রিক্ত বসন্ত

পর্ব - ৫০

🟢

(বর্তমান)

“তারমানে মিলি সারাটা জীবন একাই কাটিয়ে দিল ম্যাম? ওর জীবনে আপনি একটু শান্তি আনলেন না?”

রুবা শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“আমি ওনার জীবনে শান্তি আনার কে বলো? উনি ওনার নিজের শান্তিটা নিজেই বেছে নিয়েছেন। আর আমি তো বললাম এটা আমার নিজের বানানো কোন গল্প না সত্যি ঘটনা তাই আমি চাইলেই তো কিছু করতে পারবো না।”

মেয়েটা আবারো দুঃখী গলায় বলে উঠলো,

“তাই বলে এভাবে একা জীবনটা কাটিয়ে দিল!”

“উঁহু। মিলি জীবনে একা ছিলই না কখনো। মিলির সাথে ওর ছেলে ছিল তো। ওনার ছেলেকে ঘিরেই ওনার সব স্বপ্ন ছিল। উনি ঠিক যেমন ভাবে ওনার ছেলেকে বড় করতে চেয়েছিলেন তেমন ভাবেই করেছেন। ওনার ছেলে যেমন আজ ওনার গর্ব তেমনি ওনার ছেলের বউয়েরও গর্ব। উনি এমন শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন ওনার ছেলেকে যে একটা মেয়ে কখনো তার স্বামীকে নিয়ে অভিযোগ করার সুযোগ পাবে না, একজন মা কখনো তার ছেলে কে নিয়ে অভিযোগ করার সুযোগ পাবে না।”

বিস্ময়ে সবার চোখ কোটর ছেড়ে বেশি বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। সেই ছোট্ট অয়ন তার মানে এখন এত বড় হয়ে গিয়েছে যে বিয়েও হয়ে গেছে! তাহলে ওরা এটা কত আগেকার গল্প শুনল?

বিস্ময় ভরা কন্ঠে প্রশ্ন করলো,

“ম্যাম অয়নের বিয়েও হয়ে গেছে, ওর আবার বউও আছে?”

“হ্যাঁ। কারণ মিলিরও এখন অনেক বয়স হয়ে গিয়েছে।”

“তারমানে তাকদীরেরও অনেক বয়স হয়ে গিয়েছে। ওদের যোগাযোগ আছে ম্যাম?”

“হুম বয়স তো হয়ে গিয়েছে, যোগাযোগ আছেও। সেই সাথে একটা সুন্দর, স্বাভাবিক সম্পর্কও তৈরি হয়েছে ওদের মাঝে।”

রুবার কথার মাঝেই ওর ফোনটা বেজে উঠলো। সবাইকে একটু চুপ করতে বলে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে বলল,

“হ্যাঁ অয়ন বলো।”

নামটা সবার কানেই পৌঁছালো। আরো একবার বিস্ময়ে সবার চোখ কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। সবাই একে অন্যের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। সবাই ভাবল নামটা ভুল শুনল কিনা। তবে না আরো কয়েকবার ফোনের অপর পাশে থাকা মানুষটাকে রুবা অয়ন বলে সম্বোধন করল।

কথা বলা শেষে ফোনটা ব্যাগে রেখে স্টুডেন্টদের দিকে তাকাতেই দেখলো সবাই হা করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ওদের হঠাৎ এত বিস্ময়ের কারণটা রুবা বুঝে উঠতে পারলো না। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“তোমাদের আবার কি হলো?”

একজন মেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“ম্যাম আপনি কার সাথে কথা বললেন?”

“আমার হাজবেন্ডের সাথে।”

“নাম কি বললেন?”

“অয়ন।”

“ম্যাম অয়ন তো মিলির ছেলের নাম ছিল। তবে আপনার হাজবেন্ডের নাম অয়ন কি করে হলো?”

দাঁত দিয়ে জিভ কাটলো রুবা। নিজেই নিজের ভুলের উপরে বিরক্ত হলো। ও চায়নি এখনই মিলির আসল পরিচয়টা প্রকাশ করতে তবে শেষে ভুলটা করেই বসলো। ভাবলো কোন অজুহাত দেবে। তবে সেই সুযোগটাও রুবা পেল না।

আরেকজন শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে উঠে বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

“ম্যাম গল্পের তাকদীর একবার মিলিকে মুসতারিন ম্যাডাম বলে ডেকেছিল। আমাদের প্রিন্সিপাল ম্যামের নামও মুসতারিন, আপনি ওনারই ছেলের বউ, আবার আপনার হাজবেন্ডের নামও অয়ন। তার মানে কি আমি যেটা ভাবছি সেটাই?”

রুবা বুঝলো এবারে লুকিয়ে কোন লাভ হবে না। ও ওর নিজের ভুলেই ধরা পড়ে গেছে। রুবার নীরবতার মাঝে সবাই একযোগে চেঁচিয়ে বলে উঠলো,

“ম্যাম মুসতারিন ম্যাডাম কি মিলি?”

রুবা একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো। ক্লাসরুমের মাঝে হইচই শুরু হয়ে গেল। সবাই আশে পাশে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সাথে কি সব যেন বলাবলি শুরু করলো। কারোই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না ঠিক করে।

ওদের কে এতো চেঁচামেচি করতে দেখে রুবা শান্ত হতে বলে বলল,

“চুপ কর তোমরা। এতো চেঁচামেচি করলে তো অন্যান্য ক্লাসে অসুবিধা হবে। আর শেষে যদি কেউ তোমাদের মুসতারিন ম্যাডামের কাছে আমার নামে কমপ্লেন করে তবে কলেজের চাকরি তো যাবেই, সেই সাথে কিন্তু বাড়িতে গিয়েও বকা খাব।”

“ম্যাডাম মাথা ঘুরাচ্ছে আমাদের? আমি স্বপ্ন দেখছি না সত্যি মুসতারিন ম্যাডামই মিলি? প্লিজ বলুন একবার!”

“হ্যাঁ রে বাবা, তোমাদের মুসতারিন ম্যাডামই মিলি। তবে এই ব্যাপারে ওনাকে কেউ কিছু বলো না যেন। উনি কিন্তু জানেন না আমি তোমাদেরকে গল্পটা শুনিয়েছি। আমি অনেক কষ্ট করে এই গল্পটা শুনেছিলাম।”

“তারমানে আপনি তাকদীর কেও চেনেন ম্যাডাম?”

“হ্যাঁ খুব ভালো চিনি।”

মেয়েটা ধপ করে আবার নিজের জায়গায় বসে পড়লো। কারোরই যেন কথাগুলো পুরোপুরি বিশ্বাস হচ্ছে না। আবার বিশ্বাস না করেও তো কোন উপায় নেই।

ওদের ভাবনার মাঝেই বেল পড়ে গেল। বেল বাজার শব্দ পেতেই সবাই ভাবনার জগত থেকে বেরিয়ে এলো। রুবা কে আবারো কিছু জিজ্ঞেস করতে নিলে রুবা থামিয়ে দিয়ে বলল,

“আজ আর না। তোমাদেরকে বলার মতন আর কিছু বাকি নেই। যা বলার ছিল বলে দিয়েছি। এই নিয়ে আর কখনো আমাকে কিংবা অন্য কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করো না।”

কথাটা বলে রুবা চলে যেতে নিলে পিছন থেকে একজন বলে উঠলো,

“ম্যাম তাকদীরের পরিস্থিতিটা অন্তত বলে যান? মিলির সাথে বর্তমানে ওর সম্পর্কটা কোন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছে, ও কেমন আছে?”

থেমে গেল রুবা। এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ওর চলে যাওয়া উচিত হবে না। আবারও সবাইকে উদ্দেশ্য করে আলতো হেসে বলল,

“খুব ভালো আছে তাকদীর। মিলি আর তাকদীরের সম্পর্কটা একটা পরিচয় পেয়েছে। অন্যরকম একটা পরিচয় পেয়েছে। যেটা আমরা কেউ কখনো ভাবি নি। তোমরা কেউও কখনো হয়তো ভাবতেও পারবে না তোমাদেরকে যেটা জানাবো। সব যখন বললাম এটাও বলবো তবে আজ নয়। আগামীকাল মুসতারিন ম্যাডাম অবসর নেবেন। ওনার বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তোমাদেরকে একটা চমক দেব।”

______

❝পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়।

ও সেই চোখে দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায়।❞

গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে শাড়ি পড়ছে মিলি। পুরনো দিনের কথা ভোলা যায় কি যায় না সে সব মিলির জানা নেই তবে আজকাল আর মিলির সেই সব দিনের কথা মনে পড়ে না। বয়স হয়েছে, শরীরের চামড়া কুঁকড়ে গেছে, কালো চুলগুলো সাদা রং ধারণ করেছে। এখন আর চোখে মুখে সেই তেজটা নেই, শরীরটাও অনেক দুর্বল হয়ে গিয়েছে। বদলেছে অনেকগুলো ক্যালেন্ডারের পাতা। না জানি এর মাঝে কত বসন্ত এলো আবার চলেও গেল। ফিরে এলো আবার নতুন ভাবে তবে মিলির সেই বসন্ত আজীবন রিক্তই থেকে গেল।

কিন্তু মিলি কখনো এর জন্য আফসোস করে না। এই রিক্ততাই মিলির ভীষণ প্রিয়। এই রিক্ততাই মিলি স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেছে। সেজন্য কখনো এই নিয়ে আফসোসও করেনি।

কালো রঙের জামদানি শাড়ি পরলো মিলি। বয়স হওয়ার কারণে চেহারার সৌন্দর্য অনেকটা কমে গিয়েছে। তবে গায়ের ফর্সা রংটার জন্য কালো শাড়িটা পরে ভীষণ মানিয়েছে মিলিকে। কোন সাজগোজ করার ইচ্ছে মিলির নেই। এসব সাজার ইচ্ছে ম'রে গেছে বহু বছর আগে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শুধু চুলটাকে একটু আঁচড়ে নিল আর ঠোঁটে একটু মেরিল লাগালো।

মিলির আর কোন সাজগোজের দরকার নেই। ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল আটটা বাজে। এইতো একটু পরেই অয়ন চলে আসবে ওদেরকে নিতে।

ভাবতেই মিলির আজকাল অবাক লাগে সেই ছোট্ট অয়নটা আজ কত বড় হয়ে গিয়েছে। আজ আর মিলির অয়নকে হাত ধরে জীবনে চলতে শেখাতে হয় না, আজ সেই অয়ন মিলির ভরসা। আজকাল অয়ন মিলির হাত ধরে হাঁটাচলা করায়।

মিলি পেরেছে নিজেকে দেওয়া নিজের কথা রাখতে, মিলি পেরেছে নিজের মনের মতন করে নিজের ছেলেকে মানুষ করতে। ভীষণ গর্ব হয় মিলির নিজের ছেলের জন্য। ওর ছেলে বোঝে মায়ের কষ্ট, বোঝে মায়ের সংগ্রাম, মায়ের আত্মত্যাগ।

মিলির এসব ভাবনার মাঝেই ঘরে রুবা এসে ব্যস্ত গলায় বলল,

“মা রেডি হয়েছো তুমি?”

রুবার কণ্ঠে মিলির ধ্যান ভাঙ্গলো। খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে রূবা কে বলল ল,

“হ্যাঁ মা, তৈরি হয়ে গিয়েছি আমি।“

রুবা মিলিকে নিজের দিকে ঘুরে দাঁড় করিয়ে একবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভালো করে দেখে নিল। মিলি জানে মেয়েটা এখন একে একে সব ভুল ধরা শুরু করবে। কেন চুলটা এভাবে বেঁধেছো, কেন মুখে কিছু লাগাওনি, কেন একটা কানের দুল পরোনি এই সেই আরো হাবিজাবি অনেক কিছু বলবে। আর হলোও তাই। রুবা নাম মুখ কুঁচকে বলল,

“চুলটা এভাবে বেঁধেছো কেন? তোমার সুন্দর মুখটার সাথে মানাচ্ছে না। রেস্টুরেন্টে যাচ্ছি মা কলেজে যাচ্ছি না।”

মিলি আলতো হেসে বলল,

“সে যেখানেই যাই না কেন এভাবে চুল বাঁধতেই আমার ভালো লাগে।”

“আচ্ছা ঠিক আছে তা না হয় মেনে নিলাম। কিন্তু একটা কানের দুল অব্দি পরোনি তুমি।”

“না রে মা ভালো লাগে না এত কিছু পরতে। দেখো এমনি ঠিক আছি আমি। তুমি না বললে তো এই শাড়িটাও পরতাম না। এমনি একটা সুতি শাড়ি পরে নিতাম।”

রুবা এবারে কপট রাগ দেখিয়ে বলল,

“তোমার ছেলে এসে যদি দেখেনা যে আমি এত সেজেছি আর তুমি কিছু করোনি তাহলে ও ভাববে যে আমি বোধহয় আমার শাশুড়ি মার খেয়াল রাখছি না।”

বিজ্ঞাপন

মিলি আবারো অল্প একটু হেসে বলল,

“এমন কিছু বললে তুমি আমায় বলে দেবে। আমিও দেখবো ওর সাহস কি করে হয় আমার মেয়েকে এসব বলার।”

“আচ্ছা ঠিক আছে সেসব না হয় পরে বলব। তবে এখন অন্তত একটা কানের দুল পরতে হবে তোমায়। আমি আসছি এক্ষুনি।”

মিলি আটকানোর চেষ্টা করলো তবে রুবা ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে দৌড়ে নিজের ঘরে গেল। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে আবার ফিরে এলো। মিলিকে আয়নার দিকে ঘুরে দাঁড় করিয়ে বলল,

“আমি একটা কানের দুল নিয়ে এসেছি। এটা পরলে দেখতে সুন্দর লাগবে তোমায়।”

মিলির মতামত জানার প্রয়োজন মনে করলো না রুবা, আর মিলির আপত্তিগুলোকেও পাত্তা দিলো না। নিজেই পরিয়ে দিল কানের দুলটা। কালো জামদানি সাথে সোনার কানের দুলটা বেশ সুন্দর লাগছে দেখতে। তবে মিলির কাছে অতিরিক্ত মনে হলো। এই বয়সে এসে এত সাজগোজ ঠিক পছন্দ হলো না। ইতস্তত গলায় বলল,

“শোনো না মা কানের দুলটা খুলে দাও। এই বয়সে এসে এতকিছু মানায় না।”

রুবা আবারও কপট রাগ দেখিয়ে বলল,

“একদম চুপ। তোমাকে আমি ভারী মেকাপ করে দিচ্ছি না যে তুমি চিন্তায় আছো এই বয়সে মানাবে কি মানাবে না। সামান্য কানের দুলও পরা যাবে না?”

মিলি আরো কিছু বলতে চাইলো তবে সেই সুযোগ আর পেলো না। তার আগেই কলিং বেল বেজে উঠলো। রুবা উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,

“অয়ন এসে গেছে মনে হয় মা। আমি দরজা খুলে দিয়ে আসছি।”

কথাটা বলেই রুবা দৌড়ে চলে গেল দরজা খুলতে। মিলি হাসলো। মেয়েটা এই বাড়িতে আসার পর থেকেই সারাদিন যেন বাড়িটা আনন্দে মাতিয়ে রাখে। ভীষণ চঞ্চল। একটা সেকেন্ডও চুপ থাকেনা। আর রুবার এই চঞ্চলতা গুলো বারবার মিলি কে একজনের কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে না মিলি। বরং হাসি ফুটে ওঠে মুখে।

মিলি ফোনটা হাতে নিয়ে ঘরের লাইট অফ করে দিয়ে বসার ঘরে চলে গেল। ততক্ষণে অয়নও ভিতরে চলে এসেছে। মিলিকে সেখানে যেতে দেখে রুবা অয়নকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“দেখো অয়ন মা কে সুন্দর লাগছে না দেখতে?”

“আমার মা তো সুন্দরই। ভীষণ সুন্দর আমার মা। যেমন আমার মা দেখতে সুন্দর তেমনই আমার মায়ের মনটাও সুন্দর।”

মিলি হাসলো। তারপর অয়নের পাশে দাঁড়ানো রুবা কে দেখিয়ে বলল,

“আমার থেকেও অনেক বেশি সুন্দর আমার ছেলের বউকে লাগছে। আমার তো বয়স হয়ে গিয়েছে, বুড়ি মানুষ আমি। আমার কি আর এখন এত সৌন্দর্য আছে নাকি। আমার রুবাকেই বেশি সুন্দর লাগছে।”

রুবা খুশি হলো মিলির প্রশংসায়। অয়ন একবার দুজনকেই দেখে নিয়ে দু হাতে দুজনকে আগলে নিয়ে বলল,

“সুন্দর তো দুজনকেই লাগছে। একজনকে অল্প বয়সে দেখতে সুন্দর লাগছে, আরেকজনকে বৃদ্ধ বয়সে দেখতে সুন্দর লাগছে। তবে জানো তো তোমাদের দুজনের আসল সৌন্দর্য তোমাদের মনে। মাঝে মাঝে আমি ভাবি আমি কি করে এতটা লাকি হলাম, যে যেমন সুন্দর মা ঠিক তেমন সুন্দরী একটা বউ পেয়ে গেলাম।”

মিলি আলতো হেসে মনে মনে বলল,

“আমার ছেলের বউ তো সুন্দর হবেই। ওকে বড় করে তুলেছে কে সেটা দেখতে হবে না!”

________

শহরের এক বিলাসবহুল রেস্টুরেন্টের রুফটপে বসে আছে মিলি, অয়ন আর রুবা। অপেক্ষা করছে আরো দুজন মানুষের আসার।

আজ রুবা আর অয়নের বিয়ের এক মাস হলো। সেই জন্যই একটু পরিবারের সবাই মিলে সেটা উদযাপন করার জন্য বাইরে খেতে এসেছে। রুবা সমানে হাত ঘড়িতে সময়টা দেখে নিচ্ছে। প্রায় আধা ঘন্টা হলো বসে আছে অথচ এখনো সেই কাঙ্খিত দুজন মানুষ আসার নামই নিচ্ছে না। মুখ ভার করে অয়ন কে বলল,

“অয়ন আসছে না কেন? আসবে না নাকি?”

“আরে আসবেনা কেন? একটু সময় দাও। কাজ শেষ করে তবে তো আসবে।”

রুবার মনটা খারাপ হয়ে গেল। মিলি কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে আবার কাপটা টেবিলের উপর রেখে দিয়ে ভাবলো রুবাকে একটু কিছু বোঝাবে, নাহয় ওর সাথে গল্প করে মনটা ভালো করবে। তবে তার আগেই মিলির চোখ পড়লো সেই দুজন কাঙ্খিত মানুষের উপরে যাদের জন্য রুবার মনটা খারাপ হচ্ছিল। ইশারায় রুবা কে সেদিকে দেখিয়ে বলল,

“ওই দেখো রুবা যাদের জন্য মন খারাপ করে বসে আছো এসে গেছে তারা।”

রুবা চমকে সেদিকে তাকাতেই দেখলো তাকদীর আর তোহা আসছে। মুহূর্তের মাঝে রুবার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। “বাবা” বলে চিৎকার করে উঠে দৌড়ে ওদের দিকে ছুটে গেল। মেয়েকে আসতে দেখে তাকদীর দু হাত মেলে জড়িয়ে ধরলো। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,

“কেমন আছো মা?”

তাকদীরের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে রুবা অভিমান মাখানো গলায় বলল,

“এত দেরি করলে কেন আগে সেটা বলো?”

তাকদীর নিজের পাশে দাঁড়ানো তোহা কে দেখিয়ে বলল,

“আমার কিন্তু কোন দোষ নেই। সব দোষ তোমার আম্মুর। একেই তো তৈরি হতে সময় লেগেছে দু'ঘণ্টা, তার উপরে আবার আসার সময় তোমাদের জন্য গিফট কিনতে লাগিয়েছে আরও এক ঘন্টা। এখন বলো আমার এখানে দোষ কোথায়?”

তাকদীরের কথার তীব্র বিরোধিতা করে তোহা বলে উঠলো,

“তোর বাবা কিন্তু একদমই মিথ্যে বলল মা। ওই বাড়ি ফিরতে দেরি করেছে। হ্যাঁ আসার সময় তোদের জন্য গিফট কিনতে একটু দেরি হয়েছে ঠিকই তবে আমি তৈরি হতে দু'ঘণ্টা সময় লাগাইনি।”

তাকদীর অসহায় গলায় মেয়েকে বলল,

“দেখেছো মা তুমি নেই আর তোমার মা সব দোষ আমার উপরে চাপিয়ে দিচ্ছে। আজ তুমি থাকলেই নিজের চোখে সব দেখতে আর আমায় সাপোর্ট করতে পারতে।”

রুবা এবারে শব্দ করে হেসে উঠলো। কি মিষ্টি লাগে ওর বাবা মায়ের এই খুনসুটিগুলা দেখতে।

ওরা এগিয়ে গেল টেবিলের দিকে। অয়ন উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দিয়ে জড়িয়ে ধরলো তাকদীরকে।

“কেমন আছো আমার জামাই বাবা?”

অয়ন আলতো হেসে বলল,

“এইতো ভালো আছি বাবা। আপনার শরীর কেমন?”

“এইতো চলছে।”

তাকদীর কে ছেড়ে দিয়ে অয়ন তোহাকেও জিজ্ঞেস করল কেমন আছে। কথাবার্তা শেষ করে তাকদীরের চোখ পড়লো এবার মিলির উপরে। আন্তরিকতার গলায় সালাম দিয়ে বলল,

“আসসালামু আলাইকুম সিনিয়র, ও সরি বেয়াইন। কেমন আছেন আপনি?”

মিলি আলতো হেসে বলল,

“আলহামদুলিল্লাহ ভালোই আছি বেয়াই।”

তোহা এগিয়ে এসে মিলিকে জড়িয়ে ধরলো। মিলিও পাল্টা জড়িয়ে ধরল। কিছুক্ষণ কথাবার্তা শেষে সবাই বসে পড়লো। রাতের খাওয়া দাওয়া করলো সেই সাথে অনেক গল্প গুজব হলো সবার মাঝে।

পরিবেশটা এখন ভীষণ স্বাভাবিক। হ্যাঁ একদমই স্বাভাবিক। এখন এইখানে উপস্থিত কারো জন্যই কারো অস্বস্তি হয় না, এখন আর কাউকে কাঁদতে হয় না, এখন আর কেউ কারো কাছে নিজের ভালোবাসা ভিক্ষে চায় না। আবার কেউ সেই ভালোবাসা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য নিজেকে দোষারোপও করে না।

তাকদীর জড়িয়েছে সংসারে। ওই যে বলেছিল যদি কখনো প্রয়োজন মনে করে তবেই কারো সাথে জীবনটা জড়াবে। সেই প্রয়োজনটা মনে হয়েছিল তাকদীরের এক সময়।

মাঝে যখন পুরো একটা বছর কেটে গেল, মিলির সাথে কথাবার্তা কোন কিছুই তেমন হতো না। শুধু দেখা হতো অয়নের সাথে। ধীরে ধীরে তাহরিমা বেগমের শরীরের অবনতি ঘটলো। তিনি যে মনের দিক থেকে ভীষণ দূর্বল হয়ে পড়েছিলেন ফলে শরীরও আর কোনো ওষুধে তেমন একটা সায় জানাচ্ছিলো না।

তবে এত কিছুর মাঝেও তাকদীর কখনো ভাবেনি যে নতুন করে আবার জীবনটা শুরু করবে। তবে অবাক হয়েছিল সেই দিন যেদিন খবর পেয়েছিল যে তোহা বিয়ে করেনি।

তাকদীর সেদিন চমকেছিল, অবাকও হয়েছিল সেই সাথে কাজ করেছিল অপরাধবোধ। সেই সাথে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল মনের মাঝে যে খবর তো পেয়েছিলো তোহার বিয়ে হয়ে গেছে। তবে আজ আবার কেন শুনতে হচ্ছে যে তোহা বিয়ে করেনি?

পরে জানলো ভুল শুনেছিল। তোহা চায়নি ওর জন্য তাকদীরের মাঝে কোনরকম কোন অপরাধবোধ কাজ করুক। সেজন্য জানিয়েছিল হঠাৎ করে বিয়েটা হয়ে গিয়েছে, ওদেরকে জানায়ওনি। তোহার বিয়েতে যাওয়ার ইচ্ছেও ছিল না। তবে পরে জানতে পারে তোহা বিয়েটা করেনি।

ধীরে ধীরে সময় পেরোলো, একটা বছর কেটে গেল। এই একটা বছর তাকদীরের জন্য মোটেই সহজ ছিল না। একটা বছর কয়েকটা যুগের মতন লেগেছিল। জীবনটা যেন একই জায়গায় থমকে ছিল। কোন দিক দিয়ে কিছুই এগোচ্ছিলো না। বরং ধীরে ধীরে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে চলে যাচ্ছিল।

তাকদীর চোখের সামনে যেন দেখতে পাচ্ছিল ধীরে ধীরে কি করে তোহার জীবনটা শেষ হয়ে যাচ্ছে, ওর মা অসুস্থ হয়ে পড়ছে, মিলি অস্বস্তি আর অপরাধবোধে ভুগছে। সবার জীবনের শান্তি যেন তাকদীর নিজেই কেড়ে নিয়েছিল। সেই সাথে ওর নিজের জীবনের শান্তিও।

তারপর আর কি তাকদীরের একদিন মনে হল না এবার ওর জীবনে কাউকে একটা দরকার। তিন তিনটে মানুষের জীবন স্বাভাবিক করার জন্য হলেও তাকদীর কে এটা করতেই হবে। এবারে আর তোহার অনুরোধে তাকদীর ওকে বিয়ে করেনি, এবার বিয়ে করেছে নিজের সিদ্ধান্তে।

এই বিয়েটা থেকে তাকদীর একটা বিষয় উপলব্ধি করেছে যে মন থেকে চেষ্টা করলে দ্বিতীয়বার কাউকে ভালোবাসা যায়। মাঝে মাঝে নিজের ওপর জোর চালিয়ে নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত আমাদের জন্য ভালো হতে পারে। সব সময় মনকে প্রাধান্য না দিয়ে মাঝে মাঝে মস্তিষ্কের কথাও শুনতে হয়।

সেই থেকে আজ ওদের বিয়ের সাতাশ বছর হতে চলল। তাকদীর এখন নিঃসন্দেহে বলতে পারে যে ও ভালোবাসে তোহা কে।

মিলি কেও ভালোবেসে ছিল তাকদীর একটা সময়। তবে মিলি যেমন দ্বিতীয়বার নিজেকে সুযোগ দিতে পারেনি, তাকদীর সেটা করেনি। তাকদীর দিয়েছিল নিজেকে সুযোগ। মিলির প্রতি সেই ভালোবাসাটা ছিল তাকদীরের অতীত। এখন কেবল হৃদয়ে রয়ে গেছে মিলির জন্য একটা দুর্বল জায়গা। মনে পড়ে মিলির জন্য করা সেই পাগলামি গুলো। তবে ভালো এখন তোহাকেই বাসে। আর মিলি? সে কেবল অতীত।

মাঝে মাঝে তাকদীর ভাবে তোহা কে এত সহজে কি করে ভালোবেসে ফেলল? তবে কি মিলিকে ভালোবাসতে পারেনি?

পরক্ষণেই মনে পড়ে হয়তো মিলির ভালোর জন্যই মিলি কে ভুলে গিয়েছে। সাথে থেকে অস্বস্তির কারণ হওয়ার চাইতে দূরে সরে গিয়ে তাকে ভালো রাখাটা জরুরী। যেখানে মিলি চায় না তাকদীরকে নিজের পাশে সেখানে থেকে কি লাভ! তাহলে যে অস্বস্তি আর অপরাধবোধ ছাড়া আর কিছুই দিতে পারতো না মিলি কে।

বিজ্ঞাপন
রিক্ত বসন্ত গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস