রিক্ত বসন্ত

পর্ব - ৪৬

🟢

দেখতে দেখতে চলে এসেছে রবিবার। দুটো দিন পর আবারো কলেজ খুলেছে। উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির দ্বিতীয় বর্ষের বিজ্ঞান বিভাগের খ শাখার যেসব শিক্ষার্থীরা গত বৃহস্পতিবার ক্লাসে উপস্থিত ছিল তাদের একজনও আজ ক্লাসে অনুপস্থিত নেই। অপেক্ষা করছে তাদের প্রিয় শিক্ষক রুবা ম্যামের ক্লাসের জন্য। সবাই বারবার ক্লাস রুটিন টা দেখছে। তৃতীয় ঘন্টায় গিয়ে উচ্চতর গণিত ক্লাস।

প্রথম দুটো ক্লাস যেন শেষই হতে চাইছেনা। একেই তো মাঝে দুটো দিনের মতো দীর্ঘ সময়ের বিরতি তার মাঝে আবার এই দুটো ক্লাস। সবারই যেন ইচ্ছে করছিল এই শিক্ষকদের চলে যেতে বলে রুবা ম্যামকে নিয়ে আসতে।

অবশেষে তাদের অপেক্ষার অবসান ঘটলো। দ্বিতীয় ক্লাস শেষের বেল বাজলো। সবাই একযোগে আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল। ইংরেজির লেকচারার ওদের কে চেঁচিয়ে উঠতে দেখে নিজেই কেঁপে উঠলেন। বিস্ময় ভরা কন্ঠে বললেন,

“কি হয়েছে তোমাদের?”

ওদের মধ্যে থেকে একজন উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

“এরপর রুবা ম্যামের ক্লাস।”

“তো কি হয়েছে? সে তো প্রতিদিনই থাকে। “

“আজকের ক্লাসটা একটু স্পেশাল ম্যাম, আপনি বুঝবেন না। আপনি যান না ম্যাম। নেক্সট ক্লাসের জন্য আপনার দেরী হয়ে যাচ্ছে।”

ভদ্রমহিলা আর কোন কারণ জিজ্ঞেস করলেন না। সত্যি সত্যি তার দেরি হয়ে যাচ্ছে তাই চলে গেলেন।

সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলো রুবার আসার জন্য। ঘড়িতে সময় দেখলো। নির্দিষ্ট সময় থেকে পাঁচ মিনিট অতিক্রম করে গেল তবে এখনো তাদের কাঙ্খিত রুবা ম্যাম এসে পৌঁছালো না। ঠিক ঠিক ছয় মিনিট পর শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করল রুবা। বয়স খুব বেশি না। ছয় মাস হলো কলেজে লেকচারার হিসেবে জয়েন করেছে। পরনে ফুল স্লিভ ব্লাউজের সাথে হালকা বেগুনি রঙের সুতি শাড়ি। শাড়ির আঁচল চিকন করে ভাঁজ করে কাঁধের উপরে ফেলে রেখেছে। চোখে একটা কালো চিকন ফ্রেমের চশমা, চুলগুলো পরিপাটি ভাবে একটা খোপা করা আর কাঁধে একটা ব্যাগ। দেখতে ভীষণ মিষ্টি লাগে মেয়েটাকে। ফর্সা গায়ের রঙে হালকা বেগুনি রংয়ের শাড়িটা বেশ মানিয়েছে।

রুবা কে প্রবেশ করতে দেখে সবাই একযোগে দাঁড়িয়ে সালাম দিল। রুবা আলতো হেসে সালামের জবাব দিল। রুবা কে কেউ আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সবাই একযোগে বলে উঠলো,

“ম্যাম, গল্প বলুন।”

রুবা বিস্ময় সমেত বলল,

“আগেই কেন গল্প? এর আগের দিনও পড়া হয়নি। আজ আগে একটু পড়াই তারপরে গল্প।”

রুবার কথায় সবাই তীব্র বিরোধিতা করে বলল,

“কোন মতেই না ম্যাম। আগে গল্প শেষ করবেন তারপরে পড়া।”

রুবাও ওদের কথার বিরোধিতা করে বলল,

“একদম না। এমন করলে কিন্তু আমার চাকরি চলে যাবে। যদি প্রিন্সিপাল ম্যাম এসে দেখেন না যে তোমাদেরকে না পড়িয়ে আমি গল্প শোনাচ্ছি তবে চাকরি চলে যাবে আমার।”

সবাই আবারও একসাথে চেঁচিয়ে উঠলো। কে কি বলল কিছুই রুবা বুঝতে পারল না। সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

“যেকোনো একজন বলো।”

সবাই থেমে গেলো। সবার হয়ে একজন উঠে দাঁড়িয়ে বললো,

“না ম্যাম আপনি গল্প শুনান। মুসতারিন ম্যাম এলে আমরা ওনাকে বুঝিয়ে বলব। দুটো দিনেরই তো ব্যাপার কি হবে একটু পড়াশোনা না করলে? সারা বছর তো করিই।”

রুবা বুঝতে পারলো এদেরকে আজ গল্প না শোনানো অব্দি রেহাই পাবে না। অবশ্য দোষটা ওদের না। যখন রুবা নিজে এই গল্পটা শুনেছিল তখন তো ও নিজেই ধৈর্য ধরতে পারছিল না। বারবার শুধু মনে হচ্ছিল এই গল্পের সমাপ্তিটা কোথায়, সুখ কোথায় এই গল্পের মাঝে, আদৌও কি কখনো সুখ মিলবে না মিলবে না, দুঃখগুলে কি কেটে যাবে নাকি সারাটা জীবন থেকে যাবে?

রুবা কে ভাবনার জগতে ডুবে থাকতে দেখে সবাই আরেক দফা অস্থির হয়ে উঠলো। ওদের অস্থিরতা দেখে রুবা আশ্বস্ত করে বলল,

“বলছি।”

………

(অতীত)

সময়টা তখন রাত দশটার কাছাকাছি। না অয়নের দুচোখে ঘুম আছে আর না মিলির চোখে ঘুম আছে। বলতে গেলে অয়নের জন্যই মিলিকে জাগতে হচ্ছে। আজ ছেলেটা সন্ধ্যায় অসময়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল সেজন্যই এখন আর ঘুমোতে চাইছে না।

এদিকে সকালে আবার মিলি কে কলেজে যেতে হবে সেই জন্য এখন জেগে থাকা নিয়ে বেশি চিন্তা হচ্ছে।

হঠাৎ করে কলিং বেলটা বেজে উঠলো। কলিংবেলের আওয়াজ কানে যেতেই মিলি চমকে উঠলো। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো দশটা বারো বাজে। এত রাতে কে এলো? তাকদীর? কিন্তু ও তো এত রাতে আসে না সচরাচর।

মিলির হঠাৎ মনে হল তাহরিমা বেগম কি তবে তাকদীর কে বলে দিয়েছে মিলির চলে যাওয়ার কথা? আর সেজন্যই কি আজ অসময়ে অনিয়ম করে চলে এসেছে তাকদীর? হ্যাঁ হতেই পারে।

মিলি একটু ঘাবড়ালো। তবে ঘাবড়ালে তো চলবে না। নিজেকে শক্ত করতে হবে। তাকদীরের সামনে নিজেকে খুব স্বাভাবিকভাবে প্রদর্শন করতে হবে। নিজের অস্বস্তি কিংবা খারাপ লাগা কোনটাই দেখানো যাবে না।

দরজা খুলে দিতেই মিলি বুঝলো ওর ধারণা একদমই ভুল না। সামনে তাকদীরই দাঁড়িয়ে আছে। তবে অবাক করার বিষয় হলো তাকদীর কে স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। যদি তাহরিমা বেগম মিলির চলে যাওয়ার কথাটা বলতো তবে তো তাকদীর কে এতটা স্বাভাবিক দেখাতো না। কখনোই এটা সম্ভব না যে মিলির চলে যাওয়ার খবর শোনার পরও তাকদীর স্বাভাবিক থাকবে।

তবে কি তাহরিমা বেগম তাকদীরকে কিছু বলেনি? তাহলে তাকদীর এই সময় কেন এলো?

মিলিকে চুপ করে নিজের মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে তাকদীর অল্প বিস্তর হাসলো। বোধহয় বুঝল মিলির অবাক হওয়ার কারণ। মিলির ভাবনার মাঝেই তাকদীর বলে উঠলো,

“অয়ন কি ঘুমিয়ে পড়েছে?”

মিলির ধ্যান ভাঙলো। তবে ঘোরের মাঝে থাকায় তাকদীরের প্রশ্নটা ঠিকঠাক কানে যায়নি। অবুঝের ন্যায় বলল,

“কিছু বললে?”

“হ্যাঁ। বললাম অয়ন কি ঘুমিয়ে পড়েছে?”

মিলি দু দিকে মাথা দাঁড়িয়ে না বোধক উত্তর জানিয়ে বললো,

“না এখনো ঘুমোয়নি, খেলছে।”

“ওকে একটু দিতে পারবেন আমার কাছে?”

“এই রাতে তুমি ওকে নিয়ে গিয়ে কি করবে? যাও ঘুমোও তুমি।”

“হ্যাঁ ঘুমোবো তো কিন্তু কিছু দরকার আছে। ওকে একটু দেবেন? না হলে আপনি এখানে থাকুন আমি ওকে ভিতর থেকে নিয়ে আসছি।”

তাকদীরের কথা মতোই তাকদীর ভিতরে গিয়ে অয়নকে নিয়ে এলো। অয়নকে নিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে চলে যেতে ধরলে মিলি বলে উঠল,

“কখন দিয়ে যাবে ওকে?”

“একটু অপেক্ষা করুন আমি আসছি।”

কথাটা বলে তাকদীর নিজের ফ্ল্যাটে চলে গেল। দরজা লাগালো না। মিলিও তাই ভেতরে গেলো না। ভাবলো তাকদীর আবার আসবে তাই সেখানেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো এবং হলোও তাই। একটু পরেই তাকদীর এলো তবে কোলে অয়ন নেই। বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে মিলির দিকে এগিয়ে এসে বলল,

“একটু ছাদে যেতে পারবেন? কথা ছিল আপনার সাথে।”

মিলির কেন যেন এবারে ভয় হলো। তাকদীরের শান্ত ভাবটা মিলির মনে ভয় তৈরি করল। মিলির মনে হচ্ছে যে তাকদীর সবটা জানে। তাকদীরের ভাব ভঙ্গি দেখে কিছু তো অন্যরকম লাগছে। আর ঠিক সেই কারণেই তাকদীরের শান্ত ভাবটা মেনে নিতে পারছে না। ছেলেটার তো এতটা শান্ত থাকার কথা নয় মিলির চলে যাওয়ার কথা শুনে তবে কেন শান্ত আছে? কি উদ্দেশ্য? আর অয়নকেই বা কোথায় রেখে এলো?

“অয়ন কে কোথায় রেখে এলে?”

“চিন্তা করবেন না, আম্মুর কাছে আছে। আমি আম্মুকে বলে এসেছি যেন কিছুক্ষণ ওর খেয়াল রাখে। চলুন ছাদে যাই।”

মিলি আবারো জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

“কিন্তু এই রাতের বেলা ছাদে কেন যাব?”

“কিছু কথা বলার আছে আপনার সাথে।”

“এখানেই বলো।”

তাকদীর আপত্তি জানিয়ে বলল,

“না এখানে বলবো না। আমি জানি হয়তো আমার প্রত্যেকটা কথার প্রেক্ষিতে, প্রত্যেকটা প্রশ্নের প্রেক্ষিতে বুক চিরে একটা করে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসবে। আর সেই দীর্ঘশ্বাসগুলো মুক্ত বাতাস উড়িয়ে দেওয়ার জন্য একটা খোলা জায়গার প্রয়োজন। এই বদ্ধ জায়গায় সেই দীর্ঘশ্বাস গুলো আরো ভারী হয়ে উঠবে। চলুন ছাদে যাই।”

কথাটা বলে তাকদীর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। মিলিও আর আপত্তি করতে পারল না।দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে তাকদীরের পিছু পিছু সিঁড়ি বেয়ে ছাদে চলে গেল।

বাড়ির ছাদটা অনেক সুন্দর। তাকদীরের বারান্দায় যেমন অসংখ্য ফুলের গাছ আছে ঠিক তেমনি ছাদেও অসংখ্য গাছ আছে। আর সেই সমস্ত গাছের পরিচর্যা তাকদীর নিয়ম করেই করে। মাঝে মাঝে মিলিও অবশ্য আজকাল গাছ গাছালির যত্ন করে তবে তেমন সময় হয় না। বেশিরভাগ দায়িত্বটাই তাকদীর পালন করে।

দুদিন হলো কোন বৃষ্টি হয় না যার ফলে আকাশটা বেশ পরিষ্কার। চাঁদটাও খুব স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে। আবহাওয়াটাও স্বাভাবিক। খুব বেশি গরমও না আবার খুব বেশি ঠান্ডাও না।

ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে তাকদীর। দৃষ্টি তার সেই আকাশের চাঁদটার দিকে। পাশে মিলি দাঁড়িয়ে আছে। কিছুই বলছে না ছেলেটা, মিলিও আর আগ বাড়িয়ে কোন প্রশ্ন করতে পারছে না।

জানেনা তাকদীর এখানে কেন এনেছে, কি বলতে এনেছে? তবে হ্যাঁ আন্দাজ করছে কিছু একটা। তবে নিশ্চিত হতে পারছে না। মিলি জানেনা তাকদীরের সেই সব কথার কি উত্তর দেবে, কি উত্তর দেওয়া উচিত, কি উত্তর দিলে ছেলেটা কে বোঝাতে পারবে। মিলি জানে মিলির জন্য আজ তাকদীর ভীষণ কষ্ট পাবে। হ্যাঁ ঠিক যতটা কষ্ট মিলি তন্ময়ের থেকে পেয়েছিল হয়তো ততটাই কষ্ট তাকদীর পাবে। কিন্তু এই কষ্টটা মিলিকে দিতেই হবে। না হলে যে ছেলেটা জীবনে এগোতে পারবেনা। সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবে।

নীরবতার মাঝে ঠিক কতটা সময় অতিবাহিত হয়ে গেল সেটা কারোরই জানা নেই। একটা গুমোট পরিবেশ তৈরি হয়েছে। শুধু শোনা যাচ্ছে দুটো মানুষের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ।

“কিছু কি বলবে তাকদীর?”

“মায়া খুব খারাপ একটা জিনিস তাই না মিলি?”

“হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?”

তাকদীর কিছুক্ষণ ভেবে উত্তরে বলল,

“অপ্রত্যাশিত ভাবে আপনার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। প্রথমে লাবিবার থেকে আপনার বিষয়ে অনেক কিছু শোনা আর সেই থেকে শুরু হয় আপনার জন্য খারাপ লাগা। তারপর ধীরে ধীরে আপনার মুখ থেকেই আপনার ব্যাপারে অনেক কিছু শুনলাম, আপনাকে জানলাম, বুঝতে শিখলাম আর তারপর তৈরি হলো আপনার প্রতি মায়া।”

“আর এর শেষ কোথায়?”

তাকদীর বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে মিলির দিকে তাকিয়ে বলল,

বিজ্ঞাপন

“অনুভূতিরা কখনো শেষ হয় না মিলি। আপনার জীবন শেষ হয়ে যাবে, আপনার অস্তিত্ব মুছে যাবে তবুও আপনার অনুভূতি শেষ হবে না। অনুভূতিরা আজীবন বেঁচে থাকে। ওরা বেঁচে থাকে এই প্রকৃতির মাঝে। আপনার একেকটা দীর্ঘশ্বাস এই দুনিয়ায় থেকে যায়, আপনার একেকটা চোখের জলের ফোঁটা এই দুনিয়ায় থেকে যায়, আপনার ব্যক্ত করা অনুভূতির স্বীকারোক্তি গুলো থেকে যায়, সেই সাথে থেকে যায় আপনার অব্যক্ত অনুভূতি গুলো। মানুষ মা'রা যায় তবে তখনও সে নিজের সাথে করে অনুভূতিদের নিয়ে যায়। দেহের মৃত্যু আছে, মনের মৃত্যু আছে তবে অনুভূতির কোনো মৃত্যু নেই।”

মিলি নিস্তব্ধ হয়ে গেল। এই গভীর উপমার কাছে মিলির সকল যুক্তি যেন ফিকে হয়ে গেল। কি বলা উচিত ভেবে পেল না। তাকদীর আবারো বলে উঠলো,

“আপনি হয়ত ভাবেন আপনি আমার জন্য নিষিদ্ধ তবে আমি সেটা কখনোই ভাবিনি। নিষিদ্ধ বলতে আমি বুঝি অপবিত্র কোনো বস্তু। আর আমি মনে প্রাণে এটা বিশ্বাস করি যে যা কিছু অপবিত্র তার প্রতি কখনো ভালোবাসা আসতে পারে না। আপনার প্রত্যেকটা বিষয় আপনার প্রতি আমার অনুভূতি তৈরি হওয়ার কারণ। আপনার হাসি, কান্না, আফসোস, যন্ত্রণা, লড়াই সবকিছু ধীরে ধীরে আমায় আপনার প্রতি দূর্বল করে তুলেছে। আজ আমি আপনাকে ছাড়া ভীষণ অসহায় মিলি।”

তাকদীর থেমে গেল। আবারো বেশ কিছুক্ষণ নিরবতা চললো। গুমোট পরিবেশের গুমোট ভাবটা মিলির কন্ঠে ভেঙে গেল।

“আর কিছু?”

চাঁদের উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তাকদীর মিলির মুখ পানে তাকালো। কিছু বলতে চাইলো তবে মুখ দিয়ে বেরোলো না। শুধু বুক চিরে একটা দীর্ঘ শ্বাস আর হতাশা বের হলো।

মিলি আবারো বলে উঠলো,

“কিছু বলবে?”

তাকদীর এবারে নিজেকে প্রস্তুত করলো। আজ ওকে বলতেই হবে এই কথাটা। এতকিছু যখন বলেই দিল বাকি কথাটাও সম্পূর্ণ করতে হবে। আর দেরি করা সম্ভব না। যদি আজও না বলে তবে এবার সত্যিই ভীষণ দেরি হয়ে যাবে। মিলির দিকে তাকাতে পারলো না তাকদীর। দৃষ্টি রাখলো সেই আকাশের বিশাল চাঁদটার দিকে। আঙ্গুলের ইশারায় মিলি কে চাঁদটা দেখিয়ে বলল,

“দেখুন মিলি ওই চাঁদটাও কিন্তু ভীষণ একা। চাঁদ এর মতন আর কেউ নেই, চাঁদ কে সঙ্গ দেওয়ার মতন আর কেউ নেই কেবল ঐ বিশাল আকাশটা ছাড়া। ঐ চাঁদ কে ঐ আকাশ সঙ্গ দিয়েছে, নিজের বুকে জায়গা দিয়েছে কেন জানেন? ওই চাঁদের একাকীত্ব দূর করার জন্য। চাঁদটা ভীষণ সুন্দর কিন্তু তারপরেও ও একা।”

“কি বলতে চাইছো?”

“আমি আপনার তুলনা ওই চাঁদের সাথে করলাম আর আকাশের সাথে তুলনা করলাম আমার। ওই চাঁদের মতন আপনিও ভীষণ একা আর আমি ঐ আকাশটা হয়ে আমার বুকের মাঝে আপনাকে রাখতে চাই। আমার এই ইচ্ছেটা কি অন্যায়? আমি তো ভালোবেসেছি আপনাকে তবে ভালোবাসাটা কি আমার অন্যায়? আমি আপনাকে নিয়ে আমার জীবন সাজানোর স্বপ্ন দেখেছি তবে আমার সেই স্বপ্ন দেখাটা কি অন্যায়?”

মিলি থমকে গেল। চমকানো দৃষ্টিতে তাকালো তাকদীরের দিকে। নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলো, আচ্ছা ভালোবাসাটা কি অন্যায়? ভেতর থেকে তৎক্ষণাৎ উত্তর এলো, না ভালোবাসা কখনো অন্যায় হতে পারে না। তবে ভুল মানুষকে ভালোবাসা অন্যায়। ঠিক যেমন মিলি ভুল মানুষকে ভালোবেসে অন্যায় করেছিল তেমন ভাবেই তাকদীরও ভুল মানুষকে ভালোবেসে অন্যায় করেছে। আর তার থেকেও বড় অন্যায় করেছে সেই ভুল মানুষটাকে নিয়ে জীবন সাজানোর স্বপ্ন দেখে।

“একটা ভুল আমাদের গোটা জীবন শেষ করে দিতে পারে। সেই ভুলটা আমরা যে কোন ক্ষেত্রে করতে পারি। তবে তোমার আর আমার মাঝে মিল কোথায় জানো? আমরা সেই ভুলটা করেছি ভালোবেসে। আমি যেমন ভুল মানুষকে ভালোবেসে ছিলাম ঠিক তেমনি তুমিও ভুল মানুষকে ভালোবেসেছো।”

“তবে আপনি যখন ভুল মানুষকে ভালোবাসার কষ্টটা অনুভব করতে পারেন আমাকে সেই কষ্ট কেন দিচ্ছেন? কেউ একজন আপনাকে ঠকিয়েছে তার দায় কি আমার? তাহলে তার শাস্তি কেন আমি পাব বলুন? কেউ একজন ভালোবাসতে পারেনি আপনাকে তবে আমি ভালোবাসি।”

মিলি এবার কোন উত্তর দিতে পারল না। তবে ভাবলো, সত্যিই কি মিলি তন্ময়ের শাস্তি তাকদীর কে দিচ্ছে? না এমনটা না। মিলি তাকদীর কে কোন শাস্তি দিতে চাইছে না। মিলি শুধু চাইছে নতুন করে আর কারোর সাথে জীবনটা না জড়াতে। ভরসা খুবই আলতো একটা জিনিস। একবার তা ভাঙলে আর যে জোড়া লাগানো যায় না। জীবনে বিয়েই বা কয়জনকে করা যায়, সংসারই কয়জনের সাথে করা যায়, আর ভালোই বা কতজনকেই বাসা যায়?

এই এক জীবনে মিলির বিয়ে, ভালোবাসা, সংসার সবই তো হয়ে গেছে তবে নতুন করে আবার করবেটা কি? তাকদীরকে দেওয়ার জন্য কি মিলির কাছে কিছু অবশিষ্ট আছে? নেই তো। তবে কি করে দেবে ছেলেটাকে ভালোবাসা?

মিলি কে চুপ করে থাকতে দেখে তাকদীর পুনরায় কাতর গলায় বলে উঠলো,

“বিশ্বাস করুন মিলি আমি চাইনি আপনাকে ভালোবাসতে তবে ভালোবেসে ফেলেছি। আমি জানিনা আমাদের দুজনের মাঝে কতটা কি ব্যবধান আছে, আপনি কতটা কি ব্যবধান দেখতে পান তবে বিশ্বাস করুন আমি কোনো ব্যবধান দেখতে পাই না। আমি কবে থেকে আপনার সাথে সব থেকে বেশি জড়িয়ে গিয়েছি জানেন?”

মিলি জানার আগ্রহ প্রকাশ করে বলল,

“কবে থেকে?”

“যেদিন নার্স প্রথম আমার কোলে অয়নকে দিয়ে বলেছিল আমার ছেলে হয়েছে। আমার বাচ্চাদের সাথে কখনো কোন অ্যাটাচমেন্ট ছিল না তেমন। আমি জানতাম না প্রথম বাবা হওয়ার অনুভূতি কেমন হয়, আমি জানতাম না সন্তানের প্রতি মায়া কাকে বলে তবে আমি সেই দিন সেই মুহূর্ত থেকে অনুভব করতে পেরেছি যে বাবা হওয়ার অনুভূতি ঠিক কতটা সুন্দর হয়। আমি এখনও আপনার জীবন সঙ্গী হয়ে উঠতে পারিনি কিন্তু না চাইতেও আমি অনেকদিন আগেই অয়নের বাবা হয়ে গিয়েছি। আপনি চলে গেলে এই অনুভূতিটা কি করে আমি ভুলবো?”

মিলির অজান্তেই ওর চোখের কার্নিশ বেয়ে দু'ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। তাকদীর খেয়াল করলো ওর নিজের চোখ দুটোও টলমল করছে। যে কোন সময় অশ্রু গড়িয়ে পড়বে।

মিলি হাতের উল্টো পিঠের সাহায্যে নিজের চোখের জল টুকু মুছে নিল। কণ্ঠ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে তাকদীর কে বলল,

“আমার হৃদয়টা খুব বাজে ভাবে ভেঙ্গে গেছে তাকদীর। এক জীবনে একটা মানুষ কে যতটা ভালোবাসতে পারতাম আমি ততটা আমার স্বামীকে ভালোবেসে ছিলাম। যে ভালোবাসার প্রতি থেকে আমার বিশ্বাস নষ্ট করে দিয়েছে, ঘৃণা জমিয়েছে। আমার হৃদয়ে এখন আর কারো জন্য কোন ভালোবাসা অবশিষ্ট নেই। না আমার স্বামীর জন্য, না তুমি কিংবা অন্য কারো জন্য। তবে আমি তোমাকে কি দেই বলোতো?”

“কিছু দিতে হবে না। সত্যি বলছি আমি কিচ্ছু চাইবো না আপনার থেকে শুধু আমাকে আপনাকে নিজের করে নিতে দিন। শুধু একটু যেন আমার পাশে আপনাকে পাই সেই সুযোগটা দিন। ভালোবাসা চাইছিনা আমি আপনার থেকে, দয়া দিন, করুণা দিন। আমায় ভালোবাসার মতন মূল্যবান কিছু দিতে হবে না। এত মূল্যবান জিনিস আপনার থেকে চাইবো না। তবে করুণা তো যার তার উপরে করা যায়, খুব সস্তা একটা জিনিস।

আমার উপরে নাহয় করুনাই করলেন।”

“তবে যে তোমাকে ছোট করা হয়ে যাবে, তোমার ভালোবাসাকে ছোট করা হয়ে যাবে। আমি তোমার অনুভূতিকে কখনোই ছোট করতে চাই না। তবে নিজের উপরেও আর কোনো জুলুম করতে চাই না।”

তাকদীর এবার হেসে উঠলো। তবে মিলির কেন যেন মনে হলো তাকদীরের সেই হাসিটা ছিল মিলির কথা কে ব্যঙ্গ করে। মিলি বলছে অনুভূতিকে ছোট করতে চায় না অথচ অনুভূতিকে গলা টি'পে মা'রছে । তাকদীর বৃদ্ধাঙ্গুলের সাহায্যে চোখের পানি টুকু ঝেরে ফেলে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে তুলে মিলি কে বলল,

“অনুভূতিকে ছোট করতে চাইছেন না অথচ আমাকে মে'রে ফেলার ব্যবস্থা করেছেন তাই না? আমার মনটাকে তো মে'রে ফেলছেন বুঝতে পারছেন না? আমার পাগলামো গুলো আপনার চোখে পড়ে না? আমার ভালোবাসাগুলো কি আপনার হৃদয়টাকে আবার জোড়া লাগাতে পারবে না?”

মিলির এই প্রশ্নের উত্তরটা দিতে কেন যেন একটুও সময় লাগলো না। তৎক্ষণাৎ খুব শান্ত গলায় বলল,

“পারবে না। আমি কখনো কল্পনাও করিনি জানো যে আমার আট বছরের ভালোবাসা হেরে যাবে কোন এক পরনারীর মিথ্যে ভালোবাসার সামনে। যে ছেলেটা আমাকে পাওয়ার জন্য ছোট বাচ্চাদের মতন কান্না করেছে, আমার ভাইয়ের হাত পা ধরে আমাকে চেয়েছে, আমার বাবার পায়ে পড়ে আমাকে চেয়েছে, আমার মায়ের পায়ে পড়ে আমাকে ভিক্ষে চেয়েছে, যার সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়েছিল একজন অপরিচিত মানুষকে হাতজোড় করে অনুরোধ করেছে যেন আমাকে সে গ্রহণ না করে সেই মানুষটার ভালোবাসা কখনো বদলে যেতে পারে বলে আমি ভাবি নি।”

“অনেক পাগলামি করেছে আপনার জন্য বোধ হয় তাই না?”

“হ্যাঁ। অনেক পাগলামো করেছে। ওর পাগলামোর কোন সীমা ছিল না। যে ছেলেটা আমার জন্য নিজের মায়ের সাথে অশান্তি করেছে, যে আমাকে না দেখে একটা দিন থাকতে পারতো না সেই শহর থেকে গ্রামে ছুটে আসতো, কাজের ফাঁকে যদি এক মিনিটেরও সময় পেত তবে সেই এক মিনিটেই আমায় ফোন করে আমার খোঁজ নিত। আমার অসুস্থতায় যে নিজে ব্যস্ত হয়ে উঠতো, আমায় কাঁদতে দেখলে যে নিজে উদ্বিগ্ন হয়ে যেত, আর আমায় হাসতে দেখলে যার পুরো পৃথিবীটা হেসে উঠতো সে আমাকে ঠকাতে পারে এটা আমি কখনো ভাবিনি। নিজে রোদে পুড়ে আমাকে ছায়া দিয়েছে, নিজে বৃষ্টিতে ভিজে আমাকে ছাতার নিচে আশ্রয় দিয়েছে সেই মানুষটাও তো আমাকে ঠকালো তাকদীর। সেই মানুষটাও যে আমার ভালোবাসাকে হারিয়ে দিল তবে আবার নতুন করে কাউকে ভালোবাসি কি করে?”

“আমার থেকেও কি বেশি পা'গ'লামি করতো?”

মিলি আলতো হেসে বলল,

“তোমার পা'গ'লামির তো একটা বছরও এখনো হয়নি তাকদীর আর ওর পা'গলা'মি ছিল দীর্ঘ ছয় বছরের। আর আমার ভালোবাসা ছিল দীর্ঘ আট বছরের। আমার যে আর ভরসা হয় না এসবে। আমি আর পারবো না কখনো কোন সংসারে নিজেকে জড়াতে, কারো জীবনের সাথে নিজের জীবনকে জড়াতে। এই সম্পূর্ণ দায়টা আমারই, তোমার কোন দোষ নেই।”

তাকদীর আবারো ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,

“দোষ আমার নেই তবুও শাস্তিটা আমি পাচ্ছি। আপনি এই সিদ্ধান্তটা কি আপনার প্রাক্তন স্বামীর জন্য নিচ্ছেন? আপনি কি এখনো ওনাকেই ভালোবাসেন?”

মিলি চটপট উত্তরে বলল,

“কখনোই না তাকদীর। আমি তোমাকে কি এতক্ষণ বোঝালাম? যে আমার মনে আর কারোর জন্যই কোনো ভালোবাসা নেই। আর তন্ময়ের কথা তো এখন আমার মনেও হয় না। ওর জন্য এখন শুধুই ঘৃণা আর করুণা ছাড়া কোনো অনুভূতি নেই।”

“তবে কি তোহার জন্য নিচ্ছেন? আপনি কি ভাবছেন আপনি আমাকে বিয়ে না করলে আমি তোহা কে বিয়ে করে নেব? সেটা কিন্তু….”

মিলি তাকদীর কে মাঝ পথে থামিয়ে দিয়ে বলল,

“আমি কখনোই তোমাকে বলবো না যে তুমি আমার কথা শুনে তোহা কে বিয়ে করে নাও। আমি জানি তাকদীর জোর করে কখনো কাউকে ভালোবাসা যায় না। হ্যাঁ এটা ঠিক তোহার জন্য আমার খারাপ লাগে, আমি চাই যেন তোমার আর তোহার বিয়েটা হয়ে যায়। তবে সেটা কখনোই তোমাদের একজনের অনিচ্ছায় না।”

তাকদীর এবার মিলির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে মিলির হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। তাকদীর কাঁদতে চায় না কিন্তু তবুও এবার শব্দ করে কেঁদে ফেলল। এতক্ষণ তো দু এক ফোঁটা চোখের জল এমনি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল। তবে এবারে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। শব্দ করে কেঁদে উঠে বলল,

“আমি ভালোবাসি আপনাকে মিলি। জীবনে একবার ভালোবেসে ঠকেছেন আরেকবার বিশ্বাস করে আমায় ভালোবেসে দেখুন ঠকবেন না। আমি আপনাদের ছাড়া থাকতে পারবো না। জানেন আমি স্বপ্ন দেখি অয়ন যখন কিছুদিন পর কথা বলতে শিখবে, বুঝতে শিখব আমায় বাবা বলে ডাকবে, আমি ওর হাত ধরে ওকে স্কুলে নিয়ে যাব। আমি স্বপ্ন দেখি কিছুদিন পর রোজ সকালে আপনি আমাদের জন্য রান্না করবেন, আমরা একসাথে কলেজে যাব। আমি স্বপ্ন দেখি মিলি কিছুদিন পর থেকে কেউ আপনার পরিচয় জিজ্ঞেস করলে আপনি বলবেন আপনি আমার স্ত্রী।”

মিলি খেয়াল করলো এখন আর ওর চোখে কোন জল নেই। ভিতরে কষ্ট হচ্ছে ঠিকই তবে সেই কষ্টটা বাইরে থেকে দেখলে কেউ বুঝতে পারবে না। তাকদীরের অসহায়ত্ব দেখে এক সময়ের নিজের সেই অসহায়ত্বের কথা মনে পড়ে গেল। ঠিক এভাবেই মিলি তন্ময় কে অনুরোধ করেছিল। মিলির অসহায়ত্বটা বোধহয় এর থেকেও বেশি ছিল। তবে মিলির তারপরেও মনে হচ্ছে তাকদীরের জন্য ওর কাছে করার মতন কিছু নেই। মিলি অনেক চেষ্টা করেছে নিজের মনকে রাজি করানোর জন্য তবে পারেনি। দিনশেষে ভেতর থেকে একটাই উত্তর এসেছে মিলি আর পারবে না। মিলি আর নতুন করে কারো সাথে নিজের জীবনটাকে জড়াতে পারবেনা। মিলির মনোবল ভেঙে গেছে।

এদিকে তাকদীর অঝোরে কেঁদেই যাচ্ছে। এখন আর কোন আকুতি জানাচ্ছে না মিলিকে। মিলি খেয়াল করলো ওর হাত দুটো ভিজে গেছে। মিলি পাষাণের মতন একটা কাজ করলো। তাকদীরের হাতের বাঁধন থেকে নিজের হাত দুটো ছাড়িয়ে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,

“নিজেকে সামলাতে শেখো তাকদীর। তুমি নিজেও খুব ভালো করেই জানতে যে এটা কখনোই হবার নয়। তুমি তো আমায় চিনেছিলে এই কয়দিনে বলো? তবে কি তুমি জানতে না যে আমি পারবো না আর নতুন করে জীবনটা শুরু করতে?”

তাকদীর অবাক নয়নে মিলির দিকে তাকিয়ে বলল,

“এত কিছু ভাবার পরেও তো ভালোবাসাটা হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম রাজি করিয়ে নিতে পারব আপনাকে। শুধু আমার বেলাই আপনার হৃদয়টা এত কঠিন হয়ে গেল মিলি?”

“তোমার বেলায় না তাকদীর। আমার হৃদয়টা কঠিন হয়ে গিয়েছে সবার বেলাতেই। আমার হৃদয় যদি কঠিন না হতো তবে আমি তন্ময় কেও ফিরিয়ে দিতে পারতাম না। শোনো আমার পক্ষে আর কাউকে ভালোবাসা সম্ভব না হোক সেটা তুমি, তন্ময় কিংবা অন্য কেউ।”

হঠাৎ করে তাকদীরের কান্নাটা থেমে গেল। আবারো বিস্ময় ভরা কন্ঠে মিলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আপনি তবে আমার হবেনই না?”

“এটা কখনোই সম্ভব না। তোমার কাছে যদি আমাকে পাষাণ মনে হয় তবে আমি তাই, যদি আমাকে অমানুষ মনে হয় তবে আমি তাই তবে আমি পারবো না। আমার ভেতরটা একদম ফাঁকা। আমার অনুভূতি বলতে কিছু কাজ করে না আজকাল। আমার মনে আর কারো জন্য কোন অনুভূতি কাজ করে না। বলতে পারো আমি একটা জীবন্ত পাথরে পরিণত হয়েছি। এই পাথরকে ভালোবেসে তুমি খুব বড় ভুল করেছো। কষ্ট ছাড়া আর কিছুই পাবে না। আশা করছি তুমি আমাকে বুঝবে, আমার সিদ্ধান্তকে সম্মান করবে।”

কথাটা বলে মিলি আর সেখানে দাঁড়ালো না। চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালে পিছন থেকে তাকদীর বলে উঠলো,

“এই শূন্য হৃদয় নিয়ে কেন আমার কাছে এলেন? এই হৃদয়ে যখন একটু ভালোবাসা ছিল তখন কেন এলেন না আমার কাছে? তবে তো সেই হৃদয়ে আমি আমার ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে দিতাম।”

মিলি থেমে গেল। কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে উত্তরে বলল,

“আমার ভাগ্যটা ভীষণ খারাপ তাকদীর। এতদিন আমার ভাগ্য আমার সাথে খেলেছে আর এবার আমি নিজে আমার নিজের সাথে খেলছি। এতদিন দোষারোপ করেছি আমার ভাগ্যকে কিন্তু এবার থেকে দোষারোপ করবো নিজেকে। তবে তবুও আমার কোন আফসোস নেই। সারা জীবন অন্যদের কথা শুনে এসেছি এই প্রথম নিজের ইচ্ছেতে কোন সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার সিদ্ধান্তটা কে সম্মান জানিয়ো।”

কথাটা বলে মিলি এবারে আর সত্যি দাঁড়ালো না, চলে গেল। তাকদীরও আর আটকালো না। কি বলবে? কোনো শব্দই অবশিষ্ট নেই তাকদীরের কাছে।

ছাদের ওপরে হাঁটু ভেঙে বসে পড়লো। আজ প্রথমবারের জন্য তাকদীর এমন অসহায়ের মতন করে কাঁদল। এর আগে কখনো তাকদীর কাঁদেনি। নিজের মায়ের চরম অসহায়ত্বের দিনেও এভাবে কাঁদেনি বরং হেসেছে তখন যেন ওর মা সাহস পায়। কেউ কখনোই তাকদীরকে ভাঙতে পারেনি, কেউ যদি কোন কষ্ট দিয়েছে, অপমান করেছে তবে তার পাল্টা জবাব পেয়েছে। তবে আজ প্রথম তাকদীর এতটা দুর্বল হয়ে গেল। আজ প্রথম তাকদীরের ভালোবাসা তাকদীর কে খুব জঘন্য ভাবে ভাঙলো। ভেতর থেকে কেউ যেন তাকদীরের অসহায়ত্ব দেখে বিদ্রুপাত্মক গলায় বলে উঠলো,

“বলেছিলাম তোকে তোর ভালোবাসা পূর্ণতা পাবে না। অসময়ের বৃষ্টির মতন তোর অনুভূতিগুলো সব চোখের জল হয়ে ঝরে পড়ে গেল। এটাতো হওয়ারই ছিল। তুই সব জানতি তবে কেন আজ কাঁদছিস?”

তাকদীরের কষ্ট হলো। আরো কাঁদলো। কতক্ষণ যে এভাবে বসে থেকে কাঁদলো তার হিসেব জানেনা। হঠাৎ করে কাঁধে কারো হাতের উষ্ণ স্পর্শ অনুভব করল। কেন যেন তাকদীরের মনে হলো মিলি এসেছে। চমকে সেদিকে তাকিয়ে মিলি বলে একবার ডাকল। তবে না মিলি আসেনি। এসেছে তাহারিমা বেগম। ওনাকে দেখে তাকদীরের কান্নার বেগ আরো বাড়লো। ছোট বাচ্চারা যেমন ঠোঁট উল্টিয়ে কাঁদে ঠিক তেমন করে কেঁদেই অভিযোগ করে বলল,

“আম্মু মিলি আমাকে একা ফেলে রেখে চলে গেল। আমি এতো ভালোবাসলাম তবুও আমার ভালোবাসো ওনাকে আটকে রাখতে পারল না আম্মু।”

তাহরিমা বেগম দু হাতে আগলে নিলেন ছেলেকে। ছেলের কান্না দেখে তার বুকটাও ফেটে যাচ্ছে। তার জীবনের তো এই একটাই অবলম্বন, বেঁচে থাকার এই একটাই কারণ। এই ছেলেটাই তো ওনার প্রাণ। ছেলের কষ্ট দেখলে যে ওনারও খুব কষ্ট হয়।

ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন,

“কাঁদে না বাবা। তোমায় তোমার মা অন্যদের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাতে শিখিয়েছে। আমি তোমাকে বলেছিলাম মিলি যা সিদ্ধান্ত নেবে সেটাই তোমাকে মানতে হবে। তুমি জেনে শুনে এই ভয়ঙ্কর রাস্তায় পা বাড়িয়েছো। তোমার উচিত ছিল নিজেকে সামলানোর ক্ষমতা রাখা।”

তাকদীর আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তাহরিমা বেগম কে। পিঠের জামা দু হাতে খামচে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল,

“এত কিছু ভেবে যে ভালোবাসা যায় না আম্মু। উনি যেমন আমাকে ভাঙার আগে একটা বারও ভাবেননি ঠিক তেমনি আমিও ওনাকে ভালোবাসার আগে একটা বারও ভাবিনি। দিনশেষে তবুও আমার ভালোবাসাটাই হেরে গেল। ওনার ভাঙ্গা হৃদয়টাকে আমি জোড়া লাগাতে চাইলাম অথচ উনি আমার হৃদয়টাকে ভেঙে দিয়ে চলে গেলেন আম্মু।”

বিজ্ঞাপন
রিক্ত বসন্ত গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস