“আম্মু!”
ভোরের দিকে তাহরিমা বেগমের ফোনে তাকদীরের কল আসতে দেখে উনি চিন্তায় পড়ে গেলেন। তাড়াহুড়ো করে ফোনটা রিসিভ করতেই অপর পাশ থেকে তাকদীরের কাঁদো কাঁদো কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর হতেই উৎকণ্ঠিত গলায় বলল,
"কি হয়েছে?"
তাকদীর কাঁদো কাঁদো গলাতেই বলল,
"আম্মু, সিনিয়ার এর জ্ঞান ফিরছে না। অনেক নাকি ব্লিডিং হচ্ছে। আরো কি কি যেন বলে গেল।"
"তোমরা হাসপাতালে?"
"হ্যাঁ, মিলির ছেলে হয়েছে আম্মু। ও আমার কোলেই ছিল এতক্ষণ, কিন্তু খুব কাঁদছিলো জন্য নার্স নিয়ে গেছে। আমি সামলাতে পারছিলাম না। আম্মু তুমি প্লিজ এসো, তুমি এক্ষুনি এসো। আমি কি করবো বুঝতে পারছি না। মিলি ভালো নেই আম্মু।"
তাহরিমা বেগম কি বলবেন, কি করবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। আজকেই তো এলেন এর মাঝেই এত কিছু হয়ে গেল। তবে এখন তাকদীরকে বোঝাতে হবে যেন মাথা ঠান্ডা রাখে। ওখানে মিলির কাছে তাকদীর ছাড়া তো আর কেউ নেই।
"তাকদীর শোনো, মাথা ঠান্ডা রাখো বাবা। ডাক্তার তো আছে ইনশাআল্লাহ মিলির কিছু হবে না। এখানে তোমার নানা অসুস্থ। এখন কি করা যায় বলতো? তবে আমি চেষ্টা করব যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব যাওয়ার। কাল সকালের মধ্যে যদি দেখছি বাবার শরীরের অবস্থা একটু ঠিক হচ্ছে তবে আমি আসছি। তবে ততক্ষণ তুমি মিলির খেয়াল রেখো। আর শোনো দরকার পড়লে মিলির বাড়ির লোকদের খবর দাও। মিলির ফোনে দেখো ওর ভাইয়ের নাম্বার নিশ্চয়ই সেভ করা আছে। ওনাদের কে ফোন করে আসতে বল।"
তাহরিমা বেগম অনেক কিছু বললেন ঠিকই তবে তাকদীর সেসবের উত্তর না দিয়ে ভিন্ন কিছু বলল। কণ্ঠটা শুনে বোঝা যাচ্ছে বোধহয় কাঁদছে কিংবা একটু আগে কেঁদেছে তবে এখন নিজেকে সামলের চেষ্টা করছে।
"আম্মু মিলির জ্ঞান ফিরছে না কেন? এটাতো স্বাভাবিক না তাই না? কিছু হবে নাতো মিলির?"
"তুমি নেগেটিভ কেন ভাবছো? কিচ্ছু হবে না। আমি তোমাকে যা বললাম সেটা করো। এখন ওর পাশে ওর আপনজনদের থাকা জরুরী।"
তাহরিমা বেগম ফোনটা রেখে দিলেন। তাকদীরের পকেটে মিলির ফোনটা ছিল সেটা বের করল। মিলির ফোনে কোন লক নেই। প্রয়োজন বোধ করেনি হয়তো সেই কারণে তাকদীরের সুবিধাই হলো।
কল লিস্টে যেতেই সবার ওপরে নাম্বারটাই দেখল ভাইয়া নাম দিয়ে সেভ করা।তাকদীরের সন্দেহ রইল না যে এটাই মিলির ভাইয়ের নাম্বার। একটু ভাবনা চিন্তা করে ফোন দিল। প্রথমবার রিং হয়ে গেল কিন্তু অপর পাশ থেকে মাহবুব ফোনটা রিসিভ করল না। অনেক রাত হয়েছে, এই মাঝ রাতে ফোন রিসিভ না করাটাই স্বাভাবিক। নিশ্চয়ই গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। তাকদীর ভাবলো আবার ফোন দেবে কি দেবে না। যদি খারাপ ভাবে কিন্তু এখানে খারাপ ভাবার কি আছে?
সব ভাবনা চিন্তা ফেলে রেখে আর একবার কল দিলো মাহবুবের নাম্বারে। এবারে মাহবুব রিসিভ করল। অপর পাশ থেকে মাহবুবের উৎকন্ঠিত গলার স্বর ভেসে এলো।
"কি হয়েছে? এত রাতে ফোন করেছিস কেন? তোর শরীর ঠিক আছে?"
তাকদীর সালাম দিল। সালাম দিয়ে থেমে গেল। এদিকে ফোনের ওপাশে মিলির কন্ঠস্বরের বদলে কোনো এক পুরুষের কণ্ঠস্বরূ শুনে মাহবুব একটু থমকালো। বুঝে উঠতে পারল না যে এটা কে কল করেছে। ফোনটা কান থেকে নামিয়ে একবার নাম্বারটা দেখে নিল। মিলি নাম দিয়েই তো সেভ করা তবে মিলি কথা না বলে এটা কে কথা বলছে? মাহবুব প্রশ্ন করল,
"কে বলছেন?"
"আমি তাকদীর বলছি। মিলি আমাদের ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকে।"
"ওর ফোন আপনার কাছে কেন?"
"আসলে ভাইয়া মিলিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, ওর ছেলে হয়েছে।"
মাহবুব উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,
"কখন? আর আগে জানাননি কেন আমায়?"
"আসলে তেমন পরিস্থিতি ছিল না, অনেক রাতে ওনাকে হাসপাতালে এডমিট করিয়েছে তো তাই।"
"আমার বোন কেমন আছে?"
"একটু খারাপ। এখনো জ্ঞান ফেরেনি।"
মাহবুব এর উচ্ছ্বসিত মনটা খারাপ হয়ে গেল। আতঙ্কিত গলায় বলল,
"ডাক্তার কি বলেছে? ঠিক হয়ে যাবে তো আমার বোন?"
"বলেছে ভরসা রাখতে, ঠিক হয়ে যাবে।আপনারা কি আসবেন? আসলে আমি এখানে একা। আর প্লিজ আসার সময় কোন মেয়েকে নিয়ে আসবেন।"
"আরে আসবো না কেন? আমি এক্ষুনি রওনা দিচ্ছি। আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে আসছি। চিন্তা করবেন না। আপনি একটু ততক্ষণ আমার বোনের খেয়াল রাখবেন। আর একটা কথা টাকা পয়সা নিয়ে কোন কিছু ভাববেন না। যদি এখনই টাকার দরকার হয় তাহলে প্লিজ আপনি দিয়ে দেবেন, আমি গিয়েই পরিশোধ করে দেব।"
তাকদীরের এবারের কথাটা ভালো লাগলো না। তাকদীরকে আলাদা করে বলতে হবে কেন মিলির খেয়াল রাখার কথা? ও তো এমনিতেই খেয়াল রাখতো। আর টাকা-পয়সার গরম দেখাচ্ছে নাকি? তাকদীরের কি কম আছে? আর শোধ করে দেওয়ারই বা কি আছে? মিলির জন্য তো ওই খরচ করবে। একটু গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
"আমি অনেকদিন থেকে মিলির খেয়াল রাখছি। মিলি বোধহয় আপনাকে আমার কথা কিছু বলেনি সেজন্য আপনি আমার সম্বন্ধে কিছু জানেন না।"
তাকদীরের কথা শুনে মাহবুবের কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজের সৃষ্টি হলো। কি বোঝাতে চাইলো ছেলেটা? কি বলবে মিলি ওর সম্বন্ধে? কি সম্পর্ক আছে ওর সাথে মিলির? প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
"কি বলবে মিলি আমাকে আপনার সম্বন্ধে?"
"মিলির সাথে আমার অনেক ভালো সম্পর্ক। আমি ওর অনেক ভালো বন্ধু। একবার মিলি সুস্থ হোক, আপনি আসুন ও আপনাকে বলবে আমি কে। যাইহোক সময় নষ্ট না করে আপনি চলে আসুন। আর আমাকে বলার প্রয়োজন নেই যে মিলির খেয়াল রাখুন। পরিচয় হওয়ার পর থেকে আমি মিলির খেয়াল রেখেছি। এখনও রাখছি, আপনারা না এলেও রাখবো।তাড়াতাড়ি আসুন।"
কথাটা বলে তাকদীর ফোনটা রেখে দিলো। তাকদীরের আচরণে মাহবুব অবাক না হয়ে পারল না। ছেলেটা একটু বেশি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল যে মিলি ওর পরিচয় দেবে। কিন্তু দেওয়ার মতন কি পরিচয় আছে? ওর কি সম্পর্ক আছে যে ও এত আত্মবিশ্বাস দেখাচ্ছে? মাহবুব মনে মনে ভাবল মিলি কি তবে জীবনে আর একবার এগোনোর কথা ভাবছে? কিন্তু মিলির নিজেকে এত তাড়াতাড়ি তো সামলে নেওয়া সম্ভব না। অন্তত নতুন করে আবার জীবনটা শুরু করার কথা মিলি ভাবতেও পারে না। তবে কোনটাকে ঠিক ভাববে মাহবুব নিজের ভাবনাকে নাকি তাকদীরের আত্মবিশ্বাসকে?
__________
সকালের দিকে মিলির জ্ঞান ফিরলো।পিটপিট করে চোখ খুলে তাকালো। অত্যাধিক রকমের দুর্বল লাগছে শরীর, সেই সাথে প্রচণ্ড ব্যথা। ব্যাথায় নড়াচড়া করার ক্ষমতাও যেন হারিয়ে ফেলেছে। উঠে বসার চেষ্টা করলো মিলি তবে খেয়াল করলো গায়ে একদমই বল পাচ্ছে না। মিলির জ্ঞান ফিরেছে দেখে নার্স গিয়ে ডাক্তার কে ডেকে নিয়ে এলো। ডাক্তার এসে মিলিকে দেখে জানালেন এখন আগের থেকে অবস্থা বেশ ভালো। মিলি দুর্বল কণ্ঠের ডাক্তার কে বলল,
“আমার ছেলে কোথায়? ও কার কাছে আছে?”
ডাক্তার মুচকি হেসে নির্ভয় দিয়ে বললেন,
“চিন্তা করবে না, আপনার হাজবেন্ডের কাছে আছে।”
মিলি ভ্রুঁ কুঁচকে প্রশ্ন করলো,
"কার কাছে আছে বললেন?"
"আপনার হাজবেন্ডের কাছে। একটু আগে আবার ওনার কাছে দেওয়া হয়েছে। উনি বাচ্চাকে দেখার জন্য বিরক্ত করছিলেন আমাদের। অথচ উনি কিন্তু ঠিক ভাবে কোলেও নিতে পারেন না। আমরা নিষেধ করেছিলাম কিন্তু উনি শোনেননি কথা। এখন বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে চুপচাপ বাইরে বসে আছেন।"
ডাক্তারের বলা কথাগুলো মিলির মাথার উপর দিয়ে গেল। অল্প কিছুক্ষণের জন্য মনে হলো তন্ময় এসেছে। কিন্তু তন্ময় তো আসার কথা না। তন্ময় জানবেই বা কি করে যে মিলি হাসপাতালে ভর্তি। তন্ময়ের এখন মিলির সাথে কোন লেনাদেনা নেই। তাহলে উনি কার কথা বলছেন? মিলির স্বামী তো এখনো তন্ময় ই, এখনো তোদের ডিভোর্স হয়নি।
মিলির কপালে চিন্তার সূক্ষ্ম ভাঁজ দেখে ডাক্তার নিজেই বলে উঠলেন,
"কিছু ভাবছেন?"
"আপনার কোথাও কোন ভুল হচ্ছে, আমার হাজব্যান্ড আসতে পারেন না।"
ডাক্তার নিজেও এবার সংশয়ের মাঝে পড়লেন। পাল্টা প্রশ্ন করলেন,
"তবে গতকাল কার সাথে এসেছিলেন আপনি? বাইরে একজন ছেলে বসে আছে।বাচ্চাটা হওয়ার পর থেকে উনি অনেকটা সময় আপনার বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বসে ছিলেন।"
মিলি এতক্ষণে বুঝলো যে ডাক্তার তাকদীরের কথা বলছেন। কিন্তু তাকদীর কি নিজেকে মিলির স্বামী হিসেবে পরিচয় দিয়েছে? তাদের কি এমন কিছু বলেছে? মিলির যতদূর মনে হয় তাকদীরের এতটা সাহস হবে না। তবে ডাক্তার কেন বলল একথা?
"আপনাকে কে বলল যে উনি আমার হাজব্যান্ড?"
"গতকাল থেকে উনিই আছেন আপনার সাথে, সব ফরমালিটি যা যা প্রয়োজন সব তো উনিই করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই ওনাকে আপনার হাজবেন্ডই মনে হয়েছে।"
"উনি কি বলেছেন যে উনি আমার হাজব্যান্ড?"
"না, উনি বলেননি।"
মিলির রাগটা একটু কমলো। যদি ডাক্তার বলতো যে তাকদীর নিজেকে মিলির হাজবেন্ড হিসেবে পরিচয় দিয়েছে তবে সুস্থ হওয়ার পর তাকদীরের কপালে দুঃখ ছিল। এতটা অধিকার মিলি ওকে দেয়নি। তবে এবারে ডাক্তারের উপর হালকা রাগ হলো।
"উনি শুধুমাত্র আমার বন্ধু বা ছোট ভাই বলতে পারেন। আমার হাজব্যান্ড নেই।"
ডাক্তার চমকালো। কি বলবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। সেই সাথে ছোট ভাই নামে যাকে পরিচয় দিচ্ছে তাকে হাজবেন্ড বলাতে একটু নিজের কাছে নিজেই লজ্জিত বোধ করলেন। কি সম্পর্ককে কি বানিয়ে দিয়েছেন? অপরাধী গলায় বলল,
"আই এম রিয়েলি সরি। আমি আসলে বুঝতে পারিনি। আসলে উনি এমন ভাবে বাচ্চার জন্য কেয়ার করছিলেন, ইভেন যখন ওনাকে জানিয়েছিলাম যে আপনার অবস্থা একটু খারাপ উনি ভীষণ টেন্সড হয়ে গিয়েছিলেন। আপনার জ্ঞান ফিরছিলো না জন্য উনি নাকি কান্নাও করেছে। আসলে সবকিছু মিলিয়ে আমি ওসব ভেবেছিলাম।"
মিলি বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
"উনি কেঁদেছে?"
"হ্যাঁ। নার্স জানালো আমায় উনি নাকি ডেলিভারির আগে বারবার বলছিলেন যেন আপনাকে আমরা বেশি কষ্ট না দেই। ইভেন কেঁদেছেও। আমাকে পেয়ে আমাকেও রিকুয়েস্ট করেছে অনেকবার যেন আপনার কিছু না হয়।"
মিলি আর কিছু বলল না। বলার মতন কিছু খুঁজেই পেল না। চেকআপ করার পর ডাক্তার গেল। মিলি নার্স কে বলল ওর বাচ্চাকে দেখতে চায়।
নার্স বাইরে গিয়ে তাকদীরকে বলল যে মিলির জ্ঞান ফিরেছে। যদি বাচ্চাটা কোলে না থাকতো তাহলে হয়তো তাকদীর দৌড় দিতো। কিন্তু এখন উঠে দাঁড়ালে বাচ্চাটা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে তাই চুপচাপ বসে থাকলো। তবে কন্ঠে তার খুবই ব্যস্ততা। তাড়া দিয়ে নার্স কে বলল,
"আপনি তাড়াতাড়ি ওকে কোলে নিন। এক্ষুনি, এক্ষুনি নিন।"
এই ছেলের এত তাড়া দেখে নার্স নিজেই ভ্যাবাচ্যাকা খেলো। তবে কিছু বলল না। চুপচাপ কোলে নিল বাচ্চাটাকে। ওনাকে আগে যাওয়ার সুযোগই দিলো না তাকদীর, নিজেই চলে গেল। দরজাটা খুলে হাঁপানো গলায় একবার মিলিকে ডাকলো।
"মিলি!"
মিলি তাকালো দরজার দিকে। এক রাতের মাঝে ছেলেটাকে দেখতে কেমন পা'গল পা'গল লাগছে। মিলিকে দেখে তাকদীর অদ্ভুত রকমের শান্তি পেল। ইচ্ছে তো করছে ছুটে গিয়ে মিলিকে জড়িয়ে ধরতে, একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে। কিন্তু পারবে না সে এসব করতে। তাকদীরের সে অধিকার নেই।একটু যে মিলিকে ছুঁয়ে দেখবে সে অধিকারও নেই তাকদীরের।
মিলি আলতো হাসলো তাকদীরকে দেখে।এদিকে তাকদীর তখনও দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। নার্স পেছন থেকে এসে গম্ভীর গলায় বলল,
"দরজা থেকে সরে দাঁড়ান।"
তাকদীরের কানে সে কথা গেল কি গেল না কে জানে। নার্স এবারে একটু চেঁচিয়ে উঠে বলল,
"সরে দাঁড়ান দরজা থেকে।"
এবারে তাকদীরের ধ্যান ভাঙলো। চুপচাপ সরে দাঁড়ালো। নার্স ভিতরে এসে বাচ্চাটাকে মিলির কোলে দিয়ে টুকটাক কিছু শিখিয়ে দিয়ে চলে গেল। মিলি তাকালো নিজের ছেলের দিকে। চমকালো মিলি, যদিও মিলির চমকানো উচিত না, তবুও চমকালো। ছোট্ট একটা মুখ কিন্তু তারপরও সেই মুখে যেন মিলি অন্য কারো একটা প্রতিচ্ছবি দেখতে পেল। নাকটা অবিকল তন্ময়ের মতন, ঠোঁট দুটোও তন্ময়ের মত, আবার গায়ের রংটাও ফর্সা। অনিচ্ছাকৃতভাবে মিলির অজান্তেই গাল বেশে দু ফোঁটা জল মিলির ছেলের গালের উপরে পড়লো। বাচ্চাটা একটু নড়েচড়ে উঠলো। মিলি আলতো করে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলো। কিছু দুঃখ আর কিছু আনন্দ মিলিয়ে মিলি শব্দ করে কেঁদে উঠলো।
আজ যদি তন্ময় আগের মতন থাকতো তবে মিলির জীবনটা অন্যরকম হতো, আজকের দিনটা অন্যরকম হতো, পরিস্থিতিটাও অন্যরকম হতো। আজ মিলির চোখের জলে কোন আফসোস, কোন হাহাকার থাকতো না। এটা শুধু একটা খুশির কান্না হতো। এইযে মিলির অনেকগুলো ঘন্টা জ্ঞান ছিল না, যদি তন্ময় আগের মতন থাকতো তবে নিশ্চয়ই পা'গলের মতন কাঁদতো, ডাক্তারদের ব্যস্ত করে তুলতো, পাগল বানিয়ে ছাড়তো সবাইকে নিজের সাথে সাথে। নিজের ছেলে হওয়ার সংবাদ সবাইকে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে জানাতো, অফিসের সবাইকে মিষ্টি খাওয়াতো। বারবার মিলির কাছে এসে বলতো ওর জন্য কি আনবে, কি কি করতে হবে। হয়তো সুন্দর করে একটা নতুন ঘর গোছাতো। মিলির জ্ঞান ফেরার পর ওকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতন কাঁদতো। তারপরে বলতো তোমাকে হারিয়ে ফেলার ভয় হচ্ছিলো। আমি তো সব সময় শুধু তোমাকে চেয়েছিলাম, তোমার আগে আমার কাছে আর কিচ্ছু না, কেউ না। বারবার শুধু চাইছিলাম যেন তোমাকে সাথে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারি।
তবে তেমন কিছুই হলো না। এসব কিছুই মিলির কোন এক সময়ের ইচ্ছে আর এখন সেই সব কিছু দুঃস্বপ্ন, অসম্ভব বস্তু।
"সিনিয়র!"
তাকদীরের ডাকে মিলির ধ্যান ভাঙলো। মিলি অশ্রুসিক্ত চোখে তাকদীরের দিকে তাকাতেই তাকদীর অসহায় মুখ করে বলল,
"কাঁদছেন কেন? আপনিও ঠিক আছেন, আপনার ছেলেও তো ঠিকই আছে।"
মিলি ব্যথাতুর গলায় বলল,
“আমার ছেলের ভাগ্যটা কতটা খারাপ একবার ভাবো তো তাকদীর? জন্মের পর সবাই সবার বাবাকে কাছে পায়, কত ভালোবাসা পায় ওরা। অথচ ওকে আমি কখনো জানতেও দেব না ওর বাবা কে। ও কখনো জানতেও পারবে না যে ওর বাবা এই পৃথিবীতে বেঁচে আছে। ও কখনো বাবা বলে কাউকে ডাকতে পারবে না, একটু একটু করে যখন ও বড় হবে তখন ওর বাবা ওর হাত ধরে ওকে স্কুলে রেখে আসবে না, ওকে পার্কে ঘুরতে নিয়ে যাবে না। আমার ছেলেটা কখনো ওর বাবার কাছে চকলেট খাওয়ার আবদার করতে পারবে না, আমার হাতে বকুনি খেয়ে বাবার পেছনে লুকোতে পারবে না। আমি ভাবতাম আমার ভাগ্যটাই বোধহয় সবথেকে খারাপ কিন্তু এখন ওর মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে ওর থেকে হতভাগ্য আর কেউ নেই এই পৃথিবীতে।”
"আমি ওকে চকলেট কিনে দেবো। স্কুলে নিয়ে যাব, পার্কে ঘুরতে যেতে চাইলে ওখানেও নিয়ে যাব কেমন? আর আমার ফ্ল্যাটের দরজা সব সময় খোলা রাখবো, আপনি বকা দিলে ও আমার ফ্ল্যাটে চলে আসবে।"
মিলি তাচ্ছিল্য ভরা কণ্ঠে বলল,
"কিন্তু ও কখনো ওর বাবাকে বাবা বলে ডাকতে পারবে না। বাবার স্নেহ কেমন হয় সেটা কখনো বুঝতেই পারবে না।"
মিলির এবারের কথায় প্রেক্ষিতে তাকদীর কিছু বলল না শুধু মনে মনে একটু অভিমান ভরা কন্ঠে নিজে নিজেই বলল,
"আপনি চাইলেই তো পারেন কিন্তু আপনি তো সে এক জায়গায় আটকে আছেন। আমি এখন কিছু বললেই তো হয়ে যাবে দোষ?আমি যদি বলি আমাকে বাবা ডাকবে তখনই তো একদম তেঁতে উঠবেন, আমাকে বের করেও দিতে পারেন হাসপাতাল থেকে।"
ভাবনার মাঝে মিলি বলে উঠল,
"ও কেঁদেছিল?"
"আমিও কেঁদেছিলাম। আপনার ছেলে তো একটু কেঁদে ঘুমিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আমি অনেকক্ষণ কেঁদেছিলাম।"
মিলি একটু শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
"সেই জন্যই তো তোমাকে বাচ্চা বলি। সে যাই হোক তোমাকে অনেক ধন্যবাদ, তোমার এই ঋণ আমি কোনদিনও শোধ করতে পারব না।জানিনা আল্লাহ গতকাল তোমায় না পাঠালে কি করতাম আমি। সত্যিই আমি অনেক ভাগ্যবতী যে জীবনে তোমার মতন একজনকে পেয়েছি। তুমি খুব ভালো একজন বন্ধু কিংবা ছোট ভাই।"
তাকদীরের মুখটা ছোট হয়ে গেল। সব ঠিক ছিলো কিন্তু শেষের ছোট ভাইটা বলার কি দরকার ছিল? মিলি বুঝলো তাকদীরের অভিব্যক্তি। আর সে এই জন্য ইচ্ছে করেই কথাটা বলেছে যেন তাকদীর বুঝতে পারে মিলির জীবনে তাকদীরের ভূমিকাটা ঠিক কতটুকু। হালকা একটু গম্ভীর গলাতে তাকদীর মিলিকে প্রশ্ন করল,
"ছোট ভাই বললেন কেন?"
মিলি বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,
"এমনি। সমবয়সী হলে বন্ধু বলতাম কিন্তু তুমি তো আমার থেকে বয়সে ছোট সেজন্য ছোট ভাই বললাম।"
তাকদীর আর কিছু বলল না। গাল ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। মনে মনে নিজে নিজেকে এটা বলে সান্ত্বনা দিল ছোট ভাই বললেই তো আর ছোট ভাই হয়ে যাবে না, রক্তের তো কোনো সম্পর্ক নেই। মিলি যা ইচ্ছে তাই বলুক।
তাকদীরকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মিলি একটু অনুরোধের স্বরেই বলল,
"আমার ছেলের একটা ছবি তুলে একটু আমার বন্ধুকে পাঠাবে? আর আমার ভাইয়া কেও পাঠিও। আমার মোবাইল তো তোমার কাছেই আছে।"
তাকদীর গম্ভীর গলায় বলল,
"গতকাল রাতে আপনার ভাইয়াকে ফোন দিয়েছিলাম, উনি আসছেন।"
"তাহলে আমার বন্ধুকে একটু পাঠাও। দেখো সিয়াম নাম। হোয়াটসঅ্যাপে সেভ করা আছে।"
তাকদীর কোন কথা বলল না। চুপচাপ মিলির ফোনটা বের করে সুন্দর করে বাচ্চাটার একটা ছবি তুলে সিয়ামের আইডিতে পাঠিয়ে দিল। নিচে আবার মিলির হয়ে লিখেও দিল ❝আমার ছেলে❞।
তবে মেসেজটা লিখতে তাকদীরের বেশ ভালোই লাগলো। কথাটা যদিও মিলির হয়ে বলেছে তবুও লিখেছে তো ❝আমার ছেলে❞।
________
সকাল সকাল এলার্ম বাজতেই তন্ময়ের মেজাজটা বিগড়ে গেল। ইচ্ছে তো করলো মোবাইলটা ছুঁড়ে ফেলতে। তবে না, সেসব করা যাবে না। হাতের যা অবস্থা একটা মোবাইল ভাঙলে আর একটা কিনতে কিডনি বেঁচতে হবে এখন। এলার্ম টা বাজতে বাজতে বন্ধ হয়ে গেল। তন্ময় আবার ঘুমিয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের ব্যবধানে আবার এলার্ম টা শব্দ করে বেজে উঠল। তৎক্ষণাত তন্ময়ের ঘুমটা ভেঙে গেল, তবে চোখ খুলতে পারল না। যখন মনে হলো অফিস যেতেই হবে তখন আর ঘুমোতে পারলো না। তবে উঠতেও ইচ্ছে করছে না। বিছানায় কিছুক্ষণ লাফালাফি করলো, হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। এখন উঠে আবার রান্না করতে হবে, বিছানা গোছাতে হবে। তন্ময়ের এখন মনে হচ্ছে এর থেকে ভালো সন্ন্যাসী হয়ে যাবে। অফিসে গিয়ে আবার লিজার টর্চার। লিজার টর্চার অবশ্যই অন্য রকমের হয়। কোন কাজ করায় না তন্ময়কে দিয়ে, তবে যেখানে যায় সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে যায়। যদিও অজুহাত দেয় কাজের, তবে বেশিরভাগ সময় ঘুরতেই দিন যায়।
আর সময় ব্যয় না করে তন্ময় উঠে বসলো।ভাবলে যা হয়ে যায় হবে, যেখানে যেতে যত দেরি হয় হবে, আগে ফোনটা হাতে নিয়ে একটু ফেসবুক স্ক্রল করবে। এত নিয়মমাফিক জীবন দিয়ে কি হবে? এত নিয়ম মাফিক চলেও তো শেষে বাঁশটা তন্ময়ই খায়। মাঝে মাঝে একটু অনিয়ম করলে কিচ্ছু হবে না। লিজা কি করবে? চাকরি থেকে বের করে দেবে তো? দেক না। একবার যখন চাকরি পেয়ে গেছে তখন অন্য জায়গায়ও চাকরি ঠিক পেয়ে যাবে, নিজের উপর এতটুকু আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে তন্ময়ের। আর একটা বিষয় এতদিনে বুঝে গেছে যাই হয়ে যাক না কেন লিজা ওকে চাকরি থেকে বের করবে না। লিজার উপরে এত গরম দেখানোর পরেও যখন কিছু বলেনি তখন আর কিচ্ছু হবে না। আর সেই বিষয়টারই এখন সুযোগ নিতে চাইছে তন্ময়।
ফোনটা হাতে নিয়ে আগে হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকলো দেখতে যে কেউ মেসেজ দিয়েছে কিনা। সবার উপরে সিয়াম নামটা দেখে চমকে উঠলো। সিয়ামের আইডিতে ঢুকতেই দেখলো একটা ছবি এসেছে। ছবিটা এখনো দেখা যাচ্ছে না, লোড হচ্ছে। তবে তার নিচের মেসেজটা তন্ময়ের চোখে পড়লো
“তোর ছেলে।”
লেখাটা দেখতেই তন্ময় বুকটা ধক করে উঠলো। একটা চাপা অস্থিরতা কাজ করলো ছবিটা তাড়াহুড়ো করে দেখার জন্য। তন্ময় দেখলো ছবিটা। মিল পেলো নিজের চেহারার সাথে। তন্ময় নিজের ছোটবেলার ছবি দেখেছে, সে ছবিটার সাথে নিজের ছেলের মিল পেল। ঠিক যেমন মিলি ওর নাক, ঠোঁট, গায়ে রঙের মিল পেয়েছিলো, তন্ময়ও সেগুলোরই মিল পেল।
বাইরে আজ প্রচন্ড কুয়াশা। এখনো সূর্যের দেখা মেলেনি আর দেখা মিলবে বলে মনেও হচ্ছে না। এই তীব্র শীতের মাঝেও তন্ময় খেয়াল করল ও ঘামছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে কপালটা ঘামে ভিজে গেল। খেয়াল করলে হাতটাও কাঁপছে। আবারও ওপাশ থেকে সিয়ামের আরেকটা মেসেজ এলো।
"কিছু বলার আছে তোর?"
মেসেজটা সিন হলো ঠিকই কিন্তু তন্ময় কোন রিপ্লাই দিলো না। তৎক্ষণাৎ নাম্বারটা ব্লক করে দিয়ে মোবাইলটা ছুঁড়ে মা'রলো।
তন্ময় খেয়াল করলো এখন শুধু ওর হাত না, পুরো শরীরটাই থরথর করে কাঁপছে। তাড়াহুড়ো করে আবার কম্বল মুড়িয়ে শুয়ে পড়লো। চেষ্টা করল ছবির সেই চেহারাটা ভুলে যেতে কিন্তু পারল না। বরং ওর সাথে সাথে মিলির চেহারাটাও মনে পড়ে যাচ্ছে। আচ্ছা মিলি এখন কেমন আছে? কি করছে? তন্ময় কে কি মনে পড়ছে ওর? আচ্ছা মিলি কি ওর ছেলেকে তন্ময়ের কথা বলবে? বলবে কি ওর বাবা আছে, সেই সাথে কি এটাও বলবে যে ওর বাবা ওকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল? নিশ্চয়ই বলবে ওর বাবার চরিত্র খারাপ, ওর মাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে। কিন্তু কি দরকার এসব বলার? ওই বাচ্চাটা যখন কিছু জানেই না তবে ওকে জানানোরই বা কি দরকার? না জানাই থাক নাহয়। তন্ময় তো আর ওকে নিজের সন্তান বলে দাবি করতে যাচ্ছে না, না কখনো ওদের চোখের সামনে যাবে। তবে ওর সমন্ধে বদনামগুলো না করলেই কি না?
তন্ময়ের মনে আরও একটা প্রশ্ন এলো,
মিলি কি ওকে ফোন করে খবরটা দেবে যে ওর ছেলে হয়েছে? আচ্ছা মিলি কি বলবে একবার এসে দেখে যেতে? যদি বলে তবে কি তন্ময় যাবে? তন্ময়ের কি যাওয়া উচিত?
তন্ময় মনে মনে অনেক কিছু ভাবলো। ঠিক করলো যদি মিলি ওকে একবার এসে দেখে যেতে বলে তবে কি কি করবে? ভাবলো মিলির সাথে রাগারাগি করবে না, একদমই খারাপ ব্যবহার করবে না। এক কথায় সম্মতি জানাবে। তারপর ওখানে গিয়ে মিলিকে বোঝাবে, ক্ষমা চাইবে আবার, সাথে নিয়ে আসার চেষ্টা করবে। তারপরও যদি মিলি রাজি হয় তবে না হয় নিজেদের ছেলের দোহাই দেবে। বলবে যে তন্ময় এবার থেকে খুব ভালো বাবা হবে আর মিলির জন্য একদম প্রথম দিনের মতন ভালো স্বামী হয়ে উঠবে। জীবনে যা ভুল করেছে সব শুধরে নেবে। তন্ময় মিলিকে না হয় অনুরোধ করবে যে মাঝের কয়েকটা দিন ভুলে যেতে। মিলি তো বরাবরই তন্ময়ের সব অপরাধ ক্ষমা করে এসেছে, এবারও কি করবে?
তন্ময় নিজেও জানে ও বোকার মতন সব কথাবার্তা ভাবছে। এমন কিছু ভাবছে যা কখনোই সম্ভব না। কম্বলটা গা থেকে ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো তন্ময়। আলমারির ভেতর থেকে মিলির সেই পুরনো ওড়নাটা বের করল। চাকরি জাহান্নামে যাক কিন্তু আজ তন্ময় বিছানা থেকে কোনো মতেই উঠবে না, অফিসে যাওয়া তো দূরে থাক। মিলির ওড়নাটা পেঁচিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল, আর হাতে রাখলো নিজের ফোনটা।আশা একটাই, মিলি হয়তো ফোন করে বলবে একবার এসে ওদের ছেলেকে দেখে যেতে।তন্ময় জানে যদিও এটা আদতেও সম্ভব না, তবে মাঝে মাঝে তো কিছু অসম্ভবও সম্ভব হয়ে যায়। সৃষ্টিকর্তার তো করুণা হয় মাঝে মাঝে, হয়তো আজ ওর ওপরেও হয়ে গেল।ভুল করেও যদি তন্ময়ের ফোনে একটা কল চলে আসে মিলির নাম্বার থেকে তবে তো মন্দ হয় না!