রিক্ত বসন্ত

পর্ব - ২৯

🟢

মিলির নতুন চাকরিতে আজ ওর প্রথম দিন। মিলি জানে যে ওর যেই কলেজে চাকরি হয়েছে তাহারিমা বেগম সেই কলেজের প্রিন্সিপাল। তবে তাকদীর ও যে সে একই কলেজের লেকচারার হিসেবে যোগ দিয়েছে সেটা মিলির জানা ছিল না। তাহরিমা বেগম অবশ্য মিলিকে আগেই বলে দিয়েছে যে প্রথম দিন এক সঙ্গে যাবে। মিলি এখানকার কিছুই চেনে না, রাস্তাঘাট গুলো ভালো করে ওকে চিনিয়ে দেবে। মিলি তৈরি হয়ে নিচে নেমে এলো। যেহেতু সিঁড়ি বেয়ে নামতে মিলির বেশ ভালোই সময় লাগে তাই ও আগে বেরোলো। নিজের ঘরের জানালা থেকে নিচে মিলিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাকদীরও তাড়াহুড়ো করে তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লো। আসার সময় চেঁচিয়ে তাহরিমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আম্মু আস্তে ধীরে তৈরি হও। কোন সমস্যা নেই আমি নিচে অপেক্ষা করছি।”

কথাটা বলে তাড়াহুড়ো করে জুতোটা পরে বলা যায় একপ্রকার লাফিয়ে লাফিয়ে নিচে নামলো। পারলো না শুধু দোতলায় নিজের ঘরের জানালা দিয়ে নিচে লাফ দিতে।

মিলি কে দেখতে আজ বেশ সুন্দর লাগছে। একটা সাদা কালো রঙের মেশালো তাঁতের জামা পড়েছে। সেই সাথে নিজেকে ঠান্ডা থেকে বাঁচানোর জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা করেছে। বাইরে আজ বেশ ভালোই ঠান্ডা পড়েছে। তবে মিলি খেয়াল করলো তাকদীরের গায়ে কোনরকম কোন শীতের বস্ত্র নেই। ফরমাল ওয়েতে শার্ট আর প্যান্ট পড়েছে। অথচ এই ঠান্ডার মাঝে শীতের কাপড় না পরে বের হওয়া একরকম অসম্ভব ব্যাপারই। আর সেখানে এই ছেলে বেশ ঠিকঠাকভাবে দাঁড়িয়ে আছে। আবার দাঁত বের করে হাসছেও। মিলি কিঞ্চিৎ রাগী গলাতেই বলল,

“এই পা'গল ছেলে ঠান্ডার দিনে সোয়েটার না পরে বেড়িয়েছেন কেন?”

মিলির কথার প্রেক্ষিতে তাকদীর গা ছাড়া ভাব নিয়ে হেসে বলল,

“আরে সিনিয়র মাঝেমধ্যে একটু নিয়মের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে হয়। শরীর-মনের বিরুদ্ধে গিয়েও অনেক কিছু করতে হয়। একটাই তো জীবন। এই এক জীবনে সবকিছু অনুভব করতে হয়। বৃষ্টির দিনে ছাতার আশ্রয় থেকে বেরিয়ে ভিজতে হয়,কাঠফাটা গরমের দিনে ঘামতে ঘামতে ঘুরতে হয়,তীব্র শীতে শরীরে কম্পন ধরানোর জন্য সোয়েটার ছাড়া থাকতে হয়।আবার ভাঙা হৃদয়টাকে আরেকবার জোড়া লাগানোর চেষ্টাও করতে হয়।”

মিলি কপাল কোঁচকালো। ছেলেটা কিসের সাথে কিসের তুলনা করছে? আলোচনা হচ্ছিল সোয়েটার নিয়ে সেখানে সোজা ভাঙা হৃদয়কে টেনে নিয়ে এলো?এই ছেলেটার মতলবটা কি সেটাই বুঝে উঠতে পারে না মিলি। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কথা তো হচ্ছিল অন্য বিষয় নিয়ে তবে এখানে ভাঙ্গা হৃদয় জোড়া লাগানোর ব্যাপারটা কোথায় থেকে এলো?”

তাকদীর বেশ সহজ-সাবলীল গলায় হেসে বলল,

“আমি যে নিয়মের বাইরে বের হওয়ার কথা বলছিলাম সিনিয়র। দেখুন না নিয়মের বাইরে কত কিছু হয় তবুও আমরা বারবার চাই সেই নিয়মের মাঝে আটকে থাকতে। ভাঙা হৃদয় নাকি জোড়া লাগেনা এই কথাটাও আমরা সচরাচর বলে থাকি। এটাও কিন্তু আমাদের কাছে একটা নিয়মের মতো। অথচ দেখুন কত মানুষের ভাঙা হৃদয় অন্য কেউ এসে জোড়া লাগিয়ে দিয়ে যায়। শুধু একটা ছোট্ট চেষ্টার দরকার। আর যে জোড়া লাগাতে চাইছে তাকে একটা সুযোগ দেওয়ার দরকার।কিন্তু ওই যে আমরা মানুষ জাতি বরাবরই এই জায়গাগুলোতে নিয়মের মাঝে থাকতে পছন্দ করি সেজন্য ভাঙ্গা হৃদয়টাও আর জোড়া লাগানো হয় না।”

“আপনাকে দেখতে যতটা সহজ মনে হয় আপনি কিন্তু ততটাও সহজ না। দিন দিন আপনি আমার কাছে জটিল হয়ে উঠছেন। আপনার উদ্দেশ্যটা বলবেন? মাঝে মাঝে আমায় ইশারায় কি বোঝাতে চেষ্টা করেন আপনি?”

তাকদীর বেশ অদ্ভুত ভাবে হাসলো। মিলির দিকে একটু ঝুঁকে এসে বলল,

“ইশারা দিলাম সেটা বুঝলেন অথচ ইশারায় কি বোঝাতে চাইলাম সেটা বুঝলেন না সিনিয়র?”

“মানে?”

“মানে হলো আমি এতটাও জটিল না। আপনি যত আমার ভিতরে রহস্য খুঁজতে চাইবেন আমি আপনার জন্য ঠিক ততটাই জটিল হয়ে উঠবো। আমাকে জটিল বীজগণিত ভাবতে হবে না, আমাকে বরং আপনি ছোটবেলায় শেখা সহজ যোগ-বিয়োগের অঙ্ক ভাবুন।”

মিলি আর কিছু বলার সুযোগ পেল না তার আগেই তাহরিমা বেগম নেমে এলেন। গম্ভীর গলায় একবার তাকদীরের নাম ধরে ডাকতেই তাকদীর চট করে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। পিছন ঘুরে তাকিয়ে বাধ্য ছেলের মতন বলল,

“হ্যাঁ আম্মু বলো।”

"তুমি বাইক নিয়ে চলে যাও। আমি মিলির সাথে অটোতে আসবো।”

তাকদীর দ্বিতীয় কোন শব্দ উচ্চারণ করলো না। চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে ভেতর থেকে বাইকটা আনতে গেল। তবে সে নিজে আগে গেল না।আগে তাহরিমা বেগম আর মিলির জন্য একটা অটো ঠিক করে দিল। ওনারা চলে যেতেই ওনাদের পিছন পিছন বাইক নিয়ে গেল।

______

বেশ সকাল সকালে ঘুম থেকে উঠে জেসি রান্নাবান্নার কাজটা শেষ করল। তারপর ঘর-বাড়িও টুকটাক গোছালো ।আজকাল তো এসব না করলে রাজীবের কথা শোনার থেকে রেহাই পায় না। মাঝে মাঝে গায়ে হাত তুলতেও বাদ রাখে না। জেসি বুঝতে পারে তন্ময়কে ছেড়ে দিয়ে ও কত বড় ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে।তন্ময় কখনো ওর গায়ে হাত তুলত না সেই বিশ্বাস জেসির ছিল। সত্যি বলতে তন্ময় তো জেসি কে চেয়েছিল। অনেকবার বিয়েও করতে চেয়েছে কিন্তু জেসি মানা করেছে। ওই যে কথায় আছে না অতি চালাকের গলায় দড়ি? ঠিক তাই হয়েছে জেসির সাথে। ভেবেছিল তন্ময়ের হাতে এখন চাকরি নেই, আদৌও কোনো চাকরি পাবে কিনা সন্দেহ আছে, ধার-দেনায় জর্জরিত সেখানে রাজীব একটা ভালো কোম্পানিতে ভালো পোস্টে জব করছে। রাজীবকে ছাড়া উচিত হবে না। আর সেই লোভে পড়েই আজ জেসির এই অবস্থা।

সে যাই হো,জেসিও এখন খুব একটা আফসোস করেনা। সংসারই তো চেয়েছিল জেসি। ওর একটা স্থায়ী বাসস্থানের ভীষণ দরকার ছিল যেটা রাজীবের কাছে পেয়েছে। এখন দেখা যাক কতদিন এই স্থানটা টিকিয়ে রাখা যায়। বিয়েটা যেহেতু একবার করেই নিয়েছে তবে সংসারটা তো করতে হবে। এছাড়া তো আর কোন গতিও নেই। এখন তো তন্ময়ের কাছে গেলেও আর ফিরে নেবে না ওকে।

রান্নাবান্না শেষে অফিসে বেরোনোর জন্য তৈরি হয়ে নিল জেসি। ততক্ষণে রাজীবও তৈরি হয়ে ডাইনিং টেবিলে খেতে বসেছে। জেসি চুপচাপ এসে রাজীবের প্লেটে খাবার তুলে দিয়ে নিজেও খেতে বসলো। সকাল সকাল জেসি কে এমন তৈরি হতে দেখে রাজীব ভ্রুঁ কুঁচকে প্রশ্ন করল,

“তুমি কোথায় যাচ্ছো?”

জেসি বেশ গম্ভীর গলাতে বলল,

“এমন ভাব করছো যেন জানোই না?”

“সোজাসুজি বলো কোথায় যাচ্ছো?”

জেসি খাওয়া থামিয়ে রাজীবের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ভুলে যেওনা রাজীব তুমি কোন বেকার মেয়েকে বিয়ে করোনি। তোমার ওয়াইফ সেলফ ডিপেন্ডেন্ট। আমি জব করি। আজ ছুটি শেষ তাই অফিসে যাচ্ছি।”

রাজীব ব্যঙ্গাত্মক হেসে বলল,

“চাকরি করতে যাচ্ছো? কার অনুমতি নিয়ে? কে অনুমতি দিয়েছে তোমায় চাকরি করতে যাওয়ার?”

জেসি অবাক গলায় বলল,

“আমি চাকরিতে যাব এখানে কারো অনুমতি দেওয়ার কি আছে?”

“অবশ্যই আছে। ভুলে যেওনা এখন তুমি আমার ওয়াইফ। আমি যা বলবো তোমায় তাই করতে হবে। আমি ইশারায় উঠতে বললে উঠতে হবে বসতে বললে বসতে হবে।”

“ওহ্ রিয়েলি? সব রুলস শুধু আমার জন্য তোমার জন্য কোনো রুলস নেই তাই তো?”

“নেই। তার কারণ আমি তোমার টাকায় খাচ্ছি না, আমি তোমার বাড়িতে থাকছিনা। তুমি আমার টাকায় খাচ্ছো, আমার বাড়িতে থাকছো। কোথাও যাওয়া হবে না তোমার। চুপচাপ বাড়িতে বসে থেকে বাড়ির কাজ করো।”

জেসি রাগান্বিত গলায় বলল,

“বাড়াবাড়ি করো না। তোমার অনেক টর্চার আমি মেনে নিয়েছি। তুমি আমার গায়ে হাত তুলেছো তাও আমি কিছু বলেনি কিন্তু তাই বলে এটা ভেবোনা যে আমি সারা জীবন চাকরি না করে বাড়িতে বসে হাউস ওয়াইফের মতো দিন কাটাবো। সকাল সন্ধ্যা তোমার হাতে মার খাবো, তিন বেলা চুপচাপ তোমার জন্য রান্না করবো,তোমার কাপড়চোপড় ধুঁয়ে দেবো আর আমার নিজের জীবন বলতে কিছু থাকবে না। আবার দিন শেষে যখন আমার কোন কিছুর প্রয়োজনে তোমার কাছ থেকে টাকা চাইবো তখন তুমি আমায় গরম দেখাবে তাই তো?”

“নিজের প্রয়োজন গুলো কমাও। টুকটাক জামা কাপড়,তেল সাবান এগুলো দিতে পারব কিন্তু তুমি সপ্তাহে সপ্তাহে পার্লারে যাবে,আজ এই বন্ধুর বার্থ ডে পার্টি,কাল ওই বন্ধুর বিয়ে এসবের জন্য রোজ নতুন নতুন ড্রেস কিনবে, পার্লার থেকে সাজগোজ করবে,কারণে অকারণে পার্টি থ্রো করবে এসবের জন্য আমি টাকা দিতে পারব না।”

“ফাইন। তোমাকে দিতে হবেও না। সেজন্যই আমি চাকরি ছাড়িনি। আমার নিজের প্রয়োজন গুলো আমি নিজে মিটিয়ে নিতে পারবো।”

খাবারটা আর শেষ করা হলো না জেসির। ব্যাগটা হাতে নিয়ে চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে রাজীব ওর হাত টেনে ধরলো। জেসি এবার কটমটে দৃষ্টিতে রাজীবের দিকে তাকিয়ে বলল,

বিজ্ঞাপন

“হাত ছাড়ো আমার।”

রাজীবও দাঁতে দাঁত পিষে বললো,

“যদি তোমার চরিত্র ঠিক থাকতো তাও চাকরি করতে দেওয়ার কথা ভাবতাম। কিন্তু তুমি ভাবলে কি করে তোমার এই চরিত্র নিয়ে আমি তোমাকে চাকরি করার অনুমতি দেবো?”

“খবরদার রাজীব আমার চরিত্রের উপর আঙুল তোলার চেষ্টা করবে না। আগে নিজের দিকে তাকাও।”

“জাস্ট শাট আপ বেইব। তন্ময়ের সাথে সম্পর্ক চলাকালীন তুমি আমার সাথে কি কি করেছো সেসব কি আমি ভুলে গেছি ভেবেছো? এখন আমি তোমাকে ছেড়ে দিয়ে রাখি আর তুমি আবার অন্য কারো সাথে এসব করে বেড়াও। পাগল পেয়েছো আমায়?”

“তুমিও তো অন্য কারো সাথে সম্পর্কে জড়াতে পারো?”

“আমি কি করবো না করবো সেসবের কৈফিয়ত আমি তোমায় দেবো না কিন্তু তোমাকে দিতে হবে। তোমাকে আমার কথায় উঠতে হবে,বসতে হবে। চুপচাপ বাড়িতে বসে থাকো। আমার কথার অবাধ্য হলে একদম বের করে দেবে বাড়ি থেকে।”

রাগে জেসির মাথা গরম হয়ে গেল। কোন মতেই আর রাজীবকে কিংবা ওর কথাগুলোকে সহ্য করতে পারছে না। রাগান্বিত ভঙ্গিতে রাজীবের দিকে তেরে গেলে রাজীব ঠাস করে একটা চ'ড় লাগালো। জেসি চেয়ারের হাতল ধরে কোনমতে নিজেকে মেঝের উপর উপুড় হয়ে পড়ার থেকে আটকালো। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারল না। খুব অসহায় লাগলো নিজেকে সেই সাথে ভীষণ অপমানিতও বোধ করলো। একটা সময় রাজীব ওর সাথে একটু সময় কাটানোর জন্য পিছু পিছু ঘুরেছে,কত রিকুয়েস্ট করেছে আর আজ জেসির এতটাই খারাপ দিন চলে এসেছে যে সেই রাজীব ওর সাথে কুকুরের মতন ব্যবহার করছে। মানুষ হিসেবেই গণ্য করছে না।

রাজিব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রগুলো নিয়ে জেসি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“বাড়ির বাইরে পা রাখলে আর কোনদিন এই বাড়িতে ঢুকতে পারবি না মনে রাখিস।”

কথাগুলো বলে রাজীব চলে গেল। যাওয়ার সময় বাইরে থেকে দরজায় তালা দিয়ে গেল। জেসি ধপ করে সেখানেই বসে পড়লো। মনে পড়ে গেল অনেকগুলো মানুষের বলা একটা নির্দিষ্ট কথা। আর সেটা হলো,

“অন্যের সংসার ভেঙে জেসি কখনোই নিজের সুখের সংসার গোছাতে পারবে না।”

এই কথাটা ওকে শুধু মিলি একা বলেনি আরো অনেক মানুষ বলেছে। তবে তখন জেসি এই কথাটা কে খুব একটা গুরুত্ব সহকারে নেয়নি। ভেবেছিল মানুষের কথায় ওর আর কি যায় আসবে? তন্ময় তো ওকে ভালোবাসে। নিশ্চয়ই ওদের ভালো সংসার হবে।

তবে জেসির এখন কেন যেন মনে হচ্ছে সবার অভিশাপ ফলে গেছে। মিলির চোখের জলের দাম জেসি কে দিতে হচ্ছে। সুখের সংসার চেয়েছিলো জেসি। আর এটাকে নিজের সংসার বলেই দাবি করতে পারেনা। রাজীবের হাতের পুতুল মনে হয় নিজেকে যাকে রাজীব দিনের বেলায় নিজের বাড়ি ঘর পরিষ্কার করাতে কাজে লাগায় আর রাতের বেলা নিজের শরীরের চাহিদা মেটাতে কাজে লাগায়।

________

“ম্যাডাম কাজ কি আছে আমার? বললেন তো কাজের জন্য ডেকেছেন কিন্তু এখনো তো কিছুই বলছেন না আপনি।”

তন্ময়ের প্রশ্নে ল্যাপটপের উপর থেকে চোখ তুলে তন্ময়ের দিকে তাকালো লিজা। অদ্ভুত রকমের একটু হেসে বলল,

“ইউ মে কল মি লিজা।”

লিজা কি উদ্দেশ্যে কি ইঙ্গিতে তন্ময় কে কথাটা বলল সেসব তন্ময় বোঝার প্রয়োজন মনে করলো না। সে বরাবরই একটু কাজ প্রিয় মানুষই বলা চলে। যদিও মাঝে জীবনের সব ভালো অভ্যাস প্রায় হারিয়ে ফেলেছিল। তবে মনে হচ্ছে এবার অন্তত কাজের প্রতি তার ভালোবাসাটা ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। সেখানে এরা চাকরি দিয়েও কাজ করতে দিচ্ছে না। আর এর আগের অফিসে তো নিঃশ্বাসটা অব্দি ফেলার সময় দিতো না ওরা তন্ময় কে। এতকিছুর মাঝে লিজার এই ঢং এর কথা পছন্দ হলো না তন্ময়ের। তবে রাগ দেখানো যাবে না। যতই হোক বস বলে কথা। যেমন উচ্চ পদে চাকরি দিতে পেরেছে ঠিক তেমনি যেকোনো সময় অফিস থেকে বের করেও দিতে পারে। ভদ্রতার খাতিরে কন্ঠটা নরম করে বলল,

“ম্যাডামই ঠিক আছে। নাম ধরে ডাকতে আমার অসুবিধা হবে। তা ম্যাডাম কি প্রয়োজনে আমায় ডেকেছিলেন সেটা বললে একটু সুবিধা হত?”

“আচ্ছা ঠিক আছে বলছি। আপনি বোধহয় বিরক্ত হচ্ছেন আমার আজেবাজে কথায়। সো তন্ময় আপনাকে যে পোস্টে চাকরিটা দেওয়া হয়েছিল সেখান থেকে আপনাকে সরানো হচ্ছে।”

তন্ময় চমকে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলল,

“মানে চাকরি দিলেন আবার কেড়ে নিলেন? এসবের মানেটা কি? আর আপনারা আমার থেকে চাকরিটা কেড়েই যখন নেবেন তাহলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা হাতে ধরিয়েছিলেন কেন? আজকে আমার অন্য এক জায়গায় ইন্টারভিউ ছিল সেটাও মিস হয়ে গেল।”

“আরে তন্ময় কুল ডাউন। আমি বলেছি আপনাকে যেই পদে চাকরিটা দেওয়া হয়েছিল সেখান থেকে সরানো হয়েছে আমি আপনাকে বলিনি যে আপনার থেকে চাকরিটাই আমরা কেড়ে নিয়েছি। আপনার চাকরি আছে।”

তন্ময় এবার নাক মুখ কুঁচকে বিরক্তের সহিত বলল,

“এসব আবার কেমন খেলা? মানে সবাই সব দিক দিয়ে শুধু আমাকেই বাঁশ দেবে?”

লিজা শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“আপনি তো আগেই হাইপার হয়ে যাচ্ছেন।প্লিজ সিট ডাউন, টেক এ ডিপ ব্রিথ এন্ড লিসেন টু মি।”

তন্ময় বিরক্ত হলো ঠিকই তবে লিজার কথা অমান্য করতে ইচ্ছে করলো না। একেই তো উচ্চপদটা কেড়ে নিয়েছে এখন যদি বেয়াদবি করে তাহলে হয়তো চাকরিও নিয়ে নিতে পারে। ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লো।

“সব করেছি। এবার বলুন কি অপরাধ আমার?”

“আপনার কোন অপরাধ নেই। আসলে আমার যিনি পিএ ছিলেন ওনার বিহেভিয়ারের জন্য আমি ওনাকে চাকরি থেকে বের করে দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন আর আমার মন মতো কোনো পিএ পাচ্ছি না।আপনাকে দেখে আমার বেশ ভালো লেগেছে তাই আজ থেকে আপনি আমার পিএ। আর একটা কথা আপনি যে পোস্টে চাকরি পেয়েছিলেন তার থেকে কিন্তু এখন বেতনটাও বেশি পাবেন। আর আমার পিএ হওয়ার সুবাদে অনেক আলাদা সুযোগ সুবিধাও পাবেন। সো চিল।”

তন্ময় এবারে হাফ ছেড়ে যেন বাঁচলো। কিছু মুহূর্তের জন্য ভেবেছিল চাকরিটাই বোধহয় গেল। তবে তেমন কিছুই হয়নি। বরং পদোন্নতি হয়েছে। তবে হঠাৎ করে তন্ময়ের ভেতরে থাকা সন্দেহ বাতিকটা আবারও জ্বলে উঠলো। ইন্টারভিউয়ের দিন থেকে এই লিজা নামক মেয়েটা ওকে আলাদা সুযোগ-সুবিধা দিয়েই চলেছে তো দিয়েই চলেছে। এখন আবার তার ওপরে বলছে পিএ হওয়ার সুবাদে আরও সুযোগ সুবিধা পাবে। কিন্তু এত সুযোগ সুবিধা কেন পাবে তন্ময়?

সন্দেহী গলায় প্রশ্ন করল,

“ম্যাডাম সত্যি করে একটা কথা বলুন আপনারা কেন আমাকে এত অত্যাধিক সুযোগ সুবিধা দিচ্ছেন?আপনার বাবার কসম, মিথ্যা বললে কিন্তু সমস্যা হবে।”

“আমি আপনাকে মিথ্যে বলতে যাব কেন তন্ময়? আমি তো আপনাকে আগেও বলেছি আপনাকে আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। পছন্দ না হলে কি আর আমার পিএ বানাই?”

তন্ময়ের এবারও যেন বিশ্বাস হলো না লিজার কথা গুলো। তন্ময়ের দৃষ্টিতে থাকা সন্দেহ লিজা এবারে ধরতে পারলো। চেয়ার থেকে উঠে এসে তন্ময়ের পাশের চেয়ারটায় বসে তন্ময়ের কাঁধে হাত রেখে ভরসা দিয়ে আলতো হেসে বলল,

“আপনি এগুলো ডিজার্ভ করেন তন্ময়। আর সেজন্যই এগুলো আপনি পাচ্ছেন। ট্রাস্ট মি আপনি এর থেকেও আরো অনেক বেশি ডিজার্ভ করেন।”

লিজার এবারের কথায় তন্ময় খুশি হলো। ওর নিজেরও মনে হল হ্যাঁ তন্ময় এর থেকেও অনেক বেশি কিছু ডিজার্ভ করে। তন্ময়ের ভেঙে যাওয়া আত্মবিশ্বাসটা যেন আবারো ফিরে এলো। বেশ ভালোই আনন্দ হলো।তবে সেই আনন্দটা খুব বেশি লিজার সামনে দেখাতে পছন্দ করলো না। খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

“ম্যাডাম আপনাকে ধন্যবাদ আমাকে সুযোগটা দেওয়ার জন্য। আমি চেষ্টা করব আপনার ভরসা রাখার।”

লিজা প্রত্যুত্তরে পাল্টা হাসলো। মুখে আর কিছু বললো না। মনে মনে আওড়ালো,

“সুযোগ তো তোমাকে দিতেই হতো তন্ময়। তোমার জন্য না আমার জন্য।”

বিজ্ঞাপন
রিক্ত বসন্ত গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস