একা একা কি করে আসবি একটা বাচ্চা কে নিয়ে? এত রাতে একা আসার কোন দরকার নেই। আমি গাড়ি পাঠাচ্ছি গাড়িতে আসবি।”
“অভ্যাস হয়ে গেছে আমার ভাইয়া গাড়ি ছাড়া যাতায়াত করার, তাও অনেক দিন আগে থেকেই। আমি এখন একা একা অনেক কিছুই পারি। আর এখান থেকে সামান্য ঢাকা যেতে পারবো না? তুমি চিন্তা করো না আমি ঠিক চলে যাব।”
মাহবুব জোর করল না আর। ফোনটা রাখতে ধরলে মিলি একবার ডেকে উঠলো,
“হ্যাঁ বল।”
“আমি কিন্তু সোজা নীলিমাদের বাড়ি যাবো। তারপর ওখান থেকে হাসপাতালে মা কে দেখে আবার চলে আসব।”
মাহবুব এবারে হালকা রাগী কণ্ঠে বলল,
“তোর নিজের বাড়ি থাকতে অন্যের বাড়িতে উঠতে যাবি কেন? আমি বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করবো।”
“যদি তুমি আমাকে তোমাদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য জোর করো তবে কিন্তু আমি ঢাকাতেই যাব না ভাইয়া। আমি নীলিমাদের বাড়িতেই উঠবো। ঢাকায় আমার নিজের কোন বাড়ি নেই, এই পৃথিবীর কোথাও আমার নিজের কোন বাড়ি নেই। সব সময় আমার অন্যের বাড়িতেই থাকতে হয়েছে।”
“আমি কিন্তু এবারে রেগে যাব মিলি।”
“রাগ করতে পারো তুমি। রেগে আমায় বকাও দিতে পারো আমি কিছু মনে করব না। কিন্তু আমি ওই বাড়িতে যাব না।”
মাহবুব এবার আর কিছু না বলে ফোনটা কেটে দিল। মিলিও আর ফোন করলো না। ভাবলো পরে রাগটা যখন ঠান্ডা হবে তখন না হয় ভালো করে বোঝানো যাবে।
অয়ন ঘুমোচ্ছে। এই সুযোগে ওকে রেখে একবার তাকদীরদের ফ্ল্যাটে গেল। কলিংবেল বাজাতেই তাকদীর এসে দরজা খুলে দিল।মিলিকে দেখে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“আরে আমার বাড়ির দরজায় পূর্ণিমার চাঁদ এসেছে যে!”
মিলি হেসে উঠে বলল,
“আমি পূর্ণিমার চাঁদ তোমায় কে বলল? আমি হলাম অমাবস্যা, বুঝলে জুনিয়র?”
তাকদীর বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,
“আপনি সবসময় চার লাইন বেশি বোঝেন। একা কেন এসেছেন? আমার জুনিয়র কোথায়?”
“ঘুমোচ্ছে। আমার একটু আন্টির সাথে দরকারি কথা ছিল।”
“ও ঘুমোচ্ছে আর আপনি ওকে একা রেখে চলে এলেন? যদি উঠে কান্নাকাটি করে, যদি বিছানা থেকে পড়ে যায় তখন কি হবে ভেবে দেখেছেন? আপনিও না কিচ্ছু বোঝেন না।”
কথাটা বলে মিলিকে পাশ কাটিয়ে তাকদীর মিলির ফ্ল্যাটে চলে গেল অয়নের কাছে। মিলিও সেসব নিয়ে আর ভাবলো না। সোজা তাহরিমা বেগমের রুমে গেল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দেখল বিছানায় হেলান দিয়ে শুয়ে আছেন তিনি। বিরক্ত করতে মন চাইলো না মিলির তবে এখন বিরক্ত না করে উপায় নেই।
“আন্টি!”
মিলির কন্ঠটা কানে যেতেই তাহরিমা বেগম চোখ খুলে দরজার দিকে তাকালেন। মিলিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে উঠে বসে ভিতরে আসার জন্য অনুমতি দিলেন। মিলি ভিতরে এসে বিছানায় বসে বলল,
“একটা দরকারি কথা ছিল আপনার সাথে আন্টি।”
“হ্যাঁ বল।”
“আসলে আন্টি আমার মা খুব অসুস্থ। আমাকে আর অয়নকে দেখতে চেয়েছে। আমি তাই ভাবছি আজ রাতে ঢাকা যাব। দুদিনের ছুটি দেওয়া যাবে কি কলেজ থেকে?”
তাহরিমা বেগম একটু ভেবে বললেন,
“ঠিক আছে। তুমি শুধু একটা লিখিত দরখাস্ত জমা দিয়ে যেও।”
“আচ্ছা ঠিক আছে আন্টি সেসব আমি করে দেবো। দুদিনের বেশি ছুটি লাগবে না।”
“সেসব নাহয় ঠিক আছে কিন্তু তুমি একা একা যাবে? তোমার ভাইকে আসতে বললেই হতো!”
“না তার কোন দরকার হবে না। আমি চলে যেতে পারবে একা।”
“কোথায় যাবেন আপনি একা?”
দরজার কাছ থেকে তাকদীরের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। মিলি পিছন ফিরে তাকাতেই দেখল তাকদীর অয়ন কে নিয়ে চলে এসেছে। প্রথম দিন যে ছেলেটা ঠিক করে কোলেও নিতে জানতো না বাচ্চা কে সে এখন বেশ পারদর্শী হয়ে উঠেছে।
তাকদীর মিলির দিকে এগিয়ে এসে বলল,
“দেখেছেন আমি বলেছিলাম যদি উঠে যায়। আমি গিয়েই দেখি উঠে পড়েছে।”
মিলি অয়ন কে কোলে নিয়ে বলল,
“ভালো করেছো ওকে নিয়ে এসে। ধন্যবাদ তোমায়। “
“সেসব নাহয় ঠিক আছে কিন্তু আপনি একা যাবেন কোথায়?”
“ঢাকা যাব।”
“কেন?”
“আমার মা অসুস্থ।”
“তো একা যাবেন কি করে অয়ন কে নিয়ে?”
“না যেতে পারার কি আছে? আমি ঢাকা থেকে সিলেট একাই এসেছিলাম, তখনও অয়ন আমার সাথে ছিল।”
“কবে যাবেন?”
“আজ রাতে।”
“তাও আবার রাতের বেলা আপনি একা যাবেন? অসম্ভব। আমি কোন মতেই আপনাকে একা ছাড়তে পারবো না। আমি রেখে আসবো আপনাদেরকে ঢাকায়।”
“পা'গল নাকি তুমি? চলে যেতে পারবো আমি একা।”
“আমি পা'গল সেই জন্যই যাবো। আমি যখন বলেছি যাব তার মানে যাব। আপনি একা যেতে পারবেন না।”
“তোমাকে আমি সঙ্গে করে নিয়ে গেলে তবে তো যাবে। বলছি তো আমি একা যাতায়াত করতে পারি। আমি তোমার থেকে বয়সে বড় তাকদীর, তোমার থেকে অভিজ্ঞতাও আমার বেশি।”
তাকদীর আবারো বিরক্তিকর কন্ঠে বলল,
“সব সময় এত বয়সে বড়, বয়সে বড় বলে চেঁচাবেন না তো। কি এমন বয়স আপনার? কথা শুনে তো মনে হয় আপনি আমার থেকে দশ বছরের বড়। ওই তো দেড় বছরের বড় হবেন।”
“দেড় বছরের বড় হই কিংবা দেড় মাসের বড় হই তবুও আমি তোমার থেকে বয়সে বড়।আন্টি আপনার এই পা'গল ছেলেকে বোঝান তো।”
কথাটা বলে মিলি চলে গেল। তাকদীর অভিযোগের কন্ঠে তাহরিমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আম্মু তুমি কিছু বলবে না? একা একা কি করে যাবেন উনি?”
তাহরিমা বেগম গম্ভীর গলায় ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“মিলি পারবে। তোমায় এত চিন্তা করতে হবে না। তুমি ঘরে যাও, অযথা ওকে বিরক্ত করো না।”
“বাহ! এখন সব দোষ আমার হয়ে গেল। হ্যাঁ আমিই তো সবাইকে বিরক্ত করি, যত নষ্টের মূল সব তো আমি। সবার যত অশান্তির কারণ সব আমি, সব দোষ এই তাকদীরের।”
কথাটা বলে গটগট পায়ে হেঁটে তাকদীর নিজের ঘরে চলে গিয়ে ঠাস করে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিল। মিলি তখনো সদর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। কথাগুলো সবই ওর কানে গেল। তাকদীরের দরজা বন্ধের শব্দটাও ওর কানে গেল। কিন্তু মিলির কিছু করার নেই।
মাঝে কেটে যাওয়া এই চারটা মাসে তাকদীর কম চেষ্টা করেনি নিজের মনের কথা মিলিকে বোঝানোর। এমনটা না যে মিলি বোঝেনি। বুঝেও না বোঝার ভান করেছে। মাঝে মাঝে কিছু কথায় কান দিতে নেই, মাঝে মাঝে কিছু অনুভূতিকে প্রশ্রয় করে দিতে নেই। আর মিলির প্রতি তাকদীরের অনুভূতি তো নিষিদ্ধ।
_________
তাকদীর কে নিজের সাথে ঢাকা পর্যন্ত নিয়ে আসতে মিলি রাজি হয়নি ঠিকই তবে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত নিয়ে আসতে হয়েছে। এতোটুকু রাস্তা ছেলেটা কোনমতেই ছাড়েনি আর। মিলিও এতোটুকু পথ সাথে আসতে আর বাধা দেয়নি। অন্তত একটু শান্ত করা যাবে ছেলেটাকে।
একটা মাঝারি সাইজের ব্যাগে মিলি নিজের জামা কাপড় সহ অয়নের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুলো গুছিয়ে নিয়েছে। গাড়ি থেকে নেমে তাকদীর আগে মিলির কোল থেকে অয়নকে নিতে চাইলো। মিলি আপত্তি জানালে তাকদীর ধমক দিয়ে বলল,
“হাঁটতে পারবেন না আপনি ওকে নিয়ে। বেশি কথা না বলে চুপচাপ দিন।”
মিলি দিয়ে দিল অয়নকে তাকদীরের কোলে। রাস্তা পার হতে হবে। তাকদীর মিলির হাত থেকে ব্যাগটা জোর করে কেড়ে নিয়ে আদেশের কন্ঠে বলল,
“আমার পিছন পিছন আসুন। একদম আগে আগে দৌড় দেবেন না।”
মিলি চোখ ছোট ছোট করে তাকদীরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি রাস্তা পার হতে জানি।”
“জানেন তো কি হয়েছে? আমার পিছন পিছন কি আসা যাবে না? আমি রাস্তা পার করে দিলে সমস্যা কি? আপনার যত সমস্যা সব আমায় নিয়ে। আমি কিছু করতে চাইলেই দোষ। চুপচাপ আসুন।”
ছেলেটা বেশি ধমকাধমকি করে আজকাল মিলিকে। আগে যেটুকু ভয় পেত এখন আর সেই ভয়টুকুও পায় না। এখন মিলি বকলে, চোখ গরম করে তাকালেও ছেলেটার কিচ্ছু যায় আসেনা।
বাসে ওঠার আগ পর্যন্ত তাকদীর অয়ন কে কোলে নিয়ে থাকলো। এদিকে বাস ছেড়ে দেওয়ার সময় হলে মিলি অয়ন কে নিতে চাইলে তাকদীর অসহায় কন্ঠে বলল,
“ওকে না নিয়ে গেলে হয় না? আমাকে দিয়ে যান না ওকে!”
“তুমি কি করে সামলাবে ওকে? সারাদিন ওর মায়ের প্রয়োজন না হলেও রাতে প্রয়োজন পড়ে।”
“আমি সামলে নেব ওকে, আম্মুও আছে তো। আপনিও চলে যাচ্ছেন, ওকেও সাথে করে নিয়ে যাচ্ছেন আমি থাকবো কি করে?”
“অভ্যাস করে নাও। সারা জীবন তো আর আমরা তোমাদের সাথে থাকবো না। এমন কোন কিছুর অভ্যাস বানাতে নেই তাকদীর যা তুমি সারা জীবন তোমার পাশে পাবে না।”
তাকদীর একটু জোর দিয়েই বলল,
“সেই ব্যবস্থা আমি করে নেব।”
আর সময় নেই, বাস ছেড়ে দেবে। অয়নকে মিলি নিয়ে বাসে উঠতে ধরলে তাকদীর পেছন থেকে মিলির হাত টেনে ধরল। মিলি চমকালো। তাকদীরের হাতের মাঝে থাকে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কি হলো আবার?”
“আবার ফিরবেন তো আপনারা আমার কাছে? আমাকে ভুলে গিয়ে ওখানে আবার থেকে যাবেন না তো? এই কয়দিনে যদি অয়ন আমায় ভুলে যায়? আপনার ভাই যদি আপনাকে আর আসতে না দেয়?”
“এমন কিছুই হবে না। আমি ছোট বাচ্চা না যে কেউ আমাকে আটকে রাখতে পারবে।একমাত্র একজন মানুষই আমায় বাঁধতে পেরেছিল। যখন তার বাঁধন ছেড়ে চলে আসতে পেরেছি তবে সবার বাঁধন ছেড়েই চলে আসতে পারবো। আর অয়ন ভুলে যাবে কেন তোমায়? আমরা মাত্র দুদিনের জন্য যাচ্ছি।”
“বললাম ওকে দিয়ে যান আমার কাছে।”
“ও থাকতে পারবে না এখন। আরেকটু বড় হলে সত্যিই দিয়ে যেতাম তোমার কাছে।”
“আমি ভিডিও কল দিলে রিসিভ করবেন আপনি?”
“ঠিক আছে করব। এখন যাই বাস ছেড়ে দেবে।”
“তাড়াতাড়ি আসবেন কেমন? আমি অপেক্ষায় থাকবো আপনাদের। আপনাদের ছাড়া থাকতে পারি না আমি এখন আর।আপনার সাথে সাথে জুনিয়রেরও অভ্যাস হয়ে গেছে আমার। আপনার আমাকে ছাড়া থাকতে কষ্ট হবে না, তাই না?
মিলি তাকদীরের হাতের বাঁধন থেকে নিজের হাতে ছাড়িয়ে নিয়ে আলতো হেসে বলল,
“এখন আর আমি এমন কোনো অভ্যাস বানাই না তাকদীর যা আমার জন্য নিষিদ্ধ।আসি। কাল তো তোমার বড় মামা আসছে। ফিরে এসে তোমার বিয়ের মিষ্টি খাব।”
কথাটা বলে মিলি বাসে উঠে গেল। বাসটা ছাড়ার পর জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে মিলি আরো একবার তাকদীর কে বিদায় জানালো। বাসটা দৃষ্টি সীমানার বাইরে যাওয়ার পর পর্যন্ত তাকদীর ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকল। কেমন যেন একটা শূন্যতা অনুভব করছে তাকদীর। মনে হচ্ছে কি যেন তাকদীরের থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। হয়তো তাকদীরের ভালো থাকার কারণ, হয়তো তাকদীরের বেঁচে থাকার অন্যতম একটা কারণ।
_________
জ্যামের মধ্যে বেশ অনেকক্ষণ হলো মাহবুবের গাড়িটা আটকে আছে। বিরক্ত লাগছে এখন। আজ সারাটা দিন ছোটাছুটি করতেই গেছে। একটা মুহূর্তের জন্য একটু বিশ্রাম পায়নি। ভেবেছিল বাড়ি গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে তারপর আবার হাসপাতালে যাবে কিন্তু এই জ্যাম সব সময় নষ্ট করে দিচ্ছে। দম বন্ধ লাগছে এখন গাড়ির ভেতরে। আরো আধ ঘন্টাটেও এই জ্যাম ছাড়বে কিনা কে জানে।
গাড়ির কাঁচ নামিয়ে মাহবুব একবার বাইরে তাকালো। চোখ পড়লো ফুটপাতের উপরে বসে থাকে এক ব্যক্তির উপর। রাত হয়ে গেছে, চারপাশটা অন্ধকার তবে ফুটপাতের ধার দিয়ে বসা কিছু দোকানের কৃত্রিম আলোয় মানুষটার মুখ একটু দেখা যাচ্ছে। মাহবুবের একবার মনে হলো লোকটা তন্ময়।তবে নিশ্চিত হতে পারছে না ওটা তন্ময় কিনা। আরো কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণের পর এবারে নিশ্চিত হতে পারলো যে ওটা তন্ময়। কিন্তু কথা হলো ও এভাবে ফুটপাতের উপর বসে আছে কেন এমন নোংরা জায়গায়?
মাহবুবের কৌতুহল হলো একবার গিয়ে দেখার। অনেকগুলো দিন পর আবার তন্ময়কে দেখল। তন্ময়ের অবস্থা এখন কেমন সেটা জানারও কৌতুহল হলো। গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে গেল তন্ময়ের দিকে।
“এখানে এই ভাবে বসে আছো কেন?”
হঠাৎ কারো কণ্ঠস্বর পেয়ে তন্ময় মাথা তুলে তাকালো। দেখল মাহবুব দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষ কোনো হেলদোল দেখা গেল না তন্ময়ের মাঝে। খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“কেন? এটা কি আপনার জায়গা যে আমার বসে থাকা মানা?”
মাহবুব একটু থতমত খেল। একেই তো ছেলেটার মুখ চোখের অবস্থা ঠিক নেই তার মাঝে আবার এমন অদ্ভুত কথা।
“সেজন্য বলিনি। ত্যাড়ামো কথাবার্তা এখনো যায়নি তোমার।”
“নিজের বলতে তো এক ওই ত্যাড়ামিই কাছে আর তো কিছু নেই।”
“কি হয়েছে তোমার? দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে ঝগড়া হয়েছে নাকি? বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে?”
তন্ময় এবার তেঁতে উঠে বলল,
“সব সময় এত খোঁচাবেন না তো আমায়। সবাই খোঁচানোর জন্য এক আমাকেই পায়।কি সমস্যা? করিনি বিয়ে তাহলে বউ আসবে কোথা থেকে? আমার বাড়ি আমি যখন ইচ্ছে তখন যাব। কারো সাহস নেই আমাকে আমার বাড়ি থেকে বের করে দেবে, বুঝতে পেরেছেন?”
তন্ময়ের এত বেশি রেগে যাওয়ার কারণটা মাহবুব ঠিক বুঝলো না। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“হয়েছেটা কি তোমার?”
তন্ময়ের রাগটা আবার টুপ করে নিভে গেল।ফোঁস করে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলল,
“আপনাকে কিছু বলতে চাই, শুনবেন? শুনলে আপনার ভালো লাগবে। আপনি খুশি হবেন।আমার কিছু আফসোসের কথা বলব শুনবেন?”
“আফসোস হয় তবে তোমার?”
“কেন আমাকে কি মানুষ মনে হয় না যে আমার আফসোস হবে না?”
“আমার বোনের ছেলে হয়েছে জানো?”
“কি ভেবেছেন খবর পাবো না আমি? আমার কান অব্দি ঠিক খবর চলে এসেছে যে আমার ছেলে হয়েছে।”
“লজ্জা করলো না নিজের ছেলে বলতে?”
“আপনার লজ্জা করলো না শুধুমাত্র আপনার বোনের ছেলে বলতে? ও কি এমনি এমনি এলো নাকি পৃথিবীতে?”
মাহবুবের কাছে এখন তন্ময়কে আস্ত একটা পা'গল বলে মনে হচ্ছে। একেই তো গায়ের পোশাক আশাকের ঠিক নেই। শার্টের উপরের দুটো বাটন খোলা, এক হাতা কনুই অব্দি গোটানো আর এক হাতা ভাঁজ করা নেই।শার্টটা বোধহয় ইন করেই পরেছিল তবে এখন তার অস্তিত্ব খুব একটা বোঝা যাচ্ছে না। চুলগুলো অগোছালো, শুষ্ক ঠোঁট আর ক্লান্ত দুটো চোখ দেখে মনে হচ্ছে অনেকদিন হলো ঠিক করে ঘুম হয় না।
তন্ময় এবার মাহবুবকে নিজের পাশে বসতে ইশারা করলো। মাহবুব বসলো না। গম্ভীর গলায় বলল,
“দাঁড়িয়ে থেকেই শুনছি। বলো তোমার আফসোসের কথা। সত্যি শুনলে আমার ভালো লাগবে।”
তন্ময় কিছু বলল না। হাতে থাকা একটা ফাইল মাহবুবের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“এটা দেখুন তাহলে আপনার জীবন অর্ধেক ধন্য হয়ে যাবে।”
মাহবুব ফাইলটা হাতে নিয়ে ভেতরে কিছু কাগজপত্র দেখল। উপরে নামের জায়গায় দেখল তন্ময়ের নামটাই লেখা। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“তোমার মানসিক সমস্যা আছে?”
“ছিল না তবে এখন হচ্ছে। সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে এখন নিয়মিত যাতায়াত করছি। আমার কি রোগের কথা বলেছে জানেন?”
“কি?”
“পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসওর্ডার।কেন হয় এই সমস্যা জানেন?”
“কেন?”
“অত কিছু জেনে আপনার লাভ নেই। আমার সাথে কি হয় সেসব বলি। সিয়াম আমার হোয়াটসঅ্যাপে একটা ছবি পাঠিয়েছিল আমার ছেলের। ছেলেটা দেখতে আমার মতনই হয়েছে। হবেই না বা কেন? আমার ছেলে কি অন্য কারো মতন হবে নাকি।তারপর আমি মাঝে মাঝে ছবিটা বের করে দেখতাম। তারপর আমি হঠাৎ করে একদিন দেখা বন্ধ করে দেই যখন বুঝতে পারি যে আমার ওর প্রতি মায়া জন্মাচ্ছে।”
“তারপর?”
“তারপর আর কি আমি ওকে দেখা বন্ধ করলাম কিন্তু ও আমাকে দেখা দেওয়া বন্ধ করলো না। আমার হ্যালুসিনেশন হতে লাগলো। রাতে হঠাৎ করে আমার ঘুম ভেঙে যেত বাচ্চার কান্নার আওয়াজে। বাড়িতে বসে থাকলে মনে হতো ঘরের ভেতর দিয়ে কোন ছোট বাচ্চা ছোটাছুটি করছে। রাতে ওর মুখটা আমি স্বপ্নে দেখি তখন আমার ঘুম ভেঙে যায়। মাঝে মাঝে মনে হয় কেউ আমায় ডাকছে। মাঝে মাঝে মিলি কেও দেখতে পাই অথচ ওরা কিন্তু কেউ নেই।”
“অপরাধবোধ হয় এখন?”
“অপরাধবোধের জন্যই তো এমন হচ্ছে আমার। কেন আমাকে দেখে বুঝতে পারছেন না আমি ভালো আছি কি খারাপ আছি?আচ্ছা আপনি বলুন নিজের ভুলে যদি কেউ নিজের জীবনের সুখ হারায় তবে কি সে ভালো থাকতে পারে?”
“একদম ঠিক বলেছো নিজের ভুলে তুমি সবকিছু হারিয়েছো। তাহলে এখন এতো আফসোস করছো কেন?”
“আফসোস করতেও পারবো না?”
“যে আফসোস করে লাভ নেই সে আফসোস করার দরকার কি? তোমায় আমি বলেছিলাম যে ফিরে এসো, তুমি তখনো ফিরে আসোনি। আমার বোন তোমায় কত বুঝিয়েছে, আমি অনুরোধ করেছি কিন্তু তাও তুমি ফিরে আসোনি। তোমার কি মনে হয় না এই সব কিছু তোমার প্রাপ্য?”
“ঠিক সেই জন্যই মিলির কাছে আর কখনো ফিরে যাইনি, বুঝতে পেরেছেন? যাইহোক মিলি কেমন আছে? ছেলের নাম কি রেখেছে? আমার নামের সাথে মিলিয়ে রেখেছে কি?”
মাহবুব এবার কিঞ্চিৎ বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,
“তুমি কি সত্যি পা'গল হয়ে গেছো? লজ্জা করে না মিলির খোঁজ নিতে? আর তোমার নামের সাথে মিলিয়ে নাম রাখতে যাবে কেন ওর ছেলের?”
তন্ময় হেসে মাহবুবের কথাটা হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ও আমার নামের সাথে মিলিয়েই রাখবে আমি জানি।”
“মিলির ছেলের নাম মিলি রাখেনি অন্য কেউ রেখেছে।”
তন্ময়ের কপালে সুক্ষ্ম ভাঁজের সৃষ্টি হলো। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কে রেখেছে?”
“রেখেছে কেউ একজন। মিলির জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ যার জীবনেও মিলির সমান গুরুত্ব আছে।”
“মিলি বিয়ে করেছে?”
বেশ স্বাভাবিক কন্ঠে তন্ময় প্রশ্নটা করলো তবে ভেতরে বয়ে গেল তুমুল একটা ঝড়। কে জানে কি উত্তর শুনতে হবে।
“করেনি তবে করবে চিন্তা করো না।”
তন্ময় এবারে শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“মিলি বিয়ে করবে না। আমি আপনাকে লিখে দিতে পারি মিলি জীবনেও বিয়ে করবে না।আরে একবার আমার দিকে তাকিয়ে দেখুন, আমিই এখনো বিয়ে করতে পারিনি আর ও তো আমায় ভালোবাসে। ও কি করে বিয়ে করে নেবে? এত সহজ ভাবেন নাকি? ওকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে নেবেন দেখবেন ওর উত্তর আমার উত্তরের সাথে মিলবে।”
“এত কনফিডেন্স মিলি কে নিয়ে? যদি তোমার এই বিশ্বাসটা ও না রাখে? যদি বিয়ে করে নেয় তবে?”
“যখন আমি জানি ও বিয়ে করবে না, তবে এসব অযথা ভাববো কেন? এমনিতেই ভেবে ভেবে পা'গল হয়ে যাচ্ছি নতুন করে আবার এসব ভাবনা ঢোকাবেন না আমার মাথায়।”
“এভাবে নিজের জীবন কেউ নষ্ট করে তন্ময়?কি হতো যদি ভালো হয়ে থাকতে? একটা সুখের সংসার কি হতে পারতো না তোমাদের তিনজনের? আজকে তোমায় রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে হতো না, আজকে আমার বোনকে এত দূরে থাকতে হতো না আমাদের থেকে, আজকে ওই বাচ্চাটাকে নিজের বাবা ছাড়া থাকতে হতো না যদি তুমি ভালো থাকতে। কি পেলে এসব করে? আমার বোনের জীবন কিন্তু দিব্যি চলছে বরং তুমি আটকে আছো।”
তন্ময় কিছুক্ষণ হাসলো। হাসতে হাসতেই হঠাৎই ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,
“তো কি করব এখন? করেছি তো ভুল বুঝতে পারছি। কিন্তু কেউ তো ক্ষমা করবে না আমায়। যে কটা দিন মিলির সাথে সংসার করেছিলাম ওই কয়টা দিনই সুখে ছিলাম। তারপর থেকে সুখ কি জিনিস ভুলেই গেছি।এই বাকি জীবন এখন আমার আফসোস করতে করতেই কেটে যাবে।”
“এটাই দরকার। এটাই উচিত। তুমি যত আফসোসই করো না কেন সেগুলো তোমার অপরাধের কাছে কিছুই না। একটা মেয়ের জীবন শেষ করে দিয়েছো তুমি, একটা বাচ্চার জীবন শেষ করে দিয়েছো। সেই সাথে নিজের জীবনও শেষ করেছো। এই এক জীবনে তুমি এত পাপ করেছো তন্ময় যার ক্ষমা পেতে পেতে তোমার এই গোটা জীবনটাই কেটে যাবে।”
“আপনার কি মায়া হচ্ছে না আমায় দেখে? কষ্ট লাগছে না আমায় দেখে?”
“আমার বোনকে এর থেকেও বেশি কষ্ট পেতে দেখেছি সেজন্য তোমার কষ্টগুলো আমার কাছে খুবই সামান্য মনে হচ্ছে। বিনা অপরাধে কাঁদিয়েছো তুমি ওই মেয়েটাকে। কি ভেবেছিলে এসবের দাম তোমায় দিতে হবে না?”
“বুঝতে পেরেছি, যান। সহানুভূতি দেখাবেন না সেসবও বুঝে গেছি। আর কোন কাজ নেই আমার আপনাকে দিয়ে।”
“তোমার প্রতি সহানুভূতি আমার কখনোই আসবেনা। তবে একটা কথা বলি পা'গল হয়ে যেও না। পা'গল হলে নিজের করা অপরাধগুলো ভুলে যাবে, তোমার শাস্তি অনেক কমে যাবে তাই বলছি সুস্থ থাকার চেষ্টা করো। এখনো অনেক শাস্তি তোমার পাওয়া বাকি আছে।”
কথাটা বলে মাহবুব চলে গেল। গাড়িতে গিয়ে বসল। তন্ময় তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল।কিছুক্ষণের মাঝে জ্যাম ছুটে গিয়ে গাড়িটাও চলে গেল তন্ময়ের চোখের আড়ালে। তন্ময় আর সেখানে বসলো না। উঠে দাঁড়িয়ে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে হেঁটে নিজের বাড়ির দিকে চলে গেল।