রিক্ত বসন্ত

পর্ব - ৩৫

🟢

“আমাদের সাথে ঢাকা ফিরে চল। এখনে একা একা কি করে থাকবে? কি করে সামলাবি সব?”

“আবার সেই একই কথা ভাইয়া। ফিরে যাওয়ার হলে তো এখানে আসতাম না। ওই শহরে পা রাখার বিন্দুমাত্র কোন ইচ্ছে আমার নেই।”

“পা'গ'লা'মো করিস না মিলি, বাড়ি ফিরে চল। দেখিস তোর ছেলের মুখটা দেখে বাবা মেনে নেবে, কিছু বলবে না।”

মিলি তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

“তাই? তা তোমরা যে এখানে এসেছো তাহলে নিশ্চয়ই খবর পেয়েই গেছে যে আমার ছেলে হয়েছে। কই একটাবারও তো ফোন করে খোঁজ নিল না? আর তুমি বলছো আমি ফেরত গেলে মেনে নেবে? বাবার কাছে আমি মৃত ভাইয়া। আমার দোষের কারণেই মৃত। আমি অনেক দয়ার পাত্রী হয়েছি, আমার ছেলেটা না হয় নাই হলো।”

মাহবুব আরো জোর করতো তবে পিউ ইশারায় থামতে বলল। আসার দিন থেকে সেই একই কথা শুরু করেছে মাহবুব, ওর সাথে ঢাকা নিয়ে যাবে, ঢাকা নিয়ে যাবে। এক মুহূর্তের জন্য মেয়েটাকে শান্তি পেতে দিচ্ছে না।

চুপচাপ বসে থাকলো মাহবুব। একটু পর তাকদীর এলো। মাহবুব আসার পর থেকে ছেলেটা বেশ ভদ্র হয়ে গেছে, শান্তশিষ্টও হয়ে গেছে। বলা চলে চঞ্চলতা অনেকটা কমেছে। আজেবাজে কোন কথা বলে না, বেশি ছোটাছুটি করে না, মিলির সাথে খুব বেশি মজা করে না। যেটুকু কথা বলা একদম জরুরী সেটুকুই বলে তাও গুরুতর ভঙ্গিতে বলে। বাচ্চাকে নিয়েও মিলিকে অনেক পরামর্শ দেয় যেন তাকদীর কত কিছু জানে। এমন ভাবে পরামর্শ দেয় মনে হয় তার বাচ্চা মানুষ করার অভ্যাস আছে বহুদিনের। অথচ মিলি হেসে সামনে তাকদীরের সম্মানের পরোয়া না করে বলে,

“তুমি তো নিজেই এখনো একটা বাচ্চা।”

আর ঠিক তখনই সবাই হেসে ওঠে। তাকদীরের এত কষ্ট করে গড়ে তোলা মাহবুবের সামনে নিজের সম্মানটা মুহূর্তের মাঝে নষ্ট হয়ে যায়।

তাকদীর বেডের কাছে মিলির পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,

“ডিসচার্জ হয়ে গেছে। চলুন বাড়ি যাবো।”

মাহবুব আবারও মিলিকে বলল,

“অন্য কোথাও যাওয়ার দরকার নেই, চল সোজা ঢাকা ফিরে যাই। এখানে যা আছে থাক, কিছু নেওয়ার দরকার নেই।”

তাকদীর তৎক্ষণাত বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

“ঢাকা নিয়ে যাবেন মানে? উনি ঢাকা যাবেন কেন?”

মাহবুব স্বভাব সুলভ গম্ভীর গলায় বলল,

“ওর বাড়ি ঢাকা তাই।”

“ওনার বাড়ি তো এখানেও আছে। আর সিনিয়র আপনি ঢাকা যাবেন?”

মিলি দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে না বোধক উত্তর জানালো। তাকদীর স্বস্তি পেল। মাহবুবের দিকে তাকিয়ে বলল,

“দেখেছেন উনি যেতে চান না। উনি এ্যাডাল্ট, আপনি ওনাকে জোর করে নিয়ে যেতে পারেন না।”

“আমার বোনকে আমি যেখানে ইচ্ছে সেখানে নিয়ে যেতে পারি। হু আর ইউ?”

“আমি তাকদীর। চেনেন না নাকি আমাকে?”

মাহবুব বোধহয় একটু বিরক্ত হলো সেটা তার কণ্ঠ শুনেই বোঝা গেল। মিলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“সেই প্রথম দিন থেকে এই ছেলেটার ভীষণ কনফিডেন্স দেখছি আমি মিলি। তোকে নিয়ে খুব কনফিডেন্স দেখিয়ে বলে তুই নাকি আমাকে পরিচয় দিবি ওর সাথে। একটু দে তো ওর পরিচয়।”

মিলি হেসে উঠে মাহবুব এর পাশের চেয়ারে বসা ওর ছেলেকে দেখিয়ে বলল,

“এই যে তোমার ছেলে মুহিবের মতো একটা চঞ্চল, দুষ্টু বাচ্চা টাইপের মানুষ। মুহিবের মতনই যে আমাকে বিরক্ত করে খুব মজা পায়। হাইট দেখে বুঝবে না যে বাচ্চা কিন্তু আচরণ একদমই বাচ্চাদের মতন।”

তাকদীর হালকা রাগান্বিত গলাতেই বলল,

“প্লিজ সিনিয়ার সব সময় বাচ্চা-বাচ্চা বলবেন না। আম্মু কি বলে জানেন? ঠিক সময় আমার বিয়ে দিলে আমি এক বাচ্চার বাবা হয়ে যেতাম এতদিনে। আর শুনুন কেউ জোর করলেই যে আপনাকে সেটা শুনতে হবে তেমনটা না। নিজের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিন।”

মাহবুব কটমটে দৃষ্টিতে তাকদীরের দিকে তাকিয়ে থাকলো, কিছু বলল না। আপাতত মিলির সামনে কোন রকমের কোন ঝামেলা করতে চাইছে না জন্য ছেলেটা বেঁচে গেল মাবুবের হাত থেকে।

________

এক সপ্তাহ পর তন্ময় অফিসে পা রাখল। এই পুরো সপ্তাহ না অফিসে এসেছে, না অফিসের কারো সাথে যোগাযোগ করেছে। নিজের ছেলের ছবি দেখার পর সেই পুরোটা দিন মিলির কলের অপেক্ষা করেছিল। কিন্তু এক সময় গিয়ে তন্ময় বুঝেছিল যে ও মিথ্যে আশা রাখছে। মিলি কোনদিন ওকে কল করবে না। তারপরে সেই যে ফোনটা বন্ধ করেছিলো আর খোলেনি।

তন্ময় মনস্থির করে এসেছে যদি চাকরি যায় তো যাবে। হাতে যদি সোজা টার্মিনেশন লেটার ধরিয়ে দেয় তাও কিছু কথা বলবে না। চুপচাপ বেরিয়ে আসবে।

এক সপ্তাহ পর তন্ময়কে দেখে সবাই ভূত দেখার মতন করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলো। তন্ময়ের অবশ্য সেসব কিছু যায় আসে না। সোজা হেঁটে লিজার কেবিনে গেল। উঁকি দিতেই দেখল ভেতরে লিজা আছে। অনুমতি চাইলো। এতগুলো দিন পর তন্ময়কে দেখে লিজার মাঝে বাড়তি কোন উৎকণ্ঠা দেখা গেল না। বরং স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেসে অনুমতি দিল ভিতরে আসার।

তন্ময় ভিতর এসে চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ল। ভীষণ নির্লিপ্ত দেখাচ্ছে তাকে। লিজা কিছু বোঝার চেষ্টা করলো তবে ব্যর্থ হলো। এই কয়দিন যে তন্ময় বাড়িতেই ছিল সে খোঁজ লিজা পেয়েছে। একবারের জন্যও বাড়ি থেকে বের হয়নি। তবে সেসব বিষয়ে আর গেল না।হাস্যোজ্জ্বল গলায় তন্ময় কে বলল,

“কেমন আছেন তন্ময়?”

তন্ময় আবারও নির্লিপ্ত গলায় বলল,

“ভালো আছি। এক সপ্তাহ অফিসে আসিনি ম্যাডাম।আপনার থেকে কোন ছুটিও নেওয়া ছিল না, আপনাকে কিছু জানাইওনি, বেতন কেটে নেবেন। আর যদি খুব বেশি যদি বেয়া'দবি করে থাকি তবে চাকরি থেকে বের করে দিতে পারেন, সমস্যা নেই।”

তন্ময়ের কথায় লিজা অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে বলল,

“কি বলছেন এসব? আপনাকে চাকরি থেকে বের করে দেওয়ার কথা কোথা থেকে আসছে? আর বেতন কাটার কথাই বা কেন আসছে বলুন তো?”

“এটাতো কোম্পানির নিয়ম কোন এমপ্লয়ি অফিসে না এলে অবশ্যই ছুটি নিতে হবে। আর কোন এমপ্লয়ি যদি নিয়মের বাইরে যায় তাহলে তো অবশ্যই..”

“কিন্তু আপনার সাথে তো বাকি এমপ্লয়িদের তুলনা হয় না। আপনাকে আমি আর কিভাবে বোঝাবো বলুন তো যে আপনি আমার কাছে স্পেশাল। আপনি নিজেকে এমপ্লয়ি ভাবছেন কেন? আপনি আমার খুব কাছের একজন। আর অফিসে না এলে আপনাকে লিখিতভাবে কিংবা মৌখিক ভাবে আমার থেকে ছুটি নিতে হবে না। আপনার ইচ্ছে হলে আসবেন না হলে আসবেন না। এটা আপনারই অফিস।”

“হাসালেন ম্যাডাম। কোম্পানির মালিক আপনি আর আমাকে বলছেন আমি যেন নিজের মনে করি? তবে লিখে দিন আমার নামে। তখন একেবারে নিজের মনে হবে।”

“আপনি আবদার করলে দিতেই পারি। এমনিতেও আমার যা সব তো আপনারই, যদি আপনি চান। আপনি চাইলে কিন্তু খুব সহজেই এই কোম্পানির মালিক হয়ে যেতে পারেন তন্ময়।”

“কিভাবে?”

তন্ময়ের কন্ঠে বেশ অনেকটা বিরক্তি প্রকাশ পেল।লিজা নিজের চেয়ার থেকে উঠে এসে তন্ময়ের পাশের চেয়ারটায় বসল। বরাবরের মতন তন্ময়ের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নেওয়ার চেষ্টা করলো আর তন্ময়ও বরাবরের মতন বিরক্তি নিয়ে সেটা সরিয়ে দিলো। লিজা কিছু মনে করলো না। এখন রাগলে চলবে না। বেশ ভালো একটা সুযোগ হাতে এসেছে। মনে হচ্ছে এখনই তন্ময় কে বলে দিতে হবে সবটা।

“দেখুন তন্ময় আমি জানি আপনার সাথে আমার পরিচয়টা খুব অল্প দিনের। আপনার সাথে আমার যখন পরিচয় হয় তখন আপনি মানসিকভাবে খুবই বিধ্বস্ত ছিলেন। আমি একজন অগোছালো তন্ময় কে দেখেছি যার অগোছালো জীবনটা আমাকে ভীষণভাবে পীড়া দিয়েছে। আমি জানি আপনার একটা টেরিবেল অতীত আছে। আমার সব সময় মনে হয়েছে আমি আপনার অতীতটা ভুলিয়ে দিতে চাই। আমি সবসময় চেয়েছি আপনার বর্তমানটা সুন্দর করতে। আর আপনি চাইলে আপনার ভবিষ্যতটা সুন্দর করার দায়িত্ব আমি নিতে পারি তন্ময়।”

তন্ময় গম্ভীর গলায় বলল,

“সোজাসুজি বলুন কি বলতে চান?”

“এত কিছু বলার পরেও বুঝলেম না। আই লাভ ইউ তন্ময়। আমি জানিনা কি করে এসব হয়ে গেল কিন্তু আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি। আমি আপনার সাথে আমার বাকি জীবনটা কাটাতে চাই তন্ময়। উইল ইউ বি মাইন ফর এভার? উইল ইউ ম্যারি মি তন্ময়?”

তন্ময় তৎক্ষণাৎ চেয়ার থেকে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে রাগান্বিত গলায় বলল,

“অসম্ভব! কি আজেবাজে কথা বলছেন এসব? আমি এতদিন বুঝতাম আপনার মাঝে কোন গন্ডগোল আছে কিন্তু তাই বলে সরাসরি এভাবে বলে দেবেন ভাবিনি কখনো। আমাদের দুজনের সম্পর্কটা তো একবার তফাৎ করুন। আপনি মালিক আর আমি সামান্য কর্মচারী।”

“তো কি হয়েছে? ভালোবাসায় এত পার্থক্য হয় না। আমি জানিনা আপনি কে, আপনি কেমন, আপনার অতীত কি ছিল আমি শুধু জানি আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি। আমাকে ফিরিয়ে দেবেন না।”

“আপনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রশ্নই আসছে না ম্যাডাম কারণ আমি কখনো আপনাকে গ্রহণই করিনি। আপনি একা একা এসেছেন একা একাই ফিরে যান সেটাই ভালো হবে। আর বিয়ের কথা বলছেন? আমি পা'গল হইনি যে আবার বিয়ে করতে যাব। জীবনে একবারই বিয়ে করেছি আর করবো না। সেই একটা বিয়ের ধাক্কাই সামলাতে পারছিনা আবার কোন দুঃখে আরেকটা ধাক্কা খেতে যাবো?”

“কিন্তু কেন তন্ময়? আমি মানছি আপনার অতীতে যিনি ছিল তিনি খারাপ ছিল কিন্তু তার মানে তো এমনটা না যে আমিও খারাপ হবো। আমি আপনার আগের ওয়াইফের থেকেও আপনাকে অনেক বেশি ভালো রাখবো। আপনার অনেক বেশি খেয়াল রাখবো প্রমিস করছি।”

“দেখুন ম্যাডাম অযথা এক কথা বলে লাভ নেই। মিলির থেকে বেশি আমায় কেউ ভালোবাসতে পারবে না আমি সেসব জানি, বুঝে গেছি। আর আপনি কি খেয়াল রাখবেন? আপনাদের মতন বড়লোকের মেয়েরা কখনো ঐসব করতেই জানে না। স্বামী সেবা কি হয় সেসব আপনারা বুঝবেনই না। আর মিলির সাথে নিজের তুলনা না দিলেই খুশি হব।”

বিজ্ঞাপন

“তাহলে আমি কি করবো বলুন? কি করলে আপনি আমাকে বিয়ে করতে রাজি হবেন?”

“রাজি তো কখনোই হবো না। তবে আপনি কি করবেন সেটা বলে দিতে পারি।”

“বলুন।”

“আমার হাতে টার্মিনেশন লেটার ধরিয়ে দিন না হলে আমি নিজে রেজিগনেশন লেটার জমা দিয়ে চলে যাব। দরকার নেই আমার চাকরির।”

লিজা আঁৎকে উঠে বলল,

“কি আজেবাজে কথা বলছেন এসব?”

“আমি একদমই ঠিক কথা বলছি ম্যাডাম। এতদিন নিরুপায় ছিলাম জন্য এই চাকরিটা ছাড়িনি। আজও আমি নিরুপায় আছি কিন্তু তারপরেও আমার পক্ষে এখন আর এই চাকরিটা করা সম্ভব না। ভেবে নিয়েছি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে গ্রামে চলে যাব। দরকার পড়লে বাবার সাথে জমি-জমায় কাজ করবো। তবুও আর এখানে না। এই শহরটা বি'ষাক্ত ঠেকছে আমার কাছে।”

ভুল সময় ভুল কথাটা বলে ফেলেছে লিজা সেটা এখন বুঝতে পারছে। আজ ভেবেছিল তন্ময়ের মনটা বোধহয় ভালো আছে কিন্তু না তন্ময় ভীষণভাবে হতাশায় ভুগছে। এই মুহূর্তে কথাগুলো তোলা লিজার একদম ঠিক করেনি, ভুল করে ফেলেছে।

লিজা অনুরোধের স্বরে তন্ময় কে বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে আমি ভুল করে ফেলেছি। আর কখনো আপনাকে এই ধরনের কোন কথা বলব না তাও প্লিজ আপনি ছাড়বেন না চাকরিটা।”

তন্ময় পাল্টা অনুরোধ করে বলল,

“আমাকে আটকাবেন না দয়া করে ম্যাডাম। আপনার অনুভূতিকে আমি সম্মান করছি। আমার না চাওয়া সত্ত্বেও আপনি আমায় অনেক সুযোগ সুবিধা দিয়েছেন, অনেক সাহায্য করেছেন তার জন্য আমি আপনার কাছে চির কৃতজ্ঞ। আপনি আমাকে এমন একটা পদে চাকরি দিয়েছেন যেটার আমি এখনো যোগ্য হয়ে উঠতে পারিনি। আমার যোগ্যতার থেকে অনেক বেশি বেতন দিয়েছেন আমায়। আমার বিপদে সবসময় আমার পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আজ আপনি আমাকে কোম্পানির মালিক বানাতে চেয়েছেন কিন্তু এত কিছুর আমার কোন দরকার নেই। জীবনের সবথেকে মূল্যবান কিছু জিনিস হারিয়ে ফেলেছি। এখন আর কোন কিছুই আমাকে টানতে পারে না।”

“বললাম তো তন্ময় আমি ভুল করে ফেলেছি আর কখনো তুলবো না এসব কথা। আপনি কখনো বুঝতেই পারবেন না যে আমি আপনাকে ভালোবেসেছি। আমরা ভালো বন্ধু হয়ে থাকবো কিন্তু তাও চাকরিটা ছেড়ে যাবেন না।”

“আমি আমার রেজিগনেশন লেটার আপনাকে মেইল করে দেব। আর আপনার সকল সাহায্যের জন্য আমি আপনার কাছে চির কৃতজ্ঞ। অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। আর একটা কথা বলি আমাকে ভালোবেসে খুব বড় ভুল করে ফেলেছেন। আমার মতন জঘন্য মানুষ এই পৃথিবীতে আর একটাও নেই।”

কথাটা বলে তন্ময় চলে গেল। লিজা চেয়ারে বসে নিজেই দু হাতে নিজের চুল খামচে ধরলো। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে খুব বড় ভুল করে ফেলল লিজা।

_______

আমজাদ সাহেবের ফোন নাম্বারটা বের করে মোবাইলটা হাতে ধরে সোফার উপরে চুপচাপ বসে আছে তন্ময়। অনেকবার চেষ্টা করলো ডায়াল করার কিন্তু সাহস হচ্ছে না। বারবার ডায়াল করতে গিয়েও ফিরে আসছে। ভয় পাচ্ছে না সংকোচ হচ্ছে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না।

তবে আজ তন্ময় যতই নিরুপায় হোক না কেন, যতই সংকোচ হোক না কেন আমজাদ সাহেবকে কল করতেই হবে। এছাড়া যে তন্ময়ের কাছে আর কোন উপায় নেই। লিজা কে তো বলে এসেছে রেজিগনেশন লেটার মেইল করে দেবে ।তাহলে যে এবার চাকরি ছাড়তেই হবে। আর নতুন করে এখানে চাকরি করার বা খোঁজার কোন ইচ্ছে নেই তন্ময়ের। সত্যি বলতে এই শহরে আর থাকার ইচ্ছে নেই।

মিলির সাথে যে বাড়িতে সংসার পেতেছিল সেই বাড়িটা তো ছেড়েছে ঠিকই তবে আজকাল সেই স্মৃতিগুলো তন্ময়কে তাড়া করে বেড়ায়। খুব জঘন্য ভাবে তন্ময়কে বিরক্ত করে। যখন তখন স্মৃতির পাতায় উঁকি দেয়। তন্ময়কে ভাবায় বারবার যে সে জীবনে কত বড় ভুল করেছে।

অনেক ভাবনা চিন্তার পর তন্ময় ডায়াল করলো আমজাদ সাহেবের নাম্বারটা। রিং হয়ে গেল কিন্তু কেউ ফোনটা রিসিভ করল না। একটু বিরতি নিয়ে তন্ময় আবারো ফোন করলো। না এবারও কেউ রিসিভ করলো না। তন্ময় এবারে যেন বুঝতে পারছে যে অপর পাশ থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে ওর কলটা রিসিভ করা হচ্ছে না। কিন্তু তবু আরো একবার কল করল। আর এবারে বেশ তাড়াতাড়ি কলটা রিসিভ হলো। তন্ময়ের ভালো লাগে। দেরিতে হোক তবু রিসিভ তো করেছে। সালাম দিল তবে সেই সালামের জবাব আমজাদ সাহেব দিলেন না। গম্ভীর গলায় বললেন,

“কে?”

তন্ময় চমকালো। বুঝতে পারলো না যে আমজাদ সাহেব সত্যিই চিনতে পারেনি নাকি ইচ্ছে করে এমন বলল। তন্ময় তো নাম্বারটাও পরিবর্তন করেনি যে চিনতে পারবে না। আর সালাম তো দিল কণ্ঠটা শুনেও কি বুঝলো না?

তন্ময় নিজেই নিজেকে বোঝালো না ইচ্ছাকৃতভাবে এটা বলছে না। হয়তো সত্যিই চিনতে পারেনি। এমনও তো হতে পারে যে স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা না দেখেই কলটা রিসিভ করেছে।

“আব্বু আমি তন্ময়।”

“কে তন্ময়? আমার মনে হয় আপনি ভুল নাম্বারে কল করেছেন?”

“আমি তোমার ছেলে তন্ময় কথা বলছি। নাম্বার দেখো।”

“আমার ছেলে তন্ময় তো অনেকদিন আগে মা'রা গেছে আপনি জানেন না? আমি তো ওর দাফনও করে দিয়েছি আমার মনের মাঝে। ওর প্রতি এতটাই ঘৃণা জমে ছিল যে দাফন করার আগে শেষবারের মতন ওর মুখটা অব্দি দেখিনি আমি। এখন আমার মৃত ছেলে কি করে কথা বলতে পারে? সেজন্যই তো আমি বলছি আমি আপনাকে চিনি না। আপনি ভুল জায়গায় কল করেছেন।”

খুব আঘাত পেল তন্ময়। ওর বাবা কি সুন্দর অনায়াসে বলে ফেললো তন্ময় নাকি মৃত। নিজের মনের মাঝে তন্ময়ের দাফনও করে দিয়েছেন। একজন জীবিত মানুষকে মৃত বলা বুঝি এতটা সহজ? তাও যখন আবার বিপরীত পাশের মানুষটা ওনার নিজের সন্তান।আচ্ছা নিজের সন্তানকে অবহেলা করা কি এতই সহজ?

নিজের মনে উদয় হওয়া প্রশ্নের বিপরীতে তন্ময়ের নিজের কথাই মনে হলো। সত্যি তো সহজই অবহেলা করা। তন্ময় তো নিজেও নিজের সন্তানকে অবহেলা করেছিল। কত জঘন্য ব্যবহার করেছে মিলির সাথে, সব সময় বলেছে ওটা মিলির সন্তান, তন্ময়ের না।

তন্ময়কে নীরব থাকতে দেখে ফোনের অপর পাশে থাকা আমজাদ সাহেব আবারও গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন,

“আপনার কি আর কিছু জিজ্ঞেস করার আছে?”

“আমি বাড়ি যেতে চাই আব্বু। আমি এক সপ্তাহের মধ্যেই গ্রামে ফিরে আসছি। এখানে আমার আর কেউ নেই, আমার করার মতন কিছু নেই, আমি ভীষণ একা হয়ে গেছি। আমি জানি গ্রামে গিয়েও হয়তো আমি একাই থাকবো আর সেটা তোমার এই কথার ধরন, তোমার আপনি আপনি বলা দেখেই আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু তবুও আমি গ্রামে ফিরতে চাই আব্বু। এই শহরে আমি আর টিকতে পারছি না।”

আমজাদ সাহেব এবারে আর নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না। মনে হচ্ছে কোন অমানুষকে জন্ম দিয়েছেন তিনি। নিজের শিক্ষার উপর এখন তার ঘৃণা হচ্ছে। তিনি এখন গর্বের সাথে কাউকে পরিচয় দিতে পারেন না যে তন্ময় নামক তার একটা ছেলে আছে।

“মনে রাখিস যদি তোর পা আমার বাড়িতে পড়েছে তবে আমার ম'রা মুখ দেখবি তুই। জানিনা এ জীবনে কি এমন পাপ করেছিলাম যে খোদা তোর মতন ছেলে দিয়েছে আমায়। জীবনে তো অনেক অশান্তি দিলি, এই শেষ বয়সে অন্তত মৃত্যুর আগে একটু শান্তিতে থাকতে দে আমায়। ম'রার সময় তোর মুখটা দেখলে আমি ম'রেও শান্তি পাবো না। বারবার আমার মিলির কথা মনে পড়বে। মনে পড়বে তুই মেয়েটাকে কিভাবে ঠকিয়েছিস, ঠিক কতটা কষ্ট দিয়েছিস। আর তোর জন্য এই বৃদ্ধ বয়সে আমি আমার নাতি কিংবা নাতনির থেকে দূরে আছি। জানিনা মেয়েটা কেমন আছে।”

হঠাৎ করে তন্ময়ের কি যেন হলো। উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,

“তোমার নাতি হয়েছে বাবা। আমার ছেলে হয়েছে। দেখবে তুমি? আমার কাছে ছবি আছে। একদম আমার মতন হয়েছে দেখতে। আমি ছবি পাঠাচ্ছি তুমি আম্মু, ভাইয়া, ভাবিকে দেখিয়ো।”

আমজাদ সাহেবের পাশে বসে তনিমা কথাটা শুনলেন যে ওনার নাতি হয়েছে। আঁচলে মুখ গুজে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। এক ছেলের শোকই তিনি সামলাতে পারছিলেন না। শুধুমাত্র স্বামীর ভয়ে চুপচাপ আছেন। তবুও দিনে চারবার করে স্বামীর কানের কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করেন যেন ছেলেকে ক্ষমা করে দেয়। অনেক কিছু বোঝানোর চেষ্টা করেন যে মিলি এখন ভালো আছে। আর তাছাড়া ছেলের আগে কি কখনো ছেলের বউ হয় নাকি? যতই হোক ওনাদেরই তো র"ক্ত। আজই কোন বিপদে পড়ুক দেখবে তো সেই ছেলে, ছেলের বউ তো ছুটে আসবেনা। কিন্তু যখনই আমজাদ সাহেব র'ক্তচক্ষু নিয়ে তাকায় তখনই আবার থেমে যেতে হয়।

স্বামীকে উদ্দেশ্য করে অনুরোধে স্বরে বললেন,

“ক্ষমা করে দাও ছেলেটাকে। ও বাড়ি ফিরতে চাইছে ফিরতে দাও।”

“চুপ করো তুমি আমি কথা বলছি তো।”

আমজাদ সাহেব আবারও রাগান্বিত গলায় তন্ময় কে উদ্দেশ্য করে বলল,

‘যদি আমার আমার নাতিকে দেখার হয় তবে আমি গিয়ে ওকে দেখে আসব। তবে তোমায় একটা কথা বলে রাখছি আমার বাড়ির দরজা তোমার জন্য চিরকালের মতন বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বিপদে পড়ে টাকা ভিক্ষে চেয়েছিলে, দিয়ে দিয়েছি। তোমার সম্পত্তির ভাগ ওর মাঝে চলে গিয়েছে।”

“আমি তো তোমার থেকে ভিক্ষে চাইনি আব্বু। অনুরোধ করেছিলাম তাও একবার। তবে অপমান করছ কেন এভাবে?”

আমজাদ সাহেব ব্যাঙ্গাত্মক হেসে বলল,

“ঠিকই বলেছো। তুমি তো ভিক্ষে চাওনি আমার থেকে। তবে তোমাকে আজ একটা সত্যি কথা বলি, তোমার কি মনে হয় তুমি ছেলে আমার, তোমার প্রতি ভালোবাসা থেকে তোমায় টাকাগুলো দিয়েছিলাম? তোমার অনুরোধ, কান্নাকাটি শুনে আমার মন গলে গিয়েছিল? না তেমন কিছু না। এখানেও তোমায় বাঁচিয়ে নিয়েছিল মিলি। জানিনা ও কি করে খোঁজ পেয়ে গিয়েছিল যে তুমি বিপদের মাঝে আছো, মেয়েটা আমায় ফোন করে অনেক অনুরোধ করেছে। ওর অনুরোধ আমি ফেলতে পারিনি জন্যই টাকা গুলো দিয়েছিলাম।”

তন্ময় বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

“মিলি তোমার সাথে যোগাযোগ রেখেছে?”

“তোমার জন্য এক দিনই কল করেছিলে নিজ থেকে। তারপরে আর যোগাযোগ করতে পারিনি।”

“ও সত্যি তোমাকে বলেছিল আব্বু আমায় টাকাগুলো দিতে? মানে ও এখনো আমায় নিয়ে চিন্তা করে। আমি খারাপ থাকলে ওর যায় আসে তাই না?”

“হ্যাঁ। তার কারণ তুমি ওকে ভালো না বাসলেও মেয়েটা তোমায় ভালোবেসেছিল। এখন কি উপলব্ধি করতে পারো কাকে হারিয়েছো তুমি? দ্বিতীয় বিয়ে কি করে নিয়েছে এতদিনে?”

“না করিনি।”

“তবে নিশ্চয়ই সামনে করবে?”

“কখনোই করব না।”

“সে তোমার যা ইচ্ছে তাই করো। তবে একটা কথা মনে রেখো আমার বাড়িতে যেন তোমার পা না পড়ে। আর কোনদিন আমায় কল করবে না। আমি ভুলে গিয়েছে অনেকদিন আগেই যে তন্ময় নামে আমার কোন ছেলে আছে। তুমিও ভুলে যাও যে তোমার বাবা-মা আছে।ভালো থেকো সেই দোয়াটাও করতে পারলাম না। মন থেকে আসছে না।”

আমজাদ সাহেব ফোনটা কেটে দিলেন।তন্ময়ের শেষ ভরসাটাও শেষ হয়ে গেল। ওকে এখন এই শহরটাতেই থাকতে হবে।

ফোনটা হাতে নিয়ে গ্যালারিতে গিয়ে সিয়ামের পাঠানো নিজের ছেলের ছবিটা বের করলো। কি অদ্ভুত ব্যাপার? তন্ময় যাকে এত অবহেলা করলো, এত ঘৃণা করলো সেই ছেলেটাও দেখতে ওর মতোনই হয়েছে। ওকে শাস্তি দেওয়ার জন্যই বোধহয় ওর মতন দেখতে হয়েছে।বারবার ওকে অপরাধী অনুভব করানোর জন্যই বোধহয় এমন হয়েছে দেখতে। আচ্ছা এই বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকালে কি মিলির তন্ময়ের কথা মনে পড়ে?

বিজ্ঞাপন
রিক্ত বসন্ত গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস