সন্ধ্যার মধ্যে মিলি আজ নিজের সব কাজকর্ম শেষ করে সোজা গেল গোসলে।গোসল থেকে বেরিয়ে তাড়াহুড়ো করে চুল শুকিয়ে তন্ময়ের দেওয়া সেই বাসন্তী রঙের সুতি শাড়িটা গায়ে জড়ালো।চুলগুলো হালকা করে হাত খোঁপা করে তাতে একটা কাটা দিয়ে আটকালো।চোখ ভর্তি গাঢ় করে কাজল পড়লো, কপালে একটা ছোট্ট টিপ পরলো,হালকা গোলাপি রঙের লিপস্টিকও লাগালো।অনেকগুলো দিন পর মিলি আয়নায় বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নিজেকে দেখল।নিজের কাছে আজ নিজেকে অন্য রকম লাগছে।মিলি আজ ভীষণ খুশি।তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সংবাদটা আজ সে পেয়েছে।ভালোবাসার মানুষটাকে এই খবরটা তো বিশেষ ভাবে জানাতে হয় তাই না?সেজন্যই তো আজ একটু সাজলো।
মিলির এসব ভাবনার মাঝেই দরজায় কলিং বেল বেজে উঠলো।ঘড়িতে তাকাতেই দেখল তন্ময়ের বাড়ি ফেরার সময় হয়ে গেছে।আজ বেশ তাড়াতাড়ি চলে এসেছে তন্ময়।অন্যান্য দিন দশটার আগে বাড়ি ফেরে না।মিলি বেশ অবাক হলো এতে।তন্ময় কি তবে আন্দাজ করতে পেরেছিল যে বাড়িতে ওর জন্য একটা সুখবর অপেক্ষা করছে?হয়তো বুঝতে পেরেছিল সেজন্যে আজ একটু তাড়াতাড়ি চলে এসেছে।মিলি আরো একবার আয়নায় ভালোভাবে নিজেকে একটু দেখে নিয়ে দরজা খুলতে চলে গেল।মুখে তার লেপ্টে আছে মিষ্টি হাসি।দরজা খুলে তন্ময়ের সেই গম্ভীর মুখটা দেখতেই তার সেই হাসিটা দপ করে নিভে গেল।তন্ময় চুপচাপ জুতো খুলে ভিতরে চলে এলো।তার সামনে যে একটা আস্ত মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল,তার জন্য সেজেছে সেদিকে তার কোন খেয়ালই নেই।মিলিকে পাশ কাটিয়ে সে সোজা নিজের ঘরে চলে গেল।মিলি কিছুক্ষণ থ মেরে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকল।তার ধ্যান ভাঙলো তন্ময়ের ওয়াশরুমের দরজা লাগানোর শব্দে।
মিলির খারাপ লাগলো তবে এসব তো আর আজ নতুন নয়।বিগত কয়েক মাস ধরে তন্ময়ের এমন আচরণই সে সহ্য করে আসছে।তার কারণটা অবশ্য মিলির খুব একটা অজানা না।তবু যে কেন বোকার মতন আশা করে দাঁড়িয়েছিল যে দরজা খুলতেই তন্ময় মিলি কে এই রূপে দেখে চমকে যাবে।মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকবে,মন খুলে প্রশংসা করবে।মিলি আজ আরো একবার উপলব্ধি করতে পারলো যে সে আসলেই বোকা।কার থেকে কি আশা করতে হবে সেটুকু জ্ঞান তার এখনো হয়নি।
নিজের ভাবনা গুলোকে এখন আর বেশি পাত্তা দিল না মিলি।ঘরে গেল।দেখলো তন্ময় অফিসের ব্যাগ,ঘড়ি,ওয়ালেট সব বিছানার ওপরে অমনি ফেলে রেখে গেছে।সেগুলো ঠিকঠাক করে গুছিয়ে রাখতেই ওয়াশরুম থেকে তন্ময়ের গলা ভেসে এলো।
“মিলি গামছা দাও তো।”
মিলি কোন কথা না বলে চুপচাপ গামছা নিয়ে গিয়ে তন্ময়ের হাতে দিল।
প্রথম যেদিন এই শাড়িটা পড়ে তন্ময়ের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল সেদিন যেমন বুকের ভিতর কেমন একটা ধুকপুকানি হচ্ছিলো আজও ঠিক তেমনটাই হচ্ছে।মিলি ভীষণ নার্ভাস ফিল করছে।কথাটা তন্ময়কে কিভাবে জানাবে বুঝতে পারছে না।তন্ময়ের অভিব্যক্তি কি হবে?আচ্ছা তন্ময় কি খুব খুশি হবে?জড়িয়ে ধরবে মিলি কে?আজ থেকে কি মিলির সংসারটা ঠিক হয়ে যাবে?তন্ময় কি মিলি কে আগের মত ভালোবাসবে,যত্ন করবে,বারে বারে ফোন করে খোঁজখবর নেবে ঠিকঠাক খেয়েছি কিনা,নিজের হাতে খাইয়ে দেবে বাড়ি ফিরে,মাঝে মাঝে ঘুরতে নিয়ে যাবে?করবে কি এসব?
মিলির এসব ভাবনার মাঝেই বাথরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো।তন্ময় বেরিয়েছে তবে এখনও একবারের জন্য মিলির দিকে চোখ তুলে তাকালো না।হয়ত তার আজকাল মিলি কে দেখতে ইচ্ছে করে না।গম্ভীর গলায় আদেশের স্বরে বলল,
“এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত বানিয়ে নিয়ে এসো তো!”
মিলি কোন কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ বেরিয়ে গেল।কয়েক মিনিটের ব্যবধানে এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত করে নিয়ে এলো তন্ময়ের জন্য।তন্ময় তখন বিছানার উপর বসে ফোন চালাচ্ছে।আঙ্গুলের গতিবিধি দেখে মনে হলো কিবোর্ডে কিছু টাইপ করছে।হয়তো কাউকে মেসেজ পাঠাচ্ছে।মিলি শরবত বাড়িয়ে দিতেই চুপচাপ তন্ময় সেটা খেয়ে গ্লাসটা আবার মিলির হাতে দিয়ে দিল।এখনো তন্ময়ের একটা বারের জন্য মিলির দিকে চোখ তুলে তাকানোর ইচ্ছে হয়নি।মিলি ভাবলো এবার নিজে থেকেই বলবে কেমন লাগছে ওকে দেখতে।কথাটা বলতে যাবে তার আগেই তন্ময় ওর হাতে থাকা ফোনটা এক প্রকার ছুঁড়ে বিছানার উপর ফেলল।মিলি হালকা কেঁপে উঠল।বুঝতে পারলো তন্ময়ের মুড আজ ভালো নেই।
“কি হয়েছে তন্ময়?রেগে আছো কোন কারণে?”
মিলির এই কথাটা যেন আ/গুনে ঘি ঢালার কাজ করলো।তন্ময় রেগে গিয়ে বলল,
“আমার যা হয় হোক তাতে তোমার কি?তোমায় কি আমি কথা বলতে বলেছি এই নিয়ে?জাস্ট গেট আউট ফ্রম হিয়ার মিলি।”
নিজের অজান্তেই মিলির গাল বেয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো।নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে এতটা অবহেলা করা যায়?কত নিষ্ঠুর ভাবে চলে যেতে বললো মিলি কে চোখের সামনে থেকে।প্রথম যেদিন এই শাড়ি পড়ে দেখেছিল তখন তন্ময় দীর্ঘ সময় মিলিকে নিজের সামনে বসিয়ে রেখে শুধু তাকিয়ে ছিল।সেদিনের মত মিলি আজ একইভাবে সেজেছে,তন্ময়ের প্রেমিকা থেকে স্ত্রী হয়েছে,শুধু বদলেছে তন্ময়ের ভালোবাসা।
“আমায় কেমন লাগছে তন্ময়?দেখো তোমার প্রথম উপহার,তোমার দেওয়া শাড়িটা আমি পড়েছি।”
কি মনে করে যেন তন্ময় একবার চোখ তুলে তাকালো এবার।মিলি দেখতে অপূর্ব সুন্দরী।ওর এই মায়াবী মুখটা দেখেই তো তন্ময় প্রেমে পড়েছিল।দীর্ঘ এক বছর পিছনে ঘুরঘুর করার পর মিলি ওর প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছিল।কি আনন্দ তখন তন্ময়ের চোখে মুখে।দেখে মনে হচ্ছিল যেন বিশ্বজয় করে ফেলেছে।তবে মিলির সৌন্দর্য এখন অনেকটাই কমে গেছে।তবে একেবারে যে হারিয়ে গেছে তা না।আজকে একটু যত্ন নিয়ে সাজগোজ করেছে জন্য আরো দেখতে বেশি সুন্দর লাগছে।ফর্সা শরীরটায় বাসন্তী রংয়ের শাড়িটা দারুন ফুটে উঠেছে।হালকা গোলাপি ঠোঁট দুটো ফুটন্ত গোলাপের কুঁড়ির মতন লাগছে দেখতে।মিলিকে দেখলে মনে হয় খুব নিখুঁতভাবে ওর শরীরের প্রত্যেকটা অঙ্গ তৈরি করা হয়েছে।এই চোখে মোটা করে কাজল পড়লে মিলি কে যে কি দারুন লাগে তার বর্ণনা একসময় তন্ময় দিয়েছিল।
মিলি খেয়াল করলো তন্ময়ের অভিব্যক্তি যেন বদলে গেল।এখন আর মুখটা দেখে মনে হচ্ছে না যে রেগে আছে,বরং একটু মুগ্ধতা যেন দেখলো।
তন্ময় উঠে দাঁড়িয়ে মিলির চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে বলল,
“তোমায় তো দারুন লাগছে মিলি!”
আজ কতগুলো দিন পর যে আবার তন্ময় মিলির একটু প্রশংসা করলো সেটা মিলি ভেবেই পাচ্ছে না।শেষ কবে তন্ময় এতটা মনোযোগ দিয়ে মিলিকে দেখেছিল সেটাও তন্ময়ের জানা নেই।আরো একবার মিলি মনে মনে নিজেকে দোষারোপ করল।তার নিজের প্রতি অবহেলার জন্য তন্ময়েরও ওর প্রতি অবহেলা জন্মেছে।
এদিকে তন্ময় যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছে।মিলিকে একটু কাছে টেনে নিয়ে ওর গলার ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে বলল,
“ভীষণ এটট্রাকটিভ লাগছে তোমায়।আমার খারাপ মুডটাকে তুমি একদম ভালো করে দিলে।জানো মিলি তোমায় আমার একটা কারণে ভীষণ ভালো লাগে।আমি যখন তোমায় আমার কাছে ডাকি তুমি ঠিক তখনই আমার কাছে আসো।কখনো আমাকে তুমি দুরে সরিয়ে দাও না,সব সময় রেসপন্স করো আমার ডাকে।কিন্তু…”
“কিন্তু কি তন্ময়?”
তন্ময় বলতে নিয়েও বাকি কথাটা বলল না।এসব কথা মিলি কে বলা যাবে না।কোন মুখে মিলিকে বলবে যে অন্য নারীর কাছে গেলে এভাবে মিলির মতন নির্দিধায়,নিঃসংকোচে তার ডাকে সাড়া দেয় না।আর তন্ময়ের ডাকে সাড়া না দেওয়ার জন্যই তো তন্ময়ের মুডটা আজকে ভীষণ খারাপ।নিজের প্রেমিকার সাথে এই নিয়ে ঝামেলা করতে করতেই তো এক পর্যায়ে ফোনটা ছুঁড়ে মারল।
মিলি বুঝতে পারছে তন্ময় ওকে কাছে পেতে চাইছে,মিলির সাথে ভীষণ ঘনিষ্ঠ একটা মুহূর্ত কাটাতে চাইছে।কিন্তু সেটা তো এখন কোনমতেই সম্ভব না।এদিকে তন্ময়ের আচরণ ধীরে ধীরে বেপরোয়া হয়ে উঠছে।মিলি খুব কষ্টে ওকে আটকানোর চেষ্টা করে বলল,
“প্লিজ একটু ওয়েট করো।আমার তোমাকে কিছু জরুরী কথা বলার আছে।”
তন্ময় নেশালো গলায় বলল,
“প্লিজ এখন না।আগে একটু তোমার কাছে যাই তারপর সব শুনবো,প্রমিস।প্লিজ এখন আমায় বিরক্ত করো না।”
“প্লিজ তন্ময় বোঝার চেষ্টা করো কথাটা ভীষণ জরুরী এবং এখনই শুনতে হবে তোমায়।প্লিজ কন্ট্রোল আনো নিজের উপরে।”
“ধুর বাবা সেটাই তো পারছি না।”
“প্লিজ তন্ময় আগে আমার কথাটা শোনো।আমি জানি তারপর তুমি নিজেই থেমে যাবে।”
“আচ্ছা ঠিক আছে বলো।তাড়াতাড়ি বলো কি বলবে?তারপর কিন্তু আটকাবে না আমায়।”
মিলির হৃদস্পন্দনের গতি বেড়ে গেছে ভীষণ খুশিতে।আজ মিলি অনেক ভেবেছিলো এই খুশির সংবাদটা কোন বিশেষভাবে তন্ময় কে জানাবে কিন্তু তেমন কোন বুদ্ধি তার মাথায় আসেনি।হাতের আঁজলায় তন্ময়ের মুখটা নিয়ে বলল,
“আমি প্রেগন্যান্ট তন্ময়।আমাদের ভালোবাসার একটা অংশ আসতে চলেছে।আমাদের এই বাড়িতে একটা ছোট্ট সদস্য আসতে চলেছে।তুমি আর আমি বাবা-মা হতে যাচ্ছি।”
মুহূর্তের মাঝে তন্ময়ের ঘোর কেটে গেল।মিলির বলা কথাটা যেন ঠিক বুঝতে পারল না এমন ভঙ্গিতে বলল,
“আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না।আরেকবার বলোতো?”
মিলি তন্ময়ের হাতটা নিজের পেটের ওপরে রেখে বলল,
“এই দেখো এখানে তোমার অংশ আছে।আমাদের দুজনের সন্তান আছে এখানে।ও ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে আমার গর্ভে।তুমি বাবা হতে চলেছো তন্ময়।”
এবারও ব্যাপারটা বুঝতে তন্ময়ের বেশ কিছুটা সময় লাগলো।বুঝেছে অনেকক্ষণ আগে কিন্তু সেটা মেনে নিতে অনেক কষ্ট হল।ঘোর থেকে বেরিয়ে ছিটকে মিলির থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে দাঁড়ালো।অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“এটা কি করে সম্ভব?আমি তো তোমায় বলেছিলাম মিলি যে এখনো আমি প্রিপেয়ার্ড না একটা বাচ্চার জন্য।আমাদের দুজনের মাঝে তো কথা হয়েছিল যে আমরা দুজনে একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেব বাচ্চার ব্যাপারে তাহলে তুমি একা কি করে সিদ্ধান্তটা নিতে পারো?”
“আমি নেইনি সিদ্ধান্তটা তন্ময়।আমিও তোমার সম্মতির অপেক্ষাই করছিলাম তবে জানিনা কি করে কি হয়ে গেল।হয়তো আল্লাহ এটাই চেয়েছিলেন সেই জন্য হঠাৎ করে আমাদের জীবনে ওর আগমন ঘটছে।তুমি খুশি হওনি?”
তন্ময় রাগান্বিত গলায় বলল,
“এটা তোমার খুশি হওয়ার মতন কোন খবর বলে মনে হয় যে আমি খুশি হবো?তুমি কি করে এমন একটা কাজ করতে পারো?এটার জন্য আমার জীবনে কি প্রভাব পড়তে পারে সেই বিষয়ে তোমার কোনো ধারণা আছে?আরে ইয়ার আমি প্রিপেয়ার না এখন এসবের জন্য।”
মিলির মুখ থেকে হাসিটা হারিয়ে গেল।সবসময় তার ভাবনার বিপরীত কেন হয়?আজকাল কেন যেন মিলি যা ভাবে সেগুলো সত্যি হয় না।এই খবরটা পাওয়ার পর কি তন্ময় একটু খুশি হতে পারত না?একটু জড়িয়ে ধরে নিজের আনন্দটুকু প্রকাশ করতে পারতে না কি?পারতো।তবে কেন করল না?সন্তানটা তো তন্ময়েরই, তবে কেন ওর আসাতে খুশি হলো না?
“তুমি কেন প্রিপেয়ার না?আমাদের বিয়ের চার বছর হয়ে আসছে।তুমি এখন আগের থেকে অনেক ভালো চাকরি করো তাহলে সমস্যা কি?”
“অবশ্যই সমস্যা আছে জন্য তোমায় বলছি।
আমি ভালো চাকরি করি তার মানে এটা না যে আমার সব টাকা তোমার আর তোমার সন্তানের পিছনে খরচ করে দেবো।ফিউচারের সেভিংস এর একটা ব্যাপার আছে।প্রতি মাসে বেতনের অর্ধেক টাকা বাড়িতে পাঠাতে হয়।এখনও আমি নিজের বাড়ি করতে পারিনি,গাড়ি করতে পারিনি,তার মাঝে এসব।একেই তো তুমি বসে বসে খাচ্ছো এর মাঝে আবার এই বাচ্চা।”
“শাট আপ তন্ময়।আমায় নিয়ে যা ইচ্ছে বলো কিন্তু এই বাচ্চাটাকে নিয়ে একটা শব্দও তুমি উচ্চারণ করবে না।ভুলে যেওনা ও তোমারও সন্তান।”
"আমি ভুলে যেতে চাই মিলি।দেখো আমি তোমায় আগেও যা বলেছি এখনো তাই বলছি আমি বাচ্চার জন্য এখনো তৈরি না।”
“তো তুমি কি করতে বলছ আমায়?”
তন্ময় বুঝলো এই মুহূর্তে মিলির সাথে রাগারাগি করলে চলবে না তাতে পরিস্থিতি আরো বিগড়ে যেতে পারে।এগিয়ে এসে মিলিকে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“লিসেন মিলি এখনো তো আমাদের হাতে অনেক সময় আছে তাই না?পরেও আমরা বেবি নিতে পারব বাট এখন না।তুমি এই বাচ্চাটাকে নষ্ট করে ফেলো।”
মিলি খিঁচে দুচোখ বন্ধ করে নিলো।এই মুহূর্তে তার সামনে দাঁড়ানো পুরুষটাকে মানুষ হিসেবে ভাবতেও মিলির বিবেকে বাঁধছে।একটা মানুষ এতটা নিকৃষ্ট হতে পারে যে নিজের অনাগত সন্তানটাকে মে/রে ফেলার কথা বলছে তাও নির্দ্বিধায়?কোন বাবা তার সন্তানের আসার খবরে কি এতটা অখুশি হতে পারে?হয়তো পারে।এই তো তন্ময় হয়েছে।মিলিকে চুপ করে থাকতে দেখে তন্ময় পুনরায় বলে উঠলো,
“মিলি প্লিজ আমার কথাটা রাখো।আমি জানি এটা করতে তোমার কষ্ট হবে বাট তোমায় করতে হবে।ইউ লাভ মি মোর দেন দা বেবি রাইট?আই অলসো লাভ ইউ জান।তাই বলছি এই বাচ্চাটাকে নষ্ট করে ফেলো।”
“অনেক বলে ফেলেছো তন্ময় আর না।প্লিজ এবার থামো।আমি আর সহ্য করতে পারছি না।”
“মানে তুমি আমার সিদ্ধান্তে রাজি তো?”
মিলি তন্ময়ের দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
“যতদিন আমার নিঃশ্বাস চলছে আমার আল্লাহ ছাড়া আমার সন্তানকে আমার থেকে আর কেউ কেড়ে নিতে পারবে না,এমন কি তুমিও না।আর তোমায় সাবধান করে দিচ্ছি আর কখনো যদি তুমি তোমার মুখ দিয়ে আর একবার আমার সন্তানকে মে/রে ফেলার কথা বলেছো আমার থেকে খারাপ কিন্তু আর কেউ হবে না।”
তন্ময় আর নিজের শান্ত ভাবটা ধরে থাকতে পারলো না।মিলির দু'বাহ শক্ত করে চেপে ধরে দাঁত পিষে বলল,
“তাহলে বেরিয়ে যা আমার বাড়ি থেকে।
তোকে আর তোর সন্তানকে তিনবেলা বসে বসে খাওয়াতে পারবো না আমি।আমি তোকে আগেও সাবধান করেছিলাম যে এখনই এসব বাচ্চা কাচ্চার ব্যাপারে যাস না কিন্তু তুই আমার কথা শুনিস নি।তারপরও আমি তোকে একটা সুযোগ দিয়েছিলাম যে ওটাকে মে/রে ফেল।তাহলে অন্তত তোর জায়গা হবে এই বাড়িতে।কিন্তু এখন মনে হচ্ছে না তোর এই বাড়িতে জায়গা হবে আর না তোর বাচ্চার।”
মিলি তাচ্ছিল্য ভরা কন্ঠে বলল,
“বাহ্ তুমি থেকে সোজা তুই?তোমার সংসারে আনার জন্য পা ধরে কেঁদেছিলে আর আজ সোজা তোমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলছো?কি অপরাধ আমার তন্ময় যে তুমি এতটা বদলে গেলে?আমার চোখের পানি তো তুমি সহ্য করতে পারতে না অথচ আজ তুমি প্রতিটা মুহূর্তে আমাকে কাঁদাও।আমার দোষটা কি?”
তন্ময় মিলিকে হালকা করে ধাক্কা মে/রে দূরে সরিয়ে দিয়ে বলল,
“এত দোষ-গুণ আমি কিচ্ছু জানি না।আমি শুধু জানি এই বাচ্চাটাকে আমি চাইনা।আমি ওকে মেনে নেব না।তুমি যা পারো ওকে নিয়ে করো।আমার বাড়িতে ওর জায়গা হবে না।হয় বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও নয়তো ওকে মে/রে…”
তন্ময় কথাটা সম্পূর্ণ করার আগেই মিলি সপাটে ওর গালে একটা চ/ড় বসালো।তন্ময় কোনমতেই ভাবতে পারেনি যে মিলি এভাবে ওর গায়ে হাত তুলবে।তন্ময় মিলির দিকে তেড়ে আসতে নিলে মিলি নিজের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে আরো একটা চড় বসালো তন্ময়ের গালে।এবারে তন্ময় বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।আঘাতপ্রাপ্ত গালে হাত রেখে বিস্ময় ভরা গলায় বলল,
“তুমি আমার গায়ে হাত তুললে মিলি!”
মিলির চোখ দিয়ে আগুন বর্ষিত হচ্ছে।সেই সাথে একাধারে পানিও পড়ছে।তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে হুংকার ছেড়ে বলল,
“তুমি একটা অমানুষ,পশু।অবশ্য তোমার থেকে হয়ত পশুও ভালো আছে।অন্তত ওদের শরীরে মায়া-দয়া বলতে তো কিছু থাকে।নিজের সন্তানকে যে এত ঘৃণা করছো আমার কাছাকাছি আসার সময় মনে ছিল না?আমার শরীরে নিজের এই নোংরা ছোঁয়া বসানোর সময় মনে ছিল না তোমার?সারাদিন রাত অন্য মেয়ের সাথে নোংরামো করে এসে আবার আমাকে ছোঁয়ার জন্য উন্মাদ হওয়ার সময় তোমার লজ্জা করত না?”
রাগে তন্ময়ের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।মিলির চোয়াল চেপে ধরে দাঁত পিষে বলল,
“আমার বউ তুমি।তোমার উপর আমার অধিকার আছে।তোমাকে ছোঁয়ার জন্য কারো থেকে অনুমতি নেওয়ার আমার দরকার নোই।নিজের ভাগ্য ভালো মনে করো যে এখনো তোমাকে ছুঁতে গেলে আমি উন্মাদ হয়ে যাই।আমি ছাড়া না কেউ চোখ তুলেও তাকাবে না তোমার দিকে।”
“তাকাতো তো এক সময় তন্ময়।তোমার থেকে হাজার গুণ ভালো ছেলেরা আমার দিকে তাকাতো কিন্তু ভুলটা আমি করেছিলাম তাদের পাত্তা না দিয়ে তোমার মতন একটা অমানুষকে ভালোবেসে ছিলাম।এত তাড়াতাড়ি সব ভুলে গেলে?সেই ছেঁড়া শার্ট,বছরের পর বছর পড়তে পড়তে ক্ষয় হয়ে যাওয়া জুতো,সারা বছর জুড়ে প্রতিদিন একই জামা-কাপড় পড়ে মাঠে ঘুরতে থাকা বোকা,রোগা পাতলা কালো ছেলেটাকে যখন কলেজের সবাই তিরস্কার করতো,হাসাহাসি করতো তোমায় নিয়ে, তখন তোমার পাশে কে ছিল?আমি ছিলাম।আজকের তোমার এই মর্ডান কালিগ তখন তোমার পাশে ছিল না। যদি তোমাকে সেই রুপে তারা দেখতো না তোমার উপর থুথু ফেলতো।আর আজকে তুমি আমাকে বলছো এসব কথা।লজ্জা করো তন্ময়।”
তন্ময় ভীষণ অপমানিত বোধ করল।দ্বিতীয়বারের মতন মিলিকে হালকা করে ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ফোনটা হাতে নিয়ে।মিলি সেখানে বসে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।তন্ময়ের সাথে তার সংসারটা তো এমন হওয়ার কথা ছিল।না তাদের সংসার ভাঙার কথা ছিল।ভালোবাসা তো এত তাড়াতাড়ি শেষ হওয়ার কথা ছিল না।তবে কেন হলো?মিলির ভাবনা অনুযায়ী তো কিছু হলো না।তন্ময়কে ভালোবেসে নিজের পরিবার, বাবা-মা,আভিজাত্যপূর্ণ জীবন,চাকরি,সুখ শান্তি সবকিছু বিসর্জন দিয়ে ওই বেকার ছেলেটার হাত ধরে পালিয়ে এসে কি পেল মিলি আজ?কিচ্ছু পায়নি,কিচ্ছু না।