রিক্ত বসন্ত

পর্ব - ৪৭

🟢

“আন্টি, চাবিটা দেওয়ার জন্য এসেছিলাম।”

তাহরিমা বেগম মূর্তির মতন হাতটা বাড়িয়ে দিলেন। মিলি ওনার হাতে চাবিটা দিল। মিলির এখন কি বলা উচিত বুঝে উঠতে পারছে না। তবে ইচ্ছে করছে একবার তাহরিমা বেগম কে জড়িয়ে ধরতে। তবে ঠিক সাহস করে উঠতে পারছে না। যার ছেলেকে এভাবে কষ্ট দিল, যে মানুষগুলো ওকে এতটা সাহায্য করলো আজ স্বার্থপরের মতন তাদের কথা মিলি একবারের জন্যও ভাবেনি। কৃতজ্ঞতা জানানোর সাহসও কেন যেন আর হলো না। শুধু ছোট্ট করে বলল,

“আসছি আন্টি। ভালো থাকবেন।”

মিলি যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েও থেমে গেল। হুট করে পিছন ফিরে এক হাতে তাহরিমা বেগমকে জড়িয়ে ধরলো। তাহরিমা বেগম চমকালেন। ওনার বিস্ময়ের মাত্রা এতটাই বেড়ে গেছে যে পাল্টা মিলিকে জড়িয়েও ধরতে পারলেন না। শুধু খেয়াল করলেন ওনার কাঁধটা যেন একটু ভেজা ভেজা অনুভূত হচ্ছে। সেই সাথে ওনার কানে ভেসে এলো মিলির অপরাধী কন্ঠস্বর।

“পারলে আমার ক্ষমা করে দেবেন আন্টি। আর আপনার পা'গল ছেলেটাকে একটু বোঝাবেন। ওকে বোঝাবেন যে আমি ওর জন্য ঠিক না। আমার পক্ষে আর কাউকে ভালোবাসা সম্ভব না। আমি পারবো না আন্টি।”

তাহরিমা বেগম এক হাতে মিলিকে জড়িয়ে ধরে অন্য হাতে অয়নের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। খুব শান্ত কণ্ঠে মিলিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“তোমার সিদ্ধান্তকে আমি সম্মান করি মিলি। আমি তোমাকে আমার ছেলের কথা ভাবতে বলছি না, আমি তোমাকে তোমার নিজের কথা ভাবতে বলছি। আমি জানি মা একা জীবনটা কাটানো কতটা কষ্টকর।”

“তবে তো আপনি এটাও বুঝবেন আন্টি যে যাদপর মন একবার ভেঙ্গে যায়, একবার যাদের কারো ভালোবাসার উপর থেকে ভরসা উঠে যায় তারা দ্বিতীয়বার আর নিজেকে সুযোগ দিতে পারে না।”

থেমে গেলেন তাহরিমা বেগম। মিলি কে বোঝানোর মতোন আর কোনো শব্দ খুঁজে পেলেন না। মিলির কথার মানে তো উনি নিজেও খুব ভালো করেই জানেন। উনি নিজেও তো ভাঙ্গা হৃদয়টাকে আর জোড়া লাগাতে পারেননি। ওনাকেও কেউ নিজের জীবনে জায়গা দিতে চেয়েছিল, ওনাকেও কেউ ভালোবাসতে চেয়েছিল তবে উনিও পারেননি নিজের জীবনকে দ্বিতীয় সুযোগ দিতে। এমনটা না যে ওনার আগের স্বামীর প্রতি ভালোবাসা ছিল। সেই লোকটার প্রতি তো এখন কেবল ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই নেই। তবে ভালোবাসার উপর থেকে বিশ্বাসটা উঠে গেছে তাই আর পারেননি নিজেকে সুযোগ দিতে।

মিলি মাথা তুলে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই দেখলো পেছনে তাকদীর দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটো লাল টকটক করছে। কে জানে না ঘুমোনোর জন্য এমন হয়েছে নাকি অতিরিক্ত কাঁদার জন্য?

তাকদীর কে দেখে মিলির একটু অস্বস্তি হলো। এই কয়দিনে তাকদীরের সামনে তেমন একটা পড়তে হয়নি মিলি কে। বলা যায় ইচ্ছে করে পড়েনি। যদিও বা দেখা হয়ে গিয়েছে তো তাকদীর পাশ কাটিয়ে চলে গিয়েছে। অনেকগুলো দিন পর আজ আবারও এমন সামনাসামনি দেখলো ছেলেটা কে। তাকদীর গভীর গলায় তাহরিমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আম্মু ওনাকে বলে দাও ওনাকে আর নিজের ওপর জুলুম করে নিজের ভাঙ্গা হৃদয়কে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করতে হবে না। আমার হৃদয়টাও ভেঙে গেছে। আর ওনাকে নিজের করে পাওয়ার আবদার করবো না।”

কথাটা বলে তাকদীর এগিয়ে এসে মিলির কোল থেকে অয়নকে একপ্রকার কেড়েই নিল। জোরে জোরে পা ফেলে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল।

মিলি তাহরিমা বেগমের থেকে বিদায় নিয়ে নিজেও নিচে চলে গেল। মিলি গিয়ে দেখলো তাকদীর একটা অটো দাঁড় করিয়ে রেখেছে। মিলিকে দেখে তাকদীর অয়নকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“অয়ন তোর আম্মুকে বল অটোতে উঠতে।”

মিলি বুঝলো তাকদীর ওর সাথে কথা বলতে চাইছে না। এটাই মিলির কাছে ভালো মনে হলো। যত কথা কম বলবে তত তাড়াতাড়ি মিলিকে ভুলে যেতে পারবে।

মিলি এগিয়ে গিয়ে তাকদীর কে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় বলল,

“তোমাকে এত কষ্ট করতে কে বলেছে? আমি পারতাম অটো ডেকে নিতে।”

তাকদীর তেঁতে উঠে বলল,

“জানি আপনি পারতেন। আপনি তো সব পারেন। শুধু পারেন না নিজের ভাঙ্গা মনটাকে আরেকবার জোড়া লাগাতে। যাইহোক গাড়িতে গিয়ে উঠুন।”

“অয়নকে দাও।”

“আমার কোলে আছে সমস্যা কি হচ্ছে? ফেলে দেব আপনার ছেলেকে নাকি মা'রবো?ও যে আমার কাছে সেফ আছে এটাও এখন আর বিশ্বাস হয়না?”

মিলি বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

“এভাবে কথা বলছ কেন তুমি? আমি কি এসব বলেছি নাকি? আমি যাবো তো অয়নকে নিতে হবে না?”

“আমিও তো যাচ্ছি তাহলে আমার কাছে থাকলে সমস্যা কি?”

“কিন্তু তুমি কেন যাবে? তোমার যাওয়ার কোন প্রয়োজন নেই।”

“আমার যা ইচ্ছে হবে আমি তাই করবো। আপনি অটোতে নিয়ে যাবেন না তো ঠিক আছে আমি বাইকে করে চলে যাব তবে আমি যখন বলেছি যাব তার মানে যাবই।”

মিলি মৃদু রাগী কন্ঠে বলল,

“বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু তাকদীর। আমি তোমার থেকে দূরত্ব মেইনটেইন করতে চাইছি যেন তুমি তাড়াতাড়ি আমাকে ভুলে যেতে পারো। তবে তুমি ব্যাপারটা আরো জটিল করে তুলছো কেন?”

“আপনি জটিল করছেন ব্যাপারটা কে। আমি কি আর একবারও আপনাকে বলেছি আমাকে ভালোবাসুন? আমি কি একবারও আর আপনাকে বলেছি আমাকে বিয়ে করুন? বলিনি তো। একটা স্বাভাবিক সম্পর্কও রাখতে দেবেন না আপনার সাথে? জীবনসঙ্গী না হয় নাই বানালেন, বন্ধুও বানাতে পারবেন না? এতটা অযোগ্য আমি?”

মিলির কন্ঠ এবার নরম হলো। অসহায় গলায় বলল,

“এমনটা না তাকদীর। আমি তোমার ভালোর জন্য বলছি এমনটা।”

“আর না হয় নাই ভাবলেন আমার ভালো। এবার আমাকে একটু ভাবতে দিন আমার ভালোটা। আপনি যেমন বোঝেন কোন বিষয়টাতে আপনি ভালো থাকবেন তেমনি আমিও বুঝি কোন বিষয়টাতে আমি ভালো থাকবো।”

মিলি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ওর জীবনের মতন যেন তাকদীরের জীবনটাও ছন্নছাড়া হয়ে যাচ্ছে। সব কিছু ছন্নছাড়া হয়ে যাচ্ছে। মিলি পারছে না কোন কিছু সামলাতে। না নিজের জীবন সামলাতে পেরেছে আর না তাকদীরের জীবনটা কে সামলে দিতে পারছে।

……

(বর্তমান)

“এটা কি ঠিক হলো ম্যাম? মিলি কি তাকদীর কে একটু বেশিই কষ্ট দিয়ে ফেলল না?”

রুবা আলতো হাসলো। উপস্থিত সবারই তাকদীরের জন্য কষ্ট হচ্ছে। রুবা যখন এই গল্পটা শুনেছিল তখন রুবারও কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু কেউ এটা বুঝবে না যে তাকদীর এই কষ্টটাকে হাসিমুখে গ্রহণ করে নিয়েছে। এই কষ্টটা নিয়েই বাঁচতে তাকবীর বেশি খুশি। রুবা ভাবলো ওর এই ভাবনা সবাইকে বোঝাতে হবে। অল্প কিছুক্ষণ নিজেই নিজের ভাবনায় কিছু কথা সাজালো। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে রুবার মুখ থেকে কিছু শোনার জন্য। অবশেষে রুবা আবারও মুখ খুলল,

“একটা বিষয় জানো তো প্রত্যেকটা মানুষের সুখ আলাদা আলাদা বিষয়ের মাঝে নিমজ্জিত থাকে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে আমাদের যেটা অন্যের কষ্ট বলে মনে হয় সেটা তার কাছে সুখও হতে পারে।”

“কিন্তু ম্যাম এভাবেই তাহলে ওদের গল্পটা শেষ হয়ে যাবে? এত খারাপ একটা পরিণতি হলো ওদের?

“আমি তো বলিনি গল্পটা শেষ। আমি তো বলেছিলাম এই গল্পটা এখনো চলমান। এর কোন সমাপ্তি এখনো হয়নি তবে তোমরা আগেই এত ভাবছো কেন?”

“আলাদা হয়ে গেল তো ওরা!”

“এই গল্পটার বর্তমান চলমান অবস্থা তোমরা যে যে নজরে দেখবে তেমনি লাগবে তোমাদের কাছে। তোমরা যদি বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করতে চাও তবে ইতিবাচক লাগবে, নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতে চাইলেই তেমনই লাগবে।”

সবার হরেক রকমের প্রশ্নে কিছু নির্দিষ্ট শিক্ষার্থী বিরক্ত হলো। গল্পটা পুরোই করতে দিচ্ছে না। রুবা ম্যাম তো বললোই যে এখনো গল্পটা শেষ হয়নি তারপরও এদের প্রশ্ন শেষ হচ্ছে না। যতসব বিরক্তিকর ছেলে মেয়ে। তন্ময়ের থেকেও যেন বেশি বিরক্তিকর লাগলো ওদেরকে।

এসব ভাবনার মাঝেই হুট করে তন্ময়ের কথা মনে হলো। আচ্ছা তন্ময়ের কি হলো? তন্ময়কে নিয়ে তো আর কিছু বলল না। আচ্ছা মিলি আবার তন্ময়ের কাছে ফিরে চলে যায়নি তো? আর তাকদীরের কি তোহার সাথে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল?

নিজের কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে একটা মেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে উৎকন্ঠিত গলায় রুবাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ম্যাম তন্ময়ের কথা তো বললেন না? মিলি আবার তন্ময়ের কাছে ফিরে চলে যায় নি তো?”

“এই চিনলে তোমরা মিলিকে? আমার তো এখন মনে হচ্ছে আমি তোমাদেরকে মিলির সম্বন্ধে ঠিকঠাক ধারণাই দিতে পারিনি। তোমরা ভাবলে কি করে মিলি আবার তন্ময়ের কাছে ফেরত যেতে পারে? তন্ময় এর মতন মানুষের সাথে কি সংসার করা যায়?”

রুবার বিস্ময় ভরা কন্ঠের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে মেয়েটা কাচুমাচু করে বলল,

“না মানে ম্যাম আসলে তন্ময়কে নিয়ে তো কিছু বলছেন না। মিলিও তাকদীরকে ফিরিয়ে দিল তাই ভাবলাম আর কি।”

“এমন কিছুই হয়নি। সেই যে মিলির ঢাকায় তন্ময়ের সাথে দেখা হয়েছিল তারপর থেকে আর তন্ময়ের কোন খোঁজ পায়নি। তন্ময়ও আর কোনো যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি আর না মিলি কখনো নিজে যোগাযোগ করবে। এটা অসম্ভব। জানিনা তন্ময় এখন কোথায় আছে, কিভাবে আছে, আদৌ বেঁচে আছে কিনা।”

বিজ্ঞাপন

তন্ময়ের কথাটা শুনে অনেকের চোখমুখে করুণা ভেসে উঠলো, অনেকের বোধহয় একটু মায়াও হলো। আবার অনেক কে আনন্দিত দেখা গেল। তাদের মতে তন্ময়ের সাথে যা কিছু খারাপ হচ্ছে সেটাই ঠিক হচ্ছে।

রুবা আবারো ফিরে গেলে অতীতে। অতীতের পাঠটুকু সম্পূর্ণ করতে।

.........

(অতীত)

মিলি চলে যাওয়ার একমাস অতিক্রম হয়ে গিয়েছে। এক মাসে যদি কিছুর পরিবর্তন হয়ে থাকে তবে সেটা মিলি আর তাকদীরের যোগাযোগে পরিবর্তন এসেছে। সেই যে সেদিন মিলি চলে যাওয়ার সময় শেষ বারের মতন তাকদীর মিলির সাথে কথা বলেছিলো তারপর থেকে আর দুজনের মাঝে কোন কথা হয়নি। হ্যাঁ দেখা হয়েছে ঠিকই তবে দুজনের মাঝে একটা অক্ষরও বিনিময় হয়নি।

তাকদীর গেছে অয়নের সাথে দেখা করার জন্য। খুব বেশিক্ষণ সেখানে থাকেনি, অয়নের সাথে একটু সময় কাটিয়েই চলে এসেছে। মিলি দু একবার মানা করেছে তবে তাকদীর মিলির কথা পুরোপুরি অবজ্ঞা করে গেছে। মিলির কেন যেন আজকাল সাহস হয় না তাকদীরের সাথে কথা বলার। আর তাকদীর কেন মিলির সাথে কথা বলে না সেই কারণটা ওর নিজেরও জানা নেই।

জানেনা অভিমানে, নাকি অভিযোগে, নাকি অস্বস্তিতে। তবে হ্যাঁ কথা বলতে পারে না। দেখা তো করতে যায় অয়নের অজুহাত দিয়ে তবে মিলিকে দেখাও তো একটা বড় কারণ যাওয়ার। শুধুই অয়নকে ভালোবেসেছে তাকদীর এমনটা তো না। ভালোবেসেছে মিলি আর অয়ন দুজনকেই। বরং অয়নের থেকে একটু হলেও বেশি মিলিকে ভালোবেসেছে। সেখানে অয়নকে না দেখেই যদি থাকতে না পারে তবে মিলিকে না দেখে থাকবে কি করে?

তবে হ্যাঁ সে একদিনও আর মিলি কে গিয়ে বলেনি যে মিলি আপনাকে দেখার জন্য এলাম, মিলি আপনার কমতি অনুভূত হচ্ছে বলে ছুটে এলাম। শুধু বলে অয়নকে দেখার জন্য এসেছি।

তাহরিমা বেগম চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। এখন আর তার কাজে যাওয়ার কোন তাড়া নেই। বাইরে যাওয়া হয় না। সারাদিনরাত ঘরেই কাটে। ঘরে টুকটাক কাজ আর বই পড়া এর মধ্যে দিয়েই তার দিন অতিবাহিত হয়। আর এই সবকিছুর ফাঁকে ফাঁকে ছেলের চিন্তা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়।

তার চঞ্চল ছেলেটা শান্ত হয়ে গেছে। এখন আর তাকে আলাদা করে তার ছেলেকে নিজের চঞ্চলতা কমাতে বলতে হয় না, তাকে আর বলতে হয় না তাকদীর আস্তে চলাফেরা করো। বরং ছেলেটা নিজ থেকেই শান্ত হয়ে গিয়েছে। এতটাই বেশি শান্ত হয়ে গিয়েছে যে আজকাল আর মায়ের সাথেও তেমন কথাবার্তা বলে না।

সেই দুষ্টুমি গুলো আর করে না, মা ছেলের মাঝে খুনসুটি গুলো আর হয় না। জীবনটা যেন গতিবিহীন হয়ে গিয়েছে। এই জীবন আর খরস্রোতা নদী নেই, হয়ে গেছে এক শান্ত নদী।

দুপুরে রান্না শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ। সময় গড়াতে গড়াতে এখন ঘড়ির কাঁটা তিনটের ঘরে গিয়ে ঠেকেছে। তাকদীর এখনো বাড়ি ফেরেনি। যার ফলে তাহরিমা বেগমের খাওয়া হয়ে ওঠেনি। একা একা খেতে ইচ্ছে করে না। এখন তো মনে হয় চাকরিটা ছেড়েই ভুল করেছে। অন্তত সময়টা কাটতো। উনি তো আর জানতেন না যে মিলি চলে যাবে এখান থেকে। ভেবেছিলেন একটা সঙ্গী পাওয়া যাবে। কিছুদিন পর হয়তো মিলি একেবারের জন্য ওনার বাড়িতে চলে আসবে। তখন অয়নকে কাছে পাবে। সময়টা ঠিক ভালোভাবে কেটে যাবে। তবে এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনার জন্য ওনার সব পূর্ব পরিকল্পনা যেন ভেস্তে গেল।

বাড়ি ফিরতে ফিরতে তাকদীরের চারটা বেজে গেল। কলিংবেলের আওয়াজ কানে যেতেই তাহরিমা বেগম দরজাটা খুলে দিলেন। দেখতে পেলেন তাকদীরের ক্লান্ত মুখটা। তবে তাকদীর নিজের সবটুকু ক্লান্তি ভাব নিজের মায়ের কাছ থেকে আড়াল করার জন্য মুখে হালকা একটু হাসি ফুটিয়ে তুলল।

তাহরিমা বেগম বুঝলেন ছেলের এই হাসিটা মিথ্যে তবে তিনি আর সেটুকু মুখে বললেন না। যে কারণেই হোক ছেলেটা হেসেছে তো অন্তত। তাকদীর বুঝতে পেরেছে যে ওকে হাসতে হবে, ওকে ভালো থাকতে হবে। ওর আম্মুর জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।

তাকদীর সোজা নিজের ঘরে চলে গেল। তাহরিমা বেগম খাবারগুলো গরম করে টেবিলে রাখলেন। একটু পর তাকদীর এলো। যদিও খাওয়ার কোন ইচ্ছে নেই তবে তাকদীর জানে ও না খেলে ওর আম্মুও খাবে না সেজন্য বাধ্য হয়ে তিন বেলা খেতে হয় কষ্ট করে ওর মায়ের কথা ভেবে। আজকাল তো তাকদীর কে নিজের অনিচ্ছায় অনেকই কিছু করতে হয়। না হলে তো জীবনটা আরো ছন্নছাড়া হয়ে যেত।

খাওয়া-দাওয়া শেষ করে তাকদীর আবার নিজের ঘরে চলে গেল। তাহরিমা বেগম টুকটাক কাজ শেষ করে নিজেও ছেলের ঘরে গেলেন। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দেখলেন তাকদীর জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি তার বাইরে। চোখ মুখের ভাব কেমন থমথমে, গম্ভীর অথচ তিনি তার এই গম্ভীর ছেলেটাকে চিনতে পারেন না। যে ছেলের মুখ থেকে কখনো হাসি সড়তো না, পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন তার ছেলে সব সময় সবকিছু হাসিমুখে করতে পছন্দ করত আজ সেই ছেলের মুখে তিনি হাসি দেখতে পান না।

“আসবো বাবা?”

তাহরিমা বেগমের কন্ঠ কানে যেতেই তাকদীর চমকে উঠলো। বোধহয় কোন ঘোরের মাঝে ছিল। দরজার দিকে তাকিয়ে তাহরিমা বেগমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ব্যস্ত গলায় বলল,

“এসো আম্মু। আমার রুমে আসতে তোমার আবার অনুমতি লাগবে নাকি?”

তাহরিমা বেগম ভিতরে এলেন। জানালার কাছে গিয়ে ছেলের মুখোমুখি দাঁড়ালেন। তাকদীর জিজ্ঞেস করল,

“কিছু বলবে আম্মু?”

“দেখতে এলাম তুমি কি করছো। আমি একটু থাকি এখানে?”

তাকদীর মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো। নিজেকে স্বাভাবিক করে আবারো দৃষ্টি বাইরে রাখলো। কিছুক্ষণ নীরবতা কাটিয়ে তাহরিমা বেগম বলে উঠলেন,

“আজ মিলির সাথে দেখা করতে গিয়েছিলে?”

তাকদীর শান্ত গলায় বলল,

“বাড়িতে যাওয়ার প্রয়োজন হয়নি। কলেজেই তো দেখা হয়ে যায়।”

“কতদিন এভাবে চলবে ভেবেছো?”

এই প্রশ্নের উত্তর তাকদীর দিতে পারল না। হয়তো আন্দাজ করতে পারছে ওর মা পরবর্তীতে কি বলবে। এই ভয়টাই তো তাকদীর পাচ্ছিলো। এতদিনে একবারের জন্যও তাহরিমা বেগম তাকদীর কে বলেনি মিলিকে ভুলে যেতে কিংবা জীবনে এগিয়ে যেতে বা মিলির জায়গাটায় তোহা কে বসাতে। তাকদীর ওর মায়ের কথা ফেলতে পারবে না। অনুরোধ করতে পারবে, হাত-পা ধরে বোঝাতে পারবে কিন্তু যদি তাহরিমা বেগম না বোঝেন? ওনার না বোঝাটা অস্বাভাবিক না। উনি তো মা, উনি চাইবেনই ওনার সন্তান যেন খুশি থাকে। কিন্তু তাকদীর কি ওনাকে বোঝাতে পারবে যে তাকদীরের খুশি অন্য কোথাও?

“কি হলো বল কতদিন এভাবে চলবে? এর শেষ কোথায়? আর তোমার জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা কবে ঘটবে?”

আবারো তাহরিমা বেগমের কন্ঠে কেঁপে উঠলো তাকদীর। একটু ভাবনা চিন্তা করে বলল,

“সবার জীবনে কি নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটতেই হয় আম্মু?”

“সবার জীবনে ঘটার প্রয়োজন পড়ে কিনা জানিনা তবে আমি চাই আমার ছেলের জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হোক। তুমি আমার বেঁচে থাকার অবলম্বন বাবা, তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে তোমার আম্মু সব দুঃখ কষ্ট ভুলে গিয়েছে। যেদিন তোমার বাবা আমার হাতটা ছেড়ে দিয়েছিল সেদিন যদি তুমি আমার কাছে না থাকতে, যদি তখন তোমার মুখ থেকে আমি আম্মু ডাক না শুনতে পেতাম তবে এতদিন তোমার আম্মু থাকত না। তুমি আমার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা নিশ্চয়ই জানো?”

তাকদীর মাথা নামিয়ে নিল। এই প্রশ্নের কোন উত্তর হয় না। কেননা তাকদীর জানে ওর ভাবনার থেকেও ওর গুরুত্ব মায়ের কাছে বেশি। ঠিক তেমনি ওর মায়ের গুরুত্বও তাকদীরের কাছে সর্বাধিক। খুব ধীর গলায় বললো তাকদীর,

“আমি তোমায় খুব ভালোবাসি আম্মু, খুব ভালোবাসি তোমায়। তোমার গুরুত্ব, তোমার কথার মূল্য আমার জীবনে অনেক। তবে আমি মিলিকেও ভীষণ ভালোবাসি। এরপরে তুমি যা বলবে সেটা তোমার সিদ্ধান্ত।"

তাহরিমা বেগম নিজের দুর্বল সত্তাটাকে বাইরে আনলেন না। আজ তাকে কঠিন থাকতেই হবে। না হলে যে তার ছেলের জীবনটা তিনি গুছিয়ে দিতে পারবেন না।

“মিলি নিজের জীবনে নাই এগোতে পারে। এই বিষয়টা কে আমি স্বাভাবিক বলেই ভাববো। তুমি বুঝতে পারছো যে তুমি ভালো, তুমি কখনো ওকে ঠকাবে না, আমি জানি, মিলিও হয়তো জানে কিন্তু বিশ্বাস করতে পারছে না। এতে ওর কোন দোষ নেই। ও জীবনে খুব বাজে ভাবে ঠকেছে।”

“কি বলতে চাইছো তুমি আম্মু?”

“আমি শুধু এতোটুকুই বলতে চাইছি তোমায় যে তোমার আম্মুকে শান্তি দাও। আমি সবসময় বলেছি তুমি যাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করতে চাইবে আমি তাকেই মেনে নেব তোমার সুখের জন্য। তবে এখন তুমি যা করতে চাইছো এতে তোমার সুখ নেই। আমি আমার ছেলেকে এতটা অসুখী দেখে ম'রতে পারবো না। আমি তোমাকে বলছি না যে তোমাকে তোহাকেই বিয়ে করতে হবে। আমি শুধু তোমাকে বলছি জীবনে এগিয়ে যাও। পিছন ফিরে আর তাকিও না। এতে যেমন তোমার কষ্ট বাড়বে তেমনি বাড়বে মিলির অস্বস্তি।”

“এটা হয় না আম্মু।”

“হওয়াতে হবে। যদি মিলির জীবনে এগোতে না পারাটা তোমার কাছে অদ্ভুত, অযৌক্তিক মনে হয় তবে তুমি কেন জীবনে থেমে আছো বোঝাও আমাকে? তোমার কি মনে হয় না তোমার এই অবস্থা দেখলে মিলির অপরাধবোধ বাড়বে? মেয়েটার জীবনে কিন্তু এমনিতেই অশান্তির শেষ নেই। তুমি নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলে যে তুমি কখনো মিলির জীবনের অশান্তির কারণ হবে না তবে এখন কেন সেই কারণটা হতে চাইছো? তোমাকে এরকম ভাবে দেখলে মিলি ভালো থাকতে পারবে বলো? ও না তোমার হতে পারবে আর না শান্তিতে থাকতে পারবে। তুমি নিজের থেকেও হাজার গুণ বেশি অশান্তিতে তখন মিলিকে ফেলবে।”

তাকদীর এবার অস্থির চিত্তে বলল,

“এমনটা বলো না আম্মু।”

“আমি না বললেই কথাটা মিথ্যে হয়ে যাবে না তাকদীর। আমি তো তোমাকে বললাম তোমাকে তোহাকেই বিয়ে করতে হবে এমনটা না। তবে হ্যাঁ এটা ঠিক যদি আমার পছন্দে কাউকে বিয়ে করতে চাও তবে আমি বলবো তোহা কেই বিয়ে কর। আর যদি বলো যে না তুমি আরেকটু সময় নিয়ে নতুন করে নিজের মনের মতন কাউকে খুঁজে নিতে চাও তবে বেশ তাই হোক।”

তাকদীর অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

“আর ভালোবাসতে পারবো না কাউকে আম্মু। মিলি যেমন আমায় বলেছিল যে ওনার আর কাউকে দেওয়ার মতন কোনো ভালোবাসা অবশিষ্ট নেই হৃদয়ে ঠিক তেমনি আমারও আর কাউকে দেয়ার মতন ভালোবাসা অবশিষ্ট নেই।”

তাহরিমা বেগম ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

“সংসারের বাধন খুব ভয়ঙ্কর এক জিনিস বাবা। তিন কবুল বলে যখন তুমি একটা মানুষের দায়িত্ব নেবে তখন দেখবে আপনা আপনি তোমার মাঝে একটা পরিবর্তন চলে আসবে। একটা মানুষের সাথে যখন দিনরাত চলাফেরা করবে, একই ঘরে থাকবে, একই টেবিলে বসে খাবার খাবে, নিজেদের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেবে তখন দেখবে তার প্রতি ঠিক একটা মায়া জন্ম নেবে। সংসার জিনিসটাই এমন। সংসার হলো একটা মায়ার বাঁধন। একবার যদি তুমি সংসারের জালে বাঁধা পড়ো তবে সেই মায়ার বাঁধন তোমাকে আটকে রাখবে। আর আমি তো আমার ছেলেকে চিনি। আমার ছেলে কখনো নিজের দায়িত্বে গাফিলতি করবে না।”

তাকদীর আবারো অস্থির কন্ঠে বলল,

“কেন এমন করছো আম্মু? পারব না আমি তুমি বুঝতে পারছ না? এসব সম্ভব না।”

তাহরিমা বেগম একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললেন,

“ঠিক আছে আমি তোমাকে সময় দিচ্ছি। তবে শুধু এতোটুকু বলব তুমি আমার শান্তি। সবাই তোমার আম্মুকে কষ্ট দিয়েছে, অশান্তি দিয়েছে, তুমি আর দিও না বাবা।”

কথাটা বলে তাহরিমা বেগম চলে গেলেন। তাকদীরের এখন ভীষণ অস্থির লাগছে। এই ভয়টাই তো তাকদীর এতদিন পাচ্ছিলো। নিজেকে খুব অসহায় লাগলো তাকদীরের। জীবন আজ এমন এক জায়গায় এনে তাকদীর কে দাঁড় করিয়েছে যে তাকদীর এর থেকে বাঁচার কোন পথ খুঁজে পাচ্ছে না। কি অসহায় বানিয়ে ছেড়েছে এই জীবন তাকদীর কে। কেউ তাকদীরকে বুঝতে চাইছে না, কেউ তাকদীরের অনুভূতিগুলো বুঝতে চাইছে না অথচ সবাই চাইছে তাকদীর যেন তাদের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানায়।

বিজ্ঞাপন
রিক্ত বসন্ত গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস