রিক্ত বসন্ত

পর্ব - ৪

🟢

(সবাই রেসপন্স করবেন।আপনাদের আগ্রহ দেখলে আমার লেখায় আগ্রহ বাড়বে।)

সকালে না খেয়ে অফিসে বেরিয়ে পড়ল তন্ময়।দুপুরের খাবারটাও নিলো না।মিলির সাথে একবার কথা বলা তো দূর চোখ তুলেও তাকালো না।রাতে মিলির সঙ্গে এক ঘরে ঘুমোয়নি,পাশের ঘরে ঘুমিয়ে ছিল।মিলিও আগ বাড়িয়ে গিয়ে কোন কথা বলেনি আর না রাতে তার নিজের কিছু খাওয়া হয়েছে।অন্যান্য সময় হলে হয়তো সকালেও কিছু খেত না যদি ব্যাপারটা শুধু নিজের সাথে জড়িত হতো।কিন্তু না এখন মিলিকে নিজের খেয়াল রাখতে হবে।নিজের অনাগত সন্তানের জন্য হলেও মিলিকে নিজের খেয়াল রাখতে হবে।রাতের ভাত তরকারি ফ্রিজ থেকে বের করে গরম করে সেগুলোই খেয়ে নিল।শরীরটা আজ কেন যেন ভীষণ দুর্বল লাগছে।মানসিক আর শারীরিক দু দিক থেকেই মিলির নিজেকে বিধ্বস্ত মনে হচ্ছে।বিছানায় বালিশ ঠিক করে হেলান দিয়ে বসে ফোনটা হাতে নিয়ে নীলিমার নাম্বারে কল করলো।অনেকদিন হলো কথা হয়না ওর সাথে।মনে হলো আজ একটু ওদেরকে অন্তত সবটা জানানো দরকার।সিয়াম কে বলে যদি তন্ময়কে একটু বোঝানো যায়।রিং হয়ে গেল কিন্তু নীলিমা ফোনটা রিসিভ করলো না।সিয়ামের নাম্বারে কল করলে সিয়ামও ফোনটা রিসিভ করলে না।মিলির হালকা একটু চিন্তাই হলো।কখনো তো ওরা এমন করে না।মিনিট পাঁচের পরে সিয়ামের নাম্বার থেকে কল ব্যাক এলো।মিলি সময় ব্যয় না করে কল রিসিভ করে চিন্তিত গলায় বলল,

“কিরে তুইও ফোন ধরছিস না,নীলিমাও ফোন ধরছেনা ঠিক আছিস তোরা?”

সিয়ামের কন্ঠ ভীষণ ভারী শোনালো।ভারাক্রান্ত গলায় বলল,

“না রে মিলি ঠিক নেই আমরা।”

মিলি উৎকণ্ঠিত গলায় বলল,

“কেন কি হয়েছে?”

“নীলিমার মিসক্যারেজ হয়ে গেছে?”

মিলি আঁৎকে উঠে বলল,

“কি বলছিস?কি করে হলে এমন?”

“বাচ্চার হার্ট বিট পাওয়া যাচ্ছিলো না।বাচ্চাটা ভেতরে থাকলে নীলিমার জীবনের ঝুঁকি ছিল।সেজন্য বাধ্য হয়ে…”

নিজের কথাটা শেষ করতে পারলো না সিয়াম।মুখে আনতেও তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।

“নীলিমা ঠিক আছে এখন?আর কবে হলো এসব?”

“দুদিন আগে।”

মিলি এবার মৃদু রাগান্বিত কন্ঠে বলল,

“দুদিন আগে হয়েছে আর তুই একবার আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করলি না?”

“প্লিজ রাগ করিস না।আসলে তেমন মানসিকতাই ছিল না,পরিস্থিতিও হাতের বাইরে ছিল।নীলিমাকে সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।খাওয়া-দাওয়া কিছু করছে না সারাদিন শুধু কান্নাকাটি করছে আর বলছে ওর ভুলের কারণে এমনটা নাকি হয়েছে।আমি এত করে ওকে বোঝানোর চেষ্টা করছি যে ভাগ্যে যা ছিল তাই হয়েছে কিন্তু ও কোন কথাই বুঝতে চাইছে না।”

“এমনটা হওয়া স্বাভাবিক সিয়াম।এই নিয়ে দুটো সন্তান হারাতে হলো নীলিমা কে।”

“সেসব তো আমিও বুঝতে পারছি,কষ্ট আমারও হচ্ছে।কিন্তু এমন করলে যদি ওর কিছু একটা হয়ে যায় তখন আমার কি হবে?তুই জানিস আমার কাছে নীলিমার গুরুত্ব বেশি।”

“ওকে ফোনটা দে একটু কথা বলি।দেখি কিছু বোঝাতে পারি কিনা।”

“এখন তো ঘুমোচ্ছে উঠলে আমি তোকে কল দিতে বলব কেমন।তুই কিছু বলবি?ফোন করেছিলি কেন?”

মিলির ইতস্তত হচ্ছে এখন তন্ময়ের কথাটা বলতে। সিয়াম নিজেই একটা বিশাল বড় ঝামেলার মাঝে আছে এর মাঝে কি আবার ওর ঘাড়ে নিজের এই অশান্তি গুলো চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে?মিলির সেই নীরবতার মানে বোধহয় সিয়াম হালকা কিছু আন্দাজ করলো।আশ্বস্ত করে বলল,

“যা বলতে চাস নিশ্চিন্ত মনে বল।যত সমস্যাই থাকুক না কেন তোর চিন্তার ভার তার মাঝে বহন করার ক্ষমতা আছে।বল কি হয়েছে?”

মিলি বলল,

“তুই একটু তন্ময়ের সাথে কথা বলতে পারবি সিয়াম?”

সিয়াম কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

“কি কথা বলব?”

“ও না কেমন যেন বদলে যাচ্ছে রে ধীরে ধীরে।আমায় আগের মতন আর ভালোবাসে না,গুরুত্ব দেয় না,কথা বলে না।সব সময় কেমন অমানুষের মতন আচরণ করে।”

“ওর আবার হঠাৎ কি হলো?”

“হঠাৎ করে না রে।গত কয়েক মাস ধরে এমন করছে।কিন্তু প্রথম দিকে না আমি ব্যাপারটাকে স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে।ভেবেছি নতুন প্রমোশন পেয়েছে হয়তো কাজের চাপ বেড়েছে তাই জন্য এমন করছে কিন্তু গত কয়েকদিন হলো আমি আর মানতে পারছি না।আমার কেন যেন মনে হচ্ছে,মনে হচ্ছে বলবো না আমি অনেকটা নিশ্চিত এই ব্যাপারে।”

মিলি থেমে গেল।পরের কথাটুকু বলতে তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।নিজের স্বামীর সম্বন্ধে এই কথাগুলো বলতে কি তার খারাপ লাগবে না?কি করে এই মুখে উচ্চারণ করবে যে তন্ময়ের জীবনে হয়তো এখন নতুন কারো আগমন ঘটেছে?

মিলিকে মাঝপথে থামতে দেখে সিয়ামের সন্দেহ আরো গাঢ় হলো।

“কি হলো থেমে গেলি কেন?বল কি মনে হচ্ছে?”

“আমার মনে হচ্ছে ওর অন্য কারো সাথে সম্পর্ক চলছে।”

সিয়াম বেশ বড় একটা ধাক্কা খেলো।নিজের কানকে যেন তার বিশ্বাস আছে না।এটা অসম্ভব।তন্ময় কি করে মিলিকে ছাড়া অন্য কারো সাথে সম্পর্কে জড়াতে পারে?সিয়াম নিজে দেখেছে তন্ময়ের পাগলামি মিলির জন্য।

অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“না না মিলি এটা হতে পারে না,তুই ভুল ভাবছিস।”

“তোর কথাই যেন সত্যি হয় সিয়াম।আমি চাই আমি ভুল প্রমাণিত হই কিন্তু আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আমি এবার ভুল প্রমাণিত হবো না।”

সিয়াম অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“কিন্তু এটা অসম্ভব।তুই তন্ময়ের পাগলামি ভুলে গেলি?তোর প্রতি ওর ভালোবাসা ভুলে গেলি?এত ভালোবাসা ভুলে কেউ কি করে অন্য কারো সাথে আবার সম্পর্কে জড়াতে পারে?”

মিলি তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

“সব পারে সিয়াম।মানুষ পরিবর্তনশীল।ঠিক তেমন ভাবে হয়ত তাদের পছন্দও পরিবর্তনশীল।এক সময় পাগলামি ছিল,ভালোবাসাও ছিল,ব্যাকুলতাও ছিল।আর এখন আছে শুধু বিরক্তবোধ।আছে দুরত্ব বাড়ানোর অজুহাত।”

“আমার কেন যেন বিশ্বাস হচ্ছে না মিলি।”

“তুই আমায় বল তাহলে ওর আমার প্রতি এত বিরক্ত কেন?আমার কথা না হয় বাদই দিলাম ওর নিজের সন্তানের প্রতিও বিরক্ত এসে গেছে।ও আমাকে আমাদের সন্তানকে মে/রে ফেলার কথা বলছে।”

সিয়াম আরো এক দফা ধাক্কা খেল।এখানে সন্তান কোথা থেকে এলো ঠিক বুঝতে পারছে না।

“এর মাঝে তোদের সন্তানের কথা কোথা থেকে এলো?”

“আমি প্রেগন্যান্ট।”

সিয়াম উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,

“কংগ্রাচুলেশন।আরে এই খবরটা আগে না দিয়ে এসব কি আজেবাজে কথা বলছিস বলতো?আরে আমি মামা চাচু সব একসাথে হতে যাচ্ছি এটা কি কম খুশির খবর নাকি?”

মিলির মুখে হাসি ফুটে উঠলো।যাক ওর সন্তানের আশার খবরে কেউ তো খুশি হয়েছে।

“আসলে প্রথমেই নীলিমার মিসক্যারেজের কথা শুনে আর বলতে পারছিলাম না রে।”

“আরে ধুর পাগল নাকি।বাবা হওয়ার আগে না হয় মামা আর চাচা হলাম।”

“তুই এই সংবাদটা শুনে কত খুশি হলি আর তন্ময় একটুও খুশি হয়নি।”

সিয়াম আলতো হাসলো।সেই হাসির মাঝে একটা চাপা দীর্ষশ্বাস আর মনের মাঝে লুকিয়ে রাখা কষ্টগুলো বেড়িয়ে এলো।

বিজ্ঞাপন

“আসলে কি বলতো মিলি যে পেয়ে যায় সে হয়ত তার সঠিক মূল্য বোঝে না।আমায় আর নীলিমা কে দেখনা তোদের আগে আমাদের বিয়ে হয়েছে,ছয় বছর হচ্ছে।বিগত পাচঁ বছর ধরেই আমরা চাইছি আমাদের পরিবারে একজন আসুক কিন্তু কিছুই হচ্ছে না।আর তন্ময় হয়ত না চাইতেই পেয়ে গেছে।ও যদি আমার জায়গায় থাকতো তাহলে বাবা ডাক শোনার জন্য মরিয়া হয়ে উঠতো।বাদ দে সেসব কথা এখন বল সন্তানকে নিয়ে তন্ময়ের কি সমস্যা?”

“ও চায় না এখনই বাচ্চাটা এই পৃথিবীতে আসুক।ও আমাকে বলছে আমি যেন বাচ্চাটাকে নষ্ট করে ফেলি। অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে এখনই বাচ্চাটার জন্য প্রিপেয়ার্ড না।ও আগে বাড়ি গাড়ি সব করে নিতে চায়।এখন এইসব বাচ্চার ঝামেলায় যেতে চায় না।ও আমাকে আর আমার বাচ্চাকে বাড়িতে বসে রেখে খাওয়াতে পারবে না।”

সিয়ামের এবার ভীষন রাগ হলো।এগুলো কি কোন পুরুষ মানুষের কথা?আর বাচ্চার জন্য তৈরি না মানে কি?ওর কি টাকা পয়সার অভাব?মাসে ৫০ হাজারের উপরে বেতন পায়,মিলিও ভীষণ হিসেবি।নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোও সে কিনতে ভীষণ কৃপণতা করে।সেখানে কিনা তন্ময় এসব চিন্তা করছে?মৃদু রাগী গলায় বলল,

“ওর মনে হয় মাথা খারাপ হয়ে গেছে।তুই চিন্তা করিস না আমি ওর সাথে কথা বলে ওর মাথা থেকে ভূত ছাড়িয়ে দেবো।”

মিলি একটু শান্তি পেল।সন্তুষ্ট গলায় বলল,

“শান্তি পেলাম রে।এই জন্যই তোকে কল করেছিলাম না হলে মনে হচ্ছিল কি করে এসব ঠিক করব।ভেবেছিলাম আমার সংসারটা হয়তো ভেঙে যাবে।”

“ধুর অতই সোজা নাকি সংসার ভাঙ্গা?আমি তোকে বলছি তন্ময় যতই যা বলুক না কেন তোকে কখনো ছাড়বে না।ও তোকে পাগলের মতন ভালোবাসে।আচ্ছা এখন রাখছি কেমন।আমি ওর সাথে কথা বলে তোকে জানাবো।”

ফোনটা রেখে দিল সিয়াম।সিয়ামের কথাটা যে তন্ময় মিলি কে পাগলের মতো ভালোবাসে এটা শুনে আজ কেন যেন মিলির ভীষণ হাসি পাচ্ছে।অথচ একটা সময় এই কথাটা শুনলে হৃদয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে যেত।কি করে বোঝাবে যে সেই তন্ময় আর এখনকার তন্মার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ?এই তন্ময়ের মাঝে আর মিলির জন্য কোন পাগলামো দেখা যায় না,কেবল ঘৃণা আর বিরক্তই দেখা যায়।

মিলি আর এসব বিষয় নিয়ে বেশি চিন্তা করতে চায় না।সিয়াম যেহেতু বলেছে যে তন্ময়ের সাথে কথা বলবে তাহলে নিশ্চয়ই কিছু একটা হবে।তন্ময় সিয়ামের কথা বরাবরই ভীষণ মানে।এবারও নিশ্চয়ই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।

আজ কেন জানি মিলির কোন কাজও করতে মন চাইছে না।চোখ দুটো লেগে আসছে।সারারাত ঘুমোতে পারেনি।ভাবলো এখন একটু ঘুমিয়ে নেওয়া যাক।বালিশটা ঠিক করে ঘুমিয়ে পড়ল।

_____

রেস্টুরেন্টে মিলির মুখোমুখি এক ভদ্রলোক বসে আছে।একবারে ফরমাল লুকে,দেখতে বেশ সুদর্শন।ভদ্রলোকের দৃষ্টিতে মিলির প্রতি একরাশ মুগ্ধতা মিলি বেশ ভালোই অনুভব করলো।তার যে এই বিয়েতে কোন আপত্তি নেই সেটাও মিলি ভালো করে জানে।তবে মিলির আপত্তি আছে সেই কথাই আজকে তাকে জানাতে এসেছে।

“আপনি কি কিছু বলতে চান?”

হঠাৎ প্রশ্ন করায় মিলি চমকে উঠলো। ঠিক প্রশ্নটা শুনতে পায়নি তাই বলল,

“কিছু কি বললেন আপনি?”

“আপনি আমায় কিছু বলতে চান কিনা সেটাই জিজ্ঞেস করলাম।দেখুন বিয়ের পর সারাটা জীবন আমাদেরকে একসাথে কাটাতে হবে।আমি চাইনা তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে।আমার আপনাকে পছন্দ হয়েছে কিন্তু আপনার হয়ত আমাকে কোন কারণে পছন্দ হয়নি,কিংবা এই বিয়েটা অন্য কোন কারণে আপনি করতে চান না যদি এমন কিছু থেকে থাকে বলতে পারেন।”

“বিয়েটা না করতে চাইলে কি করবেন আপনি?”

“আগে মুখ ফুটে বলুন কিছু।আপনার কথাটা শোনার পর যা ঠিক বলে মনে হবে তাই করবো।”

মিলি এবারে একটু ঠিকঠাক হয়ে বসলো।গুরুতর ভঙ্গিতে বলল,

“দেখুন আপনাকে আজ এখানে ডাকার কারণ এটাই।আপনি ভাববেন না আমি আপনাকে অপমান করছি।আসলে আমার পক্ষে বিয়েটা করা সম্ভব না।”

ভদ্রলোক হকচকালো।তাই বলে যাকে হবু স্ত্রী ভাবছে তার মুখ থেকে এমন কথা শুনতে প্রস্তুত ছিল না সে। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“কেন সম্ভব না?”

“আমি একজনকে ভালোবাসি।”

“আপনার পরিবারকে জানিয়েছেন সে বিষয়ে?”

“হ্যাঁ জানিয়েছি কিন্তু তারা আমার কথা শুনতে রাজি না।আসলে আমার ব্যাচমেটের সাথে আমার চার বছরের রিলেশন।ও এখনও চাকরি বাকরি কিছু করেনা,ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ডও আপনার মতন না সেই জন্য আপনার মতন একজন স্ট্যাবলিস্ট ছেলেকে রেখে আমার ফ্যামিলি ওর সাথে আমার বিয়ে দিতে রাজি না।আর আমি ওকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করতে রাজি না।”

“ব্যাপারটা তো তাহলে বলতে হচ্ছে বেশ জটিল।তাহলে আমার করণীয় কি এখানে?”

“খুব বেশি কিছু করতে বলবো না শুধু বলবেন বিয়েটাতে রাজি না।যদি না হওয়ার কোন কারণ খুঁজে না পান তবে বলে দেবেন আমায় পছন্দ হয়নি আপনার।”

“কিন্তু আমার তো আপনাকে পছন্দ তাহলে মিথ্যে কেন বলবো?”

“এতোটুকু সাহায্য করতে পারবেন না?ধরুন আপনার সাথে আমার বিয়ে হয়ে গেল আমরা ভালো থাকতে পারবো?”

“সেসব তো বিয়ের পরের কথা।আর তাছাড়া যাকে আপনি ভালোবাসেন সেই যে ভালো মানুষ এইসব বিষয়ে কি করে নিশ্চিত হচ্ছেন?হতেও তো পারে ভবিষ্যৎয়ে দেখে গেল আমার সাথে বিয়ে হলে আপনি বেশি সুখী হচ্ছেন আর যাকে ভালেবাসছেন সে ঠিক ছিল না।”

মিলি এবারে রেগে গেল।তন্ময়ের সম্বন্ধে কেউ খারাপ কিছু বলবে সেটা মিলির কোন কালেই পছন্দ না ল।তন্ময়ের ব্যাপারে সে বিন্দুমাত্র কারো সাথে আপোষ করতে রাজি না।যেখানে বাড়িতে নিজের বাবা-মার সাথে ঝগড়া চলছে সেখানে বাইরের একটা মানুষকে কিছুতেই তন্ময়ের ব্যাপারে সে কিছু বলতে দেবে না।মৃদু রাগান্বিত গলায় বলল,

“দেখুন আপনি তন্ময় কে চেনেন না তাই ওর সম্বন্ধে অযথা আজেবাজে কথা বলবেন না।ও আমার সুখের জন্য নিজের সুখও বিসর্জন দিতে পারে যেটা আপনি কখনোই পারবেন না।আপনি কেন কেউ পারবেনা।অন্যের সুখের জন্য নিজের সুখ বিসর্জন দিতে সবাই পারেনা।ও আমার জন্য সব করতে পারে।তন্ময়ের ভালোবাসার উপর প্রশ্ন তুলবেন না।”

“কি আশ্চর্য আমি ভালোবাসার উপর কখন প্রশ্ন তুললাম।দেখুন,আমার মতে ভালোবাসা দু রকমের হয়।এক,সেই ভালোবাসা যা জীবনে একবারই হয় এবং সেই যা একজনের ওপরেই স্থির থাকে।আর দুই,জীবনে বহু বার ভালোবাসা হয় এবং সেই ভালোবাসা কখনো একজনের উপরে স্থির থাকে না।ক্ষণে ক্ষণে বদলাতে থাকে।এখন আপনার ভাগে যে কোন ভালোবাসাটা পরেছে সেটা তো জানিনা তাই এই কথাটা বললাম।”

“আপনি ইঙ্গিত করতে চাইছেন যে তন্ময়ের ভালোবাসা দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষের মাঝে পড়ে তাই তো?আমি যদি বলি আপনিও তো সেই একই কাজ করতে পারেন?”

ছেলেটা আলতো হেসে বলল,

“নিজেকে নিয়ে আমি গ্যারান্টি দিতে পারি।”

মিলি দৃঢ় গলায় বলল,

“আর আমি তন্ময়কে নিয়ে।”

“বুঝেছি আপনাকে এই বিষয়ে বুঝিয়ে লাভ নেই। যাইহোক চিন্তা করবেন না…….”

ভদ্রলোক নিজের কথাটা সম্পূর্ণ করার আগে কোথায় থেকে যেন তন্ময় হন্তদন্ত হয়ে ওদের টেবিলের দিকে ছুটে এলো।তন্ময়ের চোখে মুখে একটা চাপা উত্তেজনা বিরাজমান।দুশ্চিন্তাও দেখা যাচ্ছে।কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে।সোজা এসে মিলির পায়ের কাছে বসে ওর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে অনুনয়ের কন্ঠে বলল,

“প্লিজ মিলি এই বিয়েটা তুমি করোনা,তোমায় ছাড়া আমি বাঁচবো না।আমায় একটু সময় দাও।আমি তোমায় কথা দিচ্ছি আমি ভালো একটা চাকরি খুঁজে নেব।ওই ছেলের থেকেও আমি বেশি ভালো রাখবো তোমায়।আমি তোমার মা-বাবাকেও রাজি করিয়ে নেবো তাও প্লিজ তুমি এই বিয়ে করো না।”

হঠাৎ করে তন্ময়কে এখানে দেখে মিলি অবাক হয়েছে।সেই সাথে রেস্টুরেন্টে এত মানুষের সামনে তন্ময়ের এমন ছেলেমানুষীতে একটু লজ্জাও পেল।সম্মুখে তাকিয়ে দেখলো ভদ্রলোক বিষ্ময় ভরা দৃষ্টি তে ওদের দুজনকে দেখছে।

“এই তন্ময় কি করছো ওঠো।আর কাঁদছো কেন?কে বলেছে তোমায় আমি বিয়েটা করব?”

“তাহলে দেখা করতে এসেছ কেন?তুমি তো আমায় কথা দিয়েছিলে বলো যে সারা জীবন আমার পাশে থাকবে তাহলে কেন সেই কথাটা ভুলে যাচ্ছ?”

মিলি উত্তর দেওয়ার আগেই অপর পাশে চেয়ারে বসা ভদ্রলোক তন্ময় কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এক্সকিউজ মি মিস্টার তন্ময়,উনি নিজের কথাটা ভুলে যাননি।নিজের কথাটা রাখার উদ্দেশ্যেই এখানে এসেছেন।”

এতক্ষণে তন্ময়ের খেয়াল হলো যে বিপরীত পাশে সেই মানুষটা বসে আছে যার জন্য আজ তন্ময় আর মিলির মাঝে ভাঙ্গন ধরতে বসেছে।তবে ওনার সাথে এখন খারাপ আচরণ করলে চলবে না,তাকে বোঝাতে হবে। ওদের ভালোবাসা বোঝাতে হবে,তন্ময়ের দুর্বলতা বোঝাতে হবে,মিলিকে ছাড়া ও কতটা অসহায় সেসব বোঝাতে হবে তো।

“দেখুন ভাই আপনি অনেক বড় জায়গায় আছেন এখন।মিলিকে তো আপনি ভালোবাসেন না বলুন। আরো অনেক সম্বন্ধে তো আপনি পেয়ে যাবেন।তাহলে প্লিজ আমার ভালোবাসাকে আমার থেকে কেড়ে নেবেন না।”

ভদ্রলোক আলতো হেসে বলল,

“সেই বিষয়েই কথা হচ্ছিলো আমার আর আপনার মিলির মাঝে।চিন্তা করবেন না আপনাদের মাঝে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে আমি আসবো না।বিয়েটা ভেঙে যাবে।”

তন্ময়ের যেন ঠিক বিশ্বাস হলো না।সন্দেহী গলায় বলল,

“সত্যি বলছেন তো?আমাকে এসব আশ্বাস দিয়ে পরে আপনি আবার মিলিকে বিয়ে করে নেবেন না তো?”

ভদ্রলোক শব্দ করে হেসে উঠে বললেন,

“আপনাদের দুজনের এই ভালোবাসা দেখার পর আমার আর মিলিকে বিয়ে করে সাহসই নেই।আমি একটু শান্তিপূর্ণ সংসার চাই।আর সেই সংসারটা মিলিকে নিয়ে কখনোই সম্ভব না।ওর পুরো মনটাই আপনার কাছে।যাই হোক আপনাকে নিয়ে মনের মাঝে একটু সন্দেহ ছিল কিন্তু এই পাগলামো গুলো দেখে আর সন্দেহ রইল না।আর মিলি বলতেই হচ্ছে আপনার পছন্দ সত্যি প্রশংসার যোগ্য।আসছি।”

হঠাৎ করে ঘুম থেকে লাফ দিয়ে উঠে বসলেো মিলি।বুকটা ধড়ফড় করছে।ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা।স্বপ্নটা ছিল তার জীবনের কয়েক বছর আগের একটা সামান্য অধ্যায় মাত্র।যা আজ দুঃস্বপ্ন হয়ে হানা দিলো।যদিও এই ঘটনাটুকু মিলির কাছে দুঃস্বপ্ন ছিল না তবে এখন এই সবটাই মিলির কাছে একটা দুঃস্বপ্নের মতনই লাগছে।সেই পুরনো তন্ময় আর এখনকার তন্ময় কে মেলাতে পারছে না।বেড সাইডের উপরে থাকা গ্লাসটা হাতে নিয়ে ঢকঢক করে পুরো গ্লাসের পানিটা শেষ করে দিল।বিছানা থেকে উঠে ওয়াসরুমে গিয়ে মুখে একটু পানির ছিটা দিল।শরীরটা ভীষণ খারাপ লাগছে।বিছানায় এসে আবারো হেলান দিয়ে বসলো।স্বপ্নগুলো আবার মস্তিষ্কে উঁকি দিচ্ছে।মিলি এগুলো মনে করতে চাইছে না।সেই পুরনো কথাগুলো মনে পড়লে যে বর্তমানের তন্ময়ের সাথে মেলাতে তার ভীষণ কষ্ট হয়।দুঃখগুলো, যন্ত্রণা গুলো যে আরো বাড়ে।

বিজ্ঞাপন
রিক্ত বসন্ত গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস