রিক্ত বসন্ত

পর্ব - ৫

🟢

“একটু কিছু খেয়ে নাও নীলিমা।অসুস্থ হয়ে পড়বে তো তুমি।”

সিয়ামের বিচলিত কন্ঠস্বর।চোখে মুখে তার একরাশ দুশ্চিন্তার ছাপ।নীলিমা দু দিকে মাথা নাড়িয়ে না বোধক উত্তর জানিয়ে বলল,

“ইচ্ছে করছে না সিয়াম।পড়ে খেয়ে নেব।”

“ইচ্ছে করছে না বললে তো আর চলবে না।ইচ্ছে না করলেও এখন তোমায় খেতে হবে।আমি আর কোন কথা শুনতে চাই না।”

নীলিমা অশ্রু সিক্ত নয়নে সিয়ামের দিকে তাকালো।কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলে।সিয়াম নীলিমার সেই দৃষ্টির মানে বুঝতে অক্ষম হল।প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কিছু বলবে?”

“আমি মনে হয় কোনদিনও মা হতে পারব না তাই না সিয়াম?আমার জন্য তুমিও কখনোই বাবা ডাক শুনতে পারবে না।”

সিয়ামের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো।কথাটা তিক্ত হলেও আজকাল সিয়ামের এমনটাই মনে হয়। তবে নীলিমা কে সেসব বুঝতে দিলে চলবে না।এমনিতেই কাঁদতে কাঁদতে অবস্থা খারাপ করেছে এর মাঝে যদি সিয়ামও এসব বলে তাহলে নীলিমা কে সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।এক হাতে নীলিমাকে জড়িয়ে ধরে বলল,

“কে বলেছে তোমায় এসব?শোন নীলিমা আল্লাহ যদি চান তবে সব সম্ভব।ওনার হুকুম ছাড়া কিচ্ছু হবে না।যখন ওনার হুকুম হবে তখনই আমরা মা বাবা হতে পারব।আর তুমি এসব কেন ভাবছো হ্যাঁ?”

নীলিমা এবারে ডুকরে কেঁদে উঠল।নীলিমার অপর পাশে বসা ওর মা নাজমা বেগমও আঁচলে মুখ গুঁজে কেঁদে উঠলেন।একমাত্র মেয়ের এমন অবস্থা তিনি নিজেও সহ্য করতে পারছেন না।নীলিমা ক্রন্দনরত কন্ঠে সিয়াম কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তুমি অনেক শখ করে আমার থেকে এটা চেয়েছিলে আর আমি তোমায় দিতে পারলাম না।তুমি এক কাজ করো,তুমি আমায় ছেড়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করে নাও।”

সিয়াম রাগান্বিত গলায় বলল,

“একদম এসব আজেবাজে কথা বলবে না।আমার কাছে তুমি গুরুত্বপূর্ণ।আমি তোমায় আগেও বলেছি তোমায় পেলে আমার আর কিচ্ছু লাগবে না,আমার কোন কিছুর আফসোস থাকবে না।দ্বিতীয় দিন যেন আর এসব কথা না শুনি।”

নাজমা বেগম নিজের মেয়ের ওপর চটে গিয়ে বললেন,

“এসব কি আজেবাজে কথা বলছিস হ্যাঁ?যদি সমস্যাটা তোর হয়ে থাকে তাহলে কি ছেড়ে দিতে হবে?এটা কোন সমাধান না।আজ যদি জামাইয়ের এই সমস্যা হত তাহলে তুই ওকে ছেড়ে যেতি?”

নীলিমা তাচ্ছিল্য ভরা কন্ঠে বলল,

“কেন মা কয়দিন আগে তো তুমি তোমার বোনের ছেলেকে এই একই পরামর্শটা দিয়েছিলে যেটা আমি আজ সিয়ামকে দিলাম।তখন যখন আমি তোমায় বলেছিলাম যে বাচ্চাই কি জীবনের সব?মেয়েটার কি কোন দাম নেই?তখন তুমি আমাকে কি বলেছিলে মনে আছে?বাচ্চা না হলে ওই মেয়েকে দিয়ে করবে।আর আজ যখন তোমার নিজের মেয়ে একই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছে তখন তোমার এই নীতিবাক্যটা মনে হল?কি অদ্ভুত!”

নাজমা বেগম অপমানিত বোধ করলেন।জামাইয়ের সামনে তার মুখটা ছোট হয়ে গেল।হয়তো নীলিমা সত্যি কথাটা তার চোখে আঙ্গুল দিয়ে ধরিয়ে দেওয়ার জন্যেই এমন লজ্জিত অনুভূত হলো।তিনি আর কোন কথা বাড়ালেন না,উঠে চলে গেলেন।সিয়াম হালকা রাগী কন্ঠে নীলিমাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“মাকে এভাবে বলতে গেলে কেন?”

“আমি ভুল কিছু বলিনি সিয়াম।আমি তোমাকে বলছি তুমি বিয়ে করে নাও আবার একটা।”

“এবার কিন্তু আমি সত্যি রেগে যাব।বারবার এই এক কথা বলবে না আমি তোমায় নিষেধ করে দিচ্ছি। ভালোবেসে বিয়ে করেছি তোমায়।তোমায় কেউ আমার গলায় ঝুলিয়ে দেয়নি,আর না তুমি নিজে জোর করে আমার গলায় ঝুলেছো।এসব বলে আমার ভালোবাসাকে ছোট করো না তুমি।”

“তো আমি কি করবো বলো?আমার অপরাধী মনে হচ্ছে নিজেকে।”

সিয়াম দু হাতের আজলায় নীলিমার মুখটা নিয়ে বলল,

“এসব কথা আর ভেবো না।ধরে নাও না আমাদের ভাগ্যে এটা ছিল।আমাদের ভাগ্যে যা লেখা আছে তাই হবে।এই নিয়ে আর অতিরিক্ত চিন্তা করো না।তোমার কিছু হয়ে গেলে আমি বাঁচবো না।আমি তোমায় ভীষণ ভালোবাসি।তোমায় ছাড়া অন্য কোন নারীকে জীবনে গ্রহণ করার কথা আমি কল্পনাও করতে পারি না।আমি অন্য কোনো নারীর দিকে চোখ তুলে তাকানোর কথাও ভাবতে পারি না।”

“এতটা ভালোবাসো জন্যই তো অপরাধবোধটা আরও বেশি হয়।”

“আজ থেকে আর হতে দিও না।তুমি শুধু আমায় ভালোবেসো তাহলেই হবে।”

________

সন্ধ্যার পর পর মিলির ফোনে ওর শ্বশুরের নাম্বার থেকে কল ব্যাক এলো।সকালে ফোন করেছিল একবার কিন্তু তখন কেউ রিসিভ করেনি।তারপরে আর মিলিও কল করেনি।ফোনটা রিসিভ করে মিলি সালাম দিল।অপর পাশ থেকে মিলির শাশুড়ি তনিমা গম্ভীর গলায় সালামের উত্তরটা দিলেন।তার কন্ঠের মাঝে মিলি যেন হালকা বিরক্তি ভাব ধরতে পেল।তবুও সেসবে পাত্তা দিল না,আজ অব্দি কখনো দেয়ওনি।হাস্যজ্জ্বল গলায় বলল,

“কেমন আছেন মা?”

“ভালো আছি।তন্ময় কোথায়?আজকাল তো ওকে ফোনে পাওয়াই যায় না।এখন কি আমার ছেলের সাথে সাথে ওর ফোনটাও নিজের দখলে রাখো নাকি?”

মিলি তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

“কি যে বলেন না মা আপনি।আপনার ছেলেই তো আমার দখলে নেই ওর ফোনটা আমার দখলে কি রাখবো?যে নিজের ফোনটা আমাকে ছুঁয়েও দেখতে দেয় না আপনি বলছেন তার ফোন আমি নিজের দখলে রাখি?”

তনিমা ভ্রুঁ কোঁচকালেন।মিলির কথা বলার ভাবভঙ্গি আজ তার সুবিধার লাগছে না।প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

“কি হয়েছে খুলে বলোতো?”

“বাবা আছে মা?”

“সব সময় এত শশুরকে খোঁজো কেন?আমাকে কিছু বলা যায় না?ওদিক থেকে প্রশ্রয় পাও জন্য সব কথা ওনাকেই বলতে হবে?”

“মা আসলে আপনি হয়তো সহ্য করতে পারবেন না সেই জন্য আপনাকে বলতে চাইছি না।”

মিলির মুখ থেকে এই কথাটা শুনে তনিমা ভয় পেলেন। ভাবলেন হয়তো তার ছেলের কিছু হয়েছে।আতঙ্কিত গলায় বললেন,

“কেন সহ্য করতে পারব না?কি হয়েছে?আমার ছেলে কোথায়?ও ঠিক আছে তো?”

মিলি আবারো তাচ্ছিল্য হাসলো।নিজের ছেলে বোধহয় একেই বলে।একেই বলে নিজের রক্ত।তনিমা তো একবারও মিলিকে জিজ্ঞাসা করলো যে ও কেমন আছে?আর এখন মিলির সামান্য কথায় তন্ময়ের জন্য চিন্তা করছেন।একবারও এটা ভাবলেন না যে মিলিরও কিছু হতে পারে।”

“তন্ময় ঠিক আছে।আসলে আমার অন্য কিছু বলার ছিল।”

“কি বলার আছে আমাকেই বলো।”

তনিমা যখন একবার বলে দিয়েছেন যে উনি শুনবেন তার মানে শুনবেনই।আর কোন উপায় নেই বলতেই হবে ওনাকে।মিলি একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে বলল,

“আসলে মা গত কয়েক মাস হলো তন্ময়ের ব্যবহারের মাঝে আমি ভীষণ পরিবর্তন লক্ষ্য করছি।ও অন্য কারো সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে মা।”

নিজের ছেলের বিরুদ্ধে তনিমা এত বড় একটা অভিযোগ কোন মতেই মেনে নিতে রাজি নন।তিনি মানুষ করেছেন তন্ময়কে।তার ছেলের চরিত্র এমন হতেই পারে না।রাগান্বিত গলায় মিলিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“ভুলেও আমার ছেলের চরিত্রের উপর দাগ দেওয়ার চেষ্টা করবে না তুমি।কি ভেবেছ আমার ছেলের নামে আমাকে যা খুশি তাই বলবে আর আমি বিশ্বাস করে নেব?পা/গল পেয়েছ আমায়?আমার ছেলের তোমার জন্য পাগলামি দেখিনি নাকি আমি?তার নামে এসব আজেবাজে কথা বলতে লজ্জা করছে না তোমার?”

মিলিট হয়তো অবাক হওয়ার কথা ছিল কিন্তু অবাক হলো না।আশাই করেছিল যে তনিমা কথাটা বিশ্বাস করবেন না।কেননা তিনি তো ছেলে বলতে অন্ধ।আর মিলি কে দুচোখে সহ্য করতে পারেন না।তনিমার জন্য মিলির প্রতি এই ঘৃণাটা আজ নতুন না।বিয়ের পর থেকে উনি মিলি কে কখনো সহ্য করতে পারেননি।বিয়ের পর পর তো মিলির প্রতি তন্ময়ের সীমাহীন ভালোবাসা ছিল।একদম পাগলামো ভালোবাসা যাকে বলে।তন্ময়ের তখন চাকরি ছিল না জন্য মিলি কয়েক মাস ওদের গ্রামের বাড়িতে থেকেছিল।বউ পাগল ছেলেটা একদিন না যেতেই গ্রামে যেত বউয়ের সাথে দেখা করতে।সারা গ্রামে ততদিনে তন্ময়ের বউ পা/গল খেতাব পাওয়া হয়ে গিয়েছিল।সে সব তনিমা ঠিক সহ্য করতে পারতেন না।তন্ময়ের অনুপস্থিতিতে মিলির ওপর নানাভাবে অত্যাচার করতেন,গালাগালি করতেন। বারবার করে মিলিকে চাপ দিতেন যেন নিজের বাপের বাড়ি থেকে কিছু টাকা এনে তন্ময়কে দেয় কিছু করার জন্য।এসবই তন্ময়ের একদম ভালো লাগেনি।কোনমতে একটা ছোটখাটো চাকরি জোগাড় করে দু মাসের মাথায় মিলিকে আবার শহরে নিয়ে এসেছিল।সেই থেকে তোদের ছোট্ট একটা সংসার শুরু হয়েছিল।আর আজ সেই সংসারটা সমাপ্তির পথে চলে এসেছে। মিলিকে চুপ করে থাকতে দেখে তনিমা পুনরায় হুংকার দিয়ে বলল,

“কি হলো চুপ করে গেলে কেন?”

মিলি কিছু বলতে যাবে তার আগেই ফোনের অপর পাশ থেকে একটি কঠোর পুরুষালী কণ্ঠ তনিমাকে ধমক দিয়ে তার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে বললেন,

“কখনো তো মানুষের মতন আচরণ করো মেয়েটার সাথে।”

মিলি জানে এই মানুষটা ওর শ্বশুর।তন্ময়ের পরে ওর শ্বশুরবাড়িতে যদি কেউ মিলিকে ভালোবেসে থাকে তবে সেটা ওর শশুর।মানুষটা অনেক ভাবে চেষ্টা করেছে মিলির বাবার অভাবটা পূরণ করার।অনেকটা করতেও পেরেছিলেনও।এই মানুষটাকে নিয়ে মিলি কখনো কোন অভিযোগ করার সুযোগ পায়নি।ফোনটা কানে ধরে অপর পাশ থেকে ভদ্রলোক নম্র গলায় মিলিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“কেমন আছো মা?”

মিলি সালাম দিয়ে বলল,

“ভালো আছি বাবা।তুমি কেমন আছো?”

আমজাদ সাহেব সালামের জবাব দিয়ে বললেন,

“ভালো আছি।তন্ময় কি করেছে মা তুমি আমায় বলো তো?”

মিলি ঘটনাগুলো সব খুলে বললো।কথাগুলো বলতে শেষের দিকে মিলির গলাটা ধরে এলো।চোখ দিয়ে নিজের অজান্তে পানিও গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে।সবটা শুনতেই আমজাদ সাহেব রাগান্বিত গলায় বলল,

“চিন্তা করোনা আমি কালকে আসছি।ওর এসব নোংরামি আমি বের করে দেব।আর তুমি কাঁদছো কেন?”

মিলি নিজের চোখের জল টুকু মুছে নিয়ে বললো,

“বাবা তোমাদের আরেকটা কথা জানানো হয়নি।”

“কি?”

“আমি প্রেগনেন্ট।”

কথাটা কানে যেতেই আমজাদ সাহেবের মুখ থেকে মুহুর্তের মাঝে রাগ উড়ে গেল।খুশিতে তার দুচোখ চিকচিক করে উঠলো।উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন,

“তুমি তো দারুণ একটা খুশির খবর শোনালে মা।”

“তোমার জন্য খুশির খবর বাবা কিন্তু তন্ময়ের জন্য এটা খুশির খবর না।ও আমায় বলেছে আমি যেন বাচ্চাটা নষ্ট করে ফেলি।”

আমজাদ সাহেব এবার যেন নিজের রাগের উপরে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না।পারছেন না শুধু তিনি ফোনের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে এক্ষুনি তন্ময়কে কয়েকটা চ/ড় লাগাতে।

“তুমি চিন্তা করো না কালকে আমি আসছি।ওর সমস্যা কি সেসব আগে আমি জানতে চাই।”

“আমিও সেজন্যই ফোনটা করেছি বাবা।দেখো যদি একটু ওকে বোঝাতে পারো।আমার না খুব ভয় হচ্ছে।ও মনে হয় আমার সাথে থাকতে চায় না আর।”

বিজ্ঞাপন

“থাকতে চায়না বললেই হলো নাকি?তাহলে পালিয়ে বিয়ে করেছিল কেন?যখন দায়িত্ব পালন করতে পারবেনা তখন সেটা ওর আগে ভাবা উচিত ছিল। তোমায় বললাম তো তুমি এসব না ভেবে নিজের খেয়াল রাখো।বাকিটা আমি দেখছি।”

________

দরজায় কলিং বেল বাজতেই মিলি উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিল।মিলি জানে এ সময়ে তন্ময় ছাড়া কেউ আসবে না।আজ আর তন্ময়ের সাথে দরজা খুলে কোন কথা বলল না,তাকালোও না।প্রয়োজনই মনে করলো না মিলি।ওকে তো এখন মানুষ হিসেবে ভাবতেও মিলির বিবেকে বাঁধে সেখানে কথা বলে আর কি লাভ।তবে তন্ময়ের অভিব্যক্তি একটু অন্যরকম লাগলো।ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে হাস্যজ্জ্বল গলায় মিলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“সারাদিন আমায় ছাড়া কেমন কাটলো মিলি?”

সেই পুরনো কন্ঠ।সেই পুরনো হাস্যজ্জ্বল গলার স্বর।সেই পুরনো প্রশ্ন।মিলি কি উত্তর না দিয়ে পারে?মুহূর্তের মাঝে নিজের সকল অভিমান ভুলে গেল।ভাবলো এইতো ফিরে পেয়েছে তার পুরনো তন্ময়কে।পাল্টা হেসে বলল,

“তুমি ছাড়া যেমন কাটার কথা।এতক্ষণ বড্ড একা লাগছিলো এখন তোমাকে দেখে ভালো লাগছে। তোমার সারাদিন কেমন কাটলো?চোখ মুখ ভীষণ শুকনো দেখাচ্ছে।নিশ্চয় কাজের অনেক চাপ থাকে আজকাল তাই না?”

“হ্যাঁ।আর বলোনা যার আন্ডারে কাজ করি সে একটা পাক্কা ইবলিশ।এক সেকেন্ড একটু কাজ বন্ধ করে থাকতে দেয় না।এমন ভাব করে যেন আমরা মানুষই না।”

“তুমি ফ্রেশ হয়ে এসো আমি খাবার বেড়ে দিচ্ছি।খেয়ে একটু ঘুমোও দেখবে ভালো লাগবে।”

“না আমি ডিনার করে এসেছি বাইরে থেকে।আসলে একটা ক্লায়েন্টের সাথে মিটিং ছিল তো ওইখানে ডিনার করেছি।আমি ফ্রেশ হয়ে ঘুমোবো এখন,তুমি খেয়ে নাও।”

মুহূর্তের মাঝে মিলির ভালো লাগাটুকু আবার হাওয়া হয়ে গেল।সত্যি কি ক্লায়েন্টের সাথে মিটিং ছিল জন্য ডিনার করে এসেছে নাকি বিশেষ কোনো মানুষের সাথে রাতের খাবার শেষ করে এসেছে?মিলির খুব কষ্ট হলো কিন্তু তবুও সেই কষ্ট তার মুখে প্রকাশ করল না।আজ একটু হলেও তন্ময়ের মাঝে পরিবর্তন দেখেছে।অন্তত ভালো করে কথা তো বলেছে,খোঁজ তো নিয়েছে। আজকের জন্য না হয় এতোটুকুই যথেষ্ট।থাক আজ আর বরং কোন অভিযোগ না থাক।মাথা নাড়িয়ে সায় জানাতেই তন্ময় ঘরে চলে যেতে ধরলে মিলি পিছন থেকে ফের ডেকে উঠলো।পিছন ফিরে তাকাতেই মিলি জিজ্ঞেস করল,

“সিয়ামের সাথে কথা হয়েছে তোমার?”

“হ্যাঁ হয়েছে।”

“কি বলল?”

“তুমি যা বলতে বলেছিলে।”

তন্ময়ের কথার প্রেক্ষিতে মিলি ঠিক বুঝলো না যে আদৌ কথাটা স্বাভাবিকভাবেই বললো নাকি ভেতরে রাগ পুষে রেখেছো?সেসব আর ভাবলো না।পুনরায় প্রশ্ন করল,

“তুমি কি ভাবলে?”

“আমার ব্যবহার দেখেও কি বুঝতে পারছ না?”

আর কোন কথা বলল না তন্ময়,ঘরে চলে গেল।মিলি বড্ড দ্বিধাদ্বন্দে ভুগলো।তন্ময়ের ব্যবহারে প্রথমে তো সব ঠিকই লেগেছিল কিন্তু পরে আবার মনের মাঝে সন্দেহ দানা বাঁধলো।এখন কোনটাকে মিলি সত্যি ধরে নেবে আর কোনটা কে মিথ্যে বুঝতে পারছে না।

মিলে আগেই খেতে বসলো না।তন্ময়ের কখন কি প্রয়োজন হয় সেসব আগে ওকে গুছিয়ে দিয়ে তারপরে খেয়েদেয়ে বাকিটুকু কাজ সম্পন্ন করে ঘুমোবে।টেবিলের উপরে খাবার গুলো ঢেকে রেখে ঘরে গেল।ততক্ষণে তন্ময় ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে পড়েছে।মিলিকে দেখে ওর দিকে একটা ওষুধ বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“এই নাও ধরো।রাতে খাবার খেয়ে এই ওষুধটা খেয়ে নাও কেমন?”

মিলি ওষুধের পাতাটা হাতে নিয়ে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“কিসের ওষুধ এটা?”

“তুমি তো প্রেগন্যান্ট।এটা প্রেগনেন্সির ওষুধ তোমার আর বাচ্চার জন্য ভালো।”

“কিন্তু আমি তো এখনো ডাক্তার দেখাইনি।আমার শরীরের কন্ডিশন,বেবির কন্ডিশন না জেনে এভাবে আন্দাজে একটা ওষুধ খাওয়া তো ঠিক না।”

“আরে তুমি চিন্তা করছ কেন?এটা আমার একটা বন্ধু দিল।আর কাল-পরশু তোমায় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো সেজন্যই তো কম করে এনেছি।অনেক বড় ডাক্তার।চিন্তা করোনা।রাতে খাবার খেয়ে এটা খেয়ে নিও।”

“কিন্তু তন্ময় এটা কি আদৌ ঠিক হবে?যদি বেবির উপরে কোন খারাপ প্রভাব পড়ে?”

তন্ময় এবার মৃদু বিরক্তিকর গলায় বলল,

“আরে বাবা বলছি তো আমি পড়বে না।ট্রাস্ট নেই আমার কথার উপরে?”

মিলি আর কিছু বলল না।চুপচাপ ওষুধটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেল।খাবার নিয়ে একা একা টেবিলে বসে খেতে মিলির একটুও ভালো লাগেনা।পাশে যদি অন্তত তন্ময় একটু বসে থাকে ওর সাথে টুকটাক গল্প করতো ভীষণ ভালো লাগতো।

মিলির খাওয়ার মাঝেই তন্ময় ল্যাপটপ হাতে নিয়ে এসে মিলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমার অফিসের কিছু দরকারি কাজ আছে আমি পাশের ঘরে আছি।তুমি ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো নাহলে লাইটে তোমার ঘুমোতে সমস্যা হবে।”

মিলি মুখের মাঝে থাকা অবশিষ্ট খাবারটুকু গিলে নিয়ে তন্ময় কে বলল,

“আজ তো নতুন না তন্ময় যে তুমি রাত জেগে অফিসের কাজ করছো।এর আগে তো কখনো আমার অসুবিধা হয়নি তাহলে আজ কেন অসুবিধা হবে?”

“এর আগে তো তুমি একা ছিলে মিলি কিন্তু এখন তোমার ভেতরে আরেকজন আছে।তোমাদের দুজনেরই এখন পর্যাপ্ত রেস্ট দরকার সেই জন্যই আমি ওই ঘরে যাচ্ছি না হলে যেতাম না।”

তন্ময়ের যুক্তিটা মিলির কাছে ভুল কিছু মনে হলো না।সত্যি এখন ওর পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশ্রাম দরকার যাতে ও আর বাচ্চা দুজনেই ভালো থাকে।যাওয়ার আগে তন্ময় আরেকবার ওষুধটা খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়ে গেল।মিলি খাবার খেয়ে থালা বাসন সব মেজে রান্নাঘর,টেবিল পরিষ্কার করে খাবারগুলো ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখল।এর মাঝে তন্ময়ের জন্য আবার কফি বানিয়ে ফ্লাস্কে তুলল।রাত জেগে কাজ করলে তন্ময়ের সব সময় কফি প্রয়োজন হয়।নিজের অভ্যাস নিজের প্রয়োজনগুলো তন্ময় ভুলে গেলেও মিলি ভুলতে পারেনা।ফ্লাস্কটা হাতে নিয়ে পাশের ঘরে যেয়ে দেখলো তন্মার ভিতর থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছে।যেই না নক করতে যাবে ওমনি ভেতর থেকে তন্ময়ের গলার স্বর ভেসে এলো।কারো সাথে কথা বলছে।মিলির হাতটা থেমে গেল।কথাগুলো শোনার চেষ্টা করল।

“আরে রাগ করছ কেন তুমি?আমি তো তোমার সাথে ডিনার করে এসেছি।এখন মিলির সাথে ঘুমোইনি অব্দি।তোমার কথাই তো শুনছি আর কি করতে বলছো?”

তন্ময়ের কথার প্রেক্ষিতে অপর পাশ থেকে কি উত্তর এলো সেটা মিলির জানা নেই।তন্ময় পুনরায় অপর পাশের মানুষটাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোমাকে তো বললাম বেবি নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।সেই সমস্যার সমাধান আমি করে ফেলেছি।বাচ্চাই যদি না থাকে তাহলে কিসের চিন্তা আমাদের?”

মিলি দুচোখ খিঁচে বন্ধ করে নিল।এতটা সময় ধরে যে একটু একটু তন্ময়ের উপর ভরসাটা জেগেছিল,আবার যে ভালোলাগাটা ফিরে এসেছিলো ওর মুহূর্তের মাঝে সেটা আবার শেষ হয়ে গেল।কিন্তু তন্ময় এই কথাটা কেন বলল?কি হবে ওদের বাচ্চার?হঠাৎ করে মিলির চোখ গেল টেবিলের উপরে রাখা ওষুধের পাতাটার ওপর।মিলির সন্দেহ হলো।এটা আসলে কিসের ওষুধ? তন্ময় তো এই বাচ্চাটাকে মানতেই রাজি ছিল না সেখানে ওর আর বাচ্চার ভালোর জন্য কিনা ওষুধ আনলো?এটা তো আগে ভেবে দেখেনি মিলি।ব্যাপারটা মোটেও মিলির সুবিধার লাগলো না।ওষুধটা হাতে নিয়ে জ্যোতির ফ্ল্যাটে গেল।জ্যোতির স্বামী ডাক্তার।ওনাকে ওষুধটা দেখালে নিশ্চয়ই বলতে পারবেন যে এটা কিসের ওষুধ।মিলি কলিং বেলটা বাজিয়ে দাঁড়িয়ে রইলা।চিন্তায় আর অস্থিরতায় তার হাত-পা কাঁপছে, কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে।তার নিজের সন্দেহ যদি ঠিক হয় তবে আজকের পর থেকে আর কখনোই তন্ময়ের প্রতি ওর ঘৃণা ছাড়া আর কোন অনুভূতি কাজ করবে না।কয়েক মিনিটের ব্যবধানে জ্যোতি এসে দরজা খুলে দিল।এই অসময়ে মিলিকে দেখে ভীষণ অবাক হলো।

“আরে মিলি তুমি এত রাতে?কোন সমস্যা হয়েছে নাকি?”

“জ্যোতি তোমার স্বামী মানে ভাইয়া কি বাড়িতে আছে? আমার একটু দরকার ছিল ওনার সাথে।”

“হ্যাঁ ও তো বাড়িতে আছে,ভেতরে এসো।”

মিলি আর কোন কথা না বলে চুপচাপ জ্যোতির সাথে ভেতরে গেল।জ্যোতি ওকে নিজের ঘরে নিয়ে গেল।মিলিকে দেখতেই নিজাম সৌজন্য মূলক হেসে বলল,

“আরে ভাবি আপনি?”

“হ্যাঁ ভাইয়া আসলে আপনার সাথে একটা দরকার ছিল।”

“কি দরকার বলুন।”

মিলি কাঁপা কাঁপা হাতে ওষুধের পাতাটা নিজামের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“একটু এটা দেখে বলতে পারবেন ভাইয়া কিসের ওষুধ?”

নিজাম ওষুধটা হাতে নিয়ে নামটা দেখতেই চমকে উঠলো।আতঙ্কিত গলায় বলল,

“আপনি এটা খেয়েছেন নাকি?”

“না খাইনি তবে খেতাম।”

“পা/গল নাকি আপনি?কে খেতে বলেছে আপনাকে এই ওষুধ?”

“কেন ভাইয়া কি হয়েছে?এই ওষুধটা কিসের?”

“এই ওষুধটা খেলে আপনার মিসক্যারেজ হয়ে যাবে সেটা জানেন?”

মিলি বেশ বড়সর একটা ধাক্কা খেল।মনে হলো পায়ের নিচ থেকে শক্ত মাটি সরে গেল তার।দাঁড়িয়ে থাকার আর ক্ষমতা রইলো না।ধপ করে বিছানার উপর বসে পড়ল।যাকে সবথেকে কাছের ভেবেছে,নিজের সবটা দিয়ে ভালোবেসেছে সেই মানুষটাই যদি এভাবে ঠকায় তাহলে কার কাছে অভিযোগ করবে মিলি?

জ্যোতি এগিয়ে এসে ওকে আঁকড়ে ধরে চিন্তিত গলায় বলল

“এই মিলি কি হয়েছে?আর এসব ওষুধ কেন খাচ্ছিলে তুমি?”

মিলি যেন কোন কিছু বলার অবস্থাতেই রইল না।নিজাম ইশারায় জ্যোতি কে বলল মিলিকে একটু পানি দিতে।জ্যোতি পানি এগিয়ে দিলো।

মিলি দু ঢোক খেলো আর বেশি খেতে পারল না।মিলির দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে তবে তার কান্নার কোন শব্দ হলো না।মিলির সেই চোখের জলই যেন নিজাম আর জ্যোতি কে ভালো কিছুর আভাস দিল না।নিজাম বললো,

“সত্যি করে বলুন তো ভাবি কে আপনাকে খেতে বলেছে এই ওষুধটা?কোন ডাক্তার তো কখনই বলবে না যদি না আপনি এই বাচ্চাটাকে নষ্ট করতে চান।আমি একটু জানতে চাই যে কোন মূর্খ আপনাকে ওষুধ টা দিল।আর আপনাকে বলছি এভাবে যে কেউ ঔষধ দিয়ে দিল আর আপনি সেটা খেয়ে নেবেন?অন্তত আগে দেখবেন তো ওষুধটা কিসের?এই সময় নিজের খেয়াল না রাখলে চলবে?”

মিলি নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে নিজামের দিকে তাকিয়ে বলল,

“যাকে ভালোবাসি,যার সাথে এতগুলো বছর হলো সংসার করছি,এক ছাদের নিচে থাকছি,এক বিছানায় ঘুমোচ্ছি তাকে বিশ্বাস করাটাও কি অন্যায়?যদি চোখ বন্ধ করে নিজের স্বামীকেই বিশ্বাস করতে না পারি তাহলে আর কাকে করবো?”

নিজাম আর জ্যোতির এবারে আর বুঝতে বাকি রইল না যে ওষুধটা মিলিকে কে দিয়েছে।নিজাম রাগান্বিতা স্বরে বলল,

“তন্ময় আপনাকে দিয়েছে তাই না?এর কিন্তু একটা ব্যবস্থা করতেই হবে।ও বাড়াবাড়ি শুরু করে দিয়েছে।”

“থাক ভাইয়া বাদ দিন।ও যখন আমাকে চায় না,আমার সন্তানকে চায় না তখন আমরা ওর জীবনে থাকবো না।তাই বলে আমি ভাবতে পারিনি যে ও নিজের সন্তানকে এভাবে খু/ন করতে চাইবে।”

জ্যোতি চিন্তিত গলায় বলল,

“শোনো মিলি তুমি ওই ফ্ল্যাটে যেও না,তুমি এখানেই থাকো।ওই ছেলে একটা খু/নি।ওকে বিশ্বাস করা যায় না।”

মিলি তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

“চিন্তা করো না জ্যোতি।আর বেশি দিন এমনিতেও আমি ওখানে থাকবো না।আমার বিশ্বাস ভেঙে দিয়েছে তন্ময়।আর কোনো চেষ্টা করবো না,না ওকে আর বেঁধে রাখার চেষ্টা করবো।ওকে মুক্তি দেব এবার।আর আমি জানি এই মুক্তির জন্য তন্ময় একদিন আফসোস করবেই।”

বিজ্ঞাপন
রিক্ত বসন্ত গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস