রিক্ত বসন্ত

পর্ব - ৫১

🟢

কলেজের অডিটোরিয়ামে মিলির বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। দীর্ঘ দশ বছর যাবত মিলি এই কলেজের প্রিন্সিপাল। আর তার মোট কর্মজীবনের বয়স পঁচিশ বছর পেরিয়ে গেছে।

দীর্ঘদিনের সম্পর্ক মিলির এই কলেজের সাথে, কলেজের মানুষগুলোর সাথে। কত নতুন শিক্ষার্থী এসেছে আবার চলে গেছে, কত নতুন মানুষের সাথে প্রতিনিয়ত পরিচয় হয়েছে আবার কত মানুষের সাথে পরিচয় ছিন্ন হয়েছে তার হিসেব নেই। প্রায় দিনই কত স্টুডেন্ট মিলি কে ফোন করে খোঁজ খবর নেয়, নিজেরা জীবনে এখন কে কতটা সাফল্য অর্জন করেছে সেসব খোঁজখবর দেয়। সবমিলিয়ে অনেক কিছু পেয়েছে মিলি এই কলেজ থেকে। এই কলেজ মিলিকে কত কিছু দিয়েছে তার তালিকা করতে গেলে অনেক লম্বা একটা তালিকা তৈরি হয়ে যাবে।

আজকের এই অনুষ্ঠানে মিলির কাছে সব থেকে গর্বের বিষয়টা হল অতিথির আসনে মিলির ছেলে বসে আছে। অয়ন এই কলেজের স্টুডেন্টই ছিল। মিলি এখন গর্ব করে সবাইকে বলতে পারে ওর ছেলে ডাক্তার। শুধু অয়ন না, তাকদীর আর তোহাও এসেছে। রুবা তো আগে থেকেই উপস্থিত ছিল। তাকদীর এই কলেজে প্রাক্তন শিক্ষক। সেই সাথে মিলির পরিবারের সদস্য।

অনুষ্ঠান প্রায় শেষের দিকে তখন রুবার কয়েকজন স্টুডেন্ট রুবার নাগাল পেল। রুবাকে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কয়েকজনের একটা ছোট্ট দল ওর দিকে এগিয়ে গেল। স্টেজে তখন মিলি বক্তব্য দিচ্ছে। রুবা মনোযোগ দিয়ে শুনছে মিলির কথাগুলো। এর মাঝে পিছন থেকে একটা মিনমিনে কন্ঠ কানে ভেসে এলো।

“রুবা ম্যাম!”

ডাকটা কানে যেতেই রুবা পিছন ফিরে তাকিয়ে পরিচিত শিক্ষার্থীদের মুখ দেখতে পেল। বুঝতে আর বাকি রইল না যে ওরা কেন এসেছে। কিন্তু তবু ওদেরকে আগে বুঝতে দিল না। মৃদু গম্ভীর গলায় বলল,

“হ্যাঁ বলো।”

“আপনি যে বলেছিলেন আজ আমাদের জন্য একটা চমক আছে কই দিলেন না তো?”

“তাই? এমন কিছু বলেছিলাম নাকি? আমার তো মনে পড়ছে না?”

সবার মুখ দেখে মনে হল এক্ষুনি বোধহয় কেঁদে ফেলবে। এত বড় একটা কথা বলার পর কেউ অস্বীকার করে নাকি? আর এটা ভুলে যাওয়ার মতন কোনো কথা না, গতকালই তো বলল। কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,

“ম্যাম প্লিজ মজা করবেন না। অনেক টেনশনে আছি। আপনার জন্য তো মুসতারিন ম্যাডাম কেও কিছু জিজ্ঞেস করতে পারছি না। এবার আপনি যদি না বলেন সরাসরি কিন্তু ওনার কাছে চলে যাব।”

রুবা বিস্ফোরিত নয়নে তাকিয়ে বলল,

“তোমরা আমায় ব্ল্যাকমেইল করছো?”

“না ম্যাম তেমনটা না। আপনি না বলতে চাইলে আর কি করব।”

রুবা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে তোমরা দাঁড়াও এখানে, আমি আসছি।”

কথাটা বলে রুবা কোথায় যেন চলে গেল। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করলো রুবার আসার জন্য। এই সুযোগে আরেকবার সবাই স্টেজে বসা অয়নকে দেখে নিল। ভীষণ অদ্ভুত লাগলো অয়নকে ওদের কাছে। গতকাল অব্দি যার ছোটবেলার কাহিনী শুনলো আজকে তাকে চোখের সামনে এত বড় একজন মানুষ হিসেবে দেখছে। অদ্ভুত লাগবে এটা কি স্বাভাবিক না?

ওদের এসব ভাবনার মাঝেই রুবা তাকদীর আর তোহাকে নিয়ে এলো। কেউই চেনে না ওদেরকে। যে তাকদীরের জন্য ওদের এত কষ্ট হচ্ছিল সম্মুখে দাঁড়ানো মানুষটাই যে সেই তাকদীর সেটাও জানে না। রুবা কিছু বলার আগেই সবাই একযোগে প্রশ্ন করল ল,

“এনারা কারা ম্যাম?”

রুবা আলতো হেসে পরিচয় করিয়ে দিল,

“ইনি হচ্ছেন আমার বাবা তাকদীর আর উনি হচ্ছেন আমার মা তোহা।”

সবাই বিকট শব্দে চিৎকার করে উঠে বলল,

“কিইই?”

ওদের হঠাৎ চেঁচানো তে তাকদীর আর তোহাও কেঁপে উঠলো। বুঝতে পারল না ওদের পরিচয় শুনে এভাবে চিৎকার করার কি আছে? তবে অবাক হলো না রুবা। জানতই এমনই প্রতিক্রিয়া দেখাবে ওরা।

তাকদীর প্রশ্নাত্মক গলায় রুবা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কি হলো মা? ওরা এমন করছে কেন?”

রুবা একটু শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“ভূত দেখছে বাবা জীবনে প্রথমবার। একটু তো অবাক হবে তাই না?”

রুবার কথাটা তাকদীর আর তোহা দুজনেরই মাথার উপর দিয়ে গেল।

এদিকে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা একবার তাকদীর আর তোহা কে দেখছে তো একবার রুবার মুখের দিকে তাকাচ্ছে। আর যখনই রুবার দিকে তাকাচ্ছে তখনই অসহায় হয়ে উঠছে ওদের মুখগুলো। কোন কিছুই যেন মেনে নিতে পারছে না। এক পর্যায়ে গিয়ে আর সহ্য করতে না পেরে একজন প্রশ্ন করেই ফেলল,

“ম্যাম এগুলো আবার কবে হলো? কি করে হলো? এগুলো তো বলেননি আমাদের কিছু।”

“এগুলোই তো ছিল তোমাদের সারপ্রাইজ। আমি হলাম তাকদীরের মেয়ে আর মিলির ছেলের বউ বুঝেছ? এখন মিলি আর তাকদীর বেয়াই বেয়াইন। অদ্ভুত সম্পর্ক না? তোমরা আন্দাজ করেছিলে এমন কিছু হতে পারে?”

“মাথা ঘুরাচ্ছে ম্যাম। এত বড় টুইস্ট কেউ দেয়?”

তাকদীর আর তোহা এবারে অনেক কিছুই আন্দাজ করতে পারছে। সেই সাথে সবার অবাক হওয়ার কারণটাও বুঝতে পারছে। তাকদীরের মনে হলো এখানে আর থাকার দরকার নেই। ওদের যা অষ্টম আশ্চর্য দেখানোর ছিল সেটা দেখা হয়ে গেছে। রুবা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমরা তাহলে এখন যাই।”

রুবা মাথা নাড়িয়ে সায় জানাতেই তাকদীর তোহার হাত ধরে সেখান থেকে চলে যেতে নিলে দুই তিন জন ওদের পথরোধ করে দাঁড়ালো। দুজনে আবারো চমকালো। সেই সাথে চমকালো রুবা।

মেয়েটা নিজ থেকেই রুবা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ম্যাম রাগ করবেন না। আসলে ওনাদের একটা ছবি তুলতাম। বাকিদের দেখাতে হবে তো, শুধু আমরাই তো দেখলাম।”

তোহা আর তাকদীর দুজনেরই এবার একটু অস্বস্তি হলো। তোহা রুবার দিকে তাকিয়ে মৃদু রাগী গলায় বলল,

“কি দরকার ছিল ওদেরকে সব শোনানোর? অস্বস্তিতে ফেললি তো আমাদের।”

রুবা তোহার কাঁধে হাত রেখে বলল,

“সমস্যা কি মা? ওরাও একটু জানুক সত্যিকারের ভালোবাসার জোর ঠিক কতখানি। আচ্ছা ঠিক আছে নাও তোমরা ছবি তোলো। ওদের সাথে আমারও ছবি তোলো।”

মেয়েটা সত্যি ছবি তুললো। ছবি তোলা শেষে তাকদীর আর তোহা চলে গেলে। মেয়েটা আবারও রুবা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ম্যাম সবাইকেই তো দেখলাম তন্ময় কে কি দেখার সুযোগ পাবো না? বাস্তবে না দেখলাম একটা ছবি দেখান। গালি দিতে সুবিধা হবে।”

রুবা শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“সরি। আমি নিজে আজ অব্দি ওনাকে কখনো দেখিনি। আমি কেন অয়ন অবধি দেখেনি ওনাকে কখনো। অয়ন তো ওনার নামটাও অনেক পরে জেনেছে। তাই তোমাদের কেও দেখাতে পারলাম না। আর না ওনার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানাতে পারলাম।”

“ম্যাম আজও কি উনি মুসতারিন ম্যাডামের উপর প্রভাব ফেলতে পারেন?”

রুবা একটু ভেবে বলল,

“না। আমি অন্তত তোমাদের মুসতারিন ম্যাডামকে যতোটুকু চিনেছি তাতে আমার মনে হয় আজকাল আর ওনার উপর কোন প্রভাব ফেলতে পারে না। দেখো ভালো যখন বেসেছিল তখন তাকে ভুলতে তো একটু সময় লাগবে তাই না? মিলির ভালোবাসায় তো কোনো খাদ ছিল না। তবে মুসতারিন ম্যাডাম নিজের ভালো থাকাটাকে বেছে নিয়েছিল আর সেজন্য ভুলে গেছো তন্ময় কে। এখন তন্ময়ের থাকা না থাকা ওনার উপরে কোন প্রভাবই ফেলে না। আর না প্রভাব ফেলে পুরনো স্মৃতিগুলো।”

________

শেষ মুহূর্তে সবাই গোছগাছ করতে ব্যস্ত। তোহা সমানে তাকদীর কে তাড়া দিয়ে বলছে কিছু ভুলে গেল কিনা। আর প্রতিবারই তাকদীর তোহা কে আশ্বস্ত করে বলছে, ভুলে গেলেও সমস্যা নেই ওখানে গিয়ে কিনে নেবে দরকার হলে।

তবে তোহা তো নিশ্চিত হতে পারছে না। একপর্যায়ে গিয়ে তাকদীর থেমে গেল। ভাবলো এবার তোহা যদি বলে কিছু ভুলে গেছে কিনা তবে বলবে না সব নেওয়া হয়ে গেছে। এ ছাড়া আর তোহা কে শান্ত করার কোন উপায় তাকদীর খুঁজে পেল না।

রুবা নিজের আর অয়নের ব্যাগ গোছানো শেষে মিলির ঘরে এলো দেখতে যে মিলির সব কিছু গোছানা শেষ কিনা। রুমে ঢুকে ব্যস্ত গলায় মিলিকে বলল

“মা, তোমার সব গোছানো শেষ তো?”

“সে তো আমি গতকাল রাতেই সব গুছিয়ে রেখেছি। আমি তো জানতাম নাহলে সকালে তাড়াহুড়ো লেগে যাবে ।”

“তুমি সত্যিই বেস্ট মা। তুমি সবকিছু এত সুন্দর গুছিয়ে করো না কি বলবো।”

মিলি আলতো হেসে বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে হয়েছে। তোমাদের ব্যাগ গোছানো শেষ?”

“হ্যাঁ আমাদেরও শেষ তবে চিন্তায় আছি কিছু বাদ পড়লো কিনা।”

ওদের কথার মাঝে মিলির ফোনটা বেজে উঠলো। হাতে নিয়ে দেখল মাহবুবের নাম্বার থেকে কল এসেছে।

মিলি ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে আলতো হেসে বলল,

“হ্যাঁ ভাইয়া বলো।”

“রওয়ানা হয়েছিস তোরা?”

"না ভাইয়া এখনো রওনা দেইনি আমরা। অয়ন আবার হসপিটালে গেছে। কিসের জানি ইমারজেন্সি হয়ে গিয়েছে তাই।”

“আচ্ছা ঠিক আছে। রওনা দেওয়ার আগে আমায় ফোন করিস।”

মাহবুব ফোনটা রেখে দিল। ততক্ষণে রুবার ফোনেও অয়নের কল এসে গেছে। মিলি ফোনটা রাখতেই রুবাও ফোনটা রেখে দিয়ে মিলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“মা অয়ন বলল আমরা যেন গাড়ি নিয়ে সোজা হসপিটালে যাই। ও ওখান থেকেই যাবে। আবার বাড়িতে এলে দেরি হয়ে যাবে।”

“আচ্ছা ঠিক আছে চলো।”

________

“কি হয়েছে ওনার?”

“জানিনা। রাস্তায় হঠাৎ করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিল। আমরা চিনি না ওনাকে। সাথে আর কেউ ছিলনা।”

সবেমাত্র কাজ শেষ করে বেরিয়ে যেতে ধরেছিল অয়ন। এর মাঝেই আবার নতুন করে একটা রোগীকে নিয়ে এলো যার সাথে আবার তার বাড়ির লোকজন কেউ নেই। বয়স্ক মানুষ এভাবে তো ফেলে রেখেও যাওয়া যায় না। ওদিকে মিলিরাও হয়তো কিছুক্ষণের মাঝে চলে আসবে।

তবে কোন উপায় নেই অয়নের হাতে। ছুটির দিন হওয়ায় এখন হাসপাতালে কোন ডাক্তারই নেই। এজন্যই তো সকালে জরুরী তলবে আসতে হয়েছিল।

কিছু সময়ের জন্য অয়ন আবারও নিজের ব্যক্তিগত জীবনের সব কাজ দায়িত্ব ভুলে গিয়ে নিজের পেশার দিকে মনোযোগ দিল। নার্স কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“নিয়ে আসুন ওনাকে। আগে ওনার কিছু টেস্ট করতে হবে।”

_________

হাসপাতালের বাইরে গাড়িতে অপেক্ষা করছে মিলিরা সবাই। রুবা সমানে অয়নের নাম্বারে কল করা যাচ্ছে। ফোনটা রিং হয়ে যাচ্ছে ঠিকই তবে অয়ন রিসিভ করছে না। একপর্যায়ে গিয়ে রুবা বিরক্ত হয়ে বলল,

“আমি ওটাকে ভেতর থেকে ধরে আনছি।”

রুবার মুখ থেকে এমন কথা শুনে তোহা ধমক দিয়ে বলে উঠলো,

“এটা কোন ধরনের ব্যবহার রুবা?”

তোহার কথায় রুবার মাঝে বিশেষ কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। বরং স্বাভাবিক গলাতেই বললো,

“ও দেরি করে কেন? দেরি করলে আমি এভাবেই বলবো।”

তোহা আরো কিছু বলতে চাইলো তবে মিলি ওকে থামিয়ে দিয়ে রুবা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“রুবা চলো আমিও যাই তোমার সাথে।”

“তুমি আবার যাবে মা এত দূর হেঁটে?”

মিলি আলতো হেসে বলল,

“হাসপাতালে যখন অয়নকে দেখি তখন ওকে একদম ডাক্তার ডাক্তার লাগে। যখন দেখি ও অনেক মানুষের সেবা করছে, কত অসুস্থ মানুষের ভরসার জায়গা হয়ে উঠছে তখন খুব ভালো লাগে। মনে হয় ছেলেটা আমার অন্যের থেকে বাঁচার কারণ কেড়ে নেয় না বরং তাদেরকে বাঁচার কারণ দেয়। খুব গর্ব হয়। চলো দেখে আসি।”

কেউই আর মিলিকে বাধা দিলোনা। মিলি আর রুবা হাসপাতালের ভেতরে গেল। রিসিপশনে গিয়ে নিজেদের পরিচয় দিয়ে অয়নের খোঁজ করলে রিসিপসনিস্ট জানালো অয়ন হাসপাতালেই আছে, রোগী দেখছে। ওরা যেন একটু অপেক্ষা করে।

খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না মিলিদের কে। একটু পরেই অয়নকে দেখতে পেল। অয়ন বুঝতে পারলো যে অনেক দেরি করে ফেলেছে নিশ্চয়ই, তবে কিছু করার ছিল না। তাড়াহুড়ো করে মিলিদের দিকে এগিয়ে গিয়ে অপরাধী গলায় বলল,

“আই এম রিয়েলি সরি মা, রুবা। আসলে লাস্ট মোমেন্টে একটা ইমারজেন্সি পেশেন্ট এসে গিয়েছিল।”

রুবা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল তবে মিলি রাগ করলো না। ছেলের গালে হাত রেখে আদুরে গলায় বলল,

“কোন ব্যাপার না বাবা। এটাই তো তোমার কাজ। তুমি যে তোমার আনন্দর আগে অন্যের জীবনকে প্রাধান্য দিয়েছো এটাই বড় কথা।”

“বোঝার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ মা। তবে আর বেশি সময় লাগবে না। এখন ওনাকে ওয়ার্ডে শিফট করলেই চলে যাব।”

অয়ন আরো কিছু বলতে চাইলো তবে তার আগেই ওর ডাক পরল। পেশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে। সেটা বলতেই নার্স অয়ন কে ডাকলো। মিলিও সেদিকে তাকালো। স্ট্রেচারের উপর একজন কে দেখা যাচ্ছে। মুখটা বোঝা যাচ্ছে না। অয়ন তাড়াহুড়োর কন্ঠে মিলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোমরা গিয়ে গাড়িতে বসো, আমি দশ মিনিট এ আসছি।”

মিলি মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো। রুবা অয়নের সাথে কথা বলল না, সেখানে আর দাঁড়ানোর ইচ্ছেও হলো না। মিলির হাত ধরে চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো। যাওয়ার জন্য পাও বাড়ালো তবে কি ভেবে যেন মিলি থেমে গেল।

স্ট্রেচারের ওপর থাকা পেশেন্ট কে ওয়ার্ড বয় ওদের দিকেই নিয়ে আসছিল। হঠাৎ করে মিলি আবছা রোগীর চেহারাটা দেখতে পেল। মিলি জানে না ঠিক দেখেছে কিনা। কাকে দেখেছে সেটাও জানে না তবে কেন যেন থেমে গেল। আসলে মানুষটা কে মিলির দেখার জন্য কৌতুহল হলো।

মিলি কে থেমে যেতে দেখে রুবা বলে উঠলো,

“কি হলো মা থামলে কেন? তোমার ছেলে তো বলল যে দশ মিনিটে আসছে।”

মিলি রুবা কে কিছু বলল না। ধীর পায়ে স্ট্রেচারের দিকে এগিয়ে গেল। মিলিকে আবার আসতে দেখে অয়ন প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কি হলো আম্মু আবার ফিরে এলে কেন? কিছু বলবে?”

মিলি অয়নের প্রশ্নেরও কোন উত্তর দিলােনা। অয়নকে পাশ কাটিয়ে স্ট্রেচারের উপর শুয়ে থাকা বৃদ্ধ মানুষটার মুখের দিকে তাকালো। মানুষটার চেহারায় বিস্তর পার্থক্য এসেছে। যৌবনকালের সেই সৌন্দর্য আর নেই। মিলির মতনই চুল গুলো সাদা হয়ে গিয়েছে, গাল মুখে লম্বা লম্বা দাঁড়ি হয়েছে সেগুলোও সাদা। শরীরটা শুকিয়ে গেছে আগের তুলনায় অনেকটাই, ফর্সা গায়ের রং কালচে হয়ে গেছে। চামড়াও কুঁচকে এসেছে তবুও মানুষটা তো একই আছে। যাকে চিনতে মিলির ভুল হলো না।

মিলি কে লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে অয়ন একটু অবাক হলো। বুঝতে পারছে না এভাবে তাকিয়ে থাকার কারণ। রুবা এগিয়ে এসে মিলির কাঁধে হাত রেখে বলল,

“কি হলো মা?”

মিলি কারোর কোন কথারই উত্তর দিতে পারছে না।

স্ট্রেচারে শায়িত তন্ময়ের জ্ঞান ফিরেছে। তবে খুব একটা বেশি কথা বলার মতন অবস্থাতে নেই। এত কথাবার্তার আওয়াজ শুনে সেদিকে একবার তাকালো। স্পষ্টই দেখতে পেল মিলির মুখটা।

মুহূর্তের মাঝে তন্ময়ের চোখের কার্নিশ বেয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। দীর্ঘ আটাশ বছরে তবে এই প্রথম সৃষ্টিকর্তা তন্ময়ের কথা শুনলো, ওর অনুরোধ রাখল। এতদিনে তবে তন্ময়ের প্রতি তার মনটা নরম হলো। যার খোঁজে জীবনের শেষ সময়ে তন্ময় সিলেটে পা রেখেছিল অবশেষে পেল তার দেখা। তাও তন্ময়কে আর কষ্ট করে খুঁজে বের করতে হয়নি, মিলিই খুঁজে বের করেছে।

এদিকে হঠাৎ করে তন্ময়ের মাঝে অস্থিরতা বেড়ে গেল। কথা বলার ক্ষমতা এখনো হারিয়ে ফেলেনি। কথা বলার ক্ষমতা আছে তবে এই মুহূর্তে বলতে পারছে না। হঠাৎ করে তন্ময়কে এত অস্থির হতে দেখে অয়ন শান্ত হতে বলে বলল,

“প্লিজ এত অস্থির হবেন না। আপনার শরীরের কন্ডিশন ভালো না।”

অয়নের কথায় তন্ময় কান দিল না। চামড়া কুঁচকে যাওয়া হাতটা কাঁপছে। কাঁপা কাঁপা হাতটা তুলে মিলির দিকে তাক করার চেষ্টা করলো, সেই সাথে কিছু বলার চেষ্টা করলো। অয়ন বুঝতে পারলো যে তন্ময় কিছু বলতে চাইছে। মিলির দিকে তাক করতে চাওয়া হাতটা অয়ন ধরল। তন্ময়ের মুখের কাছে কান নিয়ে গিয়ে শান্ত গলায় বলল,

“কিছু বলতে চান আপনি? বলুন। আপনার নাম কি? আপনার সাথে তো আর কেউ আসেনি। আপনার ফোনেও কারো নাম্বার পাইনি আমরা। কাউকে খুঁজছেন আপনি? অন্তত নিজের নাম বা পরিবারের কারো নাম্বার বলুন আমরা তাকে কল করবো।”

তন্ময় কিচ্ছু বলতে পারলো না। তন্ময়ের সম্পূর্ণ মনোযোগ কেবলই মিলির ওপরে। তবে মিলি অস্পষ্ট কণ্ঠে বলে উঠলো,

“তন্ময়!”

রুবা চমকে উঠলো। বুঝতে পারছে না যা ধারণা করছে সেটাই ঠিক কিনা। থেমে গেল অয়নের কন্ঠ। মিলির দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল,

“তুমি ওনাকে চেনো মা?”

মিলি উপর-নিচ মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে বলল,

“হ্যাঁ। ও তন্ময়।”

নিজের হাতের মাঝে থাকা তন্ময়ের হাতটা ছেড়ে দিল অয়ন। ছিটকে বেশ অনেকটা দূরে সরে গেল। আজ প্রথম নিজের বাবাকে সামনাসামনি দেখল অয়ন। এর আগে না কখনো মিলি দেখিয়েছে আর না কখনো অয়ন দেখতে চেয়েছে কিংবা দেখার ইচ্ছে হয়েছে।

তন্ময় অয়নের সাথে যা করতে চেয়েছে বা করেছে সেসবের জন্য অয়নের রাগ নেই। অয়নের একটাই অভিযোগ তন্ময় ওর মাকে কষ্ট দিয়েছে। অনেক কাঁদিয়েছে ওর মা কে।

অনেকটা সময় চুপ থাকার পর অবশেষে তন্ময় মুখ ফুটে একবার মিলিকে ডাকতে পারল।

কাঁপা কাঁপা হাতটা মিলির দিকে তাক করে বলল,

“তোমাকে এক নজর দেখার জন্যই বোধহয় বেঁচে ছিলাম মিলি। আর আমার ছেলে, আমার ছেলে কোথায়?”

বিজ্ঞাপন

এর আগের বারের মতন মিলির কন্ঠটা এবারে কাঁপলো না। বরং গম্ভীর গলায় বলল,

“ভুল বললে। আমার ছেলে, শুধুমাত্র আমার ছেলে। দেখবে আমার ছেলেকে? ওই দেখো আমার ছেলে অয়ন। ডাক্তার বানিয়েছি ওকে আমি। একদম আমার মনের মতন করে মানুষ করেছি। আজ ওর জন্য যেমন আমি গর্বিত মা, তেমনি আমার ছেলের বউ একজন গর্বিত স্ত্রী। কখনো কোনো নারীর লজ্জার কারণ হয়নি আমার ছেলে, কোন নারীর চোখের জলের কারণ হয়নি আমার ছেলে।”

কথাটা বলে মিলি ইশারায় অয়নকে দেখালো। তন্ময় ঘাড় ঘুরিয়ে একবার অয়নের দিকে তাকালো। মুখে হাসি ফুটে উঠলো অয়নকে দেখে। কত বড় হয়ে গিয়েছে ছেলেটা। সেই কবে একবার দেখেছিল, একবার একটু কোলে নেওয়ার সুযোগও পেয়েছিল। তবে বেশিক্ষণ নিয়ে রাখতে পারেনি। কেঁদে দিয়েছিল অয়ন।

আপনা আপনি তন্ময়ের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। ক্রন্দনরত কন্ঠে এবার হাতটা অয়নের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“আমি, আমি তোমার বাবা। আমায় চিনতে পারছো তুমি? তোমার মা তোমায় আমার সম্বন্ধে বলেছে, আমার ছবি দেখিয়েছে তোমায়?”

তন্ময় জানে না কেন তবে আশা করেছিল অয়ন ওর সাথে কথা বলবে, এগিয়ে এসে হয়তো বাবা বলে জড়িয়ে ধরবে। তবে তেমন কিছুই হলো না। বরং গম্ভীর গলায় নার্স কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ওনাকে ওয়ার্ডে নিয়ে যান। কিছুক্ষণের মাঝে অন্য ডাক্তার আসবে ওনাকে দেখতে। মা, রুবা চলো।”

কথাটা বলে অয়ন সত্যি চলে যেতে নিলে পিছন থেকে তন্ময়ের আর্তনাদ ভেসে এলো ওর কানে। থেমে গেল অয়ন। কিছু একটা তো বাধা দিল ওকে। তন্ময় আর্তনাদ করে বলে উঠলো,

“এভাবে ছেড়ে যেও না আমায় মিলি। তোমাদেরকে একবার দেখার জন্য এতদূর এসেছি। মিলি একবার ওকে বলো না আমায় বাবা বলে ডাকতে।”

অয়ন তাকালো একবার তন্ময়ের দিকে তবে কিছু বলল না। তন্ময়ের আবদার রাখতে একবার বাবা বলে ডাকার ইচ্ছেও হলো না। মুখ দিয়ে বাবা ডাকটা বের হবেই না হয়তো।

অয়ন তাকালো একবার মিলির দিকে। মিলির অভিব্যক্তি ভীষণ স্বাভাবিক।

অয়ন আবারো মিলি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“মা চলো।”

তন্ময় আবারও পিছন থেকে আর্তনাদ করে মিলিকে বলে উঠলো,

“মিলি যেওনা। এভাবে যেওনা মিলি। আটাশ টা বছর চলে গেছে আমার জীবনের। আমার জীবনের আটাশটা বছর নষ্ট হয়ে গেছে। আমি হয়তো আর বেশি দিন বাঁচবো না। শুধুমাত্র তোমাদের দুজনকে দেখার জন্য এত দূরে এসেছি। দেখো না আল্লাহ আমায় মিলিয়ে দিয়েছে তোমাদের সাথে। একটু সময় কাটাও আমার সাথে মিলি। একটু আমাদের ছেলেকে বলো না একবার একটু আমায় বাবা বলে ডাকতে।”

মিলি তাকালো তন্ময়ের দিকে। তন্ময়ের এই অবস্থা দেখে কষ্ট হলো কিনা মিলি জানে না। এখন তো আর তন্ময়ের কথা মনেও পড়ে না। ভুলে গেছে মিলি, সবটা মিলি ভুলে গেছে। মিলির আট বছরের ভালোবাসা কে ভুলে গেছে, মিলির চার বছরের সংসার ভুলে গেছে। মিলি এখন কেবল একটা কথাই মনে রেখেছে গত আটাশ বছর ধরে শুধুমাত্র নিজের ছেলেকে বড় করার জন্য নিজের সংগ্রাম।

তন্ময়ের প্রতি আজ আর রাগ হলো না, আজ আর ঘৃণাও হলো না বরং তন্ময়ের অসহায়ত্বে করুণা হচ্ছে ওর জন্য। মিলি জানে তন্ময় আর কারো কাছে স্থান পায়নি। ওর বাবা-মা তো মারা গেছে অনেক দিন আগে। তন্ময়ের বাবা মৃত্যুর আগ অব্দি কখনো তন্ময়কে ক্ষমা করেনি। শেষ ইচ্ছে হিসেবে জানিয়ে গিয়েছিলেন যেন ওনার জানাযায় তন্ময় নামক মৃত ছেলে উপস্থিত না থাকে। তার মৃত্যুর পর তন্ময় আর সেখানে যায়নি।

এই আটাশটা বছর ধরে একা একাই ধুকে ধুকে মরছে তন্ময়। প্রতিটা মুহূর্তে অনুভব করেছে নিজের করা জঘন্য অপরাধগুলো।

মিলির হাসি পেল আজ তন্ময়কে দেখে। মিলির মনে হলো একটা সময় মিলি যতটা অসহায় ছিল আজ তন্ময় তার থেকেও অনেক বেশি অসহায়। মিলির কাছে তো তবুও বাঁচার একটা কারণ হিসেবে অয়ন ছিল তবে তন্ময়ের কাছে কিছু নেই। তাচ্ছিল্য হেসে তন্ময় কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“যে ছেলেটা কে একদিন তুমি মে'রে ফেলতে চেয়েছিলে আজ সেই ছেলে মানুষের জীবন বাঁচায়, তোমার জীবনও বাঁচালো। জীবনে কিছু ভুলের কোনো ক্ষমা হয় না তন্ময়। কিছু অপরাধের জন্য তুমি যত শাস্তিই পাও না কেন তবুও কম হয় সেটা। তুমি এতদিন কি কষ্ট পেয়েছো না পেয়েছো সেটা আমি জানি না তবে আজ চোখের সামনে নিজের সন্তানকে দেখতে পেয়েও তার মুখ থেকে বাবা ডাক শুনতে না পাওয়ার যে কষ্টটা আমি জানি সেটা তোমার এত দিনের সব কষ্ট কে হার মানাবে।”

মিলি এবারাে অয়নকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ওই মানুষটার এখন তোমার কাছে একটাই পরিচয়, উনি তোমার রোগী। উনি যে তোমার জন্মদাতা পিতা সেটা তোমায় মনে রাখতে হবে না। যেকোনো অসুস্থ মানুষ এলেই তো তোমার দায়িত্ব থাকে তাকে সুস্থ করে তোলা তাই না? উনি তোমার মায়ের অপরাধী জন্য ওনার প্রতি তুমি গাফিলতি করতে পারো না। তোমার দায়িত্ব ওনাকে সুস্থ করে তোলা।”

“আমার যতটুকু দায়িত্ব ছিল আমি পালন করেছি মা। আমার বন্ধুকে কল করেছিলাম ও আসছে। চলো।”

তন্ময় এবারে ডুকরে কেঁদে উঠলো। কাঁদতে কাঁদতে বলল,

“এত ঘৃণা আমার ওপরে তোমার বাবা যে একটা বার আমায় বাবা বলে ডাকতে পারলে না? তোমরা শুধু আমার অপরাধটাই দেখলে অথচ তারপর গত আটাশটা বছর ধরে আমি কোন যন্ত্রণার মাঝে কাটাচ্ছি সেটা দেখলে না। তোমরা মা ছেলে দিব্যি ভালো দিন কাটিয়েছো তবে একবার কি ভেবে দেখেছো আমি একা একা কি করে একটা বাড়িতে দিন কাটিয়েছি?”

এবারে অয়ন তন্ময়ের প্রশ্নটার উত্তর দেয়ার প্রয়োজন মনে করল। খুব স্বাভাবিক শান্ত গলায় বলল,

“তাহলে বলবো আপনাকে, মনে করে দেখুন আমি আর আমার মা কেন আজ আপনার থেকে এতটা দূরে। আপনি আমার সাথে কি করতে চেয়েছিলেন বা করেছেন সে সব নিয়ে আমার কোন অভিযোগ নেই। তবে আমার একটাই অভিযোগ আপনি আমার মাকে কাঁদিয়েছেন। আমি সব সহ্য করতে পারলেও আমার মায়ের চোখের জল সহ্য করতে পারি না। অথচ আপনি দীর্ঘ একটা সময় যাবৎ সেটাই করেছেন। বিশ্বাস করুন আমি চাইলেও আপনাকে ক্ষমা করতে পারব না। একজন মানুষ হিসেবে আপনার উপর করুণা করলেও একজন ছেলে হিসেবে কখনো আমার মায়ের অপরাধী কে আমি ক্ষমা করতে পারব না।”

কথাটা বলে অয়ন মিলি আর রুবার হাত ধরে সেখান থেকে বেরিয়ে এলো। বাইরে আসতেই দেখলে তাকদীর গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের কে আসতে দেখে বলে উঠলো,

“এত সময় লাগলো কেন? কই ছিলে তোমরা?”

অয়ন একটু হাসার চেষ্টা করে বলল,

“দুঃখিত বাবা। একটু দেরি হয়ে গেল।”

হঠাৎ করে মিলির শরীরটা কেমন খারাপ লাগছে। নিজেকে সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে ধরলে অয়ন হাতটা আকড়ে ধরলো।অপর পাশে গিয়ে রুবা মিলির অন্য হাতটা ধরলো। অয়ন চিন্তিত গলায় বলল,

“শরীর খারাপ লাগছে মা? চলো বসবে চলো।”

মিলির শরীরটা হঠাৎ করেই কেমন খারাপ হয়ে গেল। এতটুকু হাঁটতেই হাঁপিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে যে কোন সময় শরীরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাটিতে পড়ে যাবে। হাঁপিয়ে যাওয়া গলায় অয়ন কে বলল,

“না আমি ঠিক আছি।”

অয়ন আরো কিছু বলতে যাবে তার আগেই ভেতর থেকে একজন নার্স অয়নের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে ছুটে বেরিয়ে এলো। অয়নকে দেখতে পেয়ে যেন স্বস্তি পেল। অয়ন ব্যস্ত গলায় বলল

“কি হয়েছে?”

“স্যার, পেশেন্টের অবস্থা খুব খারাপ। শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যা হচ্ছে। বারবার আপনাকে ডাকছে প্লিজ চলুন।”

অয়ন ব্যস্ত গলায় মিলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তুমি একটু বসো আমি আসছি।”

অয়ন যেতে ধরলে মিলি ওর হাতটা টেনে ধরে বলল,

“জীবন মৃত্যুর মালিক আল্লাহ সেটা জানি তবে দুনিয়ায় তোমাদের মতন ডাক্তারদের মাধ্যমে তিনি আমাদেরকে সুস্থ করে দেন। চেষ্টা করো ওই লোকটাকে সুস্থ করে তোলার। আমি কখনো ওনার মৃত্যু চাইনি।”

অয়ন মিলি কে আশ্বস্ত করে বলল,

“আমি চেষ্টা করব আম্মু।”

________

ঘরটা পুরো নিস্তব্ধ। শুধুমাত্র মনিটরের বিপ বিপ শব্দ শোনা যাচ্ছে আর দেখা যাচ্ছে নার্সদের ব্যস্ততা।

দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো অয়ন। চোখে মুখে তার উদ্বিগ্নতা দেখা যাচ্ছে । অয়নকে আসতে দেখেই নার্স ব্যস্ত গলায় বলল,

“স্যার, পেশেন্টের অবস্থা ক্রিটিকাল।”

অয়ন তাড়াহুড়ো করে তন্ময়ের কাছে এগিয়ে গেল। তন্ময়ের মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। অয়ন একবার মনিটরের দিকে তাকালো। তৎক্ষণাৎ নার্স কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“অক্সিজেনের ফ্লো বাড়ান।”

অয়নের কথা অনুযায়ী নার্স তাই করলো। অয়ন খেয়াল করল অক্সিজেন মাস্ক লাগানো অবস্থাতেই তন্ময় কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে। মৃদু রাগান্বিত গলায় বলল,

“চুপ করে থাকুন। কথা বলার চেষ্টা করবেন না প্লিজ!”

হঠাৎ করে শব্দ হওয়ায় অয়ন পিছনে তাকালো। দেখল মিলি দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, পাশেই রুবা।

“মা তুমি কেন এসেছো এখানে? তোমার শরীর তো ভালো না। তুমি যাও গাড়িতে গিয়ে বসো।”

“আমি এখানে থাকি। তোমায় বিরক্ত করবো না। তুমি তোমার কাজ করো।”

অয়ন আরো কিছু বলতে যাবে তার আগে নার্সের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

“স্যার, পেশেস্টের বিপি কমে যাচ্ছে।”

অয়ন তাড়াহুড়ো করে মনিটরের দিকে তাকালো। পরপরই অয়ন খেয়াল করলো তন্ময় কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে। মুখের কাছে কান নিয়ে যেতেই বুঝতে পারলো তন্ময় অস্পষ্ট গলায় বলছে,

“বাবা ডাকো একবার।”

অয়ন খুব কষ্টে নিজে কে সংযত রাখলো। খেয়াল করলো কোন কিছুতেই কাজ হচ্ছে না আর। তন্ময়ের অবস্থা ধীরে ধীরে অবনতির দিকে যাচ্ছে। বিপি ক্রমশ কমে যাচ্ছে, হার্ট বিটও কমে যাচ্ছে।

হঠাৎ করে অয়ন কেমন অস্থির হয়ে উঠলো। এর আগে অনেক রোগীর এমন অবস্থার সম্মুখীন হয়েছে তবে কখনো এমনটা হয়নি বরং সব সময় শান্ত থেকে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে আজ পারছে না।

এক পর্যায়ে গিয়ে অয়ন খেয়াল করলো তন্ময়ের চোখটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসছে। আগে যাও বা একটু কথা বলার চেষ্টা করছিল তবে এখন আর সেটাও পাচ্ছে না। আরো বেশি অস্থির লাগলো অয়নের। অস্থির গলায় তন্ময় কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“প্লিজ প্লিজ চোখ বন্ধ করবেন না। হ্যালো শুনছেন? কথা বলুন।”

অয়নের কথার কোন জবাব তন্ময় দিল না। রুবা মিলিকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মিলি ওর হাত ধরে এগিয়ে এলো। একবার দেখে নিল ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যেতে থাকা তন্ময়ের দেহটাকে। এদিকে তন্ময়ের থেকে কোন সাড়া না পাওয়ায় অয়ন আরো বেশি অস্থির হয়ে উঠলো। আবারও তন্ময়কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“প্লিজ কথা বলুন। তাকান আমার দিকে একবার। বাবা! একবার তাকান দেখুন বাবা বলে ডেকেছি এবার অন্তত তাকান।”

অয়ন কথাটা বলার সাথে সাথেই মনিটরে বিইইইইইপ শব্দ কানে এলো। অয়ন সেদিকে তাকাতেই দেখল মনিটরের সবগুলো আঁকাবাঁকা দাগ এখন সোজা রেখায় পরিণত হয়েছে। তন্ময়ের দিকে তাকাতেই দেখল একদম নিস্তেজ হয়ে গেছে শরীরটা। কোন কিছুতেই কোন কাজ হলো না আর। তন্ময় একদম ঠিক করেই নিয়েছে যে আজ এই যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পাবেই। হয়ত বা শুধু অয়নের মুখ থেকে বাবা ডাকটা শোনার অপেক্ষাতেই ছিল।

হাল ছেড়ে দিল অয়ন। জানে আর কোন কিছুতেই কিছু সম্ভব না। নার্স তন্ময়ের অক্সিজেন মাস্কটা খুলে দিল তন্ময় এর মুখ থেকে। অয়ন একটু পিছিয়ে গেলো। কানে ভেসে এলো মিলির প্রশ্ন,

“চলে গেল?”

অয়ন অসহায় দৃষ্টিতে মিলির দিকে তাকিয়ে বলল,

“পারলাম না আম্মু, আমি পারলাম না। এই হাতে কত মানুষ আবার নিজের জীবন ফিরে পেয়েছে তবে আজ পারলাম না। আমি ব্যর্থ হলাম। আজ আমি ব্যর্থ হলাম।”

তাকদীর এগিয়ে গিয়ে আঁকড়ে ধরলো অয়ন কে। আর রুবা ধরে আছে মিলি কে। তাকদীর নিজেও আজ প্রথম তন্ময়কে দেখল। তাকালো মিলির দিকে। মিলি কিন্তু কাঁদছে না ভীষণ স্বাভাবিক। শুধু নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তন্ময়ের দিকে। তাকদীরের আজ আবারো একটা কথা মনে পড়লো।

মিলি ভালোবেসে কতটা জঘন্যভাবেই না ঠকে গিয়েছিল। তাকদীরের মনে শুধু একটা প্রশ্নই আসে একটা মানুষ ঠিক কতটা বাজে ভাবে ভেঙে পড়লে নিজেকে আর কখনো জোড়া লাগানোর কথা ভাবতে পারে না।

সবাই চুপ করে আছে, কোন কথা বলছে না। কেউ কাঁদছেও না। আজ তন্ময় ঠিক এতটাই অসহায় যে ওর মৃত দেহটা দেখে একজন কাঁদার মানুষও নেই। কেউ নেই। কেউ নেই যে তন্ময় না থাকার জন্য একটু আফসোস করবে, কেউ নেই যে একটু তন্ময়ের কমতি অনুভব করবে। যাদের করার কথা ছিল তাদের আর সেই অনুভূতিগুলো বেঁচে নেই।

মিলি এখন আর কার কমতি অনুভব করবে যে গত আটাশটা বছর ধরে মিলির জীবনে ছিলই না? অয়নই বা কার কমতি অনুভব করবে যাকে জন্মের পর থেকে আজ প্রথম দেখলো, তার?

মিলি একটু হাসলো। নিজেই মনে মনে বিড়বিড় করলো,

“আজ তোমার সব কষ্টের সমাপ্তি ঘটলো তন্ময়। আমি তোমায় ক্ষমা করলাম আজ। আজ এই মুহূর্তে আমি তোমায় ক্ষমা করে দিলাম। তোমার সকল অন্যায়ের, সকল পাপের জন্য আমি তোমায় ক্ষমা করে দিলাম। এই জীবনে তুমি যতটা না আমায় কষ্ট দিয়েছো তার থেকেও হয়তো অনেক বেশি কষ্ট নিজে পেয়েছো। আমি জানিনা তুমি ওপারে গিয়ে কেমন থাকবে। সৃষ্টিকর্তার দরবারে এখনো তোমার ঠিক কতটা পাপ জমা হয়ে আছে। তবে আমি তোমায় ক্ষমা করে দিলাম। এই জীবনে যেমন মুক্তি দিয়েছিলাম তেমনি আমি আমার সাথে করা তোমার অন্যায় ক্ষমা করে দিয়ে তোমাকে ওই জীবনেও আমার পক্ষ থেকে মুক্ত করে দিলাম।”

_______

কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল। আবহাওয়াটা আজ ভারী সুন্দর। মিলি গায়ে একটা শাল জড়িয়ে হোটেলের লনে বসে আছে। হোটেলটা খুব সুন্দর। এখান থেকে একদম পাহাড়গুলো স্পষ্ট ভাবে দেখা যায়। দূর থেকে দেখলে মনে হয় পাহাড়ের চূড়ায় উঠলে আকাশের মেঘগুলো ছোঁয়া যাবে।

পাহাড় অঞ্চল হওয়ায় ঠান্ডা আরো বেশি পড়েছে। মিলি চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে আর ভাবছে বিগত কিছুদিনের কথা। ওদের ঘুরতে আসার কথা ছিল আরো একমাস আগে তবে সেদিন তন্ময়ের হঠাৎ আগমন, তারপরে তন্ময়ের মৃত্যু সবকিছু কেমন পিছিয়ে গিয়েছিল। মিলি চায়নি ওদের আনন্দের পথে বাধা সৃষ্টি করতে তবে কেউই আর এই পরিস্থিতিতে ঘুরতে আসতে চায় নি।

এখনো হয়তো আসতো না তবে মিলি সবাইকে জোর করেছে। এতগুলো বছর যার কোন অস্তিত্বই ছিল না মিলির জীবনে তার জন্য কেন বাকি সবার আনন্দ মাটি হয়ে যাবে।

নিজের এসব ভাবনার মাঝে ওর পাশের চেয়ারে এসে নীলিমা বসলো। নীলিমাকে দেখতেই মিলি হালকা হাসলো। নীলিমাও পাল্টা হেসে বলল,

“একা একা বসে আছিস যে?”

“আমার একা বসে থাকতে ভালো লাগে। ভীড়ের মাঝে থাকতে ভালো লাগেনা।”

“তবে আমাদের সবাইকে আসতে জোর করলি কেন? তুই, অয়ন আর রুবা আসতি।”

“চুপ কর তো। নিজের ভালো লাগা কে সবসময় প্রাধান্য দিতে নেই। এমনটা তো না যে তোরা এসেছিস জন্য খারাপ লাগছে। এখন একাকীত্বটা ভালো লাগছে, একটু পর হয়তো তোদের সাথে আড্ডা দিতে ভালো লাগবে। সিয়াম কোথায়?”

“ওঠেনি ঘুম থেকে।”

“তা বল মেয়ের বিয়ে কবে দিচ্ছিস?”

এ পর্যায়ে নীলিমার মুখে একটু চিন্তার ছাপ দেখা গেল। চিন্তিত গলাতেই বলল,

“এটা নিয়ে না খুব চিন্তায় আছি মিলি। বিয়ের সম্বন্ধ পাকা প্রায় হয়েছিল এক জায়গায়। ছেলে, ছেলের পরিবার সবাই মোটামুটি ভালোই ছিল। তবে যখন শুনেছে আমরা আমাদের মেয়ে কে এডপ্ট করেছি তখন রাজি হয়নি। এই বিষয়টা মেয়েটার উপর খুব বাজে একটা প্রভাব ফেলেছে।”

মিলি আলতো হেসে নীলিমার কাঁধে হাত রেখে ভরসা দিয়ে বলল,

“চিন্তা করিস না সব ঠিক হয়ে যাবে। এডপ্টের কথা শুনে যারা বিয়েটা ভেঙে দিয়েছে তাদের বাড়িতে মেয়েকে না পাঠানোই ভালো। সামান্য একটা কথা যদি ওদের উপর এতটা প্রভাব ফেলে, সংসারে তৈরি হওয়া বড় বড় বিষয়গুলো যে ওরা কোন নজরে দেখবে সেটা ভেবেই তো আমার ভয় করছে।”

“তা অবশ্য ঠিকই বলেছিস।”

আরো টুকটাক কিছু কথাবার্তা বলে মিলি উঠে দাঁড়িয়ে নীলিমাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমি একটু আশপাশটা হেঁটে আসি। এভাবে বসে থাকতে ভালো লাগছে না।”

“একা একা যাবি? অয়নকে নিয়ে যা।”

“না থাক ও ঘুমোচ্ছে। আমি ফোন নিয়ে যাচ্ছি। সমস্যা হলে কল করব।”

নীলিমা আর বাঁধা দিলোনা। হাঁটতে হাঁটতে মিলি বেশ অনেকটা দূরে চলে এলো। বেছে বেছে একটা ফাঁকা জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালো। মাঝে খাদ আর তার সামনে বিশাল বড় পাহাড়। কুয়াশার কারণে পাহাড়টা ভালোভাবে দেখাও যাচ্ছে না। সূর্যও ওঠেনি। হিম শীতল হাওয়ায় মিলির গা শিউরে উঠলো। পরনে শীতবস্তু থাকলেও ঠান্ডা লাগছে।

হঠাৎ করে মিলি একটু উষ্ণতা অনুভব করলো। সেই সাথে অনুভব করলো ওর শরীর কেউ কিছু একটা দিয়ে ঢেকে দিল। পাশে তাকাতেই দেখলে অয়ন দাঁড়িয়ে আছে। ওর গায়ের জ্যাকেট মিলি কে পরিয়ে দিয়েছে। মিলি আলতো হাসলো। দৃষ্টি আবার পাহাড়ের দিকে তাক করে বলল,

“এত তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে পড়েছ কেন? রুবা উঠেছে?”

“না ও ঘুমোচ্ছে। আমার ঘুম ধরছিল না তাই উঠে এলাম। নীলিমা আন্টির থেকে শুনলাম তুমি নাকি একা একা হাঁটতে বেরিয়েছো তাই ভাবলাম তোমাকে একটু সঙ্গ দেই।”

মিলি আবারো আলতো হাসল। এরপর বেশ কিছুক্ষণ দুজনে চুপ থাকলো। তারপর হঠাৎ করে অয়ন একটু ইতস্তত গলায় বলে উঠলো,

“সেদিন আমি ওনাকে অনেক অনিচ্ছায়কৃত ভাবে বাবা বলে ডেকে ফেলেছিলাম। ওনার জানাজা, কবর সবকিছুর ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলাম। ওনার কবরে মাটিও দিয়েছিলাম। তুমি কি এজন্য রাগ করেছো আমার উপরে মা? আসলে উনি আমার বাবা জন্যই আমি এমনটা করিনি। ওনার কেউ ছিলনা, ওনার মৃত দেহের দায়িত্ব নেওয়ার মতন কেউ ছিলনা জন্য করেছি।”

মিলি একটু হেসে বলল,

“লুকোচ্ছো কেন? মানুষটা যতই খারাপ হোক না কেন র'ক্তের একটা টান বোধহয় থেকেই গেছে বাবা। এই যেমন ধরো তুমি তাকে বাবা বলে ডাকতে চাওনি তবুও ডেকে ফেলেছিলে। তার শেষ ইচ্ছাটা রাখতেই হয়ত। শেষে ছেলের হাতের মাটি পেয়েছে, জানাযায় তার ছেলে শরিক হয়েছে।”

“তুমি কি কষ্ট পেয়েছো এতে?”

“না তো। আমার গর্ব হয়েছে আমার ছেলের প্রতি। তার, তার বাবার প্রতি যতই অভিযোগ থাকুক না কেন, মনের মাঝে যতই ঘৃণা থাকুক না কেন তবুও একজন মানুষের মৃত্যুর পরে তোমার যেটুকু দায়িত্ব পালন করার ছিলো তুমি করেছো সেই সব ঘৃণা ভুলে।”

অয়ন চুপ করে গেল। কিছুক্ষণ পরে আবার বলল,

“তোমার কি ওনার জন্য কষ্ট হচ্ছে আম্মু?”

মিলি একটু ভাবনার মাঝে পড়ে গেল। সত্যিই কি মিলির কষ্ট হচ্ছে? তবে কাঁদলো না কেন? তন্ময় মারা যাওয়ার এক মাস হয়ে গেছে। নিজের চোখে দেখেছে তন্ময়কে সবকিছু ছেড়ে চলে যেত তবুও মিলি কাঁদেনি। তবে তো নিশ্চয়ই কষ্ট হচ্ছে না।

“আমার বাবা মৃত্যুর আগ অব্দি আমায় আর নিজের সন্তান বলে পরিচয় দেয়নি তবুও তার মৃত্যুতে কেঁদেছি, আমার মায়ের মৃত্যুতে আমি কেঁদেছি, তন্ময়ের বাবা মানে যখন আমার শ্বশুর মা'রা যাওয়ার খবর পাই তখনও আমি কেঁদেছি। তবে আমার শাশুড়ি মা'রা যাওয়ার খবর অনেক পরে পেয়েছি তাও চোখে জল এসেছিল। এমনকি তাকদীরের মা যখন মা'রা যায় তখনও আমি কেঁদেছি। কেঁদেছি তার কারণ আমার কষ্ট হয়েছিল, আমার খারাপ লেগেছিল। তবে তন্ময় মা'রা যাওয়ার পর আমার চোখ দিয়ে একফোঁটা পানিও পড়েনি। তবে তো নিশ্চয়ই আমার কষ্ট হয়নি তাই না?”

অয়ন কিছুক্ষণ নিষ্পলক দৃষ্টিতে মিলির দিকে তাকিয়ে থাকলো। মিলি তাকালো না অয়নের দিকে। তাকিয়ে থাকলো সে পাহাড়ের দিকে, তাকিয়ে থাকলো কুয়াশায় ঢাকা আকাশটার দিকে। হঠাৎ করে অয়ন এক হাতে জড়িয়ে ধরল মিলিকে। মিলির মাথাটা বুকের সাথে চেপে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

“তুমি নিশ্চয়ই অনেকদিন হলো কাঁদার জন্য কোন ভরসা যোগ্য জায়গা পাওনা তাই না মা? আমি তো আছি। তুমি কাঁদতে পারো। আমি কাউকে দেখতে দেবো না আমার মা দুর্বল জায়গাটা। তোমার সবটুকু যন্ত্রণা আমি নিজের মাঝে লুকিয়ে রাখব মা।”

মিলির কাঁদার কথা ছিল তবে কাঁদলো না।বরং হেসে উঠে বলল,

“কি অদ্ভুত তাই না! কাল অব্দি যে ছেলেটা মায়ের আঁচল ধরে কাঁদতে কাঁদতে পিছু পিছু ঘুরতো আজ সে মা কে কাঁদার জন্য নিজের বুকে জায়গা দিচ্ছে। মায়ের কান্না গুলোকে এই দুনিয়ার নজর থেকে লুকোনোর চেষ্টা করছে।”

“তুমি আমার জন্য অনেক কষ্ট করেছো মা। আমি জানিনা তুমি আমার জন্য যা যা ত্যাগ করেছো, যা যা কষ্ট সহ্য করেছো তার বিনিময়ে কতটুকু সুখ আমি তোমায় দিতে পেরেছি। তবে বিশ্বাস করো আমি তোমায় খুব ভালোবাসি মা। তোমায় ছাড়া আমি পৃথিবীটা কল্পনাও করতে পারি না। তোমার যখনই কষ্ট হবে তুমি একটু আমায় বলো কেমন? আমি তোমায় জড়িয়ে ধরবো। তোমায় হয়তো কেউ এতদিন সান্ত্বনা দেওয়ার মতন ছিল না তবে এখন আমি আছি।”

মিলি হাসলো। আজ মিলির জীবন সার্থক। আজ মিলির বেঁচে থাকা সার্থক। জীবনের এতো লড়াই, এত সংগ্রাম যে সন্তানের জন্য সেই সবকিছু সার্থক। এতদিন মিলির কাঁদার কোন জায়গা ছিল না, নিজের দুর্বলতা গুলো দেখানোর কোন জায়গা ছিল না তবে আজ মিলিকে আগলে রাখার জন্য মিলির ছেলে আছে।

তবে আফসোস একটাই এই জীবনটা আরেকটু সুখকর হতে পারতো। যদি তন্ময় সেই একটা ভুল না করতো তবে আজ ওদের জীবনটা অন্যরকম হতে পারতো। দীর্ঘ কয়েক বছর এত কষ্টে কাটাতে হতো না। সবাই একসঙ্গে একে অপর কে ভালোবেসে কাটাতো।

এসেছিল মিলির জীবনে কোন এক কালে বসন্ত। ফুল ফুটেছিল সেই বসন্তে, কোকিল গান গেয়েছিল সেই বসন্তে। সেই বসন্ত চলে গেল, থাকলো না সেই রঙিন ফুল গুলো, গান গাইলো না আর কোকিল। পরে আবারো বসন্ত এলো। সেই বসন্ত এলো মিলির জীবনেও। তবে সেই বসন্তে আর কোন ফুল ফুটল না, কখনো আর সেই বসন্তে কোকিল গান গাইলো না।

মিলির সেই রঙিন বসন্ত তারপরে পরিণত হলো রিক্ত বসন্তে। যে বসন্তে রয়েছে কেবলই শূন্যতা, কেবলই হাহাকার আর যন্ত্রণা। মিলি আপন করে নিল সেই বসন্তকেই। গল্পটা কোন এক রঙিন বসন্তে শুরু হলেও তার সমাপ্তি ঘটলো রিক্ত বসন্তে। আর মিলি এতেই খুশি, এতেই নিজের জীবনের সার্থকতা।

...........সমাপ্ত.............

নোট:অবশেষে আল্লাহ আমায় আপনাদের গালি থেকে মুক্তি দিল। আশা করছি যারা এখনও গল্পটা পড়ছেন তারা আজ আর নিরবে পড়ে চলে যাবেন না। অবশ্যই মন্তব্য জানাবেন। আর যাদের ভালো লেগেছে গল্পটা তারা পারলে রিভিউ দিয়েন। এত কষ্ট করে লিখে এতটুকু নিশ্চয়ই আমার প্রাপ্য

বিজ্ঞাপন
রিক্ত বসন্ত গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস