রিক্ত বসন্ত

পর্ব - ২৫

🟢

মিলি ঠিক করেছে কয়েকদিন অতিরিক্ত দরকার না হলে অফিসে যাবে না।এখন সত্যি নিজের একটু খেয়াল রাখা দরকার।সে হিসেবে সকাল থেকে উঠে বাড়িতে বসে ল্যাপটপের টুকটাক কিছু কাজ করছে।তবে এর মাঝে মিলির ফোনে একটা ফোন এলো অফিস থেকে।জানানো হলো যে ওকে নাকি খুবই জরুরিভাবে অফিসে যেতে হবে।যেতে হবে মানে যেতেই হবে।মিলি আর কোন আপত্তি করলো না।হয়তো কোন সমস্যা হয়েছে না হলে তাকে ডাকত না।যেহেতু ফরহাদ যাওয়ার সময় সব ব্যবস্থা করেই গেছে।মিলি যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।নিজে সোজা ফরহাদের কেবিনে গেল।অফিসে এসে জানতে পেরেছে যে ফরহাদ না আসা অব্দি নাকি এই ব্রাঞ্চের দায়িত্বে ফরহাদের বাবা থাকবে।ওনার সামনে যেতে যদিও মিলির একটু অস্বস্তি হচ্ছে।ফরহাদ না হয় ভালো তাই বলে ও বাড়ির লোক কেমন সেইসব তো কিছু জানে না মিলি।তবে কি আর করার যেতেই হবে।ফরহাদের কথা মনে করে মনের মাঝে একটু আশা জাগলো যে ওর বাবা হয়তো ওর মতনই হবে।

"মে আই কম ইন স্যার!"

কারো কণ্ঠস্বরূে ফারুক সাহেব চোখ তুলে দরজার দিকে তাকালেন।মিলিকে চিনতে তার খুব একটা অসুবিধা হলো না।গম্ভীর গলায় ভেতরে আসার অনুমতি দিলেন।মিলি চুপচাপ ভেতরে এসে স্বাভাবিকভাবে ফারুক সাহেব কে উদ্দেশ্য করে বলল,

"আমায় ডেকেছিলেন স্যার?"

"হ্যাঁ।আজ তো অফিসের ছুটি নেই,তুমি কোন কারণ দেখিয়ে ছুটিও নাওনি,তাহলে অফিসে আসোনি কেন?"

ফারুক সাহেবের কথা বলার ভাব ভঙ্গি মিলির একদমই ভালো লাগলো না।তবে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে স্বাভাবিক গলাতেই বলল,

"আসলে স্যার ফরহাদ আমায় বলে গিয়েছে যে আমার অসুবিধা হলে আমি অফিসে না আসলেও সমস্যা হবে না সেজন্য আসিনি।"

"এখন কি এখানে ফরহাদ উপস্থিত আছে?আরে এই অফিসটা কি তোমার বাবার যে যা ইচ্ছে তাই করবে?"

মিলির এবার একটু রাগ হলো।তবে খুব করে চেষ্টা করলো যেন নিজের রাগটা প্রকাশ না হয়।

"কথাটা আমায় নিয়ে হচ্ছে এর মাঝে আমার ফ্যামিলিকে টানছেন কেন?আমি অফিসে আসিনি তার কারণ ফরহাদ আমায় এর আগেও এসব কথা বলে রেখেছে।আমার জানামতে আপনাকেও বলে গেছে।আর এটা আজ নতুন না যে আমি ছুটি না নিয়ে অফিসে আসি নি।এর আগেও এমন অনেক হয়েছে।"

ফারুক সাহেব এবার গর্জে উঠে বললেন,

"জাস্ট সাট আপ!একজন সাধারণ এমপ্লয়ি হয়ে আমার সাথে উঁচু গলায় কথা বলার সাহস তোমাকে কে দিয়েছে?"

"আপনি কিন্তু কোন কারণ ছাড়াই আমার সাথে অত্যন্ত রূড বিহেভ করছেন।"

"কারণ তুমি এটাই ডিসার্ভ করো।যাই হোক তোমার সাথে এত কথা বাড়ানোর আমার কোন ইচ্ছে নেই।এটা ধরো।"

ফারুক সাহেব একটা খামে মোড়ানো কাগজ মিলির দিকে বাড়িয়ে দিল।মিলি সেটা দেখে তাকে প্রশ্ন করলো,

"এটা কি?"

"এর ভিতরে কি লেখা আছে সেটা নিশ্চয়ই তোমাকে পড়ে শোনানোর দায়িত্ব আমার না।নিজে পড়ে দেখো।"

মিলি চোখ বন্ধ করে ফারুক সাহেবের কথাটা হজম করে নিলো।খামটা হাতে নিয়ে সেটার ভেতর থেকে একটা লেটার বের করল।পড়ে যতটুকু বুঝতে পারলো তা হচ্ছে ফারুক সাহেব ওকে চাকরিটা থেকে বের করে দিয়েছে।মিলি খুব বেশি অবাক হলো না। কেননা ওনার ব্যবহার দেখে আন্দাজ করতে পেরেছিলে যে উনি মিলিকে স্বাভাবিক চোখে দেখছে না।তবে কারণটা জানতে ইচ্ছে করল মিলির।কোন কারণ ছাড়া তো উনি নিশ্চয় বের করে দিচ্ছেন না।

"আমাকে চাকরিটা থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে ভালো কথা।কিন্তু আমার অপরাধটা কি আমি জানতে পারি?"

"তোমাকে ক্ল্যারিফিকেশন দিতে আমি বাধ্য না।তবে একটা কথা বলতেই হচ্ছে চৌধুরী বাড়ির সম্মান তুমি ডোবালে।একসময় তোমার বাবা খুব অপমান করেছিল।তুমি পালিয়ে যাওয়ার পর উনি অজুহাত দেখিয়েছিলেন যে আমার ছেলের সাথে নাকি উনি উনার মেয়ের বিয়ে দেবেন না।আর আজ দেখো তোমাকে আমার সেই ছেলের কোম্পানিতেই চাকরি করতে হচ্ছে।"

"আমার বাবা ফরহাদের সাথে কি করেছে সেটা জানি না।তবে আপনাকে কিন্তু এটা মানতেই হবে যে আমার ভাইয়া ফরহাদকে অনেক সাহায্য করেছে।"

"ভুলটাতো তোমার ভাইয়ারই ছিল,তবে শোধরাবে না?"

"কিসের ভুল?"

"বিয়ের প্রস্তাবটা উনি আগে দিয়েছিলেন,এটা বোধহয় তোমার জানা নেই।আমার ছেলে ভদ্র জন্য চুপচাপ বিয়ে টা ভেঙ্গে দিয়েছিল।অনেক অপমান করেছো তোমরা আমাদের।ধরে নাও সেই অপমানের ক্ষতিপূরণ হিসেবে তোমার ভাইয়া আমার ছেলেকে সাহায্য করেছে।এবার তোমাদের অপমানিত হওয়ার পালা।এখন শুধু চৌধুরী সাহেবের কানে খবরটা দেওয়ার অপেক্ষা যে ওনার মেয়েকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে আমাদের অফিস থেকে বের করে দিয়েছি।"

মিলি ফারুক সাহেবের সাথে আর কোন কথাই বলল না।ইচ্ছে করলো না আর কিছু বলার।চুপচাপ বেরিয়ে এলো অফিস থেকে।বাইরে এসে একটা চায়ের দোকানে বেঞ্চের উপর বসলো।শরীরটা হঠাৎ করে কেমন যেন খারাপ লাগছে।ফারুক সাহেব বোধহয় একটু বেশি অপমান করেছে।তবে কথাগুলো যদি মাহবুব এর কানে যায় তবে তো ও খুব কষ্ট পাবে।ফরহাদের উপর রেগেও যেতে পারে। এমনিতেই ফরহাদ নিজের পরিবারকে নিয়ে এখন ব্যস্ত আছে,চিন্তার মাঝে আছে।আবার মিলির ঝামেলা গুলো নতুন সমস্যা তৈরি করতে পারে।এখন চিন্তা একটাই মাহবুবের কানে কথাগুলো না গেলেই হয়।

______

“এই মিলি শোনো আমি আন্টির সাথে কথা বলেছি।ওই কলেজে তোমার চাকরিটা হয়ে যেতে পারে।”

মিলি বিস্ময়ভরা কন্ঠে বলল,

"সত্যি বলছো তুমি হয়ে যাবে চাকরিটা?"

"হ্যাঁ হয়ে যাবে আমার মনে হচ্ছে।আমি আন্টিকে তোমার সব কথাই বলেছি।জানো আন্টি নিজেও সিঙ্গেল মাদার।খুব ভালো আন্টি।বলতে পারো আমি তোমার কথাগুলো বলে আন্টিকে একটু ইমোশনাল করার চেষ্টা করেছি আর সেটা কাজে লেগে গেছে।"

মিলি কৃতজ্ঞতার কন্ঠে লাবিবা কে বলল,

"তোমায় যে কি বলে ধন্যবাদ দেবো আমি জানিনা লাবিবা।কত আপন মানুষ বিপদের সময় আমার হাত ছেড়ে দিয়েছে আর তুমি অল্প কয়েকদিনের পরিচয়ে আমায় এতবড় একটা সাহায্য করলে।"

"হয়েছে।আর কৃতজ্ঞতা জানাতে হবে না।আমি যতটুকু পেরেছি তোমার সাহায্য করার চেষ্টা করেছি মিলি।"

"কিন্তু লাবিবা ঐ কলেজটাতো এখান থেকে অনেক দূরে।আমিতো এই বাড়িতে থাকতে পারবো না।প্রতিদিন এতটা পথ যাতায়াত করা অসম্ভব।"

"ও তুমি চিন্তা করো না।আমরা বরং এই কয়েকদিন ঐ কলেজের আশেপাশে বাড়ি খুঁজবো কেমন?"

"আচ্ছা ঠিক আছে।"

_________

“এই কোথায় তোর ভাড়াটিয়া রে?আমি কি এখন ওনার জন্য সারাদিন বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবো নাকি?কোন স্লো মোশন কে পাঠিয়েছিস রে?”

ফোনের অপর পাশে থাকা লাবিবা এবার ঝাড়ি দিয়ে বলল,

"একদম আজেবাজে কথা বলবি না ওকে নিয়ে।তোর থেকে বয়সে বড়,সম্মান দিয়ে কথা বল।"

"তোর সম্মানের পিছনে এক লাত্তি।আর পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করবো এরপর না আসলে তোর নাম্বার ব্লক করে দেব।থাক তুই তোর ভাড়াটিয়া কে নিয়ে।বালের অশান্তি পাঠায় আমার ঘাড়ে।"

কথাটা বলে তাকদীর ফোনটা রেখে দিল।এই ঠান্ডার দিনে এভাবে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার কোন মানে হয়?কিন্তু কি করবে সে তো নিরুপায়।তার মায়ের কঠোর নির্দেশ যেন নতুন ভাড়াটিয়ার কোনো রকম কোনো অসুবিধা না হয়।তাকে যেন ঠিকঠাক ভাবে নিজের ফ্ল্যাটটা দেখিয়ে দেয়।

“এক্সকিউজ মি,আপনি কি তাকদীর?”

কোন মেয়েলী কন্ঠস্বর পেয়ে তাকদীর পাশ ফিরে তাকালো।বেশ গুলুমুলু একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।তাকদীরের কাছে মিলিকে একদম গুলমুলু রসগোল্লা লাগলো।ঠাণ্ডার জন্য গাল গুলো একদম লাল টকটকে হয়ে আছে।মাথাটা একটা চাদর দিয়ে মোড়ানো। হাত দুটো সোয়েটারের পকেটে রাখা।হঠাৎ করে আবার তাকদীরের মিলিকে দেখতে পেঙ্গুইনের মতন লাগলো।

এদিকে তাকদীর কে নিজের দিকে এভাবে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে মিলির একটু অস্বস্তি হলো।গলা খাকারি দিয়ে তাকদীরের মনোযোগ পাওয়ার চেষ্টা করলো এবং কাজও হলো।তাকদীর নড়েচেড়ে উঠে বলল,

"হ্যাঁ আমি তাকদীর।আপনি কে?"

"আমি মিলি।আপনারা তো বাড়িটা ভাড়া দেবেন সেজন্য এসেছি।"

তাকদীরের এখন লাবিবার উপরে রাগ হল।যদি ও স্লো মোশন ভাড়াটিয়াকে না ঠিক করত তবে তাকদীর এই মেয়েটাকে ভাড়াটিয়া হিসেবে তুলতে পারতো।তবে কি আর করার এখন লাবিবাকে তো কথা দিয়ে,ওর মাও রাজি হয়ে গেছে আর কোন উপায় নেই।একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

"সরি আপু,আমার এখন আর কিছু করার নেই।বাড়িটা অলরেডি ভাড়া হয়ে গেছে। আমার এক বান্ধবী ওর এক স্লো মোশন বান্ধবীকে পাঠিয়েছে।আমার ভীষণ ইচ্ছে ছিল আপনাকে বাড়িটা ভাড়া দেওয়ার কিন্তু পারলাম না আপু।"

"আমাকে আপনার বান্ধবীই পাঠিয়েছে।আমি মিলি,নামটাও কি চিনতে পারছেন না?"

তাকদীরের একটু সন্দেহ হলো।ওতো মিলি নাম না অন্য কোন নাম শুনেছিলো বলে মনে হচ্ছে।তাড়াহুড়ো করে ফোনটা বের করে লাবিবার নাম্বারে কল দিল।লাবিবা রিসিভ করতেই বলল

"এই তুই তোর যে বান্ধবীকে পাঠিয়েছিস তার নাম কি?"

"মিলি।"

"উনি কি দেখতে গুলুমুলু,মোটা সোটা?"

লাবিব এবার ধমক দিয়ে বলল,

"একটা থাপ্পর দেবো।এসব কি ধরনের পরিচয়?গুলুমোলু মোটাসোটা এসব কি?আর একটা বাজে কথা বললে গিয়ে কিন্তু তোকে লাথি মারবো।"

ঝাড়ি খেয়ে তাকদীর নিশ্চিত হলো যে এটাই মিলি।লাবিবা কে আর কিছু বলার প্রয়োজনই মনে করলো না।ফোনটাই বন্ধ করে দিলো।না হলে এই মেয়ে এখন ওকে বিরক্ত করে মারবে।ফোনটা পকেটের ঢুকিয়ে হাস্যজ্জ্বল গলায় মিলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"দুঃখিত আপু,আপনাকে চিনতে পারিনি।মানে নামটা ভুলে গেছিলাম।চলুন আপনাকে ফ্ল্যাটটা দেখাই।"

তাকদীর আগে আগে গেল।মিলিও চুপচাপ পিছনে পিছনে গেল।সিঁড়ির কাছে গিয়ে মিলি দাঁড়িয়ে পড়ল।চোখে মুখে চিন্তা ভাঁজ পড়ল। মিলিকে থেমে যেতে দেখে তাকদীর বলল,

"কি হলো যাবেন না?"

"দোতালায় ফ্ল্যাট?"

"হ্যাঁ,আর তার উপরে ছাদ আছে যাবেন?

"না না দোতলাতেই উঠতে পারব কিনা তারওপর আবার ছাদ।"

"সে কি,আপনি তো এতটাও মোটা না যে দোতলা পর্যন্ত উঠতে পারবেন ন!"

তখন থেকেই ছেলেটার মুখ থেকে মোটা, গুলুমুলু শব্দগুলো মিলির একদম পছন্দ হচ্ছে না।ছেলেটার কি কোন বুদ্ধিসুদ্ধি নেই?বুঝতে পারছে না যে মিলি প্রেগন্যান্ট?

"মোটা হওয়াটা সমস্যা না,সমস্যাটা হচ্ছে আমি প্রেগন্যান্ট।এ সময় সিঁড়িতে ওঠানামা আমার জন্য ঠিক হবে না জন্য বলছি।"

তাকদীর ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল সেই সাথে হঠাৎ করে মনের মাঝে জাগা স্বপ্নটা ঠুস করে ভেঙে গেল।এই গোলগাল মেয়েটাকে তো তাকদীরের খুবই পছন্দ হয়েছিল।তার উপরে যখন আবার জানল যে পাশের ফ্ল্যাটে থাকবে তখন ভাবলো প্রেম করতে সুবিধা হবে।আর একটা সুন্দরী গোলগাল মেয়ের সাথে প্রেম করার ইচ্ছে তো তাকদীরের আজকের না। বহুদিনের।তবে মনের মতন কাউকে পায়নি।তবে এবারে মনটা ভেঙে গেল।বিষণ্ন কণ্ঠে বলল,

"কিছু হবে না এটুকু উঠলে।"

কথাটা বলে তাকদীর জোরে জোরে পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।মিলির উপরে উঠতে পাঁচ মিনিটের মতন সময় লাগলো।উপরে গিয়ে দেখলো তাকদীর সিঁড়ির ওপরে বসে পড়েছে।মিলি ইতস্তত গলায় বলল,

"বেশি অপেক্ষা করালাম?"

বিজ্ঞাপন

"ঠিক আছে কোন ব্যাপার না।দরজা খুলে দিয়েছি,যান ভিতরে গিয়ে দেখে আসুন।"

তাকদীরের কথা অনুযায়ী মিলি ভিতরে গেল।তাকদীর পকেট থেকে ফোনটা বের করে অন করল কারণ ওর মা যদি ফোন করে না পায় তাহলে কপালে দুঃখ আছে।এবং অন করার সাথে সাথেই তাকদীরের ফোনে ওর মায়ের নাম্বার থেকে কল এলো।তাকদীর লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো।গলাটা পরিষ্কার করে ফোনটা রিসিভ করলো।নম্র গলায় বলল,

"হ্যাঁ আম্মু বলো।"

"মিলি এসেছে?"

"হ্যাঁ এসেছে।"

"কোথায় ও?"

"ফ্ল্যাট দেখছে।"

"তুমি কোথায়?"

"সিঁড়িতে বসে আছি,ওহ্ না সরি এখন দাঁড়িয়ে আছি।"

"ওকে একা ছেড়ো না।ও কিন্তু অসুস্থ।আর অতিরিক্ত কথা বলে ওকে বিরক্ত করবে না একদম।তোমার এসব বকবক আমি সহ্য করলেও সবাই সহ্য করবে না মনে রেখো সেটা।আর আজেবাজে প্রশ্ন তো একদমই করবে না।যদি আমি ওর মুখে তোমার নামে কোন কমপ্লেইন শুনেছি তাহলে কিন্তু তোমার খবর আছে।"

তাকদীর বাচ্চা ছেলের মতো বলল,

"আচ্ছা ঠিক আছে আম্মু।আমি কিছু করবো না,চুপচাপ থাকব।"

"রাখছি।"

তাকদীর ফোনটা রেখে ফ্ল্যাটের ভেতরে গেল।বেশ অনেকখন তো হলো এখনো মিলি বাইরে আসছে না কেন?ব্যাপারটা ওকে বেশ ভাবালো।আবার অজ্ঞান টজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল না তো?

তবে ভেতরে যেতেই দেখলো মিলি ঠিক আছে।তাকদীর কে দেখে মিলি জিজ্ঞেস করল,

"আপনার মা কোথায়?"

"মা তো কলেজে,আপনার কিছু জানার থাকলে আমায় বলুন আমি সব জানি।"

"না,তেমন কিছু জানার নেই.কিন্তু কত টাকা এডভান্স করতে হবে সেটা জানলে একটু ভালো হতো।"

"ওসব কেন করতে হবে?আপনি তো বাড়িতেই উঠবেন,ওসব কিছু দিতে হবে না।মাসে মাসে ভাড়া দিয়ে দেবেন তাহলেই হবে।আর না দিলেও সমস্যা নেই।এমনিতেই আমাদের বাড়ির ভাড়াটিয়া গুলো একদমই ভালো না। আমার আম্মুকে নরম পেয়ে ঠিকঠাক ভাড়াই দেয় না।"

"চিন্তা করবেন আমি ঠিক সময় দিয়ে দেবো ভাড়া।"

"কে কে থাকবেন আপনারা?"

"আমি একাই।"

তাকদীর ভ্রুঁ কুঁচকে প্রশ্ন করলো,

"একা কেন?আপনার হাসবেন্ড?"

"নেই।"

তাকদীর আতকে উঠে বলল,

"মারা গেছেন?এই অবস্থায় রেখে মারা গেলেন উনি?'

"বেঁচে আছেন তবে আমরা একসাথে থাকি না।"

মিলির কন্ঠে একটু বিরক্তই প্রকাশ পেল।তবে তাকদীর এবার খুশি হলো।ঠুস করে ভেঙে যাওয়ার স্বপ্নটা আবার যেন একটু একটু করে জোড়া লাগতে শুরু করল।সেই সাথে বিষণ্ন মুখে হাসি ফুটে উঠলো।

"আচ্ছা যাই হোক।বেঁচে থাকুক বা মরে যাক তাতে আমার কি আপনারই যখন কিছু যায় আসে না।আচ্ছা আপনার ছেলে হবে না মেয়ে?"

"জানিনা।"

"মেয়ে হলে কি নাম রাখবেন আর ছেলে হলে কি নাম রাখবেন?"

"ঠিক করা হয়নি।"

"কোন হসপিটালে এডমিট হবেন।"

"আপনি অতিরিক্ত কথা বলেন।"

কথাটা বলে মিলি তাকদীর কে পাশ কাটিয়ে চলে গেল।তাকদীর থ হয়ে কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকল।হুশে ফিরতেই বাইরে দৌড় লাগালো।ততক্ষণে মিলি কয়েক ধাপ নেমেও গেছে সিঁড়ি দিয়ে।তাকদীর লাফাতে লাফাতে নামলো।খুব তাড়াতাড়ি মিলির পাশাপাশি এসে দাঁড়ালো।

"আচ্ছা সিনিয়ার আপু,আপনি কবে আসবেন এই ফ্ল্যাটে?"

মিলি একটু গম্ভীর গলাতে বলল,

"আপনার আচরণ দেখার পর চিন্তায় আছি যে আসবো কি আসবো না।"

তাকদীর থমকে গেল।অসহায় গলায় বলল,

"আমি কি করেছি?"

"কিছু না।"

"তাহলে আসবেন না কেন?"

"না এসে অবশ্য কোন উপায়ও নেই আমার।"

"কবে আসবেন তাহলে?"

"কাল-পরশু।"

"ওহ্ আচ্ছা।আমি অপেক্ষায় থাকবো কেমন? না পরশু হয়তো আমি থাকতে পারবো না, কিন্তু আম্মু থাকবে।তবে আপনি চিন্তা করবেন না আমার আম্মু আমার থেকেও বেশি ভালো। আর যদি আমাকে খুব বেশি মিস করেন তাহলে লাবিবা কে বলবেন ও আমার জানিয়ে দেবে।"

মিলি এবার চোখ গরম করে তাকদীরের দিকে তাকাতেই তাকদীর বোকা বোকা হেসে বলল,

"মজা করছিলাম।"

তাকদীরের মুখটা দেখে মিলিও এবার হেসে ফেলল।তাকদীরের নজরে মিলির রসগোল্লার মতন মুখটায় হাসিটা দেখতে খুবই সুন্দর লাগলো।মনে হলে রসগোল্লায় এবারে মিষ্টিটা একদম ঠিকঠাক হয়েছে।

নিচে নেমে তাকদীরের সাথে আরো টুকটাক কিছু কথাবার্তা বলল মিলি।কথার মাঝে হঠাৎ করে কাশি উঠে গেল মিলির।তাকদীর ব্যতিব্যস্ত গলায় বলল,

"কি হলো সিনিয়ার?"

"একটু পানি দেবেন?"

মিলি কথাটা বলার সাথে সাথে তাকদীর নিচতলার ফ্ল্যাটের দরজায় গিয়ে জোরে জোরে ধাক্কা দিল।সেই সাথে চেঁচাতেও লাগলো।ভিতরে থাকা মানুষজন ছুটে এসে দরজা খুলে দিল।তাকদীরের উৎকণ্ঠিত চেহারা দেখে তারাও ব্যতিব্যস্ত গলায় বলল,

"কি হয়েছে?"

"আরে তাড়াতাড়ি পানি নিয়ে আসুন,সিনিয়ার আপুর কাশি উঠেছে।"

ভদ্র মহিলা কিছু বুঝলেন না।বোকার মতন হা করে তাকিয়ে থাকলেন তাকদীরের মুখের দিকে।তাকদীর ভীষণ বিরক্ত হলো।ওনাকে আর কিছু বলার প্রয়োজনও মনে করল না। নিজেই ঘরে গিয়ে রান্নাঘর থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে এসে মিলিকে দিল।আর ভদ্রমহিলা তখনো ঠায় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে।মিলির কাশি থামতেই গ্লাসটা তাকদীরের হাতে দিয়ে ধন্যবাদ জানালো।তাকদীর গ্লাসটা ফেরত দিতে গিয়ে ভদ্রমহিলার হাতে গ্লাসটা ধরিয়ে দিয়ে বলল,

"আপনার যে আটকে যাওয়ার স্বভাব আছে তা তো জানতাম না।এইজন্যই বোধহয় বাড়ি ভাড়া দিতে গিয়ে আটকে যান,তাই না?যাইহোক এসব স্বভাব ছাড়ুন।শেষে দেখা যাবে মানুষ মরতে বসেছে আর আপনি আটকে আছেন।যান ভেতরে যান,এখন আমার কাজ শেষ।"

ভদ্রমহিলা সত্যি চুপচাপ ভেতরে চলে গেল,না হলে বলা যায় না আবার যদি বাড়ি ভাড়ার কথা উঠে যায় সমস্যা আছে।তাকদীর পুনরায় মিলির কাছে এসে বলল,

"ঠিক আছেন সিনিয়ার আপু?"

"হ্যাঁ ঠিক আছি।আবারো ধন্যবাদ আপনাকে।"

"আপনি কি আর কিছু খাবেন?আম্মু ভাত, তরকারি রান্না করে রেখে দিয়েছে দেই আপনাকে?আপনার তো দোতালায় উঠতে অসুবিধা হবে।আমি বরং এখানে চেয়ার এনে দিচ্ছি আপনি না খেয়ে গেলে আমার আম্মু আমায় বকাও দিতে পারে।"

মিলি আলতো এসে বলল,

"দরকার নেই,আমার ক্ষুধা লাগে নি।আমি বাড়িতে গিয়ে খেয়ে নেব।"

"ওহ্ আচ্ছা তাহলে ঠিক আছে।বাড়ি পছন্দ হয়েছে তো আপনার?"

মিলি মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো,

"হ্যাঁ পছন্দ হয়েছে।"

"আর বাড়িওয়ালাকে?মানে আমি আর আমার আর আম্মুকে পছন্দ হয়েছে তো? দেখুন আমি আপনাকে একটা বিষয় গ্যারান্টি দিতে পারি,আমার আর আমার আম্মুর মতন বাড়িওয়ালা আপনি পুরো সিলেটে খুঁজে পাবেন না।আর তাকদীরের মতন ভদ্র বাড়িওয়ালা তো আপনি পুরো বাংলাদেশেও খুঁজে পাবেন না।"

মিলি এবার শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

"তা ঠিক বলেছেন।আপনি একদম আমার ভাইয়ের ছেলের মতন।চঞ্চল আর দুষ্ট স্বভাবের।বয়সে বড় হয়েছেন ঠিকই তবে স্বভাবে কিংবা বুদ্ধিতে এখনো বড় হতে পারেননি।আসছি।"

কথাটা বলে মিলি চলে গেল।দ্বিতীয়বারের মতো না আবারও তাকদীরের স্বপ্নটা ঠুস করে ভেঙে গেল।মানুষ তাই বলে ভাইয়ের সাথে তুলনা করে কিন্তু ভাইয়ের ছেলের সাথে কি করে এত বড় একটা মানুষের তুলনা করে?

বিজ্ঞাপন
রিক্ত বসন্ত গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস