হাসপাতাল থেকে মিলিকে বাড়িতে আনার পর মাহবুব এক সপ্তাহ মিলির সাথেই থাকে।মিলির ফ্ল্যাটে এসে দেখল মাহবুবের বোনের ঘুমোনোর জন্য একটা খাট অব্দি নেই। জামা কাপড় রাখার জন্য আলমারি তো দূর একটা আলনাও নেই, ঘরে কোন ড্রেসিং টেবিল নেই, কোন ডাইনিং টেবিল নেই, ফ্রিজ নেই। বলতে গেলে কিছুই নেই। পুরো ফ্ল্যাটই ফাঁকা। রান্নাঘরে শুধু খাবার বানানোর জন্য কয়েকটা টুকিটাকি জিনিস। মাছ, মাংস কিংবা সবজি রাখার জন্য ফ্রিজের প্রয়োজন হলে মিলি তাকদীরের ফ্ল্যাটে রেখে আসে। খুব বেশি অসুবিধা হয় না। তবে মাহবুব একবার যখন দেখেছে যে তার বোন এত অসুবিধায় আছে তখন তো আর এই অবস্থায় ফেলে রেখে যেতে পারে না। যদিও মিলি খুব বেশি কিছু কিনে দিতে দেয়নি তবে একটা খাট কিনে দিয়েছে। মাহবুব চেয়েছিল বোনের পুরো ফ্ল্যাটটাই গুছিয়ে দিতে তবে মিলি সেসব করতে দেয়নি। শুধুমাত্র খাটটাই অনেক কষ্টে রাজি হয়েছে নেওয়ার জন্য। তবে মিলির ছেলের জন্য মাহবুব অনেক কিছু কিনেছে।জামা কাপড় থেকে শুরু করে খেলনা, মিলির খাবার দাবারের জিনিসপত্র, মিলির জামা কাপড় সবকিছু কিনে দিয়েছে। এই বিষয়ে মিলি আর আপত্তি করতে পারেনি। সবকিছুতে আপত্তি করা ঠিক সাজেনা।
এই সাত দিনে মাহবুব খুব ভালো এবং সূক্ষ্ম ভাবে তাকদীরকে খেয়াল করেছে। বলা যায় সব থেকে বেশি মাহবুবের মনোযোগ ছিল তাকদীরের উপরে। শুরুর পরিচয়ে যেমন তাকদীরের সাথে মাহবুবের একটা অদৃশ্য দ্বন্দ্ব ছিল এই সাত দিনের মাঝে সেটা মিটে গেছে। এখন সম্পর্কটা বেশ স্বাভাবিক।তাকদীর এখন চেষ্টা করে মাহবুব এর সামনে ভালো হয়ে থাকতে, মাহবুবের মন রক্ষা করে চলার চেষ্টা করে। মাহবুব এর সামনে মিলির আরো বেশি যত্ন নেয়। মাহবুব কে বোঝানোর চেষ্টা করে যে মিলি আর ওর ছেলের গুরুত্ব তাকদীরের জীবনে অনেক। মাহবুব এখানে নেই তো কি হয়েছে মিলিকে দেখে রাখার জন্য তাকদীর আছে। ওকে ভরসা করা যায়।
মাহবুব মাঝে মাঝে তাকদীরের সেইসব কাজ কারবার দেখে হাসে। মাঝে মাঝে আবার নিজের বোনের দিকে তাকিয়ে চিন্তায় পড়ে যায়। মাহবুব তো চেনে নিজের বোনকে, খুব ভালোভাবেই চেনে। যে পরিস্থিতির মাঝে মিলি এতগুলো দিন ছিল, যে পরিস্থিতি থেকে মিলি বেরিয়ে এসেছে তারপরে নতুন করে নিজের জীবনটা গোছানো মিলির জন্য খুব কঠিন। মিলি হয়তো এখন অসম্ভবই ভাবছে।
তবে মিলি চাইলেই সব সম্ভব। এখানে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মিলির চাওয়াটা। কেননা তাকদীরের মনের অবস্থা মাহবুব খুব ভালোভাবে আন্দাজ করতে পেরেছে। সেই সাথে বুঝতে পেরেছে মিলির অভিব্যক্তিও। বারবার তাকদীরের কথাগুলোকে, তাকদীরের যত্নগুলোকে মজার ছলে নেয়াই প্রমাণ করে দেয় যে মিলি তাকদীরের অনুভূতিগুলোকেও মজা হিসেবে নিতে চায়।
আজ আবার ঢাকা ফিরে যাবে মাহবুবরা।তবে মাহবুব ভেবেছে যাওয়ার আগে একবার তাকদীরের সাথে আলাদাভাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবে। তবে তাকদীর সকালেই কলেজে চলে গেছে। সেজন্য সারাটা দিনই মাহবুবকে অপেক্ষা করতে হলো। ভাবলো বিকালের দিকে তাকদীর এলে ওর সাথে কথা বলে নাহয় রাতে রওনা দেওয়া যাবে।
কলেজ থেকে ফিরে সবেমাত্র গায়ের জামা কাপড় ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় বসলো তাকদীর। এর মাঝেই কলিং বেল বেজে উঠলো। তাহরিমা বেগম ছাদে গিয়েছেন তাই তাকদীরকেই দরজা খুলতে হলো। দরজা খুলতেই সামনে মাহবুবকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিঞ্চিত চমকালো। এই পুরো একটা সপ্তাহে মাহবুব একবারের জন্যও ওদের ফ্ল্যাটে আসেনি।
“ভাইয়া আপনি? কিছু কি বলার ছিল?”
মাহবুব প্যান্টের পকেটে দুহাত গুজে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে তার বাড়িতে পরার সাধারণ টি শার্ট আর ট্রাউজার। পকেট থেকে এক হাত বের করে চোখের কালো ফ্রেমের চশমাটা একটু ঠেলে উপরে তুলল। আলতো একটু হেসে বলল,
“তোমার সাথে একটু কথা ছিল। ভিতরে আসতে পারি?”
তাকদীর তড়িঘড়ি করে দরজার সামনে থেকে সরে গিয়ে ব্যস্ত গলায় বলল,
“আসতে পারেন না মানে অবশ্যই আসবেন। এটা তো আপনারই বাড়ি।”
মাহবুব আবারও হাসলো। ভিতরে এলো।তাকদীর সোফায় বসতে বললে আপত্তি জানিয়ে বলল,
“তোমার ঘরে নিয়ে চলো।”
তাকদীর কোনো কারণ জিজ্ঞেস করলো না। বাধ্য ছেলের মত চুপচাপ আগে আগে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালো পিছন পিছন মাহবুব এলো। তাকদীর একটা চেয়ার টেনে দিল মাহবুব এর বসার জন্য। মাহবুব বসে আশেপাশটা একবার দেখে নিয়ে তাকদীর কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তোমার আম্মু নেই বাড়িতে?”
“আছে। আমার সাথে কলেজ থেকে ফিরেছে। ছাদে গিয়েছে।”
“ও আচ্ছা। তোমার সাথে কিছু দরকারী কথা ছিল। সময় আছে তো হাতে নাকি আমি আবার ভুল সময় এসে বিরক্ত করলাম?”
“আরে কি বলছেন ভাইয়া! আপনি বিরক্ত করতে যাবেন কেন? বরং আপনি কষ্ট করে আমার ফ্ল্যাটে এসেছেন জন্য আমার খারাপ লাগছে। আমাকে বললেই পারতেন আমি চলে যেতাম।”
“আরে না কষ্ট কিসের। বরং তুমি একটু আগেই কলেজ থেকে ফিরলে রেস্ট নেওয়ার দরকার ছিল আর আমি এসে বিরক্ত করলাম। আসলে রাতে ঢাকা চলে যাব সেজন্য ভাবলাম এখনই কথাটা বলে নেই, পরে হয়তো সময় পাবো না।”
মাহবুবের ঢাকা চলে যাওয়ার কথাটা শুনে তাকদীর সন্দেহী গলায় বলল,
“সিনিয়র আর আমার জুনিয়র কেও কি নিয়ে যাবেন আপনার সাথে?”
মিলি যে যাবে না এই ব্যাপারে তো মাহবুব নিশ্চিত। তাকদীরও নিশ্চয়ই জানে তবে আবারো ছেলেটার সন্দেহী গলায় করা প্রশ্ন শুনে মাহবুব ভাবলো একটু পরীক্ষা করে দেখা যাক তাকদীর কে।
“কেন নিয়ে গেলে কি হবে?”
“কেন নিয়ে যেতে হবে? এখানে তো ভালো আছে ওনারা।”
“শুধু এই একটা কারণ? সে তো মিলি আমার সাথে গেলে আরো বেশি ভালো থাকবে।”
“কিন্তু…”
“কিন্তু কি?”
তাকদীর চাইছে কথাটা বলতে যে মিলি চলে গেলে তো ও ভালো থাকবে না কিন্তু বলতে পারছে না। ভয় করছে যে মাহবুব আবার কি না কি মনে করে। চুপচাপ মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো।
মাহবুব নিজ থেকেই প্রশ্ন করল,
“তোমার খারাপ লাগবে ওরা চলে গেলে?”
“স্বাভাবিক না কি খারাপ লাগাটা?”
“উহু। অস্বাভাবিক। ভাড়াটিয়া আসবে যাবে এটাই তো নিয়ম তাই না? মিলি নিশ্চয়ই তোমাকে এই বাড়িতে ওঠার সময় বলেনি যে সারা জীবনের জন্য থাকবে। বললেই বা কি? ও চলে যাওয়াতে তোমার ওপর এতটা প্রভাব পড়া তো স্বাভাবিক হতে পারে না।”
তাকদীর মাথা তুলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মাহবুবের দিকে তাকিয়ে সন্দেহী গলায় বলল,
“আপনি কি কিছু ধরে ফেলেছেন?”
মাহবুব একটু শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“ধরে ফেলার মতন কিছু আছে নাকি?”
তাকদীর আমতা আমতা করে বলল,
“না তেমন কিছু নেই। তবে আপনার কথা শুনে মনে হলো কিছু ধরে ফেলেছেন।”
“ধরে ফেলার মতন কিছু না থেকে থাকলে কি ধরে ফেললাম? মিলি কিন্তু একদমই ভুল কিছু বলে না তুমি আসলেই এখনো বাচ্চাই আছো। বুদ্ধিশুদ্ধি হাঁটুর নিচে। তবে আমার ছেলের সাথে তুলনা দিয়ে মিলি ভুল করেছে। আমার ছেলে কিন্তু তোমার থেকে অনেক বেশি চালাক। ও যদি কাউকে ভালোবেসেও ফেলে ভবিষ্যতে আমি বাবা হয়ে ক্ষমতা নেই ওকে ধরার।”
তাকদীর বিস্ফোরিত নয়নে মাহবুবের দিকে তাকালো। মাহবুব চেয়ার থেকে উঠে এসে তাকদীরের পাশাপাশি দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। এদিকে মাহবুব যে তাকদীরের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সেসব বোধ হয় ছেলেটা খেয়ালই করেনি। এখনো হা করে চেয়ারের দিকে তাকিয়ে আছে। মাহবুব ওর কাঁধে হালকা করে একটু ধাক্কা দিতেই তাকদীরের ধ্যান ভাঙলো। থতমত খেয়ে বলল,
“আপনি এখানে কখন এলেন?”
“ভালোবাসো আমার বোনকে?”
তাকদীর এলোমেলো দৃষ্টি ফলে থতমত গলায় মাহবুব কে বলল,
“না মানে আসলে…”
“সৎ সাহস নিয়ে উত্তর দাও। কোন ভীতু কে যে আমার বোন ভালোবাসবে না সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছো?”
“আমি তো আপনার ভয়ে বলতে পারছি না।আপনি যদি আবার রেগে যান।”
“অযথা অকারণে রাগ দেখানোর মানুষ আমি না। তো এখন বলো ভালোবাসো আমার বোনকে?”
তাকদীর উপর নিচ মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোধক উত্তর জানালো। মাহবুব আবারও প্রশ্ন করলো,
“আমার বোনের ছেলেকে ভালোবাসতে পারবে?”
“নার্স ওকে সবার আগে আমার কোলে দিয়ে বলেছিলো আমার নাকি ছেলে হয়েছে ।তাহলে কি পারবো না আমার ছেলেকে ভালোবাসতে?”
তাকদীরের উত্তরগুলো শুনে মাহবুবের চিন্তা যেন আরো তড়তড় করে বেড়ে যাচ্ছে। আর এদিকে মাহবুব কে চুপ করে থাকতে দেখে তাকদীরের চিন্তা বাড়ছে। তবে তাকদীর আগ বাড়িয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলো না। ভাবলো এই মুহূর্তে মাহবুবের সামনে ভদ্র ভাবে থাকাটা দরকার। বেশ কিছুক্ষণ নীরবতা পালনের পর মাহবুব কথা বলে উঠলো। কিঞ্চিত চিন্তা প্রকাশ পেল ওর কন্ঠের মাঝে।
“আমি জানিনা মিলির অতীত সম্পর্কে তুমি কতটুকু জানো। তবে তোমায় একটা কথা বলি আমার বোনটা ভেতর থেকে সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। ও খুব ভালোবাসতো তন্ময়কে। এক তন্ময়ের জন্য ও সব কিছু ছেড়ে দিয়েছিল। আজও সেই তন্ময়ের জন্যই সবকিছু ছেঁড়েছুঁড়ে এখানে একা আছে।”
“আমি জানি সব। উনিও কিছু বলেছেন, আমার এক বন্ধুর থেকেও শুনেছি।”
“মিলি আর তোমার জীবনটা কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা। তোমার আলাদা একটা পরিবার আছে। মিলিও জীবনে একা না। আমি জানি ওর ফার্স্ট প্রায়োরিটি ওর ছেলে। আমি জানিনা তোমার এই কথাটা জানার পর মিলির সিদ্ধান্ত কি হবে। তবে আমি তোমায় একটা কথা বলতে চাই তাকদীর, যা করবে ভেবেচিন্তা করবে।”
“আপনি কি আমায় একটু সাহায্য করতে পারবেন?”
মাহবুব তাকদিরের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“আমার সাহায্য করার মতন এখানে কিছু নেই। এটা সম্পূর্ণ মিলি আর তোমার মনের ব্যাপার। আমি মিলিকে জোর করব না কোন কিছুতেই, আর না তোমাকে। আমি শুধু তোমাকে এতোটুকুই বলবো যদি মনস্থির করো যে আমার বোনের দায়িত্ব নিতে চাও তুমি তবে সব দিক বিবেচনা করে নেবে। ভবিষ্যতে গিয়ে কখনো যেন আফসোস না হয়। কখনো যেন তোমার এটা মনে না হয় যে আমার বোন তোমার যোগ্য না, তুমি আমার বোনের থেকে আরো ভালো কাউকে ডিজার্ভ করতে।”
তাকদীর বিস্মিত কণ্ঠে বলল,
“আপনারা সবাই এই একটা কথাই কেন তোলেন আমার সামনে? কেন বারবার আমাকে এটা বোঝান যে সিনিয়র আমার যোগ্য না, আমি ওনার থেকে ভালো কাউকে ডিজার্ভ করি? কেন বারবার আমাকে বলেন ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্তটা নিতে? যেখানে আমি ওনার মাঝে কোন খুঁত দেখতে পাই না সেখানে আপনারা এত খুঁত কি করে খুঁজে পান?”
“আমার বোন আমার কাছে নিখুঁত তাকদীর তবে তোমার পরিবারের চোখে ও কেমন হবে সেসব আমি জানিনা। আমি শুধু চাই এই ঝামেলা ঝঞ্ঝাট থেকে বেরিয়ে আমার বোন একটা সুস্থ জীবন পাক। আমি তোমায় এই বিষয়ে কিছুই বলবো না। কেননা আমি সব সময় চাইবো আমার বোন ভালো থাকুক। আমি আমার বোনের কথা ভেবে স্বার্থপরের মতন সব সিদ্ধান্তই নিতে পারি। সে ক্ষেত্রে দেখা গেল হয়তো তোমার সাথে অন্যায় করলাম। তাই বলছি যা সিদ্ধান্ত নেবে ভেবেচিন্তে নিও। মনে রেখো তোমাদের দুজনের মাঝে কিন্তু একটা ছোট্ট বাচ্চাও আছে।”
কথাটা বলে মাহবুব চলে যেতে নিলে তাকদীর ডেকে উঠলো। মাহবুব পিছন ফিরে তাকাতেই তাকদীর বলল,
“আমি আমার আম্মুর লাইফের স্ট্রাগেলটা খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমি দেখেছি আমার আম্মু আমার জন্য কতটা কষ্ট করেছে, আমার আব্বুর জন্য কত কষ্ট পেয়েছে। আমি জানি বিয়ের পর স্বামী ছাড়া একটা মেয়ের এই সোসাইটিতে একা একটা সন্তানকে নিয়ে টিকে থাকা কতটা কষ্টকর।আমি জানি একটা সন্তানের তার বাবাকে ছাড়া থাকতে ঠিক কতটা কষ্ট হয়। আমি শুধু চাই মিলি আর আমার জুনিয়র যেন ওই পরিস্থিতি গুলোর মাঝে না পড়ে।”
মাহবুব আলতো হেসে বলল,
“একটু আগে তোমাকে যা বললাম এখনো তাই বলবো। যাই সিদ্ধান্ত নেবে না কেন ভেবেচিন্তে নেবে। শুধু দেখবে আমার বোন যেন আর কোন কষ্ট না পায়। আর কখনোই ওকে জোর করবে না কোন বিষয়ে। ওর সিদ্ধান্তটাকে সম্মান করো।”
_______
দেখতে দেখতে মিলির ছেলেটার বয়স তিন মাস হয়ে গেল। তিনটে মাস কি করে কেটে গেল মিলি যেন বুঝতেই পারেনি। একা ছেলেকে সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। প্রথম বার মা হয়েছে কত কিছু তার অজানা। বাচ্চাকে খাওয়াতে পারে না, একা একা গোসল করাতে গেলে হিমশিম খায়, ছোট্ট শরীরের জামা কাপড় পরাতে পারে না ঠিক করে। তাহরিমা বেগম এক্ষেত্রে অনেক সাহায্য করে মিলিকে, অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়ে যায়। বাচ্চাকে গোসল করানোর সময় তো থাকতে পারে না সেজন্য মিলিকে শিখিয়ে দিয়েছে। তারপর থেকে অবশ্য মিলির খুব একটা বেশি অসুবিধা হয় না। তবে তিনি যখনই যতোটুকু সময় পান এসে মিলিকে সাহায্য করার চেষ্টা করেন।
ছাদে কাপড় শুকোতে দিয়েছিল মিলি। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে অথচ এখনো কাপড়গুলো ছাদ থেকে নামানো হয়নি। ছেলেকে কিছুক্ষণের জন্য তাহরিমা বেগমের কাছে দিয়ে ছাদে গেল মিলি।
মিলির ছেলের নাম রেখেছে অয়ন। নামটা অবশ্য তাকদীরের রাখা। তাকদীর খুব করে বায়না ধরেছিল মিলির কাছে যে নামটা ও রাখতে চায়। মিলিও আর আপত্তি করেনি।তাকদীরের উপরে অনেক ঋণ জমা হয়ে আছে, অনেক সাহায্য করেছে ছেলেটা, এখনো করে যাচ্ছে। সেই ছেলেটার এই ছোট্ট একটা আবদার রাখাই যায়।
মিলি ছাদে গিয়ে দেখলো রেলিং ধরে তাকদীর দাঁড়িয়ে আছে। ভীষণ বিষণ্ণ দেখাচ্ছে ওকে। মিলি এগিয়ে গেল তাকদীরের দিকে। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“মন খারাপ?”
তাকদীর একবার মিলির দিকে তাকিয়ে আবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে বলল,
“মেজাজ খারাপ।”
“কেন কি হয়েছে?”
“রাগ হচ্ছে একজনের উপর।”
“কার উপর?”
“আমার বড় মামা।”
“কেন? কি করেছেন আবার উনি?”
“বলবো না আপনাকে।”
মিলি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“বুঝতে পেরেছি। তোহার সাথে আবার বিয়ের কথা তুলেছেন তাই তো? জোরাজুরি করছে নিশ্চয়ই?”
তাকদীর হালকা রাগী গলায় বলল,
“নিশ্চয়ই খুশিই হয়েছেন এতে?”
মিলি বেশ স্বাভাবিক গলাতে বলল,
“খুশি না হওয়ার তো কিছু নেই। আমি তোমায় আগেও বলেছি তোহা খুব ভালো মেয়ে।আমার ওকে ভীষণ পছন্দ হয়েছে। যে ছেলেরই বউ হোক না কেন সেই ছেলের কপাল ভালো। আর সেই ভালো মেয়েটাকে এভাবে দূরে ঠেলে দিচ্ছো?”
“দরকার নেই আমার এত ভালো মেয়ের।”
মিলিও এবারে হালকা বিরক্তিকর গলায় বলল,
“কি সমস্যা তোমার ওকে নিয়ে বলোতো? কেন বিয়ে করবে না ওকে? কি খুঁত আছে মেয়েটার মাঝে? দেখতে শুনতে সুন্দর, পড়াশোনা করে, তোমায় ভালোবাসে।”
তাকদীর ফোঁশ করে একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে রেলিংয়ের সাথে হেলান দিল।বিজ্ঞের ন্যয় কিছু একটা ভেবে বলল,
“জানেন সিনিয়র আমার সব সময় আমার মায়ের শিক্ষা আর আমার নিজের প্রতি বিশ্বাস ছিল। আমার এখনও নিজের প্রতি এই বিশ্বাসটা আছে যে আমি একজন খুব ভালো হাজবেন্ড হতে পারব। আমি খুব কাছ থেকে আমার আম্মুকে দেখেছি একজন ভালো হাজবেন্ডের অভাবে আমার কতটা কষ্ট পেয়েছে সে। আমার আব্বু কখনো একজন পারফেক্ট হাজবেন্ড কিংবা বাবা ছিল না।”
“এসবের সাথে তোহাকে বিয়ে করা না করার কি সম্পর্ক?”
“ধীরে ধীরে বোঝাচ্ছি আপনাকে। আমার বড় মামার টাকা-পয়সার কোন সমস্যা নেই, ক্ষমতারও কোনো অভাব নেই। বড় মামা চাইলেই খুব ভালো কোন ছেলে খুঁজে তোহার বিয়ে দিয়ে দিতে পারবে। ছেলেরা কি নিয়ে সমস্যা করে? আমি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখেছি ছেলে বা ছেলের পরিবারের সদস্যরা যৌতুক দেওয়া নিয়ে ঝামেলা করে। সেক্ষেত্রে বলতে গেলে আমার বড় মামা কোন কমতি রাখবে না। উনি টাকা আর ক্ষমতা দিয়ে ওনার জামাইয়ের মুখ বন্ধ করে রাখতে পারবেন।”
“তো?”
“মানে আমি বলতে চাইছি তোহার জীবনে আমার খুব একটা প্রয়োজন নেই। আমায় না পেলেও ও জীবনে ভালো থাকতে পারবে। অথচ আমি আমার জীবনে এমন কাউকে চেয়েছিলাম যার আমাকে ভীষণ প্রয়োজন। যার জীবনে অনেক কমতি থাকবে এবং আমি সেই কমতি গুলো পূরণ করে দিতে পারবো। দেখুন, একজন মানুষ যার লাইফ অলরেডি পারফেক্ট আছে আমি আলাদা করে আবার তার লাইফটা পারফেক্ট বানানোর কোন মানেই হয় না। তার থেকে কি যার জীবনটা পারফেক্ট না, যার আমার মতন কাউকে প্রয়োজন তার জীবনটা পারফেক্ট বানানো বেশি জরুরি না?”
“মাথা ঘুরছে তোমার কথা শুনে আমার। কি সব বলছো?”
“খুব সহজ কথা। আমি সবসময় চেয়েছি কারো একটা জীবন গুছিয়ে দিতে। কারো গোছানো জীবন আমি গুছিয়ে দিতে চাইনি, কারো এলোমেলো জীবন আমি গুছিয়ে দিতে চেয়েছি।”
“মানে তুমি বলতে চাইছো যদি তোহার অন্য কারো সাথে বিয়ে হয় তবে ভালো থাকবে। মানে যদি কোন ঝামেলা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে তবে তোহার পরিবারের ভয়ে সব ঠিক হয়ে যাবে?”
“আমার তো তাই মনে হয়।”
“আর যদি সেই ছেলের চরিত্র খারাপ হয় তখন কি করবে? টাকা দিয়ে কি চরিত্র ঠিক করা যায় তাকদীর?”
তাকদীর প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে মিলির দিকে তাকালো। এই কথাটা তো কখনো ভাবেনি।
“এটা কখনো ভেবে দেখিনি। আসলে আমার আব্বু আম্মুকে সবসময় আমার নানু বাড়ি থেকে টাকা আনার জন্য প্রেসার দিতেন। আব্বু আম্মুর লাভ ম্যারেজ ছিল। তো আমার আব্বু কিছু করত না জন্য আমার নানা নানু মেনে নেয়নি বিয়েটা। বিয়ের কিছুদিন পর থেকে আব্বু বিভিন্নভাবে আম্মুকে বারবার প্রেসার দিত টাকা আনার জন্য। আমার নানু বাড়ি আগে থেকেই অবস্থা সম্পন্ন কিন্তু আম্মু কখনোই রাজি হয়নি।”
“শুধু এতোটুকুই সমস্যা?”
“না। পরবর্তীতে আম্মু জানতে পেরেছিলো আব্বুর অন্য কারো সাথে রিলেশন চলছে।”
“তাহলে দেখলে তো তাকদীর সংসার ভাঙার জন্য প্রধান কারণটা কিন্তু তোমার বাবার চরিত্র ছিল। তবে তুমি কি করে বলতে পারছো যে তোহার জীবনে অন্য কেউ এলে গুছিয়ে দেবে?”
“সব ছেলেই যে খারাপ হবে তার তো কোনো মানে নেই। আমার মামা অনেক বিচক্ষণ মানুষ। তিনি যখন তোহার জন্য পাত্র দেখবেন তখন অবশ্যই ভেবেচিন্তে ভালো কাউকেই নির্বাচন করবেন। না হলে তো আর আমাকে ঠিক করতেন না।”
“আমি জানি সব ছেলেরা খারাপ হয় না। কিন্তু ধরো সেই খারাপ ছেলেদের মধ্যে থেকেই কেউ একজন তোহার জীবনে এলো?”
তাকদীর একটু বিরক্তি নিয়েই বলল,
“আমি এত কিছু বুঝি না সিনিয়র। আপনি আমাকে যাই বোঝান না কেন আমার সব সময় এটাই মনে হবে যে তোহার আমাকে দরকার নেই। আমি ওর জীবনে গিয়ে কি করবো? ওর জীবনে কোন অপূর্ণতাই নেই যেগুলো আমি পূরণ করতে পারি। ওর জীবনে কোন আফসোসই নেই যেগুলো আমি মিটিয়ে দিতে পারি। ওর জীবনে কান্নার কোনো কারণ নেই যে আমি ওকে কাঁদার জন্য আমার কাঁধটা দিতে পারি।”
“তোমায় না পেলে তুমিই যে তোহার জীবনের সবথেকে বড় অপূর্ণতা হয়ে দাঁড়াবে সেটা ভেবে দেখেছো? আজ যে কারণগুলোর জন্য তুমি তোহাকে নিজের জীবনে জায়গা দিতে চাইছো না তোমাকে না পেলে সেই অপূর্ণতা গুলোই তোহার জীবনে তৈরি হবে।”
তাকদীর থামলো। কিছুক্ষণ ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“আর আমার জীবনের অপূর্ণতা? সেটার কি করব? আপনাকে না পেলে…”
মিলি তাকদীর কে নিজের কথা সম্পন্ন করতে দিল না। এমন ভাব দেখালো যেন কিছু শুনতেই পায়নি।
তাকদীরের কাছে আর দাঁড়ালো না। কাপড় গুলো তুলে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
“তোহা কে বিয়ে করে দেখো। মেয়েটা ওর ভালোবাসা দিয়ে তোমার জীবনের সকল অপূর্ণতা শেষ করে দেবে। তোমার জীবনে এখন একটা বিষয়েরই অভাব সেটা হলো তোহার ভালোবাসা।”
কথাগুলো বলে মিলি চলে গেল। তাকদীর ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকলো। কি সহজ ভাবে মিলি কথাগুলো বলে চলে গেল, তাকদীরের কথা শুনলোও না। অথচ মিলি বুঝলো না তাকদীরের কত কষ্ট হলো। মিলি কি বোঝেনা মিলি কে না পেলে তাকদীরের জীবনটা অপূর্ণ থেকে যাবে? এক বিরাট বড় শূন্যতা যে কুঁড়ে কুঁড়ে খাবে তাকদীর কে।