সারাটা রাত আর ঘুমোতে পারেনি তন্ময়। এপাশ-ওপাশ ফিরতে ফিরতেই রাত কেটে গেছে। কখনো অস্থিরতা আর সহ্য করতে না পেরে বিছানা থেকে উঠে ঘরের মাঝে পায়চারি করেছে, কখনো বেলকনিতে গেছে। মাথাটা যন্ত্রণা করায় কখন আবার ট্যাপের নিচে গিয়ে মাথায় পানি দিয়েছে তবে কোন কিছুই তন্ময়ের অস্থিরতা কমাতে পারেনি। শেষে আবার বাধ্য হয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়েছে একটু ঘুমোনোর চেষ্টায় তবে সেই প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। ভোরের দিকে অবশ্য একটু চোখটা লেগে এসছিল তবে এক ঘন্টাও বোধ হয় ঘুমোতে পারেনি। তার আগেই ঘুমটা আবার ভেঙে গেছে।
দু হাতে নিজে নিজের মাথার চুল খামচে ধরে বসে আছে তন্ময়। ভাবছে গতকাল রাতের কথা। ভাবছে মিলির কথা। মিলি কত স্বাভাবিক ভাবে অয়ন কে কোলে নিয়ে তন্ময়কে একা ফেলে চলে গেল। কতটা নিষ্ঠুর ভাবে তন্ময় কে ফেলে চলে গেল। একটা বার ফিরেও তাকালো না তন্ময়ের দিকে মিলি। তন্ময় ভাবলো মিলির মনে হয়তো তন্ময়ের জন্য আর ভালোবাসা নেই। থাকবেই বা কি করে? ভালোবাসা থাকার মতন কোন কাজ তো তন্ময় করেনি। এত নিষ্ঠুর তো আর মিলি এমনি এমনি হয়ে যায়নি। তন্ময়ই এতটা নিষ্ঠুর হতে বাধ্য করেছে মিলিকে। মিলির ভেতরে থাকা কোমল-নরম হৃদয়টাকে একদম শক্ত পাথর বানিয়ে ছেড়েছে। তন্ময়ের প্রতি মিলির সীমাহীন ভালোবাসাকে তন্ময় নিজেই ধীরে ধীরে নিজের কর্মের দ্বারা ঘৃণায় পরিণত করেছে অথচ আজ মিলির নিষ্ঠুরতার জন্য তন্ময় আবার সেই মিলিকেই দায়ী করছে। কি অদ্ভুত!
তবে শুধু যে মিলিকে দায়ী করছে এমনটা নয়, তন্ময় নিজেও নিজেকে দায়ী করছে। এইতো বালিশটার দিকে তাকালেই দেখা যাচ্ছে পুরো বালিশটা ভিজে আছে। সারারাত অঝোরে শুধু দুচোখের পানি পড়েছে। তন্ময় অনেকবার নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করেছে তবে সামলাতে পারেনি।
এভাবে কাঁদার অভ্যাস খুব একটা নেই তন্ময়ের। বড় হওয়ার পর জীবনে বোধহয় দুবারই এমন হাউমাউ করে কাঁদলো। সেই প্রথম মিলিকে হারানোর ভয়ে কেঁদেছিল আর আজ আবারও মিলিকে একেবারে হারিয়ে কেঁদেছে। এছাড়া তন্ময় কখনো আর এতটা অসহায় ভাবে কাঁদেনি।
তন্ময়ের মনে হলো মিলির অনেক ক্ষমতা। যে ছেলেটা কখনো কাঁদে না তাকে পর্যন্ত দু দুবার কাঁদিয়ে ছাড়লো, অসহায় বানিয়ে ছাড়লো। মিলির ভালোবাসাটা সত্যিই খুব সুন্দর ছিল, খুব জোর ছিল মিলির ভালোবাসাতে। সেজন্যই তো নিজের ভালোবাসাকে হারানোর বদলে মিলির বলা প্রত্যেকটা কথা ফলেছে। তন্ময় সুখে নেই, তন্ময় জীবন থেকে সব হারিয়েছে। তন্ময়ের তথাকথিত জেসি নামল ভালোবাসা হারিয়ে গেছে আর সেই সাথে তন্ময় হারিয়ে ফেলেছে নিজের জীবনের সত্যিকারের সুখ নিজের স্ত্রী আর সন্তানকে।
নিজের ভাবনার মাঝেই আবারও তন্ময়ের গাল বেয়ে কয়েক ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। তন্ময়ের মাঝে সেই অশ্রু গুলো মোছার কোন তাড়া দেখা গেল না, কারো থেকে আড়াল করার তাড়াও দেখা গেল না। কেউ তো নেই তবে এত তাড়া দেখিয়ে কি হবে?
“এভাবে বসে আছো কেন তন্ময়? মাথা ব্যথা করছে?”
হঠাৎ করে মিলির কণ্ঠস্বর কানে এলো তন্ময়ের। চমকে উঠল সে। পাশে তাকাতেই দেখল মিলি বসে আছে। বিস্ময়ে তন্ময়ের চোখ কপালে উঠে গেল। অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“মিলি তুমি এখন এখানে?”
মিলি ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“আমি এখানে থাকবো না তো কে থাকবে হ্যাঁ? তোমার পাশে তো আমারই থাকার কথা চিরকাল তাই না?”
তন্ময় আবার অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“সত্যি তুমি এসেছো? সত্যি তুমি আমার পাশে থাকবে চিরকাল? আমি ভুল দেখছি না তো মিলি?”
মিলি একটু ভাবনা চিন্তা করে বলল,
“ভুল দেখার কি আছে?”
“এর আগেও তুমি অনেকবার এসেছো আমার সামনে কিন্তু কখনো আমি তোমায় ছুঁতে পারিনি। ছুঁতে গেলেই তুমি উধাও হয়ে গেছো। এবারেও তেমনটা হবে না তো? আমি আবার তোমাকে হারিয়ে ফেলবো না তো?”
মিলি আলতো হেসে বলল,
“এমন কাজ করো কেন তন্ময় যাতে তোমায় আমাকে বারবার হারিয়ে ফেলতে হয়? নিজের জীবন থেকে তো সরিয়ে দিয়েইছো তবে কল্পনায় যখন আমি আসি তখনো কেন আমাকে হারিয়ে ফেলার মতন কাজ করো?”
তন্ময় অসহায়ের ন্যায় কেঁদে উঠে বলল,
“আমি খুব খারাপ মিলি। আমি কখনো তোমার যত্ন করতে পারিনি, কখনো তোমায় আগলে রাখতে পারিনি। এখনও প্রত্যেক পদে পদে ভুল করছি। আজ যখন আমি নিজের ভুলগুলো বুঝতে পারছি তখন তোমার হৃদয় এতটাই কঠিন হয়ে গেল যে তুমি চলে যাওয়ার আগে আমার দিকে একবার ফিরেও তাকালে না।”
“আমি তো চলে যাইনি, তুমি আমায় চলে যেতে বাধ্য করেছিলে। আমি তোমায় বলেছিলাম যে তুমি আফসোস করবে।”
“তাহলে, তাহলে এখন ফিরে এসো তুমি আমার কাছে। আমি জানি আমি খুব খারাপ, আমি খুব জঘন্য একটা মানুষ তবুও বলবো ফিরে এসো আমার কাছে। তুমি দেখো আমি তোমায় ছাড়া কাউকে কখনো গ্রহণ করতে পারিনি। আমি তোমার ছিলাম, তোমারই আছি মিলি আর তোমারই থাকবো। তুমি শুধু আর একবার আমার হয়ে যাও। তুমি দেখো এবারে আমি তোমাকে একদম প্রথম যতটা ভালোবাসতাম তার থেকেও অনেক বেশি ভালোবাসবো।”
মিলির ঠোঁট থেকে এবার হাসিটা উড়ে গেল। চোখ মুখে সন্দেহী ভাব ফুটিয়ে তুলে প্রশ্ন করলো তন্ময় কে,
“কিন্তু তন্ময় তুমি কি কখনো আমায় ভালোবেসে ছিলে? যদি কখনো ভালো নাই বেশে থাকো তবে এখন ফিরে এলে আমাকে আরো বেশি ভালোবাসবে কি করে?”
তন্ময় এবারে তাড়াহুড়ো করে জোর গলায় বলল,
“আমি ভালোবেসেছি তোমায় মিলি। আমি তোমায় এখনো ভালোবাসি। শুধুমাত্র সাময়িক মোহের পিছনে ছুটে আমি জীবনে অনেক বড় ভুল করেছিলাম তার আফসোস আমার আছে মিলি।”
মিলি এবারের শব্দ করে হেসে উঠলো। এভাবে হাসতে তন্ময় মিলিকে কখনো দেখেনি। মিলি হেসেছে শব্দ করে তবে তন্ময়কে কটাক্ষ করে কখনো হাসেনি। মিলির হাসি যেন তন্ময়কে বোঝাচ্ছে যে তন্ময়ের বলা প্রত্যেকটা কথা মিথ্যে।
নিজের হাসি থামিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক গলায় মিলি তন্ময় কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তুমি বলেছিলে, তুমি জেসিকে ভালোবাসো। আজ যদি তোমার জেসির প্রতি ভালোবাসা মোহ হয়ে যায় তবে আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা যে মোহ ছিল না সেটা কি করে বলবো?”
তন্ময়ের মাঝে আবার সেই পুরনো অস্থিরতা জেগে উঠলো। কি করে মিলিকে বোঝাবে যে তন্ময় মিলিকে ভালোবেসেছে? জেসির সাথে মিলির তুলনা হয় না। জেসি আলাদা, মিলি আলাদা। মিলির ভূমিকা তন্ময়ের জীবনে অনেক। জেসির কথা তো এখন ভুলেও একবার মনে হয় না বরং ঘৃণা আসে। আর সারাটা দিন কেটে যায় তন্ময়ের মিলির কথা ভাবতে ভাবতে। রাতে ঘুমোতে গেলেও মিলির কথা মনে হয়, স্বপ্নেও মিলিকে দেখে তবে কি করে জেসির সাথে মিলির তুলনা হয়? মিলির কথা মনে হলে তো তন্ময়ের ঘৃণা হয় না বরং দুচোখ বেয়ে শুধু অশ্রু গড়িয়ে পড়ে, আফসোস হয়, নিজের প্রতি রাগ হয়। তবে কেন আজ মিলি জেসির প্রতি তার মোহের সাথে মিলির প্রতি তার ভালোবাসার তুলনা করছে?
তন্ময় মিলিকে জড়িয়ে ধরে কিছু বোঝাতে চাইলো তবে ছুঁতে পারল না। ছুঁতে গেলেই চোখের সামনে থাকা মিলির অস্তিত্ব হাওয়া হয়ে গেল।
তন্ময় চমকালো। পুরো ঘরে চোখ বোলালে মিলিকে খোঁজার উদ্দেশ্যে তবে কোথাও মিলি নেই। বিছানা থেকে উঠে রান্নাঘরে গেল, ওয়াশরুম চেক করল, বারান্দায় গেল কিন্তু কোথাও মিলি নেই। কোথায় গেল এত তাড়াতাড়ি মিলি? এইতো একটু আগেই ছিল এখানে। বেশ অনেকবার মিলির নাম ধরে চেঁচালো, অনেক বার করে ডাকলো মিলি কে, অনুরোধ করলো আর একবার ধরা দিতে তবে মিলি আর এলো না।
তন্ময় বুঝল আজ আবারো নিজের ভুলের কারণে তন্ময় মিলিকে হারিয়ে ফেলেছে। কি দরকার ছিল ছোঁয়ার চেষ্টা করার? জানেই তো ছুঁতে গেলেই মিলি হারিয়ে যায় তবে কেন আবার ছুঁতে চাইলো? বারবার তন্ময় ভুল করে। এক জীবনে আর কত ভুল করবে, আর কত আফসোস বাড়াবে!
মাথাটা যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে। ওয়াশরুমে গিয়ে শাওয়ার চালু করে হাঁটুতে মুখ গুঁজে মেঝেতে বসে পড়ল। ঝর্ণার পানি আর চোখের পানি দুটো এক হয়ে গেল। তন্ময় নিজের ভুলগুলোকে চোখের পানি আর ঝর্ণার পানিতে ধুঁয়ে মিটিয়ে ফেলতে চাইল, আফসোসগুলোকে ধুঁয়ে ফেলতে চাইলো তবে তা আর কিছুই সম্ভব না।
এই আফসোস গুলো একদম হৃদয়ে গেঁথে গেছে। সারা শরীর ধীরে ধীরে সেই আফসোসের বি'ষে ভরে উঠছে, যন্ত্রণায় ছটফট করছে তন্ময়। এভাবে কতক্ষণ তন্ময় বসে বসে কাঁদলো তার হিসেব তন্ময়ের নিজেরই জানা নেই। বেশ অনেকক্ষণ পরে আবারো হঠাৎ করে যেন মিলির কন্ঠে কানে ভেসে এলো।
“এভাবে ভিজো না তন্ময়। জ্বর এলে তোমার সেবা করার জন্য আমি নেই। জোর করে ওষুধ খাওয়ানোর জন্য আমি নেই। উঠে এসো। তোমাকে বাঁচতে হবে। তোমার আফসোসগুলো নিয়ে তোমায় অনেকদিন বাঁচতে হবে।”
তন্ময় মাথা তুলে তাকালো তবে এবারও বরাবরের মতন কোথাও মিলির অস্তিত্ব টের পেল না। তবে কথাগুলো তন্ময় স্পষ্টই শুনেছে যেন মিলি বলছিল ওকে কথাগুলো। তবে দেখতে পাচ্ছেনা। আবারও কয়েক ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো তন্ময়ের গাল বেয়ে। আনমনে বিড়বিড় করে বলল,
“কত কঠিন হয়ে গেছো তুমি মিলি? আমাকে বাঁচতে বলছো আফসোস করার জন্য?”
_________
বাসস্ট্যান্ডে নামতেই মিলি তাকদীরকে দেখতে পেল। চমকালো মিলি। তাকদীরের তো আসার কথা ছিল না তবে কি করে খোঁজ পেল এই ছেলেটা যে মিলি রাতের বাসের রওনা দিয়েছিল? এগিয়ে গিয়ে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“তুমি এখানে কি করছো?”
তাকদীর আগেই মিলির প্রশ্নের কোন উত্তর দিল না। মিলির কোল থেকে ঘুমন্ত অয়নকে কোলে নিল। একটু নড়ে চড়ে উঠলো অয়ন। দু গালে আলতো করে দুটো চুমু খেয়ে অয়নের ঘুমন্ত মাথাটা কাঁধের উপর ফেলে মিলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কি ভেবেছিলেন আমি গা'ধা?”
“গা'ধা ভাবার কি আছে?”
“গা'ধা না ভাবলে কেন বললেন যে আপনি আজ সকালের বাসে রওনা দেবেন? আমি আপনার ভাইয়াকে কল করেছিলাম উনি বলেছেন যে আপনি রাতের বাসেই রওনা দিয়েছেন। আমার বেলা এত ষড়যন্ত্র করেন কেন?”
মিলি বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
“এখানে ষড়যন্ত্রের কি দেখলে তুমি?”
“এটাকে তো ষড়যন্ত্রই বলে। আমাকে বাসস্ট্যান্ডে আসতে দিতেন না সেইজন্যই তো ষড়যন্ত্রটা করেছেন আপনি।”
“একদম ঠিক বলেছো। আমি চাইনি তুমি আসো। বুঝতে যখন পেরেছিলে তারপরেও এসেছো কেন?”
“আপনার জন্য আসিনি, অয়নকে নিতে এসেছি।।”
মিলি বেশ স্বাভাবিক বলায় বলল,
“ঠিক আছে তাহলে তুমি অয়নকে নিয়ে যাও আমি আসছি পরে।”
“অদ্ভুত তো! এসেছি যখন একা ওকে নিয়ে যাব কেন? হ্যাঁ মানছি অয়নকে নিতে এসেছি তাই বলে কি অয়নের মা কে এভাবে একা একা ফেলে দিয়ে যেতে পারি? যতই হোক অয়নের মা আমার….. সিনিয়র আর কি।”
মিলি চোখ গরম করে তাকিয়েছিল তাকদীরের দিকে যার ফলে মিলির পরিচয়টা ওকে সিনিয়রই বলতে হলো। অন্য কিছু বলার সাহস হলো না। সবেমাত্র এসেছে। এখনই মাথাটা গরম করে দেওয়া ঠিক হবে না।
আপাতত এইসব আজেবাজে কথা পাশে রেখে একবার ভালো করে মিলিকে দেখে নিল তাকদীর। দুটো দিনেই কেমন চোখ মুখ শুকিয়ে গেছে মিলির। মনে হয় অনেক বেশি ঘোরাফেরা করেছে রোদের মাঝে সেজন্য এই অবস্থা। তাকদীর একটু রাগান্বিত ভাব নিয়ে বলল,
“আমি বকা দেওয়ার জন্য ছিলাম না অমনি আপনি নিজের অযত্ন করা শুরু করে দিয়েছেন তাই না? একবার দেখেছেন নিজের চোখ মুখের অবস্থা? রসগোল্লার মত মুখটা তো শুকিয়ে গেছে।”
মিলি জোর করেও নিজের হাসিটা চেপে রাখতে পারল না। তাকদীরের মুখ থেকে রসগোল্লা ডাকটা শুনলেই কেমন যেন ভিতর থেকে আপনা আপনি হাসি বেরিয়ে আসে। মিলি অনেকবার চেষ্টা করেছে হাসি আটকানোর তবে সফল হতে পারেনি। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। হেসে দিয়ে বলল,
“এই রূপ, সৌন্দর্য দিয়ে কিছু যায় আসে না। কেউ দেখেনা এগুলো। আমিও এখন আর এগুলোর দিকে নজর দেই না।”
“আচ্ছা ঠিক আছে নজর দিতে হবে না। এমনিতেও আমার এসবে কিছু যায় আসে না।”
মিলি আবারো আলতো হেসে বলল,
“তোমার যায় আসাতে আমার কিছু যায় আসে না।”
তাকদীর চোখ ছোট ছোট করে মিলির দিকে তাকালো। ইচ্ছে করলো অনেক কিছু বলতে কিন্তু কিছু বলতে পারলো না মুখ ফুটে। সেই সাহসটা ঠিক হয়ে উঠল না। গম্ভীর গলায় বলল,
“চুপচাপ চলুন।”
কথাটা বলে আজকেও মিলির হাত থেকে জোর করে ব্যাগটা কেড়ে নিল। আগে আগে গিয়ে একটা অটো দাঁড় করিয়ে মিলিকে আগে উঠিয়ে দিয়ে তারপরে নিজে উঠে পড়ল।
সারা রাস্তায় তাকদীর অনেক কিছুই বলল, মিলিকে দিয়েও অনেক কিছু বলানোর চেষ্টা করলো তবে খুব একটা কাজ হলো না। শুধু প্রশ্ন করলে উত্তর দিল, মিলি পাল্টা কিছুই বলল না। কিন্তু তাকদীরের তো ইচ্ছে করছে এখন দীর্ঘ কথোপকথন চালাতে। চুপচাপ থেকে মিলির কন্ঠ শুনতে ইচ্ছে করছে।
অনেক ভাবনা-চিন্তার পর তাকদীর একটা প্রশ্ন পেল।
“সিনিয়র, এই দুদিন ঢাকায় কি কি করলেন? কেমন কাটলো দুটো দিন? কোথায় কোথায় ঘুরলেন, কোন কোন পরিচিতদের সাথে দেখা হলো?”
তাকদীরের প্রশ্নটা শুনতেই মিলির মনে পড়লো তন্ময়ের কথা। অত বড় শহরে অত পরিচিত মানুষের ভিড়ের মাঝে একটা দিনেই দু দুবার তন্ময়ের সাথে দেখা হলো। কি অদ্ভুত দুটো পরিস্থিতি তৈরি হলো। যে তন্ময় কে ছেড়ে এসেছিল আর এবার গিয়ে যে তন্ময় কে দেখল কত পার্থক্য তাদের মাঝে।
মিলিকে ভাবনার জগতে ডুবে থাকতে দেখে তাকদীর আবারো বলল,
“কি হলো সিনিয়র বলবেন না?”
মিলির ধ্যান ভাঙলো। সামান্য একটু হাসার চেষ্টা করে বলল,
"ভাগ্য আমার ভীষণ অদ্ভুত জানো তো তাকদীর। জানো যাদেরকে আমি ছেড়ে এসেছিলাম, যাদের থেকে আমি দূরে থাকতে চেয়েছিলাম ঐ শহরে যাওয়ার পর তাদের সাথেই আমার ঘুরে ফিরে দেখা হয়েছে। আমি কখনো ভাবিনি যে ওই মানুষগুলোর সাথে আমার আবারও দেখা হবে, তবে হয়েছে। আর খুব অদ্ভুতভাবে তারা সবাই আজ নিজেদের জীবনে অসুখী।”
তাকদীর প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কার কথা বলছেন?”
“আমার প্রাক্তন স্বামীর কথা আর আমার সেই প্রাক্তন স্বামীর প্রাক্তন প্রেমিকার কথা বলছি। জানো আমি আজ আমার জীবনে বেশ ভালো আছি তবে ওরা কেউ ভালো নেই। আমার জীবনে কোন আফসোস নেই, কোন অনুশোচনা নেই তবে ওদের গোটা জীবনটাই অনুশোচনায় ভরা। আমার মাথার ওপর কারো জীবন নষ্ট করার দায় নেই কিন্তু ওদের মাথার উপর আমার আর আমার সন্তানের জীবন নষ্ট করার দায় আছে। যে দায় নিয়ে ওদের সারা জীবন বাঁচতে হবে। আর একটা ভীষণ অদ্ভুত বিষয় কি জানো?”
“কি?”
“ওরা আমার সাথে যে যে অন্যায় করেছে আজ ওদের সাথে ঠিক সেই একই অন্যায়গুলো হয়েছে। একেই কি বলে প্রকৃতির নেওয়া প্রতিশোধ? আমি আমার সাধ্যমত যতটুকু যা শাস্তি দেওয়া সম্ভব আমি তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি তবে জানো দিন শেষে সব থেকে বড় শাস্তিটা আল্লাহই দেয়। সব থেকে বড় শাস্তি হচ্ছে নিজের আত্মপলব্ধি।”
“আপনি ঠিক আছেন?”
তাকদীরের কন্ঠে তীব্র সংশয় প্রকাশ পেল। চোখ দুটো ভীষণ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো। খুব ভালোভাবে মিলির অভিব্যক্তি বোঝার চেষ্টা করছে তবে মিলির মাঝে খুব বেশি কিছু পরিবর্তন দেখা গেল না। ভীষণ অদ্ভুতভাবে একটু হাসলো যেন সেই হাসির দ্বারাই তাকদীর কে বোঝাতে চাইলো যে মিলির কি হবে। যেন বলতে চাইলো,
“আমার জীবনে কি হওয়ার বাকি আছে? ধ্বংস হওয়া একটা মানুষকে আবার নতুন করে কি ধ্বংস করা যায়? যে ভিতর থেকেই ম'রে গেছে, যার মনটাই ম'রে গেছে তাকে কি আবার নতুন করে মা'রা যায়? তাকে কি আবার বাঁচিয়ে তোলা যায়? তবে কি হবে আমার? কেন ঠিক থাকবো না?”
কথাগুলো মনে মনেই বলল মিলি। তাকদীরের দিকে তাকাতেই দেখলো উত্তরের অপেক্ষা করছে। মিলি একটু হেসে বলল,
“নতুন করে আমার সাথে ঘটার মতন কিছুই নেই তাকদীর। যদি আমি তন্ময়ের সেই বদলে যাওয়া রূপটা সহ্য করে সবকিছু ছেড়ে চলে আসতে পারি তবে আমাকে নিয়ে আর ভাবার কিছুই নেই। এবারে তন্ময়ের আবার বদলে যাওয়া রূপটা দেখে বলতে পারো আমার আত্মতৃপ্তি হয়েছে। আমি শান্তি পাচ্ছি ওকে আফসোস করতে দেখে। ও আমাকে যত কষ্ট দিয়েছে তার থেকে অনেক বেশি কষ্ট ও পাবে। এখন তো আমার চোখের জল প্রায় শুকিয়ে এসেছে কিন্তু তন্ময় কেবলমাত্র কাঁদতে শুরু করেছে। আর ওর এই কান্নাটা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত থামবে না।”
তাকদীর হাসলো। একদম মুগ্ধ করার মতন হাসি যাকে বলে। ছেলেটা হাসলে ভীষণ সুন্দর দেখায়। তবে মিলির বোধহয় কখনো সেসব খেয়াল করা হয়নি। তাকদীর খুব মিষ্টি করে হেসে ঝরঝরে গলায় বলল,
“আপনি খুশি থাকলেই আমি খুশি। আপনাকে খুশি দেখলে আমার ভীষণ ভালো লাগে।”
মিলি তাকালো তাকদীরের দিকে। কিছুক্ষণ নীরবতার সহিত খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলো। মিলির দৃষ্টিটা হঠাৎ করে কেমন যেন অসহায় হয়ে উঠল। কিছু বোঝাতে চাইলো তাকদীর কে তবে বোঝাতে পারলো না।
দৃষ্টির অসহায়ত্বটা এবার মিলির কন্ঠে নেমে এলো।
“কিছু পাওয়ার আশায় আমার সাথে সম্পর্ক রেখো না তাকদীর। আমি নিঃস্ব এক মানুষ। আমার কাছে তোমায় দেবার মতন কিছুই নেই বিশ্বাস করো। আমার ভেতরটা একদম ফাঁকা, কোন অনুভূতি কাজ করে না আজকাল আমার হৃদয়ে। আমার নিজের বলতে এখন শুধু আমার প্রাণ আর আমার ছেলেটাই আছে। এই ব্যতীত আমার আর কিছুই নেই।”
তাকদীর অল্প বিস্তর হেসে বলল,
“যে দুটো জিনিস আছে ওই দুটো জিনিসই না হয় আমার নামে করে দিন। এক আপনার প্রাণ আর দ্বিতীয় আপনার ছেলে। এই দুটোই নাহয় আমার হয়ে যাক।তবে তো আর কিছু লাগে না আমার।”