বাসস্ট্যান্ড থেকে মিলি কে হাসপাতালে রেখে তখনই মাহবুব আবার অফিসে চলে গেল।মিলি কেবিনে গিয়ে দেখলো মিথিলা ঘুমোচ্ছেন। পিউ ডাকতে চাইলো তবে মিলি বাঁধা দিল।
মিলি আর অয়ন কে দেখতেই জাহিদ চৌধুরী কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতে নিলে পিছন থেকে মিলি বলে উঠলো,
“কেমন আছো বাবা?”
জাহিদী চৌধুরীর পা থেমে গেল কিন্তু কোনো উত্তর দিলেন না। মিলি জাহিদ চৌধুরীর সম্মুখে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“আমায় যে জিজ্ঞেস করবে না কেমন আছি সেটা তো আমি জানি তবে তুমি কেমন আছো সেটা বলতেও আপত্তি?”
জাহিদ চৌধুরী গমগমে গলায় বললেন,
“তুমি কেমন আছো সেটা জানার যেমন প্রয়োজন মনে করছিনা ঠিক তেমনি আমি কেমন আছি সে সবও তোমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করছি না।”
মিলি এবার একটু বিস্ময়ের সাথে বলল,
“এখনো এত অবহেলা আমার প্রতি? তুমি কি মনে করেছো বাবা আমি তোমার কাছে আবারও আশ্রয় ভিক্ষে চাইতে এসেছি? তুমি ভেবেছো আমি আমার অধিকার দাবি করতে এসেছি? না বাবা, তেমন কিছুই না। শুধুমাত্র মা কে দেখতে এসেছি।”
“তুমি ভাবলে কি করে তুমি ভিক্ষে চাইলেই তোমাকে দিয়ে দেব? রাস্তার ভিখিরিদেরকে আমি দুই টাকা দান করতে পছন্দ করব কিন্তু তবুও তোমাকে না।”
“জানি আমি সেসব। সেজন্যই আর তোমার কাছে ভিক্ষে চাইবো না। একবার চেয়েই হয়তো ভুল করেছিলাম।”
জাহিদ চৌধুরী একবার মিলির কোলে থাকা অয়নের দিকে তাকালো। ছেলেটা বেশ শান্তশিষ্ট হয়েছে, কান্নাকাটি খুব একটা করে না। ছোট বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে জাহিদ চৌধুরীর মায়া হলোনা। এবার একটু ব্যাঙ্গাত্মক গলায় করে মিলি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“নিজের ছেলেকে নিয়ে এসে কি ভেবেছো ওকে দেখলে আমি গলে যাব? দয়া হবে তোমাদের উপর? তোমাকে আর তোমার ছেলেকে যার শরীরে ওই কুলাঙ্গারের র'ক্ত বইছে আমার বাড়িতে জায়গা দিয়ে দেবো?”
মিলি এবারেও একরাশ বিস্ময় সমেত বলল,
“তুমি কি করে ভাবলে বাবা যে আমি আমার ছেলেকে আমার মতন দয়ার পাত্র করে রাখবো? আমি জীবনে অনেকের থেকে অনেক অবহেলা পেয়েছি কিন্তু আমার ছেলেকে পেতে দেবো না। জানো বাবা তোমার উপর আমার কোন অভিযোগ নেই। বরং তোমার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তুমি যদি সেদিন আমাকে তোমার বাড়িতে জায়গা দিতে তবে হয়তো আমি স্বনির্ভরশীল কখনোই হতে পারতাম না। আমি কখনো একা একা বাঁচতে শিখতেই পারতাম না।”
“খোঁচা দিচ্ছো আমায়?”
“তোমার সাথে কি আমার খোঁচা দেওয়ার মতন সম্পর্ক? তবে জানো বাবা আমার একটা কথাই মনে হয় আমার অপরাধটা বোধহয় এতটাও বড় ছিল না যতটা শাস্তি তুমি আমায় দিয়েছো, তাই না? আমি জানি বাবা আমি অনেক বড় অপরাধ করেছি তোমাদেরকে কষ্ট দিয়ে তবে তুমি কি একটা জিনিস ভেবে দেখেছো তন্ময়ের কথা আমি যখন তোমাদেরকে জানাই তখন তুমি বারবার শুধু একটা কথাই বলেছো যে ওর মত ছোট পরিবারের ছেলের সাথে তোমার মেয়ের বিয়ে দিলে তোমার সম্মান নষ্ট হবে। তুমি কিন্তু তখন একবারও আমায় বলোনি যে আমি তন্ময়ের সাথে ভালো থাকতে পারবো না।”
“এসব কথা তুলে কি প্রমাণ করতে চাইছো?”
মিলি আলতো হেসে বলল,
“আমি কিছুই প্রমাণ করতে চাইছি না বাবা। আমি শুধু তোমাকে বোঝানোর চেষ্টা করছি যে তুমি তখনও শুধুমাত্র তোমার সম্মান নিয়ে ভেবেছো, এখনো শুধুমাত্র তোমার সম্মান নিয়েই ভাবছো। তোমার সম্মান খুব বড় তোমার কাছে, তাই না? নিজের সন্তানের থেকেও বড়?”
জাহিদ চৌধুরী জোর গলায় বলল,
“হ্যাঁ। সম্মান আমার কাছে সব থেকে বড়।”
“আর সেই সম্মানের সামনে যদি তোমার সন্তানের মৃ'ত্যুও ঘটে তবুও তুমি তাতেই রাজি?”
জাহিদ চৌধুরী বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর আবারও জোর গলায় বললেন,
“হ্যাঁ তাতেই রাজি।”
মিলি হাসলো। এই নিয়ে আর কোন কথা তুললো না।
“তবে তুমি কি সত্যি বলবে না তুমি কেমন আছো? আমি তো তোমায় বলছি আমি এখানে থাকতে আসিনি। কালকে রাতের বাসে আবার চলে যাব সিলেট। অতিথি হিসেবেও কি আমার সাথে একটু ভালো করে কথা বলা যায় না?”
“শুধুমাত্র তোমার মা তোমাদেরকে দেখতে চেয়েছিল জন্য এখানে আসার অনুমতি দিয়েছি। না হলে তোমার আর তোমার ছেলের মুখ দেখার আমার ইচ্ছে ছিল না। ভালো ব্যবহারের আশা করা ছেড়ে দাও।”
কথাটা বলে জাহিদ চৌধুরী কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। মিলি সত্যিই অবাক না হয়ে পারলো না। এতগুলো দিন মাঝে কেটে গেল তবু ওনার রাগ কমলো না? মিলির এত কষ্ট, এত অসহায়ত্ব দেখেও একটু দয়া হলো না মেয়েটার উপর? সাথে করে আজ ওনার নাতিকে এনেছে, একটাবারের জন্য ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে একটু আদর করলো না।আচ্ছা মিলি নাহয় কষ্ট দিয়েছে, জাহিদ চৌধুরীর সম্মান নষ্ট করেছে কিন্তু এই ছোট বাচ্চাটা কি করেছে?
চোখের কোনায় জমা হওয়া অশ্রুগুলো মিলি সবার আড়ালেই মুছে নিল। পিউ মিলির কাঁধে হাত রাখতেই মিলি একটু চমকে উঠে পিছন ফিরে তাকিয়ে পিউয়ের মুখটা দেখতেই মুখে আবার হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“কিছু বলবে ভাবি?”
“কষ্ট পেয়ো না মিলি। তুমি তো জানো বাবার রাগ আর জেদ দুটোই বেশি। সেই সাথে সম্মান নিয়ে চিন্তাও।”
“আমি তো কষ্ট পাইনি ভাবি। আমি আর কষ্ট পাই না তুমি জানো না? এখন আর আমার কষ্টই হয় না।”
“কষ্ট হয় না বললেই কি তোমার চোখে যে কষ্টটা ফুটে উঠেছে সেটা তুমি ঢেকে রাখতে পারবে? তোমার জায়গায় আমি দাঁড়িয়ে নেই মিলি তাই তোমার পরিস্থিতিটা হয়তো পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পারব না কিন্তু তোমার জীবনের কষ্ট একটু হলেও আন্দাজ করতে পারি। যাকে ভালোবেসেছি, যার জন্য সব ছেড়ে দিয়েছি সেও যদি আমাকে ছেড়ে দেয় তবে সেই কষ্টটা একটু হলেও আন্দাজ করতে পারি আমি।”
“আন্দাজ করোনা ভাবি। ওই সামান্য আন্দাজেই খুব কষ্ট হবে তোমার। তোমার জীবনে তো সুখ আছে সেই সুখগুলোকেই উপভোগ করো। অযথা আন্দাজ করে কষ্টগুলোকে ডেকে এনো না।”
_________
শীত চলে গিয়ে আবার আগমন ঘটেছে গ্রীষ্মকালের। মাথার ওপরে সূর্যটা আজ দারুন ভাবে নিজের তেজ ছড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে মানুষজনকে পু'ড়িয়ে মা'রা যেন তার উদ্দেশ্য।অতিরিক্ত গরম পড়েছে আজ। সকালের খাওয়া দাওয়া শেষ করে মিলি বেরিয়েছে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। হাসপাতাল থেকে যাবে উকিলের কাছে মাহবুবের সাথে। আজ আর অয়নকে সাথে নেয়নি। ভিডিও কলে প্রায়ই সিয়াম আর নীলিমার সাথে কথা হওয়ার কারণে ওরা দুজনেই অয়নের কাছে পরিচিত। এমনিতেও বাচ্চাটা খুব ভদ্র। একটুও জ্বালায় না মা কে, একটুও বিরক্ত করে না। নীলিমার কাছে তাই অয়ন কে রেখে এসেছে। আসার সময় অবশ্য ঘুমে ছিল, মিলি আশা করছে ঘুম থেকে ওঠার পরেও খুব বেশি জ্বালাবে না নীলিমাকে। অবশ্য জ্বালালেও নীলিমা বিরক্ত হবে না। মিলিও তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার চেষ্টা করবে।
বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দাঁড়াতেই একটা বাসের সন্ধান পেল। এখান থেকে হাসপাতাল খুব বেশি দূরে না। এই পনেরো-বিশ মিনিট মতন লাগবে। তাই ভাবলো বাসেই যাবে। মিলির সাথে সাথে আরো অনেকেই বাসে উঠলো। মুহূর্তের মাঝে বাসটা ভরে গেল। বাসের পিছন দিকটায় ফাঁকা দেখে মিলি পিছনের দিকটাতেই গেল। একটা সিটও ফাঁকা নেই। বুঝলো দাঁড়িয়েই থাকতে হবে। এদিকে বাসটাও ছেড়ে দিয়েছে। চলন্ত বাসে একটু লড়াই করেই মিলিকে দাঁড়িয়ে থাকতে হলো।
হঠাৎ করেই ডান পাশে সিটে বসা এক পুরুষের উপর নজর পড়লো মিলির, যে বিস্ফোরিত নয়নে মিলির দিকে তাকিয়ে আছে। মিলি অবাক হলো। অল্প না, ভীষণ অবাক হলো। সেই সাথে বুকের কোথাও যেন একটা কিঞ্চিৎ ব্যথা অনুভব করল।
তন্ময় তখনো হা করে মিলির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আজ কতগুলো মাস পর তন্ময় আবারও মিলির মুখটা দেখল সেই হিসেব তন্ময় জানে না। খুব সুন্দর লাগছে মিলি কে দেখতে। অবশ্য মিলি অসুন্দর ছিলই কবে?
মিলির যে শাড়ি পরার অভ্যেস সেটা তন্ময় বেশ ভালো করেই জানে। খুব কমই সালোয়ার কামিজ পরে। আজকাল মিলির সেই অভ্যাস আরো বেড়েছে। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। শাড়ি পরেছে, আর চুলগুলো শুধু খোপা করেছে। এ ছাড়া আর কিছুই করেনি নিজেকে সুন্দর দেখানোর জন্য। না কানে দুল, না গলায় কোন চেইন, না মুখে কোন প্রসাধনী। অতিরিক্ত কোন কিছুই নেই তবুও অপূর্ব লাগছে মেয়েটাকে দেখতে। গায়ের ধবধবে ফর্সা রঙে হালকা গোলাপি শাড়ি চমৎকার লাগছে। গোলগাল মুখটা যেন নিখুঁত। তন্ময়ের অজান্তেই ওর মুখ দিয়ে মাশাআল্লাহ বেরিয়ে গেল। মুগ্ধ হলো তন্ময়। অনুভব করলো আরো একবার প্রেমে পড়ে গেল মিলির।
তন্ময় এখনো হা করে তাকিয়ে আছে তবে মিলি খুব বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকেনি। অপরিচিতর মতন খুব তাড়াতাড়ি তন্ময়কে অবজ্ঞা করে মুখটা ঘুরিয়ে নিল। তন্ময় অবশ্য এতে অবাক হলো না। মিলি যে ওকে অবজ্ঞা করবে এটাই তো স্বাভাবিক। তন্ময় যা করেছে মিলির সাথে তারপরে মিলি ওর সাথে হেসে হেসে কথা বলবে এসব আশা করাটাই বোকামি।
এদিকে বলতে গেলে বাসে পুরুষের সংখ্যাই বেশি। অন্তত যারা দাঁড়িয়ে আছে তাদের মধ্যে মিলি ব্যতীত একজন মেয়েকেও বোধহয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। মিলির এখন মনে হচ্ছে বাসটাতে উঠেই ভুল করেছে। একেই তো পাশে তন্ময়। মিলি বুঝতে পারছে তন্ময় এক সেকেন্ডের জন্যও মিলির উপর থেকে নিজের চোখ সরায়নি, তার উপরে আবার এই ভিড়। বাস হালকা করে একটু ব্রেক কসলেই অন্যান্য যাত্রীদের সাথে ধাক্কা লাগছে যা ভীষণ বিরক্তিকর ঠেকছে মিলির কাছে। অন্তত মিলির সম্মুখে যে লোকটা দাঁড়িয়েছে তিনি যেন একটু বেশিই মিলির গা ঘেষার চেষ্টা করছেন।
তন্ময় বেশ ভালো করে খেয়াল করলো লোকটা কে। একপর্যায়ে গিয়ে আর সহ্য করতে পারল না। ইচ্ছে তো করছে লোকটাকে এখন এখানেই দু চার ঘা মে'রে দিতে তবে মনে হলো এখন এসব করা ঠিক হবে না। মিলি এসব মা'রা'মা'রি একদম পছন্দ করে না।
তবে এভাবে তো চুপচাপ বসেও থাকতে পারে না। নিজের সিট থেকে উঠে মিলিকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“বসো এখানে।”
কথাটা মিলির কানে গেল ঠিকই তবে খুব বেশি গুরুত্ব দিলে না। তন্ময় এবারও চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“বসতে বললাম তো আমি।”
মিলি চেঁচালো না। বেশ শান্ত কণ্ঠে বলল,
“আপনার উপকারের কোন দরকার নেই আমার।”
তন্ময় আর কোন কিছু বলারই প্রয়োজন মনে করলো না। মিলির হাত ধরে একপ্রকার টেনেই সিটে বসিয়ে দিল। মিলি হতবিহ্বল কণ্ঠে বলল,
“কি সমস্যা আপনার?”
“একদম চুপ। চুপচাপ এখানে বসে থাকো।”
তন্ময় মিলির জায়গাটায় গিয়ে দাঁড়ালো। সম্মুখে দাঁড়ানো লোকটার দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। লোকটা বোধহয় কিছু আন্দাজ করতে পারলো তাই নিজের দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল। এদিকে মিলি আর নিজের গন্তব্য পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারলো না। পরের স্টপেজে বাস থামতেই ভিড় ঠেলে নেমে পড়লো। নামার সময় তন্ময়ের দিকে একবার ফিরেও তাকালো না।
তন্ময়ের গন্তব্য আসতে এখনও দেরি ছিল তবে কেন যেন মিলি কে নামতে দেখে আর নিজেকে আটকাতে পারলো না। পিছন পিছন নেমে পড়লো। মনে হলো কিছু যেন বলতে চায় মিলি কে, একটু কথা বলতে চায় মিলির সাথে।
বাস থেকে নেমে মিলি আর কোন গাড়ি নিলোনা। হেঁটে যাবে বলেই মনস্থির করলো। কিন্তু কয়েক মিনিট পর মনে হলো কেউ হয়তো ওর পিছু করছে, ওর পিছন পিছন আসছে। সন্দেহ থেকে পিছন ফিরে তাকাতেই বিস্ময়ে চোখ কপালে উঠে গেল। তন্ময় ঠিক মিলির পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।
মিলি অনেক কষ্টে নিজের রাগটাকে সংবরণ করলো। তন্ময়কে অবজ্ঞা করলো একদম অপরিচিত মানুষের মতন। আবারো সামনে তাকিয়ে হাঁটা ধরলো।
কিন্তু মিলির এখনো মনে হচ্ছে যে ওর পিছন পিছন তন্ময় আসছে। আরো বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর আবারো পিছনে ফিরে তাকালো। ওর সন্দেহই একদম ঠিক। তন্ময় এখনো মিলির পিছন পিছন আসছে। মিলিকে তাকাতে দেখেই মাথা নিচু করে ফেলল। মিলি এবারে আর চুপ থাকতে পারলো না। মিলির উত্তর দরকার যে কেন ওর পিছু করছে তন্ময়।
“পিছু করছেন কেন আমার?”
মিলি যে কথা বলবে এটাই বোধহয় তন্ময় আশা করেনি। প্রশ্নটা কানে যেতেই মাথা তুলে তাকিয়ে হতবিহ্বল গলায় বলল,
“তুমি যে আমার সাথে কথা বলবে আমি সেটা ভাবিনি মিলি।”
“কথা বলার কোন ইচ্ছে নেই আমার আপনার সাথে কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর দিন। পিছু করছেন কেন আমার?”
তন্ময় কাতর গলায় বলল,
“একটু কথা বলবে আমার সাথে মিলি?অনেকদিন হলো তোমার সাথে কথা হয় না, অনেকদিন হলো কারো সাথে কথা বলা হয় না, কেউ আমার কথা শোনে না। তুমি একটু শুনবে আজ?”
“কেন আপনার প্রেমিকা কোথায়? আপনার ভালোবাসার মানুষটা কোথায়? উনি ছাড়া তো আর আপনার কারো প্রয়োজন ছিল না তবে আজ আমার প্রয়োজন পড়ছে কেন?”
“নেই। কেউ নেই আমার জীবনে। এখন আমার জীবনে শুধু আছে একাকীত্ব আর হতাশা। আমি বিয়ে করতে পারিনি, আমি জেসি কে বিয়ে করিনি মিলি। আমি এখনো তোমার…”
তন্ময় কে নিজের কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে মিলি হাত উঠিয়ে ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“আর এগোবেন না। আপনি আমার কেউ নন।আর বলুন জেসি আপনাকে বিয়ে করেনি।জেসি যদি আপনাকে বিয়ে করতে চাইতো তবে এতদিনে আপনার সংসারে দ্বিতীয় স্ত্রী থাকতো।”
কথাটা বলে মিলি আবার চলে যেতে নিলে তন্ময় ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। মিলি চোখ গরম করে তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে সাবধানী গলায় বলল,
“ভুলেও আমার রাস্তায় বাধা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবেন না।”
তন্ময় এবারে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
“একটু কথা বলো মিলি প্লিজ! পাঁচটা মিনিট সময় দাও। কিছু বলার আছে তোমায়। ক্ষমা চাওয়ার সুযোগটা অন্তত দাও।”
“দরকার নেই আমার আপনার ক্ষমার। প্লিজ সামনে থেকে সরে যান।”
তন্ময় এবার হাত জোড় করে মিলির সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“একটু কথা বলো। আজকেই শেষবারের মতন আবদার করছি আর কখনো করবো না। আর হয়তো কখনো দেখাই হবে না আমাদের। পাঁচটা মিনিট সময় দাও!”
মিলি জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস ফেলে নিজের রাগটাকে দমানোর চেষ্টা করলো। নিজেই নিজের মনটাকে বোঝানোর চেষ্টা করলো এই শেষবারের মতো একটা সুযোগ দেওয়া যাক তন্ময় কে। একটু তন্ময়ের আফসোসের কথাগুলো শোনা যাক।
হঠাৎ করে মিলির জানতে ইচ্ছে হলো তন্ময় ঠিক কতটা অপরাধ বোধে ভুগছে। এমনিতেও আজকের পর থেকে তন্ময় আর কখন কোন কিছু বলে মিলি কে পরিচয় দিতে পারবেনা, আটকাতেও পারবে না। মিলি সব সম্পর্কের সুতোগুলোই ছিঁ'ড়ে ফেলবে আজ।
“বেশ বলুন, পাঁচ মিনিট সময় আছে আপনার কাছে। এক সেকেন্ডও বেশি পাবেন না।”
তন্ময় খুশি হলো, কৃতজ্ঞতা জানালো মিলিকে। তবে এখন আর কি বলবে সেসব খুঁজে পাচ্ছে না। আমতা আমতা করলো।কোথায় থেকে শুরু করবে, কি আগে বলবে না বলবে বুঝতে পারছে না। কথা তো অনেক জমা হয়ে আছে তবে পাঁচটা মিনিটে কি করে বলবে? এতগুলো মাসের জমানো অপরাধবোধ কি পাঁচটা মিনিটে বলে শেষ করা যায়?
তন্ময়কে চুপ করে থাকতে দেখে মিলি বলে উঠলো,
“দুই মিনিট কিন্তু চলে গেছে। আর তিন মিনিট সময় আছে আপনার হাতে।”
তন্ময় আঁৎকে উঠে বলল,
“এত তাড়াতাড়ি দুই মিনিট কি করে চলে গেল?”
“ঠিক যতটা তাড়াতাড়ি আপনি বদলে গিয়েছিলেন ততটাই তাড়াতাড়ি দুটো মিনিট সময়ও চলে গেল। আজ শেষবারের মতন আপনাকে সুযোগ দিলাম কিছু বলার থাকলে বলে নিন।”
“ফিরে আসবে আমার কাছে মিলি?”
তন্ময়ের প্রস্তাবটা মিলির কাছে হাস্যকর মনে হলো। এই মানবজাতি কতটা অদ্ভুত। যখন নিজের ইচ্ছে হয় না তখন রাখে না আর যখন নিজের ইচ্ছে হয় তখন আবার ফিরিয়ে নিতে চায়।
মিলি এবারে শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“কার কাছে ফিরে যাবো? একটা অমানুষের কাছে? আমি মানুষ হয়ে একটা অমানুষের সাথে থাকবো কি করে? আপনাকে দেখলেই তো আমার ঘৃণা হয়। মনে হচ্ছে চোখের সামনে একটা পশু দাঁড়িয়ে আছে। তার কাছে আবার আমি ফিরে যাব?”
কণ্ঠস্বর ঠিক যতটা কাতর করা যায় তন্ময় ঠিক ততটা কাতর করে মিলি কে অনুরোধ করে বলল,
“ভুল কি মানুষ করে না বলো? আমিও তো মানুষ, আমি তো ভুলের উর্ধ্বে না। করেছি আমি ভুল তার জন্য ক্ষমা চাইছি। দেখো আমার অবস্থা দেখো। তুমি আমায় দেখে বুঝতে পারছ না আমি তোমায় ছাড়া ভালো নেই?”
“কিন্তু আমি আপনাকে ছাড়া ভীষণ ভালো আছি। আপনি আমাকে দেখে বুঝতে পারছেন না?”
মিলির আচরণে তন্ময় ভীষণ অবাক হচ্ছেন।কন্ঠে একরাশ বিস্ময় ভাব নিয়ে বলল,
“এই মিলি, এভাবে কথা বলছ কেন? আমার সাথে এত কঠিন করে কথা বলছ কেন? তুমি তো এত কঠিন করে কথা বলতে পারো না আমার সাথে। আমাকে কষ্ট দিলে তো তোমার কষ্ট হয়। আজ এভাবে কষ্ট দিচ্ছ কেন তাহলে?”
“আপনার সত্যি মনে হয় সেই মিলি এখনো বেঁচে আছে? আপনার মনে নেই তাই না আপনি ঠিক কিভাবে সেই মিলি কে মে'রে ফেলে ছিলেন? আমাকে যে কষ্টটা আপনি দিয়েছিলেন তার কাছে আপনার এই কষ্টগুলো কিছুই না। সবকিছু আপনার সাময়িক সময়ের অনুশোচনা। এই অনুশোচনাগুলো তৈরি হওয়ার কারণ আপনি আপনার প্রেমিকাকে কাছে পাননি। তাকে কাছে পেলে তার শরীরের নেশায় মত্ত হয়ে ঠিকই আমাকে ভুলে যেতেন।”
তন্ময় এবারে বেশ তাড়াহুড়ো কণ্ঠে বলল,
“পারতাম না মিলি। আমি আর কোন নারীকে ছুঁতে পারেনি। কেউ আমার কাছে আসলে আমার বিরক্ত লাগতা, অস্বস্তি হতো। আমি তোমাকে ছাড়া কাউকে ছুঁইনি,বিশ্বাস করো?”
“এখন এসব বলে আর কোন লাভ নেই। যে মনের মিলটা ছিল সেটাই এখন আর নেই। আমাদের সম্পর্কে একে অপরের প্রতি যে সম্মান আর ভরসাটা ছিল সেটাও এখন আর নেই। আর আপনি এটা খুব ভালো করেই জানেন একবার যে জায়গা থেকে আমি ফিরে আসি অপমানিত হয়ে সেখানে আর দ্বিতীয় দিন যাই না।”
কথাটা বলে মিলি আবারো পিছন ঘুরে হাঁটা ধরলে তন্ময় আবারো ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। মিলি এবার অগ্নিদৃষ্টিতে তাকে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
“বাড়াবাড়ি করছেন কিন্তু এবারে। চিৎকার করে লোক জড়ো করে যদি বলি না যে আপনি আমার অপরিচিত, বিরক্ত করছেন তখন কিন্তু মজা বুঝবেন। আমাকে বাধ্য করবেন না এসব করতে।”
তন্ময়ের এখন কেমন যেন অস্থির লাগছে। কি সব যেন বলতে চাইছে মিলিকে কিন্তু কিছুই বলতে পারছে না। ভেতরের কোন কথাই বোঝাতে পারছে না। মিলি খেয়াল করলো তন্ময়ের চোখ দুটো জলে টইটুম্বুর হয়ে উঠেছে। যেকোনো সময় গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়বে। ঠিক তাই হলো। তন্ময় ওর ভেতরের অস্থিরতা সহ্য করতে না পেরে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,
“ভুল হয়ে গেছে মিলি। আর কিভাবে তোমাকে বোঝাই বলো? জানো আমি মানসিক রোগী হয়ে গিয়েছি। আমার নিয়মিত ডাক্তারের কাছে যেতে হয়। আমি পা'গল হয়ে যাব মিলি। আমি বাঁচতে পারব না। তোমার সাথে কাটানো মূহুর্ত গুলো আমার বারবার মনে পড়ে।”
মিলির মন আজ কেন যেন একটুও নরম হলো না। তন্ময়ের কান্না দেখে একটুও কষ্ট হলো না। বরং ভিতর থেকে যেন একটা শান্তি অনুভব করছে। অবশেষে তন্ময় নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছে। বেশ স্বাভাবিক গলায় তন্ময় কে বলল,
“আমি চাই সেই স্মৃতিগুলো আপনাকে আরো বেশি করে বিরক্ত করুক। মনে আছে আমি আপনাকে বলেছিলাম আপনি কোনদিন ভালো থাকতে পারবেন না। আর আমি এখনো সেটাই চাই যেন আপনি কোনদিন ভালো থাকতে না পারেন। আর আমি আজন্ম চাইবো। আমি চাই প্রতিটা মুহূর্তে আপনার আমার সাথে করা অন্যায় গুলোর কথা মনে হয়ে আপনি ধুঁকে-ধুকে বাঁচুন। আমি চাই কাঁদতে কাঁদতে আপনার চোখের জল শুকিয়ে যাক। আমি যেমন এক সময় আপনার ভালোবাসায় পা'গল হয়ে উঠেছিলাম ঠিক তেমনি আপনিও পা'গল হয়ে যান। আমার ভালোবাসার কথাগুলো মনে করে পা'গল হয়ে যান। এর থেকে ভালো শাস্তি আপনার জন্য আর কিছু হতেই পারে না। আর একটা কথা কান খুলে শুনে রাখুন এই মিলি আপনাকে আর বিন্দু পরিমাণ ভালোবাসে না। আপনাকে এতটা ঘৃণা করি আমি যেটা আমি নিজেও আপনাকে বলে বোঝাতে পারবো না।”
তন্ময়ের কান্না থেমে গেল। বুঝতে পারলো আর কোন আশাই যেন অবশিষ্ট নেই। সত্যি বদলে গেছে তন্ময়ের মিলি। না তন্ময় ভুল বলল। এখন আর মিলি তন্ময়ের নেই। এখন তন্ময় একা, মিলি বদলে গেছে।
খুব তাড়াতাড়ি তন্ময় নিজেকে সামলে নিল। শার্টের হাতায় চোখের জল টুকু মুছে নিয়ে মিলিকে বলল,
“বিরক্ত করলাম বোধহয় তোমায় অনেক।আর করবো না। শেষ একটা প্রশ্ন করি শুধু?”
“বলুন।”
“তুমি কি আবার বিয়ে করবে? আমি কিন্তু কখনো আর কাউকে গ্রহণ করতে পারবো না।”
“সেটা আপনার ব্যাপার। আমার নিজের জীবনে সুখী হওয়ার পূর্ণ অধিকার আছে। যদি আমার কখনো মনে হয় যে হ্যাঁ আমার আমার জীবনে কাউকে দরকার তবে আমি নিশ্চয়ই সেটা নিয়ে ভাববো।”
তন্ময় বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
“তুমি সত্যি পারবে জীবনে অন্য কাউকে গ্রহণ করতে? আমি ব্যতীত অন্য কেউ তোমায় ছোঁবে সেটা তুমি সহ্য করতে পারবে?”
“আপনি যদি অন্য কাউকে ছুঁতে পারেন অবৈধভাবে তবে আমি যদি কাউকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করি তবে তার বৈধ স্পর্শ সহ্য করতে পারবো না? চিন্তা করবেন না যদি কখনো বিয়ে করি তবে আমার সেই স্বামীর সাথে আপনার পরিচয় করিয়ে দেবো। তাকে দেখাবো যে জীবনে একটা কুলাঙ্গার কে বিয়ে করেছিলাম। তাকে দেখাবো যে আমি মানুষ হয়ে একটা পশুর সাথে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিলাম।”
তন্ময় হাসলো। সেই হাসির মাঝে তাচ্ছিল্যতা প্রকাশ পেল। নিজেকে নিজেই তাচ্ছিল্য করে হাসলো। নির্লজ্জের মতন আরো একটা প্রশ্ন করল মিলিকে।
“তোমার ছেলে কেমন আছে? নাম কি রেখেছো?”
এবারে মিলির কষ্ট হলো। এবারে ভীষণ কষ্ট হলো। তন্ময় মিলিকে ফিরে পেতে চাইলো অথচ আজও একটা বারের জন্য নিজের সন্তানকে নিজের বলে স্বীকার করতে পারল না। আজও ছেলেটাকে শুধুমাত্র মিলির ছেলেই বলল।
মিলি এবারে যেন নিশ্চিত হয়ে গেল যে এতক্ষণের তন্ময়ের এই সকল আফসোস সবই মিথ্যে। যে নিজের সন্তানকে নিজের বলে স্বীকার করতে জানে না সে কখনো মানুষ হতেই পারে না, সে কখনো শোধরাতে পারে না। তবে মিলি সেসব বুঝতে দিল না তন্ময় কে। মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,
“খুব ভালো আছে আমার ছেলে। নাম রেখেছি অয়ন। আপনাকে ছবি দেখাতাম তবে কি বলুন তো যদি নজর লেগে যায় আবার আমার ছেলেটার।”
“আমার ছেলের উপর আমারই নজর লেগে যাবে মিলি এমনটা তুমি বলতে পারলে?”
কথাটা আর মুখ ফুটে বলার সাহস হলো না তন্ময়ের। মনে মনেই বলল। মিলির তেজ, রাগ আর কাঠিন্যতা দেখে আর বলার সাহসই হচ্ছে না এখন। মিলিও আর আশা রাখলো না যে তন্ময় কিছু বলবে।
“অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমার মূল্যবান সময়ের মধ্যে থেকে অনেকটুকু সময় আপনাকে দিয়ে দিলাম। এখন যান। আর কোনদিন আমার চোখের সামনে আসবেন না। আর হ্যাঁ দোয়া করি যেন আপনার জীবনের আফসোস গুলো আরো বাড়ে। আফসোস করতে করতেই যেন আপনার জীবনটা শেষ হয়ে যায়।”
তন্ময় আর কিছু বলতে পারল না। মনটা এখনো মানতে চাইছে না যে মিলি এভাবে বলে গেল। মনটা এখনও এটা মানতে চাইছে না যে এতগুলো দিন পর দেখা হওয়ার পরও মিলি একবারও ওকে জড়িয়ে ধরল না। একবার জিজ্ঞেসও করল না কেমন আছে। তন্ময়ের শুকিয়ে যাওয়া মুখটার দিকে তাকিয়ে একবারও একটু আর্তনাদ করল না।
তন্ময় আর মিলি দুজনে দুজনের রাস্তায় চলে গেল। দুজনের পথ তো আলাদা হয়েছে অনেকদিন আগেই তবে তন্ময় যেন আজ আরো গভীর ভাবে উপলব্ধি করতে পারলো যে দূরত্বটা ঠিক কতটা বেড়ে গিয়েছে। তন্ময় থামলো। পিছন ফিরে একবার মিলি কে দেখলো যে দিব্যি নিজের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছে। একবারের জন্যও আর পিছন ফিরে তাকায়নি।
মিলির যাওয়ার পানে তাকিয়ে তন্ময় মনে মনে আওড়ালো,
“আমি আজও তোমার সামনে বলতে পারলাম না যে ও আমাদের ছেলে, ও আমারও ছেলে। আমার সেই সাহস নেই মিলি। আমি আজও কাপুরুষের মতন বললাম তোমার ছেলে। তবে আজ ভীষণ কষ্ট হয়েছিল বলতে। আমি চেয়েও বলতে পারিনি যে আমাদের ছেলের প্রতি অনেক মায়া জন্মেছে আমার।”
তন্ময় বেশিক্ষন দাঁড়ালো না আর। নিজের গন্তব্যের উদ্দেশ্য হাঁটা ধরলো।
মিলি একবারের জন্যও পিছন ফিরে তাকালো না। কোনো পিছুটানই আজ মিলি কে পিছন ফেরাতে পারলো না। শুধু একরাশ আফসোসের সাথে সেও মনে মনে আওড়ালো,
“তুমি আজও সাহস করে একবারের জন্যও ওকে নিজের সন্তান বলতে পারলে না তন্ময়।তোমার সব অপরাধবোধ, আফসোসের গল্প সেই মূহুর্তেই আমার কাছে মিথ্যে হয়ে গেছে যখন তুমি আজ আবারো আমাদের সন্তান কে শুধুমাত্র আমার সন্তান বললে।”
মিলির ভাবনার মাঝেই ওর ফোনে একটা কল এলো। ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে দেখল তাকদীরের নাম্বার থেকে কল এসেছে। বুক চিরে আরো একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো মিলির।
ঢাকা আসার পর থেকে ঘন্টায় ঘন্টায় ছেলেটা ফোন করছে, বারবার একই প্রশ্ন কখন ফিরবে কখন ফিরবে। অয়নকে না পেলে বারবার আবার একই কথা বলে অয়নকে দেখতে চায়। কি করবে মিলি এই ছেলেটার? খুব বাজে ভাবে যে ছেলেটা ফেঁসে গেছে। কল না ধরলে তখন আবার মেসেজ দেওয়া শুরু করে পা'গল করে ফেলে। ফোনটা সুইচ অফ করতে পারে না যদি আবার ঢাকা চলে আসে!ছেলেটা তো পা'গল, আসতেই পারে।
আরো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিলি ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরলো। অপর পাশ থেকে তাকদীরের নির্জীব কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
“আপনি দ্বিতীয় বিয়ে করবেন না সিনিয়র?”
হঠাৎ এমন প্রশ্নে মিলি একটু চমকালো। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?”
“এমনিতেই। করবেন না আর বিয়ে?”
মিলি মলিন হেসে বলল,
“মনে নেই তাকদীর তুমি আমায় বলেছিলে জীবনে একা বাঁচতে শিখতে হয়? কেউ ছেড়ে যাওয়া মানে এটা নয় যে আর বাঁচা যাবেনা। নিজের জন্য বাঁচতে হয়। আমি বরং নিজের জন্যই বাঁচি।”
“আর আমার কি হবে?”
“তোমার আবার কি হবে? তোহা কে বিয়ে করে সুখে সংসার করবে।”
তাকদীরের অসহায় কন্ঠে বলল,
“আমি তো আপনাকে কষ্ট দিতে পারি না তবে আপনি আমায় এত কষ্ট দেন কেন?”
মিলি তাকদীরের কথাটা হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলল,
“আবার সিনেমার ডায়লগ শুরু করলে?আচ্ছা শোনো আমি এখন ফোনটা রাখছি। হাসপাতালে যাচ্ছি রাস্তা পার হতে হবে।অয়নের সাথে কথা বলতে চাইলে রাতে ফোন দিও।”
“ভালোবাসি আপনাকে।”
তাকদীর কথাটা বলার সাথে সাথে দেখল ফোনটা কেটে দিয়েছে মিলি। আফসোস হলো তাকদীরের। আরো একবার ঠিক সময়ে কথাটা আজও বলতে পারল না।
ফোনের অপর পাশে থাকা মিলির আরো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তাকদীরের কথাটা তো কানে এসেছে ঠিকই সেজন্যই তো আরও তাড়াহুড়ো করে ফোনটা কেটে দিল। তবে তাকদীর কে সেটা বুঝতে দিলে চলবে না যে মিলি শুনে ফেলেছে। আর খুব তাড়াতাড়ি দূরত্বটা বাড়িয়ে নিতে হবে।