“মুসতারিন ম্যাডাম!”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও মিলিকে থামতে হলো। অনেকদিন পর তাকদীর ওকে ডাকলো। না থেমে পারলো না। আর তাছাড়া এটা কলেজ। আশেপাশে মিলি ব্যতীত আরো অনেক শিক্ষার্থীও ডাক শুনেছে। তাই অবজ্ঞা করার কোন মানে হয় না তাকদীর কে। তাহলে অপমান করা হবে এত মানুষের সামনে।
পিছন ঘুরে দাঁড়িয়ে মুখে সৌজন্যমূলক হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“হ্যাঁ স্যার বলুন।”
কলেজে মিলি আর তাকদীরের এমন ভাবেই কথোপকথন চলে। আর এটাও মিলির অনুরোধেই।
তাকদীর এগিয়ে এসে ধীর গলায় মিলি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“বিশ মিনিট সময় হবে প্লিজ! কিছু কথা ছিল আপনার সাথে।”
মিলি ইতস্তত গলায় বলল,
“এখানেই বলুন।”
“এখানে বলা গেলে আপনাকে বাইরে যাওয়ার জন্য বলতাম না। খুব বেশি দূর যেতে বলছি না। কলেজের সামনে যে ক্যাফে আছে ওখানে চলুন। হাতে যে বিশ মিনিট টিফিন ব্রেক আছে ওই সময়টুকুই নেব।”
মিলি আবারো কোন অজুহাত দেখাতে চাইলো তবে তাকদীর ওকে সেই সুযোগ না অনুরোধের স্বরে বলল,
“প্লিজ মিলি! আর কখনো চাইবো না সময়।”
চেয়েও না করতে পারলানা মিলি। যেতেই হলো তাকদীরের সাথে।
______
“পাঁচ মিনিট হয়ে গিয়েছে তাকদীর কিছু তো বলো। আর যদি কিছু নাই বলার থাকে তবে ডেকে আনলে কেন?”
তাকদীর নিজেই নিজের উপর বিরক্ত হলো। যে কথাগুলো বলার জন্য মিলি কে ডেকে নিয়ে এলো কেন বলতে পারছে না সেগুলো মিলিকে? দেরি হয়ে যাচ্ছে তো। সময় চলে যাচ্ছে তাকদীরের হাত থেকে।
তাকদীর কে তারপরও চুপ করে থাকতে দেখে মিলি পুনরায় বলে উঠলো,
“তাকদীর কিছু বলবে কি তুমি?”
এবার কোন ভাবনা চিন্তার প্রয়োজন পড়লো না আর তাকদীরের। আর একটুও সময় ব্যয় করল না। মিলি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কোনভাবেই কি আমায় একটা সুযোগ দেওয়া যায় না? একটা সুযোগ দিন আমায় মিলি! আমি জানি আপনি আমায় ভরসা করেন, বিশ্বাস করেন তবে কেন আমার সাথে এমন করছেন?”
মিলির অসহায় লাগলো নিজেকে। সেই সাথে খারাপ লাগল তাকদীরের জন্য। তবে রাগ হলো না। কি হবে এই ব্যাপারগুলোতে রেগে? মনের ওপরে তো আর আমাদের কারোর হাত থাকে না। বরং এখানে রাগারাগি করাটাই হবে বোকামি। তাকদীর কে ভালো করে বোঝাতে হবে সবটা। মিলি ধীর গলায় বলল,
“আমিতো তোমায় বলেছি তাকদীর এসব সম্ভব না। আমি পারবো না.....”
মিলি কে মাঝ পথে থামিয়ে দিয়ে দিয়ে তাকদীর বলল,
“প্লিজ কোন অজুহাত দেখাতে আসবেন না। আমাকে কোন কারণ বলার দরকার নেই যে আপনি কেন পারবেন না। আমি সেসব শুনেছি। আমি শুধু আপনাকে বলছি কোনভাবেই কি আমায় একটা সুযোগ দেওয়া যায় না? শুধু এতোটুকুর উত্তরই চাই।”
“তবে সে উত্তর তো তোমায় আমি অনেক আগেই দিয়ে দিয়েছি। তারপরও তুমি বারবার এই কথাগুলো বলে কেন আমায় অস্বস্তিতে ফেলছো?”
“আপনারা সবাই শুধু নিজেদের দিকটাই দেখছেন, কেউ আমার দিকটা ভেবে দেখছেন না। এদিকে আপনি আমাকে বারবার ফিরিয়ে দিচ্ছেন, ওদিকে আম্মু বলছে আমি নাকি আম্মুকে কষ্ট দিচ্ছি। আম্মু চাইছে আমি যেন বিয়ে করে নেই অথচ আপনারা কেউ একটা বারের জন্যও আমার দিকটা ভেবে দেখছেন না। আপনারা এমন কেন হয়ে গেলেন বলুন তো?”
“আন্টি একদম ঠিক কথা বলেছে। তুমি এই আশায় থেকো না যে আমার মন কখনো নরম হবে। আমি কখনোই পারবোনা নিজেকে রাজি করাতে।”
হাল ছাড়লো তাকদীর। চেয়ারের সাথে গা টা এলিয়ে দিল। আবারো অসহায় গলায় মিলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপনি তবে আমার হবেনই না মিলি? আপনার জীবনে বাকী লড়াই গুলো তে আপনার পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ আমাকে দিলেনই না? না আপনার স্বামী হওয়ার সুযোগ দিলেন, না অয়নের বাবা হওয়ার সুযোগ দিলেন।”
মিলির খারাপ লাগল তাকদীরের জন্য। তবে বোধহয় মিলির এই খারাপ লাগার কোন মানে হয় না। কি হবে খারাপ লেগে? তাকদীরের খুশির জন্য তো কিছু করতে পারবে না মিলি।
তাকদীর সোজা হয়ে বসে আবারো মিলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“একটা সুযোগ দেবেন না আমায়?”
মিলি শান্ত কন্ঠে তাকদীর কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমার থেকে আর সুযোগ চেয়ো না তাকদীর, আমি পারবো না দিতে। তুমি খুব ভালো আমি জানি। তোমার মতন একজন ভালো জীবনসঙ্গী প্রত্যেকটা মেয়েই চায়। বর্তমান সময়ের অসংখ্য প্রতারক ছেলের মাঝে তুমি নিঃসন্দেহে একজন ভালো ছেলে। সেজন্য বলছি তুমিতো চাইতে কারো একটা জীবন গুছিয়ে দিত তবে অযথা সেই সুযোগটা নষ্ট করো না। কত মেয়ে হাহাকার করে একজন ভালো জীবনসঙ্গী পাওয়ার জন্য। তুমি বরং একটা মেয়ের জীবন গুছিয়ে দিয়ো। তবে সেটা আমি হতে পারব না। আমার জীবনটা বর্তমানে যেমন ভাবে চলছে তেমন ভাবেই আমার কাছে প্রিয়।”
তাকদীর অল্প একটু হেসে বলল,
“আপনি সব জানেন, সব বুঝছেন তবুও আমার হচ্ছেন না। আজ একটা প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে আপনাকে মিলি, কি কমতি আছে আমার মাঝে যে আমাকে ভালোবাসতে পারলেন না? আমার দিক থেকে ভালোবাসাতে কি কমতি রয়ে গিয়েছিল যে আপনি আমার ভালোবাসা দেখেও আমাকে ভালোবাসতে পারলেন না?”
মিলি কিছু ভাবলো। ভাবনা শেষে উঠে দাঁড়িয়ে তাকদীরকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“সঠিক কারণ জানিনা। তবে আমি কখনো ভাবতে পারিনি এই বিষয়ে, আর কিছু পরিস্থিতি আমাকে ভাবতে দেয়নি। আর এইসবের মাঝে এখন বর্তমানে আমি আর ভাবতে চাইও না। এটাই কারণ।”
__________
আজ দুদিন যাবত তাহরিমা বেগম ভীষণ অসুস্থ। জ্বর কোনমতেই কমতে চাইছে না। ওষুধ খাওয়াচ্ছে, তাকদীর সেবা-যত্ন করছে তবুও জ্বর কমতেই চাইছে না। তাকদীরের মনে হলো যে ওর মায়ের অসুস্থতার জন্য তাকদীর নিজেই দায়ী। ছেলের চিন্তা করতে করতেই হয়ত শরীরের এই অবস্থা হয়ে গেছে তাহরিমা বেগমের। কে জানে হয়তো আরো অবনতি হবে শরীরের। আর এই সবকিছুর জন্য দায়ী তাকদীর।।
অনেক ভাবনা চিন্তা করলো তাকদীর। এই বিষয়টা তো তাকদীর দুদিন আগেই একেবারে নিশ্চিত হয়েছে যে মিলি আর কোন মতেই ওর হবে না। কোনমতেই মিলি ওকে একটা সুযোগ দেবে না। সেই সাথে এটাও বুঝে গেছে তাকদীর যদি ও নিজের জীবনকে আর একটা সুযোগ না দেয় তবে ওর মা ভীষণ কষ্ট পাবে।
অসুস্থ শরীরে নিজের ঘরে শুয়ে আছে তাহরিমা বেগম। তাকদীর এমন সময় ধীরপায়ে গিয়ে তাহরিমা বেগমের পাশে বসলো। কপালে হাত দিয়ে একবার দেখলো জ্বর আছে নাকি। জ্বরটা একটু কমেছে।
“আম্মু শরীর কেমন লাগছে এখন?”
তাহরিমা বেগম দুর্বল গলায় বলে উঠলেন,
“আগের থেকে ভালো লাগছে।”
তাকদীর কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। যে কথাটা বলার জন্য এসেছে কেন যেন এখন আর সেই কথাটা মুখ দিয়ে বের হতে চাইছে না। তাকদীরের নীরবতা যেন তাহরিমা বেগমকে অনেক কিছু বলে দিল। তিনি নিজ থেকেই বলে উঠলেন,
“কিছু বলবে বাবা?”
তাহরিমা বেগমের মুখ থেকে এই বাবা ডাকটা শুনলেই আজকাল তাকদীরের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে। কি আদর মেশানো থাকে তাহরিমা বেগমের সেই কন্ঠে। তাকদীর কি করে এই মানুষটাকে কষ্ট দেবে? হোক নিজের কষ্ট তবু ওর আম্মুকে কষ্ট দেবেনা। সারা জীবন যে মানুষটা শুধুমাত্র তাকদীর কে ভালো রাখার জন্য এত কষ্ট করেছেন, এত ত্যাগ স্বীকার করেছেন সেই মানুষটাকে আজ তাকদীর কষ্ট দিতে পারবে না। নিজের কষ্টের থেকেও ওর আম্মুর মুখের হাসি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাকদীর তাহরিমা বেগমের হাতটা মুঠোর মাঝে নিয়ে তার হাতের উলটো পিঠে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। অল্প একটু হেসে বলল,
“তোমার তাকদীর তোমায় খুব ভালোবাসে আম্মু। তোমার মুখের একটু হাসির জন্য আমি আমার জীবনের সব সুখ বিসর্জন দিতে পারি, আমি আমার সব ইচ্ছে ভুলে যেতে পারি। তুমি যাকে বলবে আমি তাকেই বিয়ে করবো। আমার আম্মুর মুখের হাসির কাছে আমার এই কষ্টগুলো খুবই ফিকে।”
তাহরিমা বেগমের খুশি হওয়ার কথা ছিল তবে উনি কাঁদলেন। আজ ওনার নিজেকে গর্বিত মা মনে হচ্ছে, যার ছেলে মায়ের সুখের জন্য নিজের ইচ্ছে গুলোকে হাসি মুখে বিসর্জন দিতে পারে। আজ তিনি গর্ব করে বলতে পারেন তার জীবনের সকল অপূর্ণতা তার ছেলে পূরণ করে দিয়েছে। এই জীবনে তার আর কোন আফসোস নেই। তিনি জীবনে কি করতে পেরেছেন, তার প্রাপ্তির খাতায় কি কি আছে সেসব তিনি জানেন না। তবে হ্যাঁ তিনি গর্বিত যে তিনি তাকদীরের মা। নিজের মনের মতন করে নিজের ছেলেকে মানুষ করতে পেরেছেন তিনি।
____________
আজাদ আহমেদ আজ ভীষণ খুশি। যদিও তার ইচ্ছে ছিল ধুমধাম করে মেয়ের বিয়ের আয়োজন করার তবে তাকদীর সেসব করতে দেয়নি। খুব সামান্যই বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। তেমন মানুষজনকেও দাওয়াত দেওয়া হয়নি। ঘরের কয়েকজন কে নিয়েই বিয়ের অনুষ্ঠানটা সম্পন্ন হবে।
হাসি দেখা যাচ্ছে শুধু আজাদ আহমেদের মুখে। না তাহরিমা বেগম হাসছেন, না তাকদীর হাসছে আর না তোহা। বুঝতে তো সবাই পারছে যে বিয়েটা কোন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে হচ্ছে কিন্তু তবুও আজাদ আহমেদ যেন সব বুঝেও না বোঝার ভান করে যাচ্ছেন। তার একটাই আনন্দ তার পছন্দের ছেলে তার জামাই হচ্ছে। তিনি তার মেয়েকে একটা ভরসাযোগ্য কারো হাতে তুলে দিতে পারছেন এতোটুকুই তার শান্তি।
একটু পরে কাজী আসার কথা। তাকদীর নিজের জন্য কেনা বিয়ের শেরওয়ানিটা পরে ঘরে বসে আছে। অন্য ঘরে তোহা সাজগোজ করছে। পার্লার থেকে কোন লোক ডাকা হয়নি। আশেপাশে থাকা তোহার বান্ধবীরাই সাজাচ্ছে।
অনেকক্ষণ থেকে তাকদীর ফোনটা হাতে নিয়ে আছে। ভাবছে ওর কি কল করা উচিত না কল করা উচিত না? বারবার তাকদীর মিলির সাথে নিজের সাক্ষাৎ কে বলে শেষ সাক্ষাৎ। তবে কেন যেন সবকিছু শেষ করতে পারে না। পরক্ষনেই মনে হয় যে আরেকবার চেষ্টা করা যাক না, যদি মিলির মন গলে! এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। উঠে গিয়ে আগে ঘরের দরজাটা বন্ধ করলো।
বিছানায় এসে বসে ফোনটা হাতে নিয়ে মিলির নাম্বার ডায়াল করলো। প্রথমবার রিং হয়ে গেল তবে মিলি রিসিভ করলো না। তাকদীর বুঝলো না মিলি ইচ্ছেকৃতভাবে রিসিভ করেনি নাকি টের পায়নি। বেশি ভাবনা চিন্তা না করে আরেকবার কল লাগালো মিলির নাম্বারে। তবে এবারে মিলি অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই ফোনটা রিসিভ করলো। তাকদীর বুঝলো ইচ্ছেকৃতভাবে রিসিভ করেনি ফোনটা এর আগের বার তেমনটা না। হয়তো ধরতে ধরতে ফোনটা কেটে গিয়েছিল।
তাকদীরের ধ্যান ভাঙলো অপর পাশ থেকে ভেসে আসা মিলির কন্ঠ শুনে,
“আরে তাকদীর আজ এসময়ে ফোন দিলে যে? বিয়ে শেষ?”
তাকদীর গম্ভীর গলায় বলল,
“না। আমার ক'বর হয়নি এখনো, জানাযার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি।”
মিলি তাকদীরের কথাটা কৌতুকের ছলে নিয়ে বলল,
“আজকের দিনেও তোমার মজা করা যাচ্ছে না! তবে কথাটা কিন্তু তুমি একদম ভুলও বলোনি। বিয়ের পর থেকে তো সংসারে তোমার বউয়ের রাজত্বই চলবে। তখন তোমাকে অসহায়ের মতনই থাকতে হবে।”
“এলেন না কেন বিয়েতে? নিজে তো দাওয়াত দিয়ে এসেছিলাম।”
মিলি আফসোসের কন্ঠে বলল,
“যাওয়ার তো অনেক ইচ্ছে ছিল কিন্তু এত দূরে কি করে যাই বলোতো?”
“কেন? বাংলাদেশ থেকে কি গাড়ি-ঘোড়া বিলুপ্ত হয়ে গেছে নাকি? একা একা ঢাকা যেতে পারেন আর এখানে আসতে পারলেন না? চার ঘণ্টার রাস্তা মাত্র।”
“আরে তেমন কোন ব্যাপার না। কলেজ থেকে তো ছুটি পেতাম না। আমি যেতে পারিনি তো কি হয়েছে তুমি বরং বিয়ের পর তোহা কে নিয়ে আমার বাড়িতে ঘুরতে এসো।”
তাকদীর হাসলো। আজ যেন আরো ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারলো যে মিলির হৃদয়টা ঠিক কতটা পাথরে পরিণত হয়েছে। মিলি আর কিছু বলল না। তাকদীরও আর কিছু বলল না। দীর্ঘ একটা সময় দুজনের নীরবতার মাঝে কেটে গেল। মিলির মনে হলো এই নীরবতাটা এবার ভাঙা দরকার। নিজ থেকে বলে উঠলো,
“আর কিছু বলবে?”
তাকদীর নির্লজ্জের মত আরও একবার মিলিকে বলল,
“আমাকে একটা সুযোগ দেওয়া যায় না মিলি? আমি আপনার জীবনটা গোছাতে চাই, শুধু আপনার জীবনটা।”
মিলি আলতো হেসে বলল,
“এমন একটা মুহূর্তে আমার জীবন গোছানোর জন্য অন্য একটা মেয়ের জীবন অগোছালো করে দিতে চাইছো? তুমি বুঝতে পারছো কখন কি বলছো? তোমার থেকে কিন্তু এসব আশা করা যায় না তাকদীর। তোমার মতন মানুষ অন্যদের জীবন গুছিয়ে দিতে পারে, অগোছালো করে দিতে পারে না।”
“আর আমার জীবনটা যে অগোছালো হয়ে যাচ্ছে।”
“সব সময় তো আর সবকিছু আমাদের মন মত হয় না তাই না? তুমি আজ আমায় যে কথাটা বললে সেটা খুব অন্যায় করলে। তুমি আমার জীবনটা গুছিয়ে দিতে চেয়ে তোহার মতন একটা ভালো মেয়ের জীবন অগোছালো করতে চাইলে। তোহা খুব ভালো তাকদীর। অযথা মেয়েটাকে কষ্ট দিও না। রাখছি।”
ফোনটা রেখে দিল মিলি। তাকদীরের হাত থেকেও ফোনটা পড়ে গেল। কাঁদলো না তাকদীর আজ, চোখ দিয়ে একটুও জল পড়ল না। মিলির এসব অবহেলায় যেন অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তবে এখন মনে হচ্ছে তাকদীরের কাছে আর কোন রাস্তা নেই মিলির কাছে ফিরে যাওয়ার, সব রাস্তা বন্ধ।
________
“কেন করলে এটা মিলি তাকদীরের সাথে? ছেলেটা কত কষ্ট পাচ্ছে।”
লাবিবার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে মিলি আলতো হেসে বলল,
“এসব কথা থাক এখন লাবিবা। তুমি আজ প্রথমবার আমার বাড়িতে এলে একটু চা খাও। আগে মাথাটা ঠান্ডা করো।”
লাবিবা বিরক্তিকর গলায় বলল,
“তুমি কি করে এতটা স্বাভাবিক থাকতে পারো মিলি? তাকদীরের সাথে আমার পরিচয় অনেক দিন ধরে। ছেলেটা ভীষণ ভালো। ওর সাথে থাকলে কখনো অস্বস্তি হয় না। হ্যাঁ মানছি ও খুব বেয়াদব, তবে সব বেয়াদবি শুধুমাত্র আমার সাথে করে। ও তোমাকে খুব সম্মান করে মিলি, খুব ভালোবাসে। জীবনসঙ্গী হিসেবে ওকে তো আমিও একশো তে একশো নম্বর দেবো তবে তুমি কেন ওকে দূরে ঠেলে দিলে? ছেলেটা কষ্ট পাচ্ছে তো।”
“চিন্তা করো না সব ঠিক হয়ে যাবে এখন থেকে। এতক্ষণে তো ওদের বিয়েটাও হয়ে গিয়েছে নিশ্চয়ই। হ্যাঁ প্রথমে অবশ্যই কষ্ট হবে তবে ধীরে ধীরে সময়ের ব্যবধানে সবকিছু মানিয়ে নিতে শিখবে। তাকদীর বুঝদার ছেলে। ও যখন তোহার দায়িত্ব নেবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তখন অবহেলা করবে না।”
লাবিবার এবার রাগ হলো। ভীষণ রাগ হলো মিলির উপরে। রাগটা হওয়ার সবথেকে বড় কারণ হলো তাকদীর কে গ্রহণ না করা। কি হতো একটু জায়গা দিলে ছেলেটাকে নিজের জীবনে? তাকদীরও ভালো থাকতো, মিলির জীবনটাও তো সুন্দর হতো।
“কেন করলে এমনটা মিলি? আমাকে একটা যৌক্তিক কারণ দেখাও প্লিজ না হলে আমার রাগ কমবে না।”
মিলি আলতো হেসে সোফার সাথে গা এলিয়ে দিল। অল্প কিছুক্ষণ কিছু একটা ভেবে লাবিবা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তবে তোমায় একটা কথা বলি। কিন্তু তোমায় আমাকে কথা দিতে হবে যে এই কথাগুলো তুমি তাকদীর কে জানাবে না।”
লাবিবার কপালে সুক্ষ্ম ভাঁজের সৃষ্টি হলো। কোন যেন একটা রহস্যের গন্ধ পেলো মিলির কথার মাঝে। মিলির দিকে ঘুরে বসে মিলিকে ভরসা দিয়ে বলল,
“বলবো না ওকে। কি কথা বলো?”
“অনেক ভরসা করে তোমায় বলছি কিন্তু লাবিবা। তুমি যেন আবার বলো না ওকে।”
“আচ্ছা ঠিক আছে রে বাবা বলব না ওকে। এমনিতেও বিয়ে হয়ে গেছে এতক্ষনে। এখন আর বলে কি লাভ হবে?”
“আচ্ছা ঠিক আছে বলছি। কয়েকদিন আগে কলেজ থেকে বেরিয়ে আমি গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলাম। হঠাৎ করে শুনতে পেলাম কেউ একজন আমায় ডাকছে। আমি পাশ ফিরে তাকিয়ে মানুষটাকে দেখে অবাক হয়ে গেলাম। যার সাথে আমার তেমন কোন পরিচয় নেই, কখনো কথা হয়নি সে কি করছে আমার কলেজের সামনে তাও আবার আমাকেই ডাকছে?”
লাবিবা উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“কে ছিল?”
“তাকদীরের মামা।”
লাবিবা বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
“তাকদীরের মামা? সত্যিই?”
“হ্যাঁ সত্যি।”
“তারমানে উনি ঝামেলাটা পাকিয়েছেন তাই না?”
“আহা ঝামেলা বলছো কেন? উনি শুধু বাবা হওয়ার কর্তব্য টুকু পালন করেছেন এর থেকে বেশি আর কিছু না।”
লাবিবার রাগান্বিত গলায় বলল,
“দাঁড়াও এক্ষুনি আমি তাকদীর কে বলছি। ওর মেয়ের বিয়ে দেওয়া বের করছি আমি।”
মিলি চোখ রাঙিয়ে লাবিবা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তুমি কিন্তু কথা দিয়েছিলে আমায় লাবিবা যে ওকে কিছু বলবে না।”
“কিন্তু মিলি এটা তো অন্যায়।”
“আরে পুরো কথাটা তো আমার শোনো।”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও লাবিবকে ধৈর্য ধরতে হলো পুরো কথাটা শোনার জন্য। বিরক্তিকর গলাতে বলল,
“বলো।”
“ওনাকে ওখানে দেখে আমি অনেক কিছুই আন্দাজ করতে পেরেছিলাম। ভেবেছিলাম হয়তো উনি আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করবেন, আজেবাজে কথা বলবেন তবে তেমন কিছুই হয়নি। ওনার ব্যবহারে যেমন আমি অবাক হয়েছিলাম ঠিক তেমনই মুগ্ধও হয়েছিলাম। উনি একজন বাবা হিসেবে নিজের কর্তব্য পালন করেছেন। সত্যি উনি খুব ভালো বাবা। নিজের মেয়ের সুখের জন্য উনি আমার সামনে মাথা নত করতেও দুবার ভাবেননি।”
লাবিবা চোখ ছোট ছোট করে মিলির দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভিলেনকে হিরো বানানোর চেষ্টা করছো?”
মিলি এবারে শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“আমার গল্পে আমি নিজেই ভিলেন লাবিবা। আলাদাভাবে অন্য কাউকে ভিলেন বানানোর প্রয়োজন নেই।”
লাবিবা মুখ ভেঙচিয়ে বলল,
“বুঝতে পেরেছি। তা বলো কি বললেন উনি?”
“বলেছিলেন তো অনেক কিছুই। অনেকভাবে অনুরোধ করেছিলেন। তবে ওনার কোন কথাটা আমার মনে সব থেকে বেশি দাগ কেটেছিল জানো?”
“কি করে জানবো?”
“তাও ঠিক। উনি আমায় বলেছিলেন আমি খুব স্ট্রং। আমি জীবনে খুব কঠিন একটা পরিস্থিতির মাঝে থেকে বের হয়ে এখনো লড়াই করে টিকে আছি নিজের ছেলেকে নিয়ে। উনি আমায় বলেছিলেন ওনার মেয়েটা আমার মতন না। খুব দুর্বল, খুব নরম, একদম সহজ সরল একটা গ্রামের মেয়ে। আমি যেমন আমার প্রিয় মানুষটাকে ছাড়া বেঁচে থাকতে পেরেছি ওনার মেয়ে পারতেন না। উনি আমাকে বলেছিলেন আমি যেভাবে জীবনে ঘুরে দাঁড়িয়েছি কঠিন একটা পরিস্থিতির মধ্যে থেকে উঠে এসে তোহা সেটা কখনোই পারবে না, পুরোপুরি ভেঙে যাবে।”
“তো?”
“এতোটুকুই যথেষ্ট ছিল আমায় অনেক কিছু ভাবাতে। এবার আসি তোহার কথায়। জানো মেয়েটা তিন তিনটে দিন আমার পায়ে পড়েছে। প্রথম দুদিন আমার পায়ে পড়ে তাকদীর কে ভিক্ষে চেয়েছে। ও আমায় কোনো রকম কোনো অসম্মান করেনি, তবে ওর নাকি আমার প্রতি ভরসা ছিল। সে ভরসা থেকেই শুধুমাত্র অনুরোধ করতে এসেছিল। আর তৃতীয় দিন আমার পা ছুঁয়েছিল কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য। ওর আর তাকদীরে বিয়ে ঠিক হওয়ার পর। ওর চোখে মুখে সেই দিন যে খুশিটা ছিল, যে আনন্দ ছিল ওটা দেখার পরে আমার মনে হয়েছে যে আমি কোন ভুল সিদ্ধান্ত নেই নি।”
“আর তাকদীরের খুশিটা দেখলে না তুমি মিলি?”
“তাকদীরের খুশি তো আমার হাতে ছিল না লাবিবা। এমনটা না যে তাকদীরের মামা আর তোহা অনুরোধ করার জন্য আমি এই সম্পর্কটাতে জড়াইনি। আমি কখনো ভাবতেই পারিনি এই সম্পর্কটা তে জড়ানোর কথা। আমি আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করার কথা কখনো ভাবতে পারিনি। সেই সাহস আমার মাঝে আর নেই, সেই মন-মানসিকতাও আমার নেই। জীবনে বাঁচার ইচ্ছেটাই তো হারিয়ে ফেলেছিলাম শুধু বাঁচতে হচ্ছে আমার ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে। সেখানে আবার বিয়ে করে সংসার করবো এসব আমি ভাবতে পারি না।”
লাবিব এবারে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
“কি হতো তাকদীর কে বিয়েটা করে নিলে মিলি? একটা সংসার হতো তোমার।”
“অন্যের স্বপ্নের সংসারটা ভেঙে কখনো নিজের সংসার করা যায় না লাবিবা। জানো আমার সংসারটাও কোন একটা মেয়ে ভেঙেছিল। যদিও আমার সংসার আর তোহার সংসারের মাঝে বিস্তর তফাৎ আছে। তোহার সংসার ছিল কল্পনায় সাজানো সংসার। বুদ্ধির বয়স থেকে তাকদীর কে ভালোবেসেছে, ও সব দিক দিয়ে জড়িয়ে গিয়েছিল তাকদীরের সাথে।”
“তুমি তোমার কথা ভাবলে না একবারও?”
“আমার কথা ভাবার মতন কিছুই নেই। আমি বেশ ভালো আছি নিজের জীবনে। আমার ছেলেকে নিয়ে আমি দিব্যি ভালোভাবে আমার জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারবো। তাকদীরের প্রতি তো কখনো আমার কোন অনুভূতি তৈরি হয়নি। ওকে ছাড়া থাকতেও আমার কষ্ট হবে না, তবে তোহার হত। আর আমি তো তাকদীর কে ভরসা করি তাই জানি ও ধীরে ধীরে ঠিক তোহাকে ভালোবেসে ফেলবে।”
লাবিবার বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। এরপরে মিলিকে কি বলা উচিত জানেনা। এখন আর বলেও কি লাভ হবে। ঐদিকে তো তাকদীরের বিয়ে এতক্ষণে হয়ে গিয়েছে।
______
ঘড়িতে সময় তখন রাত দশটা বাজে। সবেমাত্র অয়ন কে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে মিলিও ঘুমোনোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। এমন সময় কলিং বেল বেজো উঠলো। এত রাতে কলিং বেল বাজাতে মিলি ভয় পেয়ে গেল। কেউ তো আসে না ওর বাড়িতে। এক আসতো তাকদীর কিন্তু আজ এই সময় তো তাকদীরের আসা সম্ভব না। তবে এই রাতের বেলা কে এলো?
মিলি ধীর পায়ে এগিয়ে গেল দরজার দিকে। আগেই দরজাটা খোলার সাহস হলো না। দরজার অপর পাশে থাকা আগন্তুক কে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন ছুড়লো,
“কে?”
কোন উত্তর এলো না মিলির প্রশ্নের। মিলি আবারো বলে উঠলো,
“পরিচয় না জানালে দরজা খুলবো না।”
এবারে অপর পাশ থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো মিলির কানে। মানুষটা বেশ বিরক্তির সাথে বলল,
“আমি।”
কন্ঠটা কানে যেতেই মিলি চমকে উঠল। নিজের কানকে যেন বিশ্বাস হলো না। তবে ভুল শোনার তো কথা না। তাড়াহুড়ো করে দরজা খুলে দিল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে ভূত দেখার মতন চমকে উঠলো। মিলি হতবিহ্বল গলায় বলল,
“আমি কি ভুল দেখছি?”