“তুমি এখন এখানে কি করছো? তোমার তো এখন তোহার সাথে থাকার কথা তাকদীর।”
মিলির প্রশ্নের কোন উত্তর তাকদীর দিলো না। গা ছাড়া ভাব নিয়ে মিলিকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে চলে এসে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বসলো। মিলি এখনো ঠায় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ধ্যান ভাঙ্গলো তাকদীরের ডাকে।
“ভিতরে আসুন। এত রাতে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলে ভূত ধরবে কিন্তু।”
মিলি অবাক না হয়ে পারল না। দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে ভিতরে এসে বিস্ময় ভরা কণ্ঠে তাকদীর কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তুমি এখন এখানে কি করছো?”
“এমনি এসেছি।”
মিলি এবার রাগান্বিত গলায় বলল,
“এটা মজা করার সময় না তাকদীর। আমি তোমাকে একটা সিরিয়াস প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছি। তুমি এখানে কি করছো?”
“কিছু করার জন্য আসিনি, এমনি এসেছি।”
তাকদীরের এমন গা ছাড়া কথাবার্তায় মিলির রাগ আরো বেশি হচ্ছে। কেন এখানে এসেছে? কি করেই বা এখন এখানে এলো কিচ্ছু মাথায় আসছে না। তোহা কেমন আছে? আজ বিয়ের রাতে মেয়েটাকে একা ফেলে রেখে চলে এলো তাকদীর! এতটা দায়িত্ব জ্ঞান হীন হয়ে গেল ছেলেটা!
“তুমি এতটা দায়িত্ব জ্ঞানহীন কি করে হয়ে যেতে পারো তাকদীর? তোমায় তো আমি এমন ভাবিনি। তোমায় আমি বাকিদের থেকে আলাদা ভেবেছিলাম সেই তুমিও একটা মেয়ের দায়িত্ব নিয়ে তাকে এভাবে ছেড়ে চলে এলে? তোহা না জানি কত আশা নিয়ে বসেছিল তোমার জন্য আর তুমি এটা কি করলে?”
তাকদীর এবার বিরক্তিকর গলায় বলল,
“শুনুন আগে কথা শুনবেন, বুঝবেন তারপরে নিজের এসব আজেবাজে কথাগুলো বলবেন।”
মিলি পুনরায় রাগান্বিত গলায় বলল,
“এখানে বোঝার বা শোনার কি বাকি আছে তুমি আমায় বলো? আজ তোমার বিয়ে হয়েছে একজনের সাথে, আর তুমি তাকে ফেলে রেখে এখানে চলে এলে কোন আক্কেলে?”
তাকদীর একটা ধমক দিলো মিলি কে। মিলি কেঁপে উঠলো। এর আগে কখনো তাকদীর এতটা জোরে কথা বলেনি ওর সাথে। তাকদীর এবার ধমক দিয়ে নিজেই রাগান্বিত গলায় মিলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“একদম চুপ। আপনি জানেন আমাদের বিয়েটা হয়েছে কি না? না জেনে কেন এসব বলছেন? হয়নি বিয়ে।”
মিলির মাথায় যেন এবার আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। বলছে কি এই ছেলে? মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি? আজ তো বিয়ে হওয়ার কথা ছিল তবে হবে না কেন?
“কি আজেবাজে কথা বলছো এসব? বিয়ে হবে না কেন তোমাদের?”
তাকদীর আবারও সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বসলো। আলতো একটু হেসে বলল,
“জানেন তো সিনিয়র আমি ভেবেছিলাম আমার আম্মু হয়তো আমায় বুঝবে। আমি আমার আম্মুকে দোষ দিচ্ছি না। আমার আম্মু ভেবেছিলো এই বিয়ের মাঝে আমার সুখ আছে তবে সেটা আসলে ছিল না। আমার আম্মুর পরে যদি আমি ভাবি কেউ আমাকে বুঝবে তবে সেটা ছিলেন আপনি। তবে আপনিও বোঝেননি। তবে জানেন তো অপ্রত্যাশিতভাবে আমি যার থেকে কোনো রকম কোনো আশা রাখিনি সেই মানুষটা আমাকে বুঝেছে।”
মিলি প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কার কথা বলছো?”
তাকদীর আলতো হেসে বলল,
“তোহার কথা বলছি।”
“মানে? তোহা কি বুঝেছে?”
“ও আমার মনের কথা বুঝেছে, ও আমার খুশি বুঝেছে। ও আমাকে মুক্তি দিয়েছে সিনিয়র। ও আমায় জোর করে এমন একটা সম্পর্কে বাঁধে নি যে সম্পর্কটা সারা জীবন আমার গলার কাঁটা হয়ে থাকতো।”
মিলির মাথায় যেন কিছুই ঢুকছে না। একেই তো তাকদীরের এমন অপ্রত্যাশীত আগমন তার উপরে বলছে আবার বিয়ে হয়নি। তার উপর আবার তোহার এসব কথা। আসলে ঘটেছেটা কি আজ? সত্যি কি তাকদীর আর তোহার বিয়েটা হয়নি? তোহা কি সত্যি নিজের ভালোবাসা কে মুক্তি দিয়েছে?
মিলি তাকদীরের মুখোমুখি সোফায় বসে গুরুতর ভঙ্গিতে বলল,
“দেখো তাকদীর এটা মজা করার কোন বিষয় না, মজা করার সময়ও না। তুমি যা বলছো সেটা কি ভেবে বলছো? সত্যি তোমাদের বিয়ে হয়নি?”
“বিয়ে হলে আমি কি এখন এখানে থাকতাম?”
“আমার প্রশ্ন তো সেটাই। কিন্তু বিয়েটা হবে না কেন?”
“ওই যে বললাম তোহা আমায় মুক্তি দিয়েছে। জানিনা কেন, কি ভেবে ও আমায় মুক্তি দিল। তবে জানেন তো শেষ মুহূর্তে এসে ও আমার খুশির কথা ভেবে এই বিয়েটা ভেঙে দিয়েছে।”
“আর তুমি একবারও তোহার খুশির কথাটা ভাবলেনা?”
“এখানে ওর কোনো খুশিই নেই। যদি আমি বিয়েটা ওকে ভালোবেসে করতাম তবেই তোহা খুশি থাকতো। তবে আমি ওকে কখনোই ভালোবাসতে পারতাম না। আপনি আমাকে এ বিষয়ে যাই বোঝান না কেন আমি কখনোই আপনার সাথে এই বিষয়ে একমত হবো না যে বিয়েটা করলে তোহা ভালো থাকতো।”
মিলি মাথায় হাত ঠেকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“তবে এত কিছু করে কি হলো? কেউ তো সুখী হলো না।”
মিলির বিড়বিড় করে বলা কথাটা তাকদীরের কানে গেল। বসা অবস্থাতেই মিলির দিকে একটু ঝুঁকে এসে বলল,
“কে বলেছে কেউ সুখী হয়নি? আমরা তিনজনই সুখী হয়েছি।”
মিলি চমকে তাকালো তাকদীরের দিকে। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কি করে?”
“কেন আপনি তো আগে থেকেই দাবি করেন যে আপনি আপনার এই জীবনেই সুখী।”
“হ্যাঁ, আমি আমার এই জীবনে সুখী। কিন্তু তুমি আর তোহা? তোমরা কি করে সুখী হলে?”
“আমি বিয়ে না করার জন্য তোহা সুখী হবে। আপনি দেখবেন ওর বাবা খুব ভালো একটা ছেলের সাথে ওর বিয়ে দেবে।”
“আর তুমি?”
তাকদীর শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“আমার থেকে সুখী কাউকে পুরো পৃথিবীতে আর খুঁজে পাবেন নাকি আপনি? আমি সব থেকে বেশি সুখী সিনিয়র। আজ থেকে আমার জীবনে কোন বাড়তি ভাবনা রইল না, আমি আর কোন ভয়ের মাঝে থাকবো না। আজ থেকে আর আমার সেই ভালোবাসা ভুলে যাওয়ার কোন প্রয়োজন পড়বে না। আমি ভালোবেসেছি, আমি নিজের মাঝে আজীবন সেই ভালোবাসাটাকে বাঁচিয়ে রাখবো। বাদ বাকি কে আমার সেই ভালোবাসা কে গুরুত্ব দিল কি কি দিল না তাতে আমার কিছু যায় আসে না।”
“আর আন্টি? আন্টির কথা একবারও ভাবলে না?”
“আপনার কি মনে হয় আম্মুকে কষ্ট দিয়ে আমি এখানে আসতাম? মোটেও না। আমার আম্মু তো নিজেও বোধহয় শেষ মুহূর্তে এসে বুঝে গিয়েছিল আমার শান্তি কিসে। সেজন্যই তোহা ওর সিদ্ধান্তটা জানানোর পরে একবারের জন্য ওকে বোঝায়নি। আমি যখন গিয়ে বললাম যে আমি বাড়ি ফিরবো তখনও আমাকে বাধা দেয়নি।”
মিলি তাও সন্তুষ্ট হতে পারল না। মাথাটা কেমন ঘুরছে। সবকিছু গোলমাল হয়ে গেল।
“তুমি যাই বলো না কেন এই কাজটা তুমি ঠিক করোনি তাকদীর। তুমি আমার জীবনে একটা অতিরিক্ত চাপ এনে দিলে। তুমি আমাকে আজীবনের জন্য অপরাধী বানানোর ব্যবস্থা করে দিলে।”
“আপনি অপরাধী তবুও তো মুক্ত আছেন। তবে আমি যে ভালোবাসার কারাগারে বন্দি হয়ে গেলাম মিলি। এই বন্দিত্ব যে কখনো আমার পিছু ছাড়বে না। আর আমি হাসিমুখে এই বন্দিত্ব কে মেনে নিলাম। আমি আজ থেকে সারা জীবনের মতন এমন এক কারাগারে বন্দী হলাম যেই কারাগারেই আমার সুখ আছে।”
“আমার থেকে কিন্তু তুমি কষ্ট ছাড়া কিচ্ছু পাবে না।”
“আর কিছুর প্রয়োজনও নেই। আজ থেকে আপনার থেকে আমার আর কোন চাওয়া পাওয়া রইলো না। আমি ভুলে যাব সবকিছু। আপনাকে করা আমার মিনতি ভুলে যাবো, আমাকে করা আপনার উপেক্ষা গুলো ভুলে যাবো, আমাকে আপনার ছেড়ে আসা ভুলে যাবো, আমার আপনার কাছে থাকতে চাওয়ার আকুতিগুলো ভুলে যাব। শুধু মনে রাখবো আমাদের সেই প্রথম দিনের সিনিয়র জুনিয়র পরিচয়টা। বাদবাকি সব ভুলে যাব আমি।”
_________
হাসপাতালের করিডর দিয়ে এসে ওয়েটিং চেয়ারে তাকদীর কে বসে থাকতে দেখল মিলি। তাড়াহুড়ো করে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে চিন্তিত গলায় বলল,
“আন্টি কেমন আছে তাকদীর?”
মিলির কন্ঠ পেয়ে তাকদীর মাথা তুলে তাকালো। ধীর গলায় বলল,
“ঠিক আছে।”
“কি হয়েছে আন্টির?”
“বিপির সমস্যা হয়েছে। তার উপরে এক সপ্তাহ হলো জ্বর, কোনমতেই কমছে না। অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল।”
“দেখা করা যাবে আন্টির সাথে?”
“হ্যাঁ যাবে। ভিতরে আছে আম্মু।”
মিলি তৎক্ষণাত ভেতরে যেতে ধরলে তাকদীর বাধা দিয়ে বলল,
“অয়ন কে দিয়ে যান। ভিতরে গিয়ে কান্নাকাটি করলে নার্স চেঁচামেচি করতে পারে।”
তাকদীরের কথা মেনে নিল মিলি। অয়ন কে তাকদীরের কোলে দিয়ে ভিতরে গেল। গিয়ে দেখল তাহরিমা বেগম চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন। মিলি ভাবলো হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে।
পাশে গিয়ে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে একবার ধীর গলায় ডাকলো,
“আন্টি!”
একবার ডাকতেই তাহরিমা বেগম পিটপিট করে চোখ খুলে তাকালেন। মিলিকে দেখে মুখে হালকা হাসি ফুটিয়ে তুলে দুর্বল গলায় বললেন,
“তুমি কখন এসেছো মিলি?”
“এইতো এক্ষুনি এলাম আমি। তাকদীরের থেকে শুনলাম আপনি অসুস্থ তাই চলে এসেছি। এখন শরীর কেমন লাগছে আপনার আন্টি?”
“ঠিক আছি আমি, তুমি চিন্তা করো না। আমার ছেলেটা কোথায়? ওকে নিয়ে চিন্তা হচ্ছিল।”
“ও ঠিক আছে। বাইরে বসে আছে। আর ও কে নিয়ে চিন্তা করছেন কেন? আপনার ছেলেকে আপনি অনেক স্ট্রং তৈরি করেছেন। একদম আপনার নিজের মতন।”
তাহরিমা বেগম ধীর গলায় বললেন,
“কই আর স্ট্রং তৈরি করতে পারলাম বলো? সেই তো ছেলেটা আমার ভেঙ্গে পড়েছে। তোমরা চলে গেছো আজ কত মাস হয়ে গেল, তোহার সাথে বিয়েটা ভেঙে যাওয়ারও চার মাস হয়ে যাচ্ছে। ও দেখাচ্ছে নিজেকে স্বাভাবিক তবে আমি জানি ও কেমন আছে।”
মিলি মাথা নিচু করে ফেলল। তাহরিমা বেগম এর এই কথার প্রেক্ষিতে কোন সান্ত্বনা দেওয়া মিলির সাজেনা। কেননা তাকদীরের এই অবস্থার জন্য তো কোনো না কোনোভাবে মিলি নিজেই দায়ী।
মিলিকে মাথা নামিয়ে নিতে দেখে তাহরিমা বেগম বললেন,
“তুমি কি ভাবছো মিলি আমি তোমাকে দোষারোপ করছি? এমনটা না।”
মিলি অপরাধী গলায় বলল,
“কোন না কোন ভাবে তো আমি দোষীই আন্টি আপনার কাছে। যে ছেলেকে ভালো রাখার জন্য আপনি নিজের জীবনের সব সুখ বিসর্জন দিয়েছেন আজ আমার জন্য আপনার সেই ছেলে ভালো থাকতে পারছে না। যদি আমি আপনার কাছে দোষী হয়েও থাকি তবে অন্যায় কিছু নেই এতে।”
চুপ করে গেলেন তাহরিমা বেগম। কেন যেন ওনার নীরবতা মিলিকে কে বোঝালো মিলি যা ভাবছে তাই ঠিক। হয়ত তাহরিমা বেগমের কাছে মিলি দোষী। ওনার ছেলের জীবন নষ্টের জন্য দোষী।
মিলির অপরাধবোধ বাড়লো। মাঝে এই চার মাসে যদিও একটু হলেও অপরাধবোধ কমে গিয়েছিল তাকদীরে ব্যবহারের জন্য। এই চার মাস তাকদীর একদম স্বাভাবিক ব্যবহার করেছে। মিলির সাথে তো অত্যাধিক প্রয়োজন ছাড়া কোন কথাই বলেনি। কলেজে অয়নের সাথে দেখা হয়ে গেলে তো হয়েই গেল আর নাহলে মাঝে মাঝে বাড়িতে চলে আসতো। অয়ন কে দেখে আবার চলে যেত।
তবে মিলির সাথে তেমন একটা কথা বলতো না। মিলিও তাই ভেবেছিল হয়তো তাকদীর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। যত সময় গড়াবে তত নিজেকে স্বাভাবিক করে নিতে পারবে। তবে আজ কেন যেন তাহরিমা বেগমের কথা শুনে মনে হচ্ছে তাকদীর আজও সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। শুধু এখন আর নিজের কষ্টগুলো মিলির সামনে প্রকাশ করেনা, নিজের কোন দুর্বলতা, ইচ্ছে, স্বপ্ন কিছুই মিলি কে বলে না, পার্থক্য এতোটুকুই।
মিলির ভাবনার মাঝে তাহরিমা বেগম একটা প্রশ্ন করলেন।
“আমার ছেলের ইচ্ছেটা কে কি কোনমতেই পূরণ করা যায় না মিলি?”
মিলি চমকে উঠলো। মাথা তুলে তাহরিমা বেগমের দিকে তাকিয়ে দেখলো ওনার চোখের কার্ণিশ বেয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে। মিলির ভেতরটা অস্থির হয়ে উঠল। ব্যস্ত গলায় বলল,
“কাঁদছেন কেন আন্টি? শান্ত হন আপনার শরীর আরো খারাপ করবে।”
তাহরিমা বেগম মিলির হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে অনুনয়ের কন্ঠে বললেন,
“আমার ছেলেটাকে একটা সুযোগ দাও না মিলি! আমি এতদিন তোমায় এই বিষয়ে কিছু বলিনি কারণ আমি ভেবেছিলাম যে আমার ছেলেটা হয়তো এইসব কাটিয়ে বেরিয়ে আসতে পারবে। তবে এখন আমি বুঝে গেছি ও পারবেনা মিলি। ও নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করছে ঠিকই তবে তোমায় ছাড়া ধীরে ধীরে ও জীবন্ত লা'শে পরিণত হবে।”
“আন্টি প্লিজ আপনি শান্ত হোন।”
মিলি চাইলো এই কথাটা কে এড়িয়ে যেতে তবে তাহরিমা বেগম সেই সুযোগ দিলেন না। আরো বেশি অনুরোধ করে বললেন,
“আমার ছেলেকে আমি আমার শিক্ষায় বড় করেছি। ও জানে একজন মায়ের কষ্ট। ও বোঝে একজন হেরে যাওয়া মেয়ের কষ্ট কি। ও তোমায় কখনো ঠকাবে না মিলি। আমার জীবন আর কতদিনেরই বলো। কিন্তু আমি আমার ছেলেটাকে সুখী দেখতে চাই। তুমি তো নিজেই বললে ওর জন্য আমি আমার জীবনের সব সুখ বিসর্জন দিয়েছি তবে আজ আমার জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে সেই ছেলেটাকে আমি অসুখী রেখে যাই কি করে বলোতো? ওর তাে আমি ছাড়া কেউ নেই। কে খেয়াল রাখবে আমার পরে?”
মিলির চোখ দুটো ভিজে উঠলো। এক অপরাধ বোধে, দ্বিতীয় নিজের পাষণ্ড মনের জন্য। কেন পারছে না মিলি নিজেকে রাজি করাতে? তাহরিমা বেগমের এত অনুরোধের পরও কেন পারছেনা নিজেকে রাজি করাতে মিলি?
“আন্টি প্লিজ আমাকে এই অনুরোধটা করবেন না!”
“আমি ভিক্ষে চাইছি তোমার থেকে আমার ছেলের সুখ মিলি। আগে না হয় তুমি বিয়েতে মতটা দাওনি তোহার কারণে, আমার ভাইজানের কারণে ওরা তোমায় অনুরোধ করেছিল বলে। এখন দাও।“
মিলি বিস্ফোরিত নয়নে তাহরিমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি কি করে জানলেন?”
“তোহা বলেছে আমাকে। ও বলেছে আমাকে সব। আমি তোহার কথা শুনে বুঝতে পেরেছি তুমি কতটা চাপের মাঝে ছিলে এই বিষয়টা নিয়ে। সত্যি বলতে তখন তোমার জায়গায় আমি থাকলে তুমি যে সিদ্ধান্তটা নিয়েছো আমিও হয়তো সেই একই সিদ্ধান্তটা নিতাম কিন্তু এখন তো পরিস্থিতি বদলেছে। তোহারও বিয়ে হয়ে গেছে। তাকদীর তোমায় ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করতে পারবে না, তোমার জীবনেও আর কেউ নেই তবে নিজেকে একটা সুযোগ দাও মিলি। সেই সাথে আমার ছেলেটাকেও।”
মিলি এবার একটু শব্দ করে কেঁদে উঠে বলল,
“কেন আমার কাছে এই আবদারটা করছেন আন্টি? আপনাদের কাছে আমি চির কৃতজ্ঞ। কৃতজ্ঞতার বদলে কেন এটা চাইছেন আমার থেকে?”
“তুমি তো কাউকে ফিরিয়ে দাও না মিলি। না তোহা কে ফিরিয়ে দিয়েছো, না আমার ভাইজানকে ফিরিয়ে দিয়েছো। তবে শুধুমাত্র আমার ছেলেকে আর আমাকে কেন ফিরিয়ে দিচ্ছো? তুমি তো জানো ভালোবাসার মানুষটাকে হারানোর কষ্ট কি? আমি তোমাকে বলছি না যে তোমার জীবনে বেঁচে থাকার জন্য কোন একজন সঙ্গীর দরকার, আমি তোমাকে বলছি না অয়নকে বড় করার জন্য অয়নের একজন বাবার দরকার। তুমি নিজেই যথেষ্ট তোমাদের দুজনের জন্য। তবে আমি শুধু তোমাকে বলবো আমার ছেলেটার তোমাদেরকে দরকার। আমি জানি তুমি একা বাঁচতে পারবে তবে একজন সঙ্গী পেলে যে জীবনটা আরো সুখকর হয়ে উঠবে মিলি।”
মিলি এবারে কোন উত্তর দিলোনা। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর তাহরিমা বেগম আবারো বলে উঠলেন,
“এখন আর তোমার মাথার ওপরে বোঝা নেই মিলি যে তাকদীর কে বিয়ে করলে অন্য কারো সংসার ভাঙ্গা হবে। বরং এখন ওকে বিয়ে করলে ওর জীবনটা গুছিয়ে দেওয়া হবে। আমি আবারো বলছি তোমায়, ভিক্ষে চাইছি তোমার থেকে আমার ছেলের সুখ। তুমিও তো একজন মা, তুমিও তোমার সন্তানকে ভালোবাসো। তোমার সন্তানের ভালো মন্দ নিয়ে চিন্তিত। তবে তোমার সেই সন্তানের মঙ্গলের জন্য এবং আমার সন্তানের মঙ্গলের জন্য আমাকে ফিরিয়ে দিও না মা। এই হাহাকার, যন্ত্রণা নিয়ে আমায় ম'রতে দিও না।”
__________
“রাত হয়ে গেছে বাড়ি ফিরে যান এখন। সেই দুপুরে এসেছেন, বিশ্রামও নেওয়া হয়নি।”
তাকদীরের কথায় মিলির যেন ধ্যান ভাঙল। তবে শুনতে পায়নি তাকদীর কি বলেছে। তাই জানার জন্য আবার বলল,
“আরেকবার বলো শুনতে পাইনি।”
“বললাম অনেক রাত হয়েছে আপনি এখন বাড়ি ফিরে যান। সেই দুপুরে তো এসেছেন। নিশ্চিয়ই ক্লান্ত লাগছে এখন।”
“হ্যাঁ, ফিরব।”
মিলির কন্ঠটা তাকদীরের কাছে একটু অন্যরকম শোনালো। মিলিকে দেখেই মনে হচ্ছে কোন বিষয় নিয়ে ভীষণ চিন্তার মাঝে আছে। কিংবা বলে যায় সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। প্রশ্নটা করেই ফেলল তাকদীর।
“কোন বিষয় নিয়ে চিন্তায় আছেন কি আপনি?”
মিলি দু দিকে মাথা নাড়িয়ে ছোট্ট করে বলল,
“না।”
তাকদীর তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে সন্দেহী গলায় বলল,
“কি হয়েছে আপনার বলুন তো? আম্মুর কেবিন থেকে বের হওয়ার পর থেকে দেখছি এই অবস্থা। কি হয়েছে?”
মিলি আবারো ছোট্ট করে উত্তরে বলল,
“কিছু না।”
তাকদীর বুঝলো কিছু হলেও মিলি বলবে না। তাই আশাও ছেড়ে দিল। থাক না কিছু কথা অজানা। যা বলতে অস্বস্তি হয় তা জানারই বা কি দরকার!
“ঠিক আছে বলতে হবে না। চলুন গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে আসি।”
মিলি অয়ন কে কোলে নিয়ে বলল,
“লাগবে না। আমি চলে যাব।”
কি ভেবে যেন তাকদীরও আর কিছু বলল না। জোর করতে মন চাইলো না। এমনিতেই মিলিকে দেখে মনে হচ্ছে কোন বিষয় নিয়ে ভীষণ চিন্তায় আছে তাই আলাদা করে তাকদীর আর বিরক্ত করতে চাইলো না।
মিলি বেশ অনেকটা এগিয়ে গেল। হঠাৎ করে থেমে গেল আবার। তাকদীর খেয়াল করলো মিলি থেমে গেছে। একটু ভাবনার মাঝে পড়ে গেল। থামার কারণটা জানার আগ্রহ তৈরি হলো। তাকদীর কে অবাক করে দিয়ে মিলি আবার ধীর পায়ে ওর কাছেই ফিরে এলো।
তাকদীর বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ভ্রুঁ কুঁচকে বললো,
“সত্যি করে বলুন তো কি হয়েছে আপনার? আবার ফিরে এলেন কেন?”
মিলি অয়নকে তাকদীরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ওকে একটু কোলে নাও তো। আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না, একটু বসবো।”
তাকদীর তাড়াহুড়ো করে অয়ন কে কোলে নিতেই মিলি গিয়ে বসে পড়লো। তাকদীর ওর মায়ের কেবিন থেকে গিয়ে পানির বোতল এনে মিলির দিকে বাড়িয়ে দিল। মিলি দু ঢোক পানি খেয়ে তারপর বোতলটা আবারও তাকদীরের হাতে দিলো। তাকদীর সেটা পাশে রেখে প্রশ্নাত্মক গলায় মিলি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এবারে আর কোন বাহানা দেবেন না মিলি। সত্যি করে বলুন কি হয়েছে?”
দীর্ঘ সময় চুপ করে থাকলো মিলি। পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট, পনেরো মিনিট করতে করতে এই নীরবতা গিয়ে ঠেকলো আধা ঘন্টায়। এই তিরিশ মিনিটের মাঝে তাকদীর একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি। তাকদীর বুঝতে পারছে, মিলি ওকে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে তবে ঠিক বলে উঠতে পারছে না। তাই মিলিকে সময় দিলো নিজেকে বোঝানোর, নিজেকে প্রস্তুত করার জন্য।
অয়ন ঘুমিয়ে পড়েছে তাকদীরের কোলে। ওকে কোলে নিয়েই তাকদীর অপেক্ষা করছে কখন মিলি কিছু বলবে।
“আমি বোধহয় তোমায় বিয়েটা করতে পারবো তাকদীর।”
তাকদীর জানে না মিলি এই কথাটা কি করে বলল, কতটা কষ্ট হলো বলতে। তবে হ্যাঁ কষ্ট যে হয়েছে বলতে সেটা ওর মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝলো।
এবারে বুঝলো তাকদীর মিলির এত অস্বস্তির কারণ, অস্থিরতার কারণ। আন্দাজ তো কিছু একটা করেছিলো যে তাহরিমা বেগম বোধহয় মিলি কে কিছু বলেছে তবে নিশ্চিত ছিল না। এবারে নিশ্চিত হয়ে গেল।
অন্য সময় হলে তাকদীর ভীষণ খুশি হতো। এক কথাতেই রাজি হয়ে যেত। এতক্ষণে আনন্দ করতো, উল্লাসে মেতে উঠতো। তবে এখন সেসব কিছুই করলো না। কয়েকমাস আগেও মিলি এই কথাটা বললে তাকদীর কে এত কিছু ভাবতে হতো না, ভাবতে পারতোই না। তখন তাকদীর খেয়ালই করতো না যে মিলি কোন পরিস্থিতি তে পড়ে এই কথাটা বলছে। তবে এখন তাকদীর অনেক কিছু নতুন ভাবে বুঝতে শিখেছে। স্বাভাবিক গলায় বলল,
“বোধ হয়? যদি পারতেন তবে এই বোধ হয় শব্দটা এই বাক্যের সাথে যুক্ত করতেন না আপনি।”
মিলি কোনো উত্তর দিলো না। তাকদীর আবারো বলল,
“আম্মু কিছু বলেছে তাই না?”
মিলি তৎক্ষণাত দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“না আন্টি কিছু বলেনি। কেউ কিছু বলেনি। এই সিদ্ধান্তটা সম্পূর্ণ আমার।”
তাকদীর হেসে উঠলো। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। ফোঁস করে একটা শ্বাস ছেড়ে আফসোসের গলায় বলল,
“কেন এই কথাটা সত্যি হলো না মিলি? কেন আপনার এই কথাটা মিথ্যে হলো?”
মিলি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকদীরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কি মিথ্যে বললাম আমি?”
“এই যে বললেন এই সিদ্ধান্তটা সম্পূর্ণ আপনার। বুঝি আপনাকে মিলি, আমি অনেকটাই বুঝি আপনাকে। এতদিনে তো আরো ভালোভাবে বুঝে গিয়েছি। তবে আফসোস আপনি আমায় বুঝলেন না।”
“আজ অবদি নিজের জীবন, নিজের নিয়তি কোন কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না, সেখানে তোমায় বুঝি কি করে?”
“তা ঠিক বলেছেন। তবে একটা কথা কি জানেন? কিছুদিন আগেও আমি পা'গ'লামি করতাম তবে এখন আমি বুঝতে শিখেছি জোর করে আর যাই হোক কাউকে বিয়ে করা ঠিক না। তোহার সাথে আমার বিয়েটা মেনে নিতে যেমন আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল নিশ্চয়ই আপনারও ততটাই কষ্ট হচ্ছে এখন তাই না? অন্যের কথায় প্রভাবিত হয়ে গেলেন এত সহজে?”
মিলি চোখ দুটো খিচে বন্ধ করে হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে বলল,
“বললাম তো আমি কারো কথায় প্রভাবিত হইনি।”
“তবে আপনার চোখ দুটো টলমল করছে কেন? আমাদের মাঝে কোন সম্পর্ক তৈরি হওয়ার কথা, এই বিয়ের কথা চার মাস আগেই আমি শেষ করে দিয়েছি মিলি? অনেক ছেলেমানুষী করেছি, অনেক বোকামি করেছি। আমি তো আপনার জীবনের খুশির কারণ হতে চেয়েছিলাম। আমি কখনো আপনার জন্য অস্বস্তি হতে চাইনি। আজ আপনি হয়তো আমার মায়ের কথায় আমায় বিয়ে করতে রাজি হয়ে গিয়েছেন তবে আমি জানি এই বিয়েটা হয়ে গেলে সারা জীবন আমায় আপনার চোখে একটা অস্বস্তি দেখতে হবে, একটা মিথ্যে হাসি দেখতে হবে আপনার মুখে।”
মিলি এবার শব্দ করে কেঁদে উঠলো। তাকদীর সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
“কাঁদবেন না। আমার জন্য আপনি কাঁদুন সেটা আমি চাইনা। তবে একটা অনুরোধ আর কখনো কারো কথায় প্রভাবিত হয়ে আমায় বিয়ে করতে রাজি হবেন না। তখন পা'গ'ল ছিলাম সেজন্য আপনার মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে আপনার স্বস্তি-অস্বস্তির কথা না ভেবে বারবার শুধু আপনার থেকে একটা সুযোগ চেয়ে গিয়েছে। তবে এই চার মাসে অনেক কিছুই বুঝতে শিখেছি আমি মিলি।”
“আমায় ক্ষমা করে দিয়ো তাকদীর।”
“ক্ষমা চাইছেন কেন আপনি? আপনি তো নিজের সুখের কথা, স্বস্তির কথা ভুলে গিয়ে নিঃস্বার্থভাবে আমার আম্মুর কথায় আমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলেন আমার সুখের জন্য। আপনি নির্দ্বিধায় একজন ভালো মানুষ মিলি। আমি নির্দ্বিধায় একজন ভীষণ ভালো মানুষকে ভালোবেসেছি। তবে আজ আমি আপনাকে বলছি জোর করে আপনার থেকে ভালোবাসাটা আমি চাই না। জোর করে আপনাকে আমায় বিয়ে করতে হবে না।”
মিলি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল,
“তবে তুমি শুরু করো না তোমার জীবনটা নতুন করে। তাহলেই তো আন্টি ভালো থাকে।”
তাকদীর আলতো হেসে বলল,
“যদি কখনো মনে হয় যে আমার জীবনটা নতুন করে শুরু করা দরকার তবে করব, কথা দিলাম আপনাকে। কিন্তু যদি কখনো মনে হয় যে, না আমি পারবো না। আমার জীবনটা যেমন চলছে তেমনই ঠিক আছে তবে আর সম্ভব না নতুন করে কিছু শুরু করা।”