"ডিভোর্সের ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত? আপনি সত্যি চান এই ডিভোর্সটা?”
উকিলের প্রশ্নে মিলি একটু থমকালো। মাথা তুলে তাকিয়ে অবুঝের ন্যয় পাল্টা উকিলকে প্রশ্ন করলো,
“কেন আপনার মনে হচ্ছে আমি ডিভোর্সটা চাই না?”
মিলির প্রশ্ন শুনে ভদ্র মহিলা চোখের চিকন ফ্রেমের চশমাটা একটু উপরে ঠেলে তুললেন। টেবিলের উপর হাত রেখে দুহাত থুতনিতে ঠেঁকিয়ে বলল,
“আপনাকে দেখে আমার ভীষণ কনফিউজড মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে আপনার মন একটা চাইছে কিন্তু আপনার মস্তিষ্ক আপনাকে অন্য কিছু করতে বলছে। আপনি ভীষণ দ্বিধা দ্বন্দ্বের মধ্যে আছেন।”
মিলি এবার মাহবুবের দিকে তাকালো যে ওর পাশের চেয়ারে মাথা নিচু করে বসে আছে। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“ভাইয়া তোমারও কি এমন মনে হচ্ছে যে আমি দ্বিধা দ্বন্দ্বের মধ্যে আছি? তুমি তো জানো বলো আমি তন্ময় কে ডিভোর্স দিতে চাই? ওর সাথে সম্পর্ক রাখার কোন মানেই হয় না।”
মাহবুব মাথা তুলে মিলির দিকে তাকালো। মাহবুবের চোখে মুখে আজ এক ভিন্ন রকমের অসহায়ত্ত্ব দেখা যাচ্ছে। একমাত্র আদরের বোনকে নিজের সংসার টিকিয়ে রাখতে কোন সাহায্য করতে পারেনি, নিজের বোনের সুখ ওকে এনে দিতে পারেনি সেই সবকিছুর অসহায়ত্ব যেন দেখা যাচ্ছে মাহবুবের চোখে। মিলির গালে হাত রেখে আদুরে গলায় বলল,
“নিজের মনের ওপর অযথা চাপ দেস না। ভালো করে আগে নিজেকে প্রশ্ন কর কি চাস তুই?”
সবার একই কথাতে মিলি এবার আরো বেশি দ্বিধা দ্বন্দ্বের মাঝে পড়ল। হাতের কলমটা টেবিলের উপরে পড়ে গেল। ভেতরে একটা অস্থিরতা জেগে উঠলো কিন্তু এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। মিলি তো নিজেকে সামলে নিয়েছিল, শক্ত হয়ে গিয়েছিল। তন্ময়ের প্রতি তো ঘৃণা জমেছিল। এই তো একটু আগেই তো তন্ময়কে বলে এলো মিলি ওকে ঘৃণা করে। তন্ময় ফিরে আসার জন্য অনুরোধ করলো অথচ মিলি কোন কিছু না ভেবে ওর প্রস্তাবকে নাকচ করে দিল।
তবে এখন হঠাৎ এই দুর্বলতা কিসের? তন্ময়ের অসহায়ত্বগুলো কি মিলিকে ভেতর থেকে কষ্ট দিচ্ছে? এই যে বলে এলো যে ও চায় তন্ময় যেন সারা জীবন আফসোস করে, তন্ময়ের আফসোসগুলো যেন আরো বাড়ে, তন্ময় যেন ভালো না থাকে আদৌও কি মিলি এসব চায়?
আবারও প্রশ্নাত্মক গলায় মাহবুব কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ভাইয়া, আমাদের মাঝে তো কোন সম্পর্ক নেই। অনেকদিন আগেই তো সব সম্পর্কের পাঠ চুকে গেছে তবে আজ ডিভোর্স পেপারে সাইন করতে আমার ভাবতে কেন হচ্ছে? তোমরাই বা আমাকে ভাবতে বলছো কেন?”
“তোর শুকনো চোখ মুখ দেখে ভাবতে বলছি। হ্যাঁ এটা ঠিক তোদের মাঝে সম্পর্ক অনেকদিন আগেই শেষ হয়ে গেছে তবে এখনো তোরা আইনিভাবে স্বামী-স্ত্রী। এই ডিভোর্স পেপারে সাইন করার মাধ্যমে সেই সম্পর্কটাও শেষ হয়ে যাবে হয়তো সেজন্যই তুই এত ভাবছিস। একটু আগে তন্ময়ের সাথে দেখা হয়েছিল তোর, হয়তো সেজন্য ওকে নিয়ে ভাবছিস বেশি।”
মিলির সম্মুখ চেয়ারে বসা ভদ্রমহিলা আবারো মিলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“লিসেন মিলি টেক ইওর ওন টাইম। তাড়াহুড়োর মাঝে কোন সিদ্ধান্ত নিও না।”
মিলি এবার নিজেই নিজেকে প্রচুর প্রশ্ন করল। মনে মনে নিজে নিজেকে প্রশ্ন করলো, তন্ময়কে কি আদৌ ক্ষমা করা যায়?
চোখ দুটো বন্ধ করতেই পুরনো কিছু স্মৃতি মনে পড়ে গেল। কত অসহায়ত্ব দেখিয়েছে এক সময় মিলি তন্ময় কে, তন্ময়ের বুকে মাথা রেখে কেঁদেছে আর তন্ময় অন্য নারীর প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা জানিয়েছে। বারবার মিলিকে বলেছে যে ওদের মাঝে কিছু অবশিষ্ট নেই, মিলিকে আর ভালোবাসা যায় না, মিলির সাথে থাকা যায় না।
নিজের প্রেমিকার সামনে স্ত্রীকে অপমান করেছে। না জানি আরোও কত অন্যায় করেছে। আর সব থেকে বড় অন্যায় হলো নিজের সন্তানকে মে’রে ফেলতে চেয়েছে।
না তন্ময় কে ক্ষমা করা যায় না। মিলি আরো বেশ কিছুক্ষণ নিজেই নিজের সাথে কথা বলল মনে মনে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেলল।
টেবিলের উপর থেকে কলমটা হাতে তুলে নিয়ে আর এক সেকেন্ডও সময় ব্যয় না করে সাইন করে দিল। সাইন করা শেষে মিলি তৎক্ষণাত বাইরে চলে গেল, আর একটা শব্দও ব্যয় করলো না কারো সাথে। মাহবুবের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
মাহবুবও উঠে চলে যেতে নিলে ভদ্রমহিলা মাহবুব কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ওনার খেয়াল রাখবেন। উনি যতই বলুক না কেন ওনার মুখ দেখে যে কেউ বুঝতে পারবে যে উনি শুধুমাত্র নিজের উপর জুলুম চালিয়ে এই সইটা করেছেন। অনেক দিনের অভিজ্ঞতা আমার। কে কেন এই ডিভোর্স পেপারে সাইন করে একটু হলেও বুঝতে পারি। খেয়াল রাখবেন ওনার। উনি ভালো নেই।”
মাহবুব বাইরে এসে দেখল মিলি গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ মুখে একটা থমথমে ভাব বিরাজমান। মাহবুবে এগিয়ে গিয়ে চিন্তিত গলায় বলল,
“ঠিক আছিস তুই?“
মিলি বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,
“কেন? কি হবে আমার? কেউ তো আমায় ডিভোর্স পেপারে সাইন করতে জোর করেনি। আমি নিজের ইচ্ছেতে তোমায় সব ব্যবস্থা করতে বলেছিলাম তবে আমার কি হবে?”
মাহবুব আবারও বোনের গালে হাত রেখে স্নেহ পূর্ণ গলায় বলল,
“জোর করে নিজেকে শক্ত দেখানোর চেষ্টা করিস না, ভেতর থেকে ভেঙে পড়বি কিন্তু।”
“তোমার মনে হয় আমি মানুষটা ভেতর থেকে ঠিক আছি? তন্ময় আমাকে ঠিক রেখেছে বলে তোমার মনে হয় ভাইয়া?”
“সাইনটা কেন করলি? তুই মুখে বলিস বা না বলিস আমি জানি তোর মনে এখনো তন্ময়ের জন্য দুর্বলতা আছে। তুই যেমন ওকে ঘৃণা করিস সেই সাথে ভালোও বাসিস। কারণ তোর ভালোবাসায় কোনো খাদ ছিল না। তবে কেন করলি সাইনটা?”
“দরকার ছিল ভাইয়া। আমার মনে ওর জন্য এখনও যেই অনুভূতিই থাকুক না কেন, যতই দুর্বলতা থাকুক না কেন সেগুলো আমি আর ওকে দেখাতে চাই না। ওর খুব কনফিডেন্স আমাকে নিয়ে। ও ভাবে আমি এখনো ওর জন্য কষ্ট পাই কিন্তু ওকে বোঝাতে হবে যে ওকে ছাড়া আমি খুব ভালো আছি। ওর মতো একটা জা’নো’য়া’রে’র সাথে থাকার থেকে একা থাকা অনেক ভালো।”
মাহবুব হতাশার শ্বাস ফেলল। আর কিছু বলল না। মিলি কে গাড়িতে উঠতে বলে নিজেও গাড়িতে উঠল।
_________
“আম্মু তুমি নিজের খেয়াল রেখো। বেশি চিন্তা করবে না। আমি ফোন করে তোমার খোঁজ খবর নেব। “
মেয়েকে জড়িয়ে ধরে মিথিলা এবার শব্দ করে কেঁদে উঠে বললেন,
“থেকে যা না মা। ওই অচেনা শহরে একা একা কি করে থাকিস তুই?”
মিলি মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
“আমার তো এখানে থেকে গেলে চলবে না আম্মু। কলেজ থেকে দু দিনের ছুটি নিয়েছি, আজ রাতের বাসেই ফিরব। আর ওই অচেনা শহরও আমার কাছে এখন পরিচিত হয়ে উঠেছে। তুমি চিন্তা করো না আমায় নিয়ে।”
মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আরো অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করলেন মিথিলা। অনেক করে বললেন থেকে যেতে কিন্তু মিলি ওনার আবদার কিংবা অনুরোধ কোনটাই রাখতে পারল না।
শেষে মিথিলা হাল ছেড়ে দিলেন। নাতিকে কোলে নিয়ে কিছুক্ষণ আদর করলেন। মিথিলা আর পিউয়ের থেকে বিদায় নিয়ে অয়ন কে কোলে নিয়ে বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে। নিচে মাহবুব গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছেন। মিথিলাকে কেবিনে একা ফেলে রেখে পিউ আর যেতে পারলো না। মিলি আছে জন্য জাহিদ চৌধুরীও আসেনি।
করিডর দিয়ে সোজা হেঁটে সামনের মোড়ে গিয়ে হঠাৎ করে একজনের সাথে ধাক্কা খেলো মিলি। ভুলটা আসলে কার ছিল সেটা কেউই জানে না তবে দুজনে একসঙ্গে সরি বলে উঠল। দুজনেই দুজনের বিপরীত পাশে দাঁড়ানো মানুষটা দেখে চমকে উঠলো। তবে বেশি চমকালো মিলি। সেই সুন্দরী, যুবতী, মডার্ন মেয়েটার এ কি অবস্থা হয়েছে! এই কয়েক মাসের মধ্যে সৌন্দর্য এভাবে উধাও হয়ে গেল? গায়ের ফর্সা রংটাও আর নেই ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে চোখ মুখ। শরীরটাও আগের তুলনায় অনেকটা রোগা হয়ে গেছে।
মিলির মুখ দিয়ে কোন কথা বের হলো না জেসিকে দেখে। শুধু হাঁ করে তাকিয়ে থাকলো। জেসিই নীরবতা ভেঙ্গে কথা বলে উঠলো।
“চিনতে পারছো আমায় মিলি?”
মিলির ধান ভাঙ্গলো। ব্যঙ্গ করে জেসি কে বলল,
“তোমায় চিনব না এমন হতে পারে? তুমি আমার জীবনের এমন একটা অধ্যায় যাকে চাইলেও আমি ভুলতে পারবো না।”
জেসি আলতো হেসে বলল,
“আমিও তোমায় ভুলিনি। না ভুলেছি তোমার কথাগুলো কে, আর না ভুলেছি তোমার অভিশাপগুলো কে।”
“যে অন্যায় তুমি করেছো সেগুলো কি আদৌও ভোলার মতন? তুমি আমার থেকে যা কেড়ে নিয়েছো তার বদলে তোমায় যে অভি’শাপ গুলো দিয়েছি সেগুলো খুবই কম।”
“তাই? কম অভি’শাপ দিয়েই আজ আমার জীবনের ছন্নছাড়া অবস্থা তবে বেশি অভি’শাপ দিলে কি হতো? ভালোই হতো। হয়ত ম’রে যেতাম একেবারে।”
মিলির চোখে মুখে তীব্র যন্ত্রণার ছাপ ফুটে উঠলো। আজ গোটা দিনটাই যেন যন্ত্রনাতে কাটল মিলির। এই জন্যেই এই শহরে পা রাখতে চায় না মিলি। প্রথমে তন্ময়ের সাথে দেখা হলো। তন্ময় নিজের অসহায়ত্ব দেখিয়ে মিলিকে দুর্বল করার চেষ্টা করলো, তারপর আবার ডিভোর্স পেপারে সাইন নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগা। এখন আবার জেসির সাথে দেখা হলো। সবগুলো ঘটনাই মিলির জীবনের একটা কালো অধ্যায়ের সাথে জড়িত। কেন যে বারবার এরাই সামনে আসছে কে জানে?
চোখে মুখে তীব্র যন্ত্রণা ফুটিয়ে তুলে জেসি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তুমি যে অপরাধ করেছো তার সমাধান মৃ’ত্যু না। যদি তুমি মা’রা যেতে তবে তো তোমার শাস্তি কিছুই হতো না সেজন্যই আল্লাহ তোমায় বাঁচিয়ে রেখেছে। আমি তোমায় বলেছিলাম আমি সবকিছুর অভিযোগ আমার আল্লাহর কাছে দিলাম। তিনি শাস্তি দিয়েছেন তোমায়। আর তিনি শাস্তি দেবেন বলেই তুমি এখনো বেঁচে আছো।”
কথাগুলো বলে মিলি জেসি কে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে পিছন থেকে জেসির করুন কণ্ঠস্বর ভেসে এলো যা মিলিকে থামতে বাধ্য করল।
“ইচ্ছে করে তোমার সংসারে ঢুকে পড়েছিলাম, তোমার সংসারটা নষ্ট করে দিয়েছিলাম, তোমার থেকে তোমার স্বামীকে কেড়ে নিয়েছিলাম, তোমার সন্তানকে বাবা হারা করেছিলাম আর এই প্রত্যেকটা জিনিস আজ আমার সাথে ঘটছে মিলি। সত্যি তোমার আল্লাহ আমায় শাস্তি দিয়েছেন। তোমার আল্লাহ শুধু তোমার কথাই শুনেছেন, আমার কথা শোনেননি। আমার আর্তনাদে তিনি সাড়া দেননি।”
মিলি পিছনে ফিরে তাকিয়ে চোখ মুখে এক রাশ বিস্ময় ভাব ফুটিয়ে জেসি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“মানে তুমি বিয়ে করেছো?”
“হ্যাঁ করেছিলাম। তন্ময়কে ঠকিয়ে রাজিব কে বিয়ে করেছিলাম। তন্ময়ের বন্ধু রাজীব, নিশ্চয়ই চেনো?”
রাজীবের নামটা শুনতেই ঘৃণায় মিলির শরীর রি রি করে উঠলো। তখনই মনে পড়লো সেদিন ফুচকার দোকানের সামনে দুজনের দৃশ্যটা। তবে রাজীবের সম্বন্ধে মিলির যতটুকু আন্দাজ ছিল তাতে ভেবেছিল বিয়ে জেসি কে করবে না। সেই তন্ময়ের গলাতেই ওকে ঝুলতে হবে। তবে এখন জেসির রাজীবের সাথে বিয়ে হয়েছিল কথাটা শুনে মিলি বেশ চমকালো।
“ওর মতন ছেলে যে বিয়ে করে সংসার করতে পারে এটা সত্যি আমি ভাবিনি।”
“ঠিকই ভেবেছিলে। সংসার করতে পারে না ওর মতন ছেলে। ও সংসার করেওনি আমার সাথে। আমাকে বিয়ে করেছিল শুধুমাত্র তন্ময় কে শাস্তি দেওয়ার জন্য। রাজীব তোমার নামে তন্ময়কে খুব খারাপ কথা বলেছিল জন্য তন্ময় রেগে গিয়ে ওকে মে’রে’ছিল। আর ঠিক সেই কারণেই তন্ময়ের কাছ থেকে আমাকে সরিয়ে নিয়েছিল।”
মিলি এবার না হেসে পারলো না। হালকা একটু শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“একটা বিষয় কি খেয়াল করেছে তোমরা তিনজনই একই শ্রেণির মানুষ। তোমরা কেউই সংসার করার যোগ্য না। তোমাদের দ্বারা কখনোই সংসার সম্ভব না। তোমরা শুধু পারোই ভালোবাসা নিয়ে খেলতে। আমি বুঝি না তোমরা স্বপ্ন দেখলেই বা কি করে সংসার করার।”
মিলির কথায় জেসি একটুও রাগলো না, দ্বিমতও পোষণ করলো না। বরং সম্মতি জানিয়ে বলল,
“একদমই ঠিক বলেছো। আমি সত্যি তোমার মতন সংসারী হতে পারিনি যে নিজের স্বামীর হাজারটা দোষ দেখা সত্বেও তাকে ক্ষমা করে দিতে চাইবো। আমাকে বিয়ে করার পরও রাজীবের একাধিক নারীর সাথে সম্পর্ক ছিল, অথচ ও আমাকে চাকরি অব্দি করতে দেয়নি। প্রত্যেকটা দিন গায়ে হাত তুলেছে, অপমান করেছে। কিন্তু এক সময় গিয়ে আমি এসব সহ্য করতে পারিনি। জানি আমার কোন আশ্রয় ছিল না তবুও বেরিয়ে এসেছি।”
“তোমার প্রতি আজ খুব করুণা হচ্ছে আমার। তুমি চেয়েছিলে আমার থেকে সবকিছু কেড়ে নিতে অথচ দেখ আজ আমি আমার জীবনে বেশ ভালো আছি।”
“একদম ঠিক বলেছ। দেখো তোমার ছেলেটার মতোন আমার ছেলে বা মেয়ে যেই হোক না কেন সেও তার বাবাকে কখনো পাবে না। সেও জানবে তার বাবা কতটা নিকৃষ্ট মানুষ ছিল। তবে তোমার ছেলে কখনো তার মা কে নিয়ে কোন অভিযোগ করার সুযোগ পাবে না। তবে আমার সন্তান যদি কখনো জানতে পারে যে তার মা অন্য একটা মায়ের সংসার ভাঙার জন্য দায়ী তবে হয়তো আমাকেও ঘৃণা করবে।”
“তুমি প্রেগন্যান্ট?”
“হ্যাঁ। তোমাকে একটা অনুরোধ করি মিলি, আমার সন্তানটার জন্য হলেও আমার ক্ষমা করে দেবে? বিশ্বাস করো অনেক শাস্তি পেয়েছি। নিজের করা সব ভুলে বুঝতে পেরেছি, এখন অনুশোচনা হয় আমার। তোমার অভি’শাপটা তুলে নেবে একটু?”
মিলি হাসলো। মনে পড়লো সেই দিনের কথা যেদিন প্রথম জেসির সাথে কথা হয়েছিল। সেদিন মেয়েটার চোখে মুখে কি তেজ ছিল, তন্ময় কে নিয়ে কথা বলার সময় অধিকারবোধ দেখাচ্ছিলো। আর আজ সেই মেয়ের চোখে মুখে বিন্দুমাত্র তেজ নেই, অসহায়ত্ব দেখা যাচ্ছে।
“যাও তোমাকে ক্ষমা করলাম। কেন ক্ষমা করলাম জানো? কারণ তন্ময় আমার কাছে যতটা দোষী তুমি ততটা দোষী না। যদি তন্ময় না চাইতো তবে তুমি কখনো ওর জীবনে প্রবেশ করতে পারতে না। তন্ময় না চাইলে কখনো আমাদের সংসারটা ভাঙতো না। আর তার চাইতেও বড় কথা তুমি অনেক বড় পাপী হলেও তোমার বাচ্চাটা নিষ্পাপ। আমি দোয়া করি যেন তোমার স্বামীর সুবুদ্ধি হয়, অন্তত নিজের বাচ্চাটার কথা ভেবে হলেও যেন শুধরে যায়। তবে একটা কথা ও শুধরে গেলেও তুমি ওর কাছে ফেরত যাবে কিনা সেই বিষয়টা একবার ভেবে দেখো। কেননা যে একবার বদলে যায় সে বারবার বদলাতে পারে।”
মিলি আর সেখানে দাঁড়ালো না, চলে গেল। জেসির চোখ দুটো বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। নিজের কাছে নিজেকে আজ আরো ছোট মনে হলো। কতটা অসহায় আজ জেসি। মিলিও ওর অসহায়ত্ব দেখে করুণা করে ক্ষমা করে দিয়ে গেল। জেসির এই অবস্থার জন্য জেসি নিজেই দায়ী। কাউকে অভিযোগও করতে পারবে না, কাউকে দোষারোপ করতে পারবে না। অনেকে বলেছিল যে একজনের সংসার ভেঙে কখনো নিজের সংসার করা যায় না। কথাটা একদমই সত্যি।