দিনটা শুক্রবার। অয়নকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে মিলি গেল রান্না ঘরে রান্না করতে। হঠাৎ করে কলিং বেল বেজে উঠলো। এই অসময়ে কে এলো এই নিয়ে মিলি ভাবনায় পড়ে গেল। পরক্ষণেই মনে পড়ে গেল তাকদীর ছাড়া আর কে আসবে? তার মাঝে আজ শুক্রবার, সকাল থেকে একবারও আসেনি ছেলেটা। নিশ্চয়ই এখন এসেছে। গ্যাসটা বন্ধ করে দিয়ে গিয়ে দরজা খুলল। তবে দরজা খুলে সামনে তাকদীরকে দেখলো না বরং অপরিচিত একজন বয়স্ক পুরুষকে দেখতে পেল।
মিলি প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কাকে চাই?”
মিলিকে দেখে ভদ্রলোক নিজেও থতমত খেয়েছেন। এখানে তো মিলির থাকার কথা ছিল না, অন্যদের থাকার কথা ছিল। তিনিও পাল্টা প্রশ্ন করলেন,
“এটা তাহরিমাদের ফ্ল্যাট না?”
“হ্যাঁ ওনারই বাড়ি তবে উনি এখানে থাকেন না।”
মিলি সামনের ফ্ল্যাটটা দেখিয়ে দিলো। ভদ্রলোক অপরাধী গলায় বললেন,
“ও আচ্ছা, দুঃখিত মা। আসলে ওরা আগে এই পাশে থাকতো তো সেজন্য আমি ভুল করে এসেছি।”
“আচ্ছা ঠিক আছে আঙ্কেল।”
ভদ্রলোক তাকদীরের ফ্ল্যাটে গিয়ে কলিংবেল বাজালো। মিলি আর সেখানে থাকার প্রয়োজন মনে করলো না। ভাবলো এর থেকে গিয়ে তাড়াতাড়ি অয়ন ঘুমিয়ে থাকতে থাকতে রান্নাটা সেরে নেবে। দরজাটা লাগিয়ে দু কদম বাড়াতে না বাড়াতেই তাকদীরের বিকট গর্জনের শব্দ কানে ভেসে এলো মিলির। মিলি কেঁপে উঠলো। তাড়াহুড়ো করে গিয়ে দরজা খুলল তাকদীরের চেঁচানোর কারণটা জানার জন্য।
দেখল ভদ্রলোক এখনো সামনে দাঁড়িয়ে আছে আর তাকদীর অগ্নিদৃষ্টি তে ওনার দিকে তাকিয়ে আছে।
মিলি এগিয়ে গিয়ে বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলল,
“কি হয়েছে? চেঁচাচ্ছো কেন?”
তাকদীরের কানে মিলির প্রশ্নটা গেল কিনা জানা নেই মিলির। কেননা সেই প্রশ্নের কোন উত্তর মিলি পেল না। তাকদীর পুনরায় সম্মুখে দাঁড়ানো ভদ্রলোক কে উদ্দেশ্য করে রাগান্বিত গলায় বলল,
“কোন সাহসে আপনি এখানে এসেছেন? ঢুকতে দিল কে আপনাকে আমার বাড়িতে?”
ভদ্রলোক আড়চোখে একবার পাশে দাঁড়ানো মিলির দিকে তাকালো। একটু অপমানিত বোধ করল বোধহয়। ধীর গলার তাকদীর কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তোমাকে দেখতে এসেছি। অনেকদিন হলো দেখা হয় না, কথা হয়না, ফোন দিলে ফোন ধরো না।”
“আপনার সাথে কি আমার দেখা-সাক্ষাৎ হওয়ার মতন কোনো সম্পর্ক আছে? আপনার সাথে ফোনে গল্প গুজব করার মতন কোনো সম্পর্কে আছে আমার? আপনার কি সাজে এখন এই ইচ্ছে গুলো মনের মাঝে পোষণ করে রাখা?”
তাহরিমা বেগম ছাদে গিয়েছিলেন কাপড় শুকোতে দেওয়ার জন্য। তাকদীরের চেঁচামেচির আওয়াজ ছাদে তার কান অব্দি গিয়েছে। তাড়াহুড়ো করে তিনি নেমে এসে সম্মুখে দাঁড়ানো ভদ্রলোক কে দেখে থমকে গেলেন। যে মানুষগুলো সব সময় বাইরে থেকে নিজেকে একটা শক্ত খোলোসে মুড়ে রাখেন কোন একটা নির্দিষ্ট মানুষের সামনে তারাও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাদের অনুভূতিগুলোও দুর্বল হয়ে পড়ে।
দৃষ্টিতে হাজারো প্রশ্ন সমেত বলে উঠলেন,
“তুমি এখানে কেন এসেছ?”
তাহরিমা বেগমের কন্ঠ কানে যেতেই আরিফুল হক পিছন ফিরে তাকালেন। অনেকগুলো দিন পর তাহরিমা বেগমকে দেখলেন। ওনার দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন,
“রিমা তুমি এসেছো। দেখো না তাকদীর আমার সাথে কেমন ব্যবহার করছে। আমি তো ওর বাবা বলো? তুমি বলো ওর কি আমার সাথে এই ব্যবহারটা করা ঠিক হচ্ছে?”
তাহরিমা বেগম আরিফুল হকের এত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কোন প্রয়োজন মনে করলেন না। সরাসরি গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“কেন এসেছো এখানে?”
আরিফুল হক চমকালেন। তাকদীরের থেকেই এমন ব্যবহারটাই তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না এর উপরে আবার তাহরিমা বেগমও এমন ব্যবহার করছেন। আজ অনেকগুলো দিন পর দেখা হলো ভেবেছিলেন হয়তো একটু ভালো ব্যবহার করবে। উনি তো শুধুমাত্র একটু দেখা করার জন্যই এসেছেন।
বিস্মিত গলায় বললেন,
“তুমি আমার সাথে এমন ব্যবহার কেন করছ রিমা? আমি তো শুধুমাত্র এসেছিলাম আমার ছেলের সাথে দেখা করতে।”
মিলি এবারে বুঝতে পারল আরিফুল হকের পরিচয়। তবে ইনিই তাকদীরের বাবা। আর ঠিক এই কারণেই তাকদীর এভাবে রেগে গিয়েছে।
মিলি একবার তাকদীরের দিকে তাকালো। চোখ দিয়ে যেন অগ্নি বর্ষণ হচ্ছে ছেলেটার। খুব ভয়ংকর দৃষ্টিতে আরিফুল হকের দিকে তাকিয়ে আছে। আরিফুল হকের বলা শেষের কথাটা একদম অপছন্দ হলো তাকদীরের। আবারও হুংকার দিয়ে বলে উঠলো,
“আমি শুধু মাত্র আমার আম্মুর ছেলে। আর কারোর আমাকে নিজের সন্তান বলে দাবি করার কোনো অধিকার নেই। আম্মু তুমি ওনাকে চলে যেতে বলো।”
তাহরিমা বেগম এবার আরিফুল হক কে উদ্দেশ্যে করে বললেন,
“শুনলে তো যাকে ছেলে হিসেবে দাবি করছিলে তার মন্তব্য কি? চলে যাও এখান থেকে। অযথা আমাদের জীবনে কোন অশান্তি তৈরি করো না।”
“আমি কোন অশান্তি করতে আসিনি রিমা। আমি এসেছি একটা দরকারে সেটা বলেই চলে যাব । তুমি জানো আমার আলাদা সংসার আছে। আমি এখানে থাকতে আসিনি।”
কত অনায়াসে বলে দিল আলাদা সংসার আছে। তাহরিমা বেগমের এখন অবশ্য আর খারাপ লাগেনা। সেই আলাদা সংসারের জন্যই তো আজ তার সংসারটা নেই। বরং তাচ্ছিল্য গলায় বলল,
“তুমি ভাবলে কি করে তুমি থাকতে চাইলেই তোমাকে এখানে থাকতে দেওয়া হবে? আর তোমার যতই দরকার থাকুক না কেন আমার কিংবা আমার ছেলের তোমার সাথে কোন দরকার নেই। বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে।”
আরিফুল হক বুঝলেন তাহরিমা বেগমকে বলে কোন লাভ হবে না। তাকদীর কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“তাকদীর একবার আমার কথাটা শোনো। আমার কথাটা বলা হয়ে গেলেই চলে যাব।”
তাকদীর হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রন করে আরিফুল হক কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ঠিক আছে বলুন দেখি আপনার কি দরকারি কথা। মনে রাখবেন আপনার সেই দরকারি কথা বলার সাথে সাথে আপনি এখান থেকে চলে যাবেন।”
যাক ছেলে যে অন্তত তার কথা শুনতে রাজি হয়েছে এই যথেষ্ট।
“দেখো তাকদীর তোমার বাবার এক সময় হয়তো টাকা-পয়সার সমস্যা ছিল কিন্তু এখন সে আর্থিক ভাবে সচ্ছল। আমার বয়স হয়েছে তাই আমি আমার সম্পত্তি আমার ছেলে মেয়েদের মাঝে ভাগ করে দিতে চাই।”
“তো?”
“তুমি ছাড়া আমার আরেকটা মেয়ে আছে। আমি শুধু আমার মেয়ে নামে সব সম্পত্তি দিতে চাই না। আমার সম্পত্তিতে তোমারও অধিকার আছে তাই আমি চাই তোমাদের দুজনের নামেই সম্পত্তি লিখে দিতে।”
তাকদীর রাগান্বিত গলায় বলল,
“লাথি মা'রি আপনার সম্পত্তি রে। যে মানুষটা আমার মায়ের চোখের জলের কারণ, যে মানুষটা আমার মায়ের জীবনের খুশি কেড়ে নেওয়ার কারণ, যে মানুষটা কেবলমাত্র আমার মাকে দুঃখই দিয়ে গেছে তার সম্পত্তি আমি নেব আপনি ভাবলেন কি করে? আর কিসের আপনার সন্তান? আমি বলেছি না আমি শুধুমাত্র আমার আম্মুর ছেলে?”
“তাকদীর বোঝার চেষ্টা করো….”
তাকদীর হাত উঠিয়ে আরিফুল হক কে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“আমি আর কিছু বুঝতে চাই না। আপনার যা দরকারি কথা ছিল সেটা আপনি বলে দিয়েছেন কিন্তু আপনার দরকারি কথা আমার কাছে একটা ফালতু কথার সমান। এখন আসতে পারেন।”
“আমার কথা এখনো শেষ হয়নি।”
“তবে আমার আপনার কথা শোনার ধৈর্য শেষ হয়েছে। আপনি যাবেন না তো ঠিক আছে দাঁড়িয়ে থাকুন। আম্মু ভিতরে এসো আমি দরজা বন্ধ করব। আর মিলি আপনি আপনার ফ্ল্যাটে গিয়ে দরজা বন্ধ করুন। যদি কেউ নক করে খুলবেন না। এসব আজেবাজে অনেক মানুষ আসবে তাদের জন্য অযথা কষ্ট করে আপনাকে দরজা খুলতে হবে না।”
মিলি মিনমিনে কন্ঠে তাকদীরকে উদ্দেশ্য করে বললল,
“একটু শান্ত হও। এত চেঁচামেচি করো না।”
“ক্ষমা করবেন আপনার এই অনুরোধটা আমি রাখতে পারলাম না। সামনে যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে ওনাকে দেখে আমার পক্ষে শান্ত থাকা সম্ভব না।”
আরিফুল হক বুঝলেন তিনি যতই চেষ্টা করুন না কেন ছেলেকে কোনমতেই রাজি করাতে পারবেন না। যাওয়ার আগে শেষবার তাহরিমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“ছেলেটার কানে আমার নামে এত বি'ষ ঢেলেছো রিমা যে আমাকে সহ্যই করতে পারছে না? এটা কিন্তু তুমি ঠিক করনি।”
তাহরিমা বেগম বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
“কি বললে আমি আমার ছেলের কানে তোমার নামে বি'ষ ঢেলেছি? আচ্ছা যদি ধরেও নেই যে বি'ষ ঢেলেছি তবে তো মিথ্যে কিছু বলিনি। নিজের কৃতকর্মের জন্য আজ যখন ছেলে তোমায় ঘৃণা করে তখন লজ্জা হচ্ছে? আগে হুশ ছিল না? আগে মনে হয়নি যে তোমার ছেলে একদিন বড় হবে?”
বলার মতন আর কিছু খুঁজে পেলেন না আরিফুল হক। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে চলে গেলেন। তাকদীর একবার তাহরিমা বেগমের দিকে তাকালো। বুঝতে চাইলো ওর মায়ের অবস্থা কেমন। তাহরিমা বেগমকে বেশ স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। তিনি চুপচাপ নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন যেই দরজা লাগানোর শব্দ তাকদীর আর মিলি দুজনের কান অব্দিই এলো।
তাকদীর দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। মিলির খারাপ লাগল ছেলেটাকে দেখে। তাকদীর কে এর আগে এতটা রাগতে কখনো দেখেনি মিলি। জানে তাকদীরের এত রাগের কারণটাও স্বাভাবিক। ছেলেটা নিজের মা কে বড্ড বেশি ভালোবাসে।
মিলি তাকদীরের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“চলে গেছেন উনি। এখন রাগটা কমাও।”
“উনি আমার আম্মুকে অনেক কষ্ট দিয়েছে। জানেন আমি ছোটবেলায় আমার আম্মুকে অনেক কাঁদতে দেখেছি। মাজে মাঝে গ্রামের মানুষজন যখন আমার আম্মুকে কথা শোনাতো তখন আমি আমার আম্মুকে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদতে দেখেছি। আমায় নিয়ে আমার আম্মুর একার লড়াই করা দেখেছি। বিশ্বাস করুন আমি কোনদিন ওনাকে ক্ষমা করতে পারব না।”
“কেউ তোমায় ক্ষমা করতে বলেনি। ক্ষমা করতে হবে না। তবে এখন শান্ত হও। আর ঘরে যাও, আন্টির সাথে কথা বলো। আন্টির এখন তোমায় দরকার।”
মিলির কথাটা গুরুত্বটা তাকদীর বুঝলো।
ঘরের ভেতরে যেতে নিয়ে আবার থেমে গেল। মিলির কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে তাকদীর মিলির হাতটা ধরল। খুব সাহসের বোধহয় প্রয়োজন হলো না। কেননা তাকদীর এখন অত কিছু ভাবার মতন পরিস্থিতিতেই নেই।
হঠাৎ করে তাকদীর এমন হাত ধরায় মিলি একটু চমকালো। তবে মিলি কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তাকদীর বলে উঠল,
“আমার আম্মু জীবনে যে যে পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়েছে আপনাকে আমি কখনো তেমন পরিস্থিতিতে দাঁড়াতে দেবো না। আপনার কোন লড়াইয়ে আপনি আর একা হবেন না। আমার আম্মুকে একা পেয়ে সমাজের মানুষজন যত আজেবাজে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে আপনার ক্ষেত্রে আমি সেই সুযোগটা কাউকে পেতে দেব না।”
কথাটা বলে তাকদীর ভিতরে চলে গেল। মিলি কতক্ষণ সেখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো। ছেলেটা কি সব বলে গেল? কোন লড়াইয়ে পাশে দাঁড়ানোর কথা বলল? মিলি কি করে ছেলেটাকে বোঝাবে যে তাকদীর আর বেশি সময় পাবেই না মিলির সাথে কাটানোর জন্য।
__________
কলেজ থেকে ফিরে নিজের ক্লান্ত শরীরটাকে নিয়ে মিলি আগেই নিজের ফ্ল্যাটে গেল না। এখনো তাকদীর আসেনি। বাড়ি ফিরতে নাকি আজ একটু দেরি হবে তাই ভাবলো এই সুযোগেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা তাহরিমা বেগমের সাথে মিটিয়ে নেয়া যাক। না হলে ছেলেটা বাড়িতে থাকলে মিলিকে কোনমতেই একা একা কথা বলার সুযোগই দেবে না।
কলিং বেল বাজালো মিলি। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই তাহরিমা বেগম দরজা খুলে দিলেন। মিলিকে দেখতেই মুখে হালকা হাসি ফুটিয়ে তুলে বললেন,
“কিছু বলবে?”
“আন্টি আপনার সাথে কিছু দরকারি কথা ছিল।”
“ও আচ্ছা। ভিতরে এসো তাহলে।”
“না ভিতরে যাওয়ার দরকার নেই। আমি এখানে থেকেই বলি। খুব বেশিক্ষণ লাগবে না।”
তাহরিমা বেগম মিলির কথাতেই সায় জানালেন।
মিলি খেয়াল করলো কথাটা বলতে গিয়ে ওর হৃদস্পন্দনের প্রতি বেড়ে যাচ্ছে। কেন যেন কথাটা বলতে মিলির একটু অসুবিধা হচ্ছে তবে বলতেই হবে। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে জোরপূর্বক ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“আন্টি সামনের মাসে আমি এই বাড়ি ছেড়ে দেব। আসলে কলেজ থেকে যাতায়াতে অনেকটা দূরে হয়। রোজ রোজ এতটা রাস্তা যাতায়াত করতে খুব অসুবিধা হয়, ক্লান্ত লাগে ভীষণ। সেজন্য কলেজের কাছাকাছি একটা বাসা ভাড়া নিয়েছি। সামনের মাসে আমি ওখানে শিফট করবো তাই আপনাকে জানাতে এলাম।”
তাহরিমা বেগমের মুখ থেকে হাসিটা উড়ে গেল। থমথমে হয়ে উঠলে তার অভিব্যক্তি। তার ঠিক কি বলা উচিত বুঝে উঠতে পারলেন না। চোখের সামনে শুধু তাকদীরের মুখটা ভেসে উঠলো। তার পাগল ছেলেটা এই কথাটা শুনে যে কি করবে সেটাই তিনি ভেবে ভয় পাচ্ছেন। তাহরিমা বেগমকে চুপ করে থাকতে দেখে মিলি পুনরায় বলে উঠলো,
“কি হলো আন্টি কি ভাবছেন?”
তাহরিমা বেগম থমথমে গলায় বলেন,
“হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত? কোন অসুবিধা হচ্ছে এখানে তোমার?”
“না আন্টি কি অসুবিধা হবে? শুধু একটাই সমস্যা যাতায়াতের।”
“তাকদীর জানে?”
এ পর্যায়ে মিলির মুখ থেকেও হাসিটা আবার উড়ে গেলে। তবু খুব চটপট নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,
“না এখনো জানানো হয়নি। আপনি বরং ওকে জানিয়ে দেবেন। আর না হলে আমি জানাবো পরে।”
“তুমি যতটা স্বাভাবিক দেখাতে চাইছো এই বিষয়টা সত্যিই কি ততটাই স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে তোমার কাছে মিলি?”
মিলি এবারে আর ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও মুখ ভঙ্গি স্বাভাবিক রাখতে পারল না। ভীষণ ভাবনার মাঝে পড়ে গেল। মিলি নিজেও জানে এই বিষয়টা মিলির কাছে স্বাভাবিক হলেও তাকদীরের কাছে মোটেও স্বাভাবিক হবে না। তবে মিলির কিছু করার নেই।
চলে যাওয়ার ইচ্ছে তো আরো অনেক আগেই ছিল তবে বাসা ভাড়া পাচ্ছিল না। মেয়ে মানুষ একা একটা বাচ্চাকে নিয়ে থাকবে শুনে অনেকেই রাজি হয়নি। আর যারা বাসা ভাড়া দিতে রাজি হচ্ছিল তাদের ভাব-ভঙ্গি মিলির সুবিধার লাগছিল না। অনেকের চেহারা দেখেই মনে হচ্ছে তারা যেন এই সুযোগের অপেক্ষাই করছিল যে কবে মিলির মতন একা একটা মেয়ে তাদের বাড়িতে উঠবে আর তারা সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করবে।
মিলিকে চুপ করে থাকতে দেখে তাহরিমা বেগম ফের বলে উঠলেন,
“কি হলো মিলি বলো তোমার কাছে স্বাভাবিক লাগছে এই বিষয়টা? আমার ছেলে শুনলে ঠিক কি করতে পারে সে বিষয়ে কি তুমি আন্দাজ করতে পারছো?”
“আমি এখান থেকে চলে না গেলে আরো অনেক কিছু হবে আন্টি সে সব আন্দাজ করেই চলে যাচ্ছি। আরো আগে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল তবে সম্ভব হয়ে ওঠেনি।”
“কারণটা কি আমার ছেলে?”
মিলি আলতো হেসে বলল,
“না আন্টি কারণটা আমি নিজেই। আমার ভাগ্যে যতদিন এখানে থাকা লেখা ছিল আমি তো ততদিনই থাকতে পারব তাই না? এবার হয়তো অন্য কোথাও আমার ভাগ্যে থাকা লেখা আছে। তবে আপনাকে একটা অনুরোধ করার আছে, রাখবেন আন্টি?”
“কি?”
“আমি জানিনা আমি তাকদীর কে বোঝাতে পারবো কিনা এ বিষয়ে। যদি আমি ব্যর্থ হই তবে অনুরোধ রইল আপনার কাছে আপনি একটু বোঝাবেন। ও আপনার কথা ফেলবে না। ওর জীবনে আপনার গুরুত্ব অনেক বেশি। বলা যায় সবথেকে বেশি।”
“আর আমার সমান কিংবা আমার পরে যদি ওর জীবনে কারো গুরুত্ব থেকে থাকে তবে সেটা তুমি মিলি। হঠকারিতায় কোন সিদ্ধান্ত নিও না। জীবন কে দ্বিতীয় সুযোগ দিতে হয় মিলি।”
মিলি আবারো আলতো হেসে বলল,
“সবাই যে পারে না আন্টি। দেখুন আপনিও পারেননি। আপনিও জানেন জীবনকে দ্বিতীয় সুযোগ দেওয়া কতটা কঠিন কিংবা কারো কারো ক্ষেত্রে হয়তো অসম্ভব। আমিও পারিনি, পারছিনা আর পারবো না। শুধু এতোটুকু অনুরোধ থাকবে একটু বোঝাবেন ওকে যদি আমি ব্যর্থ হই তবে। আর আমি বোঝালে যদি বুঝে যায় তবে তো হয়েই গেল। এখন আসছি।”
কথাটা বলে মিলি চলে গেল। তাহরিমা বেগম থ হয়ে কিছুক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলেন। ছেলের কানে এই কথা গুলো এখনো যায়নি। কে জানে গেলে কি হবে। আচ্ছা তার মতন কি তার ছেলেটার মনও ভেঙ্গে যাবে?
………..
★★(বর্তমান)★★
“মিলি কি চলে গিয়েছিল ম্যাম? কেন চলে গেল ম্যাম? কি দরকার ছিল? গল্পের শেষে তো হিরো হিরোইনের মিল হয় তাই না? তবে ওদের মিল করিয়ে দিন না আপনি?”
নিজের এক ছাত্রীর কথা শুনে হেসে ফেলল রুবা। সবাই বোধহয় ভাবছে যে এটা একটা কাল্পনিক গল্প। তবে এটা যে বাস্তব কাহিনী সেটা বোধহয় কেউ এখনো আন্দাজ করতে পারেনি। অবশ্য করবে কি করে? রুবা তো গল্পটা বলেইছে এমন ভাবে যেন কেউ বুঝতে না পারে। তবে মনে হচ্ছে এখন ওদের কে জানানো উচিত যে গল্পটা কারো বাস্তব জীবনের। কারোর কল্পনার থেকে তৈরি না।
রুবা আলতো হেসে তার সম্মুখে বেঞ্চে বসা নিজের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আসলে চাইলেও এই গল্পের সমাপ্তি আমি আমার ইচ্ছামত দিতে পারব না।”
আবারো একজন ছাত্রী কৌতুহলপূর্ণ গলায় প্রশ্ন করলো,
“কিন্তু কেন ম্যাম? এটাতো গল্প আপনি তো চাইলেই নিজের মতন করে বানাতে পারেন।”
“উঁহু। এটা গল্প তবে কল্পনা না। এই গল্পের লেখক আমি নই, লেখক হলো সৃষ্টিকর্তা। এই গল্প লেখা হয়েছে ভাগ্যের পাতায়। কোনো সাদা কাগজে লেখা হয়নি যে আমি বদলাতে পারবো। এই গল্পের প্রত্যেকটা শব্দের মাঝে লুকিয়ে আছে এক মেয়ের অশ্রুর ছাপ। গল্পটা আমি লিখতে পারতাম যদি আমার হাতে কাগজ আর কলম থাকতো। তবে এই গল্প কারোর জীবনের হৃদয় ভাঙার গল্প যার প্রতিটা শব্দের মাঝে এক তীব্র হাহাকার খুঁজে পাওয়া যাবে।”
সবার কপালের মাঝে সুক্ষ্ম ভাঁজ সৃষ্টি হলো। এতক্ষণ তবে যা ভেবে এসেছিল সেসব সত্যি না?
এবারে তাদের কৌতুহল আরো বাড়লো। বেশ কয়েকজন একযোগে বলে উঠলো,
“ম্যাম তারপরে কি হলো? মিলি কি সত্যি চলে গিয়েছিল? তাকদীর আটকালো না কেন? ও কি ভালোবাসে না যে চলে যেতে দিল? ওর ভালোবাসাও কি তবে তন্ময়ের মত মিথ্যে ছিল? যদি সত্যি ভালোবাসতো তবে এভাবে ছেড়ে দিতেই পারতো না।”
ওদের কথার তীব্র বিরোধিতা করে রুবা বলল,
“ভুল বললে। তোমরা এখনো সম্পূর্ণ গল্প শোনোনি জন্য ভুল বললে। যদি কেউ ভালোবেসে থাকে তবে সেটা তাকদীরই বেসেছিল। ও নিজের সুখ, শান্তি, স্বস্তি সবকিছু বিসর্জন দিয়ে শুধু ভালোইবেসেছিল। তন্ময় নামক মানুষটা কখনো ভালোবেসে ছিল কিনা মিলিকে আমি জানিনা। তবে তাকদীর ভালোবেসে ছিল। নিজের সবটা দিয়ে ভালোবেসে ছিল।’
আবার একজন প্রশ্ন করে উঠল,
“তবে মিলি চলে গেল কি করে? যেতে দিল কেন ওকে?”
“চাইলেই যদি সব সময় সবাইকে আটকে রাখা যেত তবে কি মিলি তন্ময়কে আটকাতে পারতো না? তবে কি পরবর্তীতে তন্ময় মিলিকে আটকে রাখতে পারত না? যে যাওয়ার জন্য মনস্থির করে তাকে তুমি হাজার চেষ্টা করেও আটকাতে পারবেনা।”
কেউই আর কিছু বলতে পারল না তার আগেই বেল বাজার শব্দ হলো। সবাই একসাথে আর্তনাদ করে উঠে বলল,
“ম্যাম, গল্পটা পুরো শোনাবেন না?”
“আজ তো আর হবে না। সামনের দিন শোনাবো কেমন?”
একজন বসা থেকে উঠে কাতর গলায় বলল,
“সামনের দিন মানে আবার তো সেই রবিবারে ক্লাস। এই এক্সাইটমেন্ট নিয়ে ঘুমোবো কি করে? পড়াশোনাতেও মন বসবে না। অন্তত এতটুকু বলে যান মিলি আর তাকদীরের বিয়ে হয়েছিল কিনা?”
রুবা ডেস্কের উপর থেকে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বলল,
“গল্পের সমাপ্তি এখনো হয়নি, গল্পটা তো এখনো চলমান তবে তোমাদের কে শেষের ঘটনা বলি কি করে?”