তাহরিমা বেগম রান্না করছেন।ওনার আশেপাশে ঘুরঘুর করছে তাকদীর।উনি বুঝতে পারছেন যে ছেলে ওনাকে কিছু বলতে চায় তবে নিজ থেকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।ছেলে এখন নিশ্চয়ই তার যথেষ্ট বড় হয়েছে যে নিজের প্রয়োজনগুলো নিজে বলতে পারবে।সেখানে তো জোর করে ছেলের মুখ থেকে কথা বের করার কোন প্রয়োজন নেই।
এদিকে তাকদীর ভয়ে ভয়ে আছে।জানে বেশিক্ষণ এভাবে কোন কিছু না বলে ঘোরাঘুরি করলে মায়ের কাছে বকা খাবে কিন্তু তবুও সে ঘরে যেতে পারছে না।আবার বুঝতে পারছে না যে কথাটা বলতে চাইছে তাহরিমা বেগমকে সেটা বলা ঠিক হবে কিনা।এখন অবশ্য যদি কিছু না বলে চলে যায় তাতেও বকা খাবে। সবশেষে তাকদীর সমীকরণটা মিলিয়ে ভাবলো বললেও বকা খাবে না বললেও বকা খাবে তাহলে বলে বকা খাওয়াটাই ভালো।অন্তত শান্তি তো পাবে।
“আম্মু!”
“হ্যাঁ বাবা বলো?”
তাহরিমা বেগম ইচ্ছে করে নিজের কন্ঠটা নরম করলেন।তিনি বুঝতে পারছেন ছেলে ভয় পেয়েই তাকে কিছু একটা বলতে পারছে না।কথাটা হয়তো গুরুত্বপূর্ণ। সেজন্যই তিনি নরম কন্ঠে ছেলের ডাকের জবাব দিয়ে ওকে বোঝাতে চাইলেন যে উনি কিছু বলবেন না।
এদিকে মায়ের নরম গলার আওয়াজ শুনে তাকদীর একটু সাহস পেল।গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এসে সেও ধীর গলায় বলল,
“সিনিয়র কে খাবার দেবে না?”
তাহরিমা বেগম ভ্রুঁ কুঁচকে প্রশ্ন করলেন,
“সিনিয়র কে?”
“আমাদের নতুন ভাড়াটিয়ে।”
“মিলি তোমার থেকে বয়সে বড়। এসব কি ধরনের সম্বোধন?আপু বলে ডাকবে।বড়দেরকে সম্মান করতে শিখিয়েছে তো আমি তোমায়।”
তাকদীর মনঃক্ষুন্ন হলো ঠিকই তবে মায়ের মুখের উপর কথা বলার সাহস তার নেই।অগত্যা তাহরিমা বেগমের কথাই রাখতে হলো।
“আচ্ছা ঠিক আছে এবার থেকে ডাকবো। তো সিনিয়র আপুকে খাবার দেবে না?”
“হঠাৎ এই কথা?”
“আসলে উনি তো আজ নতুন এলেন,বাড়িঘর তো কিছুই গোছানো হয়নি। আমি ওনাকে এক কাপ চা খাওয়াতে বলেছিলাম উনি বললেন যে কিছুই নাকি রান্নাবান্নার ঠিক নেই।তারপরে আবার এই অবস্থাতে বাইরে থেকেও খাবার এনে খেতে পারবে না।তাই বলছিলাম যে আমাদের দুজনের জন্য যখন রান্না করছোই ওনার জন্যও একটু রান্না করা যায় তাই না?মানে যেহেতু আমাদের প্রতিবেশি এতোটুকু দায়িত্ব পালন করতেই পারি।”
“ওকে দেবো জন্যই তো তাড়াহুড়ো করে রান্নাটা করছি।কিন্তু মেয়েটা যে কি খেতে পছন্দ করে সেসব তো কিছুই জানিনা।”
তাকদীর তড়িঘড়ি করে চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“আমি শুনে আসি?”
তাহরিমা বেগম তাকদীরের দিকে তাকাতেই তাকদীরের মুখটা ফাটা বেলুনের মতন চুপসে গেল। নিজের উচ্ছ্বসিত সত্তাটাকে খুব ঝটপট শান্ত করলো।
“শোনো তাকদীর এমন কোন আচরণ করো না যাতে তোমার মায়ের শিক্ষার উপর প্রশ্ন ওঠে।
এমনিতেই মিলির প্রতিটা বিষয়ে তোমার আগ্রহ আমি একটু বেশি দেখছি।এর কারণটা কি?”
তাকদীর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
“তুমি আম্মু।”
“আমি মানে?”
“তুমি তোমার সাথে সিনিয়রের মিল খুঁজে পাও না আম্মু?আমি তো সিনিয়রের মাঝে তোমায় দেখতে পাই।তোমার পুরো জীবনে যেমন শুধুই আমি আছি তেমনি সিনিয়রের পুরো জীবন জুড়েও শুধুমাত্র সিনিয়রের বাবুটা আছে।আজ সিনিয়র যে অবস্থায় আছে এক সময় তুমিও সেই অবস্থায় ছিলে। তুমি তখন কতটা একা ছিলে সে সব তো আমায় বলেছো। আমি তো জানি আমার আম্মু আমায় নিয়ে কতটা স্ট্রাগল করেছে।আজ প্রথমবারের মতন আমি নিজের চোখে আমার আম্মুর মতন আরেকজনকে স্ট্রাগেল করতে দেখছি।আমি সেই কারণেই সিনিয়রকে একটু সাহায্য করতে চাই।”
ছেলের কথায় বোধহয় তাহরিমা বেগম সন্তুষ্ট হলেন।তবে সেসব তার মুখ ভঙ্গি দেখে বোঝা গেল না।কেননা এই ব্যাপারে তিনি ছেলেকে বেশি প্রশ্রয় দিতে চান না।গম্ভীর গলায় বললেন,
“ফ্রিজে দেখো তো ডিম আছে কিনা?”
তাকদীর বাধ্য ছেলের মতন গিয়ে ফ্রিজ থেকে ডিম নিয়ে এসে মায়ের হাতে দিল।তাহরিমা বেগম আবারো ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“দুটো পেঁয়াজ কেটে দাও।”
তাকদীরের বাধ্য ছেলের মত ছুরি দিয়ে দুটো পেঁয়াজ কেটে দিল।এসব কাজে তাকদীর ভীষণ পটু। রান্নাবান্নায় হোক কিংবা ঘর-দর গোছানো সব কাজই তাহরিমা বেগম ওকে খুব ভালোভাবে শিখিয়েছেন।তিনি চান তার ছেলে যেন কোন মেয়ের আস্থা হয়ে উঠতে পারেন, সবথেকে বেশি ভরসাযোগ্য,বিশ্বস্ত জায়গা হয়ে উঠতে পারে।তিনি চান কোন মেয়ে যেন গর্ব করে বলতে পারে যে তাহরিমা বেগম গর্ব করার মতনই একটা ছেলে জন্ম দিয়েছে।
________
রান্নাঘরে তাহরিমা বেগম কে সাহায্য শেষে তাকদীর ঘরে এসে গোসল করলো।বাথরুম থেকে বের হতেই ফোনটা বেজে উঠলো।হাতে নিয়ে দেখল লাবিবা কল করেছে।
“হ্যাঁ মুটকি বল?”
তাকদীরের মুখ থেকে মুটকি সম্বোধনটা শুনতেই অপর পাশ থেকে লাবিবা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বলল,
“শা/লা শুটকি বাঁশ কোথাকার এই মুটকির হাতে একটা চ/ড় খেলে বুঝবি মজা।বেয়া/দব ছেলে এসব কোন ধরনের সম্বোধন?”
তাকদীর গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“মুটকি কে মুটকি বলবো না তো কি শুটকি বলবো?একবার নিজের ওজনটা মেপে দেখ।কমসে কম পাঁচশো কেজি হবি তুই।”
লাবিবা দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,
“আমার ওজন পঞ্চাশ কেজি।”
“দেখতে তো হাতির মতোই লাগে।মনে হয় মেশিনে সমস্যা ছিল।জানিস আমি বুঝে উঠতে পারি না তোকে বিয়ে করার জন্য কেউ কি করে রাজি হয়ে গেল?জেনে শুনে কেউ হাতিকে বাড়িতে নিয়ে যায় নাকি?তুই তো ওর বাড়িটাকেই খেয়ে ফেলবি।সিনিয়ারের সাথে থেকেও কি একটু নিজের শরীর স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখতে শিখিসনি।সিনিয়ার কে দেখতো কত সুন্দর,কিউট গুলুমুলু দেখতে।”
“মিলির ওজন আমার থেকেও বেশি।আমাকে তোর হাতি মনে হয় তাহলে ওকে গুলুমুলু কেন মনে হচ্ছে?সমস্যা কি তোর?”
তাকদীর দাঁত দিয়ে জিভ কাটলো।ভুল জায়গায়,ভুল মানুষকে,ভুল কথাটা বলে ফেলেছে।মনের কথা আর যাকেই বলুক না কেন লাবিবাকে কোনমতেই বলা যাবে না।তাহলে মিলির কানে সেটা পৌঁছাতে দু সেকেন্ড সময়ও লাগবে না।
“সিনিয়র মোটা তার কারণ আছে।তুইও কি প্রেগন্যান্ট?”
“বেয়া/দব ছেলে কোথাকার।ফোন রাখ।”
“তুই ফোন দিয়েছিলি, আমি না।আমার বা/লেরও ঠ্যাঁকা পরেনি তোরে ফোন দেওয়ার।”
লাবিবা রেগেমেগে সত্যি ফোনটা কেটে দিতে উদ্দ্যত হলে অপর পাশ থেকে তাকদীর ব্যস্ত গলায় বলল,
“এই মুটকি দাঁড়া।”
লাবিবা এবার খেঁকিয়ে উঠে বলল,
“কি হয়েছে?”
“সিনিয়ারের বাকি গল্প কখন শোনাবি সেটা বল?”
“শোনাবো না।তোকে কিচ্ছু বলবো না।”
“বাড়িতে গিয়ে কিন্তু লা/থি মে/রে আসবো।আজ রাতে ফোন দেবো আমি।”
“বললাম না বলব না তোকে।শুনতে চাইলে আগে আমার কাছে ক্ষমা চা।আর কথা দে কখনো মুটকি বলে ডাকবি না।”
তাকদীর জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস ফেলে নিজের রাগটুকু নিয়ন্ত্রণ করলো।নিজেই নিজেকে বুঝ দিল,
“এখন তোর রাগলে চলবে না তাকদীর।যেহেতু দরকারটা তোর তার মানে তোকে একটু নিচু হতেই হবে।আপাতত বলে দে পরে না হয় দেখা যাবে ওকে মুটকি বলে ডাকবি না শুটকি বলে ডাকবি।”
“আচ্ছা ঠিক আছে যা সরি।আর ডাকবো না তোকে মুটকি বলে।রাতে কথা হচ্ছে তাহলে।”
“ঠিক আছে।আর মিলি কোথায় রে?ওকে ফোনে পাচ্ছিনা।”
“রেস্ট নিচ্ছে হয়তো।সারাক্ষণ বিরক্ত করিস কেন ফোন দিয়ে?সবাই কি আমার মত যে তোর এসব বিরক্ত সহ্য করবে?ধ্যাত রাখ তো ফোন। কথাই বলতে ইচ্ছে করছে না তোর সাথে।”
কথাটা বলে তাকদীর ফোনটা কেটে দিল।তারপর আবারও সুইচ অফ করে রাখল।কেননা তাকদীর জানে শেষে লাবিবার সাথে যে ব্যবহারটা করেছে তার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য লাবিবা আবার ওকে কল করবে।আর এই মুহূর্তে লাবিবার এসব কথা একটুও শুনতে ইচ্ছে করছে না।ফোনটা বিছানার ওপর ছুঁড়ে মে'রে সোজা বারান্দায় গেল।তাকদীরের বারান্দায় বেশ অনেকগুলো ফুলের গাছ।তাকদীর ভীষণ সৌখিন মানুষ।গাছ গোছালির যত্ন করতে তার ভীষণ ভালো লাগে।তবে গত কয়েক দিন ধরে ঠিকঠাক যত্ন নিতে পারছে না ব্যস্ততার কারণে।কয়েকটা গাছের পাতা শুকিয়েও উঠেছে পানির অভাবে।
ভাবলো গাছগুলোর একটু পরিচর্যা করা যাক।তাকদীরের এসব কাজের মাঝে হঠাৎ করে কোথা থেকে একটা পরিচিত মেয়েলি কন্ঠস্বর ভেসে এলো ওর কানে।
“এই যে জুনিয়র,ফুলের গাছগুলোতে পানি দেন না কেন আপনি?যত্নের অভাবে ম'রে যাচ্ছে তো।এত যত্ন করে যখন লাগিয়েছেন তখন তো একটু ভালোও তো বাসতে পারেন।”
তাকদীর ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই পাশের বারান্দায় মিলি কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল।তাকদীর তো ভুলেই গিয়েছিল যে ওর বারান্দা থেকে মিলির বারান্দাটা বেশ ভালোভাবেই দেখা যায়। চাইলে তো মাঝে মাঝে এখানে দাঁড়িয়ে থেকেও দুজনে টুকটাক কথাবার্তাও বলতে পারে।বাহ! বেশ ভালোই হলো।
মিলির প্রশ্নের উত্তরটা দেওয়ার আগে তাকদীর একটু ভাবলো।ভাবলো কি করে মিলিকে অন্যভাবে অন্য কিছু বোঝানো যায়।
“শুধু অযত্নে পড়ে থাকা ফুল গাছগুলোকেই দেখলেন সিনিয়র,আমাকে দেখলেন না?ভালোবাসা তো একটু আমারও দরকার।”
মিলি একটু শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“এত তরতাজা, চঞ্চল একটা ছেলেও নাকি অযত্নে আছে ভাবা যায়?”
তাকদীর দুঃখী মুখ করে বলল,
“এই তরতাজা মুখের পেছনে অনেক কষ্ট লুকিয়ে আছে সিনিয়র।একবার যদি আপনাকে আমার মনটা দেখাতে পারতাম কতটা কষ্ট জমিয়ে রেখেছি সেখানে তবে আপনি আমার কষ্টে কেঁদে কেঁদে নদী বানিয়ে ফেলতেন।”
“কিসের এত কষ্ট আপনার?”
“ওইটাই তো জানি না।আসলে কি বলুন তো কোনো কষ্টই নেই আমার।কিন্তু কষ্টটা অনুভব করতে ইচ্ছে করে।যখন অন্যদের মুখে তাদের কষ্টের কথা শুনি তখন আমারও মনে হয় যে আমার জীবনেও কিছু কষ্ট থাকা দরকার ছিল।আমারও কাঁদতে ইচ্ছে করে কিন্তু কোন কারণ খুঁজে পাই না।এই কষ্টের অনুভূতি গুলো কেমন হয় সেটা আমি বুঝি না তাই এমনি একটু ঢং করলাম।”
“তবে আমার ভাগের কিছু কষ্ট আপনাকে দিয়ে দেই?আসলে এত কষ্ট আমি সহ্য করতে পারছি না।আপনি একটু আমার কষ্টটা আমার থেকে নিয়ে নিলে আপনার ইচ্ছেটাও পূরণ হবে আবার আমিও একটু ভালো থাকতে পারবো।”
তাকদীরের মুখ থেকে চঞ্চল হাসিটা উড়ে গেল।
হঠাৎ করে মুখ ভঙ্গি তার গুরুতর হয়ে উঠল।
“কিসের এত কষ্ট আপনার?দিয়ে দিন আমাকে আপনার কষ্ট।যত কষ্ট আছে সব দিয়ে দিন আমায়, কোন সমস্যা নেই।”
তাকদীরের এত গুরুতর ভাব ভঙ্গি দেখে মিলি একটু অবাক হলো।হঠাৎ করে ছেলেটা যেন একটু রহস্যময় হয়ে উঠল মিলির কাছে। এই ছেলেটাও যে কোন বিষয় নিয়ে এতটা গুরুতর হতে পারে সেটা মিলির বোধহয় আন্দাজে ছিল না।
সে যাই হোক তবে নিজের কষ্ট নিয়ে তাকদীরের সাথে আর কথা বাড়াতে চাইলো না।তাড়া দেখিয়ে বলল,
“আমি ভিতরে যাই। শরীর ভালো লাগছে না,একটু ঘুমোবো।”
কথাটা বলে মিলি ঘরে চলে যেতে নিলে তাকদীর জোরে ওর নাম ধরে চেঁচিয়ে উঠলো।মিলি চমকে পিছন ফিরে তাকিয়ে বলল,
“কি হয়েছে?”
“একবার যখন তাকদীর কে কিছু দিতে চেয়েছেন তাহলে তাকদীর সেটা নিয়েই ছাড়বে।একবার যখন আপনার কষ্ট আমায় দিতে চেয়েছেন তার মানে আমি নেবই।আপনি না দিলে জোর করেই নেব।”
মিলি বিড়বিড় করে “পাগল” বলে ভেতরে চলে গেল।তবে মিলির বলা সেই পাগল শব্দটা তাকদীরের কান অব্দি পৌঁছালে না।ফলস্বরূপ ভাবলো ওকে বোধ হয় অবহেলা করে মিলি চলে গেল।একটু খারাপ লাগলো তাকদীরের। উৎফুল্ল মনটা আবার ঠুস করে খারাপ হয়ে গেল।তবে পর মুহূর্তে আবার খুশি হয়ে গেল।এখন না হয় অবহেলা করেছে কিন্তু মিলি তো নিজ থেকেই কথা বলেছে ওর সাথে।তবে কি ব্যাপারটা একটু হলেও এগোচ্ছে না?
নিজের অজান্তেই তাকদীর লজ্জা পেল।কেন লজ্জা পেল নিজেও জানে না।তখনই কানে ভেসে এলো ওর মায়ের ডাক।খুব তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক হয়ে চলে গেল।কেননা এই লজ্জা রাঙা মুখ যদি ওর মা দেখত তবে অবস্থা খারাপ হয়ে যেত।
_____
লিজা কে সমানে কল করে যাচ্ছে ওর বাবা লুৎফর আহমেদ।মেয়েটা তার বড্ড অসভ্য।একটা কথা শোনে না।কে জানে এত রাত অব্দি কোথায় কি করছে। কতবার করে উনি বললেন একটু ভালো হতে,একটু যেন ওনার কথা শোনে কিন্তু না মেয়েটা তার কোন কথা শোনে না।নিজে কত শখ করে কত ভালো একটা ছেলের সাথে বিয়েও দিয়েছিলেন কিন্তু মেয়েটা তার এতটাই অসভ্য যে ঠিকঠাক সংসারও করতে পারল না।এখন নিজের মেয়েকে তো আর ফেলে দিতে পারেন না। যেমনই হোক একমাত্র মেয়ে।এত বড় ব্যবসা তার, সবটাই তো মেয়েটাকেই সামলাতে হবে।
বিশ বারের অধিক কল দেয়ার পর অবশেষে লিজার ফোনটা ধরার সময় হলো।লুৎফর আহমেদ কিছু বলতে চাইলো তবে ফোনের অপর পাশ থেকে উচ্চস্বরে গানের আওয়াজ ভেসে আসায় তিনি বুঝলেন যদি তিনি লিজাকে কিছু বলেন তারপরও লিজা কিছু বুঝতে পারবে না।তার আর বুঝতে বাকি রইল না যে মেয়েটা তার কোথায় গেছে। তবে ধীরে ধীরে গানের আওয়াজটা কমে এলো।বুঝতে পারলেন লিজা হয়তো ক্লাব থেকে বেরোচ্ছে।গানের আওয়াজটা একেবারে হালকা হয়ে এসেছে।এবারে তিনি রাগান্বিত গলায় বললেন,
“অসভ্য মেয়ে এত রাত অব্দি কোথায় আছো তুমি?”
লিজা নেশালো গলায় বলল,
“আ’ম কামিং পাপা।”
“তুমি আবার ড্রিঙ্ক করেছো?”
“নট টু মাচ পাপা।এখন আমি ফোনটা রাখছি, ড্রাইভ করতে হবে।”
“তুমি এই অবস্থায় ড্রাইভ করবে?ড্রাইভার নিয়ে যাও নি কেন সাথে?”
লিজা খিলখিল করে হেসে উঠে বলল,
“সরি পাপা আমি ভুলে গিয়েছিলাম।তুমি ঠিকই বলো আমি একটা স্টুপিড।
“তাড়াতাড়ি এসো।”
“হোয়াই পাপা?তন্ময় এসেছে নাকি?”
লুৎফর আহমেদ ভ্রুঁ কুঁচকে বললেন,
“ও এখানে আসতে যাবে কেন?কি আজেবাজে কথা বলছো তুমি?”
লিজা আবার শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“ওহ্ সরি পাপা।আসলে বারবার শুধু তন্ময়ের কথাই মনে পড়ছে।আচ্ছা এখন রাখছি কেমন।বাই পাপা।”
লুৎফর আহমেদ আরো কিছু বলতে চাইলেন মেয়েকে তবে বলতে পারলেন না।তার আগেই লিজা ফোনটা কেটে দিল।তার সম্মুখ সোফায় বসা এক সুদর্শন যুবক গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
“এখন বুঝতে পারছেন যে কিভাবে আপনি আমার জীবনটা নষ্ট করেছেন বাবা?আপনি স্বার্থপরের মত নিজের মেয়ের জীবনটা ঠিক করতে গিয়ে আমার জীবনটা শেষ করে দিয়েছেন।”
লুৎফর আহমেদ মাথা নিচু করে বসে রইলেন।বলার মতন তার কাছে কোন বাক্য নেই।কি বলে সান্ত্বনা দেবেন তিনি ফয়সালকে?এই কথাটা তো সত্যি তিনি স্বার্থপরের মতন শুধুমাত্র নিজের মেয়ের কথাটাই ভেবেছিলেন।ভেবেছিলেন ফয়সালের মতন ছেলের সাথে বিয়ে দিতে পারলে হয়তো সংসারটা করতে পারবে লিজা।তবে তার বোধহয় এই কথাটা বুঝতে দেরি হয়ে গেল যে তিনি নিজের মেয়েকে যেভাবে মানুষ করেছেন তাতে ওর পক্ষে সংসার করা সম্ভব না।মা মরা মেয়েকে তিনি আহ্লাদ দিতে দিতে কখন যে বিগড়ে ফেলেছেন বুঝতেই পারেননি।তিনি নিজে এই কথা স্বীকার করেন যে তার মেয়েটা অমানুষ হয়েছে।
ফয়সাল পুনরায় বলে উঠলো,
“শুধুমাত্র আপনার কথায় ডিভোর্স পেপারটা সাইন করার আগে ওকে আরো একটা সুযোগ দিতে চেয়েছিলাম।কিন্তু দেখলেন তো ওকে আমি পেলামই না।এরপরে আর ওকে কোন সুযোগ দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না।ও যে জায়গায় গিয়েছে আপনি কি আমায় এ ব্যাপারে গ্যারান্টি দিতে পারবেন যে শেখানে ওর গায়ে কোন বাজে স্পর্শ লাগেনি? কিংবা ও ইচ্ছে করে হয়তো কাউকে সে সুযোগটা দিয়েছে?আপনাকে কথাগুলো বলতে আমার বিবেকে বাঁধছে কিন্তু তাও আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি সত্যি ওর সাথে সংসার করা যায় না।আমার স্ত্রীর গায়ে অন্য কোন পুরুষের ছোঁয়া পড়বে এসব আমি ভাবতেও পারি না।”
লুৎফর আহমেদ অপরাধী গলায় বললেন,
“পারলে আমায় ক্ষমা করে দিও। আমিও তোমায় বাঁধা দেবো না আর।আমি জানি তুমি খুব ভালো ছেলে সেই জন্যই তোমার সাথে নিজের মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলাম।তবে আমার বোঝা উচিত ছিল যে আমার মেয়ে তোমার যোগ্য না।তুমিও নিজের জীবনটা নতুন করে শুরু করো।”
ফয়সাল সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“সেসব হয়তো আমার দ্বারা আর হবে না।ওর খারাপ দিকগুলো না জেনে ওকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম।ওর না হয় মাতাল অবস্থায় ওর স্বামীর কথা মনে থাকে না কিন্তু আমার আজও আমার শোয়ার ঘরে গেলে মনে পড়ে যে এখানে আমার স্ত্রীকে নিয়ে আমি অনেকগুলো বছর সংসার করেছি।বিশ্বাস করুন বাবা নিজেকে অনেক মানানোর চেষ্টা করেছি কিন্তু আর সম্ভব না। আমিও একটা মানুষ,আমারও একটা ধৈর্যের সীমা আছে।ভালো থাকবেন।আসছি।”
ফয়সাল চলে গেল।লুৎফর আহমেদের আফসোসগুলোকে দ্বিগুণ করে দিয়ে চলে গেল।নিঃসন্দেহে ফয়সালা ভালো ছেলে,খুব ভালো স্বামী।অথচ তার মেয়েটা এত সুখের একটা সংসার টিকিয়ে রাখতে পারল না।