অনেকদিন হলো আলমারি গোছানো হয় না। কাপড়চোপড় সব একদম এলোমেলো হয়ে আছে।তাই মিলি ঠিক করলো আজ আলমারি গোছাবে।রান্নাবান্না শেষ করে আলমারি গোছাতে এলো।এক এক করে আলমারি থেকে সব কাপড় নামালো।কাপড়গুলো নামাতে নিয়ে হঠাৎ মিলির হাত পড়ল একটা বাসন্তী রঙের সুতি শাড়ির উপর।অনেকদিন পরে শাড়িটার উপর চোখ পড়ল মিলির।আজকাল আর তেমন একটা শাড়ি পড়া হয় না।পড়বেই বা কেন?যার জন্য এত কষ্ট করে শাড়ি পড়ে সেই তো আর চোখ তুলে তাকায় না।মিলি শাড়িটার উপর আলতো করে হাত বোলালো।নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।বেশ কিছুটা সময় শাড়িটাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে রেখে পুরোনো কিছু স্মৃতি মনে করল।
অতীত………
কলেজ ক্যাম্পাসে একটা বিরাট বট গাছের নিচে বসে আছে মিলি,সিয়াম আর নীলিমা।প্রচন্ড গরম পড়েছে।মাথার উপরে বট গাছটা ছায়া দিলেও তাও ঘাম কমাতে পারছে না।মিলির জন্য নীলিমা যেতে পারছে না আর নীলিমার জন্য সিয়াম যেতে পারছেনা।আর মিলি অপেক্ষা করছে তন্ময়ের জন্য।অবশেষে সিয়াম আর সহ্য করতে না পেরে অসহায় গলায় মিলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আর কতক্ষণ বসিয়ে রাখবি এভাবে মিলি?আমরা চলে যাই?”
মিলিও পাল্টা অসহায় গলায় বলল,
“প্লিজ যাস না।তোরা সাথে থাকলে তাও যদি বাসা থেকে কল আসে একটা অজুহাত দেখাতে পারবো।তোরা না থাকলে তো ধরা পড়ে যাব।”
সিয়াম এবার বিরক্তিকর গলায় বলল,
“তোর মতন বড় লোকের মেয়েরা যে কেন বেছে বেছে বেকার ছেলেদের সাথে প্রেম করে এটা আমি বুঝিনা।আবার প্রেম যখন তোরা করবি এত ভয় পাওয়ার কি আছে?”
পাশে বাসা নীলিমা রাগান্বিত কন্ঠে সিয়াম কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তো কি বলো আমি বেছে বেছে একটা বড় লোকের সাথে প্রেম করবো নাকি?”
সিয়ামের মুখটা কালো হয়ে গেল।অসহায় গলায় বলল,
“তোমাকে বলিনি তো।”
“কেন আমি বড়লোকের মেয়ে আর তুমি কি বেকার না? প্রেম তো আমরাও করছি তাহলে আমার বেলা উল্টো নিয়ম হবে কেন?”
“ভুল হয়ে গেছে আমরা।আর বলবো না।প্রত্যেকটা বড় লোকের মেয়ের উচিত একটা করে বেকার ছেলের সাথে প্রেম করা,হয়েছে এবার?”
ওদের কথাবার্তার মাঝেই তন্ময় এসে ধপ করে ওদের সামনে বসে পড়লো।গরমে মুখ চোখ কালো হয়ে উঠেছে।কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে।শার্টটা ভিজে উঠেছে।মিলির দেখে ভীষণ মায়া হলো।ওড়নাটা তন্ময়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“ঘামটুকু মুছে নাও।”
তন্ময় নাক শিটকে বলল,
“আরে না।অনেক ঘেমে গেছি নষ্ট হয়ে যাবে তোমার ওড়না।রুমাল থাকলে রুমাল দাও।”
তন্ময়ের কথা অনুযায়ী ব্যাগ থেকে রুমালটা বের করে এগিয়ে দিল মিলি।সেই সাথে পানির বোতলটাও এগিয়ে দিল।তন্ময় মুখটা মুছে ঢক ঢক করে পানিটা খেয়ে নিল।একটা তৃপ্তির শ্বাস ছেড়ে বলল,
“গলাটা একদম শুকিয়ে গিয়েছিল।।”
সিয়াম তাড়া দিয়ে বলে উঠলো,
“হ্যাঁ ভাই এবার যা করার তাড়াতাড়ি কর।তোর গলা ভেজাতে গিয়ে আমাদের গলা শুকিয়ে এলো।”
মিলি বলল,
“যা বলার পরে বলবে।দাঁড়াও আগে তোমাদের জন্য একটা জিনিস এনেছি সেটা দেই।”
মিলি ব্যাগ থেকে দুটো বক্স বের করল।একটা তন্ময়ের দিকে এগিয়ে দিলো আর অন্যটা সিয়াম আর নীলিমাকে দিল।
বক্সটা হাতে নিয়ে তন্ময় প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কি আছে এতে?”
“পরোটা আর মাংস এনেছি।মাংস বেশি করে এনেছি তুমি হোস্টেলে নিয়ে গিয়ে রাতে খেয়ে নিও গরম করে কেমন।”
নীলিমা আর সিয়াম খুনসুটি করতে করতে খাবারটুকু খেয়ে নিল।তন্ময়ও কোনোরকম সময় ব্যয় না করে বক্সটা খুলে যতটা তাড়াহুড়ো সম্ভব ঠিক ততটাই তাড়াহুড়ো করে খেল।মনে হচ্ছে খাবারটুকু বোধহয় পালিয়ে যাবে।সকালে হোস্টেল থেকে কিছু না খেয়ে বেরিয়েছিল।মিলি মুগ্ধ নয়নে তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে থাকলো।খেতে খেতে হঠাৎই তন্ময়ের হাতটা থেমে গেল।মিলির দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“তুমি খেয়েছ?”
“হ্যাঁ সকালে খেয়ে এসেছি।”
“সে সকালে খেয়ে এসেছো এখন তো নিশ্চয়ই ক্ষুধা লেগেছে।এসো আমরা দুজন একসাথে খাই।”
মিলি আপত্তি জানিয়ে বলল,
“না আমি খাব না তুমি খাও।”
তন্ময় মিলির সেই আপত্তি শুনল না।নিজের হাতে খাইয়ে দিল।
খাওয়া-দাওয়া শেষে একটা শপিং ব্যাগ মিলির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“আজকে টিউশনি থেকে প্রথম টাকা পেয়ে তোমার জন্য এই শাড়িটা কিনেছি।দামি শাড়ি না কিন্তু সুতি শাড়ি।দাম নিয়েছে ৫০০ টাকা।এখন এই কম দামি শাড়িটা পড়ে নাও।যখন আমি অনেক টাকা ইনকাম করব তখন তোমায় দামি দামি শাড়ি কিনে দেবো।”
মিলি জানতো না যে তন্ময় এই উপহারটা দেওয়ার জন্য ওকে অপেক্ষা করতে বলেছিল।প্যাকেটটা হাতে নিয়ে শাড়িটা বের করল।বাসন্তী রঙের একটা সুতি শাড়ি।
মিলির কাছে মনে হলো এটা ওর এখন অব্দি পাওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার।এতদিন যাবত সবার থেকে অনেক দামী দামী উপহার পেয়েছে,নিজের জন্মদিনে তো বাবার কাছ থেকে একবার একটা গাড়িও উপহার পেয়েছিল তবে সেই দামি উপহারগুলোর থেকে এই ৫০০ টাকার সুতি শাড়িটাই মিলির কাছে সব থেকে বেশি দামি লাগলো।মনে হলো এত দামি উপহার আজ অব্দি কেউ মিলিকে দেয়নি আর না কখনো কেউ দিতে পারবে।
পাশে বসা নীলিমা আর সিয়াম কপাল কুঁচকে তন্ময় কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আর আমাদেরকে যে এতক্ষণ বসিয়ে রাখলি তার বিনিময়ে আমরা কি পাব?”
তন্ময় মাথা চুলকে বলল,
"আসলে তোদের দুজনকে যে আলাদা আলাদা করে উপহার দেবো এত টাকা হাতে নেই।বিকালে দেখা করিস এক প্লেট ফুচকা খাইয়ে দেবো কেমন?”
দুজনেই আলতা হেসে বললে,
“তাতেই হবে।বন্ধুর ইনকাম করা প্রথম টাকায় এক প্লেট যে ফুচকা খাওয়াতে চেয়েছে এটাই বিশাল।”
মিলির ধ্যান ভাঙলো ফোনের রিংটোন এর আওয়াজ পেয়ে।ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে ফোনটা হাতে নিতেই দেখল তন্ময়ের নাম্বার থেকে ফোন এসেছে।মিলি বেশ অবাক হলো।তন্ময়ের নাম্বার থেকে কল আসেনা এখন আর।আজকাল তো তন্ময়ের মিলি কে কল করার সময়ই হয় না।মিলি যদি একবারের জায়গায় দুবার কল করে তো রেগে যায়।মিলি ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরতেই অপর পাশ থেকে তন্ময় তাড়াহুড়ো কন্ঠে বলে উঠলো,
“আলমারির ভিতরে ডান পাশের ড্রয়ারে একটা ফাইল রাখা আছে দেখো।একটু ওটা নিয়ে তাড়াতাড়ি নিচে এসো।আমি অপেক্ষা করছি।”
কথাটুকু বলে ফোনটা আবার কেটে দিল।
এসব রুক্ষতা মিলির আজকাল সয়ে গেছে তাই সে আর বিশেষ কিছু মনে করল না।চুপচাপ ফাইলটা বের করে নিচে নামলো।দেখলো বাইকের সাথে হেলান দিয়ে তন্ময় দাঁড়িয়ে আছে।ওর পাশেই একটা কম বয়সি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।মেয়েটার পরনে লেডিস শার্ট আর ব্ল্যাক জিন্স।হালকা বাদামি চুলগুলো পনিটেল করা।দেখতে বেশ সুন্দর মেয়েটা।মিলি এগিয়ে গিয়ে তন্মায়ের হাতে ফাইলটা দিতেই পাশে দাঁড়ানো মেয়েটা মিলিকে দেখিয়ে তন্ময়কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এটা কি তোমার ওয়াইফ তন্ময়?”
মিলির পড়নে তখন বাড়িতে পড়ে থাকে একটা সাধারণ থ্রী পিছ।সকালে ঘুম থেকে উঠে সেই যে একটু মুখ ধুয়েছিল তারপর থেকে আর নিজের কোন যত্ন নেওয়ার সময় পায়নি।চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে।কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোঁটাও দেখা যাচ্ছে। তন্ময়ের বোধ হয় মেয়েটার কাছে মিলিকে নিজের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিতে একটু দ্বিধা হচ্ছিল তবে কিছু করার নেই পরিচয় দিতেই হবে।জোরপূর্বক মুখে হালকা হাসি ফুটিয়ে তুলে বললো,
“হ্যাঁ।”
তন্ময়ের থেকে নিশ্চিত হতেই মেয়েটা আরো একবার ভালোভাবে মিলিকে পর্যবেক্ষণ করলো।পর্যবেক্ষণ শেষে ব্যঙ্গাত্মক গলাতেই বলল,
“সাজ পোশাক দেখে আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল যে এটাই তোমার ওয়াইফ।”
মেয়েটা যে খুব ভদ্রভাবে মিলিকে অপমান করলো সেটা মিলির বুঝতে বাকি রইল না।তবে আশা করেছিল তন্ময় হয়তো কিছু বলবে।তবে না তন্ময় কিছু বলল না।মিলি যে ফাইল ওকে এনে দিল তার বিনিময়ে একটা ধন্যবাদও জানানোর প্রয়োজন মনে করলো না,একটা শব্দ পর্যন্ত ব্যয় করলো না মিলি কে উদ্দেশ্যে করে।ফাইলটা মেয়েটার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বাইকে উঠে বসলো।তন্ময় বসতেই মেয়েটাও বাইকে উঠে এক হাতে পিছন থেকে তন্ময়ের কোমর জড়িয়ে ধরল।
মিলির বুকের ভেতরটা কেমন যেন একটা মোচড় দিয়ে উঠলো।নিজের স্বামীর কাছাকাছি অন্য কোন নারীকে কোন স্ত্রীই মেনে নিতে পারবে না।তবে তন্ময়ের মাঝে কোন ভাবান্তরে দেখা গেল না,বেশ স্বাভাবিক।অন্য নারীর স্পর্শে বিন্দুমাত্র তার মাঝে কোন হেলদোল দেখা গেল না।অবশ্য মিলি তো আর জানে না য তন্ময়ের কাছে এই স্পর্শ নতুন না।তবুও মিলির সামনে যে মেয়েটা ওকে এভাবে ধরে বসেছে তাতেও তার মধ্যে কোন ইতস্তত বোধ দেখা গেল না।মুহূর্তের মাঝেই বাইকটা মিলির সামনে থেকে চলে গেল।মিলি ঠাঁয় সেখানে দাঁড়িয়ে রইল।একটু আগে উপরে বসে কি সুন্দর স্বপ্ন দেখছিল মিলি।সেই চার বছর আগেকার তার সুন্দর দিনগুলোর স্বপ্ন।যখন তন্ময় ছিল তার প্রেমিক,পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রেমিক।আর চার বছর পর নিজের সেই প্রেমিকের স্বামী রূপটা দেখে মিলির স্বপ্নগুলো ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল।
উপরে এসে মিলি নিজের ফ্ল্যাটে আর গেল না। জ্যোতির ফ্ল্যাটের কলিং বেল বাজালো।কিছুক্ষণের মাঝে জ্যোতি এসে দরজা খুলে দিল।মিলিকে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বেশ অবাক হলো।মিলি কখনো তার ফ্ল্যাটে আসেনি।নিজের সংসারের কাজ করেই তো মেয়েটা ফুরসৎ পায়না সেখানে আড্ডা দিতে আসবে কি করে।বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
“তুমি এখানে মিলি?কোন সমস্যা হয়েছে নাকি?”
মিলি আলতো হেসে বলল,
“না কোন সমস্যা হয়নি।তোমার সাথে কথা বলতে এলাম।”
জ্যোতির মুখে হাসি ফুটে উঠল।মেয়েটা বড্ড মিশুক। মিলির সাথে আড্ডা দিতে যে ওর ভীষণ ভালো লাগে সেটা মিলিও বুঝতে পারে।জ্যোতি চায় যেন মিলির সাথে ওর সম্পর্কটা আরো ভালো হয়।জ্যোতি মিলির হাত ধরে ভিতরে নিয়ে গেল।সোফার উপর বসিয়ে রান্না ঘরে গেলে দু কাপ চা বানাতে।যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব ঠিক ততটা তাড়াতাড়ি গিয়ে চা বানিয়ে নিয়ে এসে সোফায় মিলির পাশে বসে বলল,
“নাও এবার বলো দেখি কি বলতে এসেছো?”
জ্যোতি কে প্রশ্নটা করতে মিলির একটু অস্বস্তি হচ্ছে।একবার ভাবছো যতই জ্যোতির সাথে ভালো সম্পর্ক হোক না কেন নিজের সাংসারিক বিষয়গুলো কি এতটা খুটিয়ে বলা ওকে ঠিক হবে?আপন মানুষরাই তো কষ্ট বেশি দেয়।পরে যদি কোন এক সময় জ্যোতি এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ওকে কষ্ট দেয়?
মিলি কে চুপ করে থাকতে দেখে জ্যোতি ওর কাঁধে হালকা করে ধাক্কা দিয়ে বলল,
“কি হলো গো বলো?আরে আমরা দুজনে তো ভালো বান্ধবী।বান্ধবীকে কোন কথা বলতে এত কিসের সংকোচ?”
“আচ্ছা আমি কি দেখতে খুব খারাপ?”
মিলির হঠাৎ এমন প্রশ্নে জ্যোতি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেল।থতমত কন্ঠে বলল,
“খারাপ হতে যাবে কেন?তুমি তো দেখতে ভীষণ মিষ্টি।”
“সত্যি করে বলো না জ্যোতি?এই প্রশ্নের একটা সত্যি ঠিকঠাক উত্তর জানা আমার জন্য ভীষণ দরকার।”
জ্যোতি হয়তো মিলির প্রশ্নের গুরুত্বটা ঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারলো।একবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভালোভাবে মিলিকে দেখে নিয়ে বলল,
“দেখো মিলি তুমি ভীষণ মিষ্টি একটা মেয়ে।তবে যত্ন করো না নিজের।সত্যি করে একটা কথা বলোতো তুমি দিনে কতবার মাথা আঁচড়াও,কতবার মুখ ধোঁয়া হয়?”
“চুল আঁচড়ানোর তেমন সময় পাইনা সারাদিন।ওই রাতে ঘুমোনোর আগে কোন মত একটা বিনুনি করে শুয়ে পড়ি।মুখ ধোয়ার কথা যদি বলো তাহলে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর একবার আর গোসল করার সময় এই আর কি।”
“এমন করলে কি করে চলবে হ্যাঁ?”
“জানো একটু আগে নিচে তন্ময় এসেছিল একটা ফাইল নেওয়ার জন্য।ওর সাথে একটা মেয়েও এসেছিল। ভীষণ সুন্দর,স্মার্ট দেখতে।অনেক অল্প বয়সি।”
“তো তোমার কি নিজেকে বুড়ি মনে হয় নাকি?”
“না সেটা বলছি না।তবে ওর মতন সুন্দর না।”
জ্যোতি মিলি কে আশ্বস্ত করে বলল,
“তুমি দেখতে ভীষণ মিষ্টি মিলি তবে যত্নের অভাবে তোমার সৌন্দর্য মলিন হয়ে গেছে।তোমার ফর্সা গায়ের চামড়াটা ধীরে ধীরে কালো হয়ে যাচ্ছে,চামড়া কুঁচকে যাচ্ছে,তোমার লম্বা ঘন চুলগুলো ধীরে ধীরে ঝরে পড়ছে তোমার অযত্নের কারণে।তুমি ঠিকঠাক খাওয়া দাওয়া করো না,ঘুমোও না,নিজের যত্ন নাও না জন্য তোমার সৌন্দর্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে মিলি।আর তুমি নিচে যাকে দেখে এসেছো না ওসব হচ্ছে এখনকার যুগের মর্ডান মেয়ে।ওদের দুবেলা খাবার না হলেও চলবে কিন্তু নিজেদের চেহারার যত্ন না নিলে চলবে না।কেননা বড়লোক ছেলেদেরকে তো হাত করতে হবে তাই না?"
জ্যোতির শেষের কথাটা শুনে মিলি চমকে বলল,
“শেষের কথাটা বললে কেন?”
জ্যোতি চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে বলল,
“তোমার কথা শুনেই আমি বুঝতে পেরেছি যে তুমি ওই মেয়েটার কথা উল্লেখ করলে কারণ তুমি তন্ময়ের সাথে ওকে সন্দেহ করছে তাই তো?”
মিলি আর লুকাতে পারল না।হঠাৎ করে ডুকরে কেঁদে উঠলো।জ্যোতি আরেক দফা ভ্যাবাচ্যাকা খেল।তাড়াহুড়ো করে মিলিকে আগলে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“কাঁদছো কেন?”
“আমার খুব কষ্ট হচ্ছে জ্যোতি।আমি তন্ময় কে ভীষণ ভালোবাসি।ওই মেয়েটার সাথে তন্ময়ের এত ঘনিষ্ঠতা আমি সহ্য করতে পারছি না।ওই মেয়েটা দেখতে অনেক সুন্দর,স্মার্ট,চাকরি করে।আর একবার আমার দিকে তাকিয়ে দেখো আমি কোনো দিক দিয়েই ওই মেয়ের সাথে পেরে উঠবো না।তবে কি তন্ময়ের আমার উপর থেকে ভালোবাসা উঠে যাওয়ার জন্য আমি নিজেই দায়ী?”
জ্যোতি কপট রাগ দেখিয়ে বলল,
“একদম ওই ছেলের চরিত্রহীনতার দোষ নিজের উপরে নেবে না।তুমি এখানে সংসার করতে এসেছো ওর সাথে,সিনেমার অডিশন দিতে আসোনি যে সারাদিন রাত তোমার সেজে থাকতে হবে।ওই মেয়ে কি তিন বেলা তন্ময়ের জন্য খাবার রান্না করে,ওর জন্য ঘরদোর গুছিয়ে রাখে,ওর কাপড়চোপড় ধুঁয়ে দেয়?দেয় না তো। সবকিছু তুমি করো।সারাদিন বাড়ির কাজের লোকের মতন খেটে মরো।এর মাঝে ও আশা করে কি করে যে তুমি ওর জন্য ক্লান্ত শরীর নিয়ে সেজেগুজে বসে থাকবে?ও যদি তোমায় সত্যি ভালোবাসতো না তোমার সারাদিনের খাটাখাটনি দেখার পর রাতে বুকে নিয়ে ঘুমোতো।ওর আসলে চরিত্ররই সমস্যা আছে।”
“জানো জ্যোতি যখন আমরা প্রেম করতাম তখন ওর চোখে আমি খুব সুন্দর ছিলাম।আমি প্রতিদিন ওর জন্য পরিপাটি হয়ে সুন্দর করে সেজেগুজে আসতাম।কিন্তু এখন আমি আর পারিনা।সারাদিন এত খাটাখাটনি করার পর রাতে ও আসার আগে আর নিজেকে পরিপাটি করে বসে থাকতে ইচ্ছে করে না।আমি তো অত সময়ই পাইনা।”
“আমিতো জানি মিলি।আমি তো নিজে দেখি তোমায় কাজ করতে।প্লিজ তুমি ওর কথা ভেবে কষ্ট পেয়ো না।”
“আমি তো পারছি না নিজেকে মানাতে।বাজারহাট থেকে শুরু করে গ্যাস আনা,কারেন্ট বিল দেয়া,তিন বেলা রান্না বান্না করা,ঘর গোছানো,কাপড় কাচা,বাসন মাজা সবকিছু আমি করি একা হাতে।ও এক গ্লাস পানি অবধি ঢেলে খায় না।সারাটা দিন আমি একবার আয়নায় নিজের মুখটা দেখার অব্দি সময় পাইনা সেখানে যত্ন কি করে করি বলোতো?”
“জানো মিলি এমনটা না যে তুমি যদি ওর সামনে পরিপাটি হয়ে থাকো তবে ও তোমায় ছেড়ে যেত না।আসলে নিজের থালা রেখে অন্যের থালায় হাত দেওয়া তন্ময়ের স্বভাব।ওর নতুন চাই।তুমি পুরনো হয়ে গেছো।নতুন থাকতে কিন্তু তুমি ওর ভীষণ প্রিয় ছিলে।চিন্তা করো না,যে এখন ওর কাছে ভীষণ প্রিয় একদিন সেও ওর কাছে পুরনো হয়ে যাবে।”
মিলি মাথা তুলে জ্যোতির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“তবে কি এই সংসারে সত্যি আমার দিন ফুরিয়ে এলো জ্যোতি?তন্ময়কে আমি সত্যি হারিয়ে ফেললাম?”
জ্যোতি কোন উত্তর দিতে পারলো না।ভীষণ মায়া হলো মেয়েটার প্রতি।দিন ফুরিয়ে এসেছে কিনা সেটা তো এখনও দুজনেরই অজানা।
_______
প্রেগন্যান্সির রিপোর্টটা হাতে নিয়ে বসে আছে মিলি।পজেটিভ এসেছে।মিলির তো আজ খুব খুশি হওয়ার কথা কিন্তু খুশি হতে পারলো না।ওর আর তন্ময়ের ভালোবাসার একটা অংশ আসতে চলেছে,একটা ছোট্ট প্রাণ মিলির ভেতরে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে।কিছুদিন পর এই ঘর থেকে একটা বাচ্চার কান্নার আওয়াজ পাওয়া যাবে।সে বড় হবে ধীরে ধীরে,সারা বাড়ি হেঁটে বেড়াবে তার ছোট্ট ছোট্ট পায়ে।তন্ময় হাঁটতে শেখাবে।মিলি বকা দিলে তন্ময়ের কাছে গিয়ে নালিশ করবে।কত স্বপ্ন মিলির দু চোখ জুড়ে কিন্তু আনন্দ নেই।মনের ভেতরটা কেমন যেন অস্থির হয়ে আছে।তন্ময় কি আদৌও খুশি হবে এই সংবাদটা শুনে নাকি রেগে যাবে?আচ্ছা নিজের সন্তানের কথা শুনে কি তন্ময় আবার আগের মতন হয়ে যাবে?নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চাইবে,আবারো মিলির কাছে ফিরে আসতে চাইবে,মিলির যত্ন নেবে,ভালোবাসবে ওকে?আদৌও কি এসব সম্ভব।
জ্যোতি এক গ্লাস দুধ এনে মিলির সামনে রেখে কড়া গলায় বলল,
“চুপচাপ দুধটা খেয়ে নাও।না খেলে কিন্তু ভীষণ রেগে যাবো আমি।”
জ্যোতির বলা কথা গুলো বোধহয় মিলির কান অব্দি পৌঁছালো না।সে তো এখন অন্য ভাবনায় আছে।জ্যোতি হালকা ঝাকাতেই মিলি সম্বিত ফিরে পেল।
“কি ভাবছো মিলি?”
মিলি চিন্তিত গলায় বলল,
“তন্ময় কি খুশি হবে এই সংবাদটা শুনে জ্যোতি?”
উত্তরটা তো জ্যোতির নিজেরও জানা নেই।সে নিজেও এই নিয়ে চিন্তায় আছে যে তন্ময় কি বলবে।তবে মিলি কে এখন এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে দিলে চলবে না।আশ্বস্ত করে বলল,
“চিন্তা করো না নিশ্চয়ই খুশি হবে।একজন পুরুষ খারাপ ছেলে হতে পারে,খারাপ স্বামী হতে পারে,খারাপ ভাই,বন্ধু সব হতে পারে।কিন্তু একজন পুরুষ কখনো খারাপ বাবা হতে পারে না।নিজের সন্তান সবার কাছেই খুব প্রিয় হয়।”
“তাহলে বলছো ও খুশি হবে?”
“নিশ্চয়ই হবে।এত চিন্তা করোনা,বাচ্চার ওপর এর খারাপ প্রভাব পড়বে।”
মিলি চাইছে না চিন্তা করতে কিন্তু চিন্তা এসে যাচ্ছে।তন্ময়ের অভিব্যক্তি কি হতে পারে সেসব ভাবতেই যে ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে মিলি।