নীল চোখের অপেক্ষায়

পর্ব - ১২

🟢

এদিকে রেহান জারা আরিয়ান এর বাসার সবাই ঢাকা এসেছে।নেহাদের বাসায়।এখানে সবাই আরিয়ানকে আদিত্য বলেই ডাকে।আদিত্য এর মায়েরা দুই বোন এক ভাই ভাইয়ের দুই ছেলে এক মেয়ে আর আদিত্য এর খালার

কোন সন্তান নেই তাই তিনি আদিত্যকে খুব ভালোবাসেন।

আদিত্য এর মামা দেদার রায় এবং মামী কামিনি রায়।তাদের সন্তান নেহা নেহাল আর নাহিদ মুলত নাহিদ এর বিয়ের জন্যই তারা

এখানে এসেছে।আর বিয়েটা হচ্ছে অরিন এর বোনের সাথেই তবে এ বেপারে আরিয়ান বা অরিন কেউই জানেনা।

আদিত্য এর মামী চায় নেহার সাথে আদিত্য এর বিয়ে হোক তাহলে আদিত্য এর সমস্ত সম্পত্তি তার মেয়ের হবে তাই ছোট বেলা থেকেই তিনি মেয়েকে ফুসলিয়ে ছেন।

আর নেহাও আদিত্যকে অনেক ভালোবাসে আদিত্য সবটা বুঝেও নির্বিকার থাকে কারন সে তার নীলাম্বরী কে ভালোবাসে।এইসব কারনে আদিত্য তেমন একটা আসেনা তার মামার বাসায়।

আর পড়াশোনার চাপে

থাকায় আরো আসতে পারেনা।আদিত্য এর ঢাকা মেডিকেল কলেজেও চান্স হয়েছিল কিন্তু সে বরিশাল থেকে আসতে চায়নি।তারা আসতেই কামিনি রায় যেন খুশিতে

গদগদ হয়ে বলে উঠলো আরে আদিত্য বাবা কতোদিন পরে দেখলাম তোমায় তুমি তো আমাদের বাসায় আসোনা।আমাদের কি ভালোলগেনা তোমাদের বলো।

"" আরে মামী কি জে বলেন ভালো লাগবেনা কেন পড়াশোনা নিয়ে একটু চাপে থাকতে হয়।

তাতো অবস্যই।

এর মধ্যে আদিত্য এর মামা বলে উঠলো কি ব্যাপার কামিনি বাচ্চাদের বসতে দিবে তো আর জারা মামনি রেহান তোমরা উপরে যাও ফ্রেশ হয়ে হালকা কিছু খাবার খেয়ে নাও কাল সকালে আমরা রিসোর্টে যাব।

'""হ্যা হ্যা তাইতো যাও তুমি আর রেহান এক রুমে থাকবে জারা আর নেহা এক রুমে।

তারা হালকা কিছু খেয়ে ঘুমিয়ে পরলো।

এর মধ্যে নেহাল বলে উঠলো আরে জারা শোনো খাওয়া শেষে আমাদের কিছু প্ল্যান আছে তা নিয়ে তোমার সাথে ডিসকাশন করবো।

রেহান তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেললো জারার দিকে জারাও বললো অবস্যই তবে নাহিদ ভাইয়াকে তো দেখছি না সে কোথায়।

কামিনি রায় বলে উঠলো ও তো মেজো আপাকে

নিতে গেছে।

ওহ আচ্ছা। বলে সবাই যার যার রুমে চলে গেলো।

"" খাওয়ার শেষে জারা আর নেহাল গল্প করতে শুরু করে।রেহান ও তাদের দেখে কিছুক্ষণ বসলো কিন্তু আরিয়ান এর ডাকে সে রুমে

চলে গেলো।সে বেশ বুঝতে পারছে জারা তাকে এরিয়ে চলছে আর এটাই স্বাভাবিক কিন্তু সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।

তার রাগ হচ্ছে। কিন্তু কেন?

------------------------------

বিয়ের দিনকে ঘিরে দুই পক্ষের পরিবার মিলে ঠিক করেছিলো শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে, সবুজে মোড়া ঢাকার এক সুন্দর রিসোর্টে আয়োজন হবে সব অনুষ্ঠান। সকালে রিসোর্টে পৌঁছাতেই চোখে পড়ে বিশাল গেট, চারপাশে রঙিন ফুলের সাজ আর লাইটের ঝলক। রিসোর্টের ভেতরে ঢুকতেই শান্ত পরিবেশ— লেকের ধারে ঝুলন্ত ব্রিজ, খেজুর ও নারকেল গাছের সারি, আর পাখির ডাক যেনো আনন্দকে আরো বাড়িয়ে তোলে।

দুই পক্ষের লোকজন আলাদা আলাদা ব্লকে থাকছে— কনের পরিবার একপাশে, বরপক্ষ অন্যপাশে। রিসোর্টের কটেজগুলো সুন্দরভাবে সাজানো, প্রতিটিতে ফুল দিয়ে ডেকোরেশন করা হয়েছে। সুইমিংপুলের পাশে বসানো হয়েছে আড্ডা আর মেহেদির আয়োজন, আর বড় মাঠে মঞ্চ তৈরি হচ্ছে মূল বিয়ের দিনের জন্য।

দু’পক্ষের ছোট-বড় সবাই ব্যস্ত— কেউ রুম চেক করছে, কেউ সাজসজ্জা সামলাচ্ছে। মেয়েরা হাসি-আড্ডায় ব্যস্ত, ছেলেরা মজা করে ছবি তুলছে। রিসোর্ট বুকিং যেনো শুধু বিয়ের অনুষ্ঠান নয়, বরং দুটো পরিবারকে আরো কাছাকাছি নিয়ে আসছে।

বিকেলের আলো গাছের পাতায় পড়ছে, চারপাশে হালকা বাতাস— মনে হচ্ছিলো যেনো পুরো প্রকৃতিই বিয়ের খুশিতে ভরে গেছে।

ঢাকার সবুজে ঘেরা রিসোর্টে সন্ধ্যা নামতেই শুরু হলো গায়ে হলুদ ও মেহেদীর অনুষ্ঠান। চারপাশ রঙিন ঝালর, হলুদ ফুল, আর আলোর ঝলকে ঝলমল করছে। খোলা আকাশের নিচে সাজানো মঞ্চ— একপাশে আদ্রি আসন, অন্যপাশে বরপক্ষের নাহিদ আসন।

ঢোলক, গান আর হাসি-আড্ডায় পরিবেশ জমে উঠেছে।

আদ্রিকে গায়ে হলুদ দিচ্ছে আবার তার বন্ধুরা নানা ভাবে লজ্জাও দিচ্ছে সে মাঝে মাঝে লজ্জায় লাল নীল হচ্ছে, হলুদ শাড়ি আর মাথায় গাঁদা ফুলের সাজে যেনো সত্যি রাজকন্যার মতো লাগছে তাকে আজ।

এদিকে নাহিদের বন্ধুরা ঠাট্টা-তামাশা করে হলুদ মেখে দিচ্ছে। দুই পরিবারের ছোট-বড় সবাই একে অপরকে হলুদ মাখাচ্ছে, হাসির কলতানে রিসোর্ট মুখর হয়ে উঠেছে।

এর মধ্যে এখনো অরিন এর সাজ কমপ্লিট হয়নি সে শাড়ি পরতে জানেনা তাই বসে আছে ওপর দিকে আখি রেডি হয়ে নিচে চলে গেছে।কিছুক্ষণ পরেই আখির মা এসে অরিনকে একটা লাল পারের হলুদ জামদানী শাড়ি পরিয়ে দিলো সাদা করে পেছনে আচলটা ছেড়ে দওয়া।সে তেমন একটা সাজেনি যেটুকু না সাজলেই নয়। চোখে কাজল মুখে ক্রিম আর হালকা পাউডার। ঠোঁটে লাল লিপস্টিক আর রায়ানকে বলে সে আগে থেকেই কাচা ফুলের গহনা এনে রেখেছিলো

সেগুলোই পরিয়ে দিলো তার মামি।

সাজ শেষে তার মামী তাকিয়ে বললো আরে অরিন তোকে তো একদম হলুদ পরির মতো লাগছে মা।মাৃীর কথা শুনে অরিন কিঞ্চিৎ লজ্জা পেলো।এর মধ্যেই নিচ থেকে আখি ডাকতে শুরু করলো।

"" আচ্ছা মামী থাকো আসি।বলে দৌড়ে বেরিয়ে গেলো।

আরে আসতে যা পরে যাবিতো।

বিজ্ঞাপন

-------------

এদিকে রেহান আর আরিয়ান আজ হলুদ পাঞ্জাবি পরেছে চুলগুলো বরাবরের মতোই সেট করা তাদের দুজনকেই অসম্ভব সুন্দর লাগছে।

এর মধ্যেই জারা বেরিয়ে এলো তার পরনে হলুদ সারি চুলগুলো একপাশে ছেরে দেওয়া তাকে দেখতে একদম অপ্সরাদের মতো লাগছে।তাকে নেমে আসতে দেখেই নেহাল বলে বুকে হাত দিয়ে বলে উঠলো

"হায় মে মারজাওয়া" তোমার এই রুপেই আমি একদিন ধ্বংস হয়ে যাবো।

তার এই রিয়াকশন কেউ না দেখলেও রেহান ঠিক ই খেয়াল করলো যা তার একদমি পছন্দ হয়নি।

জারা আরিয়ান এর সামনে এসে বললো ভাইয়া আমাকে কেমন লাগছে বলোতো।

আরিয়ান মৃদু হেসে বললো আমার বোন সবসময় পরির মতোই।নেহাল বলে উঠলো ঠিক বলেছো ভাইয়া জারা তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে। কিন্তু কিছু একটা মিসিং মনে হচ্ছে বাট কি বুঝতে পারছিনা।

এর মধ্যে নেহা নেমে আসলো তার পরনে স্লিভলেস ব্লাউজ পাতলা জামদানী শাড়ি পরেছে যার ফলে শরিরের বেশির ভাগ অংসই উন্মুক্ত। মুখে একগাদা মেকআপ আর শরিরের বেশিরভাগ অংসই দেখা যাচ্ছে। সে এসেই আরিয়ান এর সামনে দারিয়ে বললো আদিত্য বলোতো আমাকে কেমন লাগছে।

"" পাশ থেকে রেহান ফট করে বলে উঠলো আপনাকে ময়দার গোডাউন মনে হচ্ছে আফা।এতো ময়দা মুখে মাখলে ভবিষ্যতে ময়দার সংকট পরবে আমাদের দেশে।

"" তার কথা শুনে নেহাল জারা মিটি মিটি হাসছে।

"" ওহ শাটআপ রেহান আমি আদিত্য কে জিজ্ঞেস করেছি তোমাকে নয়।

"" আমি আদিত্য এর হয়েই বলে দিয়েছি।

এর মধ্যেই আদিত্য গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো তোদের হলে আমরা এবার যাই নাকি অনুষ্ঠান শেষ হলে যাবি।

"" আদিত্য এর এমন এরিয়ে যাওয়ায় নেহার কিছুটা খারাপ লাগলো।

এরপর তারা হলুদ এর অনুষ্ঠান যেখানে শুরু হয়েছে সেখানে আসলো তারা আসতেই সবাই ছবি তোলায় ব্যাস্ত হয়ে পরলো।জারাকে নেহাল ছবি তুলে দিচ্ছে।

আদিত্য আর রেহান একপাশে দারিয়ে আছে।হঠাৎ আদিত্য এর চোখ পরলো শিরি দিয়ে নেমে আসা এক হুরপরীর দিকে তার চোখ যেন ওখানেই আটকে গেলো।তার হৃদস্পন্দন থেমে যাবে মনে হয়। রেহান অনেকবার ডাকার পরও যখন আদিত্য সাড়া দিচ্ছিল না তখন তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনের দিকে তাকিয়েই তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।

ভাই এরা কথা থেকে আসলো।আরিয়ান ঘরের মধ্যেই বলে উঠলো আমি নিজেই জানিনা।জারাকে জিজ্ঞেস কর।

অরিন শিরি দিয়ে নামছে আর আরিয়ান তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ ই অরিন সামনে তাকাতেই থতমত খেয়ে গেলো সে ভাবতেই পারেনি এখানে আরিয়ানকে দেখতে পাবে সে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। এর মধ্যে হঠাৎ লাইট চলে গেলো।

আর আরিয়ান অরিন এর হাত টেনে ধরে এক সাইডে নিয়ে গেলো যেখানে কেউ ছিলো না।আদিত্য এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার নীলাম্বরীর দিকে।যেন চোখ সরালেই হারিয়ে যাবে।

অরিন আরিয়ানের এই দৃষ্টি বুঝতে পারছেনা। সে ভয়ে ফিসফিস করে বললো কি করছেন ভাইয়,,,,তার আগেই আরিয়ান অরিন এর ঠোঁটে আঙুল রাখলো।এতে করে অরিন কিঞ্চিৎ কেপে উঠলো।

আরিয়ান বললো নীলাম্বরী তুমি কেন এতে সেজেছ কে বলেছে সাজতে তোমার এই সাজে আমার ভেতরটা জলেপুরে যাচ্ছে। তোমার এই কাজল কালো চোখ বাকানো কোমরে তোমাকে ছুয়ে দিতে ইচ্ছে করছে।অরিন স্তব্ধ হয়ে গেছে সে কিছুই বুঝতে পারছেনা এর মাঝেই অরিন তার গালে শীতল স্পর্শ পেয়ে কেপে উঠলো। আরিয়ান তার গালে হলুদ নিয়ে অরিন এর গালে স্লাইড করতে থাকে অরিন শক্ত করে আদিত্য এর পাঞ্জাবির কালার আকরে ধরে।

ফিসফিস করে বলে উঠে কেন করছেন এমন আমার সাথে এটা ঠিক না।

"" আরিয়ান ফট করে নিজের ঘোর থেকে বের হলো সে অরিন এর দিকে রাগি চোখে তাকিয়ে বললো কি ঠিক নয়।আর তুই সেজে এসেছিস এটা তোর দোষ আমার নয়।

বলেই সেখান থেকে চলে গেলো।

অরিনের সবটা যেন মাথার ওপর দিয়ে গেলো সে কিছুই বুঝতে পারছেনা আর আরিয়ান এর এই ব্যাবহার কেন করছে সে এমন।এর মধ্যে সব লাইট জলে উঠলো সে এসব ভাবতে ভাবতেই অনুষ্ঠানে চলে গেলো দেখলো সেখানে জারাও আছে।সে তো অনেক খুশি যার ফলে কিছুক্ষণ আগের ঘটনা ভুলেই গেলো।

কিন্তু এই ওরুটা সময় একজোড়া চোখ তাদের অবলোকন করেছে সে আর কেউ না নেহা।

সে বেস বুঝতে পারছে এই মেয়েটার জন্যই আদিত্য তাকে পছন্দ করেনা ভালোবাসেনা।

তার চোখে পানি টলোমলো করছে।

সে মনে মনে বলে উঠলো ;

তুমি আমার কাছে সপ্ন নও

বরং অভিশাপ যাকে

চাইতে চাইতেই আমি ধ্বংস,,,,,,!

ভেবে তার চোখ দিয়ে দুই ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো। সে তা মুছে চলে গেলো সেখান থেকে।

জারা সবটা দেখে মনে মনে

বললো আমি জানি তোমার কতটা কষ্ট হচ্ছে। একতরফা ভালোবাসার কষ্ট আমার থেকে ভালো কে আর বোঝে।তবে তুমি যত তাড়াতাড়ি বুঝবে ততোই তোমার জন্য ভালো।

বিজ্ঞাপন
নীল চোখের অপেক্ষায় গল্পটি জান্নাতী আক্তার সিমি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও সাংসারিক গল্প