রিক্ত বসন্ত

পর্ব - ৪০

🟢

রাতের খাবার না খেয়েই মিলি বেরিয়ে পড়েছে। মাহবুব অনেকবার করে বলেছে কিছু খেতে কিন্তু মিলি রাজি হয়নি। খাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। ক্ষুধাও লাগেনি। তবে মাহবুব তো আর এভাবে না খাইয়ে ছেড়ে দিতে পারে না। গাড়িটা রাস্তার এক পাশে দাঁড় করিয়ে মিলি কে বলল,

“আমি হোটেল থেকে খাবার প্যাক করে আনছি। বাসের মধ্যে খেয়ে নেস।”

মিলি আপত্তি জানিয়ে বলল,

“লাগবে না ভাইয়া। আমি খেতেই পারবো না।”

মাহবুব ধমক দিয়ে বলে উঠলো,

“একদম চুপ। তোর থেকে অনুমতি চাইনি আমি। তোকে আমার সিদ্ধান্ত জানালাম।”

মাহবুব গাড়ি থেকে নামলে মিলিও নেমে পড়লো। মাহবুব ভ্রুঁ কুচকে বলল,

“তুই নামলি কেন?”

“ভাইয়া ওর ডায়াপার শেষ হয়ে গেছে। তুমি খাবার নিয়ে এসো ততক্ষণে আমি ওর ডায়াপার কিনে আনি।”

“তোকে যেতে হবে কেন? আমি নিয়ে আসছি।”

“না থাক দেরি হয়ে যাবে।”

মাহবুব আর কথা বাড়ালো না। পাশেই একটা সুপার শপ দেখে মিলি সেখানেই গেল কিনতে।

অয়ন তখন মিলির কোলে ঘুমোচ্ছে। মিলি ক্যাশ কাউন্টারে গিয়ে দেখলো কেউ নেই। আশেপাশে নজর বুলিয়ে একজন স্টাফ কে ডাকলো। যিনি ক্যাশ কাউন্টারে থাকেন ছেলেটা গিয়ে তাকে ডেকে আনলো। মিলি তখন ব্যাগ থেকে টাকা বের করার জন্য একপ্রকার যুদ্ধ করছে। অয়ন ঘুমিয়ে থাকার জন্য সমস্যা হচ্ছে। বেশি নাড়াচাড়া করলে যদি আবার ছেলের ঘুম ভেঙে যায় সেই জন্য খুবই সাবধানে টাকা বের করছে। কাউন্টারে থাকা লোকটা নিজের আসনে বসে মিলির কত বিল হয়েছে সেটা জানানোর জন্য মিলির দিকে তাকাতেই থমকালো। তন্ময় বুঝতে পারছে না ঠিক দেখছে নাকি ভুল দেখছে। আজ সকালেই মিলির সাথে দেখা হয়েছিল বলে কি এমন হচ্ছে? হ্যালুসিনেশন হচ্ছে কি তন্ময়ের আবারো? ভুল না দেখলে মিলি এখন এখানে কি করে আসবে?

মিলি ততক্ষণে ব্যাগ থেকে টাকা বের করতে সক্ষম হয়েছে। দাম শোনার জন্য চোখ তুলে তাকাতেই মিলি নিজেও চমকে গেল। ভাগ্য আবারো মিলি কে তন্ময়ের সামনে দাঁড় করালো। একদিনে দুবার কেন দেখা হতে হলো? এত বড় শহরের এত মানুষজনের মাঝে কেন তন্ময়ের সাথেই বারবার দেখা হয়ে যাচ্ছে মিলির?

মনে মনে মিলি নিজেকে শান্ত করলো। নিজের অস্থিরতা গুলো ঢেকে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

“প্রাইস কত?”

তন্ময় কোনো উত্তর দিতে পারলো না। চোখ পড়লো মিলির কোলে থাকা ঘুমন্ত অয়নের দিকে। কাঁপা কাঁপা হাতে আঙুলের ইশারায় অয়ন কে দেখিয়ে বলল,

“ও আমার ছেলে?”

মিলির ভেতরটা রাগে ফুঁসে উঠলো। এখন কেন নিজের ছেলে বলছে ওকে? সকালেও তে সাহস করে বলতে পারলো না। তবে এখন কেন নিজের ছেলে হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে?

“ভুল বললেন। ও আমার ছেলে, শুধুমাত্র আমার। বিল কত সেটা বলুন।”

তন্ময় মূর্তির মতো দামটা বলল। মিলি টাকাটা দিয়ে বেরিয়ে এলো। তন্ময় কিছুক্ষণ মূর্তির মতন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার পর যখন বুঝতে পারলো মিলি চলে গেছে তখন দৌড়ে বাইরে চলে গেল। পিছন থেকে অন্যান্য স্টাফ ওকে ডাকলো তবে সেই ডাক তন্ময়ের কানে গেল না।

তন্ময় বাইরে বেড়িয়ে মিলি কে দেখতে পেল। রাস্তা পার হওয়ার জন্য বোধহয় দাঁড়িয়ে আছে।

তন্ময় ছুটে মিলির কাছে গিয়ে ওর হাত টেনে ধরলো। মিলি বোধহয় কিছু ভাবছিল তাই চমকে উঠলো। তন্ময় কে দেখতেই চোখ-মুখ রাগে লাল হয়ে উঠলো।

তবে মিলি আগেই কিছু বলার সুযোগ পেল না। তন্ময় হাঁপাচ্ছে, সেই সাথে বোধহয় কাঁদতেও চাইছে। ছাড়া ছাড়া গলায় বলল,

“মিলি ও আমার ছেলে, তাই না?”

মিলি এবারেও কাটকাট গলায় বলল,

“বললাম না ও শুধুমাত্র আমার ছেলে।”

“না মিলি, ও আমাদের ছেলে। তুমি মানো আর না মানো ও আমাদের ছেলে।”

“অস্বীকার আপনি করেছিলেন, আমি না। আজ সকালেও আপনি অস্বীকার করেছেন, ওকে আমার ছেলে বলে সম্মোধন করেছেন। তবে এখন কোন সাহসে ওকে নিজের ছেলে বলছেন?”

তন্ময় নিজের হয়ে কোনো সাফাই দিতে পারলো না। ভেতরের অস্থিরতা আর অপরাধবোধ এর বোঝা সইতে না পেরে কেঁদে উঠলো। অনুনয়ের কন্ঠে মিলি কে বলল,

“ওকে একবার, শুধু একবার আমায় কোলে নিতে দাও মিলি। ওকে একবারের জন্য ঘুম থেকে তুলে একটু ওর বাবার মুখটা দেখাও।”

“সকালেই বলেছিলাম আমার পথে আসবেন না। কথাটা বোধহয় মনে নেই আপনার। বিরক্ত করা ছেড়ে দিন আমায়।”

মিলি ঘুরে চলে যেতে নিলে তন্ময় মিলির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। হাত জোর করে অনুরোধ করে বলল,

“একবার ওকে কোলে নিতে দাও মিলি প্লিজ! শুধু একবার ওকে ছুঁয়ে দেখবো। এতটা কঠিন হয়ো না তুমি মিলি। আমি সহ্য করতে পারছি না তোমার এত কঠোরতা।”

মিলির মন নরম হলো না। শান্ত গম্ভীর গলায় বলল,

“সামনে থেকে সরে যান।”

তন্ময়ের আকুতি আরো বাড়লো। রাস্তার মাঝে যে ওরা দাঁড়িয়ে আছে সেদিকেও খেয়াল নেই। মিলির এক হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ওখানেই হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে ক্রন্দনরত গলায় বলল,

“একবার ওকে আমার মুখটা দেখতে দাও মিলি। তোমাকে পাওয়ার আশা আমি ছেড়ে দিয়েছি। এখন শুধু একবার ওকে কোলে নিয়ে একটু আদর করতে চাই। ওকে একটু বোঝাতে চাই ওর বাবা অতটাও খারাপ না।”

তন্ময়ের আড়ালেই মিলি নিজের চোখের জল মুছে নিল। অনেকে ওদের কে দেখছে যা মিলি কে অস্বস্তি তে ফেলল।

একজন লোক এগিয়ে এসে মিলি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কি হয়েছে আপু কোন সমস্যা? বিরক্ত করছে নাকি?”

মিলি কিছু বলার আগেই তন্ময় গর্জে উঠে বলল,

“বিরক্ত করতে যাবো কেন? ওরা আমার বউ আর বাচ্চা বুঝতে পেরেছেন? আমার বউ-বাচ্চা। আপনাকে কেউ নাক গলাতে বলেছে? যান তো?”

লোকটা বিড়বিড় করে কিসব বলতে বলতে চলে গেল সেখান থেকে। তন্ময় আরো অনেক ভাবে মিলি কে অনুরোধ করলো। তবে মিলির মন বোধহয় নরম হলো না। তন্ময়ের হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,

“অনেক দেরি করে ফেলেছো তুমি তন্ময়।”

“জানি মিলি। শুধু একবার ওকে কোলে নিতে দাও প্লিজ! আমি আমার অধিকারবোধ দেখাচ্ছি না আমি শুধু তোমায় অনুরোধ করছি। মিলি একটাবার ওকে ছুঁতে দাও। একটু আদর করবো ওকে যেন ও বড় হলে তুমি ওকে বলতে পারো যে ওর বাবা অল্প কিছু সময়ের জন্য হলেও ওকে ভালোবেসেছিলো।”

মিলি কি ভেবে যেন হঠাৎ করে মনস্থির করলো অয়ন কে দেবে তন্ময়ের কোলে। শাস্তি তো কম পাচ্ছে না তন্ময়। নিজের ছেলে কে কোলে নেওয়ার পরেও যখন আবার ফেরত দিয়ে দিতে হবে কষ্টটা বোধহয় তখন আরো বাড়বে।

মিলি ঘুমন্ত অয়ন কে তন্ময়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“নাও।”

তন্ময় কাঁপা কাঁপা হাতে অয়ন কে কোলে নিল। এতো নড়াচড়ার মাঝে অয়নের ঘুমটাও ভেঙে গেল। চোখ খুলেই অপরিচিত একটা মুখ দেখে শব্দ করে কেঁদে উঠলো। আজ প্রথম এই মুখটা দেখলো অয়ন। সেজন্যই বোধহয় কাঁদলো।

বিজ্ঞাপন

অয়ন কে কাঁদতে দেখে তন্ময় উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“মিলি ও কাঁদছে কেন? আমি কিছু করিনি।”

“ওর বাবা ওর কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। সেজন্য কাঁদছে। আমায় দাও।”

মিলি কোলে নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই অয়ন থেমে গেল। তন্ময় হাত বাড়িয়ে আবার কোলে নিতে চাইলো তবে অয়ন আপত্তি জানালো। তন্ময় একটু জোর করেই নিতে চাইলে আবারো কেঁদে উঠলো। তন্ময় আর চেষ্টা করলো না কোলে নেওয়ার। শুধু অয়নের গালে আলতো করে একটা চুমু খেল। ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

“দোয়া করি মিলি যেন ও খুব ভালো একজন মানুষ হতে পারে। আমি তোমায় যতটা কষ্ট দিয়েছি ও যেন তার থেকেও অনেক বেশি ভালো রাখে তোমায়।”

মিলি একহাতে চোখের জলটুকু মুছে নিয়ে বলল,

“নিশ্চয়ই রাখবে। ওকে আমি আমার মনের মতন করে বড় করবো যেন ও কোনো মেয়ের চোখের জলের কারণ না হয় ওর বাবার মতন।”

তন্ময় নির্জীব হেসে বলল,

“ওকে জানিয়ো যে ওর বাবা এখন ওকে অনেক ভালোবাসে। সারাজীবন ওর জন্য দোয়া করবে। আর পারলে আমায় ক্ষমা করে দিতে বলো।”

মিলি আর কোনো উত্তর দিলো না, রাস্তা পার হয়ে চলে গেল। মাহবুব গাড়ির কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। তন্ময় কে দেখেই আর যায়নি। তন্ময়ের চোখের সামনে দিয়ে গাড়িটা চলে গেল। অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতে থাকতেই হঠাৎ তন্ময় ডুকরে কেঁদে উঠলো। আজ বুঝতে পারলো তন্ময় যে ওর জীবনের সুখ আসলে কোথায় ছিল, কাদের মাঝে ছিল। তবে আফসোস ঠিক সময়ে উপলব্ধি করতে পারেনি।

_________

যে যা পায় না সেই বোধ হয় সেই জিনিসটার মূল্য সব থেকে ভালো করে বুঝতে পারে। আর যে খুব সহজে পেয়ে যায় সে তার মূল্য কখনো ঠিক ভাবে দিতে পারে না। কেউ যে জিনিসটাকে খুব করে অবহেলা করছে কেউ হয়তো বা দিন রাত সেটাকে নিজের মোনাজাতে চাইছে। অথচ সে পায় না।

এই দুইদিনে অয়নের উপর যেন আলাদা একটা টান তৈরি হয়ে গেছে নীলিমা আর সিয়ামের। বাচ্চাটার সাথে অনেকটা সময় কাটিয়েছে দুজন। এমন একটা ছোট্ট বাচ্চার স্বপ্ন ওরা দুজনও দেখেছে। তবে আল্লাহ ওদেরকে সেই খুব সৌভাগ্য দেয়নি। ওরা চেয়েও পায়নি জন্যই হয়তো একটা বাচ্চার গুরুত্ব খুব ভালো করে বোঝে আর তন্ময় খুব সহজে পেয়ে গিয়েছিল সেজন্যই তো অবহেলা করেছিল।

মিলি কে বাসস্ট্যান্ডে রাখতে এসেছে সিয়াম, নীলিমা আর মাহবুব। নীলিমা একটাবারের জন্য অয়নকে মিলির কোলে দিচ্ছে না। ছেলেটা এত ভালো, কারো কাছে একটু ভালোবাসা পেলে সেখানেই চুপচাপ থেকে যায়।

নীলিমা অসহায় কন্ঠে মিলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এই মিলি ওকে আমায় দিয়ে যাবি? তোর কাছে তো অনেকদিন থেকেছে আমার কাছে কয়েকটা দিন থাকুক?”

“এখন তো দেখছি আমার থেকে আমার ছেলের আদরই বেশি। এখানে তোরা ওকে চাইছিস আর আজ আমি যদি ওকে না নিয়ে সিলেট ফিরি তবে একজন আমাকে বাস থেকে নামতেই দেবে না।”

নীলিমা প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কে?”

মিলি কোন উত্তর দেওয়ার আগে পাশ থেকে মাহবুব বলে উঠল,

“তাকদীর।”

নীলিমা তাকদীরের নাম শুনেছে তবে খুব বেশি কিছু জানে না। কেননা মিলি কখনোই তাকদীরের ব্যাপারে কিছু বলে না তেমন।

মিলি হেসে মাহবুবের কথায় সম্মতি জানিয়ে বলল,

“একদম ঠিক বলেছ ভাইয়া। আসার সময় বলছিল আমি যেন অয়ন কে ওর কাছে দিয়ে আসি।”

“ওকে সাথে নিয়ে এলেই পারতি, ঘুরে যেত?”

“আরে না। কি করে ওকে সাথে নিয়ে আসবো? ওর বিয়ে ঠিক হয়েছে। ওর হবু শ্বশুর বাড়ি থেকে ওর হবু শ্বশুর আসবে। ওকে নিয়ে এলে হয় নাকি?”

মাহবুব অবাক হলো। মিলির কথাটা ঠিক বুঝতে পারলো না। তাকদীরের বিয়ে ঠিক হয়েছে মানে কি? আবার হবু শ্বশুর বাড়ি, হবু শ্বশুর এসবের মানে কি?

“তাকদীরের বিয়ে ঠিক হয়েছে কবে?”

“কবে মানে অনেকদিন হচ্ছে। আমার তো মনে হয় অনেক ছোটবেলা থেকে ওর বিয়ে ঠিক করা ওর মামাতো বোনের সাথে। মেয়েটা ভীষণ মিষ্টি।”

“তুই নিশ্চিত যে অনেকদিন আগে থেকে ওদের বিয়ে ঠিক আছে? আর তাকদীর সেটা জানে?”

“হ্যাঁ। কেন কি হয়েছে?”

মাহবুব আর কিছু বলল না। মনে মনে তাকদীরের ওপর ভীষণ রাগ হলো। যদি ছেলেটার আগে থেকেই বিয়ে ঠিক করা থাকে তবে মিলিকে ভালোবাসে কেন বলল? আর যদি সত্যিই মিলিকে ভালোবেসে থাকে তবে অন্যজনকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাখার মানেটা কি?

মাহবুবকে চুপ করে যেতে দেখে মিলি বলে উঠলো,

“কি হলো ভাইয়া?”

“কিছু না। ছেলেটাকে অন্যরকম ভেবেছিলাম, তবে এর ও মনে হয় মিথ্যে বলার অভ্যাস আছে।”

“একদমই না। ও যা বলবে সব সত্যি বলবে, তাতে যাই হয়ে যাক না কেন। খুব কঠিন কিছু সত্যও অকপটে বলে দেয়।”

“কিন্তু….”

মিলি বোধহয় বুঝলো মাহবুবের কিন্তুর কারণটা। তাই নিজ থেকেই বলল,

“ওই গা’ধা ছেলে বিয়েতে রাজি না। আমি কত করে বোঝাই যে মেয়েটা অনেক ভালো, ওকে বিয়ে করলে ভালো থাকবে কিন্তু শুনতে চায় না। বারবার শুধু বলে তোহার জীবনে ওকে দরকার নেই। যার জীবনে ওর দরকার ও তার জীবনে যেতে চায়।”

মাহবুবের এবারে রাগ কমলো। এবারে নিশ্চিত হলো যে ছেলেটা মিথ্যে বলেনি।

বাস ছাড়ার সময় হয়ে গেল। সেই সাথে নীলিমার মন খারাপও বাড়লো। বিয়ের অনেকগুলো বছর হয়ে গেল তবুও এখন পর্যন্ত মা ডাক শোনার সৌভাগ্য হয়নি। ছোট বাচ্চা দেখলে আজকাল খুব বেশি আদর করতে ইচ্ছে করে। মনের মাঝে থাকা আফসোস গুলো আরো বেড়ে যায়। আফসোস তো সিয়ামেরও হয় তবে নীলিমার সামনে সেগুলো প্রকাশ করে না। বরং এমন একটা ভাব দেখায় যে বাচ্চা না থাকলেও ওর কিছু যায় আসে না। নীলিমা পাশে থাকলেই হবে। সিয়ামের জীবনে যে নীলিমা আছে এটুকুই সিয়ামের জন্য যথেষ্ট।

মিলি অয়নকে কোলে নেওয়ার জন্য তাড়া দিলে নীলিমা অয়ন কে আরেকবার জড়িয়ে ধরে মিলি কে বলল,

“আর একটু সময় কোলে নিয়ে থাকি!”

মিলিও বাধা দিলোনা। নীলিমার এই হাহাকারের কারণ ওরা অজানা নয়। মাহবুব এবারে মিলিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করালো। মিলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

“আজ কিন্তু অনেক বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিস তুই। খুব কঠিন একটা কাজ করেছিস। যা ফেলে রেখে যাচ্ছিস তা নিয়ে আর ভাববি না। বেশি চিন্তা করবি না। আর কোন সমস্যা হলে আমাকে বলবি। তোর ভাইয়া এখনো বেঁচে আছে। আমি যতদিন বেঁচে আছি আমার বোনের যা যা সাহায্য দরকার হয় সব করব। তোর ইচ্ছেই আমার কাছে সব।”

মিলি আলতো হেসে বলল,

“আমি ঠিক আছে ভাইয়া। তুমি আমায় নিয়ে এত অতিরিক্ত ভেবো না।”

“আর একটা কথা শোন, পুরনো সব সম্পর্ক আজ থেকে একেবারে শেষ হয়ে গেল। তাই সেই সম্পর্ক থেকে বের হওয়ার চেষ্টা কর। আর যদি সম্ভব হয় জীবনকে নতুন করে একটা…।”

মাহবুবকে নিজের কথা আর সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে মিলি ব্যস্ত গলায় বলল,

“ভাইয়া আসি এখন। কলেজ থেকে আর ছুটি পাবো না বাস ছেড়ে চলে গেলে সমস্যা হয়ে যাবে। ভালো থেকো তোমরা সবাই। আর আমাকে নিয়ে বেশি ভেবো না। আমি ওখানে খুব ভালো আছি একা একা। আর সারা জীবন একা একাই ভালো থাকতে পারবো।”

মাহবুব চেয়েও যেন আর কিছু বলতে পারল না। মিলির ইঙ্গিতটা কেউ না বুঝলেও মাহবুব বুঝলো। আর মাহবুব তো কখনোই জোর করতে চায় না মিলিকে। সবার থেকে বিদায় নিয়ে অয়ন কে কোলে নিয়ে বাসে উঠে পড়ল। আরো একবার চেনা শহরের চেনা মানুষগুলোকে পিছনে ফেলে মিলি চলে গেল।

বাসটা ছেড়ে দিতেই মিলি জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে সবাই কে বিদায় জানালো। ওরা চোখের আড়াল হতেই মিলি সিটে হেলান দিয়ে বসলো।

অয়ন কে খুব শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরলো। চোখ দিয়ে বিরতিহীন ভাবে পানি পড়তে লাগলো। এই শহরে আর কোনোদিন ফিরতে চায় না মিলি। প্রত্যেকবার শুধু কষ্ট নিয়েই চলে যেতে হয় মিলি কে এখান থেকে। সবার সামনে নিজেকে শক্ত দেখাতে দেখাতে মিলি যেন ক্লান্ত হয়ে গেছে এখন। অথচ কষ্টে যে ভেতরে তুমুল ঝড় বইছে সেসব কেউ জানে না। আজ তন্ময় আফসোস করছে, অনুরোধ করছে ফিরে আসার জন্য। অথচ একটা সময় এই তন্ময়ই বারবার মিলি কে বলেছে ওর জীবন থেকে চলে যাওয়ার জন্য।

মিলি চেয়েও তন্ময় কে ক্ষমা করে আরেকটা সুযোগ দিতে পারলো না। মনটা যে ভেঙে গেছে, বিশ্বাস ভরসা সব ভেঙে গেছে। ভাঙা মনটা জোড়া নাহয় লাগালো তবে ভাঙনের চিহ্নটা যে আজীবন থেকে যাবে। সেই জোড়া লাগানো হৃদয় আর বিশ্বাস যদি তন্ময় আবার ভেঙে দেয় তবে যে এবারে আর মিলি বাঁচতে পারতো না। কিন্তু মিলি কে তো বাঁচতে হবে। বুকের সাথে যে ছোট্ট শরীরটাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে ওর জন্য বাঁচতে হবে। ওকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বাঁচতে হবে।

বিজ্ঞাপন
রিক্ত বসন্ত গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস