রিক্ত বসন্ত

পর্ব - ৩২

🟢

“তাকদীর কে তুমি পছন্দ করো তাই না তোহা?”

মিলির কথা শুনে তোহা লজ্জায় পড়ে গেল। আমতা আমতা করলো কিছুক্ষণ। মিলি তা দেখে হেসে ফেলল।

“লজ্জা পাওয়ার কি আছে? ভালোই তো বেসেছো, অন্যায় তো কিছু করোনি।”

“আসলে আপু তেমন কিছু না।”

“আচ্ছা? তাহলে কি? তোমার তাকদীরের দিকে ওভাবে তাকিয়ে থাকার মানেটা তাহলে কি বোঝাও আমায়?”

বলার মতন কোন অজুহাত তোহা খুঁজে পেল না। বাধ্য হয়ে চুপচাপ থাকতে হলো। আর তোহার নিরবতার মানে মিলি ঠিকই ধরে ফেলল। আলতো হেসে বলল,

“ভালো যখন বেসেই ফেলেছ তাহলে বলতে এত সংকোচ কিসের? তাকদীর কে ভালোবাসা কি অপরাধ নাকি যে এতটা ইতস্তত করছো?”

“না আপু। আসলে এটা বলতে পারি না তার কারণ আমার মাঝে মাঝে মনে হয় যে তাকদীর ভাই আমায় ভালোবাসে না।”

“ওর কথা বাদ দাও তো। ও তো একটা পা'গল। ও যে কি চায় ও নিজেও জানে না।কিন্তু তুমি যে ওকে ভালোবাসে এই কথাটি জানিয়েছো ওকে?”

“না জানাইনি আর কখনো জানাবোও না।”

মিলি কপাল কুঁচকে বলল,

“তাহলে সম্পর্কটা এগোবে কি করে হ্যাঁ?”

তোহা হাসি হাসি মুখে বললো,

“সেটা তো আমি না বললেও এগিয়ে গেছে।”

“মানে?”

“বাবা আমার আর তাকদীর ভাইয়ের বিয়ে ঠিক করে রেখেছে। আমিতো তাকদীর ভাইকে আমার ভালোবাসার কথা বললেও আমাদের বিয়ে হবে না বললেও আমাদের বিয়ে হবে। তাই বলিনি। আর বললেও বিয়ের পরে বলবো।”

মিলি বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

“তোমাদের বিয়ে ঠিক হয়ে আছে? কই ও তো আমাকে বলেনি? দেখেছো এইজন্যেই বলি ছেলেটা আসলেও পা'গল। এত কিছু বলে আমাকে অথচ ওর বিয়ে ঠিক হয়েছে সেই কথাটাই বলেনি।”

“বলবে কি করে তাকদীর ভাই তো মত দেয়নি।”

“কেন?”

“সেই জন্যই তো আমার মাঝে মাঝে মনে হয় যে ও আমায় পছন্দ করেনা। আবার মাঝে মাঝে মনে হয় পছন্দ করে। যেমন কালকে স্টেশনে আমায় বলেছিল আমাকে দেখে নাকি ভালো লাগছে। তারপর আমরা যখন ঘরে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম তখন দেখলেন না কেমন অজুহাত দিয়ে ঘরে এসে আমাদের সাথে আড্ডা দিল। আমার মনে হচ্ছিল যে আমার সাথে কথা বলবে বলে অমন করলো।”

মিলির মুখ থেকে হাসিটা সরে গেল। মিলি তো জানে তাকদীরের তখন ওই ঘরে আসার অজুহাত খোঁজার কারণটা। তবে এক মুহূর্তের জন্য তোহার কথায় সন্দেহ হলো। মিলি যেটা ভাবছি সেটা ঠিক না তোহা যেটা ভাবছে সেটা ঠিক? এর উত্তরটা একমাত্র তারকদীরই জানে। তাকদীর কে জিজ্ঞেস করতে হবে। জিজ্ঞেস করে মিলিকে নিশ্চিত হতে হবে যে ও তবে যেটা ভাবছে সেটা ঠিক কিনা। যদি ঠিক হয়ে থাকে তবে মিলিকে হয়তো জীবনে আরো একবার খুব কঠিন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তোহার সাথে আরো অনেক গল্প হলো মিলির। তোহা কবে, কখন, প্রথম তাকদীরের প্রেমে পড়েছিল সেই সব গল্প করলো। তাকদীর কে তোহা কতটা ভালোবাসে, তাকদীরের কি কি বিষয় ভালো লাগে সেসব বলল। তবে এত গল্পের মাঝেও তোহার মুখ থেকে মিলি একটা বিষয়ে কিছুই জানতে পারলো না যে তাকদীরের কোন বিষয়টা ওর অপছন্দ। সবকিছুই পছন্দ তাকদীরের। মেয়েটার চোখমুখ দেখেই মিলি বুঝতে পারলো সত্যি ভালোবাসে তাকদীর কে। এতে যেন মিলিও একটু নিশ্চিত হলো, একটু শান্তি পেল। ছেলেটাকে বোঝানোর একটা অন্তত অজুহাত পাওয়া গেছে।

______

ওয়াশরুমের দরজায় কান পেতে জেসি বোঝার চেষ্টা করল যে রাজীব গোসল করছে কিনা। শাওয়ারের শব্দ পেতেই নিশ্চিত হলো।গুটি গুটি পায়ে গিয়ে বেড সাইডের উপর থেকে রাজীবের ফোনটা হাতে নিল। রাজীবের ফোনের পাসওয়ার্ডটা জানে জেসি। পাশাপাশি বসে যখন দুজনে ফোন চালাচ্ছিল তখন আড়চোখে একবার দেখে নিয়েছিল। ভাগ্যিস দেখে নিয়েছিল নাহলে তো আজ ফোনের লকই খুলতে পারতো না।

লকটা খুলে সরাসরি মেসেঞ্জারে গেল। স্ক্রল করে দেখলো খুব কম সংখ্যক ছেলের আইডি সেখানে। বেশ কিছু মেয়ের ইনবক্সে গেল তবে তেমন কোন লেখা চোখে পড়ল না। খুঁজতে খুঁজতে একটি ইনবক্সে ঢুকতেই জেসির চোখ কপালে উঠে গেল।

বেশ অনেকগুলো মেসেজ পড়লো। দেখা যাচ্ছে বেশ অনেকবার অডিও কল, ভিডিও কলে কথা হয়েছে। মেসেজের ভাষা গুলো অত্যন্ত অশ্লীল। সেই সাথে বিভিন্ন আজেবাজে ছবিও পাঠানো হয়েছে অপর পাশ থেকে আর তার পরিপ্রেক্ষিতে করা রাজীবের নোংরা মন্তব্য। জেসির গা গুলিয়ে উঠলো।

আরো কিছু মেসেজ পড়তে চাইলো তবে রাজীব সেই সুযোগ দিল না। কখন যে ওয়াশরুমের দরজা খুলে বেড়িয়ে এসেছে জেসি সেই শব্দ পায়নি। জেসির হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিলো। জেসি রাজীবের দিকে তাকাতেই দেখলো রাজীব র'ক্ত চক্ষু নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। রাজীব দাঁতে দাঁত পিষে জেসি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোর সাহস হয় কি করে আমার অনুমতি ছাড়া আমার ফোনে হাত দেওয়ার?”

জেসিও পাল্টা রাগ দেখিয়ে বলল,

“তার আগে তুই বল তোর সাহস কি করে হয় আমাকে বিয়ে করার পরেও তোর এসব নোংরামি চালিয়ে যাওয়ার? তুই আমার চরিত্রে আঙ্গুল তুলিস? তুই তো আমার থেকে হাজার গুণ বেশি নোংরা।”

“আমি আগেও বলেছি তোকে আমার যা ইচ্ছে হবে আমি তাই করবো। তোর থাকার হলে থাক না হলে বেরিয়ে যা। দরজা খোলাই আছে।”

জেসি এবার দুহাতে রাজীবের টি শার্টের কলার চেপে ধরে ক্রন্দনরত গলায় বলল,

“তুমি আমার সাথে এমনটা কি করে করতে পারো রাজীব? তুমি তো বলেছিলে তুমি আমায় ভালোবাসো? আচ্ছা মানলাম তন্ময় কে শিক্ষা দেওয়ার জন্য আমার বিয়ে করেছিলে তাই বলে বিয়েটা যখন হয়ে গেছে তাহলে ঠিকভাবে সংসার করো। আমিও তো মানিয়ে নিয়ে সংসারটা করার চেষ্টা করছি।ছেড়ে দাও এসব, ভালো হয়ে যাও।”

রাজীব কে দেখেই বোঝা যাচ্ছে জেসির এসব কথাবার্তায় প্রচন্ড বিরক্ত হচ্ছে সে। জেসি কে নিজের থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো তবে পারলো না। জেসি যেন পণ করেছে আজ যে করেই হোক রাজীবকে বুঝিয়েই ছাড়বে। আজকে আর কোন রকমের রাগ দেখানো যাবে না। বরং আজকে ভালোভাবে রাজীবকে বোঝাতে হবে। বিভিন্নভাবে রাজীব কে অনুরোধ করলো, অনেক ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলো যেন রাজীব ভালো হয়ে যায়। জেসির সাথে ঠিকঠাক ভাবে সংসারে মনোযোগ দেয়।

জেসি নিজেও জানে যে রাজীব জীবনেও ওর কথা শুনবে না। তবুও চেষ্টা তো ওকে করতেই হবে। দিন শেষে তো জেসিরই যাওয়ার কোন জায়গা নেই।

তবে এক পর্যায়ে গিয়ে রাজীব নিজের রাগ আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। জেসির হাতটা কলার থেকে ছাড়িয়ে ধা'ক্কা মা'রলো জেসি কে। জেসির মাথাটা সরাসরি দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেল। মাথায় ভীষণ জোরেই আঘাত পেল।

কয়েক মুহূর্তের মাঝে পুরো দুনিয়াটা যেন ঘুরে উঠলো। সেখানেই বসে পড়লো। খেয়াল করলো ধীরে ধীরে চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে। একটা সময় গিয়ে মেঝের উপরে লুটিয়ে পড়লো জেসি।

রাজীব দেখলো ঠিকই তবে ইচ্ছে করলো না যে জেসি কে গিয়ে তুলতে কিংবা ও ঠিক আছে কিনা সেসব দেখতে। চুপচাপ ফোন নিয়ে চলে গেল।

_________

মিলির বারান্দা দিয়ে বেশ ভালোই রোদ আসে ভেতরে। এই ঠান্ডার দিনে একটু বারান্দায় বসে থাকলে আরাম পাওয়া যায়। একটা টুল নিয়ে গিয়ে বারান্দায় বসলো। বসতে না বসতেই পাশের বারান্দা থেকে তাকদীরের ডাক ভেসে এলো।

মাথা তুলে তাকাতেই নিশ্চিত হলো। মিলি একটু গম্ভীর গলায় কথা বলতে চাইলো তবে ছেলেটার মুখের সরল হাসিটা দেখে আর ইচ্ছে করলো না। স্বাভাবিক গলায় বলল,

“কি?”

“কি করছেন?”

“কিছুই না, বসে আছি।”

“একা একা বসে থাকতে ভালো লাগে? তার থেকে তো ভালো আমাদের ফ্ল্যাটে এসে গল্প করলেও পারেন। আমার সাথে না, আম্মুর সাথে। আপনার তো আবার তোহার সাথেও খুব মিল হয়েছে। ও তো আছে।”

তাকদীরের শেষের কথাটা বলার ভঙ্গিতে মিলি হেসে উঠে বলল,

“তোমার হিংসে হচ্ছে?”

“হওয়ারই কথা। আমি তো গেলেও আমাকে বাড়িতে ঢুকতে দেন না আর ওকে টেনে টেনে নিয়ে গেলেন। অথচ পরিচয়টা আগে আমার সাথে।”

মিলি প্রসঙ্গ বদলে একটু রাগী ভাব নিয়ে বলল,

“তোমার উপরে কিন্তু আমি একটা বিষয়ে ভীষণ রেগে আছি।”

মিলি রেগে আছে কথাটা শুনে তাকদীরের চোখে মুখে চিন্তার ছাপ দেখা গেল। চিন্তিত গলায় বলল,

“কি করেছি আমি? সারাদিন তো কথাই বলিনি আপনার সাথে।”

“এত কথা বলেছো এই কয়দিন অথচ আমায় তুমি একবারের জন্যও বলনি যে তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। আমায় দাওয়াত না দিয়ে বিয়ে করে নিতে তাই না?”

তাকদীরের মুখটা চুপসে গেল। সেই সাথে রাগ হলো তোহার উপর। মেজাজটা ভীষণ বিগড়ে গেল। কে তোহা কে মাতব্বরি করে আগে আগে এসব বলতে বলেছিল? সবথেকে বড় কথা ওকে কে বলেছে যে তাকদীর ওকে বিয়ে করবে? তাকদীর কখনো নিজের থেকে বলেছে যে ও সবাইকে এই এক কথা বলে বেড়াচ্ছে যে ওদের বিয়ে ঠিক হয়েছে? বাপ মেয়ের অত্যাচারে তো আর টেকা যাচ্ছে না। চৌদ্দগুষ্টির কাছে খবর পাঠিয়ে দিয়েছে যে তা মেয়ের সাথে তাকদীরের বিয়ে হবে।অদ্ভুত!

তাকদীর কে চুপ করে থাকতে দেখে মিলি আবারো বলে উঠলো,

“এখনো লুকোবে আমার থেকে? আমি কিন্তু সব জেনে গিয়েছি।”

তাকদীর গম্ভীর গলায় বলল,

“আমি যখন বলিনি তার মানে এই কথার কোন সত্যতা নেই। অযথা একটা কথাকে ধরে বসে থাকবেন না। আমাকে নিয়ে কোন কথা শুনলে আগে তার সত্যতা আমার থেকে যাচাই করবেন।”

“আরে রেগে যাচ্ছ কেন? এটা তো ভালো খবর। আমি তো তোমায় অভিনন্দন জানাতাম।”

“চুপ করুন মিলি। সব বিষয় নিয়ে অভিনন্দন জানাতে নেই। তার থেকেও বড় কথা আমার আর তোহার বিয়েটা হবে না তাহলে অভিনন্দন জানাবেন কেন?”

মিলি এবার কপট রাগ দেখিয়ে বলল,

“এই ছেলে একদম চুপ। মেয়েটা কত ভালো জানো। তোমায় খুব ভালোবাসে। একদম সংসারী একটা মেয়ে। অনেক ভালো থাকবে তুমি।”

তাকদির এবারে কিঞ্চিত রাগান্বিত গলায় বলল,

“এমন সুখ আমি চাইনা যে সুখে আপ….”

সম্পূর্ণ করলো না তাকদীর নিজের কথাটা, নিজেই থেমে গেল। মিলি কপাল কুঁচকে গম্ভীর গলায় বলল,

বিজ্ঞাপন

“সম্পূর্ণ করো নিজের কথাটা।”

তাকদীর হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে রাগটুকু নিয়ন্ত্রণ করে বলল,

“ঠিক সময় হলে আপনি নিজেই সম্পূর্ণ করতে পারবেন আমার কথা। যাইহোক এখন গিয়ে আগে তোহার একটা ব্যবস্থা করতে হবে। আমিও দেখতে চাই আমার সম্মতি ছাড়া আমাকে ও কি করে বিয়ে করে। আমার মত নেই অথচ সারা পৃথিবীকে জানিয়ে বেরাচ্ছে আমি ওকে বিয়ে করবো। শখ কত!আগে ও আমার কাছে আচ্ছা মত ঝারি খাবে তারপর সোজা ওকে আবার স্টেশনে গিয়ে রেখে আসবো।”

তাকদীরের কথা শুনে মনে হলো যে ছেলেটা যা বলল এখন সত্যি তাই করবে। তাকদীর কে আটকানোর জন্য কিছু বলতে চাইলো মিলি।উঠে দাঁড়াতে নিয়ে ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠে আবার বসে পড়লো। হঠাৎ উঠতে ধরায় পেটে লাগলো বোধহয়। আবার ধপ করে বসে পড়াতেও ব্যথা পেয়েছে।

এদিকে তাকদীর ততক্ষণে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছে। হঠাৎ করে মিলির আর্তনাদে চমকে পিছন ফিরে তাকালো। দেখলো মিলি চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে বসে আছে। উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“কি হলো সিনিয়র?”

তাকদীরের কথাটা মিলির কান অব্দি হয়তো পৌঁছালো না। তাকদীর আর কোন কিছু বলার কিংবা শোনার অপেক্ষাতেও থাকলো না। দৌড়ে তাহরিমা বেগমের ঘরে গিয়ে ড্রয়ার থেকে মিলির ফ্ল্যাটের চাবিটা নিয়ে চেঁচিয়ে বলল,

“আম্মু তাড়াতাড়ি সিনিয়রের ফ্ল্যাটে চলো।”

কথাটা বলে তাকদীর দৌড়ে চলে গেল। তাহরিমা বেগম কিছু বুঝে উঠতে পারলেন না যে তার ছেলে কেন এত তাড়াহুড়ো করলো।তবে যেহেতু মিলির ফ্ল্যাটে যাওয়ার কথা বলেছে তার মানে নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে।

এদিকে মিলি ততক্ষণে কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। সামনে তাকিয়ে দেখলো তাকদীর নেই। ভাবলো তোহা কে বোধহয় বকাবকি শুরু করে দিয়েছে। তবে হঠাৎ করে হন্তদন্ত হয়ে তাকদীর কে নিজের ফ্ল্যাটে আসতে দেখে চমকালো মিলি। ছেলেটা সোজা এসে মিলির হাঁটুর সামনে বসে আতঙ্কিত গলায় বলল,

“কি হয়েছে? চেঁচাচ্ছেন কেন? কোথায় লেগেছে? হাসপাতালে যাবেন? চলুন যাই।”

মিলি বিস্ময় ভরা গলায় বলল,

“তুমি কেন এখানে এসেছো? কিছু হয়নি আমার।”

“অবশ্যই হয়েছে। না হলে চিৎকার করলেন কেন? আমি সব বুঝি। চলুন হাসপাতালে যাবো।”

“আরে বললাম তো কিছু হয়নি। হঠাৎ করে উঠতে ধরেছিলাম তাই একটু ব্যথা পেয়েছি আর কি। তুমি যাও এখান থেকে। আর বলেছিলাম না যখন তখন আমার ফ্ল্যাটে চলে আসবে না।”

“আপনার এসব নীতি আপনার কাছেই রাখুন। এখন সত্যি করে বলুন কি হয়েছে?”

ততক্ষণে সেখানে তাহরিমা বেগম আর তোহাও চলে এসেছে। তাহরিমা বেগম এসে উদ্বিগ্ন গলায় মিলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কি হয়েছে মিলি? তাকদীর বলল তোমার ফ্ল্যাটে আসতে?”

“কিছু হয়নি আন্টি আমার। আপনার ছেলের মাথায় সমস্যা আছে।”

তাকদীর তেঁতে উঠে বলল,

“আপনার সমস্যা আছে। আমি জানি আপনি ব্যথা পেয়েছেন কিন্তু বলছেন না। বলবেন কি করে? আমরা তো আর আপনার নিজের কেউ না। নিজের হলে ঠিকই বলতেন।”

মিলির অস্বস্তি অনুভব হচ্ছে তোহা আর তাহরিমা বেগমের সামনে। একেতো তাকদিরের এত উদ্বিগ্নতা তার মধ্যে একদম ওর হাঁটুর সামনে বসে আছে। হা করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। মিলি আর কোনরকম কোন কথা বাড়াতে চাইলো না। ছেলেটার যা ইচ্ছে তাই বলে চলে যাক তাড়াতাড়ি।

মিলি ঠিক আছে কিনা সেসব জেনে তাহরিমা বেগম তোহা কে নিয়ে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে তাকদীর কেও বললেন এখনি ওদের সাথে যেতে। তাকদীর সায় জানালো ঠিকই তবে একটু ধীরে ধীরে পা ফেলল। তাহরিমা বেগম আর তোহা বেরিয়ে যেতেই আবারও কয়েক কদম পিছিয়ে মিলির কাছে এলো।এবারে আর রাগী গলায় না, চিন্তিত গলায় বলল,

“সত্যি ঠিক আছেন আপনি? কিছু হয়নি তো?”

মিলি এবার একটু বিরক্তির সহিত বলল,

“হ্যাঁ রে বাবা ঠিক আছি আমি। আমাকে দেখে কি মনে হচ্ছে আমি ঠিক নেই?”

তাকদীর একটু হেসে বলল,

“না। আমার রসগোল্লাকে দেখতে একদম ফার্স্ট ক্লাস লাগছে।”

মিলি এবার রাগ দেখিয়ে বলল,

“আবার আজেবাজে কথা? টেনে একটা চ'ড় লাগাবো। আর শোনো আমি তোমার না কথাটা মাথায় রাখো। দ্বিতীয় দিন আর আমাকে নিজের বলে সম্মোধন করবে না।”

মিলির কথায় তাকদীর কষ্ট পেল। চুপচাপ গাল ফুলিয়ে চলে যেতে নিলে মিলি পিছন থেকে একবার ওর নাম ধরে ডাকলো। ছেলেটা থামলো ঠিকই তবে পিছন ফিরে তাকালো না।

মিলি গম্ভীর গলায় বলল,

“সব ফ্ল্যাটেরই কি ডুপ্লিকেট চাবি তোমার কাছে আছে?”

তাকদীর দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বোধক উত্তর জানালো।

“তাহলে আমার ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবি তোমার কাছে কি করছে? তুমি আলাদা করে বানিয়ে নিয়েছো?”

তাকদীর পিছন ঘুরে মিলির কথায় অসম্মতি জানিয়ে বলল,

“না। আসলে আমরা আগে এই ফ্লাটে থাকতাম। পরে ওই পাশের ফ্ল্যাটে শিফট করে গিয়েছি তাই একটা চাবি আমাদের কাছেও আছে। আমি আলাদা করে বানায়নি সত্যি বলছি। আসলে পুরনো চাবিটা হারিয়ে গিয়েছিল সেজন্য নতুন করে একটা বানিয়ে ছিলাম। পরে নতুনটা আপনাকে দেওয়ার পর পুরনোটা খুঁজে পেয়েছি। সেটা দিয়েই আমি আসি।”

মিলি সন্দেহী কণ্ঠে বলল,

“সত্যি বলছো?”

“আপনাকে ছুঁয়ে বলবো?”

“আমাকে ছুঁয়ে যে মিথ্যে বলবে না তার কি গ্যারান্টি আছে?”

তাকদীর এবারে সত্যিই কষ্ট পেল। এবার আর কোন নাটক না, কোন বাচ্চামো না, ভীষণ কষ্ট পেল। মিলি ওকে এতোটুকুও বিশ্বাস করতে পারেনা? মিলি এতটুকুও বুঝলো না যে তাকদীর অন্তত ওকে ছুঁয়ে কিছু মিথ্যে বলবে না। ব্যথাতুর গলায় বলল,

“এভাবে বলবেন না মিলি, কষ্ট পাই আমি।সত্যিই কষ্ট পাই। আপনাকে ছুঁয়ে মিথ্যে বলবো এত সাহস আমার নেই। বিশ্বাস করুন আমি আপনাকে কোন মিথ্যে বলিনি।”

তাকদীরের গুরুতর মুখ ভঙ্গিটা মিলি বুঝলো ঠিকই তবে খুব বেশি পাত্তা দিলো না। বরং তাকদীরের কথাগুলো হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে হেসে উঠে বলল,

“আরে তুমি তো দেখছি ভয় পেয়ে গেলে।আমিতো মজা করছিলাম। তোমাদের মতন বাচ্চাদের নিয়ে এই এক জ্বালা। হুট করে এক কথায় সিরিয়াস হয়ে যাও।”

মিলি কেন এখন এই কথাটা বলল সেটা তাকদীর বুঝলো। এতটাও অবুঝ না তাকদীর। যেটুকু অবুঝ সেটুকুও মিলিকে হাসানোর জন্য দেখায়। আলতো হেসে বলল,

“আমাকে যার সাথেই তুলনা করুন না কেন তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। কোন বাচ্চার সাথে তুলনা করুন কিংবা আপনার ভাইয়ের ছেলের সাথে তাতে আমি কিছুই মনে করবো না। আপনিও জানেন আমি আসলে কি চাই আমিও জানি আমি আসলে কি চাই।আমি মিথ্যে বলি না কিন্তু আপনি মিথ্যে বলাটা এবার ছেড়ে দিন।সবকিছু বুঝেও না বোঝার ভান করাটা ছেড়ে দিন। আসছি।”

তাকদীর যাওয়ার জন্য পিছন ফিরতেই দেখল তোহা পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ করে তোহা কে দেখে ভূত দেখার মতন চমকে উঠে বলল,

“তুই এখানে কি করছিস?”

মেয়েটা বোকা বোকা হেসে বলল,

“মিলি আপুকে দেখতে এসেছিলাম।”

“তো এমন চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলিস কেন? কথা শুনছিলি লুকিয়ে লুকিয়ে আমাদের?”

“না তেমন কিছু না। আমি কিছু শুনিনি।”

তাকদীর সন্দেহী গলায় বলল,

“সত্যি শুনিস নি তো?”

“শুনলেই বা কি? তুমি কি এমন কিছু বলেছো যে আমি শুনলে সমস্যা হবে?”

“হ্যাঁ হবে। আমার সমস্যা হবে না, তোরই সমস্যা হবে। যাইহোক বেশি বিরক্ত করিস না ওনাকে। তোর অযথা বকর বকর শোনার সময় ওনার কাছে নেই। চলে আয়।”

কথাটা বলে তাকদীর চলে গেল। তোহা যতই বলুক ও কিছু শোনেনি, কিন্তু কেন যেন মিলির সন্দেহ হলো। আর সন্দেহটা বাড়লো তোহার চোখের কোনায় চিক চিক করা এক বিন্দু জল দেখে। মিলি নিজ থেকে এগিয়ে গিয়ে তোহার গালে হাত রেখে বলল,

“কিছু বলবে তোহা?”

তোহা মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“না আপু। আমি আসি এখন। আবার পরে আসবো।”

তোহার যেন খুব তাড়া ছিল চলে যাওয়ার। সেই তাড়ার কারণ সম্পর্কে মিলি ঠিক নিশ্চিত হতে পারল না। একদিকে যেমন তোহার বিষয়টা ভাবাচ্ছে ঠিক তেমনই তাকদীরের বিষয়টাও ভাবাচ্ছে। কেন যে বারবার মিলির জীবনেই এত অশান্তি চলে আসে কে জানে? একটু শান্তিতে থাকতে দেয় না ওকে কেউ।

বিজ্ঞাপন
রিক্ত বসন্ত গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস