রিক্ত বসন্ত

পর্ব - ১

🟢

আজ তৃতীয়বারের মতো স্বামীর শার্ট থেকে কোন অপরিচিত পারফিউম এর সুগন্ধ পেল মিলি। সুগন্ধটা যে কোন মেয়েলি পারফিউমের সেটাও তার বুঝতে বাকি রইলো না। কেননা একসময় মিলি নিজেও এই পারফিউমটা ব্যবহার করত। বেশ দামী ব্রান্ডের। তবে এখন আর ব্যবহার করা হয় না। এত দামি পারফিউম ব্যবহার করার থেকে সেটুকু টাকা বাঁচিয়ে তার সংসারের অন্যান্য কাজে ব্যয় করতে সে বেশি পছন্দ করে।

মিলিকে শার্ট হাতে নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তন্ময় তোয়ালে তে মাথা মুছতে মুছতে বলল,

“শার্ট ধরে দাঁড়িয়ে আছো কেন? খিদে পেয়েছে খাবার দাও।”

মিলি ভাবলো প্রশ্নটা করবে কি করবে না। একবার ভাবলো করেই ফেলবে। মনের মাঝে সন্দেহ গুলো রাখার থেকে সেগুলো প্রকাশ করাই ভালো। কিন্তু পরক্ষণেই আবার ভাবলো এখন হয়তো প্রশ্নটা করা ঠিক হবে না। একটু আগেই অফিস থেকে ফিরেছে এখন যদি আবার এসব কথা বলে তাহলে তন্ময় রেগে যেতে পারে। তার থেকে বরং খাওয়া দাওয়া করে বিশ্রাম নিয়ে নাহয় রাতে শোবার সময় প্রশ্নটা করা যাবে।

আলতো হেসে বলল,

“মাথা মুছে এসো আমি খাবার বেড়ে দিচ্ছি।”

তিন বেলা তন্ময়ের প্রিয় খাবারগুলো রান্না করতে মিলির ভীষণ ভালো লাগে। তার সারাদিন কেটে যায় সংসারের কাজ করতে। তন্ময় তো সেই সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় আবার রাতে ফেরে। তেমন একটা কথাও হয় না ফোনে যদি মিলি আগবাড়িয়ে ফোন না করে। মাঝে মাঝে তো মিলি ফোন করলেও বিরক্ত হয়ে যায়। তার নাকি কাজের প্রচণ্ড প্রেসার। নিজের স্ত্রীর সাথেও কাজের মাঝে দু মিনিট কথা বলার সময় পাওয়া যায় না। মিলি অবশ্য সেসব মেনে নিয়েছে। সব ব্যাপারে অভিযোগ করতে নেই। তাও যেখানে অভিযোগের কোন মূল্য নেই সেখানে তো অভিযোগ করাটাই বোকামি।

তন্ময় চেয়ারে এসে বসে চুপচাপ আপন মনে খাচ্ছে আর ফোন স্ক্রল করছে। মাঝে মাঝে আবার কাউকে মেসেজ পাঠাচ্ছে এর মাঝে। পাশের চেয়ারে মিলি চুপচাপ বসে আছে। সে যে খাচ্ছে না সেই দিকে তন্ময়ের কোনো খেয়ালই নেই।

মিলির অভিমান হলো। তবে সবটুকু অভিমান সে নিজের মাঝে রেখে দিল। আজকাল তো আর তন্ময় তার অভিমান ভাঙ্গায় না যে সেগুলো প্রকাশ করবে।মাংসের বাটিটা হাতে নিয়ে তন্ময়ের প্লেটে দু পিস তুলে দিতেই তন্ময় হালকা রাগী কন্ঠে বলল,

“আবার কেন দিচ্ছো? আমি কি দিতে বলেছি?”

মেয়েটার মুখটা ছোট হয়ে এলো। ও তো ভালোবেসেই দিয়েছিল। আর যদি নিতে নাই চায় সেটা কি ভালো করে বলা যায় না?

“না খেলে রেখে দাও। এই ছোট একটা বিষয়ে এত রাগারাগি করার কি আছে?”

মিলির কথা শুনে তন্ময় আরও বেশি রেগে গেল। প্লেটটা সামনের দিকে একটু ঠেলে দিয়ে বলল,

“তিন বেলা খাবার নষ্ট করব? জানো এখনকার বাজারে সবজি, মাছ-মাংসের দাম কত? জানবে কি করে? বসে বসে চুপচাপ শুধু খাও আর নষ্ট করো।”

“চাকরি তো করতাম আমি, তুমি তো আর করতে দিলে না। তাহলে এখন বসে বসে খাবার খোটা দিচ্ছো কেন?”

“ভুল হয়ে গিয়েছিল। আমার আগে বোঝা উচিত ছিল যে তোমাকে চাকরি করতে না দিলে শুধু বসে বসে অন্ন ধ্বংস করবে আর আমার মাথা খাবে। ধ্যাত খাওয়ার রুচিটাই নষ্ট করে দিল।”

পুরো ঘটনাটা ঠিকঠাক বোঝার আগেই তন্ময় উঠে চলে গেল। ফোনটা তখনো টেবিলের ওপরে পড়ে আছে।মেসেজের টুং শব্দ হয়ে ফোনের আলোটা জ্বলে উঠলো। কি ভেবে যেন মিলি একবার সেদিকে তাকালো।

জেসি নামক একটা আইডি থেকে মেসেজ এসেছে,

“আমার সাথে তো ডিনার করেই গেলে আবার খেতে বসেছো কেন?”

এতক্ষণে মনে হয় মিলি বুঝলে তন্ময়েরই অযথা রাগ দেখানোর কারণটা।খাবারটুকু হয়তো পেটে যাচ্ছিলো না।গলা দিয়ে নামাতে চাইছিল কিন্তু নামলো না।নামবে কি করে?পেটের ভিতরে তো জায়গাই নেই।তবে সরাসরি বলতেও পারছে না মিলি কে যে বাইরে থেকে খেয়ে এসেছে।রোজ রোজ তো আর এক অজুহাত দেওয়া যায় না যে অফিস থেকে খাইয়েছে বা বন্ধু খাইয়েছে।কারই বা এত টাকা বেশি হয়েছে যে রোজ রোজ ওকে বাইরে হোটেলে খাওয়াবো?সেজন্য মিথ্যা একটা রাগ দেখানোর বাহানা করে উঠে চলে গেল।

তন্ময় বেসিন থেকে হাত ধুঁয়ে এসে টেবিল থেকে ফোনটা নিয়ে চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে মিলি বলে উঠলো,

“জেসি কে?”

জেসির নামটা শুনতেই তন্ময় হালকা কেঁপে উঠলো।তবে নিজের ভয়টুকু মিলির সামনে প্রকাশ করলে চলবে না।চোখ মুখে রাগী ভাব ফুটিয়ে রেখে বলল,

“আমার কলিগ।কেন?”

“একটু আগে তো অফিস থেকে এলে এত তাড়াতাড়ি কলিগের আবার তোমার কথা মনে পড়ে গেল যে আবার মেসেজ দেওয়া শুরু করেছে?ওনার কি কমনসেন্স নেই যে এত রাতে একজন বিবাহিত পুরুষকে মেসেজ দেওয়া উচিত হবে কি হবে না?”

“তুমি ঠিক করে দেবে এখন আমি কার সাথে কখন কথা বলবো?আর আমার ফোন দেখার সাহস পেলে কোথায় থেকে?লিসেন মিলি,একদম নিজের লিমিট ক্রস করবে না।”

“লিমিটটা কিন্তু তুমি ক্রস করছো তন্ময়।আমি তোমার ওয়াইফ,তোমার সবকিছুর প্রতি আমার অধিকার আছে।তুমি চাইলে আমার ফোন দেখো না আমি তো তোমায় আটকাবো না।তাহলে তোমার ফোন যদি আমি দেখি সমস্যা কোথায়?”

“আছে আমার সমস্যা।আর একটা কথা কান খুলে শুনে রাখো তুমি আমার ওয়াইফ জন্য আমার সবকিছুতে আমি তোমায় অধিকার দেইনি।আমার একটা আলাদা লাইফ আছে,আমার নিজের পার্সোনাল স্পেস আছে বুঝতে পেরেছো?ইন ফিউচার সেখানে ইন্টারফেয়ার করার একদম চেষ্টা করবে না।তুমি তোমার মতন থাকো না আমি কি তোমায় কখনো কিছু বলেছি?সারাদিন খাচ্ছ,ঘুরছো,বাড়িতে কার সাথে কি করছো আমি তো কোনো খোঁজ রাখি না সেসবের।তাহলে তুমি এত আমার পেছনে গোয়েন্দাগিরি করছ কেন?যত্তসব!”

কথাগুলো এক নাগাড়ে বলে হেঁটে ঘরের ভেতরে গিয়ে ঠাস করে দরজাটা বন্ধ করে দিল।মিলি থ হয়ে সেখানে বসে রইল।খুব কি অন্যায় কিছু বলে ফেলেছিল? নিজের স্বামী কার সাথে কি করছে সেটুকু জানার অধিকারও কি মিলির নেই?হয়তো নেই।যদি স্বামী পর হয়ে যায় তাহলে আর জানার অধিকার কি করে থাকে?

রাতের খাবার আর পেটে পড়লো না মিলির। খাবারগুলো ফ্রিজে ঢুকিয়ে রেখে টেবিলটা গুছিয়ে ঘরের সামনে এসে দরজায় দুবার নক করলো।ভিতর থেকে তন্ময়ের কোন সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না।মিলি এবার একটু জোরে করাঘাত করলো সেই সাথে তন্ময়ের নাম ধরে কয়েকবার ডাকলো তারপরেও তন্ময়ের কোন সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না।চুপচাপ সেখানে মিনিট পাঁচেকের মতন দাঁড়িয়ে থাকল।তারপর উপায় না পেয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে তন্ময়ের নাম্বারে কল করলো।নাম্বারটা বিজি পেল।মিলির কানে ভিতর থেকে তন্ময়ের হো হো করে হাসির শব্দ ভেসে আসছে।

মিলির এখন শুধু বুক ফেটে কান্না আসছে।তন্ময় কি ভেবেছে মিলি কিছু আন্দাজ করতে পারছে না।একজন পুরুষ তার স্ত্রীর প্রতি উদাসীন তো তখনই হয় যখন বাইরে নিজের চাহিদাগুলো পূরণের একটা জায়গা পেয়ে যায়।মিলি এবার সর্বশক্তি প্রয়োগ করে দরজায় করাঘাত করলো,তাও অনবরত।ভেতরে থাকা সমস্ত রাগ যেন দরজার উপরে দেখাতে চাইলো।এবারে কাজ হলো।তন্ময় হন্তদন্ত পায়ে একপ্রকার ছুটে এসে দরজা খুলে ব্যস্ত গলায় বলল,

“কি হয়েছে?”

মিলি কোন উত্তর দেয়ার প্রয়োজন মনে করল না।চুপচাপ ঘরের ভিতরে গিয়ে শুয়ে পড়ল।তন্ময়ও আর কিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করলো না।আবার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো।

মিলি কাঁদতে চায় না তবে তার চোখের জল তার সাথে বেইমানি করল।ধীরে ধীরে বালিশটা ভিজে গেল।ঘড়িতে সময় রাত বারোটা,একটা পার করে দুটোর ঘরে গিয়ে ঠেকলো তবুও তন্ময়ের ভেতরে আসার কোন নাম নেই।ক্ষণে ক্ষণে মিলির কানে তন্ময়ের হাসির আওয়াজ ভেসে উঠছে।যদিও কি কথা হচ্ছে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে না,ফিসফিস আওয়াজ আসছে।মাঝে মাঝে হালকা যে দু একটা শব্দ কানে ভেসে আসছে তাতেই বোঝা যাচ্ছে যে তন্ময় অপর পাশের মানুষের সাথে কতটা বিনম্র গলায় কথা বলছে।অথচ আজকাল মিলির সাথে কথা বলে সম্পূর্ণ বিপরীত স্বরে।মিলি আর সহ্য করতে পারলো না।গলা উঁচিয়ে তন্ময়ের নাম ধরে কয়েকবার ডাকতেই তন্ময় ঘরে এসে বিরক্তিকর গলায় বলল,

“কি হয়েছে?”

বিজ্ঞাপন

মিলি রাগান্বিত কন্ঠে বলল,

“ঘড়িতে একবার সময় দেখেছো রাত কয়টা বাজে?কোন ভদ্র বাড়ির ছেলে এত রাত অব্দি ফোনে এরকম হো হো করে হেসে কথা বলে?”

তন্ময় নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,

“তোমার যদি খুব সমস্যা হয় তাহলে অন্য ঘরে গিয়ে ঘুমোলেই তো পারো?”

“কেন অন্য ঘরে ঘুমোবো আমি?এটা কি আমার ঘর না?”

“আমারও ঘর।তোমার যা ইচ্ছে তুমি তাই করো,আমার যা ইচ্ছে আমি তাই করবো।”

“এবারে কিন্তু তুমি অতিরিক্ত অসভ্যতামি করছো তন্ময়।মাঝরাত অব্দি তুমি ফোনে কথা বলে ঘুমোবে আর সকালে ঘুম থেকে দেরি করে উঠে যখন অফিসে যেতে দেরি হয়ে যাবে তখন সব গরম আমার ওপরে দেখাবে?পেয়েছোটা কি?সহ্য করি জন্য যা খুশি তাই করছো আজকাল।আর কার সাথে কথা বলছো উত্তর দাও?”

তন্ময় তাচ্ছিল্য গলায় বলল,

“তুমি ভাবলে কি করে তুমি আমার থেকে উত্তর চাইবে আর আমি তোমায় উত্তর দেবো?এমনিতেও আমার কথা বলা শেষ।এখন মাথা না খেয়ে আমায় ঘুমোতে দাও।”

তন্ময় এসে ঘুমিয়ে পড়ল।মিলি অবাক না হয়ে পারল না।একটা মানুষ চোখের সামনে এতটা বদলে গেল? ভালোবাসা এত তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেল?কয়েকদিন আগেও তো মিলিকে জড়িয়ে না ধরে ঘুমোতে পারতো না তন্ময়।এই তো কিছুদিন আগে মাঝরাতে মিলিকে নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকে গল্প করত,আর আজ সব বদলে গেল?মিলির অপরাধটা কি সেটাই বুঝতে পারে না।কি করলে যে আবার তন্ময়ের মন পাবে সেই কারণ তার জানা নেই।তন্ময়ের বদলটাই বা কেন ঘটছে সেটাও জানে না।শুধু একটা বিষয় যেন খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছে,এই সংসারে মিলির দিন ফুরিয়ে আসছে।তন্ময়ের জীবনে মিলির গুরুত্ব ফুরিয়েছে,দরকার ফুরিয়েছে।আর তার বহু আগে ফুরিয়েছে ওদের দুজনের মাঝে থাকা ভালোবাসা।

______

ফজরের আজান কানে যেতেই মিলির ঘুম ভেঙে গেল।প্রতিদিন সকালে এই সময় ওঠা তার অভ্যাস।এখন ফ্রেশ হয়ে নামাজ পড়ে যাবে রান্না ঘরে তন্ময়ের জন্য রান্না করতে।সাতটার মধ্যে তন্ময় বেরিয়ে পড়ে।এর আগে তার জন্য সকালের নাস্তা,দুপুরের খাবার সবকিছুর ব্যবস্থা মিলিকে করতে হয়।যদি একটু সময় এদিক ওদিক হয় তবে হয়ে গেল।মিলিকে রাগ দেখিয়ে অমনি বেরিয়ে যাবে।মিলি তখন ব্যস্ত হতে রান্না করছে।কলিংবেলের আওয়াজ পেতেই তাড়াহুড়ো করে গিয়ে দরজা খুলে দিল।মিলি জানে এই সময় কে এসেছে।প্রতিদিনই এই সময়টায় পাশের ফ্ল্যাটের এক ভদ্রমহিলা মিলির ফ্ল্যাটে আসে।ওনার সাথে মিলির বেশ ভালোই বন্ধুত্ব।মিলি সংসারের কাজের ফাঁকে যেটুকু টুকটাক সময় পায় জ্যোতির সাথে একটু টুকটাক কথা বলে।যদিও মিলি নিজে থেকে ওদের ফ্ল্যাটে কখনোই যায় না।জ্যোতি যখন একটু সময় পায় মিলির ফ্ল্যাটে চলে আসে।নিজের জীবনের টুকটাক যা কথা বলা আজকাল জ্যোতির সাথেই বলে।কারো সাথে তেমন কথাবার্তা হয় না,ভালোই লাগে না কারো সাথে কথা বলতে।দিন দিন কেমন যেন নিজের জীবনের প্রতি উদাসীন হয়ে যাচ্ছে মিলি।কোন কিছুতেই মন বসাতে পারে না আজকাল।কোন কিছুই আর তাকে হাসাতে পারে না।

“কি রান্না করছো মিলি?”

জ্যোতির প্রশ্নে মিলি ব্যস্ত গলায় বলল,

“আলুর পরোটা বানাচ্ছি।তন্ময়ের ভীষণ পছন্দ।”

জ্যোতি নাক মুখ কুঁচকে বলল,

“কি হবে ওর পছন্দের খাবার বানিয়ে?সেই তো ঘুম থেকে উঠে তোমার সাথে খ্যাকখ্যাকই করবে।”

মিলি মলিন হেসে বলল,

“সংসারটা বাঁচানোর চেষ্টা করছি।জানো তো আমার যাওয়ার কোন জায়গা নেই।এই কথাটা তন্ময় খুব ভালো করেই জানে,সেই জন্যই বোধহয় এখন আরও বেশি অবহেলা করে।ও জানে ও যতই আমার সাথে খারাপ আচরণ করুক না কেন আমি কোথাও যাবো না।ওর সংসারেই পড়ে থাকতে হবে।”

“ওর এই ধারণাটা একটু ভুল প্রমাণ করার দরকার মিলি।ওকে আচ্ছা মতো একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার।কয়েকদিনের জন্য একটু উধাও হয়ে যাও তো।এই তিন বেলা মুখের সামনে গরম ভাত রেখে দাও তো সেজন্য তোমার মর্ম বোঝে না।একদিন একটু নিজে রেঁধে খেলেই বুঝবে বউ কি জিনিস।”

“জোর করে বুঝিয়ে কি লাভ?আগে তো আমাকে বোঝাতে হয়নি।ও নিজে আমার মর্ম বুঝে আমাকে বিয়ে করেছিল।আমি আর জোর করে কিছু করতে পারবো না জ্যোতি।আমি শুধু আর কয়েকটা দিন চেষ্টা করব।”

জ্যোতি কিছু একটা ভেবে মিলিকে বলল,

“একটা পরামর্শ দেবো?”

“কিসের?”

“তোমাকে দেখে বুঝতে পারছি আমি,যে কোন মূল্যেই হোক তুমি এই সংসারটা বাঁচাতে চাও।তার কারণ তন্ময়কে তুমি ভীষণ ভালোবাসো।বিয়ের তো বেশ কয়েক বছর হলো একটা বাচ্চা নাও।দেখবে নিজের সন্তানের মায়ায় পড়ে হলেও তন্ময় ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে।এমনটা বড়রা বলে।”

জ্যোতির কথার মিলি কোন উত্তর দিলো না।এই কথাটা সে নিজেও ভেবেছে।হয়ত এবারে সুখবরটা পাওয়ার সময়ও হয়ে এসেছে,শুধু নিশ্চিত হওয়া বাকি।তবে তন্ময় কে নিয়ে চিন্তায় আছে।তন্ময়ের সাথে একবার আলোচনা করেছিল এই বিষয়ে,তখন তন্ময় ভীষণ রেগে গিয়েছিল।সরাসরি বলে দিয়েছিলো এখন নাকি এসব বাচ্চাকাচ্চার জন্য তন্ময় প্রস্তুত না।আগে নিজের জীবনে আরেকটু উন্নতি করবে তারপর এসব কথা।মিলিও তখন মেনে নিয়েছিল তবে এখন সে এই বিষয়টা মানতে নারাজ।এই সংসারে মিলি যেন একটা সন্তানের কমতি অনুভব করছে।

মিলির এসব ভাবনার মাঝেই তন্ময়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো ওর কানে।

“মিলি আমার ওয়ালেট কোথায়?”

মিলি গলা উঁচিয়ে বলল,

“তোমার ওয়ালেট কোথায় সেটা আমি কি করে জানব?”

তন্ময় রুষ্ট গলায় বলল,

“এটুকু খোঁজও রাখতে পারো না?সারাদিন বাইরে খেটে খুটে এসে একটু শুধু বলি আমার জিনিসগুলো গুছিয়ে রাখবে।সেটুকু যদি করতে না পারে তবে তোমায় দিয়ে হবেটা কি?”

“সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে মজা করো না তো আমার সাথে তন্ময়।এখন খুঁজে পাচ্ছো না জন্য মনে হয়েছে যে আমার গুছিয়ে রাখা দরকার ছিল অথচ আমি তোমার জিনিস এ হাত দিলে তুমি রেগে যাও।আগে নিজে ঠিক করো আমায় কোনটা করতে বলবে তারপর এসব গরম দেখিও।আর আমায় দিয়ে কি হবে আর কি হবে না সেটা প্রেম করার সময় ভাবা উচিৎ ছিল।”

প্রতিউত্তরে তন্ময়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো না।জ্যোতি বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

“তোমার আবার আজ হঠাৎ করে কি হলো মিলি?তুমি তো এত রেগে যাও না।”

“সবারই সহ্যের একটা সীমা থাকে।হয়তো আমার সহ্যের সীমাও একদিন শেষ হবে আর সেই দিনটাও হয়তো খুব নিকটেই।”

বিজ্ঞাপন
রিক্ত বসন্ত গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস