অয়নকে নিয়ে তাকদীর নিজের ফ্ল্যাটে এলো তাহরিমা বেগমের সাথে দেখা করার জন্য। এই দুটো দিন তাহরিমা বেগম নিজেও ওদের কমতি ভীষণভাবে অনুভব করেছেন। এই কয় মাসে ছেলেটার সাথে সময় কাটাতে কাটাতে অভ্যাস হয়ে গেছে কেমন একটা। অবসরের বেশিরভাগ সময়টুকু তিনি অয়নের সাথেই কাটাতে পছন্দ করেন। তার মধ্যে মিলি আবার নতুন নতুন অনেক কিছু বুঝতে পারে না, সেজন্য শুরু থেকে সবকিছু শিখিয়ে দিতে দিতে একটা অন্য রকমের সম্পর্কই তৈরি হয়ে গেছে। তবে মিলি ভেতরে এলো না। তাকদীরের থেকে শুনলো যে ওর বড় মামা এখনো আছে সেজন্য আর ভিতরে গেল না। ভাবলো পরে গিয়ে তাহরিমা বেগমের সাথে দেখা করে আসবে।
ভিতরে ঢুকে ড্রয়িং রুমের সোফার উপর তাকদীর ওর বড় মামা আজাদ আহমেদকে দেখতে পেল। তাকদীরের কোলে একটা বাচ্চাকে দেখে আজাদ আহমেদ ভ্রুঁ কোঁচকালেন। তাকদীর ওনাকে কিছু না বলেই সোজা তাহরিমা বেগমের ঘরের উদ্দেশ্যে পা বাড়লো। তবে পিছন থেকে আজাদ আহমেদ ডেকে ওঠায় ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও তাকে থামতে হলো। কেননা তার ডাক উপেক্ষা করার ক্ষমতা তাকদীরের নেই, নাহলে যে তার মা কষ্ট পাবে। পিছন ফিরে তাকিয়ে বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,
"কিছু বলবেন মামা?"
"এই বাচ্চাটা কে?"
"আপনাকে বলেছিলাম না মিলির কথা, ও অয়ন, মিলির ছেলে।"
"ওহ্! উনি এসেছেন?"
"হ্যাঁ, এখনই এলো।"
"তুমি কোথায় ছিলে এতোক্ষণ? সকাল উঠে থেকে তোমায় দেখছিলাম না।"
"আমি তো আনতে গিয়েছিলাম বাসস্ট্যান্ড থেকে ওদেরকে। আচ্ছা ওকে একটু আম্মুর সাথে দেখা করিয়ে আনি আমি কেমন? আপনি বসুন।"
কথাটা বলে তাকদীর চলে গেল। আজাদ আহমেদ আবারও ভাবনার মাঝে পড়ে গেলেন। এই জন্যই তবে তাকদীরের এত তাড়াহুড়ো ছিল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। কি করবেন, তার কি করা উচিত সেই নিয়ে তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন।
________
"আপু!"
পরিচিত কণ্ঠস্বরের একটা ডাক শুনতে মিলি ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো। তোহাকে দেখতেই মুখে হাসি ফুটে উঠলো। এগিয়ে গিয়ে আন্তরিক গলায় বলল,
"কেমন আছো তোহা?"
তোহা পাল্টা হেসে বলল,
"ভালো আছি। তুমি ভালো আছো?"
"হ্যাঁ, আমিও ভালো আছি। তুমিও যে এসেছো সেটা তো আমি জানি না, জানলে দেখা করে আসতাম।"
"তাকদীর ভাই মনে হয় তোমায় বলেনি, তাই না?"
"না, আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম ও শুধু বড় মামার কথা বলল, মানে তোমার বাবার কথা বলল।"
"ও আচ্ছা, হয়তো ভুলে গিয়েছিল আমার কথা। কিন্তু তোমার কথা বলতে ভোলেনি। ফ্ল্যাটে গিয়ে খুব আনন্দের সাথে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলেছিল যে তুমি এসে গিয়েছো। তোমার ছেলে অয়ন কেও দেখলাম। খুব মিষ্টি হয়েছে দেখতে, একদম তোমার মতন।"
মিলি জোর করে হাসলো। তাকদীর ফ্ল্যাটে গিয়ে মিলির কথা আনন্দের সাথে চেঁচিয়ে বলেছে এই কথাটা যে তোহা মনের আনন্দ থেকে বলল না সেটা তো আন্দাজ করতেই পারল মিলি। তবে তেমন কিছু বুঝতে দিলো না। মেয়েটা যে খোঁচা দিয়ে কথাটা বলেনি সেটা ওর কথার ধরন দেখেই বোঝা গেছে। বরং কথাটা বলপছে নিজের মনের কষ্ট আর আফসোস থেকে। তাইতো তার কথায় মিলি কিছু মনে করলো না।
"তুমি দাঁড়িয়ে আছে কেন? তুমি বসো। আমি একটু চা করে আনি। বাড়িতে তো নাস্তা কিছুই নেই, আমি ছিলাম না তো তাই। আপাতত একটু চায় খাও কেমন?"
মিলি যেতে ধরলে তোহা তাকে বাঁধা দিয়ে বলল,
"না আপু যেতে হবে না তোমায়। সকালে খেয়েছি চা। এখন আর কিছু খাবোনা, এতো ব্যস্ত হয়ো না।"
"আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি বসো, আমি শুধু একটু কাপড়টা বদলে আসছি। দু মিনিট সময় লাগবে। এসে তোমার সাথে গল্প করবো কেমন?"
মিলি জামাকাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে যেতে ধরলে তোহা হাত টেনে ধরল। মিলি একটু থমকালো। কিছু যেন বলতে চাইছে তবে সংকোচ বোধ করছে।
"কিছু বলবে তোহা?"
তোহা আমতা আমতা করে বলল,
"আপু তোমার সাথে আমার একটা কথা ছিল।"
মিলি অভয় দিয়ে বলল,
"হ্যাঁ বলো কি বলবে।"
"এখন না, তুমি সবে মাত্র এলে আগে ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নাও পরে তোমার সাথে কথা বলবো। আমি এখনো আছি কয়েকদিন এখানে।"
"যা বলতে চাইছো নির্ভয়ে বলতে পারো। কোন সমস্যা নেই। আপু বলে যখন ডাকো তবে বলতে এত সংকোচ করছ কেন? আমি কি তোমায় বকবো নাকি? আমি অত রাগী মানুষ না।"
তোহা আলতো হেসে বলল,
"জানি আপু তুমি অত রাগী মানুষ না, তুমি মানুষটা বড্ড ভালো। তোমার মনটা খুব ভালো সে জন্যই তোমায় কিছু বলতে চাই, তবে এখন না।"
"আচ্ছা ঠিক আছে যখন তোমার ভালো মনে হবে, যখন মনে হবে তুমি বলতে চাও তখনই বলো, আমি তোমায় জোর করব না।"
মিলি কথাটা বলে চলে যেতে নিয়ে আবারও থামল। এবারে তোহা কিছু বলে নি। মিলি নিজেই থেমে গেল। আবারো নিজের পূর্বের জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে তোহার গালে হাত রেখে আদুরে গলায় ভরসা দিয়ে বলল,
“আমি জানি তোহা কারো জীবন থেকে সুখ কেড়ে নিলে সেই মানুষটার বাঁচতে কতটা কষ্ট হয়। আমি জানি একজনের জীবনের সব সুখ কোন একটা নির্দিষ্ট মানুষের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে। তাই চিন্তা করে না, তোমার জীবনের সুখ আমি কেড়ে নেব না।”
তোহা চমকে তাকালো মিলির দিকে। মুহূর্তে চোখ দুটো কেমন ছলছল করে উঠলো। অস্বস্তির জন্য নাকি অপরাধবোধের জন্য সেটা তোহা জানেনা তবে চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো। খুব অল্প কিছু মুহূর্তের মাঝে চোখ বেশ কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। মিলি সযত্নে সেটুকু মুছে দিয়ে বলল,
"তোমার মতন আমিও স্বপ্ন দেখেছিলাম, আর আমার সেই স্বপ্ন ভেঙ্গেছে। তাই আমি জানি সেই যন্ত্রণা। তবে তোমার স্বপ্ন আমি ভাঙতে দেব না। অন্তত আমার কারণে সেটা কখনোই ভাঙবে না। তোমার মতন একটা স্বাভাবিক জীবন এক সময় আমিও কাটিয়েছি। হঠাৎ করে যদি সে জীবনে একটা ঝড় আসে তবে ঠিক কতটা মানসিক চাপ সৃষ্টি হয় সেসব আমি জানি তোহা। তাই চিন্তা করো না, তোমার জীবনের কোন মানসিক চাপের কারণ আমি হবো না। তোমার জীবনে তৈরি হওয়া কোন ঝড়ের কারণ আমি হবো না। বরং যদি পারি তবে গুছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব। কেউ আমার ঘর ভেঙেছে, কেউ আমার স্বপ্ন ভেঙেছে, তবে আমি কারো ঘর কিংবা স্বপ্ন কোনটাই ভাঙবো না।"
_________
আজ অনেকগুলো দিন পর আবার ফরহাদদের সাথে দেখা হলো মিলির। আজও মিতু নিজ থেকে এগিয়ে এসে আন্তরিকতার সাথে মিলিকে জড়িয়ে ধরল। সে প্রথম দিনের মতই মনে হলো মিলিকে জড়িয়ে ধরে কত শান্তি পেল। কোনো পুরনো বন্ধু কিংবা খুব কাছের কোনো আত্মীয় যাকে অনেক দিন পরে দেখে বেশ শান্তি অনুভব করল মিতু। তবে আজ মিলি প্রথম দিনের মতন থ হয়ে থাকলো না বরং নিজেও পাল্টা মিতুকে জড়িয়ে ধরল।
মিঠু কে ছেড়ে দিয়ে মিলি তাড়াহুড়োর কন্ঠে বলল,
"আগে আমাকে মিহাদের কাছে নিয়ে চলো, ওকে দেখব আমি।"
মিতু আলতো হেসে বলল,
"উপরে ও ঘুমোচ্ছে। চলো, উপরে চলো।"
অয়ন তখন ফরহাদের কোলে। মিলি আর মিতুর পিছন পিছন ফরহাদও অয়নকে কোলে নিয়ে উপরে এলো। বিছানার উপর ঘুমন্ত একটা ছোট্ট দেহ পড়ে আছে। মিহাদের মুখটা দেখতেই মিলির চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো। তবে আজ কোন কষ্ট হলো না, বরং আনন্দ হলো। ছেলেটা ধীরে ধীরে রিকভার করছে, ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে। মিলির দোয়া হয়তো কাজে লেগে গেছে।
মিহাদ ঘুমন্ত তাই মিলিও আর ওকে কোলে নেওয়ার চেষ্টা করলো না। পাশে গিয়ে বসে আলতো করে শুধু কপালে একটা চুমু খেয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
অশ্রুসিক্ত নয়নে একবার তাকালো মিতু আর ফরহাদের দিকে। দুটো মানুষের চোখ মুখ শুকিয়ে গেছে। তবে মিলির তাও ভালো লাগলো। জীবনের যত প্রতিকূলতা আসুক দুজনে একসঙ্গে সবকিছু লড়াই করছে। ফরহাদ কখনো মিতুর হাত ছেড়ে দেয় না আর না কখনো মিতু ফরহাদের হাত ছেড়ে দেবে।
“তোমাদের দুজনের ভাগ্যে ভীষণ ভালো জানো তো। জীবনের এত কঠিন একটা সময় তোমরা দুজন দুজনকে পাশে পেয়েছো, একজনের কখনো কষ্ট হলে আর একজনের কাঁধে মাথা রাখতে পেরেছো, বুকে জড়িয়ে নিতে পেরেছো অন্যজনকে, এর থেকে বড় সৌভাগ্য আর হতে পারে না।”
মিতু হাসলো। ও নিজেও জানে সত্যিই ও বড় সৌভাগ্যবতী যে ফরহাদের মতন একজন জীবন সঙ্গী পেয়েছে। টুকটাক কিছু কথার মাঝে ফরহাদের একটা কল এলে অয়নকে মিলির কোলে দিয়ে ফরহাদ নিচে চলে গেল। মিতু মিলির পাশে এসে বসলো। মিলির হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে একটু ইতস্তত গলায় বলল,
"তোমায় একটা কথা বলি মিলি কিছু মনে করো না কেমন? আর যদি খারাপ লাগে তাহলে আমায় তখনই বলো, আমি ক্ষমা চেয়ে নেব তোমার কাছে।"
"তোমার মতন মানুষ কখনো কাউকে এমন কিছু বলতে পারে না যাতে তার খারাপ লাগে। বলো না কি বলবে।"
মিলি আশ্বস্ত করলো ঠিকই তবে মিতুর তাও একটু অস্বস্তি হলো। তবে অনেকদিন থেকেই মিলিকে এই কথাটা বলবে বলে ভাবছিলো। মাঝে তো অনেকগুলো মাস দেখা, সাক্ষাৎ, কথা কিছুই হয়নি তাই আজ ভাবছে বলেই ফেলবে। কৃতজ্ঞতার কন্ঠে বলল,
"তোমায় অনেক অনেক ধন্যবাদ।"
মিলি ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
"হঠাৎ ধন্যবাদ কেন? আমিতো ধন্যবাদ পাওয়ার মতন কিছু করেছি বলে মনে পড়ছে না।"
"অনেক কিছু করেছো তুমি ধন্যবাদ পাওয়ার মতো। তুমি আমার জীবনের সব থেকে বড় উপহারটা দিয়েছো। আল্লাহ তো চেয়েছিলেন অবশ্যই তবে মাধ্যমটা তুমিই ছিলো আমার জীবনের সবথেকে শ্রেষ্ঠ উপহারটা পাওয়ার।"
মিলি বুঝলো না মিতুর কথার মানে। প্রশ্নাত্মক গলায় আবারও জিজ্ঞেস করলো,
"বুঝতে পারছি না কি উপহারের কথা বলছো।"
"আমার স্বামী, আমার ছেলের বাবা ফরহাদের কথা বলছি। যদি তুমি ওকে ফিরিয়ে না দিতে তবে ও আমার হতো না, ও আমার কাছে আসতোই না।"
মিলি একটু হেসে বলল,
"ফরহাদ যখন তোমার ভাগ্যে লেখা ছিল তখন আমি কেড়ে নিতাম কি করে?"
"সেসব তো অন্য কথা। তবে তুমি ফিরিয়ে দিয়েছিলে বলেই কিন্তু ও আমার কাছে এসেছিল। নাহলে তো ও তোমাকে প্রথম দেখাতেই পছন্দ করে ফেলেছিল। বিয়ের আগেই আমাকে এই কথা বলেছিলো। ও চায়নি কোন কিছু আড়াল করে রাখতে। তুমিই প্রথমে যাকে ওর পছন্দ হয়েছিল, তবে হ্যাঁ এটা ঠিক এখন ও শুধুই আমাকে ভালোবাসে। তুমি যেন ভেবোনা আমি তোমার কাছে অভিযোগ করছি কিংবা আফসোস থেকে এই কথাগুলো বলছি, আমি শুধু তোমায় ধন্যবাদ জানানোর জন্য বলছি।"
মিলি একটু সংশয় নিয়ে বলল,
"সত্যিই কি ধন্যবাদটা আমার প্রাপ্য?"
"হ্যাঁ, তোমার প্রাপ্য। তুমি জানো না তুমি নিজের অজান্তেই আমাকে কি উপহার কি দিয়েছো। ওই যে বললাম না তুমি ফিরিয়ে দিয়েছিল জন্যই ফরহাদ আমার কাছে এসেছিল। তুমি ওকে আপন করে নাওনি জন্য আমি ওকে আপন করে পেয়েছি। আর এমন একজন মানুষকে পেয়েছি যাকে নিয়ে আজ অব্দি কোন অভিযোগ করার সুযোগ আমি পাইনি।"
মিলির অস্বস্তি হলো কিনা জানে না তবে একটা বিষয় ভীষণ ভাবালো মিলিকে। সত্যিই এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে ফরহাদ একজন ভালো স্বামী, একজন ভালো বাবা, সেই সাথে খুব ভালো একজন মানুষ। তবে এটা ঠিক যে ফরহাদকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য মিলির কখনোই আফসোস হয়নি কেননা যে তন্ময়কে মিলি গ্রহণ করেছিল, স্বামী হিসেবে যে তন্ময়কে সে ভালোবেসেছিল সেই তন্ময়কে নিয়ে কোন অভিযোগ করার অবকাশ মিলি কখনো পায়নি। পরের বদলে যাওয়া তন্ময়ের সাথে মিলি আগের তন্ময় কে মেলাতে চায় না। কেননা আগের তন্ময়কে নিয়ে যেমন কোন অভিযোগ নেই তেমনি এই তন্ময়কে নিয়ে মিলির অভিযোগের শেষ নেই।
________
"তোমার ছেলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তবে কি তাহরিমা?"
এই প্রশ্নটার ভয়ই তাহরিমা বেগম পাচ্ছিলো আর ঠিক সেই প্রশ্নটাই করে বসলেন তার ভাই আজাদ আহমেদ। জীবনে কখনো কারো প্রশ্নের উত্তর দিতে তাকে এতটা ভাবতে হয়নি, তাকে এতটা বিচলিত হতে দেখা যায়নি, কখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়তে হয় নি। তবে আজ তার ভাইয়ের প্রশ্নে তিনি ভীষণ বিপদে পড়ে গেলেন যেন।
তাহরিমা বেগমকে চুপ করে থাকতে দেখে আজাদ আহমেদ আবারো প্রশ্ন করে উঠলেন,
"উত্তর পেলাম না তোমার।"
চুপ করে থাকা কোন সমাধান হতে পারেনা বরং নিজের দুর্বলতা আর অপারগতার পরিচয় দেয় চুপ করে থাকা। যেটা তাহারিমা বেগম একদমই পছন্দ করে না। তাই তিনি নিজেও আর চুপ থাকতে পারলেন না। সহজ সাবলীলভাবে উত্তরে বললেন,
"দেখুন ভাইজান, আমি আপনাকে একদম শুরু থেকেই বলেছি আমি আমার ছেলের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোন কিছু করতে পারবো না এই বিষয়টায়। সবকিছুতে কি আর জোর করা যায় বলুন?"
"তার মানে এই বিষয়ে তোমার কোন মন্তব্য নেই?"
"আমি আপনাকে বলেছি ভাইজান আমার ছেলে যা চাইবে সেটাই আমি চাইবো। আমার ছেলের খুশিতে আমি খুশি। যে ছেলে আমার কোন কথার অমান্য করে না, আমার জন্য নিজের সুখ-শান্তি সব ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকে তার ঘাড়ে আমি এত বড় একটা বিয়ের বোঝার চাপিয়ে দিতে পারি না। এটা তো আর দু-একদিনের বিষয় না, সারা জীবনের বিষয়।"
"আমার মেয়েটার তবে কি হবে? তুমি জানো আমার মেয়েটা তাকদীর কে পছন্দ করে। ছোটবেলা থেকে শুনে আসছে যে ওর তাকদীরের সাথে বিয়ে হবে। ওর মনে একটা আশা তৈরি হয়েছে এ নিয়ে। আর আমার সম্মানের কি হবে একবার ভেবে দেখেছো?
"ভাইজান ভুলটা কি আপনার নয়? আমি আপনাকে অনেক আগে থেকে বলেছি যে ছেলেমেয়েদেরকে আগে বড় হতে দিন, আগে ওদের নিজেদের পছন্দ-অপছন্দ হতে দিন তারপরে না হয় আমরা এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাববো। কিন্তু আপনি আমার একটা কথাও শোনেননি।"
"আমি কখনো ভাবি নি তাহরিমা যে তোমার কাছ থেকে আমাকে শূন্য হাতে ফিরে যেতে হবে। আমি আসলে বুঝতেই পারিনি আমার বোন এতটা বড় হয়ে গেছে যে আজকাল তার ভাইয়ের সম্মান, তার ভাইয়ের সিদ্ধান্ত কোন কিছুরই গুরুত্ব তার কাছে নেই।"
তাহরিমা বেগমের কন্ঠটা এবারে ভীষণ অসহায় শোনালো। তার ভাইয়ের ওপরে অনেক ঋণ জমা হয়ে আছে তার। কিন্তু তাই বলে নিজের ছেলের জীবন দিয়ে তা শোধ করতে পারেন না। তিনি না হয় নিজের ইচ্ছেগুলোকে বিসর্জন দিতে পারেন ভাইয়ের কথায়, নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও কোন কিছু মেনে নিতে পারেন ভাইয়ের কথায়। কিন্তু তাকদীরকে জোর করতে পারেন না যেখানে তিনি বুঝতে পারছেন তার ছেলেটা অন্য কারো প্রতি ভীষণভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। যেখানে ছেলের মন পড়ে আছে অন্য কারো কাছে, সেখানে কি করে বিয়ে করে সংসার করতে বলবে আরেকজনের সাথে?
অসহায় কন্ঠে বলল,
"আমার কাছে আপনার সম্মানের মূল্য আছে ভাইজান। তবে আমার কাছে যে আমার ছেলের ইচ্ছে, ওর ভালো থাকার মূল্য অনেক বেশি। আমি মা হয়ে কি করে আমার ছেলের ভালো থাকাটা কেড়ে নেই?"
আজাদ আহমেদ আবারো বললেন,
"তাহরিমা, আমি কখনো ভাবি নি তুমি আমায় শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেবে। আমার মা ম'রা মেয়েটা কে নিয়ে সবসময় চিন্তায় থাকি। মেয়েটা আমার বড্ড ভালো ভালা, সহজ সরল। এই যুগের সাথে আমার মেয়েটা তাল মিলিয়ে চলতে পারে না। ভেবেছিলাম তোমার ঘরে দিয়ে শান্তিতে থাকবে, তাকদীরের হাতে দায়িত্ব দিয়ে আমি শান্তি থাকবো। আমার দিন ফুরিয়ে আসছে, আমার কিছু হয়ে গেলে মেয়েটাকে দেখে রাখার কেউ থাকবে না তাই ভেবেছিলাম তোমাদের হাতে ওর দায়িত্বটা দিয়ে অন্তত নিশ্চিন্তে ম'রতে পারবো।"
"এভাবে কেন বলছেন ভাইজান? আমরা আছি তো ওর জন্য।"
"তোমরা আছো? কোথায়? আমি তো দেখতে পাচ্ছি না। তুমি আজ বড্ড স্বার্থপরের মতন কথা বলছো তাহরিমা। তুমি শুধুমাত্র তোমার ছেলের কথা ভাবছো কিন্তু তুমি একবারও আমার মেয়েটার কথা ভাবছো না, আমার কথা ভাবছো না, আমার সম্মানের কথা ভাবছো না।"
"বড় মামা, দয়া করে আপনি আম্মুকে কিছু বলবেন না। আপনার যা বলার আপনি আমাকে বলুন। আমি আপনার সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি।"
তাকদীরের কণ্ঠস্বর পেতেই আজাদ আহমেদ আর তাহরিমা বেগম দুজনেই দরজার দিকে তাকালেন। তাকদীর ভেতরে এলো। সরাসরি আজাদ সাহেবের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
"বড় মামা বলুন আপনার কি জানার আছে? আমাকে বলুন আমি আপনার সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি।"
আজাদ আহমেদ তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
"তুমি আর আমার প্রশ্নের কি উত্তর দেবে? এখন বড় হয়ে গেছো, নিজে বুঝতে শিখেছো, এখন কি আর বড় মামার সিদ্ধান্তের কোন গুরুত্ব আছে তোমার জীবনে? এখন বড় মামার কোন মূল্যই নেই।"
তাকদীর ভীষণ শান্ত গলায় বলল,
"এমন কোন ব্যাপার না বড় মামা। আপনার সিদ্ধান্তের মূল্য আমার জীবনে সব সময় আছে, থাকবে আর ছিল। কিন্তু বড় মামা আপনার সিদ্ধান্তের মূল্য আমার জীবনে আছে সেটা বোঝানোর একমাত্র মাধ্যমই কি এই বিয়েটা? এছাড়া কি আমি পারবো না আপনাকে বোঝাতে?"
"না, পারবে না। আমার কাছে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ আমার মেয়ের সুখ।"
"তাহলে জোর করে কেন আমার সাথে বিয়েটা দিতে চাইছেন তোহার? আমি সব সময় ওকে বোনের নজরে দেখেছি। এর থেকে বেশি আর কিছু না। ও আমার থেকে বয়সে ছোট, খুব ভালো শান্তশিষ্ট একটা মেয়ে। ওর সাথে আমায় মানায় না মামা। আপনার কি মনে হয় না যে আপনি ওর সুখের ব্যবস্থা করতে গিয়ে ওর জীবন দুঃখ ডেকে আনছেন?”
আজাদ আহমেদ আলতো একটু হেসে বললেন,
“তোমার ওপরে আমার যে ভীষণ ভরসা তাকদীর। খুব ভরসা করি তোমায় আমি। যেমন তোমার ওপরে বিশ্বাস আছে তেমনই আমার বোনের শিক্ষার উপরেও বিশ্বাস আছে। আমি জানি তোমার মতন ছেলে আমি আমার মেয়ের জন্য পাবো না। অন্য কোথাও গেলে আমার সহজ সরল মেয়েটাকে অনেক অশান্তি সহ্য করতে হবে।”
তাকদীর এবার কিঞ্চিত বিরক্তিকর গলায় বলল,
“আপনারা আগে থেকেই এত নেগেটিভ ভাবছেন কেন? একটু পজেটিভ ভাবুন না। সবার ভাগ্যে কি খারাপ স্বামী আর শ্বশুরবাড়ি জোটে নাকি? আর এই পৃথিবীতে আমিই শ্রেষ্ঠ মানুষ না। আমার থেকেও আরও অনেক ভালো মানুষ আছে মামা।”
“আমার সম্মান চলে যাবে তাকদীর। আমার মেয়েটা খুব কষ্ট পাবে। বিশ্বাস করো আমি কখনো ভাবি নি যে তুমি আর তোমার মা এভাবে আমাকে ফিরিয়ে দেবে। খুব আনন্দ মনে আমি জানিয়েছে আমাদের পরিবারের সবাই কে, আমার গ্রামে, যে আমার জামাই তুমি হবে। শহরে অনেক বড় একটা কলেজের লেকচারার আমার জামাই, ওর মায়ের গর্ব, আমার ভাগ্নে, আমার গর্ব। আমার সম্মান শেষ হয়ে যাবে।”
আজাদ আহমেদের থেকেও বেশি অসহায় এবার তাকদীরের নিজেকে লাগলো। কি করে বোঝাবে যে তাকদীর পারবেনা। তোহার প্রতি কখনো কোনো দুর্বলতা অনুভবই হয়নি। একজনের ভালোবাসা দেখে কি তাকে ভালোবাসা যায়? যায় না। ভালোবাসার জন্য খুব বেশি কারণ দরকার না, ছোট্ট একটা কারণই যথেষ্ট তবে সেই ছোট্ট কারণটাও তাকদীর কখনো পায়নি তোহাকে ভালোবাসার জন্য। তবে কি করবে? আজাদ আহমেদের দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে অনুরোধের স্বরে তাকদীর বলল,
“দয়া করে আমায় জোর করবেন না। আমি পারবো না। আর আমার আম্মুকেও কিছু বলবেন না। এতে আমার আম্মুর কোন দোষ নেই, পুরো সিদ্ধান্তটা আমার।”
“যার জন্য এত কিছু করছো সে কি তোমায় বিয়ে করবে?”
তাকদীর থমকালো। এই প্রশ্নের উত্তর তো তাকদীর নিজেও জানে না। এই বিষয় নিয়ে হাজারো সংশয়, হাজারো প্রশ্ন ওর নিজের মনেই তৈরি হয়েছে। তবে কি উত্তর দেবে?
“কি হলো বল সে কি তোমায় বিয়ে করতে রাজি?”
“রাজি না হলেও আমি তাকে রাজি করিয়ে নেব।
তবে আমার তাকেই চাই বড় মামা। মিলি ব্যাতীত কারো কথা আমি ভাবতে পারিনা। আর কেউ মনে ধরে না আমার।”
আজাদ আহমেদ আর বলার মতন কিছু খুঁজে পেলেন না, চলে গেলেন রুম থেকে। দরজার বাইরে থেকে তোহাও সবকিছুই শুনল। শেষে তাকদীরের বলা কথাগুলোও শুনলো। শুনে চলে গেল।
তাহরিমা বেগম এবারে তাকদীর কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“আমার মনে হয় তোমার এবার মিলির সাথে এই বিষয়ে সরাসরি কথা বলা দরকার তাকদীর। তোমার একটা সিদ্ধান্তের জন্য অনেক কিছু ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে।”
“আমারও মনে হয় আম্মু এবার আমার এ বিষয়ে সরাসরি ওনার সাথে কথা বলা দরকার। চিন্তা করো না খুব তাড়াতাড়ি বলবো।”
“যদি রাজি না হয়?”
“এটা ভাবছি না আমি আম্মু। আমি শুধু ভাবছি আমি ওনাকে রাজি করাবোই। আর এটাই আমি ভাবতে চাই।”